📄 হযরত ঈসা (আ)-এর নামকরণ ও উপাধি
আল-কুরআনের ভাষ্য দ্বারা বুঝা যায় যে, ঈসা মাসীহ বা মসীহ ঈসা নামকরণটি আল্লাহ্র পক্ষ হইতেই স্থিরীকৃত হইয়াছে এবং তাহা ঈসা (আ)-এর জন্মের পূর্বেই। ফেরেশতা আসিয়া যখন মারয়াম (আ)-এর কাছে ঈসা (আ)-এর জন্ম সম্পর্কে শুভ সংবাদ দিতেছিলেন তখন ফেরেশতা বলিয়াছিলেন যে, তাঁহার নাম হইবে মাসীহ ঈসা ইবন মারয়াম (দ্র. ৩ঃ৪৫)।
অবশ্য মথি সুসমাচারে আসিয়াছে যে, মারয়াম অলৌকিকভাবে গর্ভধারণের পর তাঁহার সাথী ইউসুফের নিকট স্বপ্নে ফেরেশতা দেখা দিয়া তাহাকে আদেশ করেন, "তুমি তাহার নাম যীশু রাখিবে" (মথি সুসমাচার, ১: ২১)। পরবর্তীতে ইউসুফ তাঁহার নাম যীশুই রাখিলেন (প্রাগুক্ত, ১৪ ২৫)। অপরদিকে লুক সুসমাচারে বলা হইয়াছে যে, জিবরাঈল ফেরেস্তা মারয়াম (আ)-কে আদেশ করিলেন যে, তাহার গর্ভের পুত্রের নাম যীশু রাখিবে (লুক সুসমাচার, ২৬: ৩২)।
তাঁহার প্রসিদ্ধ নাম ঈসা। মাসীহ তাঁহার উপাধি, ইব্ন মারয়াম তাঁহার ডাকনাম। কুনিয়াতগুলির মধ্যে কোথাও তাঁহাকে মাসীহ, কোথাও তাঁহাকে মাসীহ ইব্ন মারয়াম, কোথাও মাসীহ ঈসা ইবন মারয়াম, কোথাও শুধু ইব্ন মারয়াম। ইতিপূর্বে ইহার একটি তালিকা দেওয়া হইয়াছে।
ঈসা শব্দটি আরবী। হিব্রুতে যিহোশূয় (Jehoshuah) অথবা যশূয়া (Joshua) আরবীতে উচ্চারণে ইহা ইয়াশু বা ইয়াশূ। ইহার অর্থ ত্রাণকর্তা, সায়্যিদ বা সরদার, নেতা ইত্যাদি। Encyclopedia Americana-এর বর্ণনামতে ঈসা (আ)-এর সমসাময়িক কালে প্রায় ১৯ জন ব্যক্তির নাম ছিল ঈসা (vol.16, page 41)। গ্রীক ভাষায় বলা হয় জেসাস (Jesus,) যাহাকে ইংরেজী ও বাংলা সংস্করণে যীশু বলা হয়। মাসীহ শব্দটি হিব্রু মাশীয়াখ (Mashyach) বা মাসীয়াহ (Mesiah)-এর আরবী রূপ।
গ্রীক ভাষায় তাঁহাকে বলা হয় খৃস্ট (Christ)। মাসীহ শব্দটি উৎপত্তিমূলে আরবী বা হিব্রু ইহা লইয়া প্রচুর মতভেদ আছে। আল্লামা কুরতুবীর মতে, ইহা মূলত অনারব শব্দ যাহা আরবীতে প্রচলিত। ইন ফারিস-এর মতে মাসীহ সিদ্দীক বা মসৃণ মুদ্রা (কুরতুবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, page ৮৮)। আরবীতে মাসাহা শব্দটির অর্থ লেপন করা, স্পর্শ করা, পরিভ্রমণ করা ইত্যাদি। কিন্তু ঈসা (আ)-এর কেন মাসীহ নামকরণ করা হইল এই সম্পর্কেও বিভিন্ন বিশ্লেষণ পাওয়া যায়, এমনকি ইব্ন আব্বাস (রা) থেকেই একাধিক মত বর্ণিত আছে। নিম্নে কয়েকটি মতামত পেশ করা গেল:
১১. যেহেতু ঈসা (আ) কোন 'রোগাক্রান্ত ব্যক্তিকে স্পর্শ করিলেই সেই ব্যক্তি রোগমুক্ত হইত সেইজন্য ঈসা (আ)-কে মাসীহ বলা হয়।
২. কাহারও মতে তিনি পরিভ্রমণ করিয়া বেড়াইতেন। আর এই পরিভ্রমণ হইতেই তাঁহার নামকরণ হয় মাসীহ (দ্র. ফীরোযাবাদী, তানবীরুল মিয়াস মিন তাফসীরি ইব্ন আব্বাস, page ৬১)।
