📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 পিতাবিহীন জন্মের হিকমত

📄 পিতাবিহীন জন্মের হিকমত


হযরত আদম (আ)-এর পর আল্লাহ পাক যত মানুষ সৃষ্টি করিয়াছেন তাহাদিগকে পিতা-মাতার মাধ্যমেই সৃষ্টি করিয়াছেন। কিন্তু আল্লাহ্র নবী ঈসা (আ)-এর ব্যাপারে এই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটিয়াছে। মহান আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা'আলা তাঁহাকে পিতার মাধ্যম ছাড়া শুধু মাতার মাধ্যমেই সৃষ্টি করিয়াছেন। ইহার পিছনে হিকমত বা রহস্য কি? আর ইহা সম্ভব কিনা? এই সম্পর্কে উলামায়ে কেরাম বিভিন্ন ব্যাখ্যা প্রদান করিয়াছেন।
(১) পিতাবিহীনভাবে ঈসা (আ)-এর জন্মলাভের দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ সর্বশক্তিমান। কার্যকারণ বা উপকরণ ব্যতীত তিনি যাহা ইচ্ছা সৃষ্টি করিতে পারেন। কেননা বিশ্বজগতে প্রচলিত নিয়ম-কানুন যিনি প্রবর্তন করিয়াছেন তিনি ইচ্ছা করিলে স্বীয় ব্যবস্থাপনায় ইহার ব্যতিক্রমও ঘটাইতে পারেন। ঈসা (আ)-এর জন্ম আল্লাহ পাকের সেই ক্ষমতা ও শাশ্বত ইচ্ছার প্রতিফলন স্বরূপ।
উল্লেখ্য, ঈসা (আ)-এর জন্ম এমন সম্প্রদায়ে হইয়াছিল যাহারা বস্তুগত উপকরণকেই সবকিছু হওয়ার মাধ্যম মনে করিত। এমন এক যুগে তাঁহার জন্ম যখন সকল কিছুর সৃষ্টির ব্যাপারে কার্যকারণ তত্ত্বের দর্শনকেই একমাত্র সত্য বলিয়া প্রচার করা হইতেছিল। আর প্রাকৃতিক উপকরণ ব্যতীত ঈসা (আ)-এর জন্মলাভ করায় সৃষ্টিজগতে তিনি আল্লাহর আলৌকিক নিদর্শন হিসাবে প্রতিভাত হইয়াছিলেন। বলা হইয়াছে,
وَلِنَجْعَلَهُ آيَةً لِلنَّاسِ وَرَحْمَةً مِّنَّا وَكَانَ أَمْرًا مَقْضِيًّا
"আর আমি উহাকে এইজন্য সৃষ্টি করিব যেন সে হয় মানুষের জন্য এক নিদর্শন ও আমার নিকট হইতে এক অনুগ্রহ; ইহাতো এক স্থিরীকৃত ব্যাপার" (১৯: ২১)।
(২) ঈসা (আ)-এর পিতাবিহীন জন্ম ছিল এক রূহানী জগতের অস্তিত্বের সুস্পষ্ট ঘোষণা। এই ঘোষণা এমন এক সম্প্রদায়ের মাঝে যাহারা রূহানী জগতের অস্তিত্বকে স্বীকার করিত না। তাহারা মনে করিত মানুষ দেহ সর্বস্ব প্রাণী। তাহার রূহ বলিতে কিছু নাই। বলা হয় যে, মানুষ যে দেহ ও আত্মার সমষ্টি তাহা ইয়াহুদীরাও স্বীকার করিত না। দার্শনিক রেনান উল্লেখ করেন যে, গ্রীকরা মনে করিত, মানুষ দেহ ও রূহ সর্বস্ব জীব। তাই ইসরাঈলিরা গ্রীক শিক্ষার প্রতি বিদ্বেষবশত রূহের স্বতন্ত্র অস্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করে (শায়খ আবু যাহরা, মুহাদিরাতু ফিন্ নাসরানিয়্যা, page ১৭-১৮)।
সুতরাং আল্লাহ পাক একটি রূহ সৃষ্টির মাধ্যমে এবং সেই রূহকে পুরুষের স্পর্শ ব্যতীত মারয়ামের গর্ভে প্রদান করিয়া তথা পিতা বিহীনভাবে ঈসা (আ)-কে সৃষ্টি করেন। ইরশাদ হইয়াছেঃ
"এবং স্মরণ কর সেই নারীকে যে নিজ সতীত্বকে রক্ষা করিয়াছিল, অতঃপর আমি তাহার মধ্যে আমার রূহ ফুঁকিয়া দিয়াছিলাম এবং তাহাকে ও তাহার পুত্রকে করিয়াছিলাম বিশ্ববাসীর জন্য এক নিদর্শন" (৬৬:১২)।
এই সৃষ্টিকর্মে এক ফেরেশতা কর্তৃক মারয়ামের জামার ফাঁকে রূহ ফুঁকিয়া দেওয়া ব্যতীত আর কোন উপকরণই ছিল না।
৩। আল্লাহ পাকের সৃষ্টিকর্মের পূর্ণাঙ্গতা বিধানের জন্যই ঈসা (আ)-এর পিতাবিহীন জন্মলাভ। কেননা মানুষ চারটি প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি হইতে পারে।
(ক) পিতা-মাতাবিহীন: যেমন আদমকে সৃষ্টি। (খ) মাতাবিহীন: যেমন হাওয়া (আ)-কে সৃষ্টি। (গ) পিতা-মাতার মাধ্যমে সৃষ্টি: যেমন সাধারণ মানুষ সৃষ্টি। (ঘ) পিতাবিহীন সৃষ্টি। তাই এই প্রকারের সৃষ্টি কৌশলের বহিঃপ্রকাশ হযরত ঈসা (আ)-এর জন্ম। প্রথমোক্ত তিন প্রকারের সৃষ্টির কথা আল্লাহ পাক কুরআন মজীদে বর্ণনা করিয়াছেন নিম্নোক্ত আয়াতে:
