📄 অন্যান্য ধর্মগ্রন্থে হযরত ঈসা (আ)
বর্তমান বিশ্বে হযরত ঈসা (আ)-এর অনুসারী হওয়ার দাবিদার খৃস্টানদের ধর্মীয় গ্রন্থ হইল বাইবেল। এই গ্রন্থের দুইটি অংশ: ১. ওল্ড টেস্টামেন্ট ও ২. নিউ টেস্টামেন্ট। খৃস্টান জগত ঈসা (আ)-এর জীবনের জন্য নিউ টেস্টামেন্টকেই আদি উৎস মনে করে। ঈসা (আ)-এর জীবনী সম্পর্কে মৌখিক উৎস হইল ৪টি গসপেল: মথি, মার্ক, লুক ও যোহন। মথি ও লুক গসপেল বা সুসমাচারে ঈসা (আ)-এর বংশলতিকা উল্লেখ করা হইয়াছে। চারটি গসপেলই ঈসা (আ)-এর বাপ্তিস্ম গ্রহণ করা, শয়তানের আহবান প্রত্যাখ্যান করা, হাওয়ারী গ্রহণ করা, শরীয়াতের কিছু কিছু বিধিবিধান, চারিত্রিক দিকনির্দেশনা, ঈসা (আ) কর্তৃক বিভিন্ন অলৌকিক বিষয়ের অবতারণা করা, বিভিন্ন ধরনের রোগীকে সুস্থ করা, বিভিন্ন উপমা-উদাহরণ দিয়া সঙ্গীদিগকে শিক্ষা দেওয়া, ইয়াহুদী পণ্ডিতদের সহিত যুক্তি-তর্কে লিপ্ত হওয়া, বিভিন্ন স্থানে গিয়া তাঁহার দীন প্রচার করা, অবশেষে ইয়াহুদীদের ষড়যন্ত্র ও রোমান শাসক পীলাতের সৈন্যদের হাতে গ্রেফতার হইয়া ফাঁসিকাষ্ঠে মৃত্যুবরণ করিয়া তিন দিন পর মৃত্যুর উপর জয়লাভ করার কথা বিবৃত হইয়াছে। খৃস্টজগতের দাবি অনুসারে এই গসপেলগুলি ৬৫-১২৫ খৃস্টাব্দ-এর মধ্যবর্তী সময়ে লিখিত হইয়াছে (Encyclopedia Americana, vol. 16, page 41) ।
কতিপয় পত্রাবলীতে যাহা আসিয়াছে, তন্মধ্যে হযরত ঈসা-এর ইয়াহূদী হিসাবে জন্মলাভ (গালাতীয়, ৩: ১৬, রোমীয়, ৯:৫), তিনি দাউদের বংশধর (রোমীয়, ১: ৩-৪), তাঁহার মানবীয় চরিত্রের কিছু কিছু দিক, যেমন নম্রতা, ভদ্রতা (২ করিন্থীয়, ১০:১, ১ করিন্থীয়, ১৩), এমনিভাবে অন্যায়ভাবে তাঁহাকে ক্রুশে বিদ্ধ করিয়া হত্যা করিবার দাবি (১ করিন্থীয়, ২:৮, ২ করিন্থীয়, ১৩: ৪) ইত্যাদি। এই চিঠিগুলির মধ্যে অধিকাংশই সেন্ট পল কর্তৃক লিখিত। উপরিউক্ত গসপেলসমূহে ও পত্রাবলীতে ঈসা (আ)-কে আল্লাহ্ পুত্র (নাউযুবিল্লাহ) বলিয়া আখ্যা দিয়া অতি মানবীয় সত্তায় রূপান্তরিত করিবার চেষ্টা অব্যাহত ছিল। সেইগুলি বিশেষ উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করিয়া রচিত যাহা খৃস্টান গবেষকদের দৃষ্টিও এড়ায় নাই। Encyclopaedia Britannica তে বলা হয়, Each of the four Gospels is written from a prospective and for a purpose even though the prospective and the purpose may not always be lasy to discern to day (vol. 13, page 14)।
তাহা ছাড়া ঐ উৎসগুলিতে ঈসা (আ)-এর জীবনী সম্পর্কে খুব অল্পই তথ্য পরিবেশন করা হইয়াছে। ইহার উপর নির্ভর করিয়া ঈসা (আ)-এর কোন গ্রহণযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য জীবনী লিখা সম্ভব নয়। রুডলফ, জ্যাকস জারমিয়াসের মত অনেক বাইবেল বিশেষজ্ঞও সেই সত্যটি নির্দ্বিধায় স্বীকার করিয়াছেন।
মূলত প্রাথমিক যুগে ঈসা (আ)-এর এক শ্রেণীর ভক্তরা তাঁহার সম্পর্কে যেই ধরনের বিশ্বাস পোষণ করিত এবং লোক সম্মুখে প্রচার করিত তাহাই মানুষের মুখে মুখে চলিয়া আসিতেছিল। সেই মৌখিক বর্ণনার ভিত্তিতেই উপরিউক্ত গ্রন্থ ও পত্রাবলী সংকলিত হইয়াছে (Encyclopedia Americana, vol. 16, page 41)
আর ঐগুলিতে ঈসা (আ)-এর জীবনের ঘটনাপঞ্জী কালানুক্রমিক গ্রন্থনা অনুসারেও বিন্যস্ত করা হয় নাই, বরং বিচ্ছিন্নভাবে ঈসা (আ)-এর বিভিন্ন শিক্ষা ও কিছু কিছু কার্যাবলী বিবৃত করা হইয়াছে, এমন কি তাঁহার জীবনের অনেক অধ্যায় সম্পর্কে কিছুই বলা হয় নাই। যেমন শিশুকাল হইতে সাত বৎসর পর্যন্ত তাঁহার অবস্থা, সাত হইতে বার বৎসর বয়সে জেরুসালেম আগমনের পূর্বাবস্থায় তিনি কোথায় কি অবস্থায় ছিলেন তাহার সম্পর্কে ঐ উৎসগুলি নীরব। এমনিভাবে জেরুসালেম হইতে নাসেরাতে ফিরার পর তাঁহার ত্রিশ বৎসর বয়স পর্যন্ত তিনি কোথায় কিভাবে ছিলেন, কি করিয়াছেন তাহার সম্পর্কে কিছুই জানা যায় নাই। সেইজন্য উনিশ শতকের কতিপয় পশ্চিমা খৃস্টান সমালোচক ঈসা বা যিশু নামে কোন ব্যক্তির অস্তিত্বকেই অস্বীকার করিয়াছেন (Encyclopaedia Britannica, vol. 13, page 14)।
