📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবুওয়ত প্রাপ্তি ও ইঞ্জীল লাভ

📄 নবুওয়ত প্রাপ্তি ও ইঞ্জীল লাভ


হযরত ঈসা (আ) ওহীর মাধ্যমে যখন ইনজীল লাভ করিলেন, তখন তাহা বনী ইসরাঈলের মধ্যে প্রচার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। কিন্তু কখন, কিভাবে, কোথা হইতে তাঁহার দাওয়াতী কার্যক্রম সূচনা করিয়াছিলেন, তাহা সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় নাই। প্রচলিত সুসমাচারসমূহে এই সম্পর্কে বিভিন্ন রকম বর্ণনা পাওয়া যায়।
মথি সুসমাচারের বর্ণনায় জানা যায় যে, হযরত ইয়াহইয়া (আ) যত দিন সর্বসাধারণের মধ্যে দাওয়াতী কার্যক্রম চালাইয়া যাইতেছিলেন ততদিন হযরত ঈসা (আ) নীরব থাকেন। কিন্তু ইতোমধ্যে হযরত ইয়াহইয়া (আ) গ্রেফতার হইয়া জেলখানায় বন্দী হইয়া যান। হযরত ঈসা (আ) তাহা জানিতে পারিয়া গালীলে চলিয়া যান এবং স্বীয় নাসরত গ্রাম ছাড়িয়া সবূলুন ও নপ্তালি এলাকার মধ্যে মগের পাড়ের কফরনাহুর শহরে তাঁহার প্রচার কার্যক্রমের সূচনা করিয়া ঘোষণা করিলেন : "মন ফিরাও, কেননা স্বর্গরাজ্য সন্নিকট হইল" (মথি, ৪:১৭)।
অর্থাৎ “তওবা কর, কেননা আসমানী বাদশাহী সন্নিকটে আসিয়াছে"। অতঃপর ঈসা (আ) গালীল শহরের তীরবর্তী এলাকায় দাওয়াতী কাজ করিতে লাগিলেন এবং সাগরে মাছ ধরা অবস্থায় সিবাদিয়ের দুই পুত্র ইয়া'কুব ও ইউহান্নাকে তাহার দাওয়াতের প্রতি আকৃষ্ট করিতে সক্ষম হন। অবশ্যই তাহারা দুইজন ঈসা (আ)-এর সাথী হইয়া যান। অতঃপর ঈসা (আ) তাহার সাথীদ্বয়কে লইয়া গালীল প্রদেশের সমস্ত জায়গায় ঘুরিয়া ঘুরিয়া ইয়াহুদীদের ভিন্ন ভিন্ন মজলিসখানায় শিক্ষা দিতে লাগিলেন। ইহা ছাড়া তিনি বেহেশতী রাজ্যের সুখবর প্রচার করিতে এবং লোকদের সমস্ত রকম রোগ ভাল করিতে লাগিলেন। সমস্ত সিরিয়া প্রদেশে তাঁহার কথা ছড়াইয়া পড়িল। যে সমস্ত লোক নানা রকম রোগে ও ভীষণ যন্ত্রণায় কষ্ট পাইতেছিল, যাহাদের ভূতে ধরিয়াছিল এবং যাহারা মৃগী ও পক্ষাঘাত রোগে ভুগিতেছিল, লোকেরা তাহাদিগকে ঈসা (আ)-এর নিকট আনিল। তিনি তাহাদের সকলকে সুস্থ করিলেন। গালীল, দিকাপালি, জেরুসালেম এহুদিয়া এবং জর্ডানের অন্য পার হইতে অনেক লোক ঈসার পিছনে চলিল (মথি, ৪:২৩-২৫; আরও দ্র. মার্ক, ১:১৪)।
