📄 হযরত ঈসা (আ)-এর জন্ম ও বংশ পরিচয়
পূর্বেই আলোচনা করা হইয়াছে যে, বনী ইসরাঈলের ধর্মীয় বিধিবিধানের বিকৃতি ও গোমরাহী, নৈতিক অধপতন এবং রাজনৈতিক বিপর্যয় হইতে উদ্ধারের জন্য আল্লাহ তাআলা ঈসা (আ)-কে প্রেরণ করেন। তাঁহার জন্মস্থান-কাল-পাত্র লইয়া ইয়াহুদী-খৃস্টানসহ সকল ধর্মের পণ্ডিতগণের মধ্যে প্রচুর মতভেদ বিদ্যমান।
হযরত ঈসা (আ) বনূ ইসরাঈল জাতিভুক্ত হযরত দাউদ (আ)-এর বংশধর ছিলেন। তিনি পিতা ছাড়াই আল্লাহ্র কুদরতে জন্মগ্রহণ করেন। এই সম্পর্কে বাইবেলেও স্বীকৃতি রহিয়াছে (দ্র. মথি, ১: ১৮-২২, লুক, ১: ৩৪)। তাই স্বভাবতই তাঁহার মায়ের সাথে সম্পর্কিত করিয়া তাঁহার বংশ নিরূপিত হয়। সুতরাং মুসলিম ঐতিহাসিকগণ হযরত মারয়াম (আ)-এর বংশের পরম্পরায় হযরত ঈসা-এর বংশ নিরূপণ করিয়াছেন (দ্র. মারয়াম নিবন্ধ)। হযরত ঈসা (আ)-এর মাতা হযরত মারয়াম (আ) ছিলেন উচ্চ বংশীয়া মহিলা, ইবাদত ও পরহেযগারীতে অনুপম আদর্শ নারী। কুরআন কারীমের বর্ণনা অনুযারী হযরত মারয়ামের পিতা ও হযরত ঈসা (আ)-এর নানা ছিলেন ইমরান (আ)। তিনি ছিলেন বায়তুল মুকাদ্দাস মসজিদের ইমাম ও ধর্মীয় প্রধান। তাঁহার স্ত্রী ছিলেন আল্লাহ প্রেমিক আবেদা ও পরহেযগার মহিলা। আল-কুরআনেও ইমরান পরিবারের ভুয়সী প্রশংসা করা হইয়াছে। যেমন আল্লাহ্ বাণী:
إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَى آدَمَ وَنُوحًا وَآلَ إِبْرَاهِيمَ وَآلَ عِمْرَانَ عَلَى العُلَمِينَ .
"আদমকে, নূহকে ও ইবরাহীমের বংশধর এবং ইমরানের বংশধরকে আল্লাহ বিশ্বজগতে মনোনীত করিয়াছেন” (৩: ৩৩)।
এই পরিবারেই আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন হিসাবে অলৌকিকভাবে জন্মগ্রহণ করেন হযরত ঈসা (আ)। কিন্তু পরম আশ্চর্যের বিষয় হইল, 'ঈসা (আ)-এর নানা ইমরান সম্পর্কে যেহেতু বাইবেলে কিছুই উল্লেখ নাই, সেইহেতু বাইবেলে (নূতন নিয়ম) হযরত ঈসা (আ)-এর আসল বংশতালিকা অর্থাৎ মাতার দিক একেবারেই উপেক্ষা করা হইয়াছে। বরং আরো আশ্চর্যের বিষয় হইল, কোন কোন বাইবেলে (মথি ও লুক) ঈসা (আ)-এর বংশলতিকা পেশ করা হয় ইউসুফ নামে জনৈক ব্যক্তিকে সম্পর্কিত করিয়া অর্থাৎ ঈসা ইবনে ইউসুফ। অথচ সেই বাইবেলগুলিতেই উল্লেখ করা হইয়াছে যে, ইউসুফের সঙ্গে বাস করিবার পূর্বেই পাক রূহের শক্তিতে মারয়ামের গর্ভ সঞ্চার হইয়াছিল। মারয়ামের স্বামী ইউসুফ সৎলোক ছিলেন (মথি সুসমাচার, ১: ১৮-১৯; লুক