এই মতামতে বাড়াবাড়ি করা হইয়াছে নিঃসন্দেহে। কারণ খৃস্টানদের উৎস ছাড়াও তৎকালীন বিশ্বের অন্যান্য এলাকার ঐতিহাসিকদের লেখায়ও নাসেরাতের মাসীহ ঈসা তথা যীশু খৃস্টের কথা উল্লেখ করা হইয়াছে। যেমন: রোমান লেখক টাসিটাস, সোয়টনিয়াস, প্লেনি দি ইয়ংগার এবং ইয়াহুদী ঐতিহাসিক জুসেফাস প্রমুখ।
ঈসা (আ)-এর সমসাময়িক ঐতিহাসিকগণ তাঁহার আগমনের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করিয়াছেন। দুঃখজনক হইলেও সত্য যে, তাঁহার চেয়ে আরও অনেক প্রাচীন ব্যক্তিবর্গের জীবনী স্পষ্টভাবে সংরক্ষিত হইয়াছে, কিন্তু ঈসা (আ)-এর অনুসারীরা তাঁহার জীবনী ভালভাবে সংরক্ষণ করিতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়াছেন। আল-কুরআন যদি নাযিল না হইত তাহা হইলে নবী হিসাবে ঈসা (আ) কি ছিলেন এবং কি ছিলেন না তাহা সম্পর্কে জগৎবাসীর নিকট অস্পষ্টতা থাকিয়াই যাইত।
উল্লেখ্য যে, ত্রিত্ববাদীদের উপরিউক্ত চারিটি গসপেল ও পত্রাবলী ছাড়াও অনেক গসপেল রচিত হইয়াছিল, যাহা ৩২৫ খৃস্টাব্দে অনুষ্ঠিত খৃষ্টীয় সম্মেলনে বাতিল বলিয়া ঘোষণা করা হইয়াছিল। সেইগুলিতে ঈসা সম্পর্কে ত্রিত্ববাদ বিরোধী তথ্য পরিবেশন করা হইয়াছিল (মুতাওয়াল্লী ইউসুফ শালাবী, আদওয়া আলাল মাসীহিয়্যা, page ৬২)। ইহাতে অন্যান্য গসপেলের মতই ঈসা (আ)-এর বিভিন্ন শিক্ষা, কার্যাবলী ও ঘটনাবলীর কথা উল্লেখ করা হইয়াছে। তবে তাঁহার তাওহীদের শিক্ষা, মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী, কিয়ামতের আলামত এই সব বিষয় স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করা হইয়াছে, সাথে সাথে ঈসা (আ)-কে ক্রুশবিদ্ধ করার ঘটনাকেও অবান্তর বলিয়া অস্বীকার করা হইয়াছে। ইহাতে বলা হইয়াছে, ঈসা (আ)-কে ফেরেশতার মাধ্যমে সশরীরে স্বর্গারোহণ করানো হইয়াছে। আর সৈন্যরা যাহাকে ক্রুশবিদ্ধ করিয়াছিল তাহার নাম ছিল জুদাস (বার্নাবাসের বাইবেল, বঙ্গানুবাদ আফজাল চৌধুরী, page ২৫৪-২৫৫)। কিন্তু তাহা সত্ত্বেও এই গ্রন্থে ঈসা (আ)-এর ঘটনাবহুল জীবনের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায় না। আর ঈসা (আ) সম্পর্কে খৃস্টান সম্প্রদায়ের ভ্রান্ত ধারণা একমাত্র কুরআন ও সুন্নাহ পরিবেশিত তথ্যের মাধ্যমেই দূরিভূত হইতে পারে।
ইয়াহুদীদের ধর্মীয় গ্রন্থ তালমুদের যে অংশ প্রথম ও দ্বিতীয় খৃস্টীয় শতাব্দীতে লিখা হইয়াছে তাহাতেও ঈসা (আ)-এর প্রসঙ্গ আসিয়াছে এবং তাহাতে তাঁহার পরিচয় বিকৃত করা হইয়াছে (The new Encyclopaedia Britannica, vol.10, Page 145)। নিঃসন্দেহে তালমুদ ঈসা (আ)-এর প্রতি আক্রমণাত্মক ও বিদ্বেষপ্রসূত তথ্যে ভরপুর।
📄 ইনুজীল সংরক্ষিত না থাকার কারণ
ঈসা (আ)-এর ঊর্ধ্বগমনের পর তাঁহার অনুসারীরা ইন্ন্জীলকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করিতে সক্ষম হয় নাই। উহার কারণ নিম্নরূপ:
প্রথমত: অনুসারীদের আত্মগোপন অবস্থা। ইয়াহুদী ও রোমানদের সাঁড়াশী আক্রমণের মুখে ঈসা (আ)-এর ঊর্ধ্ব গমনের পরেও তাঁহার অনুসারীরা আত্মগোপন করিয়াই থাকিতেন, পাহাড়-পর্বতের গুহায়, বনে-জংগলে বাস করিতেন। আর গোপনে ইন্জীলের বাণী প্রচার করিতেন, এমনকি কাহাকেও সনাক্ত করা হইলেও তিনি ঈসা (আ)-এর অনুসারী নহেন বলিয়া দাবি করিতেন এবং নিজ পরিচয় গোপন করিতেন। অধিকন্তু যদি তাহার কাছে ইন্ন্জীলের কোন অংশবিশেষ থাকিত তাহাও ঈসা (আ)-এর নহে বলিয়া দাবি করিতেন। বর্ণিত আছে যে, "The Shepherd" নামে একটি গ্রন্থ ছিল যাহা হারমাস (Hermas) নামে এক ব্যক্তির গ্রন্থের শিক্ষার সাথে ঈসা (আ)-এর শিক্ষার অনেক সাদৃশ্য ছিল। তাই প্রাথমিক যুগের খৃস্টানরা এই গ্রন্থের গুরুত্ব দিত ও তাহা নিজেই বহন করিত (Md. Ataur Rahim, Ibid, page 48-53)। ধারণা করা হয় যে, ইহাও তাওহীদপন্থী খৃস্টানদের এক ধর্মীয় উৎস ছিল, যাহাতে ঈসা (আ)-এরও শিক্ষার সংকলন ছিল, যাহা অন্য নামে প্রচলিত ছিল। আর তাহা নির্যাতন হইতে বাঁচার জন্যই।
