📄 উত্তম আদর্শ উপস্থাপন
হযরত ঈসা (আ) ছিলেন তাঁহার সমাজে একজন আদর্শ মানুষের প্রতিচ্ছবি। তিনি ছিলেন জনদরদী, তিনি ছিলেন আর্কষণীয় ব্যক্তিত্ব। কথাবার্তায় ও আচার-আচরণে, তিনি মানুষের হৃদয়ে স্থান করিয়া লইতেন। সুসমাচারসমূহে এই ব্যাপারে প্রচুর দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।
📄 কাহিনী ও উপমা-উদাহরণের মাধ্যম দাওয়াত
হযরত ঈসা (আ)-এর দাওয়াত উপস্থাপনের আরেকটি কৌশল ছিল, তিনি লোকজনকে বুঝাইবার জন্য রূপকার্থে বিভিন্ন কিসসা-কাহিনী, উপমা-উদাহরণ ব্যবহার করিতেন। মথি সুসমাচারে বর্ণিত হইয়াছে যে, ঈসা (আ)-এর হাওয়ারীগণ তাঁহাকে ইহার রহস্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন। তিনি উহার উত্তরে বলিয়াছিলেন, আমি তাহাদের জন্য দৃষ্টান্ত দ্বারা কথা বলিতেছি। কারণ তাহারা দেখিয়াও দেখে না, শুনিয়াও শুনে না এবং বুঝিয়াও বুঝেও না (দ্র. মথি, ১৩: ১৩)।
অর্থাৎ খোদায়ী রাজ্যের বিভিন্ন রহস্য ও নিগুঢ় তত্ত্ব বুঝাইবার জন্য তিনি উপমা-উদাহরণ, কিসসা-কাহিনীর ব্যবহার করিয়াছেন, যাহাতে তাহাদের অন্তর্দৃষ্টি খুলিয়া যায় এবং বিষয়গুলি সম্পর্কে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জনসহ স্মৃতিতে ধরিয়া রাখা সহজতর হয়। মথি সুসমাচারে বিভিন্ন উদাহরণের অবতারণা করা হইয়াছে। যেমন ফল দ্বারাই গাছ চেনা যায় (১২: ৩৩-৩৬)।
এক চাষীর দৃষ্টান্ত (১৩: ১-৮), গমের মধ্যে শ্যামা ঘাসের দৃষ্টান্ত (১৩ঃ ২৪-৩০); সরিষা দানা ও খামির দৃষ্টান্ত (১৩: ৩১-৩৪), আঙুরক্ষেতের মজুরদের গল্প (২০: ১-১৬), আঙুর ক্ষেতে চাষীদের দৃষ্টান্ত (২১: ৩৩-৪৪), বিবাহভোজের দৃষ্টান্ত (২২: ১-১৩), দশ মেয়ের গল্প (২৫: ১-১৩), তিনজন গোলামের গল্প (২৫: ১৪-৩০) ইত্যাদি।
মার্ক, লুক ও যোহন সুসমাচারে কয়েকটি গল্প উল্লেখ করা হইয়াছে (দ্র. ৪: ১-৯; ৪: ২৬-২৯; ৪: ৩০-৩৪; ১২: ১-১২; ৮:৪-৮; ১০: ৩০-৩৭; ১২: ১৩-২৫; ১৩: ১৮০২১; ১৪: ১৫-২৫; ১৫:১-৭; ১৬৪ ৮-১০; ১৫: ১১-৩২; ১৬: ১-১৮; ১৬৪ ১৯-৩১; ১০: ১২-২৭; ২০ : ৯-১৮; ৪:৩৫-৩৮; ১০: ১-১৫; ১৫:১-১৭।
📄 ইয়াহুদীদের দণ্ড হ্রাসের প্রচেষ্টা চালানো
হযরত ঈসা (আ) কলহ-দ্বন্ধে লিপ্ত বানু ইসরাঈল জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করিতে চেষ্টা করিয়াছিলেন। বানূ ইসরাঈলের এলাকা ভ্রমণ করিয়া অত্যন্ত হিকমতের সহিত বুঝাইবার চেষ্টা করিয়াছিলেন। যোহন সুসমাচারে উল্লেখ করা হইয়াছে, ঈসা (আ) সমিরীয় প্রদেশে আসিয়াছিলেন। সেইখানে তাহার দাওয়াত দেওয়ার পর ঈসা (আ)-এর উপর তাহারা ঈমান আনিয়াছিল (দ্র. যোহন, ১:৪০)।
বনী ইসরাঈলের মধ্যে ঈসা (আ)-এর ঐক্যের আহবানে ও তাহাদের মুক্তির জন্য হিকমতের বিষয়টি আল-কুরআনেও স্পষ্টভাবে আসিয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে:
وَلَمَّا جَاءَ عِيسَى بِالْبَيِّنَتِ قَالَ قَدْ جِئْتُكُمْ بِالْحِكْمَةِ وَلِأُبَيِّنَ لَكُمْ بَعْضَ الَّذِي تَخْتَلِفُونَ فِيهِ فَاتَّقُوا اللَّهَ واطيعون .
