📄 পিতাবিহীন জন্ম ও আলকুরআন
হযরত ঈসা (আ)-এর ব্যাপারে জমহুর তথা অধিকাংশ উলামার বিশ্বাস যে, তিনি পিতাবিহীন জন্মলাভ করিয়াছেন। কুরআন ও সহীহ হাদীসসমূহের স্পষ্ট ভাষ্য দ্বারা তাহাই প্রমাণিত। একথা ঠিক যে, আল-কুরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয় নাই যে, ঈসা (আ)-এর কোন পিতা নাই। আধুনিক যুগে স্যার সৈয়দ আহমদ খান এবং ডঃ তৌফিক সিদ্দীকিসহ আরও কয়েকজন ব্যক্তি ভুল ব্যাখ্যা ও অলৌকিকতাকে এড়াইয়া যাওয়ার প্রয়াসে জমহূরের ঐ বিশ্বাস হইতে বিচ্যুত হইয়া গিয়াছেন (মাওলানা আবুল কালাম আযাদ, তরজমানুল কুরআন, ২খ., ৪৪৪-৪৫)। আর দুর্ভাগ্যবশত আধুনিক শিক্ষিত অনেকেই সেই ধরনের ধ্যান-ধারণা পোষণ করিতে শুরু করিয়াছেন। হযরত ঈসার প্রভুত্ব প্রমাণে একদিকে একদল খৃস্টান যেমন তাঁহাকে খোদার পুত্র সাব্যস্ত করিতে ব্যস্ত, অন্যদিকে ইয়াহুদীরা তাঁহার জন্মকে অবৈধ বলিতেও দ্বিধাবোধ করে নাই।
(১) মারয়াম (আ)-এর সাথে কোন পুরুষের দৈহিক সম্পর্ক ঘটে নাই। তিনি নিজেকে হেফাজত করিয়াছিলেন। আর তখনই তাঁহার গর্ভে ঈসা (আ)-এর রূহ ফুঁকিয়া দেওয়া হয়। এই কথা আল-কুরআনে স্পষ্টভাবে বলা হইয়াছে: وَمَرْيَمَ ابْنَتَ عِمْرَنَ الَّتِي أَحْصَنَتْ فَرْجَهَا فَنَفَخْنَا فِيهِ مِنْ رُوحِنَا وَصَدَّقَتْ بِكَلِمَتِ رَبَّهَا وَكُتُبِهِ وَكَانَتْ مِنَ الفنتين. "আরও দৃষ্টান্ত দিতেছেন ইমরান তনয়া মারয়ামের, যে তাহার সতীত্ব রক্ষা করিয়াছিল। ফলে আমি তাহার মধ্যে রূহ ফুঁকিয়া দিয়াছিলাম এবং সে তাহার প্রতিপালকের বাণী ও তাহার কিতাবসমূহ সত্য বলিয়া গ্রহণ করিয়াছিল। সে ছিল অনুগতদিগের একজন" (৬৬ : ১২)।
(২) আল-কুরআনে মারয়ামের মত তাঁহার সন্তানের পূত-পবিত্রতা, দুনিয়া ও আখেরাতে লোক সমাজে সম্মানিত হওয়ার কথাও ব্যক্ত করা হইয়াছে। যেমন ঈসা (আ) সম্পর্কে আল্লাহর বাণী : وَجِيهًا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَمِنَ الْمُقَرَّبِينَ . "সে ইহ ও পরলোকে সম্মানিত এবং সান্নিধ্যপ্রাপ্তগণের অন্যতম হইবে" (৩ : ৪৫)।
(৩) আল-কুরআনে একাধিক জায়গায় হযরত ঈসা (আ)-কে সৃষ্টির নিদর্শন বলা হইয়াছে। পিতা-মাতার মাধ্যমে স্বাভাবিক জন্ম হইলে তিনি নিদর্শন কিভাবে হইলেন? যেমন সূরা আম্বিয়াতে বলা হয় وَأَيَّتَهَا آيَةً لِلْعَالَمِينَ "এবং তাহার সন্তান জগৎবাসীর জন্য এক নিদর্শনস্বরূপ” (২১ : ৯১)। এমনিভাবে সূরা মুমিনূনে বলা হয়- وَجَعَلْنَا ابْنَ مَرْيَمَ وَأُمَّهُ آيَةً وَأَوَيْنَهُمَا إِلَى رَبِّوَةٍ ذَاتِ قَرَارٍ وَمَعِينٍ . "আর আমি মারয়ামের পুত্র (ঈসা) এবং তাহার মাকে (কুদরতের) নিদর্শনস্বরূপ বানাইয়াছি" (২৩ : ৫০)।
(৪) ঈসা (আ)-এর পিতামাতা উভয়ের মাধ্যমে স্বাভাবিক জন্ম হইলে আল-কুরআনে তাঁহাকে হযরত আদম (আ)-এর সহিত তুলনা করা হইত না। আদম (আ)-এর কোন পিতা-মাতা ছিল না। ইহা স্বীকৃত বিষয়। এমনিভাবে ঈসা (আ)-এর মাতা থাকিলেও পিতা ছিল না। পিতা না থাকার দিক দিয়া উভয়ের মধ্যে মিল আছে। সেজন্য তাঁহার সৃষ্টি আদম (আ)-এর সৃষ্টির সহিত তুলনা করা হয়। ইরশাদ হইয়াছে :
إِنَّ مَثَلَ عِيسَى عِنْدَ اللَّهِ كَمَثَلِ أَدَمَ خَلَقَهُ مِنْ تُرَابٍ ثُمَّ قَالَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ "আল্লাহ্র নিকট ঈসার দৃষ্টান্ত আদম (আ)-এর দৃষ্টান্ত সদৃশ। তিনি তাহাকে মৃত্তিকা হইতে সৃষ্টি করিয়াছিলেন, অতঃপর তাহাকে বলিয়াছিলেন, হও, ফলে সে হইয়া গেল” (৩ঃ ৫৯)।
(৫) মানব সমাজে সন্তানদেরকে সর্বদা পিতার সহিত সম্পর্কিত করিয়া সম্বোধন করা হয়। কিন্তু আল-কুরআনে হযরত ঈসা (আ)-কে ২৩ বার ইব্ন মারয়াম বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। ইহা হইতে বুঝা যায়, তাঁহার কোন পিতা ছিল না। এইজন্য তাঁহাকে ইব্ন মারয়াম বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে।
(৬) আল-কুরআনে আল্লাহ পাক বারবার ঘোষণা করিয়াছেন যে, তাঁহার কোন সন্তানাদি নাই। যাহারা আল্লাহ্ পুত্র সাব্যস্ত করিতে চায় তাহাদের ভ্রান্ত আকীদাও খণ্ডন করা হইয়াছে। কুরআন কারীমে বলা হইয়াছে :
ذلكَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ قَوْلَ الْحَقِّ الَّذِي فِيهِ يَمْتَرُونَ . مَا كَانَ لِلَّهِ أَنْ يَتَّخِذَ مِنْ وَلَدٍ سُبْحَنَهُ إِذَا قَضَى أمْرًا فَإِنَّمَا يَقُولُ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ
"এই-ই মারয়াম-তনয় ঈসা। আমি বলিলাম সত্য কথা, যে বিষয়ে উহারা বিতর্ক করে। সন্তান গ্রহণ করা আল্লাহর কাজ নহে, তিনি পবিত্র মহিমময়। তিনি যখন কিছু স্থির করেন তখন বলে, 'হও' এবং উহা হইয়া যায়” (১৯:৩৪-৩৫)।
অতএব আল-কুরআনের উপরিউক্ত স্পষ্ট বক্তব্যের পরও কাহাকেও ঈসা (আ)-এর পিতা সাব্যস্ত করার দাবি চরম ধৃষ্টতা প্রদর্শন বৈ কিছু নহে।
📄 ঈসা (আ) কতৃক শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (স)-এর আগমনের সুসংবাদ ঘোষণা
হযরত ঈসা (আ)-এর পয়গামের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এই যে, তিনি তাঁহার অনুসারীদেরকে তাঁহার পরবর্তী পয়গাম্বরের শুভাগমন সম্পর্কে সুসংবাদ প্রদান করিতেন। আর সেই পরবর্তী পয়গাম্বর বলিতে তিনি আখেরী নবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তাফা আহমদ মুজতবা (স)-কে বুঝাইয়াছিলেন। আল-কুরআনে এই সম্পর্কে বলা হইয়াছে: وَإِذْ قَالَ عِيسَى بْنُ مَرْيَمَ يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَى مِنَ التَّوْرَاةِ وَمُبَشِّرًا بِرَسُولٍ يَأْتِي مِنْ بَعْدِي اسْمُهُ أَحْمَدُ. "স্মরণ কর, মারয়াম তনয় ঈসা বলিয়াছিল, হে বানু ইসরাঈল! আমি তোমাদের নিকট আল্লাহ্র রাসূল, আমার পূর্ব হইতে তোমাদের নিকট যে তাওরাত রহিয়াছে আমি তাঁহার সমর্থক এবং আমার পরে আহমাদ নামে যে রাসূল আসিবেন আমি তাহার সুসংবাদদাতা" (৬১:৬)।
হযরত ঈসা (আ)-এর ঐ ঘোষণায় হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর নাম আহমাদ বলা হইয়াছে। আহমাদ শব্দের দুইটি অর্থ রহিয়াছেঃ (১) সেই ব্যক্তি যে আল্লাহ্ সর্বাধিক প্রশংসাকারী। (২) সেই ব্যক্তি যাহার সর্বাধিক প্রশংসা করা হইয়াছে অথবা বান্দাদের মধ্যে যে লোক সর্বাধিক প্রশংসাযোগ্য।
কুরতুবী উল্লেখ করেন যে, তিনি দুনিয়াতে প্রশংসিত, কারণ তাঁহার মাধ্যমে হেদায়াত দেওয়া হইয়াছে এবং তাঁহাকে ইলম ও হিকমতসহ পাঠাইয়া দুনিয়াবাসীকে উপকৃত করা হইয়াছে। এমনিভাবে তিনি অখিরাতেও শাফাআতের জন্য প্রশংসিত। তিনি প্রশংসাকারী তথা আহমাদ যেইজন্য তিনি প্রশংসিত তথা মুহাম্মাদ। আহমাদ বলিয়াই তিনি মুহাম্মাদ হইলেন (কুরতুবী, প্রাগুক্ত, ১৮খ, page ৮৪)।
উল্লেখ্য, একাধিক সহীহ হাদীছ হইতে প্রমাণিত যে, আহমাদ হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর অপর এক নাম। মহানবী (স) বলিয়াছেন: اسمى في التوراة احمد لاني احيد امتى عن النار واسمى في الزبور الماحي محا الله لى عبدة الأوثان واسمى في الانجيل احمد واسمى في القرآن محمد لأنى محمود في اهل السماء والارض . "তাওরাতে আমার নাম আহইয়াদ (রক্ষাকারী), কারণ আমার উম্মতকে আমি জাহান্নামের আগুন হইতে রক্ষা করিব, যাবুরে আমার নাম মাহী (বিলুপ্তকারী), কারণ আল্লাহ পাক আমার দ্বারা মূর্তি পূজা বিলুপ্ত করিয়া দিবেন। "ইনজীলে আমার নাম আহমাদ এবং আল-কুরআনে আমার নাম মুহাম্মাদ। কেননা আমি আসমান ও দুনিয়াবাসীর মধ্যে প্রশংসিত" (প্রাগুক্ত)।
হযরত জুবায়র ইবন মুতইম হইতে ইমাম মালেক, বুখারী, মুসলিম, দারিমী, তিরমিযী ও নাসায়ী এই অর্থেরই একাধিক হাদীছ উদ্ধৃত করিয়াছেন। সাহাবায়ে কিরামের মধ্যেও রাসূলে করীম (স)-এর এই নাম সুপরিচিত ছিল। হযরত হাসসান ইবন ছাবিতের কবিতার একটি ছত্র উহার প্রমাণ:
صلى الاله ومن تحت بعرشه والطيبون على المبارك احمد
“আল্লাহ এবং তাঁহার আরশের চতুষ্পার্শে সমবেত অসংখ্য ফেরেশতা ও সকল পবিত্র আত্মা মহান বরকতওয়ালা আহমাদ-এর প্রতি সালাত পেশ করেন"।