"হে মানব! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকে ভয় কর যিনি তোমাদিগকে এক ব্যক্তি হইতেই সৃষ্টি করিয়াছেন ও যিনি তাহা হইতে তাহার সঙ্গিনী সৃষ্টি করেন, যিনি তাহাদের দুইজন হইতে বহু নর-নারী ছড়াইয়াছেন" (৪:১)।
আর চতুর্থ প্রকার মানুষ সৃষ্টির বিষয়টি পবিত্র কুরআনের অন্য আয়াতে সুস্পষ্ট। বলা হইয়াছে:
قَالَتْ رَبِّ أَنِّي يَكُونُ لِي وَلَدٌ وَلَمْ يَمْسَسْنِي بَشَرٌ قَالَ كَذَلِكِ اللَّهُ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ إِذَا قَضَى أَمْرًا فَإِنَّمَا يَقُولُ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ
"সে (মারয়াম) বলিল, হে আমার পালনকর্তা। আমাকে কোন পুরুষ স্পর্শ করে নাই, আমার সন্তান হইবে কিভাবে? তিনি বলিলেন, এইভাবেই; আল্লাহ যাহা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। তিনি যখন কিছু স্থির করেন তখন বলেন, 'হও' এবং উহা হইয়া যায়" (৩:৪৭)।
সুতরাং আল্লাহ্ পক্ষে ঈসা (আ)-কে পিতাবিহীন সৃষ্টি করা সম্ভব। তিনি সর্বশক্তির আধার। বর্ণিত আছে যে, নাজরানের খৃস্টান প্রতিনিধি দল মহানবী (স)-এর কাছে আসিয়া বলিয়াছিল, আপনার কি হইল যে, আমাদের সাহেব তথা প্রাণপুরুষকে গালি দিতেছেন? মহানবী (স) বলিলেন, আমি কি বলিলাম? তাহারা বলিল, আপনি বলেন যে, তিনি আল্লাহর বান্দা। তখন মহানবী (স) বলিলেন, হাঁ, তিনি তো আল্লাহর বান্দা ও রাসূল এবং সেই কলেমা যাহাকে কুমারী মারয়াম (আ)-এর প্রতি ঢালিয়া দেওয়া হইয়াছিল। ইহা শুনিয়া তাহারা রাগান্বিত হইল এবং বলিল, আপনি কি দেখিয়াছেন, কোন মানুষ পিতাবিহীন জন্মলাভ করিয়াছে? যদি আপনার দাবিতে সত্যবাদী হন তবে এইরূপ সৃষ্টির কোন নজীর দেখান। তখন আল্লাহ পাক নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন। إِنْ مَثَلَ عِيسَى عِنْدَ اللَّهِ كَمَثَلِ أَدَمَ خَلَقَهُ مِنْ تُرَابٍ ثُمَّ قَالَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ "আল্লাহ্র নিকট ঈসার দৃষ্টান্ত আদমের দৃষ্টান্ত সদৃশ। তিনি তাহাকে মৃত্তিকা হইতে সৃষ্টি করিয়াছিলেন, অতঃপর তাহাকে বলিয়াছিলেন, 'হও', ফলে সে হইয়া গেল" (৩ঃ ৫৯) (আলুসী, প্রাগুক্ত, ৩খ., page ১৮৫-১৮৬)।
উল্লেখ্য যে, আদম (আ)-কে সৃষ্টি করা হয়, যাহার পিতা-মাতা কিছুই ছিল না। ইহা কি করিয়া সম্ভব হইল? যাহারা এই ধরনের সন্দেহ পোষণ করেন, তাহাদের সন্দেহ নিরসনে ঈসা (আ)-এর পিতাবিহীন জন্মটিও একটি নিদর্শনস্বরূপ। এই হিকমতের কারণেও আল্লাহ্ পাক ঈসাকে ঐভাবে সৃষ্টি করিলেন।
অপরদিকে আদম (আ)-এর সৃষ্টিতে তাঁহার কোন পিতা-মাতা ছিল না। কিন্তু ঈসা (আ)-এর সৃষ্টিতে পিতা না থাকিলেও মাতা ছিলেন। তাই ঈসা (আ)-এর সৃষ্টিকর্ম আরও সহজসাধ্য। তাহা ছাড়া উলামায়ে কেরাম নিম্নোক্ত যুক্তিও প্রদর্শন করিয়া থাকেন। যথা: পুরুষের সকল শুক্রকীট নারীর গর্ভে প্রবেশের মাধ্যমে গর্ভধারণ সম্পন্ন হইয়া যায় না। আল্লাহ্র ইচ্ছায় কোন একটি শুক্রকীট নারীর ডিম্বকোষের সহিত মিশ্রিত হওয়ার পরই ইহার প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং কয়েকটি স্তর অতিক্রম করার পর তাহাতে রূহ প্রবেশ করে। ইহা দ্বারা বুঝা যাইতেছে, শুক্রকীটের অনুপ্রবেশ ও রূহের অনুপ্রবেশের পর্যায় হইল ভিন্ন ভিন্ন।
বর্তমান বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও প্রজনন বিদ্যার বিভিন্ন কলাকৌশল, তত্ত্বাদি ও তথ্যাদি এবং সর্বপরি এই ক্ষেত্রে সফলতা উপরিউক্ত বিষয়টিকে আরও সম্ভাবনাময় করিয়া তুলিয়াছে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত ঈসা (আ)-এর পয়গাম ইসরাঈল জাতির জন্য নির্দিষ্ট ছিল

📄 হযরত ঈসা (আ)-এর পয়গাম ইসরাঈল জাতির জন্য নির্দিষ্ট ছিল