"ঈসা যখন স্পষ্ট নিদর্শনসহ আসিল, সে বলিয়াছিল, আমি তো তোমাদের নিকট আসিয়াছি প্রজ্ঞাসহ এবং তোমরা যে বিষয়ে মতভেদ করিতেছ, তাহা স্পষ্ট করিয়া দিবার জন্য। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমাকে অনুসরণ কর" (৪৩:৬৩)।
ইয়াহুদীদের দণ্ড হ্রাসের প্রচেষ্টা চালানো: বানু ইসরাঈল আল্লাহর কিছু কিছু বাণী বিকৃত করিয়া দাবি করিতেছিল যে, সৃষ্টিকর্তা একমাত্র তাহাদের কল্যাণেই কাজ করেন। তাহারাই আল্লাহ্ নির্বাচিত জাতি। গোটা দুনিয়ার মালিক তাহারাই। এসকল কথা তাহাদের মৌখিক বাণী। তালমুদে আরো ব্যাপকভাবে আসিয়াছে যাহার মূল উৎস পুরাতন নিয়মেও আছে বলিয়া তাহারা ধারণা করিতে থাকে। যেমন লেবীয় পুস্তকে আসিয়াছে, আমি সদাপ্রভু তোমাদের ঈশ্বর! আমি অন্য জাতি সকল হইতে তোমাদিগকে পৃথক করিয়াছি (লেবীয় পুস্তক, ২০ঃ ২৪)।
এই সমস্ত তত্ত্বকথা হইতে ইয়াহূদীদের মাঝে প্রচণ্ড জাতীয় দন্ত সৃষ্টি হয়। আল্লাহ্ প্রতি তাহাদের জাতীয় ভ্রান্ত চেতনা হইতে সৃষ্টি হয় বিভিন্ন বিভ্রান্তিমূলক চিন্তা-চেতনা। শত পাপাচারে লিপ্ত হওয়ার পরও তাহারা নিজেদেরকে দোষী মনে করিত না। এই ধারণার কথা আল-কুরআনেও বর্ণিত হইয়াছে:
ذلكَ بِأَنَّهُمْ قَالُوا لَنْ تَمَسَّنَا النَّارُ الأَ أَيَّامًا مَّعْدُودَت وَغَرَّهُمْ فِي دِينِهِمْ مَا كَانُوا يَفْتَرُونَ
"এইহেতু যে, তাহারা বলিয়া থাকে, দিন কতক ব্যতীত আমাদিগকে অগ্নি স্পর্শ করিবে না। তাহাদের নিজেদের দীন সম্বন্ধে তাহাদের মিথ্যা উদ্ভাবন তাহাদিগকে প্রবঞ্চিত করিয়াছে” (৩ঃ ২৪)।
সুতরাং তাহাদের জীবন চলার পথ বক্র হইয়া গিয়াছিল। তাই হযরত ঈসা (আ) তাহাদেরকে সিরাতুল মুসতাকীম অবলম্বনের দাওয়াত দিয়াছিলেন। তেমনিভাবে তাকওয়া তথা আল্লাহভীতি ও পরহেজগারীর দাওয়াতকেও উহার সহিত যুক্ত করিয়াছেন। এইজন্য আল-কুরআনে সূরা যুখরুফে হযরত ঈসা (আ)-এর দাওয়াত উল্লেখ করিতে গিয়া তাকওয়া ও সিরাতুল মুসতাকীমের দাওয়াত-এর কথা উল্লেখ করা হইয়াছে (দ্র. সূরা যুখরুফ : ৬৩-৬৪)। কেননা তাহাদের এই দম্ভ নিরসন করিতে হইলে যেমনি দরকার ইবাদত-এর তেমনিভাবে প্রায়োজন তাকওয়ার। হযরত ঈসা (আ) তাহাদের আমল না করিয়াই আল্লাহ্ প্রিয়পাত্র হওয়ার দাবিকে বিভিন্নভাবে খণ্ডন করিয়াছিলেন, যাহা প্রচলিত সুসমাচারসমূহেও উল্লিখিত হইয়াছে (দ্র. যোহন, ৮ : ৩৮-৪৭)।
এমনিভাবে হযরত ঈসা (আ) ব্যাখ্যা করেন যে, তাহাদের এই রাজ্য এবং আল্লাহ কর্তৃক নির্বাচন যাহা তাহারা দাবি করিতেছে অচিরেই তাহা হস্তচ্যুত হইবে তাহাদেরই কর্মফল স্বরূপ। ঈসা (আ) বলিয়াছিলেন, আমি তোমাদিগকে কহিতেছি, তোমাদের নিকট হইতে ঈশ্বরের রাজ্য কাড়িয়া লওয়া হইবে এবং এমন এক জাতিকে দেওয়া হইবে, যে জাতি তাহার ফল দিবে (মথি, ২১ : ৪৩)।
এইভাবে তিনি তাহাদের দম্ভ হ্রাস করিয়া সঠিক পথের সন্ধান দিতে চেষ্টা করিয়াছিলেন। হযরত ঈসা (আ)-এর দাওয়াত উপস্থাপনার আরও কয়েকটি কৌশলগত দিক রহিয়াছে যাহা তাহার শিক্ষার মূলে নিহিত। তন্মধ্যেঃ
(১) বাহ্যিকতা ও আনুষ্ঠানিকতার উপর নির্ভর না করিয়া শরীআতের মূল চেতনা আকড়াইয়া ধরা এবং তাহার বিধিবিধান নিষ্ঠার সহিত পালন করা।
(২) আখেরাতের জিন্দিগীর পুনরুজ্জীবিত করা।