লুক সুসমাচারের বর্ণনা অনুযায়ি প্রায় ৩০ বৎসর বয়সে ঈসা (আ) তাঁহার কার্য আরম্ভ করেন (লুক ৩:২৩)। যোহন সুসমাচারে আরও বলা হইয়াছে, দিবসে ঈসা (আ) প্রকাশ্য কার্যের আরম্ভ করিলেন। আর তাহা ছিল কান্না নগরে এক বিবাহ অনুষ্ঠানে, যেখানে তিনি পানিকে দ্রাক্ষারসে পরিণত করেন। সেই অনুষ্ঠানে তাঁহার মা জননী মারয়ামের সঙ্গেও সাক্ষাত হয়। এইভাবে কিছু দিন পর ইয়াহুদীদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান সন্নিকটে হইলে ঈসা জেরুসালেমে চলিয়া যান। অতঃপর তিনি ইবাদতখানায় দেখিতে পাইলেন যে, লোকেরা ইবাদতখানার মধ্যে গরু, ভেড়া আর কবুতর বিক্রী করিতেছে এবং টাকা বদল করিয়া দিবার লোকেরাও বসিয়া আছে। এই সমস্ত দেখিয়া তিনি দড়ি দিয়া একটা চাবুক তৈরী করিলেন আর তাহা দিয়া সমস্ত গরু, ভেড়া এবং লোকদেরও সেই জায়গা হইতে তাড়াইয়া দিলেন। টাকা বদল করিয়া দিবার লোকদের টাকা-পয়সা ছড়াইয়া দিয়া তিনি তাহাদের টেবিলগুলি উল্টাইয়া ফেলিলেন (যোহন ২: ১-১৫)। উপরিউক্ত বর্ণনায় দেখা যায় যে, ঈসা (আ) তাঁহার প্রকাশ্যে দাওয়াতী কাজের সূচনা করিয়াছিলেন গালীল প্রদেশে। মথির বর্ণনামতে, তাহা শুরু করেন তিনি কফরনাতুন শহরে এবং পরবর্তীতে গালীল সাগরের পাড়ে।
যোহন সুসমাচারের মতে বেথানিয়া গ্রামে তাঁহার সঙ্গী-সাথী গ্রহণ কাজের সূচনা করেন এবং কান্না গ্রামের বিবাহভোজ অনুষ্ঠান হইতেই প্রকাশ্য প্রচারকার্য শুরু করেন এবং পরবর্তীতে তিনি জেরুসালেমে বায়তুল মুকাদ্দাসে গমন করেন। বার্ণাবাসের বাইবেলে আছে যে, ফেরেশতা জিবরাঈল কর্তৃক ইনজীল কিতাব লাভের পর ঈসা (আ) তাঁহার মাতাকে সবকিছু অবগত করিয়া তাঁহার খেদমত হইতে অব্যাহতি চাহিলেন। মারয়াম এই সকল কথা শুনিয়া বলিলেন, "পুত্র! তোমার জন্মের আগেই আমাকে এই সকল বলা হইয়াছে। নুবুওয়াতের কাজে যোগদানের উদ্দেশ্যে জন্মদাত্রীর খেদমত হইতে পূর্ব দিন হইতে তিনি বিদায় গ্রহণ করিলেন। আর জেরুসালেমে প্রবেশ করিলেন। জেরুসালেমের প্রবেশপথে একজন কুষ্ঠ ব্যধিগ্রস্ত ব্যক্তির সাক্ষাত পাইলেন। সে ঈসার নিকট আবেদন করিল যেন তিনি তাহার রোগমুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে দু'আ করেন। অবশেষে ঈসা (আ)-এর দু'আর বরকতে যখন ঐ লোকটি রোগমুক্তি লাভ করিল তখন আনন্দে আত্মহারা হইয়া চিৎকার করিতে শুরু করিল যে, তোমরা আসিয়া দেখ, ইনি আল্লাহর নবী। আর তখন তাঁহাকে ঘিরিয়া লোকজন একত্র হইতে শুরু করে। এই কথা জেরুসালেম শহরে প্রচারিত হওয়ার পর এমনভাবে