৩. কাহারও মতে ঈসা (আ)-এর পায়ের পাতা সমান ছিল, তাই তাঁহাকে মাসীহ বলা হইত। 'আতা (র)-এর সূত্রে ইহা ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত (ইবনুল জাওযী, প্রাগুক্ত, ১খ., page ৩২৯)।
৪. কাহারও মতে তাঁহার শরীরে বরকতময় তৈল দ্বারা লেপন করা ছিল, যাহা ছিল খুবই সুগন্ধিযুক্ত।
৫. কাহারও মতে জিবরাঈল (আ) তাঁহাকে স্বীয় পাখা দ্বারা স্পর্শ করার কারণে তাঁহার উপাধি হয় মাসীহ (আবু হায়্যান, আল-বাহরুল মুহীত, ৩খ, page ১৫২)।
৬. ইব্ন আব্বাস (রা), ইব্ন জুবায়র প্রমুখের মতে মাসীহ অর্থ রাজা (ফীরোযাবাদী, প্রাগুক্ত, আবু হায়্যান, প্রাগুক্ত, page ১৫৩)।
ইব্ন আব্বাস উল্লেখ করেন, বর্ণিত আছে যে, বনী ইসরাঈলের রাজা শৌলের সময় হইতে রাজাকে মাসীহুর রব (সদাপ্রভু অভিষিক্ত) বলা হইত। যেমন ওল্ড টেস্টামেন্টে (২ শমূয়েল, ১: ১৪) আসিয়াছে, হযরত দাউদ (আ) শৌল রাজাকে মাসীহর রব বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন (ইব্ন আশূর, তাফসীরুত্ তাহরীর ওয়াত্-তানবীর, ৩খ, page ২৪৬)। আর এই রাজাদেরকে শুই উপাধি প্রদানের ধারা বনু ইসরাঈল সমাজে চালু ছিল। ঞ্জতাহারা বিশ্বাস করিত যে, আল্লাহর পক্ষ হইতে এমন একজ "মাসীহ আগমন করিবেন, যিনি তাহাদেরকে সকল অত্যাচার-অনাচার, পাপ-পঙ্কিলতা হইতে মুক্ত করিবেন। আর সেই দিক দিয়া হযরত ঈসাকে মাসীহ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
তাঁহাকে যখন তাঁহার বিরোধীরা গ্রেফতার করিয়া হত্যার চেষ্টা করিয়াছিল, তখন তাহারা তাঁহাকে 'ইয়াহুদীদের রাজা' বলিয়া ঠাট্টা-বিদ্রূপ করিতেছিল (মথি, ২৭ : ৩০; মার্ক, ১৫: ৩২; লুক ২৩: ৩৮; যোহন ১৯ : ৩)। পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে যে, বনু ইসরাঈলের কাঙ্খিত ত্রাণকর্তা রাজাকে মাসীহ বলিয়া অভিহিত করা হইত।
📄 ঈসা (আ)-এর দাওয়াতী এলাকা
উক্ত তালিকা হইতে বুঝা যায়, হযরত ঈসা (আ) তাঁহার স্বল্প সময়ের দাওয়াতী কার্যক্রম ইয়াহুদী অধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকা পরিভ্রমণ করিয়াছেন। তৎকালীন সময়ে তাহাদের তিনটি প্রদেশ ছিল যাহা হেরোদের তিন পুত্রের মধ্যে বিভক্ত ছিল। আরকে লাউসের ইয়াহুদীরা এনটি পাসের গালীল, দিকাপলি এবং ফিলিপের কৈসরিয়া ফিলিপের বিভিন্ন গ্রামে-গঞ্জে তিনি ভ্রমণ করিয়াছেন এবং ইয়াহুদী আলেমসহ সাধারণ মানুষকে দাওয়াত দিয়াছেন। সাথে সাথে সমাজকল্যাণে রোগ-ব্যাধি নিরাময়ে অলৌকিক কর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে গোটা ইয়াহুদী অঞ্চলে এক অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি করিয়াছিলেন। যেখানেই যাইতেন হাজার হাজার মানুষ তাঁহার পেছনে ছুটিয়া যাইত। মথি ও মার্ক সুসমাচার হইতে জানা যায় যে, তিনি প্রথমে গালীল প্রদেশে প্রচার কাজ চালাইয়া যান, অতঃপর ফিলিপের কৈসরীয়ার কিছু অংশ তথা গালীল সাগরের অপর তীরের অঞ্চলসমূহে দাওয়াতী কাজ করেন, অতঃপর ইয়াহুদীয়া প্রদেশে আগমন করেন এবং যিরীহো ও জেরুসালেমে দাওয়াতী কাজ সমাপ্ত করেন। জেরুসালেম আসার পর আর ফিরিয়া যান নাই।