সুসমাচার, ২:৫)। মথি ও লুক সুসমাচারে যে বংশলতিকার উল্লেখ করা হইয়াছে তাহার মধ্যে চরম বৈপরীত্য বিদ্যমান, একটির সঙ্গে অন্যটির মিল নাই। মোটকথা পিতাবিহীন জন্ম নেওয়ায় গোটা জগতের মানুষের মধ্যে ঈসা (আ) এক ব্যতিক্রম। তাই সকল মানুষকে তাহাদের পিতার সাথে সম্পর্কযুক্ত করিয়া বংশ নির্ধারণ করা গেলেও ঈসা (আ)-কে মায়ের দাবিতেই বংশ নির্ধারণ করা যথাযথ ও বাস্তবসম্মত। আল-কুরআন তাহাই করিয়াছে।
📄 সুসমাচার চতুষ্টয়ের পরস্পর বিরোধিতার কতিপয় নমুনা
সুসমাচার চতুষ্টয়ের পরস্পর বিরোধিতার কতিপয় নমুনা
১. যীশুর জন্ম ও জন্মসূত্র সম্পর্কিত তিনটি আলাদা আলাদা বিবরণ এইগুলিতে দেখিতে পাওয়া যায়। এইগুলি হইল, মথি ১ঃ ১-২২; লুক ১ঃ ৩২-৩৩ এবং যোহন ১ঃ ১। মার্ক সুসমাচার এই বিষয়ে নির্লিপ্ত। মথি আর লুক-এর মতে যীশু একজন সাধারণ মানুষপুত্র, আবার তাহাকে ঈশ্বর পুত্রও বলা হইয়াছে। কিন্তু যোহনের মতে, যীশু "আদিতে বাক্য ছিলেন, এবং বাক্য ঈশ্বরের কাছে ছিলেন, এবং বাক্য ঈশ্বর ছিলেন" (যোহন ১ঃ ১)। আর সব কিছু তাহার থেকেই সৃষ্টি। এক কথায় যীশু ছিলেন একই সাথে ত্রিত্ববাদ মতবাদের ত্রিত্ব এবং পিতা ঈশ্বর, পুত্র ঈশ্বর ও পবিত্র আত্মা ঈশ্বর।
(২) যীশুর ব্যাপ্তিস্ম সম্পর্কে মথি ৩ঃ১৩-১৭, মার্ক ১ঃ ৯-১২, লুক ৩: ২১-২২ ও ৪:১ বাণীতে পৃথক পৃথক বিবরণ রহিয়াছে। এইসব বিবরণ মতে যীশু যোহন ব্যাপ্তাইজকের হাতে বাপ্তাইজ হন এবং ইহার পরপরই কিংবা একই দিনে তাঁহাকে ছাড়িয়া অন্যত্র চলিয়া যান। কিন্তু যোহনের সুসমাচারে এই ব্যাপ্টিস্ম বিষয়ে কোন বিবরণ নাই এবং যীশু আর যোহন ব্যাপ্টাইজকের মধ্যকার দেখা-সাক্ষাৎ দুই দিন স্থায়ী হয় বলিয়া দাবি করা হইয়াছে।
(৩) মথি ১৩: ৫৪-৫৮, মার্ক ৬: ৪ ও লুক ৪: ২৪ বাণী মতে যীশুর স্বদেশ (Native land) হইল গালীল। কিন্তু যোহন ৪: ৩, ৪৩-৪৪ বাণীতে বলিতে চাওয়া হইয়াছে যে, তাঁহার স্বদেশ হইল যিহুদিয়া এবং সেইখান হইতে তিনি গালীলে গমন করেন।
(৪) লুক ২৪: ৫০-৫১ মতে যীশু বৈথনিয়া হইতেই ঊর্ধ্বে নীত হন। কিন্তু প্রেরিত ১: ১২ মতে যীশু উর্ধ্বে নীত হন জৈতুন পর্বত হইতে। অথচ এই দুইটি পুস্তকই লুক-এর রচনা বলিয়া দাবি করা হইয়া থাকে।
(৫) লুক ২৪: ২১-২৯, ৩৬ ও ৫১ বাণী মতে যীশু যেদিন পুনরুত্থিত হন সেই দিনই কিংবা পরবর্তী রজনীতেই ঊর্ধ্বে নীত হন। কিন্তু প্রেরিত ১: ৩ বাণী সাক্ষ্য দেয়, যীশু ঊর্ধ্বে নীত হন পুনরুত্থানের চল্লিশ দিন পরে। প্রকৃতপক্ষে যীশুর মৃত্যু, কবরস্থ হওয়া, পুনরুত্থান কোনটিই ঘটে নাই।
মথি ১৫: ২১-২৮ ও মার্ক ৭: ২৪-২৭ বাণীতে দেখা যায় যে, জনৈকা কনানীয়া স্ত্রীলোক যীশুর নিকট আসিয়া তাহার ভূতগ্রস্থা কন্যার প্রতি যীশুর দয়া প্রার্থনা করে। পরে দেখা যায় যে, দয়া দেখানোর পরিবর্তে যীশু বরং উল্টা "উত্তর করিয়া কহিলেন, ইস্রায়েল কুলের হারান মেষ ছাড়া আর কাহারও নিকটে আমি প্রেরিত হই নাই।" স্ত্রীলোকটি আবারও যীশুর 'উপকার' প্রার্থনা করিলে তিনি বলেন যে, সন্তানদের খাদ্য লইয়া কুকুরদের কাছে ফেলিয়া দেওয়া ভাল নহে।” অর্থাৎ কনানীয় স্ত্রীলোকটিকে যীশু কুকুর আখ্যায়িত করিয়া প্রত্যাখ্যান করিলেন। যোহন ২: ৩-৪ বাণীতে দেখা যায় যে, পরে দ্রাক্ষারসের অকুলান হইলে যীশুর মাতা তাহাকে কহিলেন, "উহাদের দ্রাক্ষারস নাই।" যীশু তাঁহাকে কহিলেন, "হে নারী! আমার কাছে তোমার বিষয় কি? আমার সময় এখনও উপস্থিত হয় নাই।"
আবার মথি ১২: ৪৭-৪৮ বাণীতে দেখা যায় যে, তখন এক ব্যক্তি আসিয়া তাঁহাকে কহিল, "দেখুন আপনার মাতা ও ভ্রাতারা কথা কহিবার চেষ্টায় বাহিরে দাঁড়াইয়া আছেন। কিন্তু যে এই কথা বলিল, তাহাকে তিনি উত্তর করিলেন, "আমার মাতা কে? আবার ভ্রাতারাই বা কাহারা"? নিজের মাও ভাইদের প্রতি এই ধরনের উক্তি ও ব্যবহার একজন নবীর পক্ষে সম্ভব নহে। আর এই ধরনের বাণীকে আসমানী কিতাব বলা যায় না (প্রাগুক্ত)।
মোটকথা, উপরিউক্ত সুসমাচারসমূহে শুধু সনদ তথা সূত্রগত দিক দিয়া অনির্ভরযোগ্যই নহে, বরং মূল বক্তব্যের দিক দিয়াও অনেকাংশে অগ্রহণযোগ্য। মূল বক্তব্যেও অসংখ্য ভুল-ভ্রান্তি ও (বিপরীত) এবং অসংগতি রহিয়াছে বলিয়া খৃস্টান গবেষকগণও স্বীকার করিতে কুণ্ঠাবোধ করেন নাই। খৃস্টান পণ্ডিতগণ নূতন নিয়মের পাঠ সংশোধনের জন্য বিগত শতাব্দীগুলিতে আপ্রাণ চেষ্টা করিয়াছেন। তাহাদের আশা ছিল যে, এই সকল চেষ্টা-গবেষণার ফলে ইনজীলের যে কোন পাঠের উপর তাহারা সর্বকালের জন্য ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করিবেন। কিন্তু ফল হইল বিপরীত। প্রসিদ্ধ জার্মান পণ্ডিত ডঃ মিল নূতন নিয়মের কয়েকটি পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করিয়া পরস্পর পরীক্ষা করিলে ত্রিশ হাজার পার্থক্য গণনা করেন। জন জেম্স এবং বাতাসতীন বিভিন্ন ঘুরিয়া পূর্ববর্তীদের তুলনায় আরও অধিক পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করিয়া