📄 অলৌকিক নিদর্শন উপস্থাপন
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হযরত ঈসা (আ)-কে বৈচিত্র্যময় অলৌকিক নিদর্শন দান করিয়াছিলেন। হযরত ঈসা (আ) সেই নিদর্শনগুলিকে দাওয়াতকে গ্রহণযোগ্য করিয়া তুলিবার ক্ষেত্রে ব্যবহার করিতেন। মানুষ হযরত ঈসা (আ)-এর মু'জিযাসমূহ দেখিয়া তাঁহার প্রতি ঈমান আনিত।
📄 উত্তম আদর্শ উপস্থাপন
হযরত ঈসা (আ) ছিলেন তাঁহার সমাজে একজন আদর্শ মানুষের প্রতিচ্ছবি। তিনি ছিলেন জনদরদী, তিনি ছিলেন আর্কষণীয় ব্যক্তিত্ব। কথাবার্তায় ও আচার-আচরণে, তিনি মানুষের হৃদয়ে স্থান করিয়া লইতেন। সুসমাচারসমূহে এই ব্যাপারে প্রচুর দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।
📄 কাহিনী ও উপমা-উদাহরণের মাধ্যম দাওয়াত
হযরত ঈসা (আ)-এর দাওয়াত উপস্থাপনের আরেকটি কৌশল ছিল, তিনি লোকজনকে বুঝাইবার জন্য রূপকার্থে বিভিন্ন কিসসা-কাহিনী, উপমা-উদাহরণ ব্যবহার করিতেন। মথি সুসমাচারে বর্ণিত হইয়াছে যে, ঈসা (আ)-এর হাওয়ারীগণ তাঁহাকে ইহার রহস্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন। তিনি উহার উত্তরে বলিয়াছিলেন, আমি তাহাদের জন্য দৃষ্টান্ত দ্বারা কথা বলিতেছি। কারণ তাহারা দেখিয়াও দেখে না, শুনিয়াও শুনে না এবং বুঝিয়াও বুঝেও না (দ্র. মথি, ১৩: ১৩)।
অর্থাৎ খোদায়ী রাজ্যের বিভিন্ন রহস্য ও নিগুঢ় তত্ত্ব বুঝাইবার জন্য তিনি উপমা-উদাহরণ, কিসসা-কাহিনীর ব্যবহার করিয়াছেন, যাহাতে তাহাদের অন্তর্দৃষ্টি খুলিয়া যায় এবং বিষয়গুলি সম্পর্কে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জনসহ স্মৃতিতে ধরিয়া রাখা সহজতর হয়। মথি সুসমাচারে বিভিন্ন উদাহরণের অবতারণা করা হইয়াছে। যেমন ফল দ্বারাই গাছ চেনা যায় (১২: ৩৩-৩৬)।
এক চাষীর দৃষ্টান্ত (১৩: ১-৮), গমের মধ্যে শ্যামা ঘাসের দৃষ্টান্ত (১৩ঃ ২৪-৩০); সরিষা দানা ও খামির দৃষ্টান্ত (১৩: ৩১-৩৪), আঙুরক্ষেতের মজুরদের গল্প (২০: ১-১৬), আঙুর ক্ষেতে চাষীদের দৃষ্টান্ত (২১: ৩৩-৪৪), বিবাহভোজের দৃষ্টান্ত (২২: ১-১৩), দশ মেয়ের গল্প (২৫: ১-১৩), তিনজন গোলামের গল্প (২৫: ১৪-৩০) ইত্যাদি।
মার্ক, লুক ও যোহন সুসমাচারে কয়েকটি গল্প উল্লেখ করা হইয়াছে (দ্র. ৪: ১-৯; ৪: ২৬-২৯; ৪: ৩০-৩৪; ১২: ১-১২; ৮:৪-৮; ১০: ৩০-৩৭; ১২: ১৩-২৫; ১৩: ১৮০২১; ১৪: ১৫-২৫; ১৫:১-৭; ১৬৪ ৮-১০; ১৫: ১১-৩২; ১৬: ১-১৮; ১৬৪ ১৯-৩১; ১০: ১২-২৭; ২০ : ৯-১৮; ৪:৩৫-৩৮; ১০: ১-১৫; ১৫:১-১৭।
📄 ইয়াহুদীদের দণ্ড হ্রাসের প্রচেষ্টা চালানো
হযরত ঈসা (আ) কলহ-দ্বন্ধে লিপ্ত বানু ইসরাঈল জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করিতে চেষ্টা করিয়াছিলেন। বানূ ইসরাঈলের এলাকা ভ্রমণ করিয়া অত্যন্ত হিকমতের সহিত বুঝাইবার চেষ্টা করিয়াছিলেন। যোহন সুসমাচারে উল্লেখ করা হইয়াছে, ঈসা (আ) সমিরীয় প্রদেশে আসিয়াছিলেন। সেইখানে তাহার দাওয়াত দেওয়ার পর ঈসা (আ)-এর উপর তাহারা ঈমান আনিয়াছিল (দ্র. যোহন, ১:৪০)।
বনী ইসরাঈলের মধ্যে ঈসা (আ)-এর ঐক্যের আহবানে ও তাহাদের মুক্তির জন্য হিকমতের বিষয়টি আল-কুরআনেও স্পষ্টভাবে আসিয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে:
وَلَمَّا جَاءَ عِيسَى بِالْبَيِّنَتِ قَالَ قَدْ جِئْتُكُمْ بِالْحِكْمَةِ وَلِأُبَيِّنَ لَكُمْ بَعْضَ الَّذِي تَخْتَلِفُونَ فِيهِ فَاتَّقُوا اللَّهَ واطيعون .