এখানেই ইয়াহুদী ধর্মীয় নেতারা তাঁহার বিরুদ্ধে হত্যার ষড়যন্ত্র করে এবং তিনি বিভিন্ন পাহাড়-পর্বতে আত্মগোপন করিয়া আর মাঝে মধ্যে বায়তুল মুকাদ্দাসে আসিয়া দাওয়াতী কাজ করেন। লুক সুসমাচারে বর্ণিত তথ্যে দেখা যায়, নবুওয়াতের প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি জর্ডান নদীর তীর হইতে জেরুসালেম পর্যন্ত সফর করিয়াছিলেন, অতঃপর গালীল প্রদেশে চলিয়া গিয়াছিলেন। জেরুসালেমে শয়তানের বিভিন্ন প্ররোচনা প্রত্যাখ্যান করার ঘটনার কথা উল্লেখ করা হইলেও দাওয়াতী কাজের ব্যাপারে তেমন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ নাই। তাই সেই সুসমাচারেও দাওয়াতী কার্যক্রমের তৎপরতা গালীল প্রদেশ হইতে শুরু করার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হইয়াছে। আর শেষ সময়ে জেরুসালেম আগমনের কথা বলা হইয়াছে।
অপর দিকে বার্নাবাসের বাইবেল হইতে জানা যায়, তাঁহার দাওয়াতী কাজের মূল কেন্দ্রভূমি ছিল জেরুসালেম। এখান হইতেই তিনি দাওয়াতী কাজের সূচনা করিয়াছিলেন এবং বারবার এখানে ফিরিয়া আসিতেন। বায়তুল মুকাদ্দাসের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে অবস্থিত যয়তুন পাহাড়ে তিনি রাত্রে ইবাদতে মশগুল থাকিতেন এবং জেরুসালেম হইতে জর্ডান সীমান্তবর্তী মরু অঞ্চল পর্যন্ত দাওয়াতী কাজ করেন। অতঃপর গালীল প্রদেশের কান্না গ্রাম, নাসরত, কাফুরনাহুম, নায়ানে দাওয়াতী কাজ করেন অতঃপর সঙ্গীগণসহ তিনি আবার জেরুসালেম ও জর্ডানের মরু অঞ্চলে আসিয়াছিলেন এমনকি তিনি সিনাই পর্বত পর্যন্ত ভ্রমণ করিয়াছিলেন। অতঃপর জেরুসালেমে নায়িন, কাফুর নাহুম অঞ্চলে ফিরিয়া গিয়াছিলেন এবং আবার জেরুসালেমে আসিয়া সেইখানে দাওয়াতী কাজ করিয়া কৈসরীয়া ফিলিপী গালীলের নাসরত, সুমিরীয় পাহাড়ী অঞ্চল, এমনকি সিনাই পর্বত ও জর্ডান নদীর তীরবর্তী অঞ্চলসহ মরু অঞ্চলে গমন করিতেও কুণ্ঠাবোধ করেন নাই। বার্নাবাসের বাইবেল থেকে আরও জানা যায় যে, হযরত ঈসা (আ) সিরিয়ার দামেস্ক পর্যন্ত গিয়াছিলেন এবং ইয়াহুদী বসতিগুলিতে দাওয়াতী কাজ করিয়াছিলেন। তবে যেখানেই যান বারবারই তিনি জেরুসালেমে ফিরিয়া আসিয়াছেন।