লোকের সমাগম হয় যে, মসজিদ প্রাঙ্গণে তিল ধারণের ঠাই পর্যন্ত রহিল না। কর্তব্যরত খাদেমগণ হযরত ঈসার নিকট আরয করিলেন, জনাব! সমবেত জনতা আপনাকে দেখিতে চায়। আপনার কথা শুনিতে চায়। ঐ মিনারায় আরোহণ করিয়া তাহাদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন। ঈসা (আ) তখন সেই মিনারায় দাঁড়াইয়া জনতার উদ্দেশ্যে ওয়াজ করিলেন। সেই ওয়াজে আল্লাহর অনন্ত মহিমা বর্ণনা, প্রথম মানব আদম (আ)-কে শয়তানের প্ররোচনা, তৎপরবর্তীতে হাবিল-কাবিলের ঘটনা, মহাপ্লাবন ও লোহিত সাগরে ফেরাউনকে ডুবাইয়া ধ্বংস করা ইত্যাদি বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনারও উদ্ধৃতি দিয়েছেন এবং ইবরাহীম (আ) ও তাঁহার সন্তানদের প্রতি সনাতন ওয়াদা ও মূসা (আ)-এর মাধ্যমে পবিত্র শরীআত জারী করার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। সাথে সাথে আল্লাহর বাণী ভুলিয়া যাওয়া এবং মিথ্যা অহমিকায় মত্ত হওয়ার ব্যাপারে জনতাকে সতর্ক করেন এবং ইয়াহুদী রিববীদেরও সমালোচনা করেন। অবশেষে জনতা পাপ মোচনের জন্য দু'আ করিতে ঈসার নিকট আবেদন জানাইল। কিন্তু রিববী ও ধর্মীয় নেতারা নিজেদের প্রতি নিন্দা, তিরস্কার ও ধিককারের কারণে ঈসা (আ)-এর প্রতি মনে মনে বিদ্বিষ্ট হইয়া উঠিল। এমনকি উপস্থিত রিববী, কাতিব ও ধর্মবেত্তারা ঈসার মৃত্যুদণ্ড দাবি করে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 চারিত্রিক ও সামাজিক সংস্কার

📄 চারিত্রিক ও সামাজিক সংস্কার


হযরত ঈসা (আ) দুনিয়াদারিতে কৃষ্ণতাসাধন, বিনয়, নম্রতা, ন্যায়নিষ্ঠা, দয়া-দাক্ষিণ্য, সততা ইত্যাদির শিক্ষা দিতেন। বর্তমানে প্রচলিত সুসমাচারসমূহে এইসব শিক্ষার বিস্তারিত বিবরণ রহিয়াছে। যেমন বিনয় ও নম্রতার শিক্ষায় তিনি বলিয়াছিলেনঃ যে কেহ আপনাকে উচ্চ করে, তাহাকে নত করা যাইবে, কিন্তু যে আপনাকে নত করে তাহাকে উচ্চ করা যাইবে (লুক, ১৮: ১৪)।
লোভ-লালসা হইতে বিরত থাকিবার জন্য শিক্ষা দিতে গিয়া তিনি বলেন: "সাবধান আপনাদিগকে সর্বপ্রকার লোভ হইতে রক্ষা করিও। কেননা উপচিয়া পড়িলে ও মনুষ্য সম্পত্তিতে তাহার জীবন হয় না" (লুক, ১২: ১৫-১৬)।
"হে অধ্যাপক ও ফরীশীগণ, কপটীরা! ধিক তোমাদিগকে। কারণ তোমরা চুনকাম করা কবরের তুল্য, যাহা বাহিরে সুন্দর বটে, ভিতরে মরা মানুষের অস্থি ও সর্বপ্রকার অশুচিতা ভরা। তদ্রূপ তোমরাও বাহিরে লোকদের কাছে ধার্মিক বলিয়া দেখাইয়া থাক, কিন্তু ভিতরে তোমরা কাপট্য ও অধর্ম্মে পরিপূর্ণ।"