"ঈসা যখন স্পষ্ট নিদর্শনসহ আসিল, সে বলিয়াছিল, আমি তো তোমাদের নিকট আসিয়াছি প্রজ্ঞাসহ এবং তোমরা যে বিষয়ে মতভেদ করিতেছ, তাহা স্পষ্ট করিয়া দিবার জন্য। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমাকে অনুসরণ কর" (৪৩:৬৩)।
ইয়াহুদীদের দণ্ড হ্রাসের প্রচেষ্টা চালানো: বানু ইসরাঈল আল্লাহর কিছু কিছু বাণী বিকৃত করিয়া দাবি করিতেছিল যে, সৃষ্টিকর্তা একমাত্র তাহাদের কল্যাণেই কাজ করেন। তাহারাই আল্লাহ্ নির্বাচিত জাতি। গোটা দুনিয়ার মালিক তাহারাই। এসকল কথা তাহাদের মৌখিক বাণী। তালমুদে আরো ব্যাপকভাবে আসিয়াছে যাহার মূল উৎস পুরাতন নিয়মেও আছে বলিয়া তাহারা ধারণা করিতে থাকে। যেমন লেবীয় পুস্তকে আসিয়াছে, আমি সদাপ্রভু তোমাদের ঈশ্বর! আমি অন্য জাতি সকল হইতে তোমাদিগকে পৃথক করিয়াছি (লেবীয় পুস্তক, ২০ঃ ২৪)।
এই সমস্ত তত্ত্বকথা হইতে ইয়াহূদীদের মাঝে প্রচণ্ড জাতীয় দন্ত সৃষ্টি হয়। আল্লাহ্ প্রতি তাহাদের জাতীয় ভ্রান্ত চেতনা হইতে সৃষ্টি হয় বিভিন্ন বিভ্রান্তিমূলক চিন্তা-চেতনা। শত পাপাচারে লিপ্ত হওয়ার পরও তাহারা নিজেদেরকে দোষী মনে করিত না। এই ধারণার কথা আল-কুরআনেও বর্ণিত হইয়াছে:
ذلكَ بِأَنَّهُمْ قَالُوا لَنْ تَمَسَّنَا النَّارُ الأَ أَيَّامًا مَّعْدُودَت وَغَرَّهُمْ فِي دِينِهِمْ مَا كَانُوا يَفْتَرُونَ
"এইহেতু যে, তাহারা বলিয়া থাকে, দিন কতক ব্যতীত আমাদিগকে অগ্নি স্পর্শ করিবে না। তাহাদের নিজেদের দীন সম্বন্ধে তাহাদের মিথ্যা উদ্ভাবন তাহাদিগকে প্রবঞ্চিত করিয়াছে” (৩ঃ ২৪)।
সুতরাং তাহাদের জীবন চলার পথ বক্র হইয়া গিয়াছিল। তাই হযরত ঈসা (আ) তাহাদেরকে সিরাতুল মুসতাকীম অবলম্বনের দাওয়াত দিয়াছিলেন। তেমনিভাবে তাকওয়া তথা আল্লাহভীতি ও পরহেজগারীর দাওয়াতকেও উহার সহিত যুক্ত করিয়াছেন। এইজন্য আল-কুরআনে সূরা যুখরুফে হযরত ঈসা (আ)-এর দাওয়াত উল্লেখ করিতে গিয়া তাকওয়া ও সিরাতুল মুসতাকীমের দাওয়াত-এর কথা উল্লেখ করা হইয়াছে (দ্র. সূরা যুখরুফ : ৬৩-৬৪)। কেননা তাহাদের এই দম্ভ নিরসন করিতে হইলে যেমনি দরকার ইবাদত-এর তেমনিভাবে প্রায়োজন তাকওয়ার। হযরত ঈসা (আ) তাহাদের আমল না করিয়াই আল্লাহ্ প্রিয়পাত্র হওয়ার দাবিকে বিভিন্নভাবে খণ্ডন করিয়াছিলেন, যাহা প্রচলিত সুসমাচারসমূহেও উল্লিখিত হইয়াছে (দ্র. যোহন, ৮ : ৩৮-৪৭)।