বার্নাবাসের বাইবেলে হযরত ঈসার আটবার জেরুসালেমে প্রত্যাবর্তনের কথা উল্লেখ রহিয়াছে। আসলে এই তথ্যটিই অধিক গ্রহণযোগ্য বলিয়া মনে হয়। কারণ জেরুসালেম ছিল সেই পবিত্র ভূমি যেখানে রহিয়াছে প্রধান ইবাদতখানা বায়তুল মুকাদ্দাস এবং বনী ইসরাঈলে আসা নবীগণের পদচারণকৃত অঞ্চল। তেমনি সেইখানে রহিয়াছে ইয়াহুদীদের বড় বড় ধর্মীয় নেতাদের আবাসস্থল ও সাধারণ জনগণের তীর্থ যাত্রার কেন্দ্রভূমি। তাই ঈসা (আ) জেরুসালেম আগমনকে প্রাধান্য দিয়াছেন, যদিও তিনটি অঞ্চলের বিভিন্ন গ্রামে-গঞ্জে যাওয়াকে তিনি উপেক্ষা করেন নাই। দাওয়াতের স্বার্থে তিনি নির্দিষ্ট কোন ঠিকানা গ্রহণ করেন নাই। দাওয়াতী সফরই ছিল তাঁহার তৎপরতার মৌলিক অংশ। ইয়াহুদী আহবার ও রিব্বিদের চরম বিরোধিতা ও নিজের জীবনের ঝুঁকিকে উপেক্ষা করিয়া দাওয়াতী কাজকে বেগবান করিবার জন্য বিভিন্ন অঞ্চলে ছুটিয়া বেড়াইয়াছেন।
প্রচারের কাজকে আরও দ্রুত, বেগবান ও প্রসারিত করিবার জন্য নিজে যেমনি বিভিন্ন এলাকায় গমন করিয়াছেন তেমনিভাবে তাঁহার প্রধান বারজন সাথীসহ আরও অন্যান্য অনুসারীদের বিভিন্ন অঞ্চলে দাওয়াতের দায়িত্ব দিয়া প্রেরণ করিয়াছিলেন। বার্নাবাসের সুসমাচারে বর্ণিত হইয়াছে যে, লোকজন এতই আকৃষ্ট হইয়া পড়িয়াছিল যে, তাহারা হযরত ঈসা (আ)-কে প্রায়ই নিজেদের রাজা হিসাবে ঘোষণা দেওয়ার চেষ্টা করিত। কিন্তু ঈসা (আ) নিজেই তাহাদিগকে নিবৃত্ত করিতেন (বার্নাবাসের বাইবেল, page ১৭০, ১৭১)।
📄 হযরত ঈসা (আ)-এর জন্মকাল হইতে নবুওয়াত পূর্ব জীবন
জন্মকাল হইতে নবুওয়াত লাভ পর্যন্ত হযরত ঈসা (আ) কোথায় কিভাবে জীবন অতিবাহিত করেন সেই সম্পর্কে কুরআন ও হাদীছে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় না। এই বিষয়ে কুরআনে শুধু জন্মের পর তাঁহার তত্ত্বাবধান ও তাঁহার মায়ের পবিত্রতার ঘোষণাসহ নিজের পরিচয় প্রদান সম্পর্কে আলোকপাত করা হইয়াছে, ধারাবাহিক ঘটনাপঞ্জির বিস্তারিত উল্লেখ নাই। তবে আল-কুরআনে উক্ত বর্ণনাসহ বাইবেলে কিছু কিছু তথ্য, কিছু ইসরাঈলী রিওয়ায়াত এবং অধুনা প্রাপ্ত কিছু প্রাচীন দলীল-দস্তাবেয-এর ভিত্তিতে ঈসা (আ)-এর জন্মকাল হইতে নবুওয়াত পর্যন্ত অবস্থাদির এক সংক্ষিপ্ত আলেখ্য এখানে পেশ করা হইল।
আল্লাহর কুদরতে শুষ্ক খর্জুর বৃক্ষ হইতে তাহাদের জন্য অসময়ে খেজুর সরবরাহসহ সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা হইয়াছিল। অপরদিকে শিশু ঈসাকে দেখিয়া তিনি চক্ষু জুড়াইতেন। এই মর্মে আল-কুরআনে উল্লিখিত হইয়াছে: فَنَادُهَا مِنْ تَحْتِهَا أَلَا تَحْزَنِي قَدْ جَعَلَ رَبُّكَ تَحْتَكِ سَرِيًّا . وَهُزَى إِلَيْكِ بِجِذْعِ النَّخْلَةِ تُسَقِطَ عَلَيْكِ رُطَبًا جَنِيًّا . فَكُلِي وَاشْرَبِي وَقَرَى عَيْنًا "ফেরেশতা তাহার নিম্ন পার্শ্ব হইতে আহ্বান করিয়া তাহাকে বলিল, তুমি দুঃখ করিও না, তোমার পাদদেশে তোমার প্রতিপালক এক ঝর্ণাধারা সৃষ্টি করিয়াছেন। তুমি তোমার দিকে খর্জুর বৃক্ষের কাণ্ড নাড়া দাও। উহা তোমাকে সুপক্ক তাজা খর্জুর দান করিবে। সুতরাং আহার কর, পান কর ও চক্ষু জুড়াও” (১৯: ২৪-২৬)।