রাসূলে করীম (স)-এর নাম কেবল মুহাম্মাদ ছিল না, আহমদও তাঁহার একটি নাম ছিল, ইতিহাসের পৃষ্ঠাগুলি হইতেও ইহার সত্যতা প্রমাণিত। তাঁহার পূর্বে অন্য কাহারও নাম 'আহমাদ' ছিল বলিয়া আরব সাহিত্যে কোন উল্লেখ পাওয়া যায় না। আর এক কথায় রাসূলের সময় হইতে আজ পর্যন্ত সমস্ত মুসলিম উম্মাতের মধ্যে তাঁহার এই নাম সুপরিচিত ও সর্বজনবিদিত।
খৃস্টানদের হাতে বর্তমানে সুসমাচারগুলিতে প্রচুর রদবদল হওয়া সত্ত্বেও সেই সকল গ্রন্থে ঈসা (আ)-এর বাণী বলিয়া যাহা উক্ত হইয়াছে, তাহাতেও মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর আগমনের সুসংবাদ রহিয়াছে।
প্রথমত, ঈসা (আ) স্বর্গরাজ্য তথা আল্লাহর দেওয়া বিধানে পরিচালিত একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা আসন্ন বলিয়া তাঁহার একাধিক বাণীতে উল্লেখ করিয়াছেন (মথি, ৬: ১০)। লুক সুসমাচারে আরও আসিয়াছে, ঈসা (আ) তাঁহার ১২ জন অনুসারীকে ডাকিয়া সেই স্বর্গ- রাজ্যের সুসংবাদ দানের কথা বলিয়াছিলেন (লুক; ১-৪)। আর একথা সর্বজনবিদিত যে, সেই ধরনের আসমানী কর্তৃত্ব ঈসা (আ)-এর শরীআতের মাধ্যমে তাঁহার সুত্রে কিংবা তাঁহার অনুসারীদের যুগেও প্রতিষ্ঠিত হয় নাই, হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর শরীআতের মাধ্যমেই উহা যমীনে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল (রহমতুল্লাহ হিন্দী, প্রাগুক্ত, ৪খ, page ১১৭৪-১১৭৫)।
দ্বিতীয়ত, মথি সুসমাচারে অন্য স্থানে আসিয়াছে, হযরত ঈসা (আ) মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (স) ও তাঁহার উম্মত সম্পর্কে একটি উদাহরণের মাধ্যমে ভবিষ্যদ্বাণী করিয়াছেন। তাহা নিম্নরূপ:
"কিন্তু যাহারা প্রথম এমন অনেক লোক শেষে পড়িবে এবং যাহারা শেষের এমন অনেক লোক প্রথম হইবে। কেননা স্বর্গরাজ্য এমন একজন গৃহকর্তার তুল্য যিনি প্রভাতকালে আপন দ্রাক্ষাক্ষেত্রে মজুর লাগাইবার জন্য বাহিরে গেলেন। তিনি মজুরদের সহিত দিন এক সিকি বেতন স্থির করিয়া তাহদিগকে আপন দ্রাক্ষাক্ষেত্রে প্রেরণ করিলেন। পরে তিনি তিন ঘটিকার সময়ে বাহিরে গিয়া দেখিলেন অন্য কয়েকজন বাজারে নিষ্কর্মে দাঁড়াইয়া আছে। তিনি তাহাদিগকে কহিলেন, তোমরাও দ্রাক্ষাক্ষেত্রে যাও, যাহা ন্যায্য তোমাদিগকে দেব; তাহাতে তাহারা গেল। আবার তিনি ছয় ও নয় ঘটিকার সময়েও বাহিরে গিয়া আর কয়েকজনকে দাঁড়াইয়া থাকিতে দেখিলেন, আর তাহাদিগকে বলিলেন, কিজন্য সমস্ত দিন এখানে নিষ্কর্মে দাঁড়াইয়া আছ? তাহারা তাহাকে বলিল, কেহই আমাদিগকে কাজে লাগায় নাই। তিনি তাহাদিগকে কহিলেন, তোমরাও দ্রাক্ষাক্ষেত্রে যাও। পরে সন্ধ্যা হইলে সেই দ্রাক্ষাক্ষেত্রের কর্তা আপন দেওয়ানকে কহিলেন, মজুরদিগকে ডাকিয়া মজুরী দাও। শেষ জন হইতে আরম্ভ করিয়া প্রথম জন পর্যন্ত দাও। তাহাতে তাহাদের এগার ঘটিকা পর্যন্ত লাগিয়াছিল। তাহারা আসিয়া এক একজন এক এক সিকি পাইল। পরে যাহারা প্রথমে লাগিয়াছিল, তাহারা আসিয়া মনে করিল, আমরা বেশী পাইব; কিন্তু তাহারাও এক এক সিকি পাইল। তাহারা সেই গৃহকর্তার বিরুদ্ধে বচসা করিয়া কহিতে লাগিল, শেষের ইহারা ত এক ঘন্টা মাত্র খাটিয়াছে, আমরা সমস্ত দিন খাটিয়াছি ও রৌদ্রে পুড়িয়াছি। আপনি ইহাদিগকে আমাদের সমান করিলেন। তিনি উত্তর করিয়া তাহাদের একজনকে কহিলেন, বন্ধু হে! আমি তোমার প্রতি কিছু অন্যায় করি নাই; তুমি কি আমার নিকটে এক সিকিতে স্বীকার কর নাই? তোমার যাহা পাওনা তাহা লইয়া চলিয়া যাও। আমার ইচ্ছা তোমাকে যাহা ঐ শেষের জনকেও তাহাই দিব। আমার নিজের যাহা তাহা আপনার ইচ্ছা মতে ব্যবহার করিবার অধিকার কি আমার নাই? না আমি দয়ালু বলিয়া তোমার চোখ টাটাইতেছে? এইরূপে যাহারা শেষের তাহারা প্রথম হইবে এবং যাহারা প্রথম তাহারা শেষে পড়িবে” (মথি ১৯: ৩০; ২০: ১০: ১৬)।
এই সুসংবাদে হযরত ঈসা (আ) দৃষ্টান্তের আকারে দুনিয়ার জাতিসমূহের কর্মময় জীবন এবং আল্লাহ্র পথ হইতে তাহাদের লওয়ার ও প্রতিদানের তুলনা করিয়াছেন। প্রথমের শ্রমিকরা হইলেন হযরত মূসা (আ)-এর পূর্বেকার জাতিসমূহ, দ্বিতীয় দল হযরত মূসা (আ)-এর নিজের উম্মত বানু ইসরাঈল, তৃতীয় দল হযরত ঈসা (আ)-এর উম্মত খৃস্টানগণ এবং নূতন ও সর্বশেষ দল সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ (স)-এর উম্মতগণ।
পৃথিবীর বয়সের দৃষ্টিকোণ হইতে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় দলের তুলনায় মুহাম্মাদ (স)-এর উম্মতের জীবনকাল যেন দিনের শেষ প্রহর এবং সওয়াব ও প্রতিদানের ক্ষেত্রে এই সর্বশেষ উম্মতকে তাহাদের পূর্বেকার উম্মতদের সম পরিমাণ দেওয়ার অর্থ হইল ইহাই। আল্লাহ তা'আলার দরবারে অন্য সকল উম্মতের তুলনায় তাহাদের সংখ্যা অধিক। এখানে শেষে যাহারা আসিবে তাহাদের দ্বারা উদ্দেশ্য উম্মতে মুহাম্মাদী। এই মর্মে হযরত মুহাম্মদ (স)-ও বলিয়াছেন:
نحن الآخرون السابقون . "আমরাই শেষে আসা অগ্রগামী লোক" (বুখারী, কিতাবুল উদ্, দ্রষ্টব্য ফতহুল বারী, ১খ, page ৩৪৫)।
উপরিউক্ত তিন দলের প্রতিদানের বিষয়টি মহানবী (স) এক উপমায় নিম্নরূপ বর্ণনা করেন:
مثلكم ومثل اهل الكتابين كمثل رجل استاجر اجراء فقال من يعمل لى من غدوة الى نصف النهار على قيراط فعملت اليهود ثم قال من يعمل لى من نصف النهار الى صلوة العصر على قيراط فعملت النصارى ثم قال من يعمل لي من العصر الى ان تغيب الشمس على قيراطين فانتم هم فغضبت اليهود والنصارى فقالوا ما لنا اكثر عملا واقل عطاء قال هل نقصتكم من حقكم قالوا لا قال فذلك فضلى أوتي من اشاء.
“তোমরা ও আহলে কিতাবদের উপমা সেই ব্যক্তির সাথে হইতে পারে যে অনেক মজুর নিয়োগ করে এবং বলে, সকাল হইতে দুপুর পর্যন্ত এক কীরাত মজুরীতে কে আছ যে আমার জন্য কাজ করিবে? অতঃপর ইয়াহুদীরা কাজ করিল। এমনিভাবে তিনি আরও বলিলেন, দুপুর হইতে আসর পর্যন্ত এক কীরাত মজুরীতে কে আছ আমার জন্য কাজ করিবে? তখন নাসারাগণ কাজ করিল। অতঃপর তিনি আরও বলিলেন, আসর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত দুই কীরাত মজুরীতে কে আছ আমার জন্য কাজ করিবে। আর তোমরাই (মুসলমানরা) সেই দল। অতঃপর ইয়াহুদী ও নাসারাগণ রাগান্বিত হইল এবং বলিল, আমাদের কি হইল যে আমরা বেশী কাজ করিলাম এবং কম মজুরী পাইলাম? তখন কর্তা বলেন, তোমাদের হক বা নির্ধারিত পাওনার কম দিয়াছি কি? তাহারা বলিল, না। তিনি বলিলেন, ইহা আমার অনুগ্রহ যাহাকে ইচ্ছা আমি বেশী দিব” (বুখারী, কিতাবুল ইজারা, বাবু আল-ইজারাত ইলা নিসফিন নাহার; দ্র. ফাতহুল বারী, page ৪৪৫-৪৪৭)।
তৃতীয়ত: হযরত ঈসা (আ) আর একটি উপমায় মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (স) ও তাঁহার উম্মতের আগমন সম্পর্কে সুসংবাদ দিয়াছিলেন: আমার পুত্রকে সমাদর করিবে। কিন্তু কৃষকেরা পুত্রকে দেখিয়া পরস্পর বলিল, এই ব্যক্তিই উত্তরাধিকারী। আইস, আমরা ইহাকে বধ করিয়া ইহার অধিকার হস্তগত করি। আর যোহনের (হযরত ইয়াহইয়া (আ)-এর) সাক্ষ্য এইঃ যখন ইয়াহুদীগণ কয়েকজন যাজক ও লেবীয়কে দিয়া যিরুসালেম হইতে তাহার কাছে এই কথা জিজ্ঞাসা করিয়া পাঠাইল, আপনি কে? তখন তিনি স্বীকার করিলেন, অস্বীকার করিলেন না। তিনি স্বীকার করিলেন যে, আমি সেই খৃস্ট নই। তাহারা তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল, তবে কি? আপনি কি এলিয়? তিনি বলিলেন, আমি এলিয় নই। আপনি কি সেই ভাববাদী? তিনি উত্তর করিলেন, না। তখন তাহার তাঁহাকে কহিল, আপনি কে? যাহারা আমাদিগকে পাঠাইয়াছেন তাহাদিগকে যেন উত্তর দিতে পারি। আপনার বিষয়ে আপনি কি বলেন? তিনি কহিলেন, আমি প্রান্তরে একজনের রব, যে ঘোষণা করিতেছে, তোমার প্রভুর পথ স্মরণ কর, যেমন যিশাইয় ভাববাদী বলিয়াছিলেন। তাহারা ফরিশীগণের নিকট হইতে প্রেরিত হইয়াছিল। আর তাহারা তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিল, আপনি যদি সেই খৃস্টও নহেন এলিয়ও নহেন, সেই ভাববাদীও নহেন, তবে বাপ্তাইজ করিতেছেন কেন (১ : ১০-২৫)?
