📄 জন্মের চল্লিশতম দিবসে বায়তুল মুকাদ্দাসে আগমন
হযরত ঈসা (আ) ইয়াহুদী সমাজে লালিত-পালিত হন। মূসা (আ)-এর শরীয়ত মতে ইয়াহুদীদের প্রথা অনুসারে কোন সন্তানের চল্লিশ দিন বয়স হইলে বরকতের দোআ ও পাক-পবিত্র হইবার জন্য বায়তুল মুকাদ্দাসে লইয়া যাওয়া হইত। সুতরাং হযরত মারয়াম (আ) স্বীয় সন্তান ঈসা (আ)-এর জন্মের চল্লিশ দিনে তাঁহাকে লইয়া বায়তুল মুকাদ্দাসে গেলেন (লুক, ২: ২২-২৪)।
সম্ভবত তখনই সর্বপ্রথম ঈসা (আ)-কে জনসম্মুখে আনা হইয়াছিল এবং তাহাদের সামনে মারয়াম (আ) বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হইয়াছিলেন। আর তখনই ঈসা (আ) মায়ের পক্ষে ও নিজের পরিচয় দিতে কথা বলিয়াছিলেন। আর তখনই এই বিষয়টি ইয়াহুদী সমাজে লোকমুখে প্রচারিত হইয়া যায়। কেহ কেহ সন্দেহ করিলেও ইবাদতখানায় যাহারা মারয়াম (আ)-এর পূত-পবিত্রতা ও ইবাদত পর্যবেক্ষণ করিয়াছে তাহারা সেই অলৌকিক জন্মে বিশ্বাস করিয়াছে, এবং ঈসা (আ)-এর প্রতিও উচ্চ ধারণা পোষণ করিয়াছে। কেহ কেহ ভাবিয়াছে এই সন্তান ভবিষ্যতে মহান কেহ হইবেন। বর্ণিত আছে, জেরুসালেমে সামাউন নামে একজন ধার্মিক ও খোদাভক্ত লোক ছিলেন। একজন মাসীহ প্রেরণের মাধ্যমে আল্লাহ পাক কখন ইসরাঈলীদের দুঃখ দূর করিবেন সেই সময়ের জন্য তিনি অপেক্ষা করিতেছিলেন। তিনি আল্লাহর ইবাদতে প্রচণ্ডভাবে মশগুল থাকার কারণে ইলহামের মাধ্যমে জানিতে পারিয়াছিলেন যে, তিনি তাহার মৃত্যুর পূর্বেই প্রতিশ্রুত মাসীহকে দেখিতে পাইবেন। আর ঈসা (আ)-কে যেদিন বায়তুল মুকাদ্দাসে লইয়া যাওয়া হয় সামউন নামের সেই ব্যক্তিটিও সেই দিন সেইখানে উপস্থিত ছিলেন। বর্ণিত আছে যে, তিনি ঈসা (আ)-কে কোলে লইয়া দোআ করেন এবং তিনিই যে প্রতিশ্রুত মাসীহ সেই ব্যাপারে মারয়াম (আ)-কে অবহিত করেন (লূক, ২:৩৪-৩৫)।
📄 হযরত ঈসা (আ)-এর মু'জিযা
হযরত ঈসা (আ)-এর নবুওয়াতের প্রমাণ স্বরূপ ও দাওয়াতী কাজে সহায়তার নিমিত্ত আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁহাকে বিভিন্ন রকম মু'জিযা প্রদান করিয়াছিলেন। ইহার সংখ্যা ছিল প্রচুর (ডঃ মুস্তফা সিবাঈ, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ, page ২২)। আল-কুরআনের বিভিন্ন স্থানে ঈসা (আ)-এর সেইসব মুজিযার কথা আলোচিত হইয়াছে। এই প্রসঙ্গে হযরত ঈসা (আ)-এর উক্তি উদ্ধৃত হইয়াছে :
إِنِّي قَدْ جِئْتُكُمْ بِآيَةٍ مِّنْ رَّبِّكُمْ إِنِّي اخْلُقُ لَكُمْ مِّنَ الطَّيْنِ كَهَيْئَةِ الطَّيْرِ فَانْفُخُ فِيْهِ فَيَكُونُ طَيْرًا بِإِذْنِ اللَّهِ وَأَبْرِئُ الْأَكْمَهَ وَالْأَبْرَصَ وَأَحْيِ الْمَوْتَى بِإِذْنِ اللهِ وَأُنَبِّئُكُمْ بِمَا تَأْكُلُونَ وَمَا تَدَّخِرُونَ فِي بُيُوتِكُمْ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةً لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ .
"আমি তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হইতে তোমাদের নিকট নিদর্শন লইয়া আসিয়াছি। আমি তোমাদের জন্য কর্দম দ্বারা একটি পক্ষী সদৃশ আকৃতি গঠন করিব; অতঃপর আমি উহাকে ফুৎকার দিব; ফলে আল্লাহ্র হুকুমে উহা পক্ষী হইয়া যাইবে। আমি জন্মান্ধ ও কুষ্ঠ ব্যাধিগ্রস্তকে নিরাময় করিব এবং আল্লাহর হুকুমে মৃতকে জীবিত করিব। তোমরা তোমাদের গৃহে যাহা আহার কর এবং মওজুদ কর তাহা তোমাদিগকে বলিয়া দিব। তোমরা যদি মু'মিন হও তবে ইহাতে তোমাদের জন্য নিদর্শন রহিয়াছে” (৩: ৪৯)।
إِذْ قَالَ اللَّهُ يُعِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ اذْكُرْ نِعْمَتِي عَلَيْكَ وَعَلَى وَالِدَتِكَ إِذْ أَيَّدْتُكَ بِرُوحِ الْقُدُسِ تُكَلِّمُ النَّاسَ فِي الْمَهْدِ وَكَهْلاً وَإِذْ عَلَّمْتُكَ الْكِتَبَ والحِكْمَةَ وَالتَّوْرَاةَ وَالْأَنْجِيلَ وَإِذْ تَخْلُقُ مِنَ الطَّيْنِ كَهَيْئَةِ الطَّيْرِ بِإِذْنِي فَتَنْفُخُ فِيهَا فَتَكُونُ طيرا باذني تُبْرِئُ الْأَكْمَهَ وَالْأَبْرَصَ بِاذْنِي وَإِذْ تُخْرِجُ الْمَوْتَى بِاذْنِي .
"আল্লাহ বলিবেন, হে মারয়াম তনয় ঈসা! তোমার প্রতি ও তোমার জননীর প্রতি আমার অনুগ্রহ স্মরণ কর: পবিত্র আত্মা দ্বারা আমি তোমাকে শক্তিশালী করিয়াছিলাম এবং তুমি দোলনায় থাকা অবস্থায় ও পরিণত বয়সে মানুষের সহিত কথা বলিতে। তোমাকে কিতাব, হিকমত, তাওরাত ও ইনজীল শিক্ষা দিয়াছিলাম। তুমি কর্দম দ্বারা আমার অনুমতিক্রমে পাখীসদৃশ আকৃতি গঠন করিতে এবং উহাতে ফুৎকার দিতে, ফলে আমার অনুমতিক্রমে উহা পাখি হইয়া যাইত। জন্মান্ধ ও কুষ্ঠ ব্যাধিগ্রস্তকে তুমি আমার অনুমতিক্রমে নিরাময় করিতে এবং আমার অনুমতিক্রমে মৃতকে জীবিত করিতে" (৫: ১১০)।
উপরিউক্ত আয়াতসমূহ হইতে ঈসা (আ)-এর নিম্নোক্ত মু'জিযার বর্ণনা পাওয়া যায়।
(১) মাটি দ্বারা পাখি তৈরি করিয়া ফুৎকার দিয়া আকাশে উড়াইয়া দেওয়া।
(২) জন্মান্ধ এবং শ্বেত কুষ্ঠ রোগীকে কেবল হাত বুলাইয়া সুস্থ করিয়া দেওয়া।
(৩) কোন কোন মৃতকে জীবিত করিয়া দেওয়া।
(৪) লোকের গৃহে কি কি জিনিস মওজুদ রহিয়াছে এবং তাহারা কি ভক্ষণ করিয়াছে সেই সম্পর্কে সংবাদ দেওয়া।
এইগুলি ছাড়াও পঞ্চম আরেকটি মু'জিযার কথা সূরা মাইদাতে আলোচনা করা হইয়াছে। তাহা হইল খাদ্য পরিপূর্ণ আসমানী খাঞ্চা নাযিল হওয়া। এই সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
إِذْ قَالَ الْحَوَارِبُونَ يُعِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ هَلْ يَسْتَطِيعُ رَبُّكَ أَنْ يُنَزِلَ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِّنَ السَّمَاءِ قَالَ اتَّقُوا اللَّهَ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ . قَالُوا نُرِيدُ أَنْ نَاكُلَ مِنْهَا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُنَا وَنَعْلَمَ أَنْ قَدْ صَدَقْتَنَا وَنَكُونَ عَلَيْهَا مِنَ الشَّهِدِينَ. قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ اللَّهُمَّ رَبَّنَا انْزِلْ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِّنَ السَّمَاءِ تَكُونُ لَنَا عِيداً لأولنَا وَآخِرِنَا وَأَيَةً مِّنْكَ وَارْزُقْنَا وَأَنْتَ خَيْرُ الرَّازِقِينَ ، قَالَ اللَّهُ إِنِّي مُنَزِّلُهَا عَلَيْكُمْ فَمَنْ يَكْفُرْ بَعْدُ مِنْكُمْ فَإِنِّي أَعَذِّبُهُ عَذَابًا لَا أَعَذِّبُهُ أَحَدًا مِّنَ الْعُلَمِينَ .