পরস্পর তুলনা করিলে দশ লক্ষ পার্থক্য দেখিতে পান। এই সকল পার্থক্যের অধিকাংশই ছিল পঠন এবং লিখন সংক্রান্ত। কিন্তু ইহাদের মধ্যে এমন কিছু উল্লেখযোগ্য পার্থক্যও ছিল যাহার ফলে সত্য ও মিথ্যা এবং আসল ও নকল পাঠ ও বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান থাকে না। Encyclopaedia Britannica-এর Bible শীর্ষক নিবন্ধকার F.C. Burkih লিখিয়াছেন যে, মিল এবং Wetstein সর্বকালের জন্য প্রমাণ করেন যে, নূতন নিয়মে যে সকল বিভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়, তাহাদের মধ্যে কোন কোনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এইগুলি প্রথম দিকেই সৃষ্টি হইয়াছিল। Marcion এবং Tatien বাইবেলের রদবদলের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। ইনজীলের রদবদল সম্পর্কে ইয়াহুদী দৃষ্টিভঙ্গি এই যে, খৃস্টানদের প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তনশীল চালচলন ও রীতিনীতি লেখকগণকে প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রভাবিত করিয়াছে (Jewish Ency., ix, 947)। নিবন্ধকার ইহার আলোচনা প্রসঙ্গে ইনজীলসমূহের পরস্পর বিরোধী বর্ণনার বহু উদাহরণ উল্লেখ করিয়াছেন। ইহাদের মধ্যে এমন কিছু পার্থক্য রহিয়াছে, যাহার নিশ্চিত কোন কারণ জানা যায় না (ইসলামী বিশ্বকোষ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ৩খ, page ৪১৪)।
বাইবেল সম্পর্কে আধুনিক মুক্ত মনের খৃস্টান গবেষকদের সাথে সুর মিলাইয়া বিশ্বখ্যাত আহমাদ দিদাতও প্রমাণ করিয়াছেন যে, বর্তমান খৃস্টানদের বাইবেলে ৫০ হাজারেরও বেশি ভুল রহিয়াছে (দ্র. আহমাদ দীদাত, ফিফটি থাউজেন্ড এ্যরারস)।
আহমাদ দিদাত তাঁহার বিখ্যাত The choice নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেন, রেড লেটার বাইবেল বলিয়া একটা বাইবেলের প্রচলন আছে। বাইবেলের যেসব বক্তব্য বা বাণী যীশুর কথিত বলিয়া উল্লেখ আছে, এই "রেড লেটার বাইবেলে” যীশুর কথিত সেই বাণী লাল কালিতে মুদ্রিত, বাকি অংশ কালো কালিতে। হিসাব করিয়া দেখা গিয়াছে, এই রেড লেটার বাইবেলের ৯০ ভাগই কালো কালিতে ছাপা (আহমাদ দিদাত, দি চয়েস, অনুবাদ আখতার-উল-আলম; আরও দ্র. The Holy Bible, Cambridge University press, Great Britain.)।
