📄 দাওয়াত উপস্থাপনের বৈচিত্র
তিনি অন্যান্য নবী-রাসূলগণের ন্যায় আল্লাহ্ দিকে দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করিয়াছেন। তাহা নিম্নরূপ: উৎসাহ প্রদান ও ভীতি প্রদর্শন-এর পন্থায় দাওয়াত প্রদান। যেমন কুরআন কারীমে আসিয়াছে:
فَأَمَّا الَّذِينَ كَفَرُوا فَأَعَذِّبْهُمْ عَذَابًا شَدِيدًا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَمَا لَهُمْ مِنْ نَصِرِينَ .
"আর যাহারা সত্য প্রত্যাখ্যান করিয়াছে আমি তাহাদিগকে ইহকাল ও পরকালে কঠোর শাস্তি প্রদান করিব এবং তাহাদের কোন সাহায্যকারী নাই" (৩ঃ ৫৬)।
وَأَمَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّلِحَتِ فَيُوَفِّيْهِمْ أَجُورَهُمْ وَاللَّهُ لا يُحِبُّ الظَّلِمِينَ .
"আর যাহারা ঈমান আনিয়াছে এবং সৎকার্য করিয়াছে তিনি তাহাদের প্রতিফল পুরাপুরিভাবে প্রদান করিবেন। আল্লাহ জালিমদিগকে পছন্দ করেন না" (৩:৫৭; আরও দ্র. ৫: ৭২)।
বর্তমান ইনজীল গ্রন্থেও অনেক ইংগিত পাওয়া যায় যে, ঈসা (আ) লোকদিগকে স্বর্গ ও আসমানী রাজ্যের সুসংবাদ প্রদান করিতেন (দ্র. মথি ২৪ ৪ ১৩-৪৪)।
তিনি দুইভাবে দাওয়াত প্রদান করিতেন: উৎসাহ ও ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে। তবে তাঁহার দাওয়াতে সুসংবাদ প্রাধান্য পাইত। এইজন্যই তাঁহার কিতাবের নামকরণ করা হইয়াছে ইনজীল অর্থাৎ সুসংবাদ। সম্ভবত এই কারণেই বর্তমান নাসারাগণ তাহাদের দাওয়াতকে সুসমাচার হিসাবে অভিহিত করে।
ঈসা (আ)-এর বয়স যখন ১২ বৎসর তখন জেরুসালেমে যান এবং সেখানে বায়তুল মুকাদ্দাসে ইয়াহুদী পণ্ডিতদের সাথে যুক্তিতর্কে লিপ্ত হইয়াছিলেন। আর তাহারা বালক ঈসা (আ)-এর বুদ্ধিমত্তা ও বিচার-বিশ্লেষণে আশ্চর্য বোধ করে (দ্র. লুক সুসমাচার, ৪-৪৭)। মুসলিম ঐতিহাসিকগণও ইহা উল্লেখ করিয়াছেন (মুহাম্মাদ আলী সাবৃনী, সাফওয়াতুত তাফাসীর, page ১৯৭)।
আল-কুরআনের বর্ণনামতে পরিণত বয়সেও তিনি কথা বলিবেন, ইহার তাৎপর্য হইল, তিনি নবুওয়াত লাভ করার পরও যুক্তিতর্কের সেই ধারা অব্যাহত থাকিবে। এইজন্য বর্তমান সুসমাচার-সমূহে ঈসা (আ)-এর দাওয়াত কথোপকথন পদ্ধতিতে ভরপুর। তিনি তাঁহার সাথীদের প্রশ্ন করিতেন এবং পরে নিজেই উহার উত্তর দিতেন। এমনিভাবে তাঁহার সাথীগণও তাঁহাকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করিতেন, তিনি তাহার উত্তর দিতেন। ইহাই ছিল তাঁহার দাওয়াত উপস্থাপনের প্রধান কৌশল তথা হিকমত।
📄 অলৌকিক নিদর্শন উপস্থাপন
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হযরত ঈসা (আ)-কে বৈচিত্র্যময় অলৌকিক নিদর্শন দান করিয়াছিলেন। হযরত ঈসা (আ) সেই নিদর্শনগুলিকে দাওয়াতকে গ্রহণযোগ্য করিয়া তুলিবার ক্ষেত্রে ব্যবহার করিতেন। মানুষ হযরত ঈসা (আ)-এর মু'জিযাসমূহ দেখিয়া তাঁহার প্রতি ঈমান আনিত।
📄 উত্তম আদর্শ উপস্থাপন
হযরত ঈসা (আ) ছিলেন তাঁহার সমাজে একজন আদর্শ মানুষের প্রতিচ্ছবি। তিনি ছিলেন জনদরদী, তিনি ছিলেন আর্কষণীয় ব্যক্তিত্ব। কথাবার্তায় ও আচার-আচরণে, তিনি মানুষের হৃদয়ে স্থান করিয়া লইতেন। সুসমাচারসমূহে এই ব্যাপারে প্রচুর দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।
📄 কাহিনী ও উপমা-উদাহরণের মাধ্যম দাওয়াত
হযরত ঈসা (আ)-এর দাওয়াত উপস্থাপনের আরেকটি কৌশল ছিল, তিনি লোকজনকে বুঝাইবার জন্য রূপকার্থে বিভিন্ন কিসসা-কাহিনী, উপমা-উদাহরণ ব্যবহার করিতেন। মথি সুসমাচারে বর্ণিত হইয়াছে যে, ঈসা (আ)-এর হাওয়ারীগণ তাঁহাকে ইহার রহস্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন। তিনি উহার উত্তরে বলিয়াছিলেন, আমি তাহাদের জন্য দৃষ্টান্ত দ্বারা কথা বলিতেছি। কারণ তাহারা দেখিয়াও দেখে না, শুনিয়াও শুনে না এবং বুঝিয়াও বুঝেও না (দ্র. মথি, ১৩: ১৩)।
অর্থাৎ খোদায়ী রাজ্যের বিভিন্ন রহস্য ও নিগুঢ় তত্ত্ব বুঝাইবার জন্য তিনি উপমা-উদাহরণ, কিসসা-কাহিনীর ব্যবহার করিয়াছেন, যাহাতে তাহাদের অন্তর্দৃষ্টি খুলিয়া যায় এবং বিষয়গুলি সম্পর্কে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জনসহ স্মৃতিতে ধরিয়া রাখা সহজতর হয়। মথি সুসমাচারে বিভিন্ন উদাহরণের অবতারণা করা হইয়াছে। যেমন ফল দ্বারাই গাছ চেনা যায় (১২: ৩৩-৩৬)।
এক চাষীর দৃষ্টান্ত (১৩: ১-৮), গমের মধ্যে শ্যামা ঘাসের দৃষ্টান্ত (১৩ঃ ২৪-৩০); সরিষা দানা ও খামির দৃষ্টান্ত (১৩: ৩১-৩৪), আঙুরক্ষেতের মজুরদের গল্প (২০: ১-১৬), আঙুর ক্ষেতে চাষীদের দৃষ্টান্ত (২১: ৩৩-৪৪), বিবাহভোজের দৃষ্টান্ত (২২: ১-১৩), দশ মেয়ের গল্প (২৫: ১-১৩), তিনজন গোলামের গল্প (২৫: ১৪-৩০) ইত্যাদি।
মার্ক, লুক ও যোহন সুসমাচারে কয়েকটি গল্প উল্লেখ করা হইয়াছে (দ্র. ৪: ১-৯; ৪: ২৬-২৯; ৪: ৩০-৩৪; ১২: ১-১২; ৮:৪-৮; ১০: ৩০-৩৭; ১২: ১৩-২৫; ১৩: ১৮০২১; ১৪: ১৫-২৫; ১৫:১-৭; ১৬৪ ৮-১০; ১৫: ১১-৩২; ১৬: ১-১৮; ১৬৪ ১৯-৩১; ১০: ১২-২৭; ২০ : ৯-১৮; ৪:৩৫-৩৮; ১০: ১-১৫; ১৫:১-১৭।