"স্মরণ কর, হাওয়ারীগণ বলিয়াছিল, হে মারয়াম তনয় ঈসা! আপনার প্রতিপালক কি আমাদের জন্য আসমান হইতে খাদ্য পরিপূর্ণ খাঞ্চা প্রেরণ করিত সক্ষম? সে বলিয়াছিল, আল্লাহকে ভয় কর যদি তোমরা মু'মিন হও। তাহারা বলিয়াছিল, আমরা চাহি যে, উহা হইতে কিছু খাইব ও আমাদের চিত্ত প্রশান্তি লাভ করিবে। আর আমরা জানিতে চাহি যে, আপনি আমাদিগকে সত্য বলিয়াছেন এবং উহাতে সাক্ষী থাকিতে চাহি। মারয়াম তনয় ঈসা বলিল, হে আল্লাহ, আমাদিগের প্রতিপালক! আমাদিগের জন্য আসমান হইতে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা প্রেরণ কর। ইহা আমাদের ও আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলের জন্য হইবে আনন্দোৎসবস্বরূপ ও তোমার নিকট হইতে নিদর্শন এবং আমাদিগকে জীবিকা দান কর। আর তুমি তো সর্বশ্রেষ্ঠ রিযিকদাতা। আল্লাহ বলিলেন, নিশ্চয় আমি তোমাদিগের নিকট উহা প্রেরণ করিব; কিন্তু ইহার পর তোমাদিগের মধ্যে কেহ কুফরী করিলে তাহাকে এমন শাস্তি দিব, যে শাস্তি বিশ্বজগতের অপর কাহাকেও দিব না" (৫ : ১১২-১১৫)।
এই মু'জিযাগুলির ধরন সম্পর্কে বিভিন্ন রকম বর্ণনা পাওয়া যায়। তাহা নিম্নরূপ:
(ক) মাটি দ্বারা পাখি তৈরি করা
হযরত ঈসা (আ)-এর মু'জিযার মধ্যে অন্যতম হইল, তিনি মাটি দ্বারা পাখি তৈরি করিয়া তাহাতে ফুৎকার দিলে তাহা উড়িয়া যাইত। আল-কুরআনের স্পষ্ট বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় যে, তিনি উহা আল্লাহরই অনুমোদন ক্রমে সম্পাদন করিতেন (তাফসীরে মাযহারী, ২খ., page ২৯৪)।
ইমাম বাগাবী (র) বলিয়াছেন, ঈসা (আ) শুধু বাদুড় পাখিই বানাইতেন, ইহা ছাড়া আর কোন পাখি বানাইতেন না। কেননা উহাই একমাত্র পাখি যাহা গঠনগত দিক হইতে পূর্ণাঙ্গ চতুষ্পদ প্রাণীর মত এবং স্তন্যপায়ী (আরো দ্র. ইবনুল জাওযী, প্রাগুক্ত, ১খ., page ৩৩৩)।
ইন জারীর তাবারী উল্লেখ করিয়াছেন, ইবন ইসহাক হইতে বর্ণিত। মকতবের কয়েকজন বালকের সাথে একবার হযরত ঈসা (আ) বসিয়াছিলেন। তাহার পর তিনি এক মুঠি কাদা হাতে নিয়া বলিলেন, এই কাদা দিয়া আমি তোমাদের জন্য একটি পাখি বানাইয়া দিব। তাহারা বলিল, সত্যিই তুমি তাহা পারিবে? তিনি বলিলেন, হাঁ, আমার প্রতিপালকের অনুমতিতে আমি তাহা পারিব। তাহার পর মাটি দিয়া তিনি একটি পাখির আকৃতি বানাইলেন, তাহাতে ফুৎকার দিলেন এবং বলিলেন, আল্লাহ্র অনুমতিতে পাখি হইয়া যাও, ফলে সেইটি পাখি হইয়া তাহার হাত হইতে উড়িয়া যায়। এই কাণ্ড দেখিয়া বালকগণ সেই স্থান হইতে বাহির হইয়া গিয়া তাহাদের শিক্ষকদের নিকট ঘটনাটি জানাইল। তাহারা ব্যাপারটি জনসাধারণের নিকট প্রকাশ করিয়া দিল। ঈসা (আ) তাহাতে চিন্তাযুক্ত হইলেন। এইদিকে বানু ইসরাঈল তাঁহার ক্ষতি করার ইচ্ছা করিয়াছিল। তাঁহার ব্যাপারে শংকাগ্রস্ত হইবার পর তাঁহার মাতা তাঁহাকে নিয়া একটি গাধায় সওয়ার হইলেন এবং মিসরে পালাইয়া গেলেন। বর্ণিত আছে যে, তিনি যখন কাদা-মাটি হইতে পাখি বানাইতে মনস্থ করিলেন, তখন তাহাদেরকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, কোন পাখি বানানো বেশী কঠিন? উত্তরে বলা হইল, বাদুড় (তাফসীরে তাবারী, ৫খ., page ৩৯৯)।
বাইবেলের চার খণ্ডের কোথাও হযরত ঈসা (আ)-এর এই মু'জিযার উল্লেখ নাই। একমাত্র মিসরীয় কিবতীদের নিকট (COPTIC CHURCH) রক্ষিত এবং বার্নাবাসের বাইবেলে ইহার উল্লেখ পাওয়া যায়। উল্লেখ্য যে, এক শ্রেণীর প্রকৃতিবাদী এবং তাহাদের সাথে ইসলামের দাবিদার কিছু ব্যক্তি ঈসা (আ)-এর মু'জিযাগুলিকে এমনভাবে বর্ণনা করিয়াছেন, যাহা সেইগুলিকে অস্বীকার করারই নামান্তর (সিওহারবী, প্রাগুক্ত, page ৬৫-৬৬)।
উহার খণ্ডনের নিমিত্ত বলিতে হয় যে, পাখি তৈরি করার উপরিউক্ত মু'জিযাটির আল-কুরআনে স্পষ্টভাবে বর্ণনা রহিয়াছে। সাথে সাথে আল্লাহর অনুমোদনক্রমে কিভাবে তাহা তৈরি করা হইয়াছিল তাহাও বলা হইয়াছে। বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট, তাই ইহা অস্বীকার করা বা অপব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা আল-কুরআনের একটি স্পষ্ট ভাষ্যকেই অস্বীকার করা বা অপব্যাখ্যা দেওয়ার নামান্তর, যাহা কোন মুসলমান করিতে পারে না।
(খ) জন্মান্ধ ও কুষ্ঠরোগীর অলৌকিকভাবে সুস্থ করা
ঈসা (আ) তাঁহার দাওয়াতী কাজের পরিক্রমায় সেই যুগে এমন কিছু রোগীকে সুস্থ করিয়া তোলেন যাহা করিতে সেই যুগের ডাক্তারগণ অপারগ ছিলেন। আল-কুরআনে প্রথম সে রোগটির বর্ণনায় শব্দটা ব্যবহার করা হয়।
হযরত আবদুল্লাহ ইব্ন আব্বাস (রা)-এর মতে অর্থ জন্ম হইতেই যাহার চোখ নাই বা যাহার চক্ষুস্থল সমতল। হাসান ও সুদ্দী (র) বলেন, অন্ধ। হযরত ইকরিমা (র) বলেন, যাহার দৃষ্টিশক্তি দুর্বল, চোখ হইতে সব সময় পানি ঝরে। মুজাহিদের মতে আকমাহ ঐ ব্যক্তি যে রাতকানা (তাফসীরে মাযহারী, page ২৯৪; আলুসী, প্রাগুক্ত, ৩খ., page ১৬৯)।
তবে প্রকৃতপক্ষে আকমাহ বলিতে জন্মান্ধ ব্যক্তিকে বুঝায়। কেননা রাতকানা রোগ ডাক্তাররাও চিকিৎসা করিতে পারে। তখন নবী হিসাবে ইহা ঈসা (আ)-এর মু'জিযা হইবে না। এইজন্য ইবন জারীর তাবারী আকমাহার অর্থে জন্মান্ধ হওয়াকে প্রাধান্য দিয়াছেন (তাফসীর তাবারী শরীফ, ৫খ, page ৪০১)। হযরত ঈসা (আ)-এর এই রোগ নিরাময় করার ঘটনাটি এমনকি বাইবেলের বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ করা হইয়াছে যেমন, মথি ৯: ২৭-৩০, মার্ক ৮ঃ ২২-২৫, লুক ১৮: ৩৫-৪৩)। তবে সর্বাধিক বিস্তারিত বিবরণ যোহন সুসমাচার ৯ঃ ১-৭-এ রহিয়াছে। এই সুসমাচারে জন্মান্ধ ও মাতৃগর্ভ হইতে প্রসবকালীন সময়েও অন্ধ হইয়া যে শিশু জন্ম নেয় তাহারও বিবরণ লিপিবদ্ধ রহিয়াছে।
আল-কুরআনে বর্ণিত দ্বিতীয় দূরারোগ্য ব্যাধিটি শ্বেতকুষ্ঠ রোগ। খৃস্টানদের হাতে প্রচলিত সুসমাচারসমূহে এই রোগ নিরাময়ের ব্যাপারে একাধিক ঘটনা উল্লেখ করা হইয়াছে। তাহার মধ্যে এক জায়গায় একজন কুষ্ঠরোগী এবং অপর স্থানে ১০ জন কুষ্ঠরোগী নিরাময়ের ঘটনার বিবরণ রহিয়াছে (মথি ৮: ১-৩)।
আরেক দিনের ঘটনা। তিনি জেরুসালেম যাত্রাকালে সামিবিয়া হইয়া গালীলের ভিতর দিয়া পথ অতিক্রম করিতেছিলেন। পথিমধ্যে এক গায়ে ১০ জন কুষ্ঠরোগীকে দেখিতে পাইলেন। কুষ্ঠরোগিগণ তাহাকে দেখিয়াই দূরে দাঁড়াইয়া উচ্চঃস্বরে ডাকিয়া বলিতে লাগিল, হে প্রভু! আমাদের প্রতি মেহেরবানী করুন। তিনি তাহাদেরকে, বলিলেন, যাও নিজ নিজ দেহগণকে দেখাইয়া নিও- তাহারা সামনের দিকে আগাইয়া যাইতেই সম্পূর্ণ সুস্থ, পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন হইয়া গেল।
প্রচলিত সুসমাচারসমূহে উপরিউক্ত দুইটি রোগসহ আরও কয়েকটি রোগের কথা উল্লেখ আছে যাহা হযরত ঈসা (আ) অলৌকিক ভাবে নিরাময় করিতেন বলিয়া বর্ণিত হইয়াছে। তন্মধ্যে
(১) তিনি অবশ রোগীকে সুস্থ করেন (মথি ৯: ২, ৮:৫, ১২ঃ ৯)।
(২) বোবা রোগীকে সুস্থ করেন (মথি ৯: ২৭)।
(৩) তোতলার তোতলামী অপসারণ করেন (মথি ৭ঃ ৩১, লুক ১৮: ৩৫-৪৩)।
(৪) ভূতে পাওয়া তথা জিনে ধরা রোগীকে সুস্থ করেন (মথি ৪: ২৪, ৮: ২৮, ১৪, ১৭ঃ ১৪, মার্ক ৫: ২-১৯, ৯৪ ১৪-২৭)।
(৫) নপুংসক ব্যক্তিকে সুস্থ করেন (বার্ণাবাসের বাইবেল, page ৭৮)।
(৬) কুজকে সুস্থ করেন (লুক ১৩: ১০) ইত্যাদি।
আল্লামা সুয়ূতী বলেন, এই দুই ধরনের এমন রোগ যাহার নিরাময়ে ডাক্তারগণ অপারগ হইয়া গিয়াছিল। হযরত ঈসা (আ)-কে চিকিৎসার জয়জয়কারের যুগেই প্রেরণ করা হইয়াছিল। আর তিনি এক দিনে ৫০ হাজার রোগীকে দু'আর মাধ্যমে সুস্থ করিয়াছিলেন। তবে শর্ত ছিল ঈমান আনিতে হইবে (প্রাগুক্ত)। হযরত ওয়াহ্ব ইবন মুনাবিবহ (র) বলেন, ঈসা (আ)-এর কাছে এক এক দিন ৫০ হাজার রোগীর সমাবেশ ঘটিত। যে তাঁহার নিকট আসিতে সক্ষম হইত সে তো নিজেই আসিয়া যাইত। আর যাহারা পারিত না, ঈসা (আ)-ই তাহাদের কাছে চলিয়া যাইতেন। রুগ্ন, পঙ্গু, অন্ধ ইত্যাদির জন্য তিনি দু'আ করিতেন :
اللهم انت إله من في السماء واله من في الارض لا إله فيهما غيرك وأنت جبار من في السموات وجبار من في الأرض لا جبار فيهما غيرك وانت ملك من في السماء وملك من في الأرض لاملك فيهما غيرك قدرتك في الأرض كقدرتك في السماء سلطانك في الأرض كسلطانك في السماء اسئلك باسمك الكريم ووجهك المنير وملكك القديم إنك على كل شئ قدير .