সামাজিক সম্পর্ক ও স্বামী-স্ত্রীর বন্ধন সম্পর্কে তিনি বলিয়াছিলেন, "সুতরাং তাহারা আর দুই নয় কিন্তু একাঙ্গ। অতএব ঈশ্বর যাহার যোগ করিয়া দিয়াছেন, মনুষ্য তাহার নিয়োগ না করুক" (মথি, ১৯:৬)।
তিনি তালাক সম্পর্কে মন্তব্য করেন, "ব্যভিচারের দোষ ব্যতিরেকে যে কেহ আপন স্ত্রীকে পরিত্যাগ করিয়া অন্যকে বিবাহ করে, সে ব্যভিচার করে" (মথি, ১৯ঃ ৯)।
লুক সুসমাচারে আসিয়াছে যে, তিনি বলেন, "তোমরা যে শুনিতেছ, আমি তোমাদিগকে বলি, তোমরা আপন শত্রুদিগকে প্রেম করিও, যাহারা তোমাদিগকে দ্বেষ করে, তাহাদের মঙ্গল করিও, যাহারা তোমাদিগকে শাপ দেয় তাহাদিগকে আশীর্বাদ করিও, যাহারা তোমাদিগকে নিন্দা করে, তাহাদের নিমিত্ত প্রার্থনা করিও, যে তোমার এক গালে চড় মারে, তাহার দিকে অন্য গালও পাতিয়া দিও এবং যে তোমার চোপা তুলিয়া লয়, তাহাকে আঙরাখাটিও (জামা) লইতে বারণ করিও না। যে কেহ তোমার কাছে যাজ্ঞা করে, তাহাকে দিও এবং যে তোমার দ্রব্য তুলিয়া লয়, তাহার কাছে তাহা আর চাহিও না, আর তোমরা যেরূপ ইচ্ছা কর যে, লোকে তোমাদের প্রতি করে, তোমরাও তাহাদের প্রতি সেইরূপ করিও” (লুক, ৬: ২৭-৩২)।
মোটকথা, হযরত ঈসা (আ) ছিলেন মানব দরদী। মানুষের দুঃখ-কষ্ট তিনি সহ্য করিতে পারিতেন না। তাহাদের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবে তিনি সর্বাত্মক চেষ্টা করিতেন। মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি, সৌহার্দমূলক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা ও তাহা রক্ষার জন্য তিনি প্রয়াস চালাইতেন। সাথে সাথে তাহার শিষ্যদেরকে এই সকল বিষয়ে শিক্ষা দিতেন। তাঁহার মত তাহার সাথীগণ এই ক্ষেত্রে আদর্শ হিসাবে প্রতিভাত হন। তাই আল-কুরআনেও তাহাদের গুণসমূহ উল্লেখ করা হইয়াছে এবং তাহাদের প্রশংসা বিবৃত হইয়াছে। আল্লাহপাক বলেন:
ثُمَّ قَفَّيْنَا عَلَى آثَارِهِمْ بِرُسُلِنَا وَقَفَّيْنَا بِعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ وَآتَيْنَهُ الْإِنْجِيلَ وَجَعَلْنَا فِي قُلُوبِ الَّذِينَ اتَّبَعُوهُ رَأْفَةً ورَحْمَةً وَرَهْبَانِيَّةٌ ابْتَدَعُوهَا مَا كَتَبْنَهَا عَلَيْهِمْ إِلَّا ابْتِغَاءَ رِضْوَانِ اللَّهِ فَمَا رَعَوْهَا حَقَّ رِعَايَتِهَا .