বার্নাবাসের বাইবেলে উল্লিখিত হইয়াছে যে, ফেরেশতাদের নিকট হইতে অবগত হইয়া বেথেলহামের নিকটস্থ মাঠের রাখালেরা আসিয়া মারয়ামকে বিবিধ উপঢৌকন দিয়া নবজাতকের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করিয়াছিল (বার্নাবাসের বাইবেল)। কোন কোন বর্ণনায় দেখা যায় যে, হযরত মারয়াম পূর্ব হইতেই বেথেলহাম শহরতলীতে ছাউনিতে আশ্রয় লইয়াছিলেন (প্রাগুক্ত)। মথি সুসমাচারের বর্ণনামতে পারস্য দেশীয় একদল পণ্ডিতও ঈসা (আ)-কে কিছু উপহার দিয়াছিলেন (মথি সুসমাচার, ২: ১২)। এই সমস্ত বর্ণনা হইতে প্রতীয়মান হয় যে, থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্তসহ অন্যান্য ব্যবহার্য দ্রব্যাদিরও বিভিন্ন পন্থায় ব্যবস্থা করা হইয়াছিল। জন্মোত্তরকালে শিশু ঈসার অলৌকিকভাবে মাতার পবিত্রতা ঘোষণায় তাঁহাকে সান্ত্বনা দান প্রভৃতি বিস্তারিত তথ্যের জন্য দ্র. মারয়াম নিবন্ধ।
আল্লামা নাসাফী বর্ণনা করেন যে, ঈসা (আ) তাঁহার জন্ম দিনেই কিংবা চল্লিশ দিন বয়সে কথা বলিয়াছিলেন (তাফসীরে নাসাফী, ২খ., page ৩৮)। দাহহাকের বর্ণনামতে তিনি ছেচল্লিশ দিন বয়সে কথা বলিয়াছিলেন (তাফসীরে মাওয়ারদী, ৩খ., page ৩৭০)। বর্ণিত আছে যে, তিনি তখন স্তন্য পান করিতেছিলেন। তাহাদের কথা শুনিয়া তিনি মাতৃস্তন ছাড়িয়া তাহাদের দিকে মুখ ফিরাইয়া এবং বাম দিকে ভর করিয়া বৃদ্ধাঙ্গুলী দ্বারা ইশারা করিতে করিতে তাঁহার বক্তব্য প্রদান করিয়াছিলেন। কাহারও মতে হযরত যাকারিয়া (আ) তাঁহার কাছে আসিয়া কথা বলিয়াছিলেন (আলুসী, প্রাগুক্ত ১৬খ, page ৮৯)। যাহাই হউক, কাহার মাধ্যমে কখন কথা বলিয়াছিলেন আল-কুরাআনে তাহা উল্লেখ নাই, তবে দোলনায় থাকা অবস্থায় তিনি কথা বলিয়াছিলেন তাহা বলা হইয়াছে।
হযরত ঈসা (আ)-এর ইহা এক মু'জিযা। কিন্তু পরম আশ্চর্যের বিষয় হইল, খৃস্টান সম্প্রদায় ঈসা (আ)-এর দোলনায় থাকা অবস্থায় কথা বলিবার বিষয়টিকে বরাবরই অস্বীকার করিয়া আসিতেছে। আল্লামা আলুসী উল্লেখ করেন যে, নাসারাগণ ধারণা করে ঈসা (আ) শিশু থাকা অবস্থায় কথা বলেন নাই, শৈশবে তাঁহার মাতার পবিত্রতার কথা বলেন নাই এবং এইভাবেই ত্রিশ বৎসর কাটিয়া যায় (আলুসী, প্রাগুক্ত, ৩খ, page ৬৩)। নাসারাগণ যুক্তি প্রদর্শন করিয়া থাকে যে, দোলনায় থাকা অবস্থায় ঈসা (আ)-এর কথা বলিবার বিষয়টি অত্যাশ্চর্যজনক বিষয়। এই ধরনের যদি কিছু ঘটিত, লোকজন অবশ্যই তাহা বর্ণনা করিত। আর এই ধরনের বর্ণনা থাকিলে নাসারাগণেরই সকলের আগে জানার কথা।
তাহাদের এই যুক্তি খণ্ডনে বলা হয়, বর্ণিত আছে যে, ঈসা (আ) সেইবার কথা বলিয়াই চুপ হইয়া যান। স্বাভাবিক শিশুরা যখন কথা বলিতে শিখে তখনই ঈসা (আ) পরবর্তীতে কথা বলিতে শুরু করিয়াছিলেন। ইহা ইব্ন আব্বাস (রা) হইতেও বর্ণিত (প্রাগুক্ত)। সুতরাং ঈসা (আ) যখন কথা বলিয়াছিলেন তখন শ্রোতাদের সংখ্যা হয়তো এমন পর্যায়ে ছিল না যাহাকে মুতাওয়াতির বলা যায়, যাহাকে কেহ মিথ্যা বলিয়া ধারণাও করিতে পারে না।
ঈসা (আ)-এর কথা বলার ঘটনাটি ছিল তাৎক্ষণিক। এমনও হইতে পারে যে, সেইখানকার শ্রোতাগণ তাহা বর্ণনা করিয়াছিলেন, কিন্তু লোকজন তাহাদিগকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করিতে শুরু করিয়াছিল। অতঃপর বর্ণনাকারিগণ নিরব হইয়া যান। আর এইভাবে বিষয়টি চাপা পড়িয়া যায়। তাহা ছাড়া যদি ধরিয়াও লওয়া হয় যে, ঈসা (আ) দোলনায় থাকা অবস্থায় অনেক বার কথা বলিয়াছেন বা অনবরত কথা বলিতেইছিলেন কিন্তু লোকজন এই বিষয়টি বর্ণনার প্রতি তেমন গুরুত্বই দেন নাই। কারণ ইহার চাইতে আরও গুরুত্বপূর্ণ আলৌকিক ঘটনা ঈসা (আ)-এর মাধ্যমে ঘটিয়াছিল। যেমন মৃতকে জীবিত করা, জন্মান্ধ ও কুষ্ঠরোগীকে নিরাময় করা, গায়েবী খবর দেওয়া, মাটি দ্বারা পাখি তৈরি করা ইত্যাদি। এইগুলিই লোকমুখে বেশী বেশী আলোচিত হইয়া আসিতেছিল (প্রাগুক্ত)। অবশ্য মারয়াম (আ)-এর পবিত্রতা প্রমাণের দিক হইতে উক্ত বিষয়টি শুধু প্রাসংগিকই নহে, বরং খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ইহা ছাড়া শুধু হযরত ঈসা (আ) যে দোলনায় থাকা অবস্থায় কথা বলিয়াছেন তাহা নহে, বরং বর্ণিত আছে যে, তিনি ব্যতীত আরও অনেকে দোলনায় শিশু অবস্থায় কথা বলিয়াছেন। হযরত আবু হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত আছে, মহানবী (সা) বলিয়াছেনঃ তিনজন দোলনায় থাকা অবস্থায় কথা বলেন, তাহারা হইলেন ঈসা ইবন মারয়াম, জুরায়জের পবিত্রতার সাক্ষী শিশু ও জাব্বার প্রসঙ্গে দুগ্ধপোষ্য শিশু (সহীহ মুসলিম, ২খ, page ২৭৬)। অন্যান্য বর্ণনায় রহিয়াছে, ঈসা (আ), ইউসুফ (আ)-এর পক্ষে সাক্ষ্যদাতা নবজাতক ও সাহেবে জুরায়াজ।
আসহাবুল উখদূদের ঘটনায় আসিয়াছে, এক ঈমানদার মহিলাকে ঈমান আনার অপরাধে আগুনে নিক্ষেপের সময় তাহার সাথে নবজাতক এক শিশু ছিল। সেই দুগ্ধপোষ্য শিশুকে ফেলিয়া আগুনে ঝাঁপ দিবে কিনা এই ব্যাপারে এ মহিলা ইতস্তত করিতেছিল। আর তখন হঠাৎ করিয়া শিশুটি বলিয়া উঠিল, ওহে মাতা! আপনি ধৈর্য ধরুন, আপনি সত্যের উপরই আছেন (কুরতুবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, page ৯১)।
দাহহাক হইতে বর্ণিত আছে যে, ছয়জন নবজাতক দোলনায় থাকা অবস্থায় কথা বলিয়াছেন। তাহারা হইলেন, ইউসুফ (আ)-এর পক্ষে সাক্ষীদাতা নবজাতক, ফেরাউনের স্ত্রীর মাথা আঁচড়ানো কাজে নিয়োজিত মহিলার শিশু, ঈসা (আ), ইয়াহ্ইয়া (আ), সাহেবে জুরায়জ ও সাহেবুল জাব্বার (প্রাগুক্ত)। উপরিউক্ত বর্ণনাসমূহে দেখা যায়, যুগে যুগে অনেক নবজাতক শিশু বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে কথা বলিয়াছেন, যাহা ইতিহাসে প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছে। তাই ঈসা (আ) মায়ের পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য অবশ্যই কথা বলিয়াছিলেন, কেননা তাহার প্রয়োজন ছিল।
📄 হযরত ঈসা (আ)-এর দাওয়াতী মিশন
হযরত ঈসা (আ) বানু ইসরাঈলের হেদায়েতের জন্য প্রেরিত হইয়াছিলেন। পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে যে, বানু ইসরাঈল তাহাদের আসল শিক্ষ প্রায় ভুলিয়াই গিয়াছিল। মূসা (আ)-এর শরীআত পরিবর্তন পরিবর্ধনের মাধ্যমে তাহা হইতে তাহারা অনেক দূরে চলিয়া গিয়াছিল। ধর্মীয় পণ্ডিত হইতে শুরু করিয়া সাধারণ মানুষ সকলেই চরম গোমরাহিতে লিপ্ত হইয়া গিয়াছিল। কালক্রমে মূসা (আ)-এর শরীআত বিস্তৃত ও বিকৃত হইয়া গিয়াছিল। তাহা ছাড়া দলাদলি এবং দীন ও শরীআতের ব্যাপারে বিভিন্ন রকম মতানৈক্যের সৃষ্টি হইয়াছিল। এই পরিস্থিতিতে হযরত ঈসা (আ) তাঁহার মিশন বা পয়গামে দুইটি বিষয়কে প্রাধান্য দান করেন।
(ক) তাওরাত এবং তাহার শিক্ষাকে তাসদীক বা সত্যায়িতকরণ।
(খ) মূসা (আ)-এর শরীআতকে পূর্ণাঙ্গতায় পৌঁছাইয়া দেওয়া এবং ইয়াহুদীদের মধ্যে মতানৈক্যের অবসান ঘটানো (জামীল আহমদ, প্রাগুক্ত, page ৩৫২-৩৫৩)।
কুরআন কারীমেও হযরত ঈসা (আ)-এর সেই মৌলিক পয়গামের কথা স্পষ্টভাবে উদ্ধৃত হইয়াছে। তিনি বলিতেন:
وَمُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَى مِنَ التَّوْرَةِ وَلَأُحِلَّ لَكُمْ بَعْضَ الَّذِي حُرِّمَ عَلَيْكُمْ وَجِئْتُكُمْ بِآيَةٍ مِّنْ رَّبِّكُمْ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ إِنَّ اللَّهَ رَبِّي وَرَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ هَذَا صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمُ
"আমি আসিয়াছি আমার সম্মুখে তাওরাতের যাহা রহিয়াছে উহার সমর্থকরূপে ও তোমাদের জন্য যাহা নিষিদ্ধ ছিল উহার কতক গুলিকে বৈধ করিতে এবং আমি তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হইতে তোমাদের নিকট নিদর্শন লইয়া আসিয়াছি। সুতরাং আল্লাহকে ভয় কর আর আমাকে অনুসরণ কর। আল্লাহ আমার প্রতিপালক এবং তোমাদের প্রতিপালক, সুতরাং তোমরা তাহার ইবাদত করিবে। তাহাই সরল পথ।" আল-কুরআনের অন্য স্থানে আরও উল্লেখ করা হয় যে,
وَلَمَّا جَاءَ عِيسَى بِالْبَيِّنَتِ قَالَ قَدْ جِئْتُكُمْ بِالحِكْمَةِ وَلِأُبَيِّنَ لَكُمْ بَعْضَ الَّذِي تَخْتَلِفُونَ فِيهِ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ إِنَّ اللَّهَ هُوَ رَبِّي وَرَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ هَذَا صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمُ.