এই বর্ণনা হইতে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, বানু ইসরাঈলরা হযরত ঈসা মসীহ ও হযরত ইলয়াস (আ) ছাড়া আরও একজন নবীর জন্য প্রতীক্ষমাণ ছিল। তিনি হযরত ইয়াহইয়াও নহেন। এই ভাবাবাদী নবীর আগমন সংক্রান্ত বিশ্বাস- বানু ইসরাঈলীদের মধ্যে এমন সর্বজনবিদিত ছিল যে, সেই নবী বলাই তাহাকে বুঝানোর জন্য যথেষ্ট ছিল। উপরন্তু ইহা হইতে এই কথাও জানা গেল যে, যে নবীর প্রতি তাহারা ইংগিত করিত, তাহার আগমন অকাট্যভাবে প্রমাণিত ছিল। কেননা হযরত ইয়াহইয়া (আ)-কে যখন এই প্রশ্ন করা হইল, তখন তিনি এই কথা বলেন নাই যে, তোমরা কোন নবীর কথা জিজ্ঞাসা করিতেছ, আর তো কোন নবীর আগমন হইবার নহে।
বস্তুত উক্ত বাণীতে তৃতীয় আর একজন নবী আগমনের সুসংবাদটি এতই পরিষ্কার যে, খৃস্টানরা অযৌক্তিকভাবে অস্বীকার করা ব্যতীত ইতিহাসের এই প্রশ্নের জবাব দিতে অপারগ থাকিয়াই গিয়াছে যে, হযরত মুহাম্মাদ (স) যদি সেই নবী না হন তবে কে সেই নবী? কারণ ঈসা (আ)-এর পরে আর কোন নবী আসিয়াছেন বলিয়া তাহারা দাবি করে না। আর ইয়াহুদীরা যেমনিভাবে হযরত মসীহ (আ)-এর আত্মপ্রকাশের অপেক্ষায় ছিল কিন্তু তাঁহার আগমনের পর বিদ্বেষের বশবর্তী হইয়া তাঁহাকে প্রত্যাখ্যান করিল, অনুরূপভাবে ইয়াহুদী খৃস্টান উভয়ে সেই নবী-এর আত্মপ্রকাশের জন্য চরমভাবে অপেক্ষা করিতেছিল। কিন্তু তাহা সত্ত্বেও সেই নবীর আগমনের পর গোষ্ঠীগত ও জাতিগত বিদ্বেষের কারণে তাহারা তাঁহাকে অস্বীকার করিয়া বসিল। এই বিষয়টি আল কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতেও বর্ণিত হইয়াছে
الَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ يَعْرِفُونَهُ كَمَا يَعْرِفُونَ أَبْنَاءَهُمْ وَإِنَّ فَرِيقًا مِنْهُمْ لَيَكْتُمُونَ الْحَقِّ وَهُمْ يَعْلَمُونَ.
"আমি যাহাদিগকে কিতাব দিয়াছি, তাহারা তাহাকে সেইরূপ জানে যেইরূপ তাহারা নিজেদের সন্তানগণকে চিনে এবং তাহাদের এক দল জানিয়া শুনিয়া সত্য গোপন করিয়া থাকে” (২: ১৪৬)।
পঞ্চমত, যোহন সুসমাচারে একজন নবীর আগমনের কথা বারবার ভবিষ্যদ্বাণীরূপে ঘোষিত হইয়াছে। তাহাতে ভবিষ্যতে আগমনকারী নবীর যেই সকল গুণ উল্লেখ করা হয়, তাহা হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর গুণাবলীর সাথে অনেকটা মিলিয়া যায়। যোহন সুসমাচারে আসা ভবিষ্যদ্বাণী নিম্নরূপঃ
(১) "তোমাদের নিকট থাকিতে থাকিতেই আমি তোমাদের নিকট এই কথা কহিলাম। কিন্তু সেই সহায় পবিত্র আত্মা, যাহাকে পিতা আমার নামে পাঠাইয়া দিবেন, তিনি সকল বিষয় তোমাদিগকে শিক্ষা দিবেন এবং আমি তোমাদিগকে যাহা যাহা বলিয়াছি, সে সকল স্মরণ করাইয়া দিবেন" (১৪: ২৫-২৭)।
(২) "তথাপি আমি তোমাদেরকে সত্য বলিতেছি, আমার যাওয়া তোমাদের পক্ষে ভাল, কারণ আমি না গেলে, সেই সহায় (ফোরকালীত) তোমাদের নিকট আসিবে না, কিন্তু আমি যদি যাই তবে তোমাদের নিকট তাহাকে পাঠাইয়া দিব" (১৬ঃ ৭; আরও দ্র. ১৬ঃ ১২-১৫)।
ইহা হইতে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, উক্ত প্রতিশ্রুত নবীই ছিলেন হযরত মুহাম্মাদ (স)।
📄 জন্মের চল্লিশতম দিবসে বায়তুল মুকাদ্দাসে আগমন
হযরত ঈসা (আ) ইয়াহুদী সমাজে লালিত-পালিত হন। মূসা (আ)-এর শরীয়ত মতে ইয়াহুদীদের প্রথা অনুসারে কোন সন্তানের চল্লিশ দিন বয়স হইলে বরকতের দোআ ও পাক-পবিত্র হইবার জন্য বায়তুল মুকাদ্দাসে লইয়া যাওয়া হইত। সুতরাং হযরত মারয়াম (আ) স্বীয় সন্তান ঈসা (আ)-এর জন্মের চল্লিশ দিনে তাঁহাকে লইয়া বায়তুল মুকাদ্দাসে গেলেন (লুক, ২: ২২-২৪)।
সম্ভবত তখনই সর্বপ্রথম ঈসা (আ)-কে জনসম্মুখে আনা হইয়াছিল এবং তাহাদের সামনে মারয়াম (আ) বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হইয়াছিলেন। আর তখনই ঈসা (আ) মায়ের পক্ষে ও নিজের পরিচয় দিতে কথা বলিয়াছিলেন। আর তখনই এই বিষয়টি ইয়াহুদী সমাজে লোকমুখে প্রচারিত হইয়া যায়। কেহ কেহ সন্দেহ করিলেও ইবাদতখানায় যাহারা মারয়াম (আ)-এর পূত-পবিত্রতা ও ইবাদত পর্যবেক্ষণ করিয়াছে তাহারা সেই অলৌকিক জন্মে বিশ্বাস করিয়াছে, এবং ঈসা (আ)-এর প্রতিও উচ্চ ধারণা পোষণ করিয়াছে। কেহ কেহ ভাবিয়াছে এই সন্তান ভবিষ্যতে মহান কেহ হইবেন। বর্ণিত আছে, জেরুসালেমে সামাউন নামে একজন ধার্মিক ও খোদাভক্ত লোক ছিলেন। একজন মাসীহ প্রেরণের মাধ্যমে আল্লাহ পাক কখন ইসরাঈলীদের দুঃখ দূর করিবেন সেই সময়ের জন্য তিনি অপেক্ষা করিতেছিলেন। তিনি আল্লাহর ইবাদতে প্রচণ্ডভাবে মশগুল থাকার কারণে ইলহামের মাধ্যমে জানিতে পারিয়াছিলেন যে, তিনি তাহার মৃত্যুর পূর্বেই প্রতিশ্রুত মাসীহকে দেখিতে পাইবেন। আর ঈসা (আ)-কে যেদিন বায়তুল মুকাদ্দাসে লইয়া যাওয়া হয় সামউন নামের সেই ব্যক্তিটিও সেই দিন সেইখানে উপস্থিত ছিলেন। বর্ণিত আছে যে, তিনি ঈসা (আ)-কে কোলে লইয়া দোআ করেন এবং তিনিই যে প্রতিশ্রুত মাসীহ সেই ব্যাপারে মারয়াম (আ)-কে অবহিত করেন (লূক, ২:৩৪-৩৫)।
📄 হযরত ঈসা (আ)-এর মু'জিযা
হযরত ঈসা (আ)-এর নবুওয়াতের প্রমাণ স্বরূপ ও দাওয়াতী কাজে সহায়তার নিমিত্ত আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁহাকে বিভিন্ন রকম মু'জিযা প্রদান করিয়াছিলেন। ইহার সংখ্যা ছিল প্রচুর (ডঃ মুস্তফা সিবাঈ, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ, page ২২)। আল-কুরআনের বিভিন্ন স্থানে ঈসা (আ)-এর সেইসব মুজিযার কথা আলোচিত হইয়াছে। এই প্রসঙ্গে হযরত ঈসা (আ)-এর উক্তি উদ্ধৃত হইয়াছে :
إِنِّي قَدْ جِئْتُكُمْ بِآيَةٍ مِّنْ رَّبِّكُمْ إِنِّي اخْلُقُ لَكُمْ مِّنَ الطَّيْنِ كَهَيْئَةِ الطَّيْرِ فَانْفُخُ فِيْهِ فَيَكُونُ طَيْرًا بِإِذْنِ اللَّهِ وَأَبْرِئُ الْأَكْمَهَ وَالْأَبْرَصَ وَأَحْيِ الْمَوْتَى بِإِذْنِ اللهِ وَأُنَبِّئُكُمْ بِمَا تَأْكُلُونَ وَمَا تَدَّخِرُونَ فِي بُيُوتِكُمْ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةً لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ .
"আমি তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হইতে তোমাদের নিকট নিদর্শন লইয়া আসিয়াছি। আমি তোমাদের জন্য কর্দম দ্বারা একটি পক্ষী সদৃশ আকৃতি গঠন করিব; অতঃপর আমি উহাকে ফুৎকার দিব; ফলে আল্লাহ্র হুকুমে উহা পক্ষী হইয়া যাইবে। আমি জন্মান্ধ ও কুষ্ঠ ব্যাধিগ্রস্তকে নিরাময় করিব এবং আল্লাহর হুকুমে মৃতকে জীবিত করিব। তোমরা তোমাদের গৃহে যাহা আহার কর এবং মওজুদ কর তাহা তোমাদিগকে বলিয়া দিব। তোমরা যদি মু'মিন হও তবে ইহাতে তোমাদের জন্য নিদর্শন রহিয়াছে” (৩: ৪৯)।
إِذْ قَالَ اللَّهُ يُعِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ اذْكُرْ نِعْمَتِي عَلَيْكَ وَعَلَى وَالِدَتِكَ إِذْ أَيَّدْتُكَ بِرُوحِ الْقُدُسِ تُكَلِّمُ النَّاسَ فِي الْمَهْدِ وَكَهْلاً وَإِذْ عَلَّمْتُكَ الْكِتَبَ والحِكْمَةَ وَالتَّوْرَاةَ وَالْأَنْجِيلَ وَإِذْ تَخْلُقُ مِنَ الطَّيْنِ كَهَيْئَةِ الطَّيْرِ بِإِذْنِي فَتَنْفُخُ فِيهَا فَتَكُونُ طيرا باذني تُبْرِئُ الْأَكْمَهَ وَالْأَبْرَصَ بِاذْنِي وَإِذْ تُخْرِجُ الْمَوْتَى بِاذْنِي .