আসলে যুগে যুগে ঐ সকল সুসমাচার মুদ্রণে গীর্জা সংস্থাই দায়িত্ব পালন করিত, সর্বসাধারণের কোন ভূমিকাই ইহাতে ছিল না। অনন্তর প্রটেস্টান্টদের বিপ্লবের মুখে ঐগুলি গবেষকগণের হাত পৌছিলে সেইগুলির অসংখ্য ত্রুটি-বিচ্যুতি ধরা পড়িতে থাকে।
📄 হযরত ঈসা (আ)-এর জন্ম সম্পর্কে শুভ সুসংবাদ
হযরত 'মারয়াম (আ) সব সময় নিজ প্রকোষ্ঠে আল্লাহর ইবাদতে লিপ্ত থাকিতেন এবং বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া কখনো বাহিরে যাইতেন না। প্রসিদ্ধ বর্ণনামতে যখন তাঁহার বয়স ১৩, তখন একদিন তিনি মসজিদুল আকসার পূর্বদিকে পবিত্রতা অর্জনের উদ্দেশ্যে লোকজন হইতে পৃথক হইয়া নির্জনে অবস্থানরত ছিলেন। তখন হযরত জিবরাঈল (আ) মানুষের আকৃতিতে তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত হইলেন। হযরত মারয়াম (আ) একজন অপরিচিত লোককে এইভাবে পর্দাহীন অবস্থায় সামনে উপস্থিত দেখিয়া ভয় পাইয়া গেলেন। তিনি বলিলেন, তোমার মধ্যে যদি সামান্যতম আল্লাহ্ ভয় থাকে তাহা হইলে আমি আল্লাহর দোহাই দিয়া তোমা হইতে আশ্রয় চাহিতেছি। ফেরেশতা বলিলেন, মারয়াম! ভয়ের কোন কারণ নাই। আমি মানুষ নহি, আমি আল্লাহর ফেরেশতা। আমি তোমাকে একটি পুত্র সন্তান লাভের সুসংবাদ দিতে আসিয়াছি। পবিত্র কুরআনে এই প্রসঙ্গে ইরশাদ হইয়াছে:
وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ مَرْيَمَ إِذِ انْتَبَذَتْ مِنْ أَهْلِهَا مَكَانًا شَرْقِيًّا . فَاتَّخَذَتْ مِنْ دُونِهِمْ حِجَابًا فَأَرْسَلْنَا إِلَيْهَا رُوحَنَا فَتَمَثَّلَ لَهَا بَشَرًا سَوِيًّا . قَالَتْ إِنِّي أَعُوذُ بِالرَّحْمَنِ مِنْكَ إِنْ كُنْتَ تَقِيًّا . قَالَ إِنَّمَا أَنَا رَسُولُ رَبِّكِ لَأَهَبَ لَكِ غُلْمًا زَكِيًّا .
"বর্ণনা কর এই কিতাবে উল্লিখিত মারয়ামের কথা, যখন সে তাহার পরিবারবর্গ হইতে পৃথক হইয়া নিরালায় পূর্ব দিকে এক স্থানে আশ্রয় লইল, অতঃপর উহাদিগ হইতে পর্দা করিল। অতঃপর আমি তাহার নিকট আমার রূহকে পাঠাইলাম, সে তাহার নিকট পূর্ণ মানবাকৃতিতে আত্মপ্রকাশ করিল। মারয়াম বলিল, তুমি যদি আল্লাহকে ভয় কর তবে আমি তোমা হইতে দয়াময়ের শরণ লইতেছি। সে বলিল, আমি তো তোমার প্রতিপালক প্রেরিত, তোমাকে এক পবিত্র পুত্র দান করিবার জন্য” (১৯ : ১৬-১৯)।
হযরত মারয়াম (আ) পুত্র সন্তানের সংবাদ শুনিয়া বিস্ময়ের সহিত বলিলেন, "মারয়াম বলিল, কেমন করিয়া আমার পুত্র হইবে যখন আমাকে কোন পুরুষ স্পর্শ করে নাই এবং আমি ব্যভিচারিণীও নহি” (১৯ : ২০)?