দ্বিতীয়ত: হাওয়ারীদের বিচ্ছিন্ন অবস্থান ও শাহাদাত বরণ: বর্ণিত আছে যে, হযরত ঈসা (আ)-এর পর তাঁহার অনুসারী হাওয়ারীগণ তৎকালীন বিশ্বের বিভিন্ন এলাকায় ছড়াইয়া পড়েন। তৎকালীন যোগাযোগ ব্যবস্থা অনুন্নত থাকার কারণে তাহারা পরস্পর ছিলেন বিচ্ছিন্ন। তাই লিখিত ইন্ন্জীলটি কাহার কাছে ছিল, তাহা জানা যায় নাই। তবে তাহারা যতটুকু স্মৃতিতে ছিল ততটুকুই মানুষের নিকট বর্ণনা করিতেন। কিন্তু পরবর্তীতে তাহারা একে একে শাহাদাত বরণ করেন (ইব্ন হাযম, আল-ফিসাল ফিল মিলাম ওয়াল আহওয়ায়ে ওয়ান নিহাল, ১খ, page ২৫৩)।
এইভাবে সময় যতই অতিবাহিত হইতে থাকে ভুলিয়া যাওয়ার মাত্রাও তত বৃদ্ধি পাইতে থাকে। তাওরাত যেমনি ইউশা ইব্ন নূন, দাউদ (আ), সুলায়মান (আ) প্রমুখ রাষ্ট্রনায়কের পৃষ্ঠপোষকতা পাইয়াছিল, কিন্তু ইন্ন্জীল গ্রন্থটি সংরক্ষণে ও সংকলনে সেই ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা পায় নাই। সেই জন্য তাহা বিস্মৃত হইয়া যাওয়া স্বাভাবিক।
তৃতীয়ত: ইয়াহুদীদের ষড়যন্ত্র কার্যকর ছিল, বিশেষত ধর্মীয় নেতাদের বিভিন্ন পাপাচার তথা ধর্ম ব্যবসার বিরুদ্ধে ঈসা (আ)-এর নূতন দাওয়াতের যে ধরনের প্রসার ঘটিতেছিল তাহা বন্ধ করিবার জন্য তাহারা মরিয়া হইয়া উঠিয়াছিল। তাই তাহাদের কেহ কেহ পরিকল্পিতভাবে খৃষ্ট ধর্মে প্রবেশ করিয়া ইয়াহুদী ধর্মনেতাদের নিকট হইতে ঘুষ লইয়া এবং ঈসার অনুসারীদের সহিত অবস্থান করে। ইয়াহুদীদের ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবে তাহাদের কেহ খৃস্ট ধর্মে প্রবেশ করিয়া ইন্ন্জীল গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি আত্মস্থ করে এবং তাহার যে অংশ তৎকালীন ইয়াহুদী সমাজের সাথে বিরোধপূর্ণ ছিল তাহা গোপন করে। অবশেষে তাহা ধ্বংসই করিয়া ফেলে। এইভাবে ইন্ন্জীলের বিভিন্ন অংশ হারাইয়া যায়। শুধু ততটুকুই বাকী থাকে, যতটুকু অনুসারীদের স্মৃতিতে ছিল।
চতুর্থত: ইয়াহুদীদের ভিতর হইতে যাহারা খৃস্ট ধর্মে দীক্ষিত হইয়াছিল তাহারা খৃষ্ট ধর্মের অপব্যাখ্যা দেওয়া শুরু করিয়াছিল। গবেষণায় প্রমাণিত হইয়াছে যে, সেন্ট পলও তাহাদের মধ্যে একজন। ইন্জীলের অনেক বাণী বিকৃত হইয়া যায়, যাহাকে আল-কুরআনের পরিভাষায় 'তাহরীফ' (বিকৃতি) বলা হইয়াছে। তাহারা ইন্ন্জীলের বিভিন্ন বাণীতে টিকামূলক বিভিন্ন ব্যাখ্যা সংযোজন করিতেন এবং পরবর্তীতে যাহারা শুনিতেন তাহারা মূল বক্তব্য ও ব্যাখ্যার মধ্যে খুব কমই পার্থক্য করিতে পারিতেন। সে কারণে স্মৃতিতে যতটুকু ছিল তাহারও অনেক পরিবর্তন ও পরিবর্ধন ঘটে। বলা হয় যে, ইন্ন্জীলের মূল ভাষ্য বিলুপ্ত হওয়ার পিছনে তাহাদের ভূমিকাই বেশী।
পঞ্চমত: ঈসা (আঃ)-এর নবুওয়ত কাল ছিল সংক্ষিপ্ত অর্থাৎ মাত্র তিন বৎসর। এই সময়ে যথেষ্ট সংখ্যক পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করিবার বিষয়টি ছিল কঠিন। তাহা ছাড়া এই স্বল্প সময়ে ঈসা (আ) দাওয়াতী কাজ ও বিরোধীদের ষড়যন্ত্র মুকাবিলায়েই বেশী ব্যস্ত থাকেন। তাই বেশী পরিমাণে পাণ্ডুলিপি না থাকায় তাহা হারাইয়া যাওয়া বা বিলুপ্ত হওয়া আরো সহজ হয়। মোটকথা, মূল ইন্ন্জীলের বিরাট অংশ বিলুপ্ত হওয়ার প্রধান কারণ ছিল চারটি:
(১) অনুসারীদের বিস্মৃতি,
(২) ঘুষ গ্রহণের মাধ্যমে অংশগ্রহণ করা,
(৩) অনুসারীদের নিজস্ব মতামত প্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য কিছু কিছু ভাষ্য পরিবর্তন এবং নিজেরা তাহা লিখিয়া আল্লাহর বাণী বা ইন্ন্জীলের অংশ বলিয়া দাবি করা,
(৪) ব্যাখ্যা করিতে গিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে বা ভাষান্তরিত করিতে গিয়া মূল ভাষ্যের বিকৃতি সাধন!