"আল্লাহ বলিবেন, হে মারয়াম তনয় ঈসা! তোমার প্রতি ও তোমার জননীর প্রতি আমার অনুগ্রহ স্মরণ কর: পবিত্র আত্মা দ্বারা আমি তোমাকে শক্তিশালী করিয়াছিলাম এবং তুমি দোলনায় থাকা অবস্থায় ও পরিণত বয়সে মানুষের সহিত কথা বলিতে। তোমাকে কিতাব, হিকমত, তাওরাত ও ইনজীল শিক্ষা দিয়াছিলাম। তুমি কর্দম দ্বারা আমার অনুমতিক্রমে পাখীসদৃশ আকৃতি গঠন করিতে এবং উহাতে ফুৎকার দিতে, ফলে আমার অনুমতিক্রমে উহা পাখি হইয়া যাইত। জন্মান্ধ ও কুষ্ঠ ব্যাধিগ্রস্তকে তুমি আমার অনুমতিক্রমে নিরাময় করিতে এবং আমার অনুমতিক্রমে মৃতকে জীবিত করিতে" (৫: ১১০)।
উপরিউক্ত আয়াতসমূহ হইতে ঈসা (আ)-এর নিম্নোক্ত মু'জিযার বর্ণনা পাওয়া যায়।
(১) মাটি দ্বারা পাখি তৈরি করিয়া ফুৎকার দিয়া আকাশে উড়াইয়া দেওয়া।
(২) জন্মান্ধ এবং শ্বেত কুষ্ঠ রোগীকে কেবল হাত বুলাইয়া সুস্থ করিয়া দেওয়া।
(৩) কোন কোন মৃতকে জীবিত করিয়া দেওয়া।
(৪) লোকের গৃহে কি কি জিনিস মওজুদ রহিয়াছে এবং তাহারা কি ভক্ষণ করিয়াছে সেই সম্পর্কে সংবাদ দেওয়া।
এইগুলি ছাড়াও পঞ্চম আরেকটি মু'জিযার কথা সূরা মাইদাতে আলোচনা করা হইয়াছে। তাহা হইল খাদ্য পরিপূর্ণ আসমানী খাঞ্চা নাযিল হওয়া। এই সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
إِذْ قَالَ الْحَوَارِبُونَ يُعِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ هَلْ يَسْتَطِيعُ رَبُّكَ أَنْ يُنَزِلَ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِّنَ السَّمَاءِ قَالَ اتَّقُوا اللَّهَ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ . قَالُوا نُرِيدُ أَنْ نَاكُلَ مِنْهَا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُنَا وَنَعْلَمَ أَنْ قَدْ صَدَقْتَنَا وَنَكُونَ عَلَيْهَا مِنَ الشَّهِدِينَ. قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ اللَّهُمَّ رَبَّنَا انْزِلْ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِّنَ السَّمَاءِ تَكُونُ لَنَا عِيداً لأولنَا وَآخِرِنَا وَأَيَةً مِّنْكَ وَارْزُقْنَا وَأَنْتَ خَيْرُ الرَّازِقِينَ ، قَالَ اللَّهُ إِنِّي مُنَزِّلُهَا عَلَيْكُمْ فَمَنْ يَكْفُرْ بَعْدُ مِنْكُمْ فَإِنِّي أَعَذِّبُهُ عَذَابًا لَا أَعَذِّبُهُ أَحَدًا مِّنَ الْعُلَمِينَ .
"স্মরণ কর, হাওয়ারীগণ বলিয়াছিল, হে মারয়াম তনয় ঈসা! আপনার প্রতিপালক কি আমাদের জন্য আসমান হইতে খাদ্য পরিপূর্ণ খাঞ্চা প্রেরণ করিত সক্ষম? সে বলিয়াছিল, আল্লাহকে ভয় কর যদি তোমরা মু'মিন হও। তাহারা বলিয়াছিল, আমরা চাহি যে, উহা হইতে কিছু খাইব ও আমাদের চিত্ত প্রশান্তি লাভ করিবে। আর আমরা জানিতে চাহি যে, আপনি আমাদিগকে সত্য বলিয়াছেন এবং উহাতে সাক্ষী থাকিতে চাহি। মারয়াম তনয় ঈসা বলিল, হে আল্লাহ, আমাদিগের প্রতিপালক! আমাদিগের জন্য আসমান হইতে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা প্রেরণ কর। ইহা আমাদের ও আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলের জন্য হইবে আনন্দোৎসবস্বরূপ ও তোমার নিকট হইতে নিদর্শন এবং আমাদিগকে জীবিকা দান কর। আর তুমি তো সর্বশ্রেষ্ঠ রিযিকদাতা। আল্লাহ বলিলেন, নিশ্চয় আমি তোমাদিগের নিকট উহা প্রেরণ করিব; কিন্তু ইহার পর তোমাদিগের মধ্যে কেহ কুফরী করিলে তাহাকে এমন শাস্তি দিব, যে শাস্তি বিশ্বজগতের অপর কাহাকেও দিব না" (৫ : ১১২-১১৫)।
এই মু'জিযাগুলির ধরন সম্পর্কে বিভিন্ন রকম বর্ণনা পাওয়া যায়। তাহা নিম্নরূপ:
(ক) মাটি দ্বারা পাখি তৈরি করা
হযরত ঈসা (আ)-এর মু'জিযার মধ্যে অন্যতম হইল, তিনি মাটি দ্বারা পাখি তৈরি করিয়া তাহাতে ফুৎকার দিলে তাহা উড়িয়া যাইত। আল-কুরআনের স্পষ্ট বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় যে, তিনি উহা আল্লাহরই অনুমোদন ক্রমে সম্পাদন করিতেন (তাফসীরে মাযহারী, ২খ., page ২৯৪)।
ইমাম বাগাবী (র) বলিয়াছেন, ঈসা (আ) শুধু বাদুড় পাখিই বানাইতেন, ইহা ছাড়া আর কোন পাখি বানাইতেন না। কেননা উহাই একমাত্র পাখি যাহা গঠনগত দিক হইতে পূর্ণাঙ্গ চতুষ্পদ প্রাণীর মত এবং স্তন্যপায়ী (আরো দ্র. ইবনুল জাওযী, প্রাগুক্ত, ১খ., page ৩৩৩)।
ইন জারীর তাবারী উল্লেখ করিয়াছেন, ইবন ইসহাক হইতে বর্ণিত। মকতবের কয়েকজন বালকের সাথে একবার হযরত ঈসা (আ) বসিয়াছিলেন। তাহার পর তিনি এক মুঠি কাদা হাতে নিয়া বলিলেন, এই কাদা দিয়া আমি তোমাদের জন্য একটি পাখি বানাইয়া দিব। তাহারা বলিল, সত্যিই তুমি তাহা পারিবে? তিনি বলিলেন, হাঁ, আমার প্রতিপালকের অনুমতিতে আমি তাহা পারিব। তাহার পর মাটি দিয়া তিনি একটি পাখির আকৃতি বানাইলেন, তাহাতে ফুৎকার দিলেন এবং বলিলেন, আল্লাহ্র অনুমতিতে পাখি হইয়া যাও, ফলে সেইটি পাখি হইয়া তাহার হাত হইতে উড়িয়া যায়। এই কাণ্ড দেখিয়া বালকগণ সেই স্থান হইতে বাহির হইয়া গিয়া তাহাদের শিক্ষকদের নিকট ঘটনাটি জানাইল। তাহারা ব্যাপারটি জনসাধারণের নিকট প্রকাশ করিয়া দিল। ঈসা (আ) তাহাতে চিন্তাযুক্ত হইলেন। এইদিকে বানু ইসরাঈল তাঁহার ক্ষতি করার ইচ্ছা করিয়াছিল। তাঁহার ব্যাপারে শংকাগ্রস্ত হইবার পর তাঁহার মাতা তাঁহাকে নিয়া একটি গাধায় সওয়ার হইলেন এবং মিসরে পালাইয়া গেলেন। বর্ণিত আছে যে, তিনি যখন কাদা-মাটি হইতে পাখি বানাইতে মনস্থ করিলেন, তখন তাহাদেরকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, কোন পাখি বানানো বেশী কঠিন? উত্তরে বলা হইল, বাদুড় (তাফসীরে তাবারী, ৫খ., page ৩৯৯)।
বাইবেলের চার খণ্ডের কোথাও হযরত ঈসা (আ)-এর এই মু'জিযার উল্লেখ নাই। একমাত্র মিসরীয় কিবতীদের নিকট (COPTIC CHURCH) রক্ষিত এবং বার্নাবাসের বাইবেলে ইহার উল্লেখ পাওয়া যায়। উল্লেখ্য যে, এক শ্রেণীর প্রকৃতিবাদী এবং তাহাদের সাথে ইসলামের দাবিদার কিছু ব্যক্তি ঈসা (আ)-এর মু'জিযাগুলিকে এমনভাবে বর্ণনা করিয়াছেন, যাহা সেইগুলিকে অস্বীকার করারই নামান্তর (সিওহারবী, প্রাগুক্ত, page ৬৫-৬৬)।
উহার খণ্ডনের নিমিত্ত বলিতে হয় যে, পাখি তৈরি করার উপরিউক্ত মু'জিযাটির আল-কুরআনে স্পষ্টভাবে বর্ণনা রহিয়াছে। সাথে সাথে আল্লাহর অনুমোদনক্রমে কিভাবে তাহা তৈরি করা হইয়াছিল তাহাও বলা হইয়াছে। বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট, তাই ইহা অস্বীকার করা বা অপব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা আল-কুরআনের একটি স্পষ্ট ভাষ্যকেই অস্বীকার করা বা অপব্যাখ্যা দেওয়ার নামান্তর, যাহা কোন মুসলমান করিতে পারে না।
(খ) জন্মান্ধ ও কুষ্ঠরোগীর অলৌকিকভাবে সুস্থ করা