তখন ফেরেশতা বলিলেন:
قَالَ كَذَلِكِ قَالَ رَبُّكِ هُوَ عَلَى هَيِّنٌ وَلِنَجْعَلَهُ آيَةً لِلنَّاسِ وَرَحْمَةً مِّنَّا وَكَانَ أَمْرًا مَّقْضِيًّا
"এইরূপই হইবে। তোমার প্রতিপালক বলিয়াছেন, ইহা আমার জন্য সহজসাধ্য এবং আমি উহাকে এইজন্য সৃষ্টি করিব যেন সে হয় মানুষের জন্য এক নিদর্শন ও আমার নিকট হইতে এক অনুগ্রহ; ইহা তো এক স্থিরীকৃত ব্যাপার" (১৯ : ২১)।
বর্তমান প্রচলিত বাইবেলেও এই বিষয়টির উল্লেখ রহিয়াছে। যেমন লুক সুসমাচারে উল্লেখ্য আছে: দূত তাহাকে কহিলেন, মারয়াম! ভয় করিও না। কেননা তুমি ঈশ্বরের নিকটে অনুগ্রহ পাইয়াছ। আর দেখ তুমি গর্ভবতী হইয়া পুত্র প্রসব করিবে ও তাহার নাম যীশু রাখিবে। তিনি মহান হইবেন। তখন মারয়াম দূতকে কহিলেন, ইহা কিরূপে হইবে? আমি ত পুরুষকে জানি না। দূত উত্তর করিয়া তাঁহাকে কহিলেন, পবিত্র আত্মা তোমার উপরে আসিবেন এবং পরাৎপরের শক্তি তোমার উপর ছায়া করিবে। এই কারণে যে, পবিত্র সন্তান জন্মিবে" (লুক, ১: ২৬-২৮)। বার্নাবাসের বাইবেলেও অনুরূপ বর্ণিত হইয়াছে। উল্লেখ্য যে, লুক সুসমাচারের ভাষ্যমতে হযরত মারয়ামের কাছে জিবরাঈল ফেরেশতা উক্ত সুসংবাদ লইয়া আসিয়াছিলেন যখন হযরত মারয়াম গালীল প্রদেশের নাসেরা জনপল্লীতে অবস্থান করিতেছিলেন (লুক সুসমাচার, ১: ২৬)।
অপরদিকে বার্নাবাসের বাইবেলে উল্লেখ করা হইয়াছে, মারয়াম তাঁহার কামরায় অর্থাৎ বায়তুল মুকাদ্দাসের কামরায় অবস্থান করিতেছিলেন। আর বায়তুল মুকাদ্দাসের ঐ কামরাটি পূর্ব দিকে অবস্থিত। সম্ভবত এইজন্য আল-কুরআনে মাকান শরকি বলা হইয়াছে (১৯:১৬)। ইবন কাছীরসহ প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিকদের মতে তখন মারয়াম মসজিদের পূর্ব দিকেই অবস্থান করিতেছিলেন (ইবনে কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ২খ, page ৫৯)। আর ভৌগোলিক পর্যালোচনায় দেখা গিয়াছে, বায়তুল মুকাদ্দাস হইতে নাসেরা জনপল্লীটি পূর্ব দিকে নহে, বরং উত্তর দিকে অবস্থিত।
📄 বার্গাবাসের গসপেল
বার্ণাবাসের গসপেল
পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে যে, খৃস্টানদের প্রাথমিক যুগে প্রচলিত গসপেলসমূহের মধ্যে বার্ণাবাসের গসপেল ছিল অন্যতম। পরবর্তীতে এক শ্রেণীর খৃস্টানদের দ্বারা তাহা নিষিদ্ধ ঘোষিত হইয়াছিল। আরও মজার ব্যাপার এই যে, উক্ত গ্রন্থটি খৃস্টান সমাজে প্রচলিত সুসমাচারের অনেক তথ্যকে সমর্থন করে না। উক্ত গ্রন্থে ত্রিত্ববাদের পরিবর্তে তাওহীদি ভাবধারা পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু এই গ্রন্থটির লেখক বার্ণাবাস কে ছিলেন, কখন কিভাবে তাহা রচনা করেন এবং তাহার পাণ্ডুলিপি খৃস্ট সমাজের প্রাচীন গ্রন্থাগার হইতে কিভাবে উদ্ধার করা হয় তাহা লইয়া গবেষকগণ অনুসন্ধান চালাইয়া আসিতেছেন। এই সম্পর্কে নিম্নে সংক্ষেপে কিছু আলোচনা করা হইল।
লেখক পরিচিতি: ঐতিহাসিকগণের মতে বার্ণাবাস ছিলেন একজন ইয়াহুদী, যিনি সাইপ্রাসে জন্মগ্রহণ করেন (Md. Ataur Rahim, Ibid, Page 54)। তিনি যুসেস (ইসু) বা যুসেফ (ইউসুফ) নামেও পরিচিত ছিলেন। তাহার সম্পর্কে উপরিউক্ত চারটি সুসমাচার- এ খুব কমই আলোচনা আসিয়াছে। চারটি গসপেলের উল্লেখকৃত তথ্যে জানা যায়, ইউসুফ নামে এক ব্যক্তি কথিত ক্রুশবিদ্ধ যীশুর লাশ দাফন করিয়াছিল। অনেকের ধারণামতে সেই ইউসুফই হইলেন বার্ণাবাস। তাহার সম্পর্কে মথি সুসমাচারে বলা হয় : "পরে সন্ধ্যা হইলে আরিমাথিয়ার একজন ধনবান লোক আসিলেন, তাহার নাম যোষেফ, তিনি নিজেও যীশুর শিষ্য হইয়াছিলেন, পীলাতের নিকেট গিয়া যীশুর দেহ যাজ্ঞা করিলেন" (মথি ২৭ঃ ৫৭-৫৮)। মার্ক, লুক ও যোহন সুসমাচারেও অনুরূপ বর্ণনা রহিয়াছে (দ্র. মার্ক সুসমাচার ১৫ঃ ৪২-৪৩; লুক সুসমাচার, ২৩ঃ ৫০-৫২)।
(১) চার সুমাচারের বর্ণনা অনুযায়ী তিনি অরিমাতিয়া জনপল্লীর অধিবাসি ছিলেন।
(২) চারটি সুমাচারের মতে তিনি ঈসা (আ)-এর কমপক্ষে অনুসারী ছিলেন। তবে যোহনের মতে তিনি তাহার পরিচয় গোপন রাখিতেন।
(৩) তিনি ধনবান ছিলেন (মথি)।
(৪) তিনি মন্ত্রী পরিষদের সম্ভ্রান্ত সদস্য ছিলেন (মার্ক ও লুক)।
(৫) তিনি ইয়াহুদী ছিলেন (মথি)।
(৬) স্বর্গরাজ্যের অপেক্ষায় ছিলেন (মার্ক)।
(৭) তিনি একজন সৎ ও ধার্মিক লোক ছিলেন (লুক)।
(৮) তিনি ঈসা (আ)-এর বিরুদ্ধে ইয়াহুদীদের ষড়যন্ত্র ও কার্যকলাপ সমর্থন করিতেন না (লুক)।
(৯) ইয়াহুদীদের ভয়ে নিজের পরিচয় গুপ্ত রাখিলেও (যোহনের বর্ণনামতে) প্রকৃতপক্ষে তিনি সাহসী লোক ছিলেন (মার্ক)।
তবে বার্ণাবাস নিজেই নিকোডেমাস ও আবাবি মাথিয়ার ইউসুফ বলিয়া ঐ ব্যক্তির পরিচয় দেন (বার্ণাবাসের বাইবেল, page ২৬০)। তাই এই ইউসুফ নামের ব্যক্তিটি তিনি নিজেই কিনা তাহা লইয়া সংশয় আছে। তবে প্রেরিতের কার্যাবলীতে বার্ণাবাসের পরিচয় স্পষ্টভাবে বিবৃত হয়। প্রেরিতদের কার্যবিবরণে অনেকবার তাহার প্রসঙ্গ আসিয়াছে। যেমন: "আর যোষেফ, যাঁহাকে প্রেরিতেরা বার্নবা নাম দিয়াছিলেন— অনুবাদ করিলে, এই নামের অর্থ প্রবোধের সন্তান— যিনি লেবীয় এবং জাতিতে কুপ্রীয়, তাঁহার এক খণ্ড ভূমি থাকাতে তিনি তাহা বিক্রয় করিয়া তাহার মূল্য আনিয়া প্ররিতদের চরণে রাখিলেন" (প্রেরিত ৪:৩৬-৩৭)।
এইভাবে কলসীয়দের পত্রে পৌল উল্লেখ করিয়াছেন, "আমার সহবন্দি আরিস্টার্থ এবং বার্নবার কুটুম্ব, মার্ক যাঁহার বিষয়ে তোমরা আজ্ঞা পাইয়াছ; তিনি যদি তোমাদের কাছে উপস্থিত হন, তবে তাঁহাকে গ্রহণ করিও” (পলের কলসীয় পত্র, ৪: ১০)।
উপরিউক্ত উদ্ধৃতিসমূহ পর্যালোচনা করিলে বার্ণাবাসের নিম্নোক্ত পরিচয় পাওয়া যায়: (১) তিনি সাইপ্রাসের অধিবাসী ছিলেন। (২) তাহার নাম ছিল ইউসুফ, যাহাকে তাহার সাথীবর্গ বার্ণবা উপাধিতে ভূষিত করেন। আর বার্ণবা অর্থ নসীহতের সন্তান। অর্থাৎ তিনি হৃদয় নিড়ানো বক্তব্যের মাধ্যমে মানুষের মাঝে ওয়াজ নসীহত করিতে পারিতেন, যেইজন্য তাহাকে উপরিউক্ত উপাধি প্রদান করা হয়। (৩) তিনি দাওয়াতের জন্য অন্যান্য প্রেরিতদের সহায়তায় নিজস্ব সম্পদ দান করার ক্ষেত্রে ছিলেন খুবই উন্মুক্ত হস্ত। (৪) তিনি ছিলেন পূতঃ পবিত্র ও আধ্যাত্মিক শক্তিতে বলিয়ান। সম্মানিত, সম্ভ্রান্ত ও পরিচ্ছন্ন ব্যক্তিত্বের অধিকারী। (৫) আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনায় তিনি দাওয়াত প্রচারে পৌলকে সাথে লইয়াছিলেন। (৬) প্রাথমিক গির্জামণ্ডলী তাহাকে এন্টিওক ও তারতুস নগরীতে পঠাইয়াছিলেন। (৭) কথিত দ্বিতীয় সুসমাচারের লেখক মার্কের সাথে তাহার আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। (৮) তিনি পৌলকে হেদায়াত দানে চেষ্টা করিয়াছিলেন। সেই পৌল যে ঈসা (আ)-এর অনুসারীদের উপর হত্যা নির্যাতনের স্টীম রোলার চালাইয়াছিল। (৯) সম্ভবত মার্কের সাথে তাহার আত্মীয়তার সূত্রে বলা যায়, বার্ণবাই মার্ককে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা দিয়াছিলেন। তাই বলা হয় যে, মাসীহ ইলাহ হওয়ার বিষয়টি মার্ক অস্বীকার করিতেন (ইউসুফ সালাবী, প্রাগুক্ত, page ৫৯-৬০)।