এই চারটি ধরনকে আল-কুরআন অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলিয়া ধরিয়াছে। প্রথমত ভুলিয়া যাওয়া সম্পর্কে বলা হইয়াছে:
وَمِنَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّا نَصَارَى أَخَذْنَا مِيثَاقَهُمْ فَنَسُوا حَظًّا مِّمَّا ذُكِّرُوا بِهِ فَأَغْرَيْنَا بَيْنَهُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَسَوْفَ يُنَبِّئُهُمُ اللَّهُ بِمَا كَانُوا يَصْنَعُونَ .
"যাহারা বলে, আমরা খৃস্টান, তাহাদেরও অংগীকার গ্রহণ করিয়াছিলাম, কিন্তু তাহারা যাহা উপদিষ্ট হইয়াছিল তাহার এক অংশ ভুলিয়া গিয়াছে। সুতরাং আমি তাহাদের মধ্যে কিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী শত্রুতা ও বিদ্বেষ জাগরুক রাখিয়াছি। তাহারা যাহা করিত আল্লাহ তাহাদিগকে তাহা জানাইয়া দিবেন” (৫:১৪)।
দ্বিতীয়ত, কিছু কিছু অংশ লুকাইয়া ফেলা হয়। এই মর্মে বলা হইয়াছে:
يَا أَهْلَ الْكِتَابِ قَدْ جَاءَكُمْ رَسُولُنَا يُبَيِّنُ لَكُمْ كَثِيرًا مِّمَّا كُنْتُمْ تُخْفُونَ مِنَ الْكِتَابِ وَيَعْفُوا عَنْ كَثِيرٍ قَدْ جَاءَكُمْ مِنَ اللَّهِ نُورٌ وَكِتَابٌ مُبِينٌ .
"হে কিতাবীগণ! আমার রাসূল তোমাদের নিকট আসিয়াছে, তোমরা কিতাবের যাহা গোপন করিতে সে উহার অনেক তোমাদের নিকট প্রকাশ করে এবং অনেক উপেক্ষা করিয়া থাকে। আল্লাহ্ নিকট হইতে এক জ্যোতি ও স্পষ্ট কিতাব তোমাদের নিকট আসিয়াছে" (৫:১৫)।
তৃতীয়ত, অর্থের লোভে নিজেরা লিখে দাবি করিত ইহা ইন্ন্জীলের অংশ অর্থাৎ পরিবর্তন সাধন করিত। এই সম্পর্কে বলা হইয়াছে:
فَوَيْلٌ لِلَّذِينَ يَكْتُبُونَ الْكِتَابَ بِأَيْدِيهِمْ ثُمَّ يَقُولُونَ هذا من عند الله لِيَشْتَرُوا بِهِ ثَمَنًا قَلِيْلاً فَوَيْلٌ لَهُمْ مِّمَّا كَتَبَتْ أَيْدِيهِمْ وَوَيْلٌ لَهُمْ مِّمَّا يَكْسِبُونَ .
"সুতরাং দুর্ভোগ তাহাদের জন্য যাহারা নিজ হাতে কিতাব রচনা করে এবং তুচ্ছ মূল্য প্রাপ্তির জন্য বলে, ইহা আল্লাহ্র নিকট হইতে। তাহাদের হাত যাহা রচনা করিয়াছে তাহার জন্য শান্তি তাহাদের এবং যাহা তাহারা উপার্জন করে তাহার জন্য শান্তি তাহাদের" (২ঃ ৭৯)।
চতুর্থত, মূল ভাষ্যে বিকৃতি সাধন করা। এই সম্পর্কে বলা হইয়াছে:
يُحَرِّفُونَ الْكَلِمَ عَنْ مَوَاضِعِهِ
"তাহারা শব্দগুলির আমল অর্থের বিকৃতি ঘটাইত" (৫: ১৩)।
يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لِمَ تَلْبِسُونَ الْحَقِّ بِالْبَاطِلِ وَتَكْتُمُونَ الْحَقِّ وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ .
"হে কিতাবীগণ! তোমরা কেন সত্যকে মিথ্যার সহিত মিশ্রিত কর এবং সত্য গোপন কর যখন তোমরা জান" (৩ঃ ৭১)?
মোটকথা, উপরিউক্ত কারণে মূল ইন্ন্জীল বিলুপ্ত হয়। স্মৃতিকথা হইতে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে যাহা সংকলিত হইয়াছে তাহাতে বিক্ষিপ্ত এক ইন্ন্জীলের কিছু কিছু রহিয়াছে, যাহা সনাক্ত করাও কঠিন।
📄 চার সুসমাচারের মূল বক্তব্য ও বিষয়বস্তু
চারটি সুসমাচার যে বিষয়ে একমত হইয়াছে তাহা হইল হযরত ইয়াহইয়া (আ) কর্তৃক তাঁহার সম্পর্কে আগাম বাণী ও ঈসা (আ)-কে বাপ্তিস্ম দান, ঈসা (আ)-এর দ্বারা সংঘটিত বিভিন্ন আশ্চর্যজনক ও অলৌকিক কার্যাবলীর বর্ণনা, তাঁহার বিভিন্ন বাণী, বক্তৃতা, উপমা, নসিহত ইত্যাদি। এইগুলিতে বিবাহ, তালাক সংক্রান্ত কিছু কিছু শরিয়তী আইনের ব্যাখ্যা এবং চারিত্রিক কিছু দিক-নির্দেশনা ও সাথী নির্বাচন সম্পর্কেও কিছু বর্ণনা রহিয়াছে। এমনিভাবে ঈসা (আ)-কে হত্যার ষড়যন্ত্র সম্পর্কে আগাম বাণী, তাঁহার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ, গ্রেফতার ও বিচারকার্য এবং তথাকথিত শূলিবিদ্ধ করিয়া হত্যার বিষয় বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হইয়াছে। তেমনিভাবে তাঁহকে কবরস্থ করিবার পর কবর হইতে উত্থান এবং শিষ্যদের সঙ্গে সাক্ষাত, পরিশেষে উর্ধ্ব গমনের কথার উল্লেখ রহিয়াছে। মার্ক ও লুক সুসমাচারে হযরত ঈসা (আ)-এর বংশপরিচয়, জন্ম বাল্যকালের কিছু কিছু অবস্থার বর্ণনা আসিয়াছে। কিন্তু মার্ক ও যোহনের সুসমাচারে সেই ধরনের বিষয়বস্তু পাওয়া যায় নাই।
একমাত্র যোহনের সুসমাচারে ঈসা (আ)-কে ইলাহ বলা হইয়াছে এবং ত্রিত্ববাদের একটি পরোক্ষ আভাষ দেওয়া হইয়াছে যাহা অন্য কোন সুসমাচারে নাই। মূল বক্তব্যের দিক দিয়া সুসমাচার সম্পর্কে গবেষকগণ প্রচুর বৈপরীত্য, বিচ্যুতি ও সংযোজন-বিয়োজন আবিষ্কার করিয়াছেন, যাহা মুসলিম গবেষক ইবন হাযম ও রহমাতুল্লাহ কিরানবী হিন্দীসহ অনেকের গ্রন্থে বিবৃত হইয়াছে। এই সম্পর্কে এমনকি খৃস্টান গবেষকগণও পিছাইয়া নাই। তাহারাও উপরিউক্ত সুসমাচারের বিভিন্ন অসংগতি স্পষ্টভাবে তুলিয়া ধরিয়াছেন।
(১) যীশুর জন্ম ও জন্মসূত্র সম্পর্কিত তিনটি আলাদা আলাদা বিবরণ এইগুলিতে দেখিতে পাওয়া যায়। এইগুলি হইল, মথি ১ঃ ১-২২; লুক ১ঃ ৩২-৩৩ এবং যোহন ১ঃ ১। মার্ক সুসমাচার এই বিষয়ে নির্লিপ্ত। মথি আর লুক-এর মতে যীশু একজন সাধারণ মানুষপুত্র, আবার তাহাকে ঈশ্বর পুত্রও বলা হইয়াছে। কিন্তু যোহনের মতে, যীশু "আদিতে বাক্য ছিলেন, এবং বাক্য ঈশ্বরের কাছে ছিলেন, এবং বাক্য ঈশ্বর ছিলেন" (যোহন ১ঃ ১)। আর সব কিছু তাহার থেকেই সৃষ্টি। এক কথায় যীশু ছিলেন একই সাথে ত্রিত্ববাদ মতবাদের ত্রিত্ব এবং পিতা ঈশ্বর, পুত্র ঈশ্বর ও পবিত্র আত্মা ঈশ্বর।
(২) যীশুর ব্যাপ্তিস্ম সম্পর্কে মথি ৩ঃ১৩-১৭, মার্ক ১ঃ ৯-১২, লুক ৩: ২১-২২ ও ৪:১ বাণীতে পৃথক পৃথক বিবরণ রহিয়াছে। এইসব বিবরণ মতে যীশু যোহন ব্যাপ্তাইজকের হাতে বাপ্তাইজ হন এবং ইহার পরপরই কিংবা একই দিনে তাঁহাকে ছাড়িয়া অন্যত্র চলিয়া যান। কিন্তু যোহনের সুসমাচারে এই ব্যাপ্টিস্ম বিষয়ে কোন বিবরণ নাই এবং যীশু আর যোহন ব্যাপ্টাইজকের মধ্যকার দেখা-সাক্ষাৎ দুই দিন স্থায়ী হয় বলিয়া দাবি করা হইয়াছে।
(৩) মথি ১৩: ৫৪-৫৮, মার্ক ৬: ৪ ও লুক ৪: ২৪ বাণী মতে যীশুর স্বদেশ (Native land) হইল গালীল। কিন্তু যোহন ৪: ৩, ৪৩-৪৪ বাণীতে বলিতে চাওয়া হইয়াছে যে, তাঁহার স্বদেশ হইল যিহুদিয়া এবং সেইখান হইতে তিনি গালীলে গমন করেন।
(৪) লুক ২৪: ৫০-৫১ মতে যীশু বৈথনিয়া হইতেই ঊর্ধ্বে নীত হন। কিন্তু প্রেরিত ১: ১২ মতে যীশু উর্ধ্বে নীত হন জৈতুন পর্বত হইতে। অথচ এই দুইটি পুস্তকই লুক-এর রচনা বলিয়া দাবি করা হইয়া থাকে।
(৫) লুক ২৪: ২১-২৯, ৩৬ ও ৫১ বাণী মতে যীশু যেদিন পুনরুত্থিত হন সেই দিনই কিংবা পরবর্তী রজনীতেই ঊর্ধ্বে নীত হন। কিন্তু প্রেরিত ১: ৩ বাণী সাক্ষ্য দেয়, যীশু ঊর্ধ্বে নীত হন পুনরুত্থানের চল্লিশ দিন পরে। প্রকৃতপক্ষে যীশুর মৃত্যু, কবরস্থ হওয়া, পুনরুত্থান কোনটিই ঘটে নাই।