ঈসা (আ) তাঁহার দাওয়াতী কাজের পরিক্রমায় সেই যুগে এমন কিছু রোগীকে সুস্থ করিয়া তোলেন যাহা করিতে সেই যুগের ডাক্তারগণ অপারগ ছিলেন। আল-কুরআনে প্রথম সে রোগটির বর্ণনায় শব্দটা ব্যবহার করা হয়।
হযরত আবদুল্লাহ ইব্ন আব্বাস (রা)-এর মতে অর্থ জন্ম হইতেই যাহার চোখ নাই বা যাহার চক্ষুস্থল সমতল। হাসান ও সুদ্দী (র) বলেন, অন্ধ। হযরত ইকরিমা (র) বলেন, যাহার দৃষ্টিশক্তি দুর্বল, চোখ হইতে সব সময় পানি ঝরে। মুজাহিদের মতে আকমাহ ঐ ব্যক্তি যে রাতকানা (তাফসীরে মাযহারী, page ২৯৪; আলুসী, প্রাগুক্ত, ৩খ., page ১৬৯)।
তবে প্রকৃতপক্ষে আকমাহ বলিতে জন্মান্ধ ব্যক্তিকে বুঝায়। কেননা রাতকানা রোগ ডাক্তাররাও চিকিৎসা করিতে পারে। তখন নবী হিসাবে ইহা ঈসা (আ)-এর মু'জিযা হইবে না। এইজন্য ইবন জারীর তাবারী আকমাহার অর্থে জন্মান্ধ হওয়াকে প্রাধান্য দিয়াছেন (তাফসীর তাবারী শরীফ, ৫খ, page ৪০১)। হযরত ঈসা (আ)-এর এই রোগ নিরাময় করার ঘটনাটি এমনকি বাইবেলের বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ করা হইয়াছে যেমন, মথি ৯: ২৭-৩০, মার্ক ৮ঃ ২২-২৫, লুক ১৮: ৩৫-৪৩)। তবে সর্বাধিক বিস্তারিত বিবরণ যোহন সুসমাচার ৯ঃ ১-৭-এ রহিয়াছে। এই সুসমাচারে জন্মান্ধ ও মাতৃগর্ভ হইতে প্রসবকালীন সময়েও অন্ধ হইয়া যে শিশু জন্ম নেয় তাহারও বিবরণ লিপিবদ্ধ রহিয়াছে।
আল-কুরআনে বর্ণিত দ্বিতীয় দূরারোগ্য ব্যাধিটি শ্বেতকুষ্ঠ রোগ। খৃস্টানদের হাতে প্রচলিত সুসমাচারসমূহে এই রোগ নিরাময়ের ব্যাপারে একাধিক ঘটনা উল্লেখ করা হইয়াছে। তাহার মধ্যে এক জায়গায় একজন কুষ্ঠরোগী এবং অপর স্থানে ১০ জন কুষ্ঠরোগী নিরাময়ের ঘটনার বিবরণ রহিয়াছে (মথি ৮: ১-৩)।
আরেক দিনের ঘটনা। তিনি জেরুসালেম যাত্রাকালে সামিবিয়া হইয়া গালীলের ভিতর দিয়া পথ অতিক্রম করিতেছিলেন। পথিমধ্যে এক গায়ে ১০ জন কুষ্ঠরোগীকে দেখিতে পাইলেন। কুষ্ঠরোগিগণ তাহাকে দেখিয়াই দূরে দাঁড়াইয়া উচ্চঃস্বরে ডাকিয়া বলিতে লাগিল, হে প্রভু! আমাদের প্রতি মেহেরবানী করুন। তিনি তাহাদেরকে, বলিলেন, যাও নিজ নিজ দেহগণকে দেখাইয়া নিও- তাহারা সামনের দিকে আগাইয়া যাইতেই সম্পূর্ণ সুস্থ, পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন হইয়া গেল।
প্রচলিত সুসমাচারসমূহে উপরিউক্ত দুইটি রোগসহ আরও কয়েকটি রোগের কথা উল্লেখ আছে যাহা হযরত ঈসা (আ) অলৌকিক ভাবে নিরাময় করিতেন বলিয়া বর্ণিত হইয়াছে। তন্মধ্যে
(১) তিনি অবশ রোগীকে সুস্থ করেন (মথি ৯: ২, ৮:৫, ১২ঃ ৯)।
(২) বোবা রোগীকে সুস্থ করেন (মথি ৯: ২৭)।
(৩) তোতলার তোতলামী অপসারণ করেন (মথি ৭ঃ ৩১, লুক ১৮: ৩৫-৪৩)।
(৪) ভূতে পাওয়া তথা জিনে ধরা রোগীকে সুস্থ করেন (মথি ৪: ২৪, ৮: ২৮, ১৪, ১৭ঃ ১৪, মার্ক ৫: ২-১৯, ৯৪ ১৪-২৭)।
(৫) নপুংসক ব্যক্তিকে সুস্থ করেন (বার্ণাবাসের বাইবেল, page ৭৮)।
(৬) কুজকে সুস্থ করেন (লুক ১৩: ১০) ইত্যাদি।
আল্লামা সুয়ূতী বলেন, এই দুই ধরনের এমন রোগ যাহার নিরাময়ে ডাক্তারগণ অপারগ হইয়া গিয়াছিল। হযরত ঈসা (আ)-কে চিকিৎসার জয়জয়কারের যুগেই প্রেরণ করা হইয়াছিল। আর তিনি এক দিনে ৫০ হাজার রোগীকে দু'আর মাধ্যমে সুস্থ করিয়াছিলেন। তবে শর্ত ছিল ঈমান আনিতে হইবে (প্রাগুক্ত)। হযরত ওয়াহ্ব ইবন মুনাবিবহ (র) বলেন, ঈসা (আ)-এর কাছে এক এক দিন ৫০ হাজার রোগীর সমাবেশ ঘটিত। যে তাঁহার নিকট আসিতে সক্ষম হইত সে তো নিজেই আসিয়া যাইত। আর যাহারা পারিত না, ঈসা (আ)-ই তাহাদের কাছে চলিয়া যাইতেন। রুগ্ন, পঙ্গু, অন্ধ ইত্যাদির জন্য তিনি দু'আ করিতেন :
اللهم انت إله من في السماء واله من في الارض لا إله فيهما غيرك وأنت جبار من في السموات وجبار من في الأرض لا جبار فيهما غيرك وانت ملك من في السماء وملك من في الأرض لاملك فيهما غيرك قدرتك في الأرض كقدرتك في السماء سلطانك في الأرض كسلطانك في السماء اسئلك باسمك الكريم ووجهك المنير وملكك القديم إنك على كل شئ قدير .
“হে আল্লাহ! তুমি আকাশবাসীর ইলাহ্, ইলাহ্ পৃথিবীবাসীর। এই দুইয়ের মাঝে তুমি ছাড়া কোনো ইলাহ্ নেই। তুমি আকাশমণ্ডলীর অধিবাসীর মাঝে প্রবল, প্রবল তুমি যমীনবাসীদের মাঝে। এই দুইয়ের মাঝে তুমি ছাড়া কেউ প্রবল নহে। তুমি আকাশবাসীর অধিকর্তা, অধিকর্তা যমীনবাসীর। এই দুইয়ের মাঝে তুমি ছাড়া আর কোন অধিকর্তা নেই। আকাশে যেমন তোমার শক্তি যমীনেও তেমন তোমার শক্তি। আকাশে যেমন তোমার ক্ষমতা, যমীনেও তেমন তোমার ক্ষমতা। তোমার কাছে চাই তোমার নামের উসিলায়, তোমার সমুজ্জ্বল চেহারার উসিলায়, চাই তোমার অনাদি সার্বভৌমত্বের উসিলায়। তুমি সবকিছুর উপর সর্বশক্তিমান” (তাফসীরে মাযহারী, প্রাগুক্ত, page ২৯৫; আলুসী, প্রাগুক্ত, ৩খ., page ১৬৯)।
ইবন জরীর তাবারী বলেন, ঐ ধরনের রোগ নিরাময় দ্বারা আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আ) সম্পর্কে নিদর্শন দিয়াছেন যে, তিনি আল্লাহ্র রাসূল। ইহা তো মু'জিযাসমূহের অন্যতম যাহা আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে দান করিয়াছেন (তাফসীরে তাবারী শরীফ, ৫খ, page ৪০১)।
(গ) আল্লাহর হুকুমে মৃতকে জীবিত করা: আল-কুরআনের ভাষ্যমতে হযরত ঈসা (আ) আল্লাহর হুকুমে মৃতকে জীবিত করিতেন যেন লোকজন তাঁহার প্রতি ঈমান আনয়ন করে। বাগাবী (র) বর্ণনা করিয়াছেন, ইবন আব্বাস (রা) বলেন, ঈসা (আ) চার ব্যক্তিকে জীবিত করিয়াছিলেন: (১) আযির, (২) জনৈক বৃদ্ধার ছেলে, (৩) কর আদায়কারীর মেয়ে এবং (৪) নূহ (আ)-এর ছেলে সাম।
(১) আযির ঈসা (আ)-এর বন্ধু ছিলেন। তিনি অসুস্থ হইয়া পড়িলে তাহার বোন ঈসা (আ)-এর কাছে লোক পাঠাইয়া দেয় যে, আপনার ভাই ইনতিকাল করিয়াছেন। তিনি তিন দিনের পথ পাড়ি দিয়া সঙ্গীদের নিয়া উপস্থিত হইলেন। কিন্তু আসিয়া দেখিলেন তিন দিন আগেই তাহার মৃত্যু হইয়াছে। তিনি তাহার বোনকে বলিলেন: আমাদের নিয়া তাহার কবরের কাছে চল। সে তাহাদের নিয়া ভাইয়ের কবরের নিকট পৌছিল। ঈসা (আ) আল্লাহ্র কাছে দু'আ করিলেন। সঙ্গে সঙ্গে আযির উঠিয়া দাঁড়াইলেন আর তাহার শরীর হইতে চর্বি গলিয়া গলিয়া পড়িতেছিল। কবর হইতে উঠার পর সে বেশ কিছুদিন জীবিত ছিল।
(২) এক বৃদ্ধার ছেলে ইন্তিকাল করিলে ঈসা (আ)-এর নিকট দিয়া তাহার জানাযা নিয়া যাওয়া হইতেছিল। তিনি তাহার জন্য দু'আ করিলেন, তৎক্ষণাৎ সে খাটের উপর উঠিয়া বসিল। ইহার পর সকলের সামনে নিচে আসিয়া জামা-কাপড় পরিধান করিল এবং খাটটি কাঁধে নিয়া বাড়ী ফিরিয়া গেল। সেও বেশ কিছু দিন বাঁচিয়াছিল। তাহার সন্তানও জন্ম নিয়াছিল।
(৩) কর আদায়কারীর তনয়ার ঘটনা হইল, তাহার বাপ ছিল একজন কর আদায়কারী। কন্যার মৃত্যুর একদিন পর সে বিষয়টি ঈসা (আ)-কে অবহিত করিল। ঈসা (আ) তাহার জন্য দু'আ করিলেন। ফলে আল্লাহ তাহাকে জীবিত করিয়া দেন। সেও দীর্ঘায়ু পাইয়াছিল এবং সন্তান জন্ম দিয়াছিল।