"ঈসা যখন স্পষ্ট নিদর্শনসহ আসিল সে বলিয়াছিল, আমি তো তোমাদিগের নিকট আসিয়াছি হেকমত তথা প্রজ্ঞাসহ এবং তোমরা যে বিষয়ে মতভেদ করিতেছ তাহা স্পষ্ট করিয়া দিবার জন্য। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার অনুসরণ কর। আল্লাহই তো আমার প্রতিপালক এবং তোমাদিগেরও প্রতিপালক। অতএব তোমরা তাঁহার ইবাদত কর; ইহাই সরল পথ" (৪৩: ৬৩-৬৪)।
প্রচলিত সুসমাচারসমূহেও হযরত ঈসা (আ)-এর পয়গামের উপরিউক্ত দুইটি দিক দিয়া বিষয়টি খুব জোরালোভাবেই উল্লেখ করা হইয়াছে।
মথি সুসমাচারে হযরত ঈসার বাণীরূপে নিম্নোক্ত কথাটি উল্লেখ আছে। তিনি বলিয়াছেন, "মনে করিও না যে, আমি ব্যবস্থা কি ভাববাদি গ্রন্থ লোপ করিতে আসিয়াছি; আমি লোপ করিতে আসি নাই, কিন্তু পূর্ণ করিতে আসিয়াছি। কেননা আমি তোমাদিগকে সত্য কহিতেছি, যে পর্যন্ত আকাশ ও পৃথিবী লুপ্ত না হইবে, সে পর্যন্ত ব্যবস্থার এক মাত্রা কি এক বিন্দুও লুপ্ত হইবে না। সমস্তই সফল হইবে" (মথি, ৫: ১৭-১৮)।
মথি সুসমাচারের অন্যত্র আরও বলা হইয়াছে, তিনি তাহাকে বলিয়াছিলেন: “তোমার সমস্ত অন্তঃকরণ, তোমার সমস্ত প্রাণ ও তোমার সমস্ত মন দিয়া তোমার ঈশ্বর প্রভুকে প্রেম করিবে। এইটি মহৎ ও প্রথম আজ্ঞা। আর দ্বিতীয়টি ইহার তুল্য; তোমার প্রতিবেশীকে আপনার মত প্রেম করিবে। এই দুইটি আজ্ঞাতেই সমস্ত ব্যবস্থা এবং ভাববাদি গ্রন্থও ঝুলিতেছে" (মথি, ২২: ৩৭-৪০)।
মথি সুসমাচারের অন্য জায়গায় আরও বলা হয়, "অধ্যাপক ও ফরীশীরা মোশির আসনে বসে। অতএব তাহারা তোমাদিগকে যাহা কিছু বলে তাহা পালন করিও, মানিও, কিন্তু তাহাদের কর্মের মত কর্ম করিও না; কেননা, তাহারা বলে, কিন্তু করে না" (মথি, ২৩: ২-৩)।
ইহা ছাড়াও হযরত ঈসা (আ) ঘোষণা দিতেন যে, তাঁহার পয়গাম ইসরাঈল জাতির জন্যই সীমাবদ্ধ। আর পরবর্তী পয়গাম্বর হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর আগমনের সুসংবাদ দেওয়াও তাঁহার পয়গামের লক্ষ্য ছিল।