“হে আল্লাহ! তুমি আকাশবাসীর ইলাহ্, ইলাহ্ পৃথিবীবাসীর। এই দুইয়ের মাঝে তুমি ছাড়া কোনো ইলাহ্ নেই। তুমি আকাশমণ্ডলীর অধিবাসীর মাঝে প্রবল, প্রবল তুমি যমীনবাসীদের মাঝে। এই দুইয়ের মাঝে তুমি ছাড়া কেউ প্রবল নহে। তুমি আকাশবাসীর অধিকর্তা, অধিকর্তা যমীনবাসীর। এই দুইয়ের মাঝে তুমি ছাড়া আর কোন অধিকর্তা নেই। আকাশে যেমন তোমার শক্তি যমীনেও তেমন তোমার শক্তি। আকাশে যেমন তোমার ক্ষমতা, যমীনেও তেমন তোমার ক্ষমতা। তোমার কাছে চাই তোমার নামের উসিলায়, তোমার সমুজ্জ্বল চেহারার উসিলায়, চাই তোমার অনাদি সার্বভৌমত্বের উসিলায়। তুমি সবকিছুর উপর সর্বশক্তিমান” (তাফসীরে মাযহারী, প্রাগুক্ত, page ২৯৫; আলুসী, প্রাগুক্ত, ৩খ., page ১৬৯)।
ইবন জরীর তাবারী বলেন, ঐ ধরনের রোগ নিরাময় দ্বারা আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আ) সম্পর্কে নিদর্শন দিয়াছেন যে, তিনি আল্লাহ্র রাসূল। ইহা তো মু'জিযাসমূহের অন্যতম যাহা আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে দান করিয়াছেন (তাফসীরে তাবারী শরীফ, ৫খ, page ৪০১)।
(গ) আল্লাহর হুকুমে মৃতকে জীবিত করা: আল-কুরআনের ভাষ্যমতে হযরত ঈসা (আ) আল্লাহর হুকুমে মৃতকে জীবিত করিতেন যেন লোকজন তাঁহার প্রতি ঈমান আনয়ন করে। বাগাবী (র) বর্ণনা করিয়াছেন, ইবন আব্বাস (রা) বলেন, ঈসা (আ) চার ব্যক্তিকে জীবিত করিয়াছিলেন: (১) আযির, (২) জনৈক বৃদ্ধার ছেলে, (৩) কর আদায়কারীর মেয়ে এবং (৪) নূহ (আ)-এর ছেলে সাম।
(১) আযির ঈসা (আ)-এর বন্ধু ছিলেন। তিনি অসুস্থ হইয়া পড়িলে তাহার বোন ঈসা (আ)-এর কাছে লোক পাঠাইয়া দেয় যে, আপনার ভাই ইনতিকাল করিয়াছেন। তিনি তিন দিনের পথ পাড়ি দিয়া সঙ্গীদের নিয়া উপস্থিত হইলেন। কিন্তু আসিয়া দেখিলেন তিন দিন আগেই তাহার মৃত্যু হইয়াছে। তিনি তাহার বোনকে বলিলেন: আমাদের নিয়া তাহার কবরের কাছে চল। সে তাহাদের নিয়া ভাইয়ের কবরের নিকট পৌছিল। ঈসা (আ) আল্লাহ্র কাছে দু'আ করিলেন। সঙ্গে সঙ্গে আযির উঠিয়া দাঁড়াইলেন আর তাহার শরীর হইতে চর্বি গলিয়া গলিয়া পড়িতেছিল। কবর হইতে উঠার পর সে বেশ কিছুদিন জীবিত ছিল।
(২) এক বৃদ্ধার ছেলে ইন্তিকাল করিলে ঈসা (আ)-এর নিকট দিয়া তাহার জানাযা নিয়া যাওয়া হইতেছিল। তিনি তাহার জন্য দু'আ করিলেন, তৎক্ষণাৎ সে খাটের উপর উঠিয়া বসিল। ইহার পর সকলের সামনে নিচে আসিয়া জামা-কাপড় পরিধান করিল এবং খাটটি কাঁধে নিয়া বাড়ী ফিরিয়া গেল। সেও বেশ কিছু দিন বাঁচিয়াছিল। তাহার সন্তানও জন্ম নিয়াছিল।
(৩) কর আদায়কারীর তনয়ার ঘটনা হইল, তাহার বাপ ছিল একজন কর আদায়কারী। কন্যার মৃত্যুর একদিন পর সে বিষয়টি ঈসা (আ)-কে অবহিত করিল। ঈসা (আ) তাহার জন্য দু'আ করিলেন। ফলে আল্লাহ তাহাকে জীবিত করিয়া দেন। সেও দীর্ঘায়ু পাইয়াছিল এবং সন্তান জন্ম দিয়াছিল।
(৪) নূহ (আ)-এর পুত্র সাম। ঈসা (আ) তাহার কবরের কাছে আসিলেন এবং ইসমে আ'জম দ্বারা দু'আ করিলেন। সাথে সাথে তিনি কবরের ভিতর হইতে বাহির হইয়া আসিলেন।
কিয়ামতের ভয়ে তাহার অর্ধেক চুল পাকিয়া গিয়াছিল। অথচ সেকালে কাহারও চুল পাকিত না। তিনি র্জিজ্ঞাসা করিলেন: কিয়ামত হইয়া গেল কি? 'ঈসা (আ) বলিলেন, না! তবে আমি ইসমে আ'জম পড়িয়া দু'আ করিয়াছি। ইহার পর বলিলেন, মরিয়া যান। তিনি বললেন: প্রস্তুত, তবে শর্ত হইল মৃত্যুকষ্ট হইতে যেন আল্লাহ রেহাই দেন। ঈসা (আ) এই জন্য দু'আ করিলেন। দু'আ কবুল হইল (তাফসীরে মাযহারী, প্রাগুক্ত, page ২৯৫-২৯৬; আলুসী, প্রাগুক্ত, ৩খ., page ১৬৯-১৭০)।
ইব্ন কাছীর উল্লেখ করেন যে, ইসহাক ইব্ন বিশর, কা'ব আল আহবার, ওয়াহব ইব্ন মুনাব্বিহ, ইব্ন আব্বাস ও সালমান ফারসী (রা) হইতে বিভিন্ন সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন যে, মৃতকে জীবিত করণে সর্বপ্রথম যাহা ঘটিয়াছিল তাহা হইল, একদা তিনি এক কবরের পার্শ্বে ক্রন্দনরত মহিলার পার্শ্ব দিয়া যাইতেছিলেন। তিনি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমার কি হইল? তখন সেই মেয়ে লোকটি বলিল, আমার মেয়েটি মৃত্যুবরণ করিয়াছে অথচ সে ছাড়া আমার আর কোন সন্তান নাই। আমি আমার রবের কাছে ওয়াদা করিয়াছি যে, আমার মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত আমি এই স্থান ত্যাগ করিব না অথবা আল্লাহ তা'আলা আমার মেয়েটিকে জীবিত করিয়া দিবেন। তুমি তাহার প্রতি দৃষ্টি দাও। 'ঈসা (আ) তাহাকে বলিলেন, আমি যদি উহার প্রতি দৃষ্টি দেই, তাহা হইলে তুমি কি ফিরিয়া যাইবে। সেই মেয়ে লোকটি বলিল, হাঁ। বর্ণনাকারিগণ বলেন, তখন ঈসা (আ) দুই রাক'আত নামায পড়িলেন এবং কবরের নিকটে আসিয়া বসিলেন। অতঃপর সেই মৃত মেয়েটিকে ডাক দিলেন, পরম দয়ালু আল্লাহ্র নির্দেশে দাঁড়াইয়া যাও এবং কবর হইতে বাহির হইয়া আস। কবরটি কাঁপিয়া উঠিল। অতঃপর ঈসা আবার ডাক দিলেন, তখন কবরটি ফাটিয়া গেল। অনন্তর তিনি তৃতীয়বারের মত ডাক দিলেন, তখন ঐ মেয়েটি মাথা হইতে মাটি ঝাড়িতে ঝাড়িতে বাহির হইয়া আসিল। হযরত ঈসা (আ) তাহাকে বলিলেন, আমার ডাকার পর তোমার দেরী হইল কেন? সে বলিল, প্রথম ডাক দেওয়ার পর আল্লাহ পাক এক ফেরেস্তা পাঠাইলেন যিনি আমার শরীরের অবয়ব পুনর্গঠন করিলেন। দ্বিতীয় ডাকের সময় আমার কাছে আমার আত্মা ফিরিয়া আসিল। আর যখন আমার কাছে তৃতীয় ডাক আসিল তখন আমি মনে করি যে, ইহা কিয়ামতের আহবান। তখন কিয়ামতের ভয়ে আমার মাথার চুল শুভ্র হইয়া যায়। অতঃপর সে তাহার মায়ের কাছে গেল এবং বলিল, হে আম্মা! আপনার কি হইল যে, আমাকে দুইবার মৃত্যুর যন্ত্রণা ভোগ করার পর্যায়ে লইয়া গেলেন। হে আম্মা! আপনি সবর করুন এবং আল্লাহর নিকট ইহার প্রতিদান কামনা করুন। অতঃপর সে ঈসা (আ)-কে লক্ষ্য করিয়া বলিল, হে আল্লাহ্ রূহ ও কলেমা ঈসা! আপনার প্রভুর কাছে প্রার্থনা করুন তিনি যেন আমাকে পরকালীন জীবনে ফিরাইয়া নেন এবং মৃত্যুযন্ত্রণাকে হাল্কা করিয়া দেন। অতঃপর ঈসা (আ) দু'আ করিলেন। আল্লাহ তাঁহার দু'আ কবুল করিলেন (ইব্ন কাছীর, page ৭৬)। বার্ণাবাসের বাইবেলেও অনুরূপ একটি ঘটনা বর্ণিত আছে (অধ্যায় নং ৪৭, page ৫৮-৫৯)।
আল্লামা আলুসী বলেন যে, আল-কুরআনে ঈসা (আ)-এর মু'জিযার আলোচনায় মৃত )الموتى শব্দ টি ব্যাপক অর্থবোধক, সবকিছু ইহার অন্তর্ভুক্ত। যুহরী হইতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলিয়াছেন, আমি অবহিত হইয়াছি, ঈসা (আ) ও তাঁহার সাথী পথ চলিতে চলিতে একেবারে স্পেন (আনদালুস) পর্যন্ত চলিয়া যান। সেখানে মৃতকে জীবিত করিয়াছিলেন। সাথীবর্গ এই ধরনের জীবিত ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করিবার পর জানিতে পারিলেন যে, তিনি আদ জাতিভুক্ত (আবু হায়্যান, প্রাগুক্ত, ৩খ., page ১৬৬)। আরও বর্ণিত আছে যে, ঈসা (আ) যখন কাহাকেও জীবিত করার জন্য দু'আ করিতেন তখন তিনি সেই দু'আয় বলিতেন, ইয়া হায়্যু, ইয়া কায়্যুম। আর বর্ণিত আছে যে, তিনি দুই রাক'আত নামায পড়িতেন। আরও বর্ণিত আছে যে, তিনি যখন কোন মৃতকে জীবিত করার ইচ্ছা পোষণ করিতেন তখন তাঁহার লাঠি দ্বারা সেই মৃতকে আঘাত করিতেন অথবা কবরে আঘাত করিতেন অথবা মাথার খুলি বাহির করিয়া আঘাত করিতেন। তখন তাহা আল্লাহ্র নির্দেশে জীবিত হইয়া যাইত এবং ঈসা (আ)-এর সঙ্গে কথা বলিত, অতঃপর দ্রুত মৃত্যুবরণ করিত (আবূ হায়্যান, প্রাগুক্ত, আলুসী, প্রাগুক্ত, ৩খ., page ১৬৯)।
উল্লেখ্য, বর্তমান যুগে আধুনিকতার দাবিদার স্যার সৈয়দ আহমদ এবং মৌলভী চেরাগআলীসহ মিথ্যা নবুওয়াতের দাবিদার গোলাম আহমদ কাদিয়ানী এবং মৌঃ মুহাম্মদ আলী লাহোরী ধর্মকে অতি প্রাকৃতিক বিষয় হইতে মুক্ত করিবার অভিলাষে ইয়াহুদীদের ন্যায় ঈসা (আ)-এর ঐ মু'জিযাকে অস্বীকার করিয়া বসিয়াছেন। ইহার পক্ষে তাহাদের দাবি হইল, কুরআন মজীদে আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের পূর্বে কাহাকেও এই দুনিয়াতে পুনর্বার জীবিত করিবেন না বলিয়া ঘোষণা করিয়াছেন। কিন্তু গোটা কুরআন মজীদের কোন একটি আয়াতেও এই দাবি প্রমাণিত হয় না বরং প্রমাণ পাওয়া যায় যে, আল্লাহ তা'আলা মৃত্যু দান করার পর এই পৃথিবীতে পুনরায় জীবিত করিয়াছেন। যেমন সূরা বাকারার গাভী যবাহ করা সম্পর্কিত আয়াতে আছে:
فَقُلْنَا اضْرِبُوهُ بِبَعْضِهَا كَذَلِكَ يُحْيِ اللَّهُ الْمَوْتُى .