(৪) নূহ (আ)-এর পুত্র সাম। ঈসা (আ) তাহার কবরের কাছে আসিলেন এবং ইসমে আ'জম দ্বারা দু'আ করিলেন। সাথে সাথে তিনি কবরের ভিতর হইতে বাহির হইয়া আসিলেন।
কিয়ামতের ভয়ে তাহার অর্ধেক চুল পাকিয়া গিয়াছিল। অথচ সেকালে কাহারও চুল পাকিত না। তিনি র্জিজ্ঞাসা করিলেন: কিয়ামত হইয়া গেল কি? 'ঈসা (আ) বলিলেন, না! তবে আমি ইসমে আ'জম পড়িয়া দু'আ করিয়াছি। ইহার পর বলিলেন, মরিয়া যান। তিনি বললেন: প্রস্তুত, তবে শর্ত হইল মৃত্যুকষ্ট হইতে যেন আল্লাহ রেহাই দেন। ঈসা (আ) এই জন্য দু'আ করিলেন। দু'আ কবুল হইল (তাফসীরে মাযহারী, প্রাগুক্ত, page ২৯৫-২৯৬; আলুসী, প্রাগুক্ত, ৩খ., page ১৬৯-১৭০)।
ইব্ন কাছীর উল্লেখ করেন যে, ইসহাক ইব্ন বিশর, কা'ব আল আহবার, ওয়াহব ইব্ন মুনাব্বিহ, ইব্ন আব্বাস ও সালমান ফারসী (রা) হইতে বিভিন্ন সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন যে, মৃতকে জীবিত করণে সর্বপ্রথম যাহা ঘটিয়াছিল তাহা হইল, একদা তিনি এক কবরের পার্শ্বে ক্রন্দনরত মহিলার পার্শ্ব দিয়া যাইতেছিলেন। তিনি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমার কি হইল? তখন সেই মেয়ে লোকটি বলিল, আমার মেয়েটি মৃত্যুবরণ করিয়াছে অথচ সে ছাড়া আমার আর কোন সন্তান নাই। আমি আমার রবের কাছে ওয়াদা করিয়াছি যে, আমার মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত আমি এই স্থান ত্যাগ করিব না অথবা আল্লাহ তা'আলা আমার মেয়েটিকে জীবিত করিয়া দিবেন। তুমি তাহার প্রতি দৃষ্টি দাও। 'ঈসা (আ) তাহাকে বলিলেন, আমি যদি উহার প্রতি দৃষ্টি দেই, তাহা হইলে তুমি কি ফিরিয়া যাইবে। সেই মেয়ে লোকটি বলিল, হাঁ। বর্ণনাকারিগণ বলেন, তখন ঈসা (আ) দুই রাক'আত নামায পড়িলেন এবং কবরের নিকটে আসিয়া বসিলেন। অতঃপর সেই মৃত মেয়েটিকে ডাক দিলেন, পরম দয়ালু আল্লাহ্র নির্দেশে দাঁড়াইয়া যাও এবং কবর হইতে বাহির হইয়া আস। কবরটি কাঁপিয়া উঠিল। অতঃপর ঈসা আবার ডাক দিলেন, তখন কবরটি ফাটিয়া গেল। অনন্তর তিনি তৃতীয়বারের মত ডাক দিলেন, তখন ঐ মেয়েটি মাথা হইতে মাটি ঝাড়িতে ঝাড়িতে বাহির হইয়া আসিল। হযরত ঈসা (আ) তাহাকে বলিলেন, আমার ডাকার পর তোমার দেরী হইল কেন? সে বলিল, প্রথম ডাক দেওয়ার পর আল্লাহ পাক এক ফেরেস্তা পাঠাইলেন যিনি আমার শরীরের অবয়ব পুনর্গঠন করিলেন। দ্বিতীয় ডাকের সময় আমার কাছে আমার আত্মা ফিরিয়া আসিল। আর যখন আমার কাছে তৃতীয় ডাক আসিল তখন আমি মনে করি যে, ইহা কিয়ামতের আহবান। তখন কিয়ামতের ভয়ে আমার মাথার চুল শুভ্র হইয়া যায়। অতঃপর সে তাহার মায়ের কাছে গেল এবং বলিল, হে আম্মা! আপনার কি হইল যে, আমাকে দুইবার মৃত্যুর যন্ত্রণা ভোগ করার পর্যায়ে লইয়া গেলেন। হে আম্মা! আপনি সবর করুন এবং আল্লাহর নিকট ইহার প্রতিদান কামনা করুন। অতঃপর সে ঈসা (আ)-কে লক্ষ্য করিয়া বলিল, হে আল্লাহ্ রূহ ও কলেমা ঈসা! আপনার প্রভুর কাছে প্রার্থনা করুন তিনি যেন আমাকে পরকালীন জীবনে ফিরাইয়া নেন এবং মৃত্যুযন্ত্রণাকে হাল্কা করিয়া দেন। অতঃপর ঈসা (আ) দু'আ করিলেন। আল্লাহ তাঁহার দু'আ কবুল করিলেন (ইব্ন কাছীর, page ৭৬)। বার্ণাবাসের বাইবেলেও অনুরূপ একটি ঘটনা বর্ণিত আছে (অধ্যায় নং ৪৭, page ৫৮-৫৯)।
আল্লামা আলুসী বলেন যে, আল-কুরআনে ঈসা (আ)-এর মু'জিযার আলোচনায় মৃত )الموتى শব্দ টি ব্যাপক অর্থবোধক, সবকিছু ইহার অন্তর্ভুক্ত। যুহরী হইতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলিয়াছেন, আমি অবহিত হইয়াছি, ঈসা (আ) ও তাঁহার সাথী পথ চলিতে চলিতে একেবারে স্পেন (আনদালুস) পর্যন্ত চলিয়া যান। সেখানে মৃতকে জীবিত করিয়াছিলেন। সাথীবর্গ এই ধরনের জীবিত ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করিবার পর জানিতে পারিলেন যে, তিনি আদ জাতিভুক্ত (আবু হায়্যান, প্রাগুক্ত, ৩খ., page ১৬৬)। আরও বর্ণিত আছে যে, ঈসা (আ) যখন কাহাকেও জীবিত করার জন্য দু'আ করিতেন তখন তিনি সেই দু'আয় বলিতেন, ইয়া হায়্যু, ইয়া কায়্যুম। আর বর্ণিত আছে যে, তিনি দুই রাক'আত নামায পড়িতেন। আরও বর্ণিত আছে যে, তিনি যখন কোন মৃতকে জীবিত করার ইচ্ছা পোষণ করিতেন তখন তাঁহার লাঠি দ্বারা সেই মৃতকে আঘাত করিতেন অথবা কবরে আঘাত করিতেন অথবা মাথার খুলি বাহির করিয়া আঘাত করিতেন। তখন তাহা আল্লাহ্র নির্দেশে জীবিত হইয়া যাইত এবং ঈসা (আ)-এর সঙ্গে কথা বলিত, অতঃপর দ্রুত মৃত্যুবরণ করিত (আবূ হায়্যান, প্রাগুক্ত, আলুসী, প্রাগুক্ত, ৩খ., page ১৬৯)।
উল্লেখ্য, বর্তমান যুগে আধুনিকতার দাবিদার স্যার সৈয়দ আহমদ এবং মৌলভী চেরাগআলীসহ মিথ্যা নবুওয়াতের দাবিদার গোলাম আহমদ কাদিয়ানী এবং মৌঃ মুহাম্মদ আলী লাহোরী ধর্মকে অতি প্রাকৃতিক বিষয় হইতে মুক্ত করিবার অভিলাষে ইয়াহুদীদের ন্যায় ঈসা (আ)-এর ঐ মু'জিযাকে অস্বীকার করিয়া বসিয়াছেন। ইহার পক্ষে তাহাদের দাবি হইল, কুরআন মজীদে আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের পূর্বে কাহাকেও এই দুনিয়াতে পুনর্বার জীবিত করিবেন না বলিয়া ঘোষণা করিয়াছেন। কিন্তু গোটা কুরআন মজীদের কোন একটি আয়াতেও এই দাবি প্রমাণিত হয় না বরং প্রমাণ পাওয়া যায় যে, আল্লাহ তা'আলা মৃত্যু দান করার পর এই পৃথিবীতে পুনরায় জীবিত করিয়াছেন। যেমন সূরা বাকারার গাভী যবাহ করা সম্পর্কিত আয়াতে আছে:
فَقُلْنَا اضْرِبُوهُ بِبَعْضِهَا كَذَلِكَ يُحْيِ اللَّهُ الْمَوْتُى .
"তখন আমরা এই নির্দেশ দিয়াছিলাম যে, নিহত ব্যক্তির লাশের উপর ইহার কোন অংশ দ্বারা আঘাত কর। বস্তুত এইভাবেই আল্লাহ তা'আলা মৃতদের জীবন দান করেন" (২ঃ ৭৩)। এই সূরায় ২৫৯ নং আয়াতে উল্লেখ আছে:
فَأَمَاتَهُ اللَّهُ مِائَةَ عَامٍ ثُمَّ بَعَثَهُ قَالَ كَمْ لَبِثْتُ قَالَ لَبِثْتُ يَوْمًا أَوْ بَعْضَ يَوْمٍ قَالَ بَلْ لَبِثْتَ مِائَةَ عَامِ.
"অতঃপর আল্লাহ তাহার প্রাণ হরণ করিয়া নিলেন এবং সে একশত বৎসর মৃত অবস্থায় পড়িয়া থাকিল। অতঃপর আল্লাহ তাহাকে পুনর্জীবিত করিলেন এবং জিজ্ঞাসা-করিলেন, বল কত কাল এইভাবে পড়িয়া রহিয়াছিলে? সে বলিল, এক দিন অথবা কয়েক ঘন্টা মাত্র। আল্লাহ বলিলেন, তোমার উপর দিয়া এমনি অবস্থায় এক শতটি বৎসর অতিবাহিত হইয়া গিয়াছে"।
এই সূরায় (২৬০ নং আয়াত) উল্লেখ আছে: وَاذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّ أرنى . كَيْفَ تُحْيِ الْمَوْتَى قَالَ أَوَلَمْ تُؤْمِنْ قَالَ بَلَى وَلَكِنْ لِيَطْمَئِنَّ قَلْبِي قَالَ فَخُذْ أَرْبَعَةً مِنَ الطَّيْرِ فَصُرْهُنَّ إِلَيْكَ ثُمَّ اجْعَلْ عَلَى كُلَّ جَبَلٍ مِنْهُنَّ جُزْء ثُمَّ ادْعُهُنَّ يَأْتِينَكَ سَعْبًا .