"অতঃপর আমি তাহাদিগের অনুগামী করিয়াছিলাম আমার রাসূলগণকে এবং অনুগামী করিয়াছিলাম মারয়াম-তনয় ঈসাকে, আর তাহাকে দিয়াছিলাম ইঞ্জীল এবং তাহার অনুসারীদিগের অন্তরে দিয়াছিলাম করুণা ও দয়া। কিন্তু সন্ন্যাসবাদ, ইহা তো উহারা নিজেরাই আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের জন্য প্রবর্তন করিয়াছিল, আমি উহাদিগকে ইহার বিধান দেই নাই, অথচ ইহাও উহারা যথাযথভাবে পালন করে নাই" (৫৭ঃ ২৭)।
হযরত ঈসা (আ)-এর প্রচারকাজে দেখা যায়, তিনি অপরাধীদেরকে ঘৃণা করিতেন না, এমনকি তাহাদের সাথে আহার করিতেন। ইহা ইয়াহুদী নেতারা পছন্দ করিত না। তাঁহার সাথীদের মধ্যেও কেহ কেহ তাহা পছন্দ করিত না। তাই তিনি তাহাদেরকে এই বলিয়া সতর্ক করিতেন, অপরাধীকে ঘৃণা করিয়া দূরে সরাইয়া দিলে সে হেদায়াত পাইবে কোথা হইতে? তাহার প্রতি সদয় ব্যবহার করিয়া দীনের প্রতি তাহাকে আকৃষ্ট করাই ছিল হযরত ঈসা (আ)-এর হিকমত।
মোটকথা, হযরত ঈসা (আ)-এর শিক্ষার মধ্যে ক্ষমা, দয়া ও মানবপ্রেম ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মানুষের প্রতি ঐকান্তিক দয়া ও ভালবাসার প্রেরণায় স্বজাতির লোকজনের সকল স্তরের ব্যক্তিদের নিকট তিনি গমন করিতেন এবং যথাসম্ভব তাহাদেরকে আপন করিয়া লইয়া হেদায়াত করিতেন।

হযরত ঈসা (আ) দুনিয়াদারিতে কৃষ্ণতাসাধন, বিনয়, নম্রতা, ন্যায়নিষ্ঠা, দয়া-দাক্ষিণ্য, সততা ইত্যাদির শিক্ষা দিতেন। বর্তমানে প্রচলিত সুসমাচারসমূহে এইসব শিক্ষার বিস্তারিত বিবরণ রহিয়াছে। যেমন বিনয় ও নম্রতার শিক্ষায় তিনি বলিয়াছিলেনঃ যে কেহ আপনাকে উচ্চ করে, তাহাকে নত করা যাইবে, কিন্তু যে আপনাকে নত করে তাহাকে উচ্চ করা যাইবে (লুক, ১৮: ১৪)।
লোভ-লালসা হইতে বিরত থাকিবার জন্য শিক্ষা দিতে গিয়া তিনি বলেন: "সাবধান আপনাদিগকে সর্বপ্রকার লোভ হইতে রক্ষা করিও। কেননা উপচিয়া পড়িলে ও মনুষ্য সম্পত্তিতে তাহার জীবন হয় না" (লুক, ১২: ১৫-১৬)।
"হে অধ্যাপক ও ফরীশীগণ, কপটীরা! ধিক তোমাদিগকে। কারণ তোমরা চুনকাম করা কবরের তুল্য, যাহা বাহিরে সুন্দর বটে, ভিতরে মরা মানুষের অস্থি ও সর্বপ্রকার অশুচিতা ভরা। তদ্রূপ তোমরাও বাহিরে লোকদের কাছে ধার্মিক বলিয়া দেখাইয়া থাক, কিন্তু ভিতরে তোমরা কাপট্য ও অধর্ম্মে পরিপূর্ণ।"
সামাজিক সম্পর্ক ও স্বামী-স্ত্রীর বন্ধন সম্পর্কে তিনি বলিয়াছিলেন, "সুতরাং তাহারা আর দুই নয় কিন্তু একাঙ্গ। অতএব ঈশ্বর যাহার যোগ করিয়া দিয়াছেন, মনুষ্য তাহার নিয়োগ না করুক" (মথি, ১৯:৬)।
তিনি তালাক সম্পর্কে মন্তব্য করেন, "ব্যভিচারের দোষ ব্যতিরেকে যে কেহ আপন স্ত্রীকে পরিত্যাগ করিয়া অন্যকে বিবাহ করে, সে ব্যভিচার করে" (মথি, ১৯ঃ ৯)।
লুক সুসমাচারে আসিয়াছে যে, তিনি বলেন, "তোমরা যে শুনিতেছ, আমি তোমাদিগকে বলি, তোমরা আপন শত্রুদিগকে প্রেম করিও, যাহারা তোমাদিগকে দ্বেষ করে, তাহাদের মঙ্গল করিও, যাহারা তোমাদিগকে শাপ দেয় তাহাদিগকে আশীর্বাদ করিও, যাহারা তোমাদিগকে নিন্দা করে, তাহাদের নিমিত্ত প্রার্থনা করিও, যে তোমার এক গালে চড় মারে, তাহার দিকে অন্য গালