📄 ইয়াহুদীদের দণ্ড হ্রাসের প্রচেষ্টা চালানো
হযরত ঈসা (আ) কলহ-দ্বন্ধে লিপ্ত বানু ইসরাঈল জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করিতে চেষ্টা করিয়াছিলেন। বানূ ইসরাঈলের এলাকা ভ্রমণ করিয়া অত্যন্ত হিকমতের সহিত বুঝাইবার চেষ্টা করিয়াছিলেন। যোহন সুসমাচারে উল্লেখ করা হইয়াছে, ঈসা (আ) সমিরীয় প্রদেশে আসিয়াছিলেন। সেইখানে তাহার দাওয়াত দেওয়ার পর ঈসা (আ)-এর উপর তাহারা ঈমান আনিয়াছিল (দ্র. যোহন, ১:৪০)।
বনী ইসরাঈলের মধ্যে ঈসা (আ)-এর ঐক্যের আহবানে ও তাহাদের মুক্তির জন্য হিকমতের বিষয়টি আল-কুরআনেও স্পষ্টভাবে আসিয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে:
وَلَمَّا جَاءَ عِيسَى بِالْبَيِّنَتِ قَالَ قَدْ جِئْتُكُمْ بِالْحِكْمَةِ وَلِأُبَيِّنَ لَكُمْ بَعْضَ الَّذِي تَخْتَلِفُونَ فِيهِ فَاتَّقُوا اللَّهَ واطيعون .
"ঈসা যখন স্পষ্ট নিদর্শনসহ আসিল, সে বলিয়াছিল, আমি তো তোমাদের নিকট আসিয়াছি প্রজ্ঞাসহ এবং তোমরা যে বিষয়ে মতভেদ করিতেছ, তাহা স্পষ্ট করিয়া দিবার জন্য। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমাকে অনুসরণ কর" (৪৩:৬৩)।
ইয়াহুদীদের দণ্ড হ্রাসের প্রচেষ্টা চালানো: বানু ইসরাঈল আল্লাহর কিছু কিছু বাণী বিকৃত করিয়া দাবি করিতেছিল যে, সৃষ্টিকর্তা একমাত্র তাহাদের কল্যাণেই কাজ করেন। তাহারাই আল্লাহ্ নির্বাচিত জাতি। গোটা দুনিয়ার মালিক তাহারাই। এসকল কথা তাহাদের মৌখিক বাণী। তালমুদে আরো ব্যাপকভাবে আসিয়াছে যাহার মূল উৎস পুরাতন নিয়মেও আছে বলিয়া তাহারা ধারণা করিতে থাকে। যেমন লেবীয় পুস্তকে আসিয়াছে, আমি সদাপ্রভু তোমাদের ঈশ্বর! আমি অন্য জাতি সকল হইতে তোমাদিগকে পৃথক করিয়াছি (লেবীয় পুস্তক, ২০ঃ ২৪)।
এই সমস্ত তত্ত্বকথা হইতে ইয়াহূদীদের মাঝে প্রচণ্ড জাতীয় দন্ত সৃষ্টি হয়। আল্লাহ্ প্রতি তাহাদের জাতীয় ভ্রান্ত চেতনা হইতে সৃষ্টি হয় বিভিন্ন বিভ্রান্তিমূলক চিন্তা-চেতনা। শত পাপাচারে লিপ্ত হওয়ার পরও তাহারা নিজেদেরকে দোষী মনে করিত না। এই ধারণার কথা আল-কুরআনেও বর্ণিত হইয়াছে:
ذلكَ بِأَنَّهُمْ قَالُوا لَنْ تَمَسَّنَا النَّارُ الأَ أَيَّامًا مَّعْدُودَت وَغَرَّهُمْ فِي دِينِهِمْ مَا كَانُوا يَفْتَرُونَ
"এইহেতু যে, তাহারা বলিয়া থাকে, দিন কতক ব্যতীত আমাদিগকে অগ্নি স্পর্শ করিবে না। তাহাদের নিজেদের দীন সম্বন্ধে তাহাদের মিথ্যা উদ্ভাবন তাহাদিগকে প্রবঞ্চিত করিয়াছে” (৩ঃ ২৪)।
সুতরাং তাহাদের জীবন চলার পথ বক্র হইয়া গিয়াছিল। তাই হযরত ঈসা (আ) তাহাদেরকে সিরাতুল মুসতাকীম অবলম্বনের দাওয়াত দিয়াছিলেন। তেমনিভাবে তাকওয়া তথা আল্লাহভীতি ও পরহেজগারীর দাওয়াতকেও উহার সহিত যুক্ত করিয়াছেন। এইজন্য আল-কুরআনে সূরা যুখরুফে হযরত ঈসা (আ)-এর দাওয়াত উল্লেখ করিতে গিয়া তাকওয়া ও সিরাতুল মুসতাকীমের দাওয়াত-এর কথা উল্লেখ করা হইয়াছে (দ্র. সূরা যুখরুফ : ৬৩-৬৪)। কেননা তাহাদের এই দম্ভ নিরসন করিতে হইলে যেমনি দরকার ইবাদত-এর তেমনিভাবে প্রায়োজন তাকওয়ার। হযরত ঈসা (আ) তাহাদের আমল না করিয়াই আল্লাহ্ প্রিয়পাত্র হওয়ার দাবিকে বিভিন্নভাবে খণ্ডন করিয়াছিলেন, যাহা প্রচলিত সুসমাচারসমূহেও উল্লিখিত হইয়াছে (দ্র. যোহন, ৮ : ৩৮-৪৭)।
এমনিভাবে হযরত ঈসা (আ) ব্যাখ্যা করেন যে, তাহাদের এই রাজ্য এবং আল্লাহ কর্তৃক নির্বাচন যাহা তাহারা দাবি করিতেছে অচিরেই তাহা হস্তচ্যুত হইবে তাহাদেরই কর্মফল স্বরূপ। ঈসা (আ) বলিয়াছিলেন, আমি তোমাদিগকে কহিতেছি, তোমাদের নিকট হইতে ঈশ্বরের রাজ্য কাড়িয়া লওয়া হইবে এবং এমন এক জাতিকে দেওয়া হইবে, যে জাতি তাহার ফল দিবে (মথি, ২১ : ৪৩)।
এইভাবে তিনি তাহাদের দম্ভ হ্রাস করিয়া সঠিক পথের সন্ধান দিতে চেষ্টা করিয়াছিলেন। হযরত ঈসা (আ)-এর দাওয়াত উপস্থাপনার আরও কয়েকটি কৌশলগত দিক রহিয়াছে যাহা তাহার শিক্ষার মূলে নিহিত। তন্মধ্যেঃ
(১) বাহ্যিকতা ও আনুষ্ঠানিকতার উপর নির্ভর না করিয়া শরীআতের মূল চেতনা আকড়াইয়া ধরা এবং তাহার বিধিবিধান নিষ্ঠার সহিত পালন করা।
(২) আখেরাতের জিন্দিগীর পুনরুজ্জীবিত করা।
(৩) তাকওয়ার অনুভূতি হৃদয়মূলে সুদৃঢ় করিয়া দেওয়া।
(৪) ইয়াহূদীদিগকে বস্তুবাদী হইতে ফিরাইয়া বেহেস্তী জিন্দেগীরমুখী করা।
(৫) ইসরাঈলী সামাজে অবহেলিত ও নির্যাতিত ব্যক্তিদের গুরুত্ব পুনরুদ্ধার করা।
(৬) হতাশাগ্রস্ত, বিপদগ্রস্ত এবং পীড়িতদের সাহায্য করা।
(৭) তাহার দাওয়াতকে পূর্ববর্তী দাওয়াতের সহিত সম্পর্কিত করা এবং সত্যায়ন করা।
(৮) আধ্যাত্মিক আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার নীতির উপর গুরুত্ব আরোপ করা।
(১০) দাওয়াত দানকারীর জন্য নিজেকে সমস্ত সন্দেহের উর্ধ্বে রাখা।
(১১) তাঁহার অবর্তমানে অনুসারিগণ যাহাতে হতাশ ও নিরাশ হইয়া না পড়ে, সেইজন্য পরবর্তী পয়গম্বরের সুসংবাদ দান।
মোটকথা, হযরত ঈসা (আ) তাঁহার দাওয়াত উপস্থাপনে উপরিউক্ত কৌশলগত নীতিসমূহ অবলম্বন করিতেন। তাঁহার দাওয়াতের আর একটি বৈশিষ্ট্য ছিল ভ্রাম্যমাণতা। তিনি নির্দিষ্ট কোন স্থানে বাস না করিয়া গ্রাম গঞ্জে ঘুরিয়া ঘুরিয়া লোকজনকে নসীহত করিতেন, শিক্ষা দিতেন, আসমানী রাজ্যের সুসংবাদ দিতেন। তিনি তাঁহার স্বল্পকালীন নবুওয়াতী জীবনে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনায় এমন এক দল সহচর বা হাওয়ারী তৈয়ারি করিয়া গিয়াছিলেন যাহারা তাঁহার শিক্ষা প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ইয়াহুদী ষড়যন্ত্র ও রোমানদের অত্যাচারের মুখেও তাহার দাওয়াত থামিয়া থাকে নাই, যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে গোপনীয়ভাবে চলমান ছিল। হযরত ঈসা (আ)-এর পক্ষ হইতে যে দৃঢ়তা তাঁহার সাথীরা লাভ করিয়াছিলেন, শত বাধার মুখেও তাহা পরিত্যাগ করেন নাই। অতএব হযরত ঈসা (আ)-এর দাওয়াত স্বল্পকালীন হইলেও তাহার প্রভাব ছিল সুগভীর ও সুদূর প্রসারী।
📄 ঈসা (আ)-এর দাওয়াতের পথে নানাবিধ বাধা
হযরত ঈসা (আ)-এর দাওয়াতে সাধারণ লোক আকৃষ্ট হইয়া গিয়াছিল, যেজন্য তিনি যেখানেই যাইতেন তাঁহার পিছনে অনুসারীদের ঢল নামিত। কিন্তু ইহাতে ধর্ম ব্যবসায়ী কায়েমী স্বার্থবাদী ইয়াহুদী পণ্ডিত ও নেতাদের গাত্রদাহ আরম্ভ হয়। হযরত ঈসা (আ)-ও তাহাদের সেই ভণ্ডামীর জোর সমালোচনা করিতেন। ফলে তাহারা ঈসা (আ)-এর বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক ভূমিকা গ্রহণ করে। হযরত ঈসা (আ) তাহাদেরকে শুধু যুক্তি ও নৈতিকভাবেই নহে, বরং কাজের মাধ্যমেও তাহাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করিয়াছিলেন। বর্ণিত আছে যে, ইয়াহুদীদের কোন এক ঈদুল ফেসাখের সময় তিনি জেরুজালেম গিয়াছিলেন। তিনি সেখানে দেখিলেন, লোকেরা ইবাদতখানার মধ্যে গরু ভেড়া আর কবুতর বিক্রী করিতেছে এবং টাকা বদল করিয়া দিবার লোকেরাও বসিয়া আছে। এই সমস্ত দেখিয়া তিনি দড়ি দিয়া একটা চাবুক তৈরি করিলেন, আর তাহা দিয়া সমস্ত গরু ভেড়া এবং লোকদেরও সেই জায়গা হইতে তাড়াইয়া দিলেন। তিনি বলিলেন, এই জায়গা হইতে সমস্ত কিছু লইয়া যাও। কারণ ইহা আল্লাহর ঘর। আল্লাহর ঘরকে ব্যবসার ঘর করিও না (দ্র. যোহন, ২ : ১৩-১৬)।
উল্লেখ্য যে, উল্লিখিত ব্যবসায় যাহারা জড়িত ছিল তাহাদেরকে ছানদারিন বলা হইত। ইহারা ছিল ইয়াহুদী সমাজে একটি প্রতিষ্ঠিত সংস্থা যাহার প্রধান সদস্য ছিল ৭০ জন ধর্মযাজক। যাহারা বানু ইসরাঈলের মধ্যে তাহাদের আইনগত কর্তৃত্ব ছিল (আহমদ-আবদুল ওয়াহাব, আল মাসীহ ফী মাসাদিরিল আকাঈদিল মাসীহিয়্যা, কায়রো, মাক্কাবাহ ওয়াহবাহ, মিসর ১৯৭৮ ১৩৯৮ হি., page ১৫০)।
হযরত ঈসা (আ) যেন ভিমরুলের চাকে হাত দিয়াছিলেন। তাই এই স্বার্থান্বেষী মহল প্রথম হইতেই তাঁহাকে শেষ করিয়া দিয়া তাঁহার তৎপরতা হইতে মুক্তি লাভ করিবার জন্য চেষ্টা করিতেছিল। আর তখন হইতেই সৃষ্টি হয় তাঁহার দাওয়াতে নানা ধরনের বাধা। আলুসী উল্লেখ করেন, সহীহ বর্ণনায় আসিয়াছে যে, হযরত ঈসা (আ) ইয়াহুদীদের পক্ষ থেকে অনেক ধরনের কষ্ট তথা বিপত্তির সম্মুখীন হইয়াছিলেন (আলুসী, প্রাগুক্ত, ৩খ, page ১৭৪)। এই গুলির মধ্যে নিম্নে কয়েকটির দিক আলোচনা করা হইল।
(১) ঈসা (আ)-এর ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে রটনা: হযরত ঈসা (আ) জনগণের মাঝে যে সাড়া জাগাইয়াছিলেন এবং প্রভাব বিস্তার করিয়াছিলেন উহা নষ্ট করিবার জন্য প্রথমে তাহারা তাঁহার ব্যক্তিত্বে আঘাত হানে। এই লক্ষ্যে তাহারা কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
(ক) ঈসা (আ)-এর জন্ম সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন: পূর্বেই বর্ণিত হইয়াছে, হযরত ঈসা (আ)-এর অলৌকিক জন্মকে প্রথমত ইয়াহুদীরা স্বাভাবিক ভাবে মানিয়া লইতে পারে নাই। তাই তাহারা তাঁহার মাতা সম্পর্কে খারাপ ধারণা পোষণ করে। কিন্তু ঈসা (আ) মায়ের কোলে শিশু অবস্থায়ই অলৌকিকভাবে কথা বলিয়া মায়ের পবিত্রতা ঘোষণা করিয়াছিলেন। ইহা শ্রবণ করিয়া ইয়াহুদীরা প্রাথমিক অবস্থায় নীরব হইয়া যায়। কিন্তু তাঁহার নবুওয়াত লাভের পর ইয়াহূদী নেতাদের ভণ্ডামীর সমালোচনা করায় জন্মের প্রসঙ্গটি পুনরুজ্জীবিত করে। তাহারা লোকমুখে প্রচার করিতে থাকে যে, ঈসা অবৈধ পন্থায় জন্মলাভ করিয়াছেন (নাউযুবিল্লাহ)। এই প্রসঙ্গে আল-কুরআনেও বলা হয়:
وَيُكَفِّرَهُمْ وَقَوْلِهِمْ عَلَى مَرْيَمَ بُهْتَانًا عَظِيمًا .
"এবং তাহারা অভিশপ্ত হইয়াছিল তাহাদের কুফরীর জন্য ও মারয়ামের বিরুদ্ধে গুরুতর অপবাদের জন্য" (৪: ১৫৬)।
(খ) যাদুকর হওয়ার অপবাদঃ ঈসা (আ)-এর মু'জিযা দেখিয়া ইয়াহুদীগণ হযরত ঈসা (আ)-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে যে, তিনি একজন যাদুকর। এ বিষয়টি আল-কুরআনে স্পষ্টভাবেই বলা হইয়াছে: "পরে সে (ঈসা) যখন স্পষ্ট নিদর্শনসহ উহাদিগের নিকট আসিল উহারা বলিতে লাগিল ইহা তো এক স্পষ্ট যাদু” (৬১:৬)। তালমুদসহ ইয়াহুদীদের প্রাচীন গ্রন্থাবলীতেও ঈসা (আ)-এর পরিচয়ে লেখা হইয়াছে যে, তিনি ছিলেন একজন যাদুকর (দি নিউ ইনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকা, প্রাগুক্ত, তাফসীরে মাজেদী, ২খ, page ৬৬০)।
(গ) পাগল আখ্যায়িত করা: মার্ক সুসমাচারে আসিয়াছে যে, নাসরতের যাহারা তাহাকে অস্বীকার করিয়াছিল তাহাদের মধ্যে ঈসা (আ)-এর নিকটআত্মীয় কয়েকজনও ছিল। তাহারা হযরত ঈসা (আ)-কে পাগল বলিয়া আখ্যা দিয়াছিল। তাহাদের ধারণামতে ঈসা পাগল হইয়া গিয়াছেন (দ্র. মার্ক সুসমাচার, ৩: ২১)।
(ঘ) ঈসা (আ)-কে ভূতের আছরগ্রস্ত আখ্যায়িত করাঃ ইয়াহুদীদের ধর্মীয় নেতারা তাঁহার নামে প্রচার করিতে থাকে যে, ঈসার উপর ভূত সওয়ার হইয়াছে (দ্র. মার্ক, ৩ঃ ২৪-৩০)।
(ঙ) পৌত্তলিক ও মুরতাদ আখ্যায়িত করা: ইয়াহুদীদের ধর্মগ্রন্থ তালমুদে আসিয়াছে যে, হযরত ঈসা (আ) ইয়াহুদী ধর্ম পরিত্যাগ করায় মুরতাদ হইয়া যান এবং মূর্তিপুজা করেন (ডঃ রূহাজ, আল-কানজুল মারসুদ ফি কাওয়ায়িদিত তালমুদ, page ৬৯)।
(২) অসদুদ্দেশ্যে মু'জিযা প্রদর্শনের আবদার: অধিকাংশ মুফাসসিরীনের মতে হযরত ঈসা (আ) যখন নবুওয়াত দাবি করিলেন এবং বিভিন্ন অলৌকিক নিদর্শন প্রকাশ করিতে লাগিলেন তখন বনূ ইসরাঈলীরা একগুয়েমী প্রদর্শন করিতে শুরু করিল। সাথে সাথে কিভাবে তাঁহাকে অপছন্দ করা যায় তাহার ফন্দি ফিকির করিতে থাকে। যাহাই হউক, একবার তাহারা ঈসা (আ)-কে অপ্রস্তুত করিবার জন্য বলিল, আপনি আমাদেরকে একটি বাঁদুড় পাখি তৈরি করিয়া দেন। তখন ঈসা (আ) তাহাদের জন্য সেই পাখি আল্লাহ্র অনুমোদনক্রমে সৃষ্টি করিয়াছিলেন (রাযী, প্রাগুক্ত, ৭খ, page ৫৯; আলুসী, প্রাগুক্ত, ৩খ, page ১৬৮)।
বর্তমান প্রচলিত সুসমাচারসমূহেও দেখা যায়, ইয়াহুদীরা বিশেষত ফরীশীরা হযরত ঈসা (আ)-এর অনেক মু'জিযা দেখার পরও মু'জিযা তলব করিত, যেজন্য তিনি তাহাদের উদ্দেশে বলিয়াছিলেনঃ "তোমরা আকাশের লক্ষণ বুঝিতে পার, কিন্তু কালের চিহ্ন সকল বুঝিতে পার না। এই কালের দুষ্ট ও ব্যভিচারী লোকেরা চিহ্নের অন্বেষণ করে" (মথি, ১৬: ৩-৪)।
(৩) ঠাট্টা-বিদ্রূপ: ইবন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত যে, ইয়াহুদীরা হযরত ঈসা (আ)-এর কাছে একত্র হইত এবং ঠাট্টা-বিদ্রূপ শুরু করিত। তাহারা তাঁহাকে বলিত, হে ঈসা! অমুক গত রাত্রে কি ভক্ষণ করিয়াছে আর তাহার বাড়িতে আগামী দিনের জন্য কি সঞ্চয় করিয়াছে? তখন হযরত ঈসা (আ) তাহাদেরকে সেই ব্যাপারে সংবাদ প্রদান করিতেন। আর উহা লইয়া তাহারা ঠাট্টা-বিদ্রূপে মত্ত হইত। এইভাবে অনেকক্ষণ চলিত (প্রাগুক্ত, page ১৭৪)।
(৪) দম্ভ প্রদর্শন: এমনিভাবে হযরত ঈসা (আ) কোন মু'জিযা বা কোন যুক্তি প্রদর্শন করিলে মূল বিষয়ে না যাইয়া ফরিশীরা শুধু ঠাট্টা-বিদ্রূপ করিয়াই ক্ষান্ত হইত না, বরং তাহারা দম্ভ প্রদর্শন ও গালিগালাজ করিতেও কুণ্ঠাবোধ করিত না। যেমন বার্ণাবাসের বাইবেলে উল্লেখ আছে যে, ইয়াহূদীদের প্রধান রাব্বির সঙ্গে ঈসা (আ)-এর এক বিতর্ক অনুষ্ঠিত হইয়াছিল এবং ইহাতে পরাজয় বরণ করে। তখন প্রধান রাব্বি বলিল, "এখন আমরা বুঝতে পারিয়াছি আপনার কাঁধের ওপর শয়তান সওয়ার হইয়াছে; আর আপনি একজন সুমেরীয়, আল্লাহর মনোনীত প্রধান রাব্বির প্রতি আপনার কোনো সম্ভ্রমবোধ নাই" (বার্ণাবাসের বাইবেল, page ২৪৬)।
(৫) প্রকাশ্যে কুফুরী ঘোষণা: হযরত ঈসা (আ) যখন তাঁহার দাওয়াত পেশ করেন তখন ইয়াহুদীরা সদন্তে উহা প্রত্যাখ্যান করে এবং প্রকাশ্যে কুফুরী ঘোষণা করে। আল-কুরআনে এই ধরনের একটি তথ্য স্পষ্টভাবেই আসিয়াছে:
فَلَمَّا أَحَسَّ عِيْسَى مِنْهُمُ الكُفْرَ قَالَ مَنْ أَنْصَارِي إِلَى الله . "যখন ঈসা তাহাদের অবিশ্বাস উপলব্ধি করিল তখন বলিল, আল্লাহর পথে কাহারা আমার সাহায্যকারী" (৩ঃ ৫২)?
আল্লামা তাবারী বলেন, এই আয়াতের অর্থ হইল, আল্লাহ তা'আলা যাহাদের নিকট হযরত ঈসা (আ)-কে পাঠাইয়াছিলেন, সেই বনূ ইসরাঈলের পক্ষ হইতে যখন নবুওয়াতের অস্বীকৃতি, তাঁহার বক্তব্য প্রত্যাখ্যানের মনোভাব দেখিতে পাইলেন এবং আল্লাহ্র পথে আহবানে তাহাদের পক্ষ হইতে বাধার সম্মুখীন হইলেন তখন তিনি বলিলেন, আল্লাহর পথে আমার সাহায্যকারী কে আছ? অর্থাৎ আল্লাহর প্রমাণ প্রত্যাখ্যানকারী ও তাঁহার নবীর নবুওয়াতের অস্বীকারকারী লোকদের বিরুদ্ধে আল্লাহর সাথে আমার সাহায্যকারী কে আছে (তাফসীরে তাবারী, ৫খ, page ৪১০)।
উহা হইতে বুঝা যায় যে, ইয়াহুদীদের দ্বারা হযরত ঈসা (আ)-এর দাওয়াতকে মুখের উপর প্রত্যাখ্যান করার পন্থাটি ছিল গুরুতর। তাহারা প্রকাশ্যে কুফুরীর ঘোষণা দিয়া বেড়াইত।
(৬) পাথর নিক্ষেপ: হযরত ঈসা (আ)-এর দাওয়াত প্রত্যাখ্যানকারীরা বিভিন্ন শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে ও পাথরের আঘাতে ঈসা (আ)-কে রক্ত রঞ্জিত করিয়া দেওয়ার চেষ্ট করিত। বার্ণাবাসের বাইবেলে বর্ণিত হইয়াছে যে, প্রধান রাব্বী পরাজয় বরণ করার পর হযরত ঈসা (আ)-এর প্রতি গোস্বায় ফাটিয়া পড়িল এবং বিকট চিৎকার করিয়া বলিল, "পাথর মারো এই বেঈমান লোকটিকে। সে আসলে একটা ইসমাঈলী, আর সে মূসার নিন্দা করে এবং আল্লাহ্ আইনের বিরুদ্ধাচরণ করে (বার্ণাবাসের বাইবেল, page ২৪৮)।
তাফসীরে মাজেদীতে উল্লেখ আছে যে, তখন তাঁহার উপর ছুড়িয়া মারার জন্য পাথর তুলিয়া লইল, কিন্তু যীশু অন্তর্হিত হইলেন ও ধর্মধাম হইতে বাহিরে গেলেন" (যোহন, ৮ : ৫৯)। আরও বলা হয়, "তাহারা আবার তাঁহাকে ধরিতে চেষ্টা করিল, কিন্তু তিনি তাহাদের হাত এড়াইয়া বাহির হইয়া গেলেন" (যোহন, ১০: ৩৯; তাফসীরে, মাজেদী, খ. ২, page ৬৫৯)।
(৭) জন্মভূমি হইতে বিতাড়িত করা: ইবন জারীর তাবারী সূদ্দী হইতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলিয়াছেন, হযরত ঈসা (আ) আল্লাহর নিদের্শমত দাওয়াতী কাজ আরম্ভ করিলে তাঁহার প্রতি ইসরাঈলীরা বিক্ষুব্ধ হইল এবং তাঁহাকে দেশ হইতে বহিষ্কার করিল। হযরত ঈসা (আ) ও তাঁহার মাতা স্বদেশ হইতে বিতাড়িত হইয়া দেশে দেশে ঘুরিতে থাকেন (তাফসীরে তাবারী, ৫খ, page ৪১০)। হযরত ঈসা (আ) দুঃখ করিয়া বলিয়াছিলেন, নিজের গ্রাম ও নিজের বাড়ি ছাড়া সমস্ত জায়গাতেই নবীরা সম্মান পান (মথি, ১৩ঃ ৫৭)।
(৮) শয়তান কর্তৃক প্ররোচনা: হযরত ঈসা (আ)-এর দাওয়াতের ক্ষেত্রে আরেকটি বাঁধা ছিল শয়তান কর্তৃক প্ররোচনা। ইবন কাছীর বর্ণনা করেন যে, হযরত ঈসা (আ) বায়তুল মুকাদ্দাসে সালাত আদায় করেন। সেখানে হইতে ফিরিবার পথে যখন তিনি এক গিরিপথে ছিলেন তখন শয়তান তাঁহাকে আটকাইয়া বিভিন্ন প্রস্তাব দেওয়া শুরু করিল এবং বলিল, হে ঈসা! আপনার খোদার বান্দা হওয়া উচিত নহে। শয়তান এই বক্তব্য দ্বারা বারবার পীড়াপীড়ি করিবার পর আল্লাহর কাছে সাহায্য চাহিলেন। তখন জিবরাঈল ও মীকাঈল আসিলেন আর দেখিলেন, ইবলীস তাহাকে পথে আটকাইয়া রাখিয়াছে। তখন জিবরাঈল (আ) তাহার দুই ডানা দ্বারা ইবলীসকে এক উপত্যকায় নিক্ষেপ করিলেন। তখন আবার শয়তান তাঁহার নিকট ফিরিয়া আসিল এবং ঈসাকে বলিতে লাগিল, আমি একটু আগেই আপনাকে সংবাদ দিলাম যে, আপনি একজন বান্দা হওয়া সমীচীন নহে, আর আপনি ক্রোধান্বিত হইলেন। আর এই ক্রোধ কোন বান্দার ক্রোধ হইতে পারে না। কারণ আপনি রাগ করার সময় কি অবস্থা দাঁড়াইয়াছিল তাহা তো আপনি দেখিলেন। তাই আমি আপনাকে একটি বিষয়ে আহ্বান করিব। তাহা হইল, আপনার জন্য আমি শয়তানদেরকে আদেশ করিব এবং তাহারা আপনার অনুসরণ করিবে। অতঃপর লোকজন যখন দেখিবে শয়তানরা আপনার অনুসরণ করিতেছে তখন তাহারা আপনার 'ইবাদত করিবে। আর আমি ইহা বলিতেছি না যে, আপনি একাই ইলাহ, আপনার সাথে আর কোন ইলাহ নাই; বরং আল্লাহ হইবেন আসমানে ইলাহ, আপনি হইবেন যমীনে ইলাহ। ঈসা (আ) আল্লাহর সাহায্য চাহিলেন। তখন ঈসরাফীল (আ), জিবরাঈল ও মীকাঈল (আ) তাঁহাকে সাহায্য করিলেন। আর ইবলীসও ঐ প্ররোচনা হইতে বিরত হইল (ইব্ন কাছীর, প্রাগুক্ত, ২খ., page ৭৪-৭৫)। মথি সুসমাচারেও এই মর্মের একটি ঘটনার উল্লেখ রহিয়াছে (দ্র. মথি, ৩ : ৬-১২)।
(৯) অনুসারীদেরকে বাধা দেওয়া : যখন হাজার হাজার লোক হযরত ঈসা (আ)-এর অনুসরণ করিতে শুরু করিল তখন ইয়াহুদী ধর্মীয় নেতারা হিংসা-বিদ্বেষে, ক্ষোভে-ক্রোধে উন্মত্ত হইয়া গেল। তাহারা তখন শুধু হযরত ঈসা (আ)-কেই বাধা দেয় নাই, বরং তাঁহার অনুসারীদেরকেও বাধা দিয়াছিল। যোহন সুসমাচারে আসিয়াছে যে, ইয়াহূদী নেতারা আগেই ঠিক করিয়াছিল যে, কেহ যদি ঈসাকে মসীহ বলিয়া স্বীকার করে তবে তাহাকে সমাজ হইতে বাহির করিয়া দেওয়া হইবে (যোহন, ৯:২২)।
এই তথ্য প্রমাণ করে যে, ইয়াহুদী সন্ত্রাসীরা জনমনে ভীতির সঞ্চার করিয়াছিল, যেন তাহারা ঈসা (আ)-এর অনুসরণ করিতে সাহস না পায়। তাহারা আল্লাহ্র রাস্তায় বাধা সৃষ্টি করিয়াছিল। তাই ইয়াহুদীদের সম্পর্কে আল-কুরআনে বলা হইয়াছে:
فَبِظُلْم مِنَ الَّذِينَ هَادُوا حَرَّمْنَا عَلَيْهِمْ طَيِّبَت أُحِلَّتْ لَهُمْ وَيَصَدِهِمْ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ كَثِيرًا .
"ভাল ভাল যাহা ইয়াহুদীদের জন্য বৈধ ছিল তাহা উহাদের জন্য অবৈধ করিয়াছি-তাহাদের সীমালংঘনের জন্য এবং আল্লাহ্ পথে অনেককে বাধা দেওয়ার জন্য" (৪:১৬০)।
(১০) হত্যার ষড়যন্ত্র : হযরত ঈসা (আ)-এর দাওয়াত চতুর্দিকে ছড়াইয়া পড়িল। ইয়াহুদীরা দেখিল যে, কোনভাবেই ঈসা (আ)-কে দাওয়াতী কাজ হইতে বিরত করা যাইতেছে না। তখন তাহারা তাঁহাকে মারিয়া ফেলার ষড়যন্ত্র করে। এই লক্ষ্যে প্রথমে তাহারা গোপন বৈঠক করে। মথি সুসমাচারে আসিয়াছে, সেই সময় মহা ইমাম কাইয়াফার বাড়ীতে প্রধান ইমামেরা ও ইয়াহুদীদের বৃদ্ধ নেতারা একত্র হইল এবং ঈসা (আ)-কে ধরিয়া আনিয়া মারিয়া ফেলিবার ষড়যন্ত্র করিল (দ্র. মথি, ২৬:৩-৪)।
এই ক্ষেত্রে দ্বিতীয় পদক্ষেপ হিসাবে তাহারা গোয়েন্দা নিয়োগ করে, তাঁহাকে বিভিন্ন লোভ দেখাইয়া আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে। মথি সুসমাচারে আসিয়াছে: তখন সেই বারজন হাওয়ারীর মধ্যে এহুদা ইস্কারিয়োৎ নামের ব্যক্তিটি প্রধান ইমামের নিকট গিয়া বলিল, 'ঈসাকে আপনাদের হাতে ধরাইয়া দিলে আপনারা আমাকে দিবেন। প্রধান ইমামেরা তিরিশটা রূপার টাকা গুনিয়া দিল তাহাকে। তাহার পর হইতেই এহুদা ঈসাকে ধরাইয়া দিবার জন্য সুযোগ খুঁজিতে লাগিল (দ্র. মথি, ২৬:১৪-১৬)।
এই ক্ষেত্রে তৃতীয় পদক্ষেপ হিসাবে তাহারা হযরত ঈসা (আ)-কে গ্রেফতার করার জন্য চেষ্টা চালায়। বারবার এই, প্রচেষ্টা অব্যাহত ছিল। হযরত ঈসা (আ) এই বিষয়ে আল্লাহ্র পক্ষ হইতে অবহিত হইয়াছিলেন, যেজন্য বারবার তিনি তাঁহার অনুসারীবৃন্দকে ঐ ব্যাপারে আগাম খবর বলিয়াছিলেন। যাহাই হউক, এই দুনিয়ায় তাঁহার নবুওয়াতের শেষ সময়ে তিনি গৎসেমানি বাগানে একটা জায়গায় তাঁহার সাথীবৃন্দসহ রাত্রে আশ্রয় লইলেন। সেই সময়ে পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে ইয়াহুদা আসখারিয়তী রোমান সৈন্যদেরকে লইয়া ছোরা ও লাঠিসহ হযরত ঈসা (আ)-এর অবস্থান স্থলে পৌঁছিয়া গেল। সুসমাচারের বর্ণনানুসারে তাহাদের আগমন সম্পর্কে হযরত ঈসা (আ) আগেই টের পাইয়া গিয়াছিলেন। তাই তাঁহার সাথীরর্গ ঘুমাইয়া গেলেও তিনি তাহাদের মধ্যে পিতর, জেমস ও যোহনকে লইয়া কিছুটা জাগ্রত ছিলেন। পরে তিনি কিছু দূরে গিয়া মাটিতে সিজদায় পড়িয়া আল্লাহ্র দরবারে কান্নাকাটি করিতে লাগিলেন এবং আসন্ন বিপদ হইতে রক্ষার জন্য আল্লাহ্র কাছে সাহায্য চাহিলেন (দ্র. মথি, ২৬: ৩৬-৩৯)।
পরে তিনি তাঁহার সাথীবর্গের কাছে ফিরিয়া আসিলেন। আবার মুনাজাত করিতে লাগিলেন। ইয়াহুদা পূর্বেই সৈনিকদেরকে বুঝাইয়া আনিয়াছিল যে, আমি সেখানে গিয়া যাহাকে চুম্বন দিব তিনিই ঈসা। আর ইয়াহুদা সেখানে আসিয়া তাহাই করিল। বাইবেলের বর্ণনামতে সঙ্গে সঙ্গে সৈনিকরা আসিয়া তাহাকে ধরিল।
এই ক্ষেত্রে চতুর্থ পদক্ষেপ হিসাবে ঈসাকে গ্রেফতার করার পর ইয়াহুদী মহাসভার সামনে তাঁহার বিচার নাটকের আয়োজন করা হয় এবং এক পর্যায়ে তাহারা ঈসার বিচারের জন্য তথা হত্যা করার সিদ্ধান্ত লইয়াই রোমীয় শাসনকর্তা পীলাতের হাতে তাঁহাকে সমর্পণ করে। বার্ণাবাসের বাইবেলের বর্ণনা অনুসারে, জুদানসহ সেনাবাহিনী যখন হযরত ঈসা (আ)-এর আস্তানায় পৌছিল তখন লোকের সমাগম অনুভব করিয়া ঈসা (আ) ঘরের ভিতরে আসিয়া ঢুকিলেন। তখনি আল্লাহ পাক তাঁহাকে ফেরেশতাদের মাধ্যমে সেই ঘর হইতে আসমানে তুলিয়া নেন এবং ঈসা (আ)-এর চেহারায় বিশ্বাসঘাতক জুদাস তথা ইয়াহুদার রূপান্তর ঘটে। আর সৈন্যরা তাহাকে গ্রেফতার করে (বার্ণাবাসের বাইবেল, অধ্যায় নং ২১৫-২১৬, page ২৫৪-২৫৫)। যাহাই হউক, সৈন্যদের কর্তৃক গ্রেফতার নাটক হইতে ইয়াহুদী মহাসভার সামনে বিচারকার্য এবং পরবর্তীতে পিলাতের হাতে হস্তান্তর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে যে কোন সময়ে হযরত ঈসা (আ)-কে উত্তোলন করা হইতে পারে। প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে আল্লাহই অধিক জ্ঞাত।
📄 বারজন হাওয়ারীর সংক্ষিপ্ত পরিচয় ও কার্যকলাপ
বারজন হাওয়ারীর সংক্ষিপ্ত পরিচয় ও কার্যকলাপ
(১) সায়মন (Simon) তিনি নিষ্ঠাবান হাওয়ারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এইজন্য তাহাকে Simon the Zealote-ও বলা হয়। তাঁহার জন্ম গ্রীসের এডসা নামক স্থানে। পশ্চিমাদের নিকট তাঁহার স্মরণ দিবস (Feast day) ২৮ অক্টোবর এবং প্রাচ্যদের নিকট ১৯ জুন। Gospels-এর Mark এবং Matthew পর্বে তাঁহার নাম Kananajos অথবা Cananaean পাওয়া যায়। Luke পর্বে তাঁহাকে The zealot বলা হইয়াছে।
তিনি সম্ভবত মিসরে ধর্ম প্রচার করেন। তারপর পারস্যে Saint judas-দের সাথে মিলিত হন (The new Encyclopaedia Britannica, vil. 10, Page 821)।
নিউ টেস্টামেন্টে উল্লেখ আছে যে, Simon এবং Juda পারস্যে ধর্ম প্রচার করিতে গিয়া শহীদ হন। Catholic church-এ ২৮ অক্টোবর এবং Orthodox church-এ ১০ মে তাঁহার ধর্মীয় উৎসব (Feast day) ধার্য করা হইয়াছে (The world book of Encyclopaedia. vol-17, page 567)।
(২) বার্থলময় (Bartholomew) : মথি, মার্ক ও লুকে শিষ্যদের তালিকায় তাঁহার নাম উল্লেখ করা হইয়াছে। John-এর Gospel-এ তাঁহাকে যীশুর অনুসারী হিসাবে উল্লেখ করা হইয়াছে। খৃস্টানদের পরবর্তী ঐতিহ্য অনুসারে বার্থলময় ইন্ডিয়া, ইথিওপিয়া, পারস্য, এশিয়া মাইনর এবং আর্মেনিয়ায় ধর্ম প্রচার করিয়াছিলেন। তিনি একটি Gospel লিখিয়াছেন। একটি তথ্য অনুযায়ী তিনি আর্মেনিয়ায় শহীদ হইয়াছিলেন (The world book of Encyclopaedia vol. 2, Page 120)।
Britannica-তে পাওয়া যায় যে, তিনি বর্তমান Dagestan-এর Derbent Albanoplis নামক স্থানে প্রথম খৃস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পারস্য, এশিয়া মাইনর, মেসোপটেমিয়া, তুরস্ক ও আরমেনিয়ায় ধর্ম প্রচার করেন। Babylonian King Aslygcs-এর নির্দেশে চামড়া তুলিয়া তাঁহাকে শহীদ করা হয়। Latin church-এ তাঁহার Feast day ২৪ আগস্ট এবং Greek-দের নিকট ১২ জুন (The new Encyclopaedia Britannica, vol. 1, Page 844)।
(৩) আন্দ্রিয় (Andrew Saint): তাঁহার জন্ম সম্পর্কে কোন তথ্য পাওয়া যায় নাই, তবে মৃত্যু সম্পর্কে উল্লেখ আছে যে, বর্তমান গ্রীসের Patrai নামক স্থানে ৬০/৭০ খৃস্টাব্দে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তিনি রাশিয়া এবং স্কটল্যান্ডে নিযুক্ত Saint Peter-এর ভাই ছিলেন। মার্ক, ১৩: ৩-এ বলা হইয়াছে Peter, James, John এবং Andrew ঈসাকে পৃথিবীর শেষ প্রান্তের চিহ্ন রূপ Olives নামক পর্বতে নিয়া যান। তিনি কৃষ্ণ সাগরের নিকটবর্তী স্থানে ধর্ম প্রচার করেন (The new Encyclopaedia Britannica, vol. 1, Page 360)।
The world book of Encyclopaedia-তে আসিয়াছে, Andrew গালীল সাগরের উপকূলীয় গ্রাম Bethsaida-র একজন জেলে ছিলেন। ঈসার শিষ্যত্ব গ্রহণের পূর্বে তিনি Saint John- এর অনুসারী ছিলেন। এশিয়া মাইনর ও গ্রীসে তিনি ধর্ম প্রচার করেন (প্রাগুক্ত vol. 1, Page 457)। পরবর্তীতে তাহার কার্যাবলী কৃষ্ণসাগরের পার্শ্ববর্তী অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছায়। S.T. Jerame-এর বর্ণনামতে আন্দ্রিয়কে ৩৫৭ খৃ. কনস্টান্টিপোলের রাজার নির্দেশে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে পনের শতাব্দীতে ক্যাথলিক ধর্মগুরুরা তাহার নিদর্শন হিসাবে গ্রীসে একটি স্মৃতি সৌধ নির্মাণ করেন।
(৪) জেমস (James): তিনি Zebedee-এর পুত্র ছিলেন। তিনি মহান জেমস নামে পরিচিত। তাঁহার জন্ম সম্পর্কে কোন তথ্য পাওয়া যায় না, তবে তিনি ৪৪ খৃ. ফিলিস্তীনের গ্যালিলিকে সৃজারেরণ করেন। তিনি ঈসা (আ)-এর খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলেন। বারজন শিষ্যের মধ্যে একমাত্র তাঁহার শাহাদাতের ঘটনা বাইবেলে বর্ণিত হইয়েছে। Judaea-এর রাজা Herod Agrippa-এর নির্দেশে তাঁহার শিরশ্ছেদ করা হয়। তাঁহার স্মরণ দিবস (Feast day) ২৫ জুলাই (The new Encyclopaedia Britannica, vol. 6, Page 485)।
The world book of Encyclopaedia-তে বলা হইয়াছে, খৃস্টীয় ৪০-এর দশকে তাঁহাকে শহীদ করা হয়। পরবর্তী ঐতিহ্য অনুসারে James-এর হাড়গুলি ষ্টোনের Santiago de compostela তে লইয়া যাওয়া হয়। ফলে শহরটি মধ্যযুগে একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থকেন্দ্রে পরিণত হয় (প্রাগুক্ত, vol. 11, pages 27-28)।
(৫) জেমস (James): তিনি ছিলেন Alpeus-এর পুত্র। তাঁহাকে James of Less-ও বলা হয়। বাইবেলে অন্য এক Mary নামক মহিলার নাম উল্লেখ রহিয়াছে, তিনি James-এর মা ছিলেন। তিনি পারস্যে মৃত্যুবরণ করেন। পশ্চিমাদের নিকট তাঁহার স্মরণ দিবস ১ মে এবং প্রাচ্যদের নিকট ৯ অক্টোবর (The new Encyclopaedia Britannica, vol. 6, Page 485)।
তাঁহার পরিচয় বর্ণনায় আল-মাওআতুল বারীতানিয়্যাই, ৬ষ্ঠ খণ্ড, page ৪৮৫-তে উল্লেখ করা হইয়াছে, তিনি ছোট ইয়া'কূব, ইয়াহুদীরা তাঁহার বিষয়ে ষড়যন্ত্র করে এবং তাহাদের মজলিসে ডাকাইয়া নেয়। অতঃপর ৬৩ খৃ. প্রস্তর নিক্ষেপের মাধ্যমে তাঁহাকে হত্যা করা হয় (আলুসী, প্রাগুক্ত, page ১০৬)।
(৬) যোহন (John): প্রাচীন কালে তাঁহাকে Three letters, the Fourth Gospel and Revelation in the New testament-এর লেখক মনে করা হইত। তিনি Galilean fisherman zebedee-এর পুত্র ছিলেন। তিনি এবং তাঁহার ভাই James ঈসা (আ)-এর প্রথম শিষ্য ছিলেন। তাঁহার মা Salome যীশু খৃস্টের শিষ্যদের সেবা করিতেন। ২য় শতাব্দীতে Poly crates -এর Ephesus-এর বিশপ দাবি করেন যে, John -এর সমাধিস্থান Ephesus-এ (Ency Britannica, প্রাগুক্ত, vol. 1, Page 241) 1
(৭) মথি (Mathew): মথি যিশুর ১২ জন শিষ্যের অন্যতম। Gospel-এর বর্ণনা মতে মথিকে যখন যীশুর অনুসরণের জন্য ডাকা হয় 'তখন তিনি একজন কর আদায়কারী ছিলেন। মার্ক এবং লুকে বর্ণিত আছে যে, কর আদায়কারীর নাম ছিল Levi. ঐতিহ্যগতভাবে মথিকে প্রথম Gospel-এর লেখক ধরা হয়, যাহা হিব্রু ভাষায় লিখিত ছিল। অনেক আধুনিক পণ্ডিতের মতে এই Gospel-এর লেখক মথি ছিলেন না এবং তাহা গ্রীক ভাষায় লিখা ছিল। তিনি আফ্রিকা এবং পারস্যে ধর্ম প্রচার করেন। রোমান ক্যাথলিক গীর্জায় মথির স্মরণ দিবস ২১ সেপ্টেম্বর এবং প্রাচ্যের অথোর্ডক্স গীর্জায় ১৬ নভেম্বর (প্রাগুক্ত, Encyclopaedia, vol. 13, Page 312)।
(৮)-ফিলিপ (Philip): জেরুসালেমে শীর্ষ খৃস্টান গীর্জায় বাস্তব কার্যাবলী সম্পাদনে সহায়তা করার জন্য তাঁহাকে সাতজন উপ-পুরোহিতের তালিকাভুক্ত করা হয়। ঐতিহ্য অনুসারে তিনি জাদিয়া ও সামিরায় দাওয়াতী কাজ করিয়াছিলেন। পরবর্তীতে তিনি তুরস্কের ট্রার্লস গীর্জার বিশপ ছিলেন। পশ্চিমা দেশগুলিতে ফিলিপের স্মরণ দিবস ৬ জুন এবং প্রাচ্যের দেশগুলিতে ১১ অক্টোবর (প্রাগুক্ত, Encyclopaedia, vol. 15, Page 371) ।
(৯) থমাস (Thomas): তিনি ১২ জনের অন্যতম। তাঁহাকে প্রায়ই John- এর বেদবাক্যতে উল্লেখ করা হয়। উৎপীড়নের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও থমাস ধর্মদূতদেরকে ঈসার সাথে Judea-তে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করিয়াছিলেন। ঐতিহ্য অনুযায়ী থমাস পার্থিয়া ও ভারতে ধর্ম প্রচার করেন। তাঁহাকে ভারতে শহীদ করা হয়। রোমান Catholic Church অনুযায়ী তাঁহার স্মরণীয় দিন ৩ জুলাই এবং প্রাচ্যের গীর্জা অনুযায়ী ২১ মার্চের প্রথম রবিবার (প্রাগুক্ত, Encyclopaedia, vol. 18, Page 729)।
(১০) যিহুদা (Judas) : ৩০ খৃস্টাব্দে তাহার মৃত্যু হয়। প্রথম যুগে তিনি ঈসা (আ)-এর বিরোধিতার কারণে কুখ্যাত ছিলেন। Judas নামটি সম্ভবত লেটিন Sicarius হইতে আসিয়াছে যাহার অর্থ হত্যাকারী। তাহার পরিবার সন্ত্রাসী ইয়াহুদীদের অন্তর্ভুক্ত। সর্বদাই তিনি ছিলেন ১২ জন হাওয়ারীর অন্যতম। তিনি কোষাধ্যক্ষ ছিলেন (প্রাগুক্ত, Britannica, vol. 6, Page 639) 1
(১১) পিটার (Peter): যীশুর ১২জন শিষ্যের মধ্যে পিটার ছিলেন শীর্ষস্থানীয়। তিনি জেরুসালেমের খৃস্টান সম্প্রদায়ের নেতা ছিলেন। তাঁহার প্রকৃত নাম Simon, যীশু তাঁহার নাম রাখেন পিটার। তিনি ফিলিস্তীনের Bethsaida নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। ঐ স্থানটি জর্ডান নদীর তীরে অবস্থিত ছিল। পিটার গ্যালিলি শহরের নিকটবর্তী শহর কাফার নাউম (Caper naum) চলিয়া যান। সেখানে তিনি মৎস শিকার পেশা গ্রহণ করেন। New testament-এর বর্ণনানুযায়ী পিটার খৃস্টান সম্প্রদায়ের নিকট যীশুর একান্ত বন্ধু এবং অনুসারী হিসাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। খৃস্টানদের ঐতিহ্য অনুসারে পিটার সর্বপ্রথম সিরিয়ায় এবং রোমে বিশপ ছিলেন। সুম্ভবত তিনি রোমে ৬৪ থেকে ৬৮ খৃস্টাব্দের মধ্যে শাহাদত বরণ করেন (প্রাগুক্ত, Encyclopaedia, vol-15)।
(১২) বার্ণাবাস:
📄 হযরত ঈসা (আ)-কে আকাশে উত্তোলন
হযরত ঈসা (আ)-কে আকাশে উত্তোলন
হযরত ঈসা (আ)-এর চরম কণ্টকাকীর্ণ পরিস্থিতিতে আল্লাহ পাক তাঁহাকে আকাশে উঠাইয়া নেন। হযরত ঈসা (আ)-এর দাওয়াতের মুকাবিলায় বিভিন্ন প্রতিরোধ গড়িয়া তোলার পরেও যখন সেই দাওয়াতকে ইয়াহুদী সম্প্রদায় স্তব্ধ করিতে পারিল না, তখন হযরত ঈসা (আ)-এর জীবননাশ করিবার জন্যই তাহারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তাহারা এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করিবার জন্য ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের পথ অবলম্বন করে। এই লক্ষ্যে সর্বপ্রথম ধর্মীয় আদালতে তাঁহার বিরুদ্ধে ধর্মদ্রোহিতা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার ভূয়া অভিযোগ উত্থাপন করিয়া হত্যাযোগ্য অপরাধী বলিয়া ঘোষণা করা হয়। সেই সময়ে ফিলিস্তীন ও সিরিয়া অঞ্চল রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাই ইয়াহুদীরা রোমানদেরকে উত্তেজিত করিয়া ঈসা (আ)-এর বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরওয়ানা জারী করার। ইয়াহুদীরা যদিও এই পৌত্তলিক বাদশাহর কর্তৃত্বকে নিজেদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক মনে করিত। কিন্তু হযরত ঈসা মসীহ (আ)-এর বিরুদ্ধে তাহাদের অন্তরে হিংসার আগুন এবং শত শত বৎসরের গোলামীর ফলে সৃষ্ট নীচ মানসিকতা তাহাদিগকে এতটা অন্ধ করিয়াছিল যে, পরিণাম চিন্তা করিয়া পিলাতের দরবারে গিয়া উপস্থিত হইল এবং আরয করিল, “হে রাজন! এই ব্যক্তি কেবল আমাদের জন্যই নহে, বরং রাষ্ট্রের জন্যও একটি বিপদ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করিতে যাইতেছে। যদি অবিলম্বে তাহার মূলোচ্ছেদ না করা হয়, তাহা হইলে আমাদের ধর্মও সঠিক অবস্থায় টিকিয়া থাকিতে পারিবে না এবং আপনার হাত হইতে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব চলিয়া যাওয়ারও আশংকা রহিয়াছে। কেননা সে আশ্চর্যজনক ভোজবাজি দেখাইয়া লোকদেরকে নিজের অনুসারী বানাইয়া লইতেছে। জনগণের এই সম্মিলিত শক্তির উপর নির্ভর করিয়া সে কাইজার এবং আপনাকে ক্ষমতাচ্যুত করিয়া নিজে বানু ইসরাঈলের রাজা বনিয়া যাওয়ার জন্য ওঁৎ পাতিয়া আছে। এই ব্যক্তি জনগণকে কেবল বস্তুগত দিক হইতেই পথভ্রষ্ট করে নাই, বরং আমাদের ধর্মকেও পরিবর্তন করিয়া দিয়াছে। অতএব যত দ্রুত সম্ভব এই ফিতনার মূলোচ্ছেদ করিতে হইবে।
দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর পিলাত হযরত ঈসা (আ)-কে গ্রেফতার করিয়া অপরাধী হিসাবে দরবারে হাযির করিবার জন্য তাহাদের অনুমতি প্রদান করে। বানু ইসরাঈলের নেতৃবৃন্দ, আলেম ও যাদুকররা এই ফরমান লাভ করিতে পারিয়া যারপরনাই আনন্দিত হয়। তাহারা বলিতে লাগিল, এখন সুযোগের অপেক্ষায় থাকিতে হইবে এবং তাহাকে একাকী ও নিঃসংগ অবস্থায় গ্রেফতার করিতে হইবে যাহাতে জনগণের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হইতে না পারে। যোহন ও মার্ক সুসমাচারে এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত বর্ণনা রহিয়াছে (যোহন, ১১ : ৪৭-৫১)। এমনিভাবে মথি ও লুক সুসমাচারেও উক্ত বিষয়টি বর্ণিত হইয়াছে (মথি, ২৬: ২-৫; লুক, ২২: ১-২)। হযরত ঈসা (আ) ও তাঁহার হাওয়ারীদের মধ্যে সেই সময়ে যে কথোপকথন অনুষ্ঠিত হইয়াছিল তাহা আল-কুরআনেও উক্ত হইয়াছে:
ফَلَمَّا أَحَسٌ عِيسَى مِنْهُمُ الْكُفْرَ قَالَ مَنْ أَنْصَارِى إِلَى اللهِ قَالَ الحَوَارِيُّوْنَ نَحْنُ أَنْصَارُ اللَّهِ اُمَنَّا بِاللَّهِ وَاشْهَدْ بِأَنَّا مُسْلِمُونَ .
"যখন ঈসা তাহাদের অবিশ্বাস উপলব্ধি করিল তখন সে বলিল, আল্লাহর পথে কাহারা আমার সাহায্যকারী? শিষ্যগণ বলিল, আমরাই আল্লাহ্ পথে সাহায্যকারী। আমরা আল্লাহে ঈমান আনিয়াছি। আমরা আত্মসমর্পণকারী, তুমি ইহার সাক্ষী থাক। হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি যাহা অবতীর্ণ করিয়াছ তাহাতে আমরা ঈমান আনিয়াছি এবং আমরা এই রাসূলের অনুসরণ করিয়াছি। সুতরাং আমাদিগকে সাক্ষ্য বহনকারীদের তালিকাভুক্ত কর" (৩ঃ ৫২-৫৩)।
মাওলানা সিওহারবী উল্লেখ করেন, হযরত ঈসা (আ) এবং তাঁহার দাওয়াত ও তাবলীগের বিরুদ্ধে ইয়াহুদীদের হঠকারী তৎপরতা সম্পর্কে বর্ণনার মধ্যে নীতিগতভাবে কোন মতবিরোধ নাই। কিন্তু উহার পরের সমস্ত ঘটনার বিবরণে কুরআন ও বাইবেল সম্পূর্ণরূপে দুই স্বতন্ত্র পথে অগ্রসর হইয়াছে। অবশ্য ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের বর্ণনা একই ধারায় প্রবাহিত হইয়াছে। শুধু পার্থক্য এতটুকু যে, ইয়াহুদীরা এই ঘটনাকে নিজেদের কীর্তি এবং গৌরবের কারণ মনে করে। আর খৃস্টানরা উহাকে ইয়াহুদীদের একটি ঘৃণ্য ও অভিসম্পাতযোগ্য তৎপরতা বলিয়া বিশ্বাস করিয়া থাকে (সিওহারবী, প্রাগুক্ত)।
ইয়াহুদী-খৃস্টান উভয়ের অভিন্ন বর্ণনা এই যে, ইয়াহুদী নেতৃবৃন্দ ও গণৎকাররা জানিতে পারিল যে, এখন যীশুখৃস্ট লোকদের ভীড় হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া নিজের সঙ্গিগণকে লইয়া একটি নির্জন বদ্ধ ঘরে অবস্থান করিতেছেন। আর উহাই উপযুক্ত সময়। অনতিবিলম্বে ইয়াহুদীরা আস্তানায় পৌঁছিয়া গেল। তাহারা চতুর্দিক হইতে ঘরটি অবরোধ করিল। ইহার পর কুরআন ও বাইবেলের বর্ণনার সাথে বৈপরীত্য দেখা দেয়। আল-কুরআনের ভাষ্যমতে তখন হযরত ঈসা (আ)-কে আল্লাহ পাক আকাশে উঠাইয়া নেন। বাইবেলের বর্ণনামতে ইয়াহুদীরা যীশুকে গ্রেফতার করিল এবং অপমান ও তিরস্কার করিতে করিতে রোমান শাসক পিলাতের দরবারে নিয়া হাযির করিল, যাহাতে সে তাহাকে শূলিতে চড়াইতে পারে। পিলাত যদিও তাহাকে নিরপরাধী মনে করিয়া ছাড়িয়া দিতে চাহিয়াছিল, কিন্তু ইয়াহুদীগের উত্তেজনা ও চাপের মুখে তাহাকে সেনাবাহিনীর লোকদের হাতে সোপর্দ করিতে বাধ্য হইল। সিপাহীরা তাহাকে কণ্টকের টুপি পরিধান করাইল, মুখে থুথু নিক্ষেপ করিল, বেত্রাঘাত করিল এবং যাবতীয় উপায়ে তিরস্কার ও অপমান করিল। অতঃপর অপরাধীদের মত শূলীতে লটকাইয়া দিল, উভয় হাতে পেরেক মারিয়া দিল, বর্শার তীক্ষ্ণাগ্র বুকের মধ্যে বিদ্ধ করিল। এই নিরূপায় অবস্থায় তিনি এই বলিতে বলিতে জীবন দিলেন: "এলী এলী লামা সাবাক্তানী" "(ঈশ্বর আমার, ঈশ্বর আমার: তুমি কেন আমায় পরিত্যাগ করিয়াছ)" (মথি, ২৭ঃ ৪৬)। এইরূপ বর্ণনা মার্ক সুসমাচারেও পেশ করা হইয়াছে (মার্ক, ১৫: ৩৪)।
মাওলানা সিওহারবী বলেন, কম বেশী সামান্য পার্থক্য সহকারে নূতন নিয়মের অবশিষ্ট তিনটি গ্রন্থেও (মার্ক, লুক, যোহন) এই কল্পিত কাহিনী একইভাবেই বর্ণিত হইয়াছে। নূতন নিয়মের চারটি বাইবেলের সম্মিলিতভাবে বর্ণিত এই কল্পিত কাহিনী অধ্যয়ন করার পর তাহা মানসপটে স্বাভাবিকভাবেই এই চিত্র অংকন করে যে, চরম অসহায় অবস্থায় এবং নির্মম পন্থায় হযরত ঈসা (আ)-এর মৃত্যু হইয়াছে। যদিও ইহা আল্লাহ্র প্রিয় এবং পবিত্র বান্দাদের ক্ষেত্রে কোনও আশ্চর্যজনক ব্যাপার ছিল না, বরং আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী বান্দাদের জন্য অধিকাংশ সময় এই প্রকারের কঠিন পরীক্ষা হইয়া থাকে। কিন্তু ঘটনার আর একটি দিক বাইবেলের বর্ণনাকে দিবালোকের মত কল্পিত এবং মনগড়া বলিয়া প্রমাণ করিয়াছে। তাহা এই যে, হযরত ঈসা (আ) সম্পর্কে যে হতাশা ও অভিযোগের চিত্র ফুটিয়া উঠে তাহা তাঁহার মহান ব্যক্তিত্বের পক্ষে শোভনীয় হইতে পারে না। উপরন্তু ঘটনার আরেকটি দিকও কম আশ্চর্যজনক নহে। তাহা এই যে, নূতন নিয়মের বর্ণনা অনুযারী এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পূর্বে হযরত ঈসা (আ) আল্লাহ তা'আলার কাছে আবেদন করেন, "হে পিত! যদি সম্ভব হয় তাহা হইলে এই (মৃত্যুর) পিয়ালা আমা হইতে সরাইয়া দেওয়া হউক। যখন এই দোআ কোনক্রমেই কবুল হইল না, তখন নিরাশ হইয়া তিনি বলিতে লাগিলেন, যদি উহা পান করা ছাড়া কোন গত্যন্তর না থাকে তাহা হইলে তোমার ইচ্ছাই পূর্ণ হউক" (আল্লামা সিওহারবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, পৃষ্ঠা ৯৩)।
আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, "প্রায়শ্চিত্ত” করার আকীদা অনুযায়ী যখন হযরত ঈসা (আ)-এর এই ঘটনা আল্লাহ এবং তাঁহার পুত্রের (নাউযুবিল্লাহ) মধ্যে চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত ছিল, তখন তাঁহার কাছে আবার নিবেদন করার কি অর্থ হইতে পারে? যদি তাহা সাধারণ প্রকৃতির উপাদানগত কারণে হইয়া থাকে তবে আল্লাহ্র ইচ্ছা সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর এবং তাহাতে তুষ্ট হওয়ার পরও অধৈর্য ও হতাশ লোকের মত জীবন দেওয়ারই বা কী কারণ থাকিতে পারে (প্রাগুক্ত)?
খৃস্টানরা যেহেতু ইয়াহুদীদের এই মনগড়া উপাখ্যান গ্রহণ করিয়া লইয়াছে, তাই ইয়াহুদীরা যারপরনাই খুশি হইয়া বলে, যীশুখৃস্ট যদি "প্রতিশ্রুত মসীহ” হইতেন, তাহা হইলে আল্লাহ তাহাকে অসহায় অবস্থায় আমাদের হাতে তুলিয়া দিতেন না। মোটকথা, খৃস্টানদের হাতে যখন এই মনগড়া অভিযোগের কোন জবাব ছিল না এবং কাহিনীর এই বর্ণনা মানিয়া নেওয়ার পর "প্রায়শ্চিত" করার আকীদারও কোন মূল্য অবশিষ্ট থাকিল না, তখন তাহারা আরও একটি অংশ যুক্ত করিয়া দিল। যাহাতে ঈসা (আ)-এর মৃত্যুর পর পুনরুত্থিত হওয়া এবং আকাশে উত্তোলিত হওয়ার বর্ণনা রহিয়াছে (দ্র. যোহন, ২০: ১২-২২)।
"সপ্তাহের প্রথম দিন প্রত্যূষে অন্ধকার থাকিতে থাকিতে মন্দলীনী মরিয়ম কবরের নিকটে যান, আর দেখেন, কবর হইতে পাথরখানা সরান হইয়াছে। তখন তিনি দৌঁড়িয়া শিমোন পিতরের নিকট এবং যীশু যাঁহাকে ভালবাসিতেন, সেই অন্য শিষ্যের নিকটে আসিলেন, আর তাঁহাদিগকে বলিলেন, লোকে প্রভুকে কবর হইতে তুলিয়া লইয়া গিয়াছে। তাঁহাকে কোথায় রাখিয়াছে আমরা জানি না'। অতএব পিতর ও সেই অন্য শিষ্য বাহির হইয়া কবরের নিকট যাইতে লাগিলেন। তাঁহারা দুইজন একসঙ্গে দৌঁড়িলেন, আর সেই অন্য শিষ্য পিতরকে পশ্চাৎ ফেলিয়া অগ্রে কবরের নিকট উপস্থিত হইলেন এবং হেঁট হইয়া ভিতরে চাহিয়া দেখিলেন, কাপড়গুলি পড়িয়া রহিয়াছে, তথাপি ভিতরে প্রবেশ করিলেন না। শিমোন পিতরও তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ আসিলেন, আর তিনি কবরে প্রবেশ করিলেন এবং দেখিলেন, কাপড়গুলি পড়িয়া রহিয়াছে, আর যে রুমালখানি তাঁহার মস্তকের উপরে ছিল তাহা সেই কাপড়ের সহিত নাই, স্বতন্ত্র এক স্থানে গুটাইয়া রাখা হইয়াছে। পরে সেই অন্য শিষ্য, যিনি কবরের নিকটে প্রথমে আসিয়াছিলেন তিনিও ভিতরে প্রবেশ করিলেন এবং দেখিলেন ও বিশ্বাস করিলেন"।
প্রতিটি ব্যক্তি সামান্য চিন্তা-ভাবনা করিলেই সহজে বুঝিতে পারিবে যে, এই বর্ণনা পূর্ববর্তী বর্ণনার সহিত অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং একেবারেই সম্পর্কহীন। কেননা বর্ণনার প্রথমাংশ এমন এক ব্যক্তির অভিব্যক্তি যাহাকে অসহায়, নিরুপায় ও হতাশ এবং আল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগকারী হিসাবে দেখা যাইতেছে। আর দ্বিতীয় অংশের বর্ণনায় এমন এক মহান ব্যক্তির সমুজ্জল চেহারা তুলিয়া ধরা হইয়াছে যাহা আল্লাহ্ প্রদত্ত গুণাবলী মণ্ডিত, মহামহিম প্রভুর নৈকট্য লাভকারী এবং আগত ঘটনাবলী সম্পর্কে সম্পূর্ণ শান্ত ও আশ্বস্ত (আল্লামা সিওহারবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, পৃষ্ট, ৯৬)।
উল্লেখ্য যে, উপরিউক্ত বর্ণনার দ্বারা বুঝা যায় যে, খৃস্টানদের মতে হযরত ঈসা (আ)-কে ইয়াহুদীরা গ্রেপ্তার করে এবং শূলে চড়াইয়া হত্যা করে। আর ঈসা (আ) শত্রুর কবল হইতে মুক্ত না হইতে পারিয়া নিরাশ হইয়া প্রাণত্যাগ করেন। কিন্তু একই সূত্রের বর্ণায় আরও দেখা যায় যে, তিনি পরবর্তীতে আবার জীবিত হইয়া উঠেন এবং সাথীদেরকে সাক্ষাৎ দেন। এমনকি মার্ক ও লুক সুসমাচারে বলা হইয়াছে যে, তাঁহার সাথীদের সাক্ষাতের পর তিনি স্বর্গারোহণ করেন। যেমন: মার্ক সুসমাচারে বর্ণিত হইয়াছে, “প্রভু যীশু ঊর্ধ্বে স্বর্গে গৃহীত হইলেন এবং ঈশ্বরের দক্ষিণে বসিলেন" (মার্ক, ১৬: ১৯)। লুক সুসমাচারে বর্ণিত হইয়াছে, পরে এইরূপ হইল, তিনি আশীর্ব্বাদ করিতে করিতে তাঁহাদের হইতে পৃথক হইলেন, এবং ঊর্ধ্বে স্বর্গে নীত হইতে লাগিলেন (লুক, ২৪ : ৫১)।
উপরিউক্ত বর্ণনায় দেখা যায় যে, ঈসা (আ)-কে জীবন্ত অবস্থায় ঊর্ধ্বে উঠাইয়া নেওয়া হয়। এই ক্ষেত্রে ইসলামও তাহা সমর্থন করে। তবে তাঁহাকে শূলে চড়াইয়া হত্যা করার পর জীবিত করিয়া উত্তোলনের বিষয়টি ইসলাম সমর্থন করে না। আল-কুরআনে স্পষ্টভাবেই বলা হইয়াছে যে, হযরত ঈসা (আ)-কে ইয়াহুদীরা শূলে চড়াইতেও পারে নাই এবং হত্যাও করিতে পারে নাই বরং আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে উঠাইয়া লইয়াছেন এবং যাহারা ফাঁসী দেওয়ার দাবি করে, তাহাদের এই দাবিকে আল-কুরআন মিথ্যা ও কল্পনাপ্রসূত বলিয়া আখ্যা দেয়। এই মর্মে বলা হইয়াছে:
وَقَوْلِهِمْ إِنَّا قَتَلْنَا الْمَسِيحَ عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ رَسُولَ اللهِ وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ وَلَكِنْ شُبِّهَ لَهُمْ وَإِنَّ الَّذِينَ اخْتَلَفُوا فِيْهِ لَفِي شَكٍّ مِنْهُ مَا لَهُمْ بِهِ مِنْ عِلْمٍ إِلَّا اتَّبَاعَ الظَّنَّ وَمَا قَتَلُوهُ يَقِينَا بَلْ رَفَعَهُ اللَّهُ إِلَيْهِ وَكَانَ اللَّهُ عزيزاً حَكِيمًا .
"আর আমরা আল্লাহ্র রাসূল মারয়াম তনয় ঈসা মসীহকে হত্যা করিয়াছি, তাহাদের এই উক্তির জন্য (তাহারা অভিশপ্ত)। অথচ তাহারা তাহাকে হত্যা করে নাই, ক্রুশবিদ্ধও করে নাই, কিন্তু তাহাদের এইরূপ বিভ্রম হইয়াছিল। যাহারা তাহার সম্বন্ধে মতভেদ করিয়াছিল, তাহারা নিশ্চয় এই সম্বন্ধে সংশয়যুক্ত ছিল; এই সম্পর্কে অনুমানের অনুসরণ ব্যতীত তাহাদের কোন জ্ঞানই ছিল না। ইহা নিশ্চিত যে, তাহারা তাহাকে হত্যা করে নাই, শূলেও চড়ায় নাই, বরং আল্লাহ তাহাকে তাঁহার নিকট তুলিয়া লইয়াছেন এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়” (৪ : ১৫৭-১৫৮)।
আল-কুরআনের বর্ণনামতে বানু ইসরাঈল আল্লাহ্র রাসূল হযরত ঈসা (আ)-এর বিরুদ্ধে গোপন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। কিন্তু মহান আল্লাহর অমোঘ বিধান ছিল এই যে, কোন বিরোধী শক্তিই হযরত ঈসা (আ)-এর নাগাল পাইবে না এবং তিনি তাঁহাকে শত্রুদের যে কোন ষড়যন্ত্র হইতে নিরাপদ রাখিবেন। ফল হইল এই যে, বানু ইসরাঈল যখন তাঁহাকে অবরোধ করিল তখন তাহারা আল্লাহ্র রাসূল হযরত ঈসা (আ)-কে ধরিতে পারিল না এবং পূর্ণ নিরাপত্তা সহকারে তাঁহাকে আসমানে উঠাইয়া লওয়া হইল। অতঃপর বানু ইসরাঈলরা যখন ঘরের ভিতরে প্রবেশ করিল তখন পরিস্থিতি তাহাদের কাছে সন্দেহজনক হইয়া দাঁড়াইল। তাহারা নিজেদের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করিতে চরমভাবে ব্যর্থ হইল। আর আল্লাহ তা'আলা এইভাবে নিজের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করিলেন, যা হযরত ঈসা (আ)-কে রক্ষার জন্য করিয়াছিলেন।
ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ এই যে, হযরত ঈসা (আ) যখন অনুভব করিলেন, বানু ইসরাঈলের শত্রুতার মাত্রা এতটা বেশি হইয়া গিয়াছে যে, তাহারা তাঁহাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হইয়াছে, তখন তিনি বিশেষভাবে একটি ঘরে নিজের হাওয়ারীগণকে একত্র করিলেন এবং তাহাদের সামনে পরিস্থিতির চিত্র তুলিয়া ধরিয়া বলিলেন, পরীক্ষার কঠিন মুহূর্ত সমাগত। সময় আসিয়া গিয়াছে, সত্যকে বিলীন করিয়া দেওয়ার ষড়যন্ত্র পূর্ণ শক্তি লাভ করিয়াছে। এখন আমি তোমাদের মধ্যে আর বেশীক্ষণ থাকিব না। এইজন্য আমার পরে সত্য দীনের উপর অবিচল থাকা ও তাহার প্রচার-প্রসার ও সাহায্য-সহযোগিতার ব্যাপারটি কেবল তোমাদের সাথে সংশ্লিষ্ট হইতে যাইতেছে। অতএব আমাকে বল, কে কে আল্লাহ্র রাস্তায় সত্যিকার সাহায্যকারী হইত প্রস্তুত আছ? হাওয়ারীগণ এই আহবান শোনার পর বলিলেন, আমরা সবাই আল্লাহ্ দীনের সাহায্যকারী, আমরা সত্যিকারভাবে মনে-প্রাণে আল্লাহর উপর ঈমান আনিয়াছি এবং আমাদের ঈমানের সত্যতার পক্ষে আপনাকে সাক্ষী রাখিলাম। তাঁহারা এই কথা বলিবার পর মানবিক দুর্বলতার দিকে লক্ষ্য রখিয়া নিজেদের দাবির উপরই বক্তব্য শেষ করেন নাই, বরং আল্লাহ্র দরবারে হাত তুলিয়া মুনাজাত করিলেন, হে আল্লাহ! আমরা যাহা কিছু বলিলাম তাহার উপর অবিচল থাকার শক্তি দান কর এবং আমাদেরকে তোমার দীনের সাহায্যকারীদের তালিকাভুক্ত করিয়া নাও।
এইদিক হইতে হযরত ঈসা (আ) নিশ্চিত হইয়া নিজের দাওয়াতের দায়িত্ব পালন করার সাথে সাথে অপেক্ষা করিতে থাকিলেন যে, দেখা যাক আল্লাহ্ দীনের শত্রুদের তৎপরতা কোন দিকে মোড় নেয় এবং আল্লাহ্ কি ফয়সালা প্রকাশ পায়? এই প্রসংগে আল্লাহ তা'আলা কুরআন মজীদের মাধ্যমে ইয়াহুদী-খৃস্টানদের ভ্রান্ত ধারণার বিপরীতে "নির্ভুল জ্ঞানের আলো" দান করিয়া বলিলেন যে, শত্রুরা যখন নিজেদের গোপন ষড়যন্ত্রে তৎপর ছিল, সেই সময় আমরাও আমাদের পরিপূর্ণ কুদরতের অদৃশ্য পরিকল্পনার সাহায্যে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিলাম যে, হযরত ঈসা (আ)-এর বিরুদ্ধে শত্রুদের কোন ষড়যন্ত্রই সফল হইতে দেওয়া হইবে না, আর নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা'আলার পরিপূর্ণ কুদরতে গোপন কার্যক্রমের মুকাবিলায় কাহারও পরিকল্পনা সফল হইতে পারে না। কেননা তাঁহার পরিকল্পনার তুলনায় উত্তম কাহারও পরিকল্পনা হইতে পারে না। বলা হইয়াছে:
وَمَكَرُوا وَمَكَرَ اللهُ وَاللَّهُ خَيْرُ الْمَاكِرِينَ .
"আর তাহারা (ইয়াহূদীরা ঈসার বিরুদ্ধে) গোপন ষড়যন্ত্র করিল। আল্লাহও (ইয়াহুদীদের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে) গোপন ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন করিলেন। আর আল্লাহ সর্বোৎকৃষ্ট গোপন ব্যবস্থাপনার অধিকারী” (৩ঃ ৫৪; আল্লামা সিওহারবী, ৪খ, page ৯৭-৯৮)।
আল্লামা মাজেদী উল্লেখ করেন যে, "আরবী মকর শব্দটি আবশ্যিকভাবে কোন দোষ বলে করে না। মকর শব্দটি প্রয়োগজনিত কারণে নিন্দনীয় ও প্রশংসনীয় উভয় অর্থে ব্যবহৃত হইতে পারে। মূল অর্থ, গোপন পরিকল্পনা, গভীর চক্রান্ত, ইংরেজী প্লান (Plan) বলিতে যাহা বুঝায় আরবী উর্দু 'তদবীর' বলিতে তাহাই বুঝায়" (তাফসীরে মাজেদী, ২খ, পৃষ্ঠা ৮৩০)।
সর্বশেষে সেই সময় আসিয়া উপস্থিত হইল যখন বানু ইসরাঈলের নেতৃবৃন্দ, মহাযাজক এবং ধর্মবেত্তাগণ হযরত ঈসা (আ)-কে একটি বদ্ধ ঘরের মধ্যে অবরোধ করিল। হযরত ঈসা (আ) এবং হাওয়ারীগণ ঘরের মধ্যে অবরুদ্ধ হইয়া পড়িলেন আর শত্রুরা চারিদিক হইতে বেষ্টনী রচনা করিয়া দাঁড়াইয়া আছে। এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন দেখা দিল, এমন কি পন্থা হইতে পারে যাহার ফলে শত্রুদের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হইবে এবং তাহারা হযরত ঈসা (আ)-এর কোন ক্ষতি করিতে পারিবে না? আর কিভাবে আল্লাহ তা'আলার হেফাজতের ওয়াদা পূর্ণ হইতে পারে?
এই সম্পর্কে কুরআন মজীদের বক্তব্য এই যে, নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা'আলার ওয়াদা পূর্ণ হইয়াছে এবং তাঁহার পরিপক্ক ব্যবস্থাপনা হযরত ঈসা (আ)-কে দুশমনদের হাত হইতে সর্বপ্রকারে নিরাপদ রাখিয়াছে। এই নাযুক মুহূর্তে তাঁহার নিকট ওহী আসিল এবং আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে সুসংবাদ দিলেনঃ ঈসা! ভীত হইও না, তোমাকে পূর্ণরূপে সাহায্য করা হইবে (অর্থাৎ শত্রুরা তোমাকে হত্যা করিতে পারিবে না এবং তুমিও এখন মৃত্যুর কোলে ঢলিয়া পড়িবে না)। আমি তোমাকে আমার নিকটে (উর্ধ্ব জগতে) তুলিয়া লইয়া আসিব এবং কাফিরদের যে কোন ষড়যন্ত্র হইতে তোমাকে রক্ষা করিব। এই ওয়াদা প্রসঙ্গে আল-কুরআনে বর্ণিত হইয়াছে:
إِذْ قَالَ اللَّهُ يُعِيسَى إِنِّي مُتَوَفِّيْكَ وَرَافِعُكَ إِلَى وَمُطَهِّرُكَ مِنَ الَّذِيْنَ كَفَرُوا وَجَاعِلُ الَّذِيْنَ اتَّبَعُوكَ فَوْقَ الَّذِيْنَ كَفَرُوا إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ ثُمَّ إِلَى مَرْجِعُكُمْ فَاحْكُمُ بَيْنَكُمْ فِيْمَا كُنْتُمْ فِيهِ تَخْتَلِفُونَ .
"স্মরণ কর যখন আল্লাহ বলিলেন, হে ঈসা! আমি তোমার কাল পূর্ণ করিতেছি এবং আমার নিকট তোমাকে তুলিয়া লইতেছি এবং যাহারা সত্য প্রত্যাখ্যান করিয়াছে তাহাদের মধ্য হইতে তোমাকে মুক্ত করিতেছি। আর তোমার অনুসারিগণকে কিয়ামত পর্যন্ত কাফিরদের উপর প্রাধান্য দিতেছি, অতঃপর আমার কাছে তোমাদের প্রত্যাবর্তন। তারপর যে বিষয়ে তোমাদের মতান্তর ঘটিতেছে আমি উহা মীমাংসা করিয়া দিব" (৩ঃ ৫৫)।
উল্লেখ্য যে, হাসান বসরী, কালবী ও ইবন জুরায়জ (র) বলিয়াছেন: আয়াতের মর্ম হইল, আমি তোমাকে মৃত্যু ছাড়াই গ্রহণ করিব এবং দুনিয়া হইতে আমার কাছে তুলিয়া লইব। বাগাবী (র) বলেন, ইহার দুইটি ব্যাখ্যা হইতে পারে: (১) আমি তোমাকে পুরোপুরি ভাবে আমার কাছে উঠাইয়া লইব। তাহারা তোমার কোন ক্ষতি সাধন করিতে পারিবে না। বলা হইয়া থাকে। توفیت کذا অর্থাৎ استوفیته মানে পরিপূর্ণভাবে উসূল করিয়াছি। (২) আমি তোমাকে স্বীয় আশ্রয়াধীন করিব। বলা হইয়া থাকে, توفیت منه كذا মানে تسلمته অর্থাৎ আমি তাহাকে স্বয়ং গ্রহণ করিয়াছি।
ইবন জারীর (র) ইব্ন আনাস হইতে বর্ণনা করেন التوفى দ্বারা নিদ্রা বুঝান হইয়াছে। ঈসা (আ)-কে যখন আসমানে তুলিয়া নেওয়া হয় তখন তিনি ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন। তখন আয়াতের অর্থ হইবে, আমি তোমাকে নিদ্রিত করিব, ইহার পর আমার কাছে তুলিয়া নিব। যেমন, আল্লাহ বলেন : وَهُوَ الَّذِي يَتَوَفَّكُمْ بِاللَّيْلِ "তিনিই রাত্রে তোমাদের (নিদ্রারূপ) মৃত্যু ঘটান" (৬ঃ ৬০)।
কেহ কেহ বলেন, التوفى অর্থ মৃত্যু। আলী ইবন আবূ তালহা, ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণনা করেন, আয়াতের অর্থ: আমি তোমার মৃত্যু ঘটাইব। ইহার ব্যাখ্যায় দাহ্হাক বলিয়াছেন, ইহার অর্থ, আমি তোমার মৃত্যু ঘটাইব এবং তাহা আকাশ হইতে দুনিয়ায় পুনরাগমনের পর। তখন আমি তোমাকে ইয়াহুদীদের হাত হইতে রক্ষা করিব এবং তোমার নির্দিষ্ট আয়ু পূর্ণ করিব। انی مُتَوَفِّيْكَ وَرَافِعُكَ -এর সংযোজক অব্যয় 'ওয়াও' শুধু সংযোগ সাধনের জন্যই, ধারাবহিকতা বুঝাইবার জন্য নহে। কিন্তু সূরা মাইদার আয়াতটি সামনে রাখিলে এই ব্যাখ্যা টিকে না।
সেখানে ঈসা (আ) বলিয়াছেন : فَلَمَّا تَوَفَّيْتَنِي كُنْتَ أَنْتَ الرَّقِيبَ عَلَيْهِمْ "যখন তুমি আমাকে তুলিয়া নিলে, তখন তুমিই তো ছিলে তাহাদের কার্যকলাপের তত্ত্বাবধায়ক”। উহার দ্বারা বুঝা যায়, তাঁহার কওম তাঁহার توفی এর পরেই তাহারা নাসারা হইয়াছিল। সুতরাং توفی -এর অর্থ আকাশে উত্তোলন কিংবা ইহার আগে তাঁহার মৃত্যুবরণ (তাফসীরে মাযহারী, ২খ, page ৩০০-৩০৪)।
আল্লামা কাযী মুহাম্মাদ ছানাউল্লাহ পানীপথী (র) বলেন, আমার মতে التوفى অর্থ মৃত্যু ছাড়াই আকাশে উত্তোলন। একটু চিন্তা করিলেই একথা বুঝা যায়। কেননা এক আয়াতে বলা হইয়াছে, وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ "তাহারা তাহাকে হত্যাও করে নাই, শূলেও চড়ায় নাই"। যদি মৃত্যুই হইবে তাহা হইলে তাঁহাকে হত্যা করে নাই বলিবার সার্থকতা কি, যখন হত্যার উদ্দেশ্য মৃত্যুই হইয়া থাকে (প্রাগুক্ত, page ৩০৪)?
মোটকথা, আল্লাহ পাক হযরত ঈসা (আ)-কে প্রতিশ্রুতি দিয়াছিলেন যে, তাঁহাকে শত্রুদের হাত হইতে পবিত্র রাখিবেন এবং তাহাদের কবল হইবে উদ্ধার করিবেন। তাই তিনি হযরত ঈসা (আ)-কে জীবিত অবস্থায়ই উদ্ধার করিয়াছিলেন এবং তাঁহাকে শত্রুদের ধরা-ছোঁয়ার বাহিরে রখিয়াই ফেরেশতাগণের মাধ্যমে জীবন্ত অবস্থায় সশরীরে আসমানে উঠাইয়া লইয়াছিলেন। শত্রুদের কবল হইতে রক্ষা পাওয়ার বিষয়টি হযরত ঈসা (আ)-এর প্রতি এক বিশেষ নেয়ামত ছিল। এই মর্মে আল-কুরআনে আরও বলা হইয়াছে:
وَإِذْ كَفَفْتُ بَنِي إِسْرَائِيلَ عَنْكَ إِذْ جِئْتَهُمْ بِالْبَيِّنَتِ فَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْهُمْ إِنْ هُذَا إِلَّا سِحْرٌ مُبِينٌ .
"আমি তোমা হইতে বানু ইসরাঈলকে নিবৃত্ত রাখিয়াছিলাম, তুমি যখন তাহাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শন আনিয়াছিলে তখন তাহাদের মধ্যে যাহারা কুফরী করিয়াছিল তাহারা বলিয়াছিল, ইহা তো স্পষ্ট যাদু” (৫: ১১০)।
হযরত ঈসা (আ)-কে এই বলিয়া সান্ত্বনা দেওয়া হইল যে, এই দুর্ভেদ্য অবরোধ সত্ত্বেও শত্রুরা তোমাকে হত্যা করিতে পারিবে না এবং অদৃশ্য হাত তোমাকে ঊর্ধ্ব জগতে তুলিয়া নিয়া আসিবে, এমনিভাবে দুশমনের নাপাক হাতের স্পর্শ হইতে তোমাকে নিরাপদ রাখা হইবে (আল্লামা সিওহারবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, page ১০০)।
কুরআন মজীদ ইয়াহুদী-খৃস্টানদের মনগড়া কল্পকাহিনীর বিরুদ্ধে মসীহ ইবন মারয়াম (আ) সম্পর্কে এই বর্ণনা প্রদান করিয়াছে। এখন দুইটি বর্ণনাই আমাদের সামনে রহিয়াছে এবং ন্যায়-ইনসাফের নিক্তিও আমাদের হাতে রহিয়াছে। প্রথমে হযরত মসীহ্ (আ)-এর ব্যক্তিত্ব এবং তাঁহার দাওয়াত ও আন্দোলনের মিশনকে ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতে উপলব্ধি করা দরকার। অতঃপর যে বিস্তারিত বর্ণনা একজন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ নবী, আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী রসূল এবং খৃস্টানদের ভ্রান্ত বিশ্বাস অনুযায়ী আল্লাহর পুত্রকে তাহার ফয়সালার সামনে হতাশ, কিংকর্তব্যবিমূঢ়, অসহায় এবং আল্লাহ্র নিকট অভিযোগকারী হিসাবে তুলিয়া ধরে তাঁহার উপর আরেকবার দৃষ্টিপাত করা হউক। সাথে সাথে এই বর্ণনার মধ্যে যে বৈপরীত্য রহিয়াছে সে সম্পর্কেও চিন্তা করা হউক। একদিকে বলা হইতেছে, হযরত মসীহ্ (আ) আল্লাহর পুত্র হইয়া এই উদ্দেশ্যে পৃথিবীতে আসিয়াছিলেন যে, তিনি শূলাবিদ্ধ হইয়া দুনিয়ার সকল পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিবেন (ইহাই হইতেছে, প্রায়শ্চিত্তের আকীদার একমাত্র ভিত্তি), অপরদিকে ক্রুশ এবং হত্যার কল্পিত কাহিনী এই ভিত্তির উপর দাঁড়ানো হইয়াছে যে, সেই নির্দিষ্ট সময় যখন আসিয়া গেল তখন আল্লাহ্ এই কল্পিত পুত্রকে নিজের মাহাত্ম্য এবং পৃথিবীতে নিজের অস্তিত্বকে একেবারে ভুলিয়া গিয়া "প্রভো আমার, প্রভো আমার, কেন আমায় পরিত্যাগ করিলে' এই ধরনের হতাশাজনক বাক্য মুখ দিয়া বাহির করিতে এবং আল্লাহর ইচ্ছার উপর নিজের অসন্তুষ্টি প্রকাশ করিতে দেখা যায়। কোন ব্যক্তির এই প্রশ্ন উত্থাপন করার কি অধিকার নাই যে, খ্রীষ্টানদের বিবৃত কাহিনীর উভয় অংশ যদি সঠিক এবং নির্ভুল হইয়া থাকে তাহা হইলে এই বৈপরীত্য কেন এবং এই অসামঞ্জস্যতারই বা অর্থ কি (আল্লামা সিওহারবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, page ১০১)?
অতএব যদি কোন বাস্তববাদী এবং দূরদৃষ্টি সম্পন্ন ব্যক্তি এই সমস্ত দিক সামনে রাখিয়া এবং ঘটনা ও পরিস্থিতির এই সার্বিক দিককে পরস্পর সংযুক্ত করিয়া বিষয়টি অধ্যয়ন করে তবে সে 'সত্যকে মানিয়া নেওয়ার তাগিদে নিঃসংকোচে এই সিদ্ধান্তে পৌছিবে যে, বাইবেলের এই কাহিনী পরস্পর বিরোধী এবং মনগড়া। আর কুরআন মজীদ ঐ প্রসংগে যে সিদ্ধান্ত দিয়াছে তাহাই সত্য।
ইতিহাস সাক্ষী যে, হযরত মসীহ (আ)-এর পর হইতে সেন্ট পলের পূর্ব পর্যন্ত খৃস্টান জগত ইয়াহুদীদের এই মনগড়া কাহিনীর সাথে সম্পূর্ণ নিঃসম্পর্ক ছিল। কিন্তু সেন্ট পল যখন "ত্রিত্ববাদ ও প্রায়শ্চিত্তের” ধারণার উপর আধুনিক খৃস্টবাদের ভিত্তি স্থাপন করেন তখন প্রায়শ্চিত্তের ধারণাকে সুদৃঢ় করার জন্য ইয়াহুদীদের এই মনগড়া উপাখ্যানকেও ধর্মের অংশে পরিণত করিয়া নেওয়া হয়।
কুরআন মজীদ চৌদ্দ শত বৎসর ধরিয়া হযরত ঈসা (আ)-এর মহান মর্যাদা শ্রেষ্ঠত্ব ও মহিমার কথা ঘোষণা করিয়া তাঁহার ঊর্ধ্ব জগতে উত্তোলিত হওয়ার রহস্যকে ইয়াহুদী-খৃস্টানদের মনগড়া কাহিনীর বিপরীতে নিশ্চিত জ্ঞানের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছে (আল্লামা সিওহারবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, page ১০২)।