"সেই ঘটনাও স্মরণ কর, যখন ইবরাহীম বলিল, প্রভু! আমাকে দেখাও তো তুমি কিভাবে মৃতকে পুনর্জীবিত কর। আল্লাহ বলিলেন, তুমি কি বিশ্বাস কর না? ইবরাহীম বলিল, বিশ্বাস করি, কিন্তু শুধু মনের সান্ত্বনার জন্য। আল্লাহ বলিলেন, তাহা হইলে তুমি চারিটি পাখি ধর এবং সেগুলি নিজের সাথে সুপরিচিত করিয়া নাও। অতঃপর ইহাদের এক একটি অংশ এক একটি পাহাড়ের উপর রাখিয়া দাও। অতঃপর ইহাদেরকে ডাক দাও। দেখিবে ইহারা তোমার কাছে দৌড়াইয়া ছুটিয়া আসিতেছে"।
অতএব এই সমস্ত ঘটনার মধ্যে মৃতকে জীবিত করিবার পরিষ্কার অর্থ বর্তমানে রহিয়াছে।
মোটকথা, কুরআনের দৃষ্টিতে দুনিয়ায় পুনর্জীবিত হওয়া নিষিদ্ধ— এইরূপ চিন্তা মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী ও মুহাম্মদ আলী লাহোরী প্রমুখের মস্তিষ্ক প্রসূত যাহা চূড়ান্তরূপেই ভ্রান্ত। ইহার পিছনে কোন যুক্তি বর্তমান নাই (সিওহারবী, প্রাগুক্ত, page ৬৭-৬৮)।
(ঘ) আসমান হইতে মাইদা অবতীর্ণ হওয়া: তাফসীরে রূহুল মা'আনীতে আছে, 'আল্লামা আলুসী বলেন, প্রচলিত অর্থে মাইদা হইল, ঐ পাত্র যাহাতে খাদ্যবস্তু রাখা হয়। ইহা ছাড়া কেবল খাদ্যকেও মাইদা বলা হইয়া থাকে (আলুসী, প্রাগুক্ত, ৭খ, page ৫৯)। মুফাসসিরগণের মতে ঐ আয়াতে খাদ্যসহ পাত্রকে বুঝানো হইয়াছে। কেননা ঈসা (আ)-এর অনুসারীরা পাত্র নহে, বরং খাদ্যই চাহিয়াছিল। রাগিব এই মতের প্রবক্তা (তাফসীরে মাজেদী, প্রাগুক্ত, page ৬৬১)।
আল-কুরআনে বর্ণিত ঈসা (আ)-এর মু'জিযা হিসাবে আসমানী মাইদা এক গুরুত্বপূর্ণ মু'জিযা। আল-কুরআনের একটি সূরার নামকরণ করা হয় 'মাইদা'। আল-কুরআনে সরাসরি মাইদার প্রসঙ্গটি আসিলেও ঈসা (আ) ও তাঁহার অনুসারীদের কাছে আসমান হইতে কখন ও কিভাবে কি বস্তু খাদ্য হিসাবে আসিয়াছিল তাহা বিস্তারিত আলোচনা করা হয় নাই। ফলে বিভিন্ন তাফসীর গ্রন্থে মাইদা সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা উল্লেখ করা হইয়াছে।
আল্লামা ইবন কাছীর (র) ইব্ন আব্বাস, সালমান আল-ফারসী, আম্মার ইব্ন ইয়াসির (রা) প্রমুখের বরাতে উল্লেখ্য করেন যে, হযরত ঈসা (আ) ত্রিশ দিন রোযা রাখার আদেশ দিয়াছিলেন। অতঃপর তাহারা যখন ত্রিশ রোযা পূর্ণ করিল তখন তাহারা ঈসা (আ)-এর নিকট আসমান হইতে মাইদা নাযil করিবার জন্য আবেদন করিল যাহাতে তাহারা উহা হইতে আহার করিতে পারে এবং তাহাদের অন্তর পরিতৃপ্তি লাভ করিতে পারে যে, আল্লাহ পাক তাহাদের সিয়াম কবূল করিয়াছেন এবং তাহাদের আবেদন মঞ্জুর করিয়াছেন। আর এইভাবে যেন ইহা এক ঈদ উৎসবে পরিণত হয়। পূর্বাপর ধনী-গরীব সকলের জন্য ইহা যথেষ্ট। অতঃপর ঈসা (আ) তাহাদেরকে এই ব্যাপারে ওয়াজ-নসীহতের মাধ্যমে সতর্ক করিলেন এবং তাহারা এই নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করিতে ও শর্তসমূহ যথাযথভাবে পালন করিতে পারে কি না সেই ব্যাপারে সংশয়বোধ করিলেন। কিন্তু তাহারা বারবার ঈসা (আ)-কে তাঁহার প্রভুর নিকট ঐ ব্যাপারে আবেদন করিতে তাকীদ দিতে লাগিল। ইহা হইতে যখন তাহারা বিরত হইল না তখন ঈসা (আ) সালাতের মুসল্লায় দাঁড়াইয়া গেলেন এবং একটি পশমের পোশাক দ্বারা আবৃত হইয়া মাথা নিম্নদিকে ঝুলাইয়া দিলেন। দুই চোখ কান্নায় ভাসাইয়া দিয়া তিনি আল্লাহর কাছে কাকুতি-মিনতি করিয়া দু'আ করিলেন, যেন তাহারা যাহা চাহিতেছে তাহা তাহদিগকে দেওয়া হয়। তখন আল্লাহ তা'আলা আসমান হইতে মাইদা নাযিল করেন (ইবন কাছীর, প্রাগুক্ত, page ৭৯-৮০)।
'আল্লামা সিউহারবী বিষয়টিকে অন্য আঙ্গিকে উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, ন্যায়নিষ্ঠ ও নিবেদিতপ্রাণ হাওয়ারীগণ যদিও সত্যিকার ঈমানদার ও অবিচল আকীদার অধিকারী ছিলেন, কিন্তু তাহারা সরল প্রকৃতির এবং গরীব ও সম্বলহীন ছিলেন। এজন্য তাহারা সরল মনে হযরত ঈসা (আ)-এর নিকট আবেদন করিলেন যে, যে মহান সত্তার অসীম ক্ষমতার একটি নির্দেশন হইতেছে আপনার অলৌকিক জন্ম এবং আপনাকে দেয়া সেইসব মু'জিযা যাহা আপনার নবুওয়াত ও রিসালাতের সত্যতার সমর্থনে আপনার হাতে প্রকাশ পাইয়াছে, সেই মহান সত্তা নিশ্চয়ই আমাদের জন্য আসমান হইতে খাদ্য খাঞ্চা পাঠাইতেও সক্ষম। তাহা হইলে আমরা জীবন ধারণের জন্য খাদ্য-সামগ্রী সংগ্রহের চিন্তা হইতে মুক্ত হইয়া নিশ্চিন্ত মনে আল্লাহকে স্মরণ করিতে পারিব এবং সব সময় তাঁহার দীনের প্রচারে আত্মনিয়োগ করিতে পারিব। এই কথা শুনিয়া হযরত ঈসা (আ) তাহাদের উপদেশ দিয়া বলিলেন, মহামহিম আল্লাহর শক্তি ও ক্ষমতা যদিও অসীম কিন্তু তাঁহাকে এইভাবে পরীক্ষা করা কোন সত্যিকার বান্দার পক্ষে শোভনীয় নহে। অতএব আল্লাহকে ভয় কর এবং এই জাতীয় চিন্তা পরিত্যাগ কর। হাওয়ারীগণ বলিল, আমরা আল্লাহকে পরীক্ষা করিব, এই দুঃসাহস আমাদের নাই এবং আমাদের উদ্দেশ্য মোটেই তাহা নহে। আমাদের উদ্দেশ্য এই যে, খাদ্য অন্বেষণের চিন্তা হইতে মুক্ত হইয়া আল্লাহ্র এই দানকে নিজেদের জন্য নির্ভর বানাইয়া নেওয়া এবং আপনাকে সত্য নবী হিসাবে মানিয়া নেওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস বদ্ধমূল করিয়া নেওয়া। ইহার মাধ্যমে আমরা গোটা বিশ্বের উপর আল্লাহর প্রভুত্বের পক্ষে ন্যায়নিষ্ঠ সাক্ষীতে পরিণত হইতে পারিব (সিওহারবী, প্রাগুক্ত, page ৮১-৮২)। মাইদা নাযিল সংক্রান্ত ঈসা (আ)-এর দু'আ ও আল্লাহ্র পক্ষ হইতে উহার প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে কুরআন কারীমে বলা হইয়াছে:
قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ اللَّهُمَّ رَبَّنَا انْزِلْ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِّنَ السَّمَاءِ تَكُونُ لَنَا عِبْدًا لِأَوَّلِنَا وَآخِرِنَا وَأَيَةً مِنْكَ وَارْزُقْنَا وَأَنْتَ خَيْرُ الرَّازِقِينَ . قَالَ اللهُ إِنِّي مُنَزِّلُهَا عَلَيْكُمْ فَمَنْ يُكَفِّرْ بَعْدُ مِنْكُمْ فَإِنِّي أُعَذِّبُهُ عَذَابًا لَا أُعَذِّبُهُ أَحَدًا مِّنَ العلمين .
“মায়াম-তনয় ‘ঈসা বলিল, হে আল্লাহ্ আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্য আসমান হইতে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা প্রেরণ কর; ইহা আমাদের ও আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলের জন্য হইবে আনন্দোৎসব স্বরূপ এবং তোমার নিকট হইতে নিদর্শন। আর আমাদিগকে জীবিকা দান কর; তুমিই তো শ্রেষ্ঠ জীবিকাদাতা। আল্লাহ্ বলিলেন, আমিই তোমাদের নিকট উহা প্রেরণ করিব; কিন্তু ইহার পর তোমাদের মধ্যে কেহ কুফরী করিলে তাহাকে এমন শাস্তি দিব, যে শাস্তি বিশ্বজগতের অপর কাহাকেও দিব না” (৫ : ১১৪-১১৫)।
উল্লেখ্য, খাবারে পূর্ণ পাত্র নাযিল হইয়াছিল কিনা তাহা আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয় নাই। এমনকি এই ব্যাপারে কোন মরফু হাদীছও পাওয়া যায় না। অবশ্য সাহাবী ও তাবিঈগণ হইতে উহার বিভিন্ন ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। ইব্ন জরীর তাবারীসহ অনেকেই মুজাহিদ ও হাসান বসরী (র) হইতে বর্ণনা করেন যে, আসমানী খাবারের জন্য আবেদনকারিগণকে যখন আল্লাহর পক্ষ হইতে কঠিন শর্তারোপ করা হয় তখন তাহারা ভয় পাইয়া যায় এবং তাহাদের আবেদন প্রত্যাহার করিয়া লয়, ফলে মাইদা নাযিল হয় নাই (আলুসী, প্রাগুক্ত, page ৬২)।
কিন্তু আবদুল্লাহ ইব্ন আব্বাস এবং আম্মার ইবন ইয়াসির (রা)-সহ অনেকের বর্ণনামতে, মাইদা নাযিল হওয়ার ঘটনা ঘটিয়াছে এবং খাঞ্চা নাযিল হইয়াছিল। জমহুর-এর ইহাই মত এবং এই মতটি প্রসিদ্ধ (আলুসী, প্রাগুক্ত, page ৬২; ইব্ন কাছীর, ২খ, page ৮০; তাফসীরে নাসাফী, ১খ, page ৩৫১)।
বর্ণিত আছে যে, হযরত ঈসা (আ)-এর দু'আর পর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন লাল রং-এর এক খাঞ্চাতে খাবার নাযিল করেন, যাহা দুইটি মেঘের মাঝামাঝিতে ছিল, একটি উপরে অপরটি নিচে। ঐ ধরনের খাবারের আবেদনকারীরা আসমান হইতে মহাশূণ্যে নাযিলের অবস্থায় তাহা প্রত্যাশা করিতেছিলেন। হযরত ঈসা (আ) পূর্বোল্লেখিত শর্তের কারণে ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় কান্নাকাটি করিতেছিল। ঐ খাঞ্চাটি তাঁহার সামনে আসার আগে তিনি অনুনয়-বিনয়ে প্রার্থনা করিতেছিলেন। ইহা তাঁহার সামনে হাজির হইবার পর তাহার আশেপাশে থাকা হাওয়ারীগণ ইহার সুগন্ধে মোহিত হইয়া যান। ঈসা (আ) ও হাওয়ারীগণ শুকরানা সিজদায় লুটাইয়া পড়িলেন। ইয়াহুদীরা দেখিতে আসিয়াও ফিরিয়া গেল। ঈসা ও তাঁহার সাথীবর্গ উহাকে রুমালে আবৃত অবস্থায় দেখিতে পাইলেন। তখন ঈসা (আ) উহা উন্মুক্ত করিয়া বলিলেন— بِسْمِ اللهِ خَيْرُ الرَّازِقِينَ (সেই আল্লাহর নামে শুরু করিতেছি যিনি সর্বোত্তকৃষ্ট রিযিকদাতা)। বিস্ময়ের সাথে তিনি দেখিতে পাইলেন, উহাতে ভাজা মাছ, রুটি ও তাজা ফল বিদ্যমান। ইব্ন কাছীরের বর্ণনামতে উহাতে সাতটি মাছ ও সাতটি রুটি ছিল। বলা হয় ইহাতে সিরকা ছিল। আরও বলা হয় উহাতে ডালিম ছিল। আরও অন্যান্য সুঘ্রাণযুক্ত ফল-ফলাদি ছিল (ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, প্রাগুক্ত)।