(৩) তাকওয়ার অনুভূতি হৃদয়মূলে সুদৃঢ় করিয়া দেওয়া।
(৪) ইয়াহূদীদিগকে বস্তুবাদী হইতে ফিরাইয়া বেহেস্তী জিন্দেগীরমুখী করা।
(৫) ইসরাঈলী সামাজে অবহেলিত ও নির্যাতিত ব্যক্তিদের গুরুত্ব পুনরুদ্ধার করা।
(৬) হতাশাগ্রস্ত, বিপদগ্রস্ত এবং পীড়িতদের সাহায্য করা।
(৭) তাহার দাওয়াতকে পূর্ববর্তী দাওয়াতের সহিত সম্পর্কিত করা এবং সত্যায়ন করা।
(৮) আধ্যাত্মিক আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার নীতির উপর গুরুত্ব আরোপ করা।
(১০) দাওয়াত দানকারীর জন্য নিজেকে সমস্ত সন্দেহের উর্ধ্বে রাখা।
(১১) তাঁহার অবর্তমানে অনুসারিগণ যাহাতে হতাশ ও নিরাশ হইয়া না পড়ে, সেইজন্য পরবর্তী পয়গম্বরের সুসংবাদ দান।
মোটকথা, হযরত ঈসা (আ) তাঁহার দাওয়াত উপস্থাপনে উপরিউক্ত কৌশলগত নীতিসমূহ অবলম্বন করিতেন। তাঁহার দাওয়াতের আর একটি বৈশিষ্ট্য ছিল ভ্রাম্যমাণতা। তিনি নির্দিষ্ট কোন স্থানে বাস না করিয়া গ্রাম গঞ্জে ঘুরিয়া ঘুরিয়া লোকজনকে নসীহত করিতেন, শিক্ষা দিতেন, আসমানী রাজ্যের সুসংবাদ দিতেন। তিনি তাঁহার স্বল্পকালীন নবুওয়াতী জীবনে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনায় এমন এক দল সহচর বা হাওয়ারী তৈয়ারি করিয়া গিয়াছিলেন যাহারা তাঁহার শিক্ষা প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ইয়াহুদী ষড়যন্ত্র ও রোমানদের অত্যাচারের মুখেও তাহার দাওয়াত থামিয়া থাকে নাই, যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে গোপনীয়ভাবে চলমান ছিল। হযরত ঈসা (আ)-এর পক্ষ হইতে যে দৃঢ়তা তাঁহার সাথীরা লাভ করিয়াছিলেন, শত বাধার মুখেও তাহা পরিত্যাগ করেন নাই। অতএব হযরত ঈসা (আ)-এর দাওয়াত স্বল্পকালীন হইলেও তাহার প্রভাব ছিল সুগভীর ও সুদূর প্রসারী।
📄 ঈসা (আ)-এর দাওয়াতের পথে নানাবিধ বাধা
হযরত ঈসা (আ)-এর দাওয়াতে সাধারণ লোক আকৃষ্ট হইয়া গিয়াছিল, যেজন্য তিনি যেখানেই যাইতেন তাঁহার পিছনে অনুসারীদের ঢল নামিত। কিন্তু ইহাতে ধর্ম ব্যবসায়ী কায়েমী স্বার্থবাদী ইয়াহুদী পণ্ডিত ও নেতাদের গাত্রদাহ আরম্ভ হয়। হযরত ঈসা (আ)-ও তাহাদের সেই ভণ্ডামীর জোর সমালোচনা করিতেন। ফলে তাহারা ঈসা (আ)-এর বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক ভূমিকা গ্রহণ করে। হযরত ঈসা (আ) তাহাদেরকে শুধু যুক্তি ও নৈতিকভাবেই নহে, বরং কাজের মাধ্যমেও তাহাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করিয়াছিলেন। বর্ণিত আছে যে, ইয়াহুদীদের কোন এক ঈদুল ফেসাখের সময় তিনি জেরুজালেম গিয়াছিলেন। তিনি সেখানে দেখিলেন, লোকেরা ইবাদতখানার মধ্যে গরু ভেড়া আর কবুতর বিক্রী করিতেছে এবং টাকা বদল করিয়া দিবার লোকেরাও বসিয়া আছে। এই সমস্ত দেখিয়া তিনি দড়ি দিয়া একটা চাবুক তৈরি করিলেন, আর তাহা দিয়া সমস্ত গরু ভেড়া এবং লোকদেরও সেই জায়গা হইতে তাড়াইয়া দিলেন। তিনি বলিলেন, এই জায়গা হইতে সমস্ত কিছু লইয়া যাও। কারণ ইহা আল্লাহর ঘর। আল্লাহর ঘরকে ব্যবসার ঘর করিও না (দ্র. যোহন, ২ : ১৩-১৬)।
উল্লেখ্য যে, উল্লিখিত ব্যবসায় যাহারা জড়িত ছিল তাহাদেরকে ছানদারিন বলা হইত। ইহারা ছিল ইয়াহুদী সমাজে একটি প্রতিষ্ঠিত সংস্থা যাহার প্রধান সদস্য ছিল ৭০ জন ধর্মযাজক। যাহারা বানু ইসরাঈলের মধ্যে তাহাদের আইনগত কর্তৃত্ব ছিল (আহমদ-আবদুল ওয়াহাব, আল মাসীহ ফী মাসাদিরিল আকাঈদিল মাসীহিয়্যা, কায়রো, মাক্কাবাহ ওয়াহবাহ, মিসর ১৯৭৮ ১৩৯৮ হি., page ১৫০)।
হযরত ঈসা (আ) যেন ভিমরুলের চাকে হাত দিয়াছিলেন। তাই এই স্বার্থান্বেষী মহল প্রথম হইতেই তাঁহাকে শেষ করিয়া দিয়া তাঁহার তৎপরতা হইতে মুক্তি লাভ করিবার জন্য চেষ্টা করিতেছিল। আর তখন হইতেই সৃষ্টি হয় তাঁহার দাওয়াতে নানা ধরনের বাধা। আলুসী উল্লেখ করেন, সহীহ বর্ণনায় আসিয়াছে যে, হযরত ঈসা (আ) ইয়াহুদীদের পক্ষ থেকে অনেক ধরনের কষ্ট তথা বিপত্তির সম্মুখীন হইয়াছিলেন (আলুসী, প্রাগুক্ত, ৩খ, page ১৭৪)। এই গুলির মধ্যে নিম্নে কয়েকটির দিক আলোচনা করা হইল।
(১) ঈসা (আ)-এর ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে রটনা: হযরত ঈসা (আ) জনগণের মাঝে যে সাড়া জাগাইয়াছিলেন এবং প্রভাব বিস্তার করিয়াছিলেন উহা নষ্ট করিবার জন্য প্রথমে তাহারা তাঁহার ব্যক্তিত্বে আঘাত হানে। এই লক্ষ্যে তাহারা কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
(ক) ঈসা (আ)-এর জন্ম সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন: পূর্বেই বর্ণিত হইয়াছে, হযরত ঈসা (আ)-এর অলৌকিক জন্মকে প্রথমত ইয়াহুদীরা স্বাভাবিক ভাবে মানিয়া লইতে পারে নাই। তাই তাহারা তাঁহার মাতা সম্পর্কে খারাপ ধারণা পোষণ করে। কিন্তু ঈসা (আ) মায়ের কোলে শিশু অবস্থায়ই অলৌকিকভাবে কথা বলিয়া মায়ের পবিত্রতা ঘোষণা করিয়াছিলেন। ইহা শ্রবণ করিয়া ইয়াহুদীরা প্রাথমিক অবস্থায় নীরব হইয়া যায়। কিন্তু তাঁহার নবুওয়াত লাভের পর ইয়াহূদী নেতাদের ভণ্ডামীর সমালোচনা করায় জন্মের প্রসঙ্গটি পুনরুজ্জীবিত করে। তাহারা লোকমুখে প্রচার করিতে থাকে যে, ঈসা অবৈধ পন্থায় জন্মলাভ করিয়াছেন (নাউযুবিল্লাহ)। এই প্রসঙ্গে আল-কুরআনেও বলা হয়:
وَيُكَفِّرَهُمْ وَقَوْلِهِمْ عَلَى مَرْيَمَ بُهْتَانًا عَظِيمًا .
"এবং তাহারা অভিশপ্ত হইয়াছিল তাহাদের কুফরীর জন্য ও মারয়ামের বিরুদ্ধে গুরুতর অপবাদের জন্য" (৪: ১৫৬)।
(খ) যাদুকর হওয়ার অপবাদঃ ঈসা (আ)-এর মু'জিযা দেখিয়া ইয়াহুদীগণ হযরত ঈসা (আ)-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে যে, তিনি একজন যাদুকর। এ বিষয়টি আল-কুরআনে স্পষ্টভাবেই বলা হইয়াছে: "পরে সে (ঈসা) যখন স্পষ্ট নিদর্শনসহ উহাদিগের নিকট আসিল উহারা বলিতে লাগিল ইহা তো এক স্পষ্ট যাদু” (৬১:৬)। তালমুদসহ ইয়াহুদীদের প্রাচীন গ্রন্থাবলীতেও ঈসা (আ)-এর পরিচয়ে লেখা হইয়াছে যে, তিনি ছিলেন একজন যাদুকর (দি নিউ ইনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকা, প্রাগুক্ত, তাফসীরে মাজেদী, ২খ, page ৬৬০)।
(গ) পাগল আখ্যায়িত করা: মার্ক সুসমাচারে আসিয়াছে যে, নাসরতের যাহারা তাহাকে অস্বীকার করিয়াছিল তাহাদের মধ্যে ঈসা (আ)-এর নিকটআত্মীয় কয়েকজনও ছিল। তাহারা হযরত ঈসা (আ)-কে পাগল বলিয়া আখ্যা দিয়াছিল। তাহাদের ধারণামতে ঈসা পাগল হইয়া গিয়াছেন (দ্র. মার্ক সুসমাচার, ৩: ২১)।
(ঘ) ঈসা (আ)-কে ভূতের আছরগ্রস্ত আখ্যায়িত করাঃ ইয়াহুদীদের ধর্মীয় নেতারা তাঁহার নামে প্রচার করিতে থাকে যে, ঈসার উপর ভূত সওয়ার হইয়াছে (দ্র. মার্ক, ৩ঃ ২৪-৩০)।
(ঙ) পৌত্তলিক ও মুরতাদ আখ্যায়িত করা: ইয়াহুদীদের ধর্মগ্রন্থ তালমুদে আসিয়াছে যে, হযরত ঈসা (আ) ইয়াহুদী ধর্ম পরিত্যাগ করায় মুরতাদ হইয়া যান এবং মূর্তিপুজা করেন (ডঃ রূহাজ, আল-কানজুল মারসুদ ফি কাওয়ায়িদিত তালমুদ, page ৬৯)।
(২) অসদুদ্দেশ্যে মু'জিযা প্রদর্শনের আবদার: অধিকাংশ মুফাসসিরীনের মতে হযরত ঈসা (আ) যখন নবুওয়াত দাবি করিলেন এবং বিভিন্ন অলৌকিক নিদর্শন প্রকাশ করিতে লাগিলেন তখন বনূ ইসরাঈলীরা একগুয়েমী প্রদর্শন করিতে শুরু করিল। সাথে সাথে কিভাবে তাঁহাকে অপছন্দ করা যায় তাহার ফন্দি ফিকির করিতে থাকে। যাহাই হউক, একবার তাহারা ঈসা (আ)-কে অপ্রস্তুত করিবার জন্য বলিল, আপনি আমাদেরকে একটি বাঁদুড় পাখি তৈরি করিয়া দেন। তখন ঈসা (আ) তাহাদের জন্য সেই পাখি আল্লাহ্র অনুমোদনক্রমে সৃষ্টি করিয়াছিলেন (রাযী, প্রাগুক্ত, ৭খ, page ৫৯; আলুসী, প্রাগুক্ত, ৩খ, page ১৬৮)।
বর্তমান প্রচলিত সুসমাচারসমূহেও দেখা যায়, ইয়াহুদীরা বিশেষত ফরীশীরা হযরত ঈসা (আ)-এর অনেক মু'জিযা দেখার পরও মু'জিযা তলব করিত, যেজন্য তিনি তাহাদের উদ্দেশে বলিয়াছিলেনঃ "তোমরা আকাশের লক্ষণ বুঝিতে পার, কিন্তু কালের চিহ্ন সকল বুঝিতে পার না। এই কালের দুষ্ট ও ব্যভিচারী লোকেরা চিহ্নের অন্বেষণ করে" (মথি, ১৬: ৩-৪)।
(৩) ঠাট্টা-বিদ্রূপ: ইবন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত যে, ইয়াহুদীরা হযরত ঈসা (আ)-এর কাছে একত্র হইত এবং ঠাট্টা-বিদ্রূপ শুরু করিত। তাহারা তাঁহাকে বলিত, হে ঈসা! অমুক গত রাত্রে কি ভক্ষণ করিয়াছে আর তাহার বাড়িতে আগামী দিনের জন্য কি সঞ্চয় করিয়াছে? তখন হযরত ঈসা (আ) তাহাদেরকে সেই ব্যাপারে সংবাদ প্রদান করিতেন। আর উহা লইয়া তাহারা ঠাট্টা-বিদ্রূপে মত্ত হইত। এইভাবে অনেকক্ষণ চলিত (প্রাগুক্ত, page ১৭৪)।
(৪) দম্ভ প্রদর্শন: এমনিভাবে হযরত ঈসা (আ) কোন মু'জিযা বা কোন যুক্তি প্রদর্শন করিলে মূল বিষয়ে না যাইয়া ফরিশীরা শুধু ঠাট্টা-বিদ্রূপ করিয়াই ক্ষান্ত হইত না, বরং তাহারা দম্ভ প্রদর্শন ও গালিগালাজ করিতেও কুণ্ঠাবোধ করিত না। যেমন বার্ণাবাসের বাইবেলে উল্লেখ আছে যে, ইয়াহূদীদের প্রধান রাব্বির সঙ্গে ঈসা (আ)-এর এক বিতর্ক অনুষ্ঠিত হইয়াছিল এবং ইহাতে পরাজয় বরণ করে। তখন প্রধান রাব্বি বলিল, "এখন আমরা বুঝতে পারিয়াছি আপনার কাঁধের ওপর শয়তান সওয়ার হইয়াছে; আর আপনি একজন সুমেরীয়, আল্লাহর মনোনীত প্রধান রাব্বির প্রতি আপনার কোনো সম্ভ্রমবোধ নাই" (বার্ণাবাসের বাইবেল, page ২৪৬)।
(৫) প্রকাশ্যে কুফুরী ঘোষণা: হযরত ঈসা (আ) যখন তাঁহার দাওয়াত পেশ করেন তখন ইয়াহুদীরা সদন্তে উহা প্রত্যাখ্যান করে এবং প্রকাশ্যে কুফুরী ঘোষণা করে। আল-কুরআনে এই ধরনের একটি তথ্য স্পষ্টভাবেই আসিয়াছে:
فَلَمَّا أَحَسَّ عِيْسَى مِنْهُمُ الكُفْرَ قَالَ مَنْ أَنْصَارِي إِلَى الله . "যখন ঈসা তাহাদের অবিশ্বাস উপলব্ধি করিল তখন বলিল, আল্লাহর পথে কাহারা আমার সাহায্যকারী" (৩ঃ ৫২)?
আল্লামা তাবারী বলেন, এই আয়াতের অর্থ হইল, আল্লাহ তা'আলা যাহাদের নিকট হযরত ঈসা (আ)-কে পাঠাইয়াছিলেন, সেই বনূ ইসরাঈলের পক্ষ হইতে যখন নবুওয়াতের অস্বীকৃতি, তাঁহার বক্তব্য প্রত্যাখ্যানের মনোভাব দেখিতে পাইলেন এবং আল্লাহ্র পথে আহবানে তাহাদের পক্ষ হইতে বাধার সম্মুখীন হইলেন তখন তিনি বলিলেন, আল্লাহর পথে আমার সাহায্যকারী কে আছ? অর্থাৎ আল্লাহর প্রমাণ প্রত্যাখ্যানকারী ও তাঁহার নবীর নবুওয়াতের অস্বীকারকারী লোকদের বিরুদ্ধে আল্লাহর সাথে আমার সাহায্যকারী কে আছে (তাফসীরে তাবারী, ৫খ, page ৪১০)।
উহা হইতে বুঝা যায় যে, ইয়াহুদীদের দ্বারা হযরত ঈসা (আ)-এর দাওয়াতকে মুখের উপর প্রত্যাখ্যান করার পন্থাটি ছিল গুরুতর। তাহারা প্রকাশ্যে কুফুরীর ঘোষণা দিয়া বেড়াইত।
(৬) পাথর নিক্ষেপ: হযরত ঈসা (আ)-এর দাওয়াত প্রত্যাখ্যানকারীরা বিভিন্ন শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে ও পাথরের আঘাতে ঈসা (আ)-কে রক্ত রঞ্জিত করিয়া দেওয়ার চেষ্ট করিত। বার্ণাবাসের বাইবেলে বর্ণিত হইয়াছে যে, প্রধান রাব্বী পরাজয় বরণ করার পর হযরত ঈসা (আ)-এর প্রতি গোস্বায় ফাটিয়া পড়িল এবং বিকট চিৎকার করিয়া বলিল, "পাথর মারো এই বেঈমান লোকটিকে। সে আসলে একটা ইসমাঈলী, আর সে মূসার নিন্দা করে এবং আল্লাহ্ আইনের বিরুদ্ধাচরণ করে (বার্ণাবাসের বাইবেল, page ২৪৮)।
তাফসীরে মাজেদীতে উল্লেখ আছে যে, তখন তাঁহার উপর ছুড়িয়া মারার জন্য পাথর তুলিয়া লইল, কিন্তু যীশু অন্তর্হিত হইলেন ও ধর্মধাম হইতে বাহিরে গেলেন" (যোহন, ৮ : ৫৯)। আরও বলা হয়, "তাহারা আবার তাঁহাকে ধরিতে চেষ্টা করিল, কিন্তু তিনি তাহাদের হাত এড়াইয়া বাহির হইয়া গেলেন" (যোহন, ১০: ৩৯; তাফসীরে, মাজেদী, খ. ২, page ৬৫৯)।
(৭) জন্মভূমি হইতে বিতাড়িত করা: ইবন জারীর তাবারী সূদ্দী হইতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলিয়াছেন, হযরত ঈসা (আ) আল্লাহর নিদের্শমত দাওয়াতী কাজ আরম্ভ করিলে তাঁহার প্রতি ইসরাঈলীরা বিক্ষুব্ধ হইল এবং তাঁহাকে দেশ হইতে বহিষ্কার করিল। হযরত ঈসা (আ) ও তাঁহার মাতা স্বদেশ হইতে বিতাড়িত হইয়া দেশে দেশে ঘুরিতে থাকেন (তাফসীরে তাবারী, ৫খ, page ৪১০)। হযরত ঈসা (আ) দুঃখ করিয়া বলিয়াছিলেন, নিজের গ্রাম ও নিজের বাড়ি ছাড়া সমস্ত জায়গাতেই নবীরা সম্মান পান (মথি, ১৩ঃ ৫৭)।
(৮) শয়তান কর্তৃক প্ররোচনা: হযরত ঈসা (আ)-এর দাওয়াতের ক্ষেত্রে আরেকটি বাঁধা ছিল শয়তান কর্তৃক প্ররোচনা। ইবন কাছীর বর্ণনা করেন যে, হযরত ঈসা (আ) বায়তুল মুকাদ্দাসে সালাত আদায় করেন। সেখানে হইতে ফিরিবার পথে যখন তিনি এক গিরিপথে ছিলেন তখন শয়তান তাঁহাকে আটকাইয়া বিভিন্ন প্রস্তাব দেওয়া শুরু করিল এবং বলিল, হে ঈসা! আপনার খোদার বান্দা হওয়া উচিত নহে। শয়তান এই বক্তব্য দ্বারা বারবার পীড়াপীড়ি করিবার পর আল্লাহর কাছে সাহায্য চাহিলেন। তখন জিবরাঈল ও মীকাঈল আসিলেন আর দেখিলেন, ইবলীস তাহাকে পথে আটকাইয়া রাখিয়াছে। তখন জিবরাঈল (আ) তাহার দুই ডানা দ্বারা ইবলীসকে এক উপত্যকায় নিক্ষেপ করিলেন। তখন আবার শয়তান তাঁহার নিকট ফিরিয়া আসিল এবং ঈসাকে বলিতে লাগিল, আমি একটু আগেই আপনাকে সংবাদ দিলাম যে, আপনি একজন বান্দা হওয়া সমীচীন নহে, আর আপনি ক্রোধান্বিত হইলেন। আর এই ক্রোধ কোন বান্দার ক্রোধ হইতে পারে না। কারণ আপনি রাগ করার সময় কি অবস্থা দাঁড়াইয়াছিল তাহা তো আপনি দেখিলেন। তাই আমি আপনাকে একটি বিষয়ে আহ্বান করিব। তাহা হইল, আপনার জন্য আমি শয়তানদেরকে আদেশ করিব এবং তাহারা আপনার অনুসরণ করিবে। অতঃপর লোকজন যখন দেখিবে শয়তানরা আপনার অনুসরণ করিতেছে তখন তাহারা আপনার 'ইবাদত করিবে। আর আমি ইহা বলিতেছি না যে, আপনি একাই ইলাহ, আপনার সাথে আর কোন ইলাহ নাই; বরং আল্লাহ হইবেন আসমানে ইলাহ, আপনি হইবেন যমীনে ইলাহ। ঈসা (আ) আল্লাহর সাহায্য চাহিলেন। তখন ঈসরাফীল (আ), জিবরাঈল ও মীকাঈল (আ) তাঁহাকে সাহায্য করিলেন। আর ইবলীসও ঐ প্ররোচনা হইতে বিরত হইল (ইব্ন কাছীর, প্রাগুক্ত, ২খ., page ৭৪-৭৫)। মথি সুসমাচারেও এই মর্মের একটি ঘটনার উল্লেখ রহিয়াছে (দ্র. মথি, ৩ : ৬-১২)।
(৯) অনুসারীদেরকে বাধা দেওয়া : যখন হাজার হাজার লোক হযরত ঈসা (আ)-এর অনুসরণ করিতে শুরু করিল তখন ইয়াহুদী ধর্মীয় নেতারা হিংসা-বিদ্বেষে, ক্ষোভে-ক্রোধে উন্মত্ত হইয়া গেল। তাহারা তখন শুধু হযরত ঈসা (আ)-কেই বাধা দেয় নাই, বরং তাঁহার অনুসারীদেরকেও বাধা দিয়াছিল। যোহন সুসমাচারে আসিয়াছে যে, ইয়াহূদী নেতারা আগেই ঠিক করিয়াছিল যে, কেহ যদি ঈসাকে মসীহ বলিয়া স্বীকার করে তবে তাহাকে সমাজ হইতে বাহির করিয়া দেওয়া হইবে (যোহন, ৯:২২)।
এই তথ্য প্রমাণ করে যে, ইয়াহুদী সন্ত্রাসীরা জনমনে ভীতির সঞ্চার করিয়াছিল, যেন তাহারা ঈসা (আ)-এর অনুসরণ করিতে সাহস না পায়। তাহারা আল্লাহ্র রাস্তায় বাধা সৃষ্টি করিয়াছিল। তাই ইয়াহুদীদের সম্পর্কে আল-কুরআনে বলা হইয়াছে:
فَبِظُلْم مِنَ الَّذِينَ هَادُوا حَرَّمْنَا عَلَيْهِمْ طَيِّبَت أُحِلَّتْ لَهُمْ وَيَصَدِهِمْ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ كَثِيرًا .
"ভাল ভাল যাহা ইয়াহুদীদের জন্য বৈধ ছিল তাহা উহাদের জন্য অবৈধ করিয়াছি-তাহাদের সীমালংঘনের জন্য এবং আল্লাহ্ পথে অনেককে বাধা দেওয়ার জন্য" (৪:১৬০)।
(১০) হত্যার ষড়যন্ত্র : হযরত ঈসা (আ)-এর দাওয়াত চতুর্দিকে ছড়াইয়া পড়িল। ইয়াহুদীরা দেখিল যে, কোনভাবেই ঈসা (আ)-কে দাওয়াতী কাজ হইতে বিরত করা যাইতেছে না। তখন তাহারা তাঁহাকে মারিয়া ফেলার ষড়যন্ত্র করে। এই লক্ষ্যে প্রথমে তাহারা গোপন বৈঠক করে। মথি সুসমাচারে আসিয়াছে, সেই সময় মহা ইমাম কাইয়াফার বাড়ীতে প্রধান ইমামেরা ও ইয়াহুদীদের বৃদ্ধ নেতারা একত্র হইল এবং ঈসা (আ)-কে ধরিয়া আনিয়া মারিয়া ফেলিবার ষড়যন্ত্র করিল (দ্র. মথি, ২৬:৩-৪)।
এই ক্ষেত্রে দ্বিতীয় পদক্ষেপ হিসাবে তাহারা গোয়েন্দা নিয়োগ করে, তাঁহাকে বিভিন্ন লোভ দেখাইয়া আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে। মথি সুসমাচারে আসিয়াছে: তখন সেই বারজন হাওয়ারীর মধ্যে এহুদা ইস্কারিয়োৎ নামের ব্যক্তিটি প্রধান ইমামের নিকট গিয়া বলিল, 'ঈসাকে আপনাদের হাতে ধরাইয়া দিলে আপনারা আমাকে দিবেন। প্রধান ইমামেরা তিরিশটা রূপার টাকা গুনিয়া দিল তাহাকে। তাহার পর হইতেই এহুদা ঈসাকে ধরাইয়া দিবার জন্য সুযোগ খুঁজিতে লাগিল (দ্র. মথি, ২৬:১৪-১৬)।
এই ক্ষেত্রে তৃতীয় পদক্ষেপ হিসাবে তাহারা হযরত ঈসা (আ)-কে গ্রেফতার করার জন্য চেষ্টা চালায়। বারবার এই, প্রচেষ্টা অব্যাহত ছিল। হযরত ঈসা (আ) এই বিষয়ে আল্লাহ্র পক্ষ হইতে অবহিত হইয়াছিলেন, যেজন্য বারবার তিনি তাঁহার অনুসারীবৃন্দকে ঐ ব্যাপারে আগাম খবর বলিয়াছিলেন। যাহাই হউক, এই দুনিয়ায় তাঁহার নবুওয়াতের শেষ সময়ে তিনি গৎসেমানি বাগানে একটা জায়গায় তাঁহার সাথীবৃন্দসহ রাত্রে আশ্রয় লইলেন। সেই সময়ে পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে ইয়াহুদা আসখারিয়তী রোমান সৈন্যদেরকে লইয়া ছোরা ও লাঠিসহ হযরত ঈসা (আ)-এর অবস্থান স্থলে পৌঁছিয়া গেল। সুসমাচারের বর্ণনানুসারে তাহাদের আগমন সম্পর্কে হযরত ঈসা (আ) আগেই টের পাইয়া গিয়াছিলেন। তাই তাঁহার সাথীরর্গ ঘুমাইয়া গেলেও তিনি তাহাদের মধ্যে পিতর, জেমস ও যোহনকে লইয়া কিছুটা জাগ্রত ছিলেন। পরে তিনি কিছু দূরে গিয়া মাটিতে সিজদায় পড়িয়া আল্লাহ্র দরবারে কান্নাকাটি করিতে লাগিলেন এবং আসন্ন বিপদ হইতে রক্ষার জন্য আল্লাহ্র কাছে সাহায্য চাহিলেন (দ্র. মথি, ২৬: ৩৬-৩৯)।
পরে তিনি তাঁহার সাথীবর্গের কাছে ফিরিয়া আসিলেন। আবার মুনাজাত করিতে লাগিলেন। ইয়াহুদা পূর্বেই সৈনিকদেরকে বুঝাইয়া আনিয়াছিল যে, আমি সেখানে গিয়া যাহাকে চুম্বন দিব তিনিই ঈসা। আর ইয়াহুদা সেখানে আসিয়া তাহাই করিল। বাইবেলের বর্ণনামতে সঙ্গে সঙ্গে সৈনিকরা আসিয়া তাহাকে ধরিল।
এই ক্ষেত্রে চতুর্থ পদক্ষেপ হিসাবে ঈসাকে গ্রেফতার করার পর ইয়াহুদী মহাসভার সামনে তাঁহার বিচার নাটকের আয়োজন করা হয় এবং এক পর্যায়ে তাহারা ঈসার বিচারের জন্য তথা হত্যা করার সিদ্ধান্ত লইয়াই রোমীয় শাসনকর্তা পীলাতের হাতে তাঁহাকে সমর্পণ করে। বার্ণাবাসের বাইবেলের বর্ণনা অনুসারে, জুদানসহ সেনাবাহিনী যখন হযরত ঈসা (আ)-এর আস্তানায় পৌছিল তখন লোকের সমাগম অনুভব করিয়া ঈসা (আ) ঘরের ভিতরে আসিয়া ঢুকিলেন। তখনি আল্লাহ পাক তাঁহাকে ফেরেশতাদের মাধ্যমে সেই ঘর হইতে আসমানে তুলিয়া নেন এবং ঈসা (আ)-এর চেহারায় বিশ্বাসঘাতক জুদাস তথা ইয়াহুদার রূপান্তর ঘটে। আর সৈন্যরা তাহাকে গ্রেফতার করে (বার্ণাবাসের বাইবেল, অধ্যায় নং ২১৫-২১৬, page ২৫৪-২৫৫)। যাহাই হউক, সৈন্যদের কর্তৃক গ্রেফতার নাটক হইতে ইয়াহুদী মহাসভার সামনে বিচারকার্য এবং পরবর্তীতে পিলাতের হাতে হস্তান্তর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে যে কোন সময়ে হযরত ঈসা (আ)-কে উত্তোলন করা হইতে পারে। প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে আল্লাহই অধিক জ্ঞাত।