মথি ১৫: ২১-২৮ ও মার্ক ৭: ২৪-২৭ বাণীতে দেখা যায় যে, জনৈকা কনানীয়া স্ত্রীলোক যীশুর নিকট আসিয়া তাহার ভূতগ্রস্থা কন্যার প্রতি যীশুর দয়া প্রার্থনা করে। পরে দেখা যায় যে, দয়া দেখানোর পরিবর্তে যীশু বরং উল্টা "উত্তর করিয়া কহিলেন, ইস্রায়েল কুলের হারান মেষ ছাড়া আর কাহারও নিকটে আমি প্রেরিত হই নাই।" স্ত্রীলোকটি আবারও যীশুর 'উপকার' প্রার্থনা করিলে তিনি বলেন যে, সন্তানদের খাদ্য লইয়া কুকুরদের কাছে ফেলিয়া দেওয়া ভাল নহে।” অর্থাৎ কনানীয় স্ত্রীলোকটিকে যীশু কুকুর আখ্যায়িত করিয়া প্রত্যাখ্যান করিলেন। যোহন ২: ৩-৪ বাণীতে দেখা যায় যে, পরে দ্রাক্ষারসের অকুলান হইলে যীশুর মাতা তাহাকে কহিলেন, "উহাদের দ্রাক্ষারস নাই।" যীশু তাঁহাকে কহিলেন, "হে নারী! আমার কাছে তোমার বিষয় কি? আমার সময় এখনও উপস্থিত হয় নাই।"
আবার মথি ১২: ৪৭-৪৮ বাণীতে দেখা যায় যে, তখন এক ব্যক্তি আসিয়া তাঁহাকে কহিল, "দেখুন আপনার মাতা ও ভ্রাতারা কথা কহিবার চেষ্টায় বাহিরে দাঁড়াইয়া আছেন। কিন্তু যে এই কথা বলিল, তাহাকে তিনি উত্তর করিলেন, "আমার মাতা কে? আবার ভ্রাতারাই বা কাহারা"? নিজের মাও ভাইদের প্রতি এই ধরনের উক্তি ও ব্যবহার একজন নবীর পক্ষে সম্ভব নহে। আর এই ধরনের বাণীকে আসমানী কিতাব বলা যায় না (প্রাগুক্ত)।
মোটকথা, উপরিউক্ত সুসমাচারসমূহে শুধু সনদ তথা সূত্রগত দিক দিয়া অনির্ভরযোগ্যই নহে, বরং মূল বক্তব্যের দিক দিয়াও অনেকাংশে অগ্রহণযোগ্য। মূল বক্তব্যেও অসংখ্য ভুল-ভ্রান্তি ও (বিপরীত) এবং অসংগতি রহিয়াছে বলিয়া খৃস্টান গবেষকগণও স্বীকার করিতে কুণ্ঠাবোধ করেন নাই। খৃস্টান পণ্ডিতগণ নূতন নিয়মের পাঠ সংশোধনের জন্য বিগত শতাব্দীগুলিতে আপ্রাণ চেষ্টা করিয়াছেন। তাহাদের আশা ছিল যে, এই সকল চেষ্টা-গবেষণার ফলে ইনজীলের যে কোন পাঠের উপর তাহারা সর্বকালের জন্য ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করিবেন। কিন্তু ফল হইল বিপরীত। প্রসিদ্ধ জার্মান পণ্ডিত ডঃ মিল নূতন নিয়মের কয়েকটি পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করিয়া পরস্পর পরীক্ষা করিলে ত্রিশ হাজার পার্থক্য গণনা করেন। জন জেম্স এবং বাতাসতীন বিভিন্ন দেশে ঘুরিয়া পূর্ববর্তীদের তুলনায় আরও অধিক পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করিয়া পরস্পর তুলনা করিলে দশ লক্ষ পার্থক্য দেখিতে পান। এই সকল পার্থক্যের অধিকাংশই ছিল পঠন এবং লিখন সংক্রান্ত। কিন্তু ইহাদের মধ্যে এমন কিছু উল্লেখযোগ্য পার্থক্যও ছিল যাহার ফলে সত্য ও মিথ্যা এবং আসল ও নকল পাঠ ও বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান থাকে না। Encyclopaedia Britannica-এর Bible শীর্ষক নিবন্ধকার F.C. Burkih লিখিয়াছেন যে, মিল এবং Wetstein সর্বকালের জন্য প্রমাণ করেন যে, নূতন নিয়মে যে সকল বিভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়, তাহাদের মধ্যে কোন কোনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এইগুলি প্রথম দিকেই সৃষ্টি হইয়াছিল। Marcion এবং Tatien বাইবেলের রদবদলের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। ইনজীলের রদবদল সম্পর্কে ইয়াহুদী দৃষ্টিভঙ্গি এই যে, খৃস্টানদের প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তনশীল চালচলন ও রীতিনীতি লেখকগণকে প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রভাবিত করিয়াছে (Jewish Ency., ix, 947)। নিবন্ধকার ইহার আলোচনা প্রসঙ্গে ইনজীলসমূহের পরস্পর বিরোধী বর্ণনার বহু উদাহরণ উল্লেখ করিয়াছেন। ইহাদের মধ্যে এমন কিছু পার্থক্য রহিয়াছে, যাহার নিশ্চিত কোন কারণ জানা যায় না (ইসলামী বিশ্বকোষ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ৩খ, page ৪১৪)।
বাইবেল সম্পর্কে আধুনিক মুক্ত মনের খৃস্টান গবেষকদের সাথে সুর মিলাইয়া বিশ্বখ্যাত আহমাদ দিদাতও প্রমাণ করিয়াছেন যে, বর্তমান খৃস্টানদের বাইবেলে ৫০ হাজারেরও বেশি ভুল রহিয়াছে (দ্র. আহমাদ দীদাত, ফিফটি থাউজেন্ড এ্যরারস)।
আহমাদ দিদাত তাঁহার বিখ্যাত The choice নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেন, রেড লেটার বাইবেল বলিয়া একটা বাইবেলের প্রচলন আছে। বাইবেলের যেসব বক্তব্য বা বাণী যীশুর কথিত বলিয়া উল্লেখ আছে, এই "রেড লেটার বাইবেলে” যীশুর কথিত সেই বাণী লাল কালিতে মুদ্রিত, বাকি অংশ কালো কালিতে। হিসাব করিয়া দেখা গিয়াছে, এই রেড লেটার বাইবেলের ৯০ ভাগই কালো কালিতে ছাপা (আহমাদ দিদাত, দি চয়েস, অনুবাদ আখতার-উল-আলম; আরও দ্র. The Holy Bible, Cambridge University press, Great Britain.)।
আসলে যুগে যুগে ঐ সকল সুসমাচার মুদ্রণে গীর্জা সংস্থাই দায়িত্ব পালন করিত, সর্বসাধারণের কোন ভূমিকাই ইহাতে ছিল না। অনন্তর প্রটেস্টান্টদের বিপ্লবের মুখে ঐগুলি গবেষকগণের হাত পৌছিলে সেইগুলির অসংখ্য ত্রুটি-বিচ্যুতি ধরা পড়িতে থাকে।
📄 সুসমাচার চতুষ্টয়ের পরস্পর বিরোধিতার কতিপয় নমুনা
সুসমাচার চতুষ্টয়ের পরস্পর বিরোধিতার কতিপয় নমুনা
১. যীশুর জন্ম ও জন্মসূত্র সম্পর্কিত তিনটি আলাদা আলাদা বিবরণ এইগুলিতে দেখিতে পাওয়া যায়। এইগুলি হইল, মথি ১ঃ ১-২২; লুক ১ঃ ৩২-৩৩ এবং যোহন ১ঃ ১। মার্ক সুসমাচার এই বিষয়ে নির্লিপ্ত। মথি আর লুক-এর মতে যীশু একজন সাধারণ মানুষপুত্র, আবার তাহাকে ঈশ্বর পুত্রও বলা হইয়াছে। কিন্তু যোহনের মতে, যীশু "আদিতে বাক্য ছিলেন, এবং বাক্য ঈশ্বরের কাছে ছিলেন, এবং বাক্য ঈশ্বর ছিলেন" (যোহন ১ঃ ১)। আর সব কিছু তাহার থেকেই সৃষ্টি। এক কথায় যীশু ছিলেন একই সাথে ত্রিত্ববাদ মতবাদের ত্রিত্ব এবং পিতা ঈশ্বর, পুত্র ঈশ্বর ও পবিত্র আত্মা ঈশ্বর।
(২) যীশুর ব্যাপ্তিস্ম সম্পর্কে মথি ৩ঃ১৩-১৭, মার্ক ১ঃ ৯-১২, লুক ৩: ২১-২২ ও ৪:১ বাণীতে পৃথক পৃথক বিবরণ রহিয়াছে। এইসব বিবরণ মতে যীশু যোহন ব্যাপ্তাইজকের হাতে বাপ্তাইজ হন এবং ইহার পরপরই কিংবা একই দিনে তাঁহাকে ছাড়িয়া অন্যত্র চলিয়া যান। কিন্তু যোহনের সুসমাচারে এই ব্যাপ্টিস্ম বিষয়ে কোন বিবরণ নাই এবং যীশু আর যোহন ব্যাপ্টাইজকের মধ্যকার দেখা-সাক্ষাৎ দুই দিন স্থায়ী হয় বলিয়া দাবি করা হইয়াছে।
(৩) মথি ১৩: ৫৪-৫৮, মার্ক ৬: ৪ ও লুক ৪: ২৪ বাণী মতে যীশুর স্বদেশ (Native land) হইল গালীল। কিন্তু যোহন ৪: ৩, ৪৩-৪৪ বাণীতে বলিতে চাওয়া হইয়াছে যে, তাঁহার স্বদেশ হইল যিহুদিয়া এবং সেইখান হইতে তিনি গালীলে গমন করেন।
(৪) লুক ২৪: ৫০-৫১ মতে যীশু বৈথনিয়া হইতেই ঊর্ধ্বে নীত হন। কিন্তু প্রেরিত ১: ১২ মতে যীশু উর্ধ্বে নীত হন জৈতুন পর্বত হইতে। অথচ এই দুইটি পুস্তকই লুক-এর রচনা বলিয়া দাবি করা হইয়া থাকে।
(৫) লুক ২৪: ২১-২৯, ৩৬ ও ৫১ বাণী মতে যীশু যেদিন পুনরুত্থিত হন সেই দিনই কিংবা পরবর্তী রজনীতেই ঊর্ধ্বে নীত হন। কিন্তু প্রেরিত ১: ৩ বাণী সাক্ষ্য দেয়, যীশু ঊর্ধ্বে নীত হন পুনরুত্থানের চল্লিশ দিন পরে। প্রকৃতপক্ষে যীশুর মৃত্যু, কবরস্থ হওয়া, পুনরুত্থান কোনটিই ঘটে নাই।
মথি ১৫: ২১-২৮ ও মার্ক ৭: ২৪-২৭ বাণীতে দেখা যায় যে, জনৈকা কনানীয়া স্ত্রীলোক যীশুর নিকট আসিয়া তাহার ভূতগ্রস্থা কন্যার প্রতি যীশুর দয়া প্রার্থনা করে। পরে দেখা যায় যে, দয়া দেখানোর পরিবর্তে যীশু বরং উল্টা "উত্তর করিয়া কহিলেন, ইস্রায়েল কুলের হারান মেষ ছাড়া আর কাহারও নিকটে আমি প্রেরিত হই নাই।" স্ত্রীলোকটি আবারও যীশুর 'উপকার' প্রার্থনা করিলে তিনি বলেন যে, সন্তানদের খাদ্য লইয়া কুকুরদের কাছে ফেলিয়া দেওয়া ভাল নহে।” অর্থাৎ কনানীয় স্ত্রীলোকটিকে যীশু কুকুর আখ্যায়িত করিয়া প্রত্যাখ্যান করিলেন। যোহন ২: ৩-৪ বাণীতে দেখা যায় যে, পরে দ্রাক্ষারসের অকুলান হইলে যীশুর মাতা তাহাকে কহিলেন, "উহাদের দ্রাক্ষারস নাই।" যীশু তাঁহাকে কহিলেন, "হে নারী! আমার কাছে তোমার বিষয় কি? আমার সময় এখনও উপস্থিত হয় নাই।"
আবার মথি ১২: ৪৭-৪৮ বাণীতে দেখা যায় যে, তখন এক ব্যক্তি আসিয়া তাঁহাকে কহিল, "দেখুন আপনার মাতা ও ভ্রাতারা কথা কহিবার চেষ্টায় বাহিরে দাঁড়াইয়া আছেন। কিন্তু যে এই কথা বলিল, তাহাকে তিনি উত্তর করিলেন, "আমার মাতা কে? আবার ভ্রাতারাই বা কাহারা"? নিজের মাও ভাইদের প্রতি এই ধরনের উক্তি ও ব্যবহার একজন নবীর পক্ষে সম্ভব নহে। আর এই ধরনের বাণীকে আসমানী কিতাব বলা যায় না (প্রাগুক্ত)।
মোটকথা, উপরিউক্ত সুসমাচারসমূহে শুধু সনদ তথা সূত্রগত দিক দিয়া অনির্ভরযোগ্যই নহে, বরং মূল বক্তব্যের দিক দিয়াও অনেকাংশে অগ্রহণযোগ্য। মূল বক্তব্যেও অসংখ্য ভুল-ভ্রান্তি ও (বিপরীত) এবং অসংগতি রহিয়াছে বলিয়া খৃস্টান গবেষকগণও স্বীকার করিতে কুণ্ঠাবোধ করেন নাই। খৃস্টান পণ্ডিতগণ নূতন নিয়মের পাঠ সংশোধনের জন্য বিগত শতাব্দীগুলিতে আপ্রাণ চেষ্টা করিয়াছেন। তাহাদের আশা ছিল যে, এই সকল চেষ্টা-গবেষণার ফলে ইনজীলের যে কোন পাঠের উপর তাহারা সর্বকালের জন্য ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করিবেন। কিন্তু ফল হইল বিপরীত। প্রসিদ্ধ জার্মান পণ্ডিত ডঃ মিল নূতন নিয়মের কয়েকটি পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করিয়া পরস্পর পরীক্ষা করিলে ত্রিশ হাজার পার্থক্য গণনা করেন। জন জেম্স এবং বাতাসতীন বিভিন্ন ঘুরিয়া পূর্ববর্তীদের তুলনায় আরও অধিক পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করিয়া পরস্পর তুলনা করিলে দশ লক্ষ পার্থক্য দেখিতে পান। এই সকল পার্থক্যের অধিকাংশই ছিল পঠন এবং লিখন সংক্রান্ত। কিন্তু ইহাদের মধ্যে এমন কিছু উল্লেখযোগ্য পার্থক্যও ছিল যাহার ফলে সত্য ও মিথ্যা এবং আসল ও নকল পাঠ ও বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান থাকে না। Encyclopaedia Britannica-এর Bible শীর্ষক নিবন্ধকার F.C. Burkih লিখিয়াছেন যে, মিল এবং Wetstein সর্বকালের জন্য প্রমাণ করেন যে, নূতন নিয়মে যে সকল বিভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়, তাহাদের মধ্যে কোন কোনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এইগুলি প্রথম দিকেই সৃষ্টি হইয়াছিল। Marcion এবং Tatien বাইবেলের রদবদলের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। ইনজীলের রদবদল সম্পর্কে ইয়াহুদী দৃষ্টিভঙ্গি এই যে, খৃস্টানদের প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তনশীল চালচলন ও রীতিনীতি লেখকগণকে প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রভাবিত করিয়াছে (Jewish Ency., ix, 947)। নিবন্ধকার ইহার আলোচনা প্রসঙ্গে ইনজীলসমূহের পরস্পর বিরোধী বর্ণনার বহু উদাহরণ উল্লেখ করিয়াছেন। ইহাদের মধ্যে এমন কিছু পার্থক্য রহিয়াছে, যাহার নিশ্চিত কোন কারণ জানা যায় না (ইসলামী বিশ্বকোষ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ৩খ, page ৪১৪)।
বাইবেল সম্পর্কে আধুনিক মুক্ত মনের খৃস্টান গবেষকদের সাথে সুর মিলাইয়া বিশ্বখ্যাত আহমাদ দিদাতও প্রমাণ করিয়াছেন যে, বর্তমান খৃস্টানদের বাইবেলে ৫০ হাজারেরও বেশি ভুল রহিয়াছে (দ্র. আহমাদ দীদাত, ফিফটি থাউজেন্ড এ্যরারস)।
আহমাদ দিদাত তাঁহার বিখ্যাত The choice নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেন, রেড লেটার বাইবেল বলিয়া একটা বাইবেলের প্রচলন আছে। বাইবেলের যেসব বক্তব্য বা বাণী যীশুর কথিত বলিয়া উল্লেখ আছে, এই "রেড লেটার বাইবেলে” যীশুর কথিত সেই বাণী লাল কালিতে মুদ্রিত, বাকি অংশ কালো কালিতে। হিসাব করিয়া দেখা গিয়াছে, এই রেড লেটার বাইবেলের ৯০ ভাগই কালো কালিতে ছাপা (আহমাদ দিদাত, দি চয়েস, অনুবাদ আখতার-উল-আলম; আরও দ্র. The Holy Bible, Cambridge University press, Great Britain.)।
আসলে যুগে যুগে ঐ সকল সুসমাচার মুদ্রণে গীর্জা সংস্থাই দায়িত্ব পালন করিত, সর্বসাধারণের কোন ভূমিকাই ইহাতে ছিল না। অনন্তর প্রটেস্টান্টদের বিপ্লবের মুখে ঐগুলি গবেষকগণের হাত পৌছিলে সেইগুলির অসংখ্য ত্রুটি-বিচ্যুতি ধরা পড়িতে থাকে।