এমনিভাবে হযরত ঈসা (আ) ব্যাখ্যা করেন যে, তাহাদের এই রাজ্য এবং আল্লাহ কর্তৃক নির্বাচন যাহা তাহারা দাবি করিতেছে অচিরেই তাহা হস্তচ্যুত হইবে তাহাদেরই কর্মফল স্বরূপ। ঈসা (আ) বলিয়াছিলেন, আমি তোমাদিগকে কহিতেছি, তোমাদের নিকট হইতে ঈশ্বরের রাজ্য কাড়িয়া লওয়া হইবে এবং এমন এক জাতিকে দেওয়া হইবে, যে জাতি তাহার ফল দিবে (মথি, ২১ : ৪৩)।
এইভাবে তিনি তাহাদের দম্ভ হ্রাস করিয়া সঠিক পথের সন্ধান দিতে চেষ্টা করিয়াছিলেন। হযরত ঈসা (আ)-এর দাওয়াত উপস্থাপনার আরও কয়েকটি কৌশলগত দিক রহিয়াছে যাহা তাহার শিক্ষার মূলে নিহিত। তন্মধ্যেঃ
(১) বাহ্যিকতা ও আনুষ্ঠানিকতার উপর নির্ভর না করিয়া শরীআতের মূল চেতনা আকড়াইয়া ধরা এবং তাহার বিধিবিধান নিষ্ঠার সহিত পালন করা।
(২) আখেরাতের জিন্দিগীর পুনরুজ্জীবিত করা।
(৩) তাকওয়ার অনুভূতি হৃদয়মূলে সুদৃঢ় করিয়া দেওয়া।
(৪) ইয়াহূদীদিগকে বস্তুবাদী হইতে ফিরাইয়া বেহেস্তী জিন্দেগীরমুখী করা।
(৫) ইসরাঈলী সামাজে অবহেলিত ও নির্যাতিত ব্যক্তিদের গুরুত্ব পুনরুদ্ধার করা।
(৬) হতাশাগ্রস্ত, বিপদগ্রস্ত এবং পীড়িতদের সাহায্য করা।
(৭) তাহার দাওয়াতকে পূর্ববর্তী দাওয়াতের সহিত সম্পর্কিত করা এবং সত্যায়ন করা।
(৮) আধ্যাত্মিক আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার নীতির উপর গুরুত্ব আরোপ করা।
(১০) দাওয়াত দানকারীর জন্য নিজেকে সমস্ত সন্দেহের উর্ধ্বে রাখা।
(১১) তাঁহার অবর্তমানে অনুসারিগণ যাহাতে হতাশ ও নিরাশ হইয়া না পড়ে, সেইজন্য পরবর্তী পয়গম্বরের সুসংবাদ দান।
মোটকথা, হযরত ঈসা (আ) তাঁহার দাওয়াত উপস্থাপনে উপরিউক্ত কৌশলগত নীতিসমূহ অবলম্বন করিতেন। তাঁহার দাওয়াতের আর একটি বৈশিষ্ট্য ছিল ভ্রাম্যমাণতা। তিনি নির্দিষ্ট কোন স্থানে বাস না করিয়া গ্রাম গঞ্জে ঘুরিয়া ঘুরিয়া লোকজনকে নসীহত করিতেন, শিক্ষা দিতেন, আসমানী রাজ্যের সুসংবাদ দিতেন। তিনি তাঁহার স্বল্পকালীন নবুওয়াতী জীবনে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনায় এমন এক দল সহচর বা হাওয়ারী তৈয়ারি করিয়া গিয়াছিলেন যাহারা তাঁহার শিক্ষা প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ইয়াহুদী ষড়যন্ত্র ও রোমানদের অত্যাচারের মুখেও তাহার দাওয়াত থামিয়া থাকে নাই, যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে গোপনীয়ভাবে চলমান ছিল। হযরত ঈসা (আ)-এর পক্ষ হইতে যে দৃঢ়তা তাঁহার সাথীরা লাভ করিয়াছিলেন, শত বাধার মুখেও তাহা পরিত্যাগ করেন নাই। অতএব হযরত ঈসা (আ)-এর দাওয়াত স্বল্পকালীন হইলেও তাহার প্রভাব ছিল সুগভীর ও সুদূর প্রসারী।