হযরত ঈসা (আ) ছিলেন বানু ইসরাঈলের শেষ নবী ও রাসূল। তাঁহার পয়গাম ইসরাঈল জাতির জন্য নির্দিষ্ট ছিল। কুরআন কারীমের বিভিন্ন স্থানে বর্ণনা করা হইয়াছে যে, হযরত ঈসা (আ) কেবল বানু ইসরাঈলের জন্য নবীরূপে প্রেরিত হইয়াছিলেন, সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য নহে। বলা হইয়াছে:
"ঈসাকে বানু ইসরাঈলের জন্য রাসূল করিয়া প্রেরণ করা হইয়াছিল"।
অনত্র বলা হইয়াছে: وَرَسُولاً إِلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ وَإِذْ قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ. "স্মরণ কর যখন মারয়াম তনয় ঈসা বলিয়াছিল, হে বানু ইসরাঈল! আমি তোমাদের জন্য রাসূল রূপে প্রেরিত হইয়াছি” (৬১:৬)।
উল্লেখ্য যে, হযরত ঈসা (আ) তাঁহার দাওয়াতী কার্যক্রম বানু ইসরাঈলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখিলেও পরবর্তীতে তাঁহার অনুসারী হিসাবে দাবিদার কিছু কিছু ব্যক্তি, যেমন পৌল, ঈসা (আ)-এর সেই দাওয়াতী কার্যক্রম ইসরাঈল বহির্ভূতদের মধ্যেও প্রসারিত করেন। ইহা ছিল খৃস্টানদের প্রাথমিক যুগে ইয়াহুদীদের একটি ষড়যন্ত্রের অংশবিশেষ। তাই যাহারা ইসরাঈলী সমাজের বাহিরে খৃস্ট ধর্ম প্রচারে আগ্রহী ছিল তাহাদেরকে ঐ ইয়াহূদী ষড়যন্ত্রকারীরা বিভিন্নভাবে সমর্থন ও সহযোগিতাও করিয়াছে। ঐ ধরনের ষড়যন্ত্রকারীরা হযরত ঈসার বাণীর অপব্যাখ্যা দিতেও কুণ্ঠা বোধ করে নাই, এমনকি তাঁহার বাণী বিকৃত করিয়া খৃস্টানদিগের কাছে প্রচলিত সুসমাচারে সংযুক্ত করিতেও সক্ষম হয়। এই প্রেক্ষিতে মথি সুসমাচারে আসিয়াছে, ঈসা নাকি বলিয়াছেন, "স্বর্গে ও পৃথিবীতে সমস্ত কর্তৃত্ব আমাকে দত্ত হইয়াছে। অতএব তোমার গিয়া সমুদয় জাতিকে শিষ্য কর" (মথি, ২৮: ১৮-১৯)।
স্মর্তব্য, সম্ভবত সমুদয় জাতি বলিতে বানু ইসরাঈলের সকল গোত্র বুঝানো হইয়াছে। কিন্তু খৃস্টানগণ ইহাকে সারা বিশ্বের মানুষ বুঝাইতে চেষ্টা করিয়া থাকে (আরো দ্র. মার্ক, ১৬: ১৫)।
মথি সুসমাচারে সমুদয় জাতির কাছে ঈসা (আ)-এর বাণী প্রচারের কথা বলা হইলেও সেই একই সুসমচারে আসিয়াছে যে, তিনি তাঁহার ১২ জন প্রেরিতকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিতেছেন, "তোমরা পর জাতিগণের পথে যাইও না এবং শমরীয়দের কোন নগরে প্রবেশ করিও না, বরং ইস্রায়েল কুলের হারান মেষগণের কাছে যাও। আর তোমরা যাইতে যাইতে এই কথা প্রচার কর, স্বর্গরাজ্য সন্নিকট হইল" (মথি ১০: ৬-৭)। একই সুসমাচারে অন্যত্র বলা হয়ঃ "ইসরাঈল কুলের হারান মেষ ছাড়া আর কাহারও নিকটে আমি প্রেরিত হই নাই" (প্রাগুক্ত, ১৫: ২৪)।
অতএব একই গ্রন্থের উভয় তথ্যের মধ্যে বৈপরীত্য বিদ্যমান। কিন্তু শেষোক্ত তথ্যের সহিত আল-কুরআনের মিল রহিয়াছে (দ্র. ৩: ৪৯ ও ৬১: ৪৬)। তিনি ছিলেন শুধু বানু ইসরাঈলের জন্য। প্রেরিত। এই কথাটি এমনকি বার্নাবাসের বাইবেলেও স্পষ্টভাবে আসিয়াছে। ঈসা (আ) বলিয়াছিলেন, আমি বানু ইসরাঈল ছাড়া আর কোনো সম্প্রদায়ের জন্য প্রেরিত নাই (বার্নাবাসের বাইবেল, page ২২)। অতঃএব ঈসা (আ)-এর পয়গামকে বিশ্বজনীন করার প্রচেষ্টা হযরত ঈসা (আ)-এর পরবর্তী সময়ের।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 পিতাবিহীন জন্ম ও আলকুরআন

📄 পিতাবিহীন জন্ম ও আলকুরআন


হযরত ঈসা (আ)-এর ব্যাপারে জমহুর তথা অধিকাংশ উলামার বিশ্বাস যে, তিনি পিতাবিহীন জন্মলাভ করিয়াছেন। কুরআন ও সহীহ হাদীসসমূহের স্পষ্ট ভাষ্য দ্বারা তাহাই প্রমাণিত। একথা ঠিক যে, আল-কুরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয় নাই যে, ঈসা (আ)-এর কোন পিতা নাই। আধুনিক যুগে স্যার সৈয়দ আহমদ খান এবং ডঃ তৌফিক সিদ্দীকিসহ আরও কয়েকজন ব্যক্তি ভুল ব্যাখ্যা ও অলৌকিকতাকে এড়াইয়া যাওয়ার প্রয়াসে জমহূরের ঐ বিশ্বাস হইতে বিচ্যুত হইয়া গিয়াছেন (মাওলানা আবুল কালাম আযাদ, তরজমানুল কুরআন, ২খ., ৪৪৪-৪৫)। আর দুর্ভাগ্যবশত আধুনিক শিক্ষিত অনেকেই সেই ধরনের ধ্যান-ধারণা পোষণ করিতে শুরু করিয়াছেন। হযরত ঈসার প্রভুত্ব প্রমাণে একদিকে একদল খৃস্টান যেমন তাঁহাকে খোদার পুত্র সাব্যস্ত করিতে ব্যস্ত, অন্যদিকে ইয়াহুদীরা তাঁহার জন্মকে অবৈধ বলিতেও দ্বিধাবোধ করে নাই।
(১) মারয়াম (আ)-এর সাথে কোন পুরুষের দৈহিক সম্পর্ক ঘটে নাই। তিনি নিজেকে হেফাজত করিয়াছিলেন। আর তখনই তাঁহার গর্ভে ঈসা (আ)-এর রূহ ফুঁকিয়া দেওয়া হয়। এই কথা আল-কুরআনে স্পষ্টভাবে বলা হইয়াছে: وَمَرْيَمَ ابْنَتَ عِمْرَنَ الَّتِي أَحْصَنَتْ فَرْجَهَا فَنَفَخْنَا فِيهِ مِنْ رُوحِنَا وَصَدَّقَتْ بِكَلِمَتِ رَبَّهَا وَكُتُبِهِ وَكَانَتْ مِنَ الفنتين. "আরও দৃষ্টান্ত দিতেছেন ইমরান তনয়া মারয়ামের, যে তাহার সতীত্ব রক্ষা করিয়াছিল। ফলে আমি তাহার মধ্যে রূহ ফুঁকিয়া দিয়াছিলাম এবং সে তাহার প্রতিপালকের বাণী ও তাহার কিতাবসমূহ সত্য বলিয়া গ্রহণ করিয়াছিল। সে ছিল অনুগতদিগের একজন" (৬৬ : ১২)।
(২) আল-কুরআনে মারয়ামের মত তাঁহার সন্তানের পূত-পবিত্রতা, দুনিয়া ও আখেরাতে লোক সমাজে সম্মানিত হওয়ার কথাও ব্যক্ত করা হইয়াছে। যেমন ঈসা (আ) সম্পর্কে আল্লাহর বাণী : وَجِيهًا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَمِنَ الْمُقَرَّبِينَ . "সে ইহ ও পরলোকে সম্মানিত এবং সান্নিধ্যপ্রাপ্তগণের অন্যতম হইবে" (৩ : ৪৫)।
(৩) আল-কুরআনে একাধিক জায়গায় হযরত ঈসা (আ)-কে সৃষ্টির নিদর্শন বলা হইয়াছে। পিতা-মাতার মাধ্যমে স্বাভাবিক জন্ম হইলে তিনি নিদর্শন কিভাবে হইলেন? যেমন সূরা আম্বিয়াতে বলা হয় وَأَيَّتَهَا آيَةً لِلْعَالَمِينَ "এবং তাহার সন্তান জগৎবাসীর জন্য এক নিদর্শনস্বরূপ” (২১ : ৯১)। এমনিভাবে সূরা মুমিনূনে বলা হয়- وَجَعَلْنَا ابْنَ مَرْيَمَ وَأُمَّهُ آيَةً وَأَوَيْنَهُمَا إِلَى رَبِّوَةٍ ذَاتِ قَرَارٍ وَمَعِينٍ . "আর আমি মারয়ামের পুত্র (ঈসা) এবং তাহার মাকে (কুদরতের) নিদর্শনস্বরূপ বানাইয়াছি" (২৩ : ৫০)।
(৪) ঈসা (আ)-এর পিতামাতা উভয়ের মাধ্যমে স্বাভাবিক জন্ম হইলে আল-কুরআনে তাঁহাকে হযরত আদম (আ)-এর সহিত তুলনা করা হইত না। আদম (আ)-এর কোন পিতা-মাতা ছিল না। ইহা স্বীকৃত বিষয়। এমনিভাবে ঈসা (আ)-এর মাতা থাকিলেও পিতা ছিল না। পিতা না থাকার দিক দিয়া উভয়ের মধ্যে মিল আছে। সেজন্য তাঁহার সৃষ্টি আদম (আ)-এর সৃষ্টির সহিত তুলনা করা হয়। ইরশাদ হইয়াছে :
إِنَّ مَثَلَ عِيسَى عِنْدَ اللَّهِ كَمَثَلِ أَدَمَ خَلَقَهُ مِنْ تُرَابٍ ثُمَّ قَالَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ "আল্লাহ্র নিকট ঈসার দৃষ্টান্ত আদম (আ)-এর দৃষ্টান্ত সদৃশ। তিনি তাহাকে মৃত্তিকা হইতে সৃষ্টি করিয়াছিলেন, অতঃপর তাহাকে বলিয়াছিলেন, হও, ফলে সে হইয়া গেল” (৩ঃ ৫৯)।
(৫) মানব সমাজে সন্তানদেরকে সর্বদা পিতার সহিত সম্পর্কিত করিয়া সম্বোধন করা হয়। কিন্তু আল-কুরআনে হযরত ঈসা (আ)-কে ২৩ বার ইব্‌ন মারয়াম বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। ইহা হইতে বুঝা যায়, তাঁহার কোন পিতা ছিল না। এইজন্য তাঁহাকে ইব্‌ন মারয়াম বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে।
(৬) আল-কুরআনে আল্লাহ পাক বারবার ঘোষণা করিয়াছেন যে, তাঁহার কোন সন্তানাদি নাই। যাহারা আল্লাহ্ পুত্র সাব্যস্ত করিতে চায় তাহাদের ভ্রান্ত আকীদাও খণ্ডন করা হইয়াছে। কুরআন কারীমে বলা হইয়াছে :
ذلكَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ قَوْلَ الْحَقِّ الَّذِي فِيهِ يَمْتَرُونَ . مَا كَانَ لِلَّهِ أَنْ يَتَّخِذَ مِنْ وَلَدٍ سُبْحَنَهُ إِذَا قَضَى أمْرًا فَإِنَّمَا يَقُولُ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ
"এই-ই মারয়াম-তনয় ঈসা। আমি বলিলাম সত্য কথা, যে বিষয়ে উহারা বিতর্ক করে। সন্তান গ্রহণ করা আল্লাহর কাজ নহে, তিনি পবিত্র মহিমময়। তিনি যখন কিছু স্থির করেন তখন বলে, 'হও' এবং উহা হইয়া যায়” (১৯:৩৪-৩৫)।
অতএব আল-কুরআনের উপরিউক্ত স্পষ্ট বক্তব্যের পরও কাহাকেও ঈসা (আ)-এর পিতা সাব্যস্ত করার দাবি চরম ধৃষ্টতা প্রদর্শন বৈ কিছু নহে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ঈসা (আ) কতৃক শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (স)-এর আগমনের সুসংবাদ ঘোষণা

📄 ঈসা (আ) কতৃক শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (স)-এর আগমনের সুসংবাদ ঘোষণা


হযরত ঈসা (আ)-এর পয়গামের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এই যে, তিনি তাঁহার অনুসারীদেরকে তাঁহার পরবর্তী পয়গাম্বরের শুভাগমন সম্পর্কে সুসংবাদ প্রদান করিতেন। আর সেই পরবর্তী পয়গাম্বর বলিতে তিনি আখেরী নবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তাফা আহমদ মুজতবা (স)-কে বুঝাইয়াছিলেন। আল-কুরআনে এই সম্পর্কে বলা হইয়াছে: وَإِذْ قَالَ عِيسَى بْنُ مَرْيَمَ يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَى مِنَ التَّوْرَاةِ وَمُبَشِّرًا بِرَسُولٍ يَأْتِي مِنْ بَعْدِي اسْمُهُ أَحْمَدُ. "স্মরণ কর, মারয়াম তনয় ঈসা বলিয়াছিল, হে বানু ইসরাঈল! আমি তোমাদের নিকট আল্লাহ্র রাসূল, আমার পূর্ব হইতে তোমাদের নিকট যে তাওরাত রহিয়াছে আমি তাঁহার সমর্থক এবং আমার পরে আহমাদ নামে যে রাসূল আসিবেন আমি তাহার সুসংবাদদাতা" (৬১:৬)।
হযরত ঈসা (আ)-এর ঐ ঘোষণায় হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর নাম আহমাদ বলা হইয়াছে। আহমাদ শব্দের দুইটি অর্থ রহিয়াছেঃ (১) সেই ব্যক্তি যে আল্লাহ্ সর্বাধিক প্রশংসাকারী। (২) সেই ব্যক্তি যাহার সর্বাধিক প্রশংসা করা হইয়াছে অথবা বান্দাদের মধ্যে যে লোক সর্বাধিক প্রশংসাযোগ্য।
কুরতুবী উল্লেখ করেন যে, তিনি দুনিয়াতে প্রশংসিত, কারণ তাঁহার মাধ্যমে হেদায়াত দেওয়া হইয়াছে এবং তাঁহাকে ইলম ও হিকমতসহ পাঠাইয়া দুনিয়াবাসীকে উপকৃত করা হইয়াছে। এমনিভাবে তিনি অখিরাতেও শাফাআতের জন্য প্রশংসিত। তিনি প্রশংসাকারী তথা আহমাদ যেইজন্য তিনি প্রশংসিত তথা মুহাম্মাদ। আহমাদ বলিয়াই তিনি মুহাম্মাদ হইলেন (কুরতুবী, প্রাগুক্ত, ১৮খ, page ৮৪)।
উল্লেখ্য, একাধিক সহীহ হাদীছ হইতে প্রমাণিত যে, আহমাদ হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর অপর এক নাম। মহানবী (স) বলিয়াছেন: اسمى في التوراة احمد لاني احيد امتى عن النار واسمى في الزبور الماحي محا الله لى عبدة الأوثان واسمى في الانجيل احمد واسمى في القرآن محمد لأنى محمود في اهل السماء والارض . "তাওরাতে আমার নাম আহইয়াদ (রক্ষাকারী), কারণ আমার উম্মতকে আমি জাহান্নামের আগুন হইতে রক্ষা করিব, যাবুরে আমার নাম মাহী (বিলুপ্তকারী), কারণ আল্লাহ পাক আমার দ্বারা মূর্তি পূজা বিলুপ্ত করিয়া দিবেন। "ইনজীলে আমার নাম আহমাদ এবং আল-কুরআনে আমার নাম মুহাম্মাদ। কেননা আমি আসমান ও দুনিয়াবাসীর মধ্যে প্রশংসিত" (প্রাগুক্ত)।
হযরত জুবায়র ইবন মুতইম হইতে ইমাম মালেক, বুখারী, মুসলিম, দারিমী, তিরমিযী ও নাসায়ী এই অর্থেরই একাধিক হাদীছ উদ্ধৃত করিয়াছেন। সাহাবায়ে কিরামের মধ্যেও রাসূলে করীম (স)-এর এই নাম সুপরিচিত ছিল। হযরত হাসসান ইবন ছাবিতের কবিতার একটি ছত্র উহার প্রমাণ:
‎صلى الاله ومن تحت بعرشه ‎والطيبون على المبارك احمد
“আল্লাহ এবং তাঁহার আরশের চতুষ্পার্শে সমবেত অসংখ্য ফেরেশতা ও সকল পবিত্র আত্মা মহান বরকতওয়ালা আহমাদ-এর প্রতি সালাত পেশ করেন"।
রাসূলে করীম (স)-এর নাম কেবল মুহাম্মাদ ছিল না, আহমদও তাঁহার একটি নাম ছিল, ইতিহাসের পৃষ্ঠাগুলি হইতেও ইহার সত্যতা প্রমাণিত। তাঁহার পূর্বে অন্য কাহারও নাম 'আহমাদ' ছিল বলিয়া আরব সাহিত্যে কোন উল্লেখ পাওয়া যায় না। আর এক কথায় রাসূলের সময় হইতে আজ পর্যন্ত সমস্ত মুসলিম উম্মাতের মধ্যে তাঁহার এই নাম সুপরিচিত ও সর্বজনবিদিত।
খৃস্টানদের হাতে বর্তমানে সুসমাচারগুলিতে প্রচুর রদবদল হওয়া সত্ত্বেও সেই সকল গ্রন্থে ঈসা (আ)-এর বাণী বলিয়া যাহা উক্ত হইয়াছে, তাহাতেও মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর আগমনের সুসংবাদ রহিয়াছে।
প্রথমত, ঈসা (আ) স্বর্গরাজ্য তথা আল্লাহর দেওয়া বিধানে পরিচালিত একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা আসন্ন বলিয়া তাঁহার একাধিক বাণীতে উল্লেখ করিয়াছেন (মথি, ৬: ১০)। লুক সুসমাচারে আরও আসিয়াছে, ঈসা (আ) তাঁহার ১২ জন অনুসারীকে ডাকিয়া সেই স্বর্গ- রাজ্যের সুসংবাদ দানের কথা বলিয়াছিলেন (লুক; ১-৪)। আর একথা সর্বজনবিদিত যে, সেই ধরনের আসমানী কর্তৃত্ব ঈসা (আ)-এর শরীআতের মাধ্যমে তাঁহার সুত্রে কিংবা তাঁহার অনুসারীদের যুগেও প্রতিষ্ঠিত হয় নাই, হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর শরীআতের মাধ্যমেই উহা যমীনে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল (রহমতুল্লাহ হিন্দী, প্রাগুক্ত, ৪খ, page ১১৭৪-১১৭৫)।
দ্বিতীয়ত, মথি সুসমাচারে অন্য স্থানে আসিয়াছে, হযরত ঈসা (আ) মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (স) ও তাঁহার উম্মত সম্পর্কে একটি উদাহরণের মাধ্যমে ভবিষ্যদ্বাণী করিয়াছেন। তাহা নিম্নরূপ:
"কিন্তু যাহারা প্রথম এমন অনেক লোক শেষে পড়িবে এবং যাহারা শেষের এমন অনেক লোক প্রথম হইবে। কেননা স্বর্গরাজ্য এমন একজন গৃহকর্তার তুল্য যিনি প্রভাতকালে আপন দ্রাক্ষাক্ষেত্রে মজুর লাগাইবার জন্য বাহিরে গেলেন। তিনি মজুরদের সহিত দিন এক সিকি বেতন স্থির করিয়া তাহদিগকে আপন দ্রাক্ষাক্ষেত্রে প্রেরণ করিলেন। পরে তিনি তিন ঘটিকার সময়ে বাহিরে গিয়া দেখিলেন অন্য কয়েকজন বাজারে নিষ্কর্মে দাঁড়াইয়া আছে। তিনি তাহাদিগকে কহিলেন, তোমরাও দ্রাক্ষাক্ষেত্রে যাও, যাহা ন্যায্য তোমাদিগকে দেব; তাহাতে তাহারা গেল। আবার তিনি ছয় ও নয় ঘটিকার সময়েও বাহিরে গিয়া আর কয়েকজনকে দাঁড়াইয়া থাকিতে দেখিলেন, আর তাহাদিগকে বলিলেন, কিজন্য সমস্ত দিন এখানে নিষ্কর্মে দাঁড়াইয়া আছ? তাহারা তাহাকে বলিল, কেহই আমাদিগকে কাজে লাগায় নাই। তিনি তাহাদিগকে কহিলেন, তোমরাও দ্রাক্ষাক্ষেত্রে যাও। পরে সন্ধ্যা হইলে সেই দ্রাক্ষাক্ষেত্রের কর্তা আপন দেওয়ানকে কহিলেন, মজুরদিগকে ডাকিয়া মজুরী দাও। শেষ জন হইতে আরম্ভ করিয়া প্রথম জন পর্যন্ত দাও। তাহাতে তাহাদের এগার ঘটিকা পর্যন্ত লাগিয়াছিল। তাহারা আসিয়া এক একজন এক এক সিকি পাইল। পরে যাহারা প্রথমে লাগিয়াছিল, তাহারা আসিয়া মনে করিল, আমরা বেশী পাইব; কিন্তু তাহারাও এক এক সিকি পাইল। তাহারা সেই গৃহকর্তার বিরুদ্ধে বচসা করিয়া কহিতে লাগিল, শেষের ইহারা ত এক ঘন্টা মাত্র খাটিয়াছে, আমরা সমস্ত দিন খাটিয়াছি ও রৌদ্রে পুড়িয়াছি। আপনি ইহাদিগকে আমাদের সমান করিলেন। তিনি উত্তর করিয়া তাহাদের একজনকে কহিলেন, বন্ধু হে! আমি তোমার প্রতি কিছু অন্যায় করি নাই; তুমি কি আমার নিকটে এক সিকিতে স্বীকার কর নাই? তোমার যাহা পাওনা তাহা লইয়া চলিয়া যাও। আমার ইচ্ছা তোমাকে যাহা ঐ শেষের জনকেও তাহাই দিব। আমার নিজের যাহা তাহা আপনার ইচ্ছা মতে ব্যবহার করিবার অধিকার কি আমার নাই? না আমি দয়ালু বলিয়া তোমার চোখ টাটাইতেছে? এইরূপে যাহারা শেষের তাহারা প্রথম হইবে এবং যাহারা প্রথম তাহারা শেষে পড়িবে” (মথি ১৯: ৩০; ২০: ১০: ১৬)।
এই সুসংবাদে হযরত ঈসা (আ) দৃষ্টান্তের আকারে দুনিয়ার জাতিসমূহের কর্মময় জীবন এবং আল্লাহ্র পথ হইতে তাহাদের লওয়ার ও প্রতিদানের তুলনা করিয়াছেন। প্রথমের শ্রমিকরা হইলেন হযরত মূসা (আ)-এর পূর্বেকার জাতিসমূহ, দ্বিতীয় দল হযরত মূসা (আ)-এর নিজের উম্মত বানু ইসরাঈল, তৃতীয় দল হযরত ঈসা (আ)-এর উম্মত খৃস্টানগণ এবং নূতন ও সর্বশেষ দল সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ (স)-এর উম্মতগণ।
পৃথিবীর বয়সের দৃষ্টিকোণ হইতে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় দলের তুলনায় মুহাম্মাদ (স)-এর উম্মতের জীবনকাল যেন দিনের শেষ প্রহর এবং সওয়াব ও প্রতিদানের ক্ষেত্রে এই সর্বশেষ উম্মতকে তাহাদের পূর্বেকার উম্মতদের সম পরিমাণ দেওয়ার অর্থ হইল ইহাই। আল্লাহ তা'আলার দরবারে অন্য সকল উম্মতের তুলনায় তাহাদের সংখ্যা অধিক। এখানে শেষে যাহারা আসিবে তাহাদের দ্বারা উদ্দেশ্য উম্মতে মুহাম্মাদী। এই মর্মে হযরত মুহাম্মদ (স)-ও বলিয়াছেন:
نحن الآخرون السابقون . "আমরাই শেষে আসা অগ্রগামী লোক" (বুখারী, কিতাবুল উদ্, দ্রষ্টব্য ফতহুল বারী, ১খ, page ৩৪৫)।
উপরিউক্ত তিন দলের প্রতিদানের বিষয়টি মহানবী (স) এক উপমায় নিম্নরূপ বর্ণনা করেন:
مثلكم ومثل اهل الكتابين كمثل رجل استاجر اجراء فقال من يعمل لى من غدوة الى نصف النهار على قيراط فعملت اليهود ثم قال من يعمل لى من نصف النهار الى صلوة العصر على قيراط فعملت النصارى ثم قال من يعمل لي من العصر الى ان تغيب الشمس على قيراطين فانتم هم فغضبت اليهود والنصارى فقالوا ما لنا اكثر عملا واقل عطاء قال هل نقصتكم من حقكم قالوا لا قال فذلك فضلى أوتي من اشاء.
“তোমরা ও আহলে কিতাবদের উপমা সেই ব্যক্তির সাথে হইতে পারে যে অনেক মজুর নিয়োগ করে এবং বলে, সকাল হইতে দুপুর পর্যন্ত এক কীরাত মজুরীতে কে আছ যে আমার জন্য কাজ করিবে? অতঃপর ইয়াহুদীরা কাজ করিল। এমনিভাবে তিনি আরও বলিলেন, দুপুর হইতে আসর পর্যন্ত এক কীরাত মজুরীতে কে আছ আমার জন্য কাজ করিবে? তখন নাসারাগণ কাজ করিল। অতঃপর তিনি আরও বলিলেন, আসর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত দুই কীরাত মজুরীতে কে আছ আমার জন্য কাজ করিবে। আর তোমরাই (মুসলমানরা) সেই দল। অতঃপর ইয়াহুদী ও নাসারাগণ রাগান্বিত হইল এবং বলিল, আমাদের কি হইল যে আমরা বেশী কাজ করিলাম এবং কম মজুরী পাইলাম? তখন কর্তা বলেন, তোমাদের হক বা নির্ধারিত পাওনার কম দিয়াছি কি? তাহারা বলিল, না। তিনি বলিলেন, ইহা আমার অনুগ্রহ যাহাকে ইচ্ছা আমি বেশী দিব” (বুখারী, কিতাবুল ইজারা, বাবু আল-ইজারাত ইলা নিসফিন নাহার; দ্র. ফাতহুল বারী, page ৪৪৫-৪৪৭)।
তৃতীয়ত: হযরত ঈসা (আ) আর একটি উপমায় মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (স) ও তাঁহার উম্মতের আগমন সম্পর্কে সুসংবাদ দিয়াছিলেন: আমার পুত্রকে সমাদর করিবে। কিন্তু কৃষকেরা পুত্রকে দেখিয়া পরস্পর বলিল, এই ব্যক্তিই উত্তরাধিকারী। আইস, আমরা ইহাকে বধ করিয়া ইহার অধিকার হস্তগত করি। আর যোহনের (হযরত ইয়াহইয়া (আ)-এর) সাক্ষ্য এইঃ যখন ইয়াহুদীগণ কয়েকজন যাজক ও লেবীয়কে দিয়া যিরুসালেম হইতে তাহার কাছে এই কথা জিজ্ঞাসা করিয়া পাঠাইল, আপনি কে? তখন তিনি স্বীকার করিলেন, অস্বীকার করিলেন না। তিনি স্বীকার করিলেন যে, আমি সেই খৃস্ট নই। তাহারা তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল, তবে কি? আপনি কি এলিয়? তিনি বলিলেন, আমি এলিয় নই। আপনি কি সেই ভাববাদী? তিনি উত্তর করিলেন, না। তখন তাহার তাঁহাকে কহিল, আপনি কে? যাহারা আমাদিগকে পাঠাইয়াছেন তাহাদিগকে যেন উত্তর দিতে পারি। আপনার বিষয়ে আপনি কি বলেন? তিনি কহিলেন, আমি প্রান্তরে একজনের রব, যে ঘোষণা করিতেছে, তোমার প্রভুর পথ স্মরণ কর, যেমন যিশাইয় ভাববাদী বলিয়াছিলেন। তাহারা ফরিশীগণের নিকট হইতে প্রেরিত হইয়াছিল। আর তাহারা তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিল, আপনি যদি সেই খৃস্টও নহেন এলিয়ও নহেন, সেই ভাববাদীও নহেন, তবে বাপ্তাইজ করিতেছেন কেন (১ : ১০-২৫)?
এই বর্ণনা হইতে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, বানু ইসরাঈলরা হযরত ঈসা মসীহ ও হযরত ইলয়াস (আ) ছাড়া আরও একজন নবীর জন্য প্রতীক্ষমাণ ছিল। তিনি হযরত ইয়াহইয়াও নহেন। এই ভাবাবাদী নবীর আগমন সংক্রান্ত বিশ্বাস- বানু ইসরাঈলীদের মধ্যে এমন সর্বজনবিদিত ছিল যে, সেই নবী বলাই তাহাকে বুঝানোর জন্য যথেষ্ট ছিল। উপরন্তু ইহা হইতে এই কথাও জানা গেল যে, যে নবীর প্রতি তাহারা ইংগিত করিত, তাহার আগমন অকাট্যভাবে প্রমাণিত ছিল। কেননা হযরত ইয়াহইয়া (আ)-কে যখন এই প্রশ্ন করা হইল, তখন তিনি এই কথা বলেন নাই যে, তোমরা কোন নবীর কথা জিজ্ঞাসা করিতেছ, আর তো কোন নবীর আগমন হইবার নহে।
বস্তুত উক্ত বাণীতে তৃতীয় আর একজন নবী আগমনের সুসংবাদটি এতই পরিষ্কার যে, খৃস্টানরা অযৌক্তিকভাবে অস্বীকার করা ব্যতীত ইতিহাসের এই প্রশ্নের জবাব দিতে অপারগ থাকিয়াই গিয়াছে যে, হযরত মুহাম্মাদ (স) যদি সেই নবী না হন তবে কে সেই নবী? কারণ ঈসা (আ)-এর পরে আর কোন নবী আসিয়াছেন বলিয়া তাহারা দাবি করে না। আর ইয়াহুদীরা যেমনিভাবে হযরত মসীহ (আ)-এর আত্মপ্রকাশের অপেক্ষায় ছিল কিন্তু তাঁহার আগমনের পর বিদ্বেষের বশবর্তী হইয়া তাঁহাকে প্রত্যাখ্যান করিল, অনুরূপভাবে ইয়াহুদী খৃস্টান উভয়ে সেই নবী-এর আত্মপ্রকাশের জন্য চরমভাবে অপেক্ষা করিতেছিল। কিন্তু তাহা সত্ত্বেও সেই নবীর আগমনের পর গোষ্ঠীগত ও জাতিগত বিদ্বেষের কারণে তাহারা তাঁহাকে অস্বীকার করিয়া বসিল। এই বিষয়টি আল কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতেও বর্ণিত হইয়াছে
الَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ يَعْرِفُونَهُ كَمَا يَعْرِفُونَ أَبْنَاءَهُمْ وَإِنَّ فَرِيقًا مِنْهُمْ لَيَكْتُمُونَ الْحَقِّ وَهُمْ يَعْلَمُونَ.
"আমি যাহাদিগকে কিতাব দিয়াছি, তাহারা তাহাকে সেইরূপ জানে যেইরূপ তাহারা নিজেদের সন্তানগণকে চিনে এবং তাহাদের এক দল জানিয়া শুনিয়া সত্য গোপন করিয়া থাকে” (২: ১৪৬)।
পঞ্চমত, যোহন সুসমাচারে একজন নবীর আগমনের কথা বারবার ভবিষ্যদ্বাণীরূপে ঘোষিত হইয়াছে। তাহাতে ভবিষ্যতে আগমনকারী নবীর যেই সকল গুণ উল্লেখ করা হয়, তাহা হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর গুণাবলীর সাথে অনেকটা মিলিয়া যায়। যোহন সুসমাচারে আসা ভবিষ্যদ্বাণী নিম্নরূপঃ
(১) "তোমাদের নিকট থাকিতে থাকিতেই আমি তোমাদের নিকট এই কথা কহিলাম। কিন্তু সেই সহায় পবিত্র আত্মা, যাহাকে পিতা আমার নামে পাঠাইয়া দিবেন, তিনি সকল বিষয় তোমাদিগকে শিক্ষা দিবেন এবং আমি তোমাদিগকে যাহা যাহা বলিয়াছি, সে সকল স্মরণ করাইয়া দিবেন" (১৪: ২৫-২৭)।
(২) "তথাপি আমি তোমাদেরকে সত্য বলিতেছি, আমার যাওয়া তোমাদের পক্ষে ভাল, কারণ আমি না গেলে, সেই সহায় (ফোরকালীত) তোমাদের নিকট আসিবে না, কিন্তু আমি যদি যাই তবে তোমাদের নিকট তাহাকে পাঠাইয়া দিব" (১৬ঃ ৭; আরও দ্র. ১৬ঃ ১২-১৫)।
ইহা হইতে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, উক্ত প্রতিশ্রুত নবীই ছিলেন হযরত মুহাম্মাদ (স)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00