"তখন আমরা এই নির্দেশ দিয়াছিলাম যে, নিহত ব্যক্তির লাশের উপর ইহার কোন অংশ দ্বারা আঘাত কর। বস্তুত এইভাবেই আল্লাহ তা'আলা মৃতদের জীবন দান করেন" (২ঃ ৭৩)। এই সূরায় ২৫৯ নং আয়াতে উল্লেখ আছে:
فَأَمَاتَهُ اللَّهُ مِائَةَ عَامٍ ثُمَّ بَعَثَهُ قَالَ كَمْ لَبِثْتُ قَالَ لَبِثْتُ يَوْمًا أَوْ بَعْضَ يَوْمٍ قَالَ بَلْ لَبِثْتَ مِائَةَ عَامِ.
"অতঃপর আল্লাহ তাহার প্রাণ হরণ করিয়া নিলেন এবং সে একশত বৎসর মৃত অবস্থায় পড়িয়া থাকিল। অতঃপর আল্লাহ তাহাকে পুনর্জীবিত করিলেন এবং জিজ্ঞাসা-করিলেন, বল কত কাল এইভাবে পড়িয়া রহিয়াছিলে? সে বলিল, এক দিন অথবা কয়েক ঘন্টা মাত্র। আল্লাহ বলিলেন, তোমার উপর দিয়া এমনি অবস্থায় এক শতটি বৎসর অতিবাহিত হইয়া গিয়াছে"।
এই সূরায় (২৬০ নং আয়াত) উল্লেখ আছে: وَاذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّ أرنى . كَيْفَ تُحْيِ الْمَوْتَى قَالَ أَوَلَمْ تُؤْمِنْ قَالَ بَلَى وَلَكِنْ لِيَطْمَئِنَّ قَلْبِي قَالَ فَخُذْ أَرْبَعَةً مِنَ الطَّيْرِ فَصُرْهُنَّ إِلَيْكَ ثُمَّ اجْعَلْ عَلَى كُلَّ جَبَلٍ مِنْهُنَّ جُزْء ثُمَّ ادْعُهُنَّ يَأْتِينَكَ سَعْبًا .
"সেই ঘটনাও স্মরণ কর, যখন ইবরাহীম বলিল, প্রভু! আমাকে দেখাও তো তুমি কিভাবে মৃতকে পুনর্জীবিত কর। আল্লাহ বলিলেন, তুমি কি বিশ্বাস কর না? ইবরাহীম বলিল, বিশ্বাস করি, কিন্তু শুধু মনের সান্ত্বনার জন্য। আল্লাহ বলিলেন, তাহা হইলে তুমি চারিটি পাখি ধর এবং সেগুলি নিজের সাথে সুপরিচিত করিয়া নাও। অতঃপর ইহাদের এক একটি অংশ এক একটি পাহাড়ের উপর রাখিয়া দাও। অতঃপর ইহাদেরকে ডাক দাও। দেখিবে ইহারা তোমার কাছে দৌড়াইয়া ছুটিয়া আসিতেছে"।
অতএব এই সমস্ত ঘটনার মধ্যে মৃতকে জীবিত করিবার পরিষ্কার অর্থ বর্তমানে রহিয়াছে।
মোটকথা, কুরআনের দৃষ্টিতে দুনিয়ায় পুনর্জীবিত হওয়া নিষিদ্ধ— এইরূপ চিন্তা মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী ও মুহাম্মদ আলী লাহোরী প্রমুখের মস্তিষ্ক প্রসূত যাহা চূড়ান্তরূপেই ভ্রান্ত। ইহার পিছনে কোন যুক্তি বর্তমান নাই (সিওহারবী, প্রাগুক্ত, page ৬৭-৬৮)।
(ঘ) আসমান হইতে মাইদা অবতীর্ণ হওয়া: তাফসীরে রূহুল মা'আনীতে আছে, 'আল্লামা আলুসী বলেন, প্রচলিত অর্থে মাইদা হইল, ঐ পাত্র যাহাতে খাদ্যবস্তু রাখা হয়। ইহা ছাড়া কেবল খাদ্যকেও মাইদা বলা হইয়া থাকে (আলুসী, প্রাগুক্ত, ৭খ, page ৫৯)। মুফাসসিরগণের মতে ঐ আয়াতে খাদ্যসহ পাত্রকে বুঝানো হইয়াছে। কেননা ঈসা (আ)-এর অনুসারীরা পাত্র নহে, বরং খাদ্যই চাহিয়াছিল। রাগিব এই মতের প্রবক্তা (তাফসীরে মাজেদী, প্রাগুক্ত, page ৬৬১)।
আল-কুরআনে বর্ণিত ঈসা (আ)-এর মু'জিযা হিসাবে আসমানী মাইদা এক গুরুত্বপূর্ণ মু'জিযা। আল-কুরআনের একটি সূরার নামকরণ করা হয় 'মাইদা'। আল-কুরআনে সরাসরি মাইদার প্রসঙ্গটি আসিলেও ঈসা (আ) ও তাঁহার অনুসারীদের কাছে আসমান হইতে কখন ও কিভাবে কি বস্তু খাদ্য হিসাবে আসিয়াছিল তাহা বিস্তারিত আলোচনা করা হয় নাই। ফলে বিভিন্ন তাফসীর গ্রন্থে মাইদা সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা উল্লেখ করা হইয়াছে।
আল্লামা ইবন কাছীর (র) ইব্ন আব্বাস, সালমান আল-ফারসী, আম্মার ইব্ন ইয়াসির (রা) প্রমুখের বরাতে উল্লেখ্য করেন যে, হযরত ঈসা (আ) ত্রিশ দিন রোযা রাখার আদেশ দিয়াছিলেন। অতঃপর তাহারা যখন ত্রিশ রোযা পূর্ণ করিল তখন তাহারা ঈসা (আ)-এর নিকট আসমান হইতে মাইদা নাযil করিবার জন্য আবেদন করিল যাহাতে তাহারা উহা হইতে আহার করিতে পারে এবং তাহাদের অন্তর পরিতৃপ্তি লাভ করিতে পারে যে, আল্লাহ পাক তাহাদের সিয়াম কবূল করিয়াছেন এবং তাহাদের আবেদন মঞ্জুর করিয়াছেন। আর এইভাবে যেন ইহা এক ঈদ উৎসবে পরিণত হয়। পূর্বাপর ধনী-গরীব সকলের জন্য ইহা যথেষ্ট। অতঃপর ঈসা (আ) তাহাদেরকে এই ব্যাপারে ওয়াজ-নসীহতের মাধ্যমে সতর্ক করিলেন এবং তাহারা এই নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করিতে ও শর্তসমূহ যথাযথভাবে পালন করিতে পারে কি না সেই ব্যাপারে সংশয়বোধ করিলেন। কিন্তু তাহারা বারবার ঈসা (আ)-কে তাঁহার প্রভুর নিকট ঐ ব্যাপারে আবেদন করিতে তাকীদ দিতে লাগিল। ইহা হইতে যখন তাহারা বিরত হইল না তখন ঈসা (আ) সালাতের মুসল্লায় দাঁড়াইয়া গেলেন এবং একটি পশমের পোশাক দ্বারা আবৃত হইয়া মাথা নিম্নদিকে ঝুলাইয়া দিলেন। দুই চোখ কান্নায় ভাসাইয়া দিয়া তিনি আল্লাহর কাছে কাকুতি-মিনতি করিয়া দু'আ করিলেন, যেন তাহারা যাহা চাহিতেছে তাহা তাহদিগকে দেওয়া হয়। তখন আল্লাহ তা'আলা আসমান হইতে মাইদা নাযিল করেন (ইবন কাছীর, প্রাগুক্ত, page ৭৯-৮০)।
'আল্লামা সিউহারবী বিষয়টিকে অন্য আঙ্গিকে উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, ন্যায়নিষ্ঠ ও নিবেদিতপ্রাণ হাওয়ারীগণ যদিও সত্যিকার ঈমানদার ও অবিচল আকীদার অধিকারী ছিলেন, কিন্তু তাহারা সরল প্রকৃতির এবং গরীব ও সম্বলহীন ছিলেন। এজন্য তাহারা সরল মনে হযরত ঈসা (আ)-এর নিকট আবেদন করিলেন যে, যে মহান সত্তার অসীম ক্ষমতার একটি নির্দেশন হইতেছে আপনার অলৌকিক জন্ম এবং আপনাকে দেয়া সেইসব মু'জিযা যাহা আপনার নবুওয়াত ও রিসালাতের সত্যতার সমর্থনে আপনার হাতে প্রকাশ পাইয়াছে, সেই মহান সত্তা নিশ্চয়ই আমাদের জন্য আসমান হইতে খাদ্য খাঞ্চা পাঠাইতেও সক্ষম। তাহা হইলে আমরা জীবন ধারণের জন্য খাদ্য-সামগ্রী সংগ্রহের চিন্তা হইতে মুক্ত হইয়া নিশ্চিন্ত মনে আল্লাহকে স্মরণ করিতে পারিব এবং সব সময় তাঁহার দীনের প্রচারে আত্মনিয়োগ করিতে পারিব। এই কথা শুনিয়া হযরত ঈসা (আ) তাহাদের উপদেশ দিয়া বলিলেন, মহামহিম আল্লাহর শক্তি ও ক্ষমতা যদিও অসীম কিন্তু তাঁহাকে এইভাবে পরীক্ষা করা কোন সত্যিকার বান্দার পক্ষে শোভনীয় নহে। অতএব আল্লাহকে ভয় কর এবং এই জাতীয় চিন্তা পরিত্যাগ কর। হাওয়ারীগণ বলিল, আমরা আল্লাহকে পরীক্ষা করিব, এই দুঃসাহস আমাদের নাই এবং আমাদের উদ্দেশ্য মোটেই তাহা নহে। আমাদের উদ্দেশ্য এই যে, খাদ্য অন্বেষণের চিন্তা হইতে মুক্ত হইয়া আল্লাহ্র এই দানকে নিজেদের জন্য নির্ভর বানাইয়া নেওয়া এবং আপনাকে সত্য নবী হিসাবে মানিয়া নেওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস বদ্ধমূল করিয়া নেওয়া। ইহার মাধ্যমে আমরা গোটা বিশ্বের উপর আল্লাহর প্রভুত্বের পক্ষে ন্যায়নিষ্ঠ সাক্ষীতে পরিণত হইতে পারিব (সিওহারবী, প্রাগুক্ত, page ৮১-৮২)। মাইদা নাযিল সংক্রান্ত ঈসা (আ)-এর দু'আ ও আল্লাহ্র পক্ষ হইতে উহার প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে কুরআন কারীমে বলা হইয়াছে:
قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ اللَّهُمَّ رَبَّنَا انْزِلْ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِّنَ السَّمَاءِ تَكُونُ لَنَا عِبْدًا لِأَوَّلِنَا وَآخِرِنَا وَأَيَةً مِنْكَ وَارْزُقْنَا وَأَنْتَ خَيْرُ الرَّازِقِينَ . قَالَ اللهُ إِنِّي مُنَزِّلُهَا عَلَيْكُمْ فَمَنْ يُكَفِّرْ بَعْدُ مِنْكُمْ فَإِنِّي أُعَذِّبُهُ عَذَابًا لَا أُعَذِّبُهُ أَحَدًا مِّنَ العلمين .
“মায়াম-তনয় ‘ঈসা বলিল, হে আল্লাহ্ আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্য আসমান হইতে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা প্রেরণ কর; ইহা আমাদের ও আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলের জন্য হইবে আনন্দোৎসব স্বরূপ এবং তোমার নিকট হইতে নিদর্শন। আর আমাদিগকে জীবিকা দান কর; তুমিই তো শ্রেষ্ঠ জীবিকাদাতা। আল্লাহ্ বলিলেন, আমিই তোমাদের নিকট উহা প্রেরণ করিব; কিন্তু ইহার পর তোমাদের মধ্যে কেহ কুফরী করিলে তাহাকে এমন শাস্তি দিব, যে শাস্তি বিশ্বজগতের অপর কাহাকেও দিব না” (৫ : ১১৪-১১৫)।
উল্লেখ্য, খাবারে পূর্ণ পাত্র নাযিল হইয়াছিল কিনা তাহা আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয় নাই। এমনকি এই ব্যাপারে কোন মরফু হাদীছও পাওয়া যায় না। অবশ্য সাহাবী ও তাবিঈগণ হইতে উহার বিভিন্ন ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। ইব্ন জরীর তাবারীসহ অনেকেই মুজাহিদ ও হাসান বসরী (র) হইতে বর্ণনা করেন যে, আসমানী খাবারের জন্য আবেদনকারিগণকে যখন আল্লাহর পক্ষ হইতে কঠিন শর্তারোপ করা হয় তখন তাহারা ভয় পাইয়া যায় এবং তাহাদের আবেদন প্রত্যাহার করিয়া লয়, ফলে মাইদা নাযিল হয় নাই (আলুসী, প্রাগুক্ত, page ৬২)।
কিন্তু আবদুল্লাহ ইব্ন আব্বাস এবং আম্মার ইবন ইয়াসির (রা)-সহ অনেকের বর্ণনামতে, মাইদা নাযিল হওয়ার ঘটনা ঘটিয়াছে এবং খাঞ্চা নাযিল হইয়াছিল। জমহুর-এর ইহাই মত এবং এই মতটি প্রসিদ্ধ (আলুসী, প্রাগুক্ত, page ৬২; ইব্ন কাছীর, ২খ, page ৮০; তাফসীরে নাসাফী, ১খ, page ৩৫১)।
বর্ণিত আছে যে, হযরত ঈসা (আ)-এর দু'আর পর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন লাল রং-এর এক খাঞ্চাতে খাবার নাযিল করেন, যাহা দুইটি মেঘের মাঝামাঝিতে ছিল, একটি উপরে অপরটি নিচে। ঐ ধরনের খাবারের আবেদনকারীরা আসমান হইতে মহাশূণ্যে নাযিলের অবস্থায় তাহা প্রত্যাশা করিতেছিলেন। হযরত ঈসা (আ) পূর্বোল্লেখিত শর্তের কারণে ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় কান্নাকাটি করিতেছিল। ঐ খাঞ্চাটি তাঁহার সামনে আসার আগে তিনি অনুনয়-বিনয়ে প্রার্থনা করিতেছিলেন। ইহা তাঁহার সামনে হাজির হইবার পর তাহার আশেপাশে থাকা হাওয়ারীগণ ইহার সুগন্ধে মোহিত হইয়া যান। ঈসা (আ) ও হাওয়ারীগণ শুকরানা সিজদায় লুটাইয়া পড়িলেন। ইয়াহুদীরা দেখিতে আসিয়াও ফিরিয়া গেল। ঈসা ও তাঁহার সাথীবর্গ উহাকে রুমালে আবৃত অবস্থায় দেখিতে পাইলেন। তখন ঈসা (আ) উহা উন্মুক্ত করিয়া বলিলেন— بِسْمِ اللهِ خَيْرُ الرَّازِقِينَ (সেই আল্লাহর নামে শুরু করিতেছি যিনি সর্বোত্তকৃষ্ট রিযিকদাতা)। বিস্ময়ের সাথে তিনি দেখিতে পাইলেন, উহাতে ভাজা মাছ, রুটি ও তাজা ফল বিদ্যমান। ইব্ন কাছীরের বর্ণনামতে উহাতে সাতটি মাছ ও সাতটি রুটি ছিল। বলা হয় ইহাতে সিরকা ছিল। আরও বলা হয় উহাতে ডালিম ছিল। আরও অন্যান্য সুঘ্রাণযুক্ত ফল-ফলাদি ছিল (ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, প্রাগুক্ত)।
আম্মার ইবন ইয়াসির (রা) হইতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন : আসমান হইতে অবতীর্ণ ঐ মাইদাতে রুটি ও গোশত ছিল (ইবনুল জাওযী, প্রাগুক্ত, ২খ, page ৮-৩৪২; তাফসীরুল মাওয়ারদী, ২খ, page ৮৫)। সালমান ফারসীর বর্ণনামতে, উহাতে ভাজা মাছ, পাঁচটি রুটি, খেজুর, যয়তুন ও ডালিম ছিল। কাতাদা (র)-এর মতে বেহেশতী ফল-ফলাদি ও খাবার ছিল। দাহহাক ইব্ন আব্বাস (র) হইতে আরেক বর্ণনায় উল্লেখ করেন, উহাতে ছারীদও ছিল (প্রাগুক্ত)। সাঈদ ইব্ন জুবায়রের মতে, ইহাতে গোশত ছাড়া সব কিছুই ছিল। 'আতিয়া আওফীর মতে, উহাতে মাছ ছিল তবে তাহাতে সব ধরনের খাদ্যের স্বাদ ছিল। ইবনুস সাইব-এর মতে, উহাতে চাউলের রুটি ও সব্জি ছিল (ইবনুল জাওযী, প্রাগুক্ত)। কাহারও মতে, উহাতে দুইটি রুটি ও দুইটি বড় মাছ ছিল। তাহারা খাঞ্চা হইতে চল্লিশ দিন আহার করিয়াছিল (তাফসীরে মাওয়ারদী, প্রাগুক্ত)। মোটকথা, তাহাতে উপাদেয় সুস্বাদু বৈচিত্র্যময় খাদ্যের সমাহার ঘটানো হইয়াছিল। কেননা তাহারা ছিল আল্লাহর মেহমান।
বর্ণিত আছে যে, হাওয়ারী শামউন তাহা দেখিয়া বলিয়াছিল, হে রূহুল্লাহ! ইহা কি দুনিয়ায় তৈরী করা খাবার, না বেহেশতী খাবার? ঈসা (আ) বলিয়াছিলেন, না, ইহা আল্লাহর কুদরতে বিশেষভাবে তৈরী করা (ইবন কাছীর, প্রাগুক্ত, page ১৪৩)। বর্ণিত আছে যে, মাইদা ঈসা-এর কাছে উপস্থিত হওয়ার পর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তিনি দুই রাক'আত সালাত আদায় করিয়াছিলেন। অতঃপর হযরত ঈসা (আ) তাহা আহারের জন্য লোকদের নির্দেশ দিলেন। কিন্তু তাহারা তাঁহাকে প্রথমে খাওয়া শুরু করিবার জন্য বারবার অনুরোধ করিল। তিনি বলিলেন, তাহা আমার জন্য নহে, বরং তোমাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই নাযিল হইয়াছে। এই কথা শুনিয়া সবাই আতংকিত হইল যে, না জানি ইহার পরিণাম কি দাঁড়ায়। তিনি তাহাদের এই অবস্থা দেখিয়া বলিলেন, তাহা হইলে ফকীর-মিসকীন, অক্ষম এবং রুগ্নদের ডাক। ইহা তাহাদের প্রাপ্য। অতঃপর আল্লাহ্র হাজারো বান্দা উহা তৃপ্তি সহকারে খাইল, কিন্তু খাদ্যের পরিমাণে মোটেই ঘাটতি দেখা দিল না (সিওহারবী, প্রাগুক্ত, page ৮৫)। এক বর্ণনামতে ১ হাজার তিন শত ফকীর-মিসকীন ও রোগগ্রস্থ লোক উহা আহার করিয়াছিল।
কাতাদার মতে, হাওয়ারীগণ যেখানেই থাকিতেন সেখানেই সকাল-সন্ধ্যা তাহা অবতীর্ণ হইত। কাহারো মতে, রবিবার দিনে দুই বার উহা নাযিল হইত। এই কারণে রবিবারকে উৎসব দিবস হিসাবে গণ্য করে (ইবনুল জাওযী, প্রাগুক্ত, ২খ, page ৩৪২)।
আর এমনিভাবে তাহারা অভাব-অনটন ও রোগ-বালাই হইতে মুক্তি লাভ করিল। অতঃপর যাহারা উহা ভক্ষণ করা হইতে বিরত ছিল, তাহারা উহাদের অবস্থা প্রত্যক্ষ করিয়া অনুতপ্ত হইল। অতঃপর বলা হয় যে, ইহা দিনে একবার অবতীর্ণ হইত। এমনকি বলা হয় যে, প্রায় সাত হাজার লোক উহা ভক্ষণ করিত। ইহার পর যেমনিভাবে সালেহ (আ)-এর উটনী হইতে একদিন পরপর দুধ পান করিত, তেমনিভাবে মাইদাও একদিন পরপর অবতীর্ণ হইতে শুরু করে। তখন ঈসা (আ) মাইদাকে গরীব ও অভাবীদের জন্য নির্দিষ্ট করিয়া দেন। আর এই বিষয়টি অনেকের কাছে কষ্টদায়ক বলিয়া মনে হয় এবং মুনাফিক শ্রেণীর লোকজন বির্তকের সৃষ্টি করিল। তখন তাহা নাযিল হওয়া বন্ধ হইয়া গেল। আর যাহারা বিতর্ক সৃষ্টি করিয়াছিল তাহারা শূকরে রূপান্তরিত হইয়া গেল (ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ, page ৮০)। তবে শাহ আবদুল কাদির (র) বলেন, শূকরে রূপান্তরিত হওয়ার ঘটনাটি বিশুদ্ধ নহে (সিওহারবী, প্রাগুক্ত, page ৮৮, টীকা দ্র.)।
ইব্ন আবী হাতেম ইন্ন জরীর তাবারী, আম্মার ইবন ইয়াসির (রা) হইতে বর্ণনা করেন, নবী করীম (স) বলেন, আসমান হইতে মাইদা নাযিল হইয়াছিল তাহাতে রুটি ও গোশত ছিল। তাহাদেরকে আদেশ করা হইয়াছিল তাহারা যেন খিয়ানত না করে এবং আগামী দিনের জন্য সঞ্চয় করিয়া না রাখে। অথচ তাহারা খিয়ানত করিল এবং আগামী দিনের জন্য সঞ্চয় করিয়া রাখিল, ফলে তাহারা বানর ও শূকরে রূপান্তরিত হইয়া গেল।
ইন্ন কাছীর এই হাদীছটি মহানবী (সা) হইতে বর্ণিত কিনা সেই ব্যাপারে মন্তব্য করিয়াছেন এবং বলিয়াছেন, ইবন জারীর এই হাদীছটি অন্য সূত্রে শুধু আম্মার (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) হইতে নহে। ইহাই বিশুদ্ধতর (প্রাগুক্ত)।
উল্লেখ্য যে, মাইদা অবতীর্ণের ঘটনাটি খৃস্টানদের কাছে প্রচলিত সুসমাচারসমূহে সরাসরি উল্লেখ্য করা হয় নাই। তবে যোহন সুসমাচারে স্বর্গ হইতে নাযিল হওয়া রুটির কথা উল্লেখ আছে (৬ঃ ৬১)। তবে আল-কুরআন বর্ণিত উক্ত মাইদার কথা সরাসরি উল্লেখ না থাকিলেও মথি সুসমাচারের মতে একবার চার হাজার লোককে সাতখানা রুটি ও কয়েকটি মাছ দ্বারা আলৌকিকভাবে খাওয়ানোর ঘটনা উল্লেখ আছে (মথি, ১৫: ৩৩-৩৮)। এমনিভাবে লুকের অন্য এক বর্ণনায় দেখা যায়, ঈসা (আ) পাঁচটি রুটি ও দুইটি মাছ দ্বারা পাঁচ হাজার লোককে খাওয়াইয়াছিলেন (লুক ৯:১০-১৭)।
(ঙ) গায়বী খবর প্রদান: অদৃশ্য জগতের কিংবা বস্তুগত কার্যকারণের সংযোগ ব্যতীতই কোন কিছু জানার সম্ভাব্যতাকে প্রমাণের জন্য আল্লাহ পাক তাঁহার নবীগণকে অদৃশ্য বিভিন্ন বিষয় অবহিত করেন। ফলে তাঁহারা সেইসব বিষয় জানিতে পারেন যেগুলি সাধারণ মানুষ জানিতে পারে না। এমনিভাবে হযরত ঈসা (আ)-কে আল্লাহ পাক এক অলৌকিক ক্ষমতা প্রদান করিয়াছিলেন, যাহার মাধ্যমে তিনি কিছু কিছু অদৃশ্য বিষয় অবহিত হইতে পারিতেন। আল-কুরআনের বর্ণনা মতে, লোকজন যাহা তাহাদের ঘরে আহার করিত এবং যাহা মওজুদ রাখিত তাহা সম্পর্কে হযরত ঈসা (আ) অবহিত করিতে পারিতেন। উহাতে লোকজন আশ্চর্য হইয়া যাইত।
অপরদিকে কাতাদা (র) বলেন, উল্লিখিত ঘটনাটি মাইদা সম্পর্কিত। বানু ইসরাঈল যেখানেই থাকিত, তাহাদের নিকট আকাশ হইতে মাইদা নামিয়া আসিত। অনেকটা মান্ন ও সালওয়ার ন্যায় (তাফসীরে তাবারী শরীফ, প্রাগুক্ত, page ৪০৫; তাফসীরে মাযহারী, ২খ, page ২৯৭)। তবে গায়বী খবর দানের বিষয়টি মাইদার সহিত নির্দিষ্ট করার কোন প্রমাণ নাই।
ইমাম ইব্ন জারীর তাবারী উল্লেখ করেন, লোকজন ঘরে কি খাইয়া আসিল, কি মওজুদ করিল ইহা সম্পর্কে যদি কেহ প্রশ্ন করে যে, উহাতে হযরত ঈসা (আ)-এর নবুওয়াতের প্রমাণ হয় না, কেননা অনেক জ্যোতিষী ও গণকও এই জাতীয় খবর দিয়া থাকে। আর ক্ষেত্রবিশেষে তাহা সত্যও হইয়া যায়। উত্তরে বলা যায়, জ্যোতিষী ও গণক ব্যক্তিরা এতদসম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা ও কৌশলের মাধ্যমে দিয়া থাকে। পক্ষান্তরে হযরত ঈসা (আ) তথা নবী-রাসূলগণের ব্যাপারটি তেমন নহে, বরং হযরত ঈসা (আ) চিন্তা-গবেষণা ও কৌশল ব্যতিরেকে সরাসরি আল্লাহ কর্তৃক অবহিত হইয়া এইসব সংবাদ দিতেন। এইভাবেই অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে আম্বিয়া কিরামের জ্ঞান আর জ্যোতিষী ও গণকদের জ্ঞান এক নহে (তাফসীরে তাবারী, প্রাগুক্ত, page ৪০২-৪০৩)।
উল্লেখ্য, আল-কুরআনের বর্ণনানুসারে হযরত ঈসা (আ)-এর উপরিউক্ত পাঁচটি মু'জিযা প্রধান। কিন্তু বাংলা ইসলামী বিশ্বকোষে ইহার সংখ্যা নয়টি বলিয়া উল্লেখ্য করা হইয়াছে। উপরিউক্ত পাঁচটিসহ বাকী চারটি নিম্নরূপ:
(১) কোন পিতার মাধ্যম ছাড়াই জন্মগ্রহণ (৩: ৪৫-৪৬)।
(২) দোলনায় কথা বলা (প্রাগুক্ত)।
(৩) জন্মগতভাবেই অন্য নবীগণের কিতাব সম্পর্কে অভিজ্ঞ হওয়া (৩: ৪৮, ৫: ১১০)।
(৪) আত্মা ও শরীরসহ জীবিতাবস্থায় আসমানে উত্তোলন (৪: ১৫৮)।
ইসলামী বিশ্বকোষ (৫খ, page ৫০৯)-এ বর্ণিত উপরিউক্ত চারটি বিষয়কে ঈসা (আ)-এর মু'জিযা না বলাই যথাযথ। কেননা মু'জিযা হইল নবুওয়াতের প্রমাণস্বরূপ এবং নবুওয়াত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জস্বরূপ। নবুওয়াতের দাবিদার ব্যক্তির মাধ্যমে অলৌকিক কিছু সংঘটিত হওয়া যাহা আল্লাহ পাকের ফয়সালা ও কুদরতে সম্পন্ন হইয়া থাকে। অতএব উপরিউক্ত চারটি বিষয়ই অলৌকিক ঘটনা নিঃসন্দেহে। আল-কুরআনেও ঈসা (আ)-কে সৃষ্টির নিদর্শন বলিয়া অবহিত করা হইয়াছে। কিন্তু প্রথমোক্ত তিনটি তাঁহার নবুওয়াতের পূর্ববর্তী জীবনের ঘটনা এবং শেষোক্তটি নবুওয়াতের সর্বশেষ ঘটনা। অতএব চারটি বিষয়ই ঈসা (আ)-এর নবুওয়াতী জীবনে তাঁহার মু'জিযা ছিল না, বরং তাহার সৃষ্টির নিদর্শন।
📄 নিরাপদ আশ্রয় লাভের উদ্দেশ্যে বায়তুল মুকাদ্দাস ত্যাগ
জন্মলাভের পর হযরত ঈসা (আ) প্রতিকূল পরিবেশের সম্মুখীন হন। তাঁহার অলৌকিক জন্ম, নবজাতক হিসাবে দোলনায় কথা বলা এবং আরও অলৌকিক কিছু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে লোকজন ধারণা করিতে শুরু করে যে, সম্ভবত এই শিশুই তাহাদের প্রতিশ্রুত মাসীহ বা ত্রাণকর্তা আর এই শিশুর বিষয়টি সেই সময়ে ইয়াহুদী রাজা হেরোদের দৃষ্টিও এড়ায় নাই। বর্ণিত আছে যে, হেরোদ রাজাও শিশু ঈসা (আ)-কে গোপনে হত্যা করিবার জন্য ষড়যন্ত্র শুরু করিয়াছিল। অন্যদিকে কিছু কিছু মুনাফিক শ্রেণীর ব্যক্তিদের মাধ্যমে ঈসা (আ)-এর জন্মকে কেন্দ্র করিয়া তিক্ত রটনাও গোটা পরিবেশকে বিষাক্ত করিয়া তুলিতেছিল। মোটকথা, এই অস্বস্তিকর ও নিরাপত্তাহীন পরিবেশে ঈসা (আ)-কে লালন-পালন করার জন্য তাহার মা উপযুক্ত মনে করেন নাই। তাই তিনি সন্তর্পণে ঈসা (আ)-কে লইয়া বায়তুল মুকাদ্দাস ত্যাগ করিলেন, যাহাতে শিশু ঈসার পরিচয় গোপন রাখিয়া সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে লালন-পালন করা সম্ভব হয়।
বায়তুল মুকাদ্দাস হইতে বাহির হইয়া ঈসা (আ)-এর মা কোথায় গিয়াছিলেন তাহা লইয়া অনেক কিংবদন্তি ইয়াহুদী ও খৃস্টান সমাজে সৃষ্টি হইয়াছে, যাহার যথার্থতা সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নহে।
বায়তুল মুকাদ্দাসের ইবাদতখানায় ঈসা (আ)-এর খৎনা অনুষ্ঠান সম্পন্ন হওয়ার পর মারয়াম (আ) স্বীয় সন্তানকে লইয়া গালীল প্রদেশে তাঁহার নিজ গ্রাম নাসরতে ফিরিয়া যান। আর এইভাবে তিনি সেইখানে লালিত-পালিত হন (লুক, ২:৩৯-৪০)।
রাজা হেরোদ সমস্ত প্রধান ধর্মীয় নেতা ডাকিয়া ইয়াহূদীর বেথেলহামে ঈসা (আ)-এর জন্মের বিষয়টি নিশ্চিত হন এবং তাঁহাকে হত্যা করিবার অভিপ্রায়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন (মথি, ২:১৬)। এদিকে মারয়ামের সহযোগী সাথী ইউসুফ স্বপ্নে আদিষ্ট হইলেন যে, হেরোদ শিশু ঈসাকে বিনাশ করিতে চায়। তাই তুমি মা-পুত্রকে লইয়া অতি শীঘ্র মিসরে চলিয়া যাও। আর তিনি ঘুম হইতে উঠিয়া তাহাদেরকে লইয়া মিসরে চলিয়া গেলেন এবং হেরোদের মৃত্যু পর্যন্ত সেখানেই রহিলেন (বার্নাবাসের বাইবেল, page ৬-৭; মথি সুসমাচার, ২:১৩-১৪)।
স্মর্তব্য, হযরত ঈসা (আ)-কে নাসরতে লইয়া যাওয়ার বর্ণনাটি একমাত্র লুক সুসমাচার সূত্রেই পাওয়া যায়। কিন্তু অপর অধিকাংশ বর্ণনায় দেখা যায় যে, তাঁহাকে লইয়া মিসরেই যাওয়া হইয়াছিল। যদিও মিসরে পালাইয়া যাওয়ার উপলক্ষ বা কারণ সম্পর্কে মতভেদ আছে।
আল্লামা রহমতুল্লাহ কীরানবী এই ঘটনার সমালোচনা করিয়াছেন। কেননা ঘটনার এক পর্যায়ে বলা হয় যে, পারস্য পণ্ডিতেরা ঈসা (আ)-এর সন্ধান লাভ করার পর স্বপ্নে আদিষ্ট হইয়া যখন নিজ দেশে ফিরিয়া গেলেন এবং হেরোদ রাজার সাথে সাক্ষাৎ করিলেন না তখন হেরোদ ভীষণ রাগিয়া গিয়াছিল এবং সেই পণ্ডিতদের নিকট হইতে যে সময়ের কথা সে জানিয়াছিল সেই সময়ের হিসাব মতে দুই বৎসর ও তাহার কম বয়সের যত ছেলে বেথেলহাম ও তাহার আশেপাশের জায়গাগুলিতে ছিল সকলকে হত্যা করার হুকুম দিয়াছিল (মথি, ২:১৬-১৭)।
আল্লামা রহমতুল্লাহ কীরানবী বলেন, এই বিষয়টি ঐতিহাসিক বর্ণনা ও যুক্তি উভয় দিক দিয়াই ভ্রান্ত বলিয়া ধরা যায়। ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, খৃস্টান ঐতিহাসিকসহ অন্যান্য নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিকদের কেহই ঐ ঘটনার উল্লেখ করেন নাই (রহমতুল্লাহ কীরানবী, ইযহারুল হক, ২খ, page ৩০৭-৩০৮)।
তাঁহার মিসর গমনের প্রাক্কালে প্রতিকূল পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ার আরও কিছু কারণ বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া যায়। কাযী মুহাম্মাদ ছানাউল্লাহ পানীপথী (র) সুদ্দী (র)-এর সূত্রে একটি বর্ণনা উল্লেখ করেন। সূদ্দী (র) বলেন, ঈসা (আ) মকতবে শিশুদের বলিতেন, কাহার বাপ কি খাবার তৈরী করিয়াছে। কাহাকে ও বলিতেন, যাইয়া দেখ বাড়ির সকলে এই খাইয়াছে। তোমার জন্য অমুক অমুক খাবার তুলিয়া রাখিয়াছে। ছেলেটি বাড়ি চলিয়া যাইত এবং সে খাবার চাহিত, না দিলে বায়না ধরিত, কান্নাকাটি করিত, শেষ পর্যন্ত তাহাদেরকে তাহা দিতেই হইত। তাহারা জিজ্ঞাসা করিত, কে বলিয়াছে তোমার জন্য এই খাবার রাখা হইয়াছে। সে বলিত, ঈসা (আ)। ফলে তাহারা তাহাদের শিশুদের আটকাইয়া রাখিল এবং বলিল, সে একজন যাদুকর। তাঁহার কাছে আর যাইও না। একবার তাহারা শিশুদের একটি ঘরে একত্র করিল। ঈসা (আ) তাহাদের ডাকিতে আসিলেন, কিন্তু তাহারা বলিল, তাহারা এইখানে নাই। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, তাহা হইলে এই ঘরে কি? তাহারা বলিল, এক পাল শূকর। তিনি বলিলেন : তবে তাহাই হইবে। তিনি চলিয়া গেলে তাহারা শিশুদের ছাড়িয়া দিতে আসিয়া দেখিল একপাল শূকর। মুহূর্তের মধ্যে এই সংবাদ বনূ ইসরাঈলে ছড়াইয়া পড়িল। ফলে তাহারা তাঁহার পিছনে লাগিয়া গেল। ঈসা (আ)-এর মা ভয় পাইয়া গেলেন, হয়ত তাহারা ঈসা (আ)-কে মারিয়াই ফেলিবে। সুতরাং তিনি তাঁহাকে লইয়া একটি গাধায় সওয়ার হইলেন এবং মিসরে পালাইয়া গেলেন (কাযী ছানাউল্লাহ পানিপথী, তাফসীরে মাযহারী, ২খ., page ২৯৬-২৯৭; তাফসীরে তাবারী, ৫খ, page ৪০৪)।
মোটকথা, একদিকে হেরোদের ষড়যন্ত্র, অন্যদিকে ঈসা (আ)-এর মাধ্যমে আশ্চর্যজনক ঘটনা প্রকাশিত হইবার প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট প্রতিকূল পরিস্থিতি তাঁহাকে অধিকাংশের মতে মিসরে আশ্রয় লইতে বাধ্য করিল। এই ধরনের আশ্রয়ের কথা আল-কুরআনেও উল্লেখ করা হইয়াছে। তবে তাহা মিসরে না অন্য কোথাও তাহা স্পষ্টভাবে বলা হয় নাই। বলা হইয়াছে :
وَجَعَلْنَا ابْنَ مَرْيَمَ وَأُمَّهُ آيَةً وَأَوَيْنَهُمَا إِلَى رَبِّوَةٍ ذَاتِ قَرَارٍ وَمَعِين .
"আর আমি মারয়াম তনয় ও তাহার জননীকে করিয়াছিলাম এক নিদর্শন, তাহাদিগকে আশ্রয় দিয়াছিলাম এক নিরাপদ ও প্রস্রবণবিশিষ্ট উচ্চ ভূমিতে” (২৩: ৫০)।
আল্লামা ইব্ন কাছীর বলেন, আয়াতে 'রাবওয়া' শব্দটির অর্থ সমতল ভূমি হইতে উচ্চ এলাকা যাহার শীর্ষদেশ সমতল ও বাসযোগ্য। এই প্রশস্ত উচ্চ ভূমি হওয়া সত্ত্বেও সেইখানে ঝরণাধারা প্রবাহিত ছিল (ইব্ন কাছীর, প্রাগুক্ত, ২খ, page ৭১-৭২)।
এই অঞ্চলটি সম্পর্কে মুফাসসিরীনে কেরাম-এর মধ্যে মতভেদ রহিয়াছে। কাহারও মতে ঈসার জন্মস্থান বেথেলহাম, কাহারও মতে বর্তমান দামিক্কের নদীমাতৃক অঞ্চল, কাহারও মতে রামলা অঞ্চল, কাহারও মতে মিসর (প্রাগুক্ত, page ৭২; আরও দ্র. তাফসীরে নাসাফী, ২খ, page ১৩৭)। তবে ইহার যে পরিচয় উক্ত আয়াতে বিধৃত হইয়াছে তাহা উচ্চ ভূমিতে নদী বা ঝর্না প্রবাহিত কোন এলাকায় হইবে। অধিকাংশের মতে, তাহা নীল নদ বিধৌত মিসর অঞ্চলকেই বুঝানো হইয়াছে। আল্লামা ইব্ন কাছীর খৃস্টানগণ ধারণা করিত যে, ঈসা (আ)-কে মিসরেই লইয়া যাওয়া হইয়াছিল তাঁহার মাতাসহ তিনি 'আয়ন শামস নামক শহরে বসবাস করিয়াছিলেন। খৃস্টানরা আরও বলে যে, মা মারয়াম ও মাসীহ যে গাছের ছায়াতলে অবস্থান করিতেন সেই গাছটি অনেক দিন পর্যন্ত টিকিয়াছিল। খৃস্টানগণ ইহার নামকরণ করিয়াছিল শাজারাতুল 'আযারা বা কুমারী বৃক্ষ যাহা পরিদর্শনের জন্য লোকজন ভ্রমণ করিত। ইহা আল-মাতারিয়া নামক শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত (আব আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার, প্রাগুক্ত)।
ইহা ছাড়া ফ্রান্সের এক প্রত্নতাত্ত্বিক মিসর হইতে ৮৩ খৃস্টাব্দের একটি লিখিত পাণ্ডুলিপি আবিষ্কার করেন, মাসীহ বাল্যকালে মিসরে অবস্থানের কথা উল্লেখ আছে (ইসলামী ইনসাইক্লোপেডিয়া, উর্দু, সম্পাদনা সৈয়দ কাসিম মাহমুদ, page ১১০৮)।
📄 স্বদেশ নাসেরাতে প্রত্যাবর্তন ও বসবাস
হযরত ঈসা (আ)-এর মাতার জন্মস্থান ছিল নাসরাত জনপল্লী। হযরত মারয়াম স্বীয় সন্তানকে লইয়া কখন বিদেশ বিভূঁই হইতে স্বদেশভূমি নাসেরাতে আসিয়াছিলেন সেই ব্যাপারে মতবিরোধ আছে। মথি সুসমাচার, বার্নাবাসের বাইবেল ও কতিপয় মুসলিম ঐতিহাসিকের মতে ইয়াহুদী রাজা হেরোদের মৃত্যুর পরই তিনি মিসর হইতে নাসেরাতে চলিয়া আসিয়াছিলেন (মথি, ২:২০-২৩; বার্নাবাসের বাইবেল, page ৭; তারীখে তাবারী, ১খ, page ৭২৯)। বার্নাবাসের বর্ণনামতে তখন ঈসা (আ)-এর বয়স ছিল সাত বৎসর (বার্নাবাসের বাইবেল, প্রগুক্ত)।
ওয়াইব ইবন মুনাব্বিই-এর এক বর্ণনায় দেখা যায়, ঈসা (আ)-এর ১২ বছর বয়স হওয়া পর্যন্ত তিনি মিসরেই ছিলেন। অন্য বর্ণনায় দেখা যায়, তিনি সেখানে ১৩ বৎসরে পদার্পণ করিবার পর তাঁহাকে মিসর হইতে জেরুসালেমে ফিরিয়া আসিবার আদেশ দেয়া হয় (ইবন কাছীর, প্রাগুক্ত, page ৭০-৭২)।
আল্লামা হিফযুর রহমান সিউহারবী উল্লেখ করেন, হযরত মারয়াম (আ) শিশু ঈসা (আ)-কে লইয়া মিসরে তাঁহার কোন আত্মীয়ের কাছে চলিয়া যান এবং পরে সেখান হইতে নাসেরায় চলিয়া আসেন। ঈসা (আ) যখন তের বৎসরে পদার্পণ করিলেন তখন তিনি তাঁহাকে সাথে করিয়া পুনরায় বায়তুল মুকাদ্দাসে ফিরিয়া আসিলেন (সিওহারবী, কাসাসুল কুরআন, ৪খ, page ৪১)।
মথি ও বার্নাবাসের বাইবেল হযরত ঈসা (আ) ও তাঁহার মাতার মিসর হইতে ফিরিয়া আসার উপলক্ষ হিসাবে উল্লেখ করা হয় যে, হেরোদের মৃত্যুর পর একদা স্বপ্নযোগে মারয়ামের সাথী ইউসুফ আদিষ্ট হইলেন যে, তিনি যেন তাহাদেরকে লইয়া ইয়াহুদায় ফিরিয়া আসেন (বার্নাবাসের বাইবেল, page ৭; মথি, ২: ১৯-২০)। অন্য বর্ণনায় আছে যে, ঈসা (আ)-এর বয়স বার অতিবাহিত হওয়ার পর বায়তুল মুকাদ্দাসের শাসকের মৃত্যু হইলে হযরত যাকারিয়া (আ) হযরত মারয়ামকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। তখন হযরত মারয়াম (আ) তাঁহার সন্তানসহ বায়তুল মুকাদ্দাসে ফিরিয়া আসিলেন (ইসলামী বিশ্বকোষ, ইসলামিক ফাউণ্ডেশন, ঢাকা, বাংলাদেশ, ৫খ, page ৫০৫)।
উল্লেখ্য যে, খৃস্টানদের বাইবেলসহ মুসলিম ঐতিহাসিকদের অধিকাংশ কিতাবে বর্ণিত হয় যে, নবুওয়াত লাভ পর্যন্ত তিনি সেই নাসেরাত পল্লীতেই বসবাস করিয়াছিলেন এবং খৃস্টানদের কিছু কিছু উৎস ইংগিত করে যে, সেই নাসরাত হইতে তিনি মারয়াম এবং ইউসুফের সহিত বার্ষিক উৎসব বা ঈদুল ফেসাখ পালনের জন্য প্রতি বৎসর জেরুসালেমে আগমন করিতেন।
তাঁহার বয়স যখন বার বৎসর তখন জেরুসালেমে ঈদ উৎসবে অংশগ্রহণ শেষে ইবাদতখানার ইয়াহুদী আলেমদের সহিত আলোচনায় লিপ্ত হইয়াছিলেন বলিয়া উল্লেখ আছে। অবশেষে মারয়াম এক দিনের পথ চলিয়া যাওয়ার পর তাঁহাকে না পাইয়া আবার জেরুসালেমে ফিরিয়া আসিয়া ইবাদতখানায় ঈসা (আ)-কে পাইলেন। অতঃপর ঈসা (আ) তাহাদের সঙ্গে নাসেরাতে ফিরিয়া গেলেন এবং তাহাদের সাথেই রহিলেন (দ্র. লুক, ২: ৪১-৫১)। ইহা হইতে বুঝা যায়, নবুওয়াত লাভ পর্যন্ত সময়টুকু তিনি নাসেরাতেই কাটাইয়াছিলেন। সেইজন্য তাঁহাকে নাসরাতের ঈসা বলিয়া অভিহিত করা হইত (মথি, ২: ২৩)।
তবে কোন কোন বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, তিনি মিসর হইতে জেরুসালেমে ফিরিয়া আসেন এবং নবুওয়াত লাভ পর্যন্ত তিনি সেখানেই অবস্থান করিয়াছিলেন (ইবন কাছীর, ২খ, page ৭২)। তবে ইহা তৎকালীন প্রেক্ষাপট ও প্রসিদ্ধ বর্ণনার পরিপন্থী। কারণ মথি ও বার্নাবাসের বাইবেলের তথ্যে দেখা যায় যে, হেরোদ মুত্যুবরণ করিলেও তাহার পুত্র আকিলাস সেই পদে সমাসীন হন। তিনিও পিতার ন্যায় প্রতিহিংসাপরায়ণ জানিতে পারিল সেখানে বসবাস ভীতিপ্রদ বিবেচনায় ঈসা (আ)-কে ইয়াহূদীয়া প্রদেশের জেরুসালেম হইতে গালীল প্রদেশের নাসরাত জনপল্লীতে লইয়া যাওয়া হয় এবং তিনি সেখানেই বসবাস করেন (বার্নাবাসের বাইবেল, প্রাগুক্ত, ২: ২২-২৩)। অতএব তিনি দুইবার হিজরত করেন। একবার জেরুসালেম হইতে মিসরে, আবার জেরুসালেম হইতে নাসেরাতে।
হযরত ঈসা (আ)-এর মাতার জন্মস্থান ছিল নাসরাত জনপল্লী। হযরত মারয়াম স্বীয় সন্তানকে লইয়া কখন বিদেশ বিভূঁই হইতে স্বদেশভূমি নাসেরাতে আসিয়াছিলেন সেই ব্যাপারে মতবিরোধ আছে। মথি সুসমাচার, বার্নাবাসের বাইবেল ও কতিপয় মুসলিম ঐতিহাসিকের মতে ইয়াহুদী রাজা হেরোদের মৃত্যুর পরই তিনি মিসর হইতে নাসেরাতে চলিয়া আসিয়াছিলেন (মথি, ২:২০-২৩; বার্নাবাসের বাইবেল, page ৭; তারীখে তাবারী, ১খ, page ৭২৯)। বার্নাবাসের বর্ণনামতে তখন ঈসা (আ)-এর বয়স ছিল সাত বৎসর (বার্নাবাসের বাইবেল, প্রগুক্ত)।
ওয়াইব ইবন মুনাব্বিই-এর এক বর্ণনায় দেখা যায়, ঈসা (আ)-এর ১২ বছর বয়স হওয়া পর্যন্ত তিনি মিসরেই ছিলেন। অন্য বর্ণনায় দেখা যায়, তিনি সেখানে ১৩ বৎসরে পদার্পণ করিবার পর তাঁহাকে মিসর হইতে জেরুসালেমে ফিরিয়া আসিবার আদেশ দেয়া হয় (ইবন কাছীর, প্রাগুক্ত, page ৭০-৭২)।
আল্লামা হিফযুর রহমান সিউহারবী উল্লেখ করেন, হযরত মারয়াম (আ) শিশু ঈসা (আ)-কে লইয়া মিসরে তাঁহার কোন আত্মীয়ের কাছে চলিয়া যান এবং পরে সেখান হইতে নাসেরায় চলিয়া আসেন। ঈসা (আ) যখন তের বৎসরে পদার্পণ করিলেন তখন তিনি তাঁহাকে সাথে করিয়া পুনরায় বায়তুল মুকাদ্দাসে ফিরিয়া আসিলেন (সিওহারবী, কাসাসুল কুরআন, ৪খ, page ৪১)।
মথি ও বার্নাবাসের বাইবেল হযরত ঈসা (আ) ও তাঁহার মাতার মিসর হইতে ফিরিয়া আসার উপলক্ষ হিসাবে উল্লেখ করা হয় যে, হেরোদের মৃত্যুর পর একদা স্বপ্নযোগে মারয়ামের সাথী ইউসুফ আদিষ্ট হইলেন যে, তিনি যেন তাহাদেরকে লইয়া ইয়াহুদায় ফিরিয়া আসেন (বার্নাবাসের বাইবেল, page ৭; মথি, ২: ১৯-২০)। অন্য বর্ণনায় আছে যে, ঈসা (আ)-এর বয়স বার অতিবাহিত হওয়ার পর বায়তুল মুকাদ্দাসের শাসকের মৃত্যু হইলে হযরত যাকারিয়া (আ) হযরত মারয়ামকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। তখন হযরত মারয়াম (আ) তাঁহার সন্তানসহ বায়তুল মুকাদ্দাসে ফিরিয়া আসিলেন (ইসলামী বিশ্বকোষ, ইসলামিক ফাউণ্ডেশন, ঢাকা, বাংলাদেশ, ৫খ, page ৫০৫)।
উল্লেখ্য যে, খৃস্টানদের বাইবেলসহ মুসলিম ঐতিহাসিকদের অধিকাংশ কিতাবে বর্ণিত হয় যে, নবুওয়াত লাভ পর্যন্ত তিনি সেই নাসেরাত পল্লীতেই বসবাস করিয়াছিলেন এবং খৃস্টানদের কিছু কিছু উৎস ইংগিত করে যে, সেই নাসরাত হইতে তিনি মারয়াম এবং ইউসুফের সহিত বার্ষিক উৎসব বা ঈদুল ফেসাখ পালনের জন্য প্রতি বৎসর জেরুসালেমে আগমন করিতেন।
তাঁহার বয়স যখন বার বৎসর তখন জেরুসালেমে ঈদ উৎসবে অংশগ্রহণ শেষে ইবাদতখানার ইয়াহুদী আলেমদের সহিত আলোচনায় লিপ্ত হইয়াছিলেন বলিয়া উল্লেখ আছে। অবশেষে মারয়াম এক দিনের পথ চলিয়া যাওয়ার পর তাঁহাকে না পাইয়া আবার জেরুসালেমে ফিরিয়া আসিয়া ইবাদতখানায় ঈসা (আ)-কে পাইলেন। অতঃপর ঈসা (আ) তাহাদের সঙ্গে নাসেরাতে ফিরিয়া গেলেন এবং তাহাদের সাথেই রহিলেন (দ্র. লুক, ২: ৪১-৫১)। ইহা হইতে বুঝা যায়, নবুওয়াত লাভ পর্যন্ত সময়টুকু তিনি নaserাতেই কাটাইয়াছিলেন। সেইজন্য তাঁহাকে নাসরাতের ঈসা বলিয়া অভিহিত করা হইত (মথি, ২: ২৩)।
তবে কোন কোন বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, তিনি মিসর হইতে জেরুসালেমে ফিরিয়া আসেন এবং নবুওয়াত লাভ পর্যন্ত তিনি সেখানেই অবস্থান করিয়াছিলেন (ইবন কাছীর, ২খ, page ৭২)। তবে ইহা তৎকালীন প্রেক্ষাপট ও প্রসিদ্ধ বর্ণনার পরিপন্থী। কারণ মথি ও বার্নাবাসের বাইবেলের তথ্যে দেখা যায় যে, হেরোদ মুত্যুবরণ করিলেও তাহার পুত্র আকিলাস সেই পদে সমাসীন হন। তিনিও পিতার ন্যায় প্রতিহিংসাপরায়ণ জানিতে পারিল সেখানে বসবাস ভীতিপ্রদ বিবেচনায় ঈসা (আ)-কে ইয়াহূদীয়া প্রদেশের জেরুসালেম হইতে গালীল প্রদেশের নাসরাত জনপল্লীতে লইয়া যাওয়া হয় এবং তিনি সেখানেই বসবাস করেন (বার্নাবাসের বাইবেল, প্রাগুক্ত, ২: ২২-২৩)। অতএব তিনি দুইবার হিজরত করেন। একবার জেরুসালেম হইতে মিসরে, আবার জেরুসালেম হইতে নাসেরাতে।