আম্মার ইবন ইয়াসির (রা) হইতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন : আসমান হইতে অবতীর্ণ ঐ মাইদাতে রুটি ও গোশত ছিল (ইবনুল জাওযী, প্রাগুক্ত, ২খ, page ৮-৩৪২; তাফসীরুল মাওয়ারদী, ২খ, page ৮৫)। সালমান ফারসীর বর্ণনামতে, উহাতে ভাজা মাছ, পাঁচটি রুটি, খেজুর, যয়তুন ও ডালিম ছিল। কাতাদা (র)-এর মতে বেহেশতী ফল-ফলাদি ও খাবার ছিল। দাহহাক ইব্ন আব্বাস (র) হইতে আরেক বর্ণনায় উল্লেখ করেন, উহাতে ছারীদও ছিল (প্রাগুক্ত)। সাঈদ ইব্ন জুবায়রের মতে, ইহাতে গোশত ছাড়া সব কিছুই ছিল। 'আতিয়া আওফীর মতে, উহাতে মাছ ছিল তবে তাহাতে সব ধরনের খাদ্যের স্বাদ ছিল। ইবনুস সাইব-এর মতে, উহাতে চাউলের রুটি ও সব্জি ছিল (ইবনুল জাওযী, প্রাগুক্ত)। কাহারও মতে, উহাতে দুইটি রুটি ও দুইটি বড় মাছ ছিল। তাহারা খাঞ্চা হইতে চল্লিশ দিন আহার করিয়াছিল (তাফসীরে মাওয়ারদী, প্রাগুক্ত)। মোটকথা, তাহাতে উপাদেয় সুস্বাদু বৈচিত্র্যময় খাদ্যের সমাহার ঘটানো হইয়াছিল। কেননা তাহারা ছিল আল্লাহর মেহমান।
বর্ণিত আছে যে, হাওয়ারী শামউন তাহা দেখিয়া বলিয়াছিল, হে রূহুল্লাহ! ইহা কি দুনিয়ায় তৈরী করা খাবার, না বেহেশতী খাবার? ঈসা (আ) বলিয়াছিলেন, না, ইহা আল্লাহর কুদরতে বিশেষভাবে তৈরী করা (ইবন কাছীর, প্রাগুক্ত, page ১৪৩)। বর্ণিত আছে যে, মাইদা ঈসা-এর কাছে উপস্থিত হওয়ার পর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তিনি দুই রাক'আত সালাত আদায় করিয়াছিলেন। অতঃপর হযরত ঈসা (আ) তাহা আহারের জন্য লোকদের নির্দেশ দিলেন। কিন্তু তাহারা তাঁহাকে প্রথমে খাওয়া শুরু করিবার জন্য বারবার অনুরোধ করিল। তিনি বলিলেন, তাহা আমার জন্য নহে, বরং তোমাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই নাযিল হইয়াছে। এই কথা শুনিয়া সবাই আতংকিত হইল যে, না জানি ইহার পরিণাম কি দাঁড়ায়। তিনি তাহাদের এই অবস্থা দেখিয়া বলিলেন, তাহা হইলে ফকীর-মিসকীন, অক্ষম এবং রুগ্নদের ডাক। ইহা তাহাদের প্রাপ্য। অতঃপর আল্লাহ্র হাজারো বান্দা উহা তৃপ্তি সহকারে খাইল, কিন্তু খাদ্যের পরিমাণে মোটেই ঘাটতি দেখা দিল না (সিওহারবী, প্রাগুক্ত, page ৮৫)। এক বর্ণনামতে ১ হাজার তিন শত ফকীর-মিসকীন ও রোগগ্রস্থ লোক উহা আহার করিয়াছিল।
কাতাদার মতে, হাওয়ারীগণ যেখানেই থাকিতেন সেখানেই সকাল-সন্ধ্যা তাহা অবতীর্ণ হইত। কাহারো মতে, রবিবার দিনে দুই বার উহা নাযিল হইত। এই কারণে রবিবারকে উৎসব দিবস হিসাবে গণ্য করে (ইবনুল জাওযী, প্রাগুক্ত, ২খ, page ৩৪২)।
আর এমনিভাবে তাহারা অভাব-অনটন ও রোগ-বালাই হইতে মুক্তি লাভ করিল। অতঃপর যাহারা উহা ভক্ষণ করা হইতে বিরত ছিল, তাহারা উহাদের অবস্থা প্রত্যক্ষ করিয়া অনুতপ্ত হইল। অতঃপর বলা হয় যে, ইহা দিনে একবার অবতীর্ণ হইত। এমনকি বলা হয় যে, প্রায় সাত হাজার লোক উহা ভক্ষণ করিত। ইহার পর যেমনিভাবে সালেহ (আ)-এর উটনী হইতে একদিন পরপর দুধ পান করিত, তেমনিভাবে মাইদাও একদিন পরপর অবতীর্ণ হইতে শুরু করে। তখন ঈসা (আ) মাইদাকে গরীব ও অভাবীদের জন্য নির্দিষ্ট করিয়া দেন। আর এই বিষয়টি অনেকের কাছে কষ্টদায়ক বলিয়া মনে হয় এবং মুনাফিক শ্রেণীর লোকজন বির্তকের সৃষ্টি করিল। তখন তাহা নাযিল হওয়া বন্ধ হইয়া গেল। আর যাহারা বিতর্ক সৃষ্টি করিয়াছিল তাহারা শূকরে রূপান্তরিত হইয়া গেল (ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ, page ৮০)। তবে শাহ আবদুল কাদির (র) বলেন, শূকরে রূপান্তরিত হওয়ার ঘটনাটি বিশুদ্ধ নহে (সিওহারবী, প্রাগুক্ত, page ৮৮, টীকা দ্র.)।
ইব্ন আবী হাতেম ইন্ন জরীর তাবারী, আম্মার ইবন ইয়াসির (রা) হইতে বর্ণনা করেন, নবী করীম (স) বলেন, আসমান হইতে মাইদা নাযিল হইয়াছিল তাহাতে রুটি ও গোশত ছিল। তাহাদেরকে আদেশ করা হইয়াছিল তাহারা যেন খিয়ানত না করে এবং আগামী দিনের জন্য সঞ্চয় করিয়া না রাখে। অথচ তাহারা খিয়ানত করিল এবং আগামী দিনের জন্য সঞ্চয় করিয়া রাখিল, ফলে তাহারা বানর ও শূকরে রূপান্তরিত হইয়া গেল।
ইন্ন কাছীর এই হাদীছটি মহানবী (সা) হইতে বর্ণিত কিনা সেই ব্যাপারে মন্তব্য করিয়াছেন এবং বলিয়াছেন, ইবন জারীর এই হাদীছটি অন্য সূত্রে শুধু আম্মার (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) হইতে নহে। ইহাই বিশুদ্ধতর (প্রাগুক্ত)।
উল্লেখ্য যে, মাইদা অবতীর্ণের ঘটনাটি খৃস্টানদের কাছে প্রচলিত সুসমাচারসমূহে সরাসরি উল্লেখ্য করা হয় নাই। তবে যোহন সুসমাচারে স্বর্গ হইতে নাযিল হওয়া রুটির কথা উল্লেখ আছে (৬ঃ ৬১)। তবে আল-কুরআন বর্ণিত উক্ত মাইদার কথা সরাসরি উল্লেখ না থাকিলেও মথি সুসমাচারের মতে একবার চার হাজার লোককে সাতখানা রুটি ও কয়েকটি মাছ দ্বারা আলৌকিকভাবে খাওয়ানোর ঘটনা উল্লেখ আছে (মথি, ১৫: ৩৩-৩৮)। এমনিভাবে লুকের অন্য এক বর্ণনায় দেখা যায়, ঈসা (আ) পাঁচটি রুটি ও দুইটি মাছ দ্বারা পাঁচ হাজার লোককে খাওয়াইয়াছিলেন (লুক ৯:১০-১৭)।
(ঙ) গায়বী খবর প্রদান: অদৃশ্য জগতের কিংবা বস্তুগত কার্যকারণের সংযোগ ব্যতীতই কোন কিছু জানার সম্ভাব্যতাকে প্রমাণের জন্য আল্লাহ পাক তাঁহার নবীগণকে অদৃশ্য বিভিন্ন বিষয় অবহিত করেন। ফলে তাঁহারা সেইসব বিষয় জানিতে পারেন যেগুলি সাধারণ মানুষ জানিতে পারে না। এমনিভাবে হযরত ঈসা (আ)-কে আল্লাহ পাক এক অলৌকিক ক্ষমতা প্রদান করিয়াছিলেন, যাহার মাধ্যমে তিনি কিছু কিছু অদৃশ্য বিষয় অবহিত হইতে পারিতেন। আল-কুরআনের বর্ণনা মতে, লোকজন যাহা তাহাদের ঘরে আহার করিত এবং যাহা মওজুদ রাখিত তাহা সম্পর্কে হযরত ঈসা (আ) অবহিত করিতে পারিতেন। উহাতে লোকজন আশ্চর্য হইয়া যাইত।
অপরদিকে কাতাদা (র) বলেন, উল্লিখিত ঘটনাটি মাইদা সম্পর্কিত। বানু ইসরাঈল যেখানেই থাকিত, তাহাদের নিকট আকাশ হইতে মাইদা নামিয়া আসিত। অনেকটা মান্ন ও সালওয়ার ন্যায় (তাফসীরে তাবারী শরীফ, প্রাগুক্ত, page ৪০৫; তাফসীরে মাযহারী, ২খ, page ২৯৭)। তবে গায়বী খবর দানের বিষয়টি মাইদার সহিত নির্দিষ্ট করার কোন প্রমাণ নাই।
ইমাম ইব্ন জারীর তাবারী উল্লেখ করেন, লোকজন ঘরে কি খাইয়া আসিল, কি মওজুদ করিল ইহা সম্পর্কে যদি কেহ প্রশ্ন করে যে, উহাতে হযরত ঈসা (আ)-এর নবুওয়াতের প্রমাণ হয় না, কেননা অনেক জ্যোতিষী ও গণকও এই জাতীয় খবর দিয়া থাকে। আর ক্ষেত্রবিশেষে তাহা সত্যও হইয়া যায়। উত্তরে বলা যায়, জ্যোতিষী ও গণক ব্যক্তিরা এতদসম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা ও কৌশলের মাধ্যমে দিয়া থাকে। পক্ষান্তরে হযরত ঈসা (আ) তথা নবী-রাসূলগণের ব্যাপারটি তেমন নহে, বরং হযরত ঈসা (আ) চিন্তা-গবেষণা ও কৌশল ব্যতিরেকে সরাসরি আল্লাহ কর্তৃক অবহিত হইয়া এইসব সংবাদ দিতেন। এইভাবেই অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে আম্বিয়া কিরামের জ্ঞান আর জ্যোতিষী ও গণকদের জ্ঞান এক নহে (তাফসীরে তাবারী, প্রাগুক্ত, page ৪০২-৪০৩)।
উল্লেখ্য, আল-কুরআনের বর্ণনানুসারে হযরত ঈসা (আ)-এর উপরিউক্ত পাঁচটি মু'জিযা প্রধান। কিন্তু বাংলা ইসলামী বিশ্বকোষে ইহার সংখ্যা নয়টি বলিয়া উল্লেখ্য করা হইয়াছে। উপরিউক্ত পাঁচটিসহ বাকী চারটি নিম্নরূপ:
(১) কোন পিতার মাধ্যম ছাড়াই জন্মগ্রহণ (৩: ৪৫-৪৬)।
(২) দোলনায় কথা বলা (প্রাগুক্ত)।
(৩) জন্মগতভাবেই অন্য নবীগণের কিতাব সম্পর্কে অভিজ্ঞ হওয়া (৩: ৪৮, ৫: ১১০)।
(৪) আত্মা ও শরীরসহ জীবিতাবস্থায় আসমানে উত্তোলন (৪: ১৫৮)।
ইসলামী বিশ্বকোষ (৫খ, page ৫০৯)-এ বর্ণিত উপরিউক্ত চারটি বিষয়কে ঈসা (আ)-এর মু'জিযা না বলাই যথাযথ। কেননা মু'জিযা হইল নবুওয়াতের প্রমাণস্বরূপ এবং নবুওয়াত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জস্বরূপ। নবুওয়াতের দাবিদার ব্যক্তির মাধ্যমে অলৌকিক কিছু সংঘটিত হওয়া যাহা আল্লাহ পাকের ফয়সালা ও কুদরতে সম্পন্ন হইয়া থাকে। অতএব উপরিউক্ত চারটি বিষয়ই অলৌকিক ঘটনা নিঃসন্দেহে। আল-কুরআনেও ঈসা (আ)-কে সৃষ্টির নিদর্শন বলিয়া অবহিত করা হইয়াছে। কিন্তু প্রথমোক্ত তিনটি তাঁহার নবুওয়াতের পূর্ববর্তী জীবনের ঘটনা এবং শেষোক্তটি নবুওয়াতের সর্বশেষ ঘটনা। অতএব চারটি বিষয়ই ঈসা (আ)-এর নবুওয়াতী জীবনে তাঁহার মু'জিযা ছিল না, বরং তাহার সৃষ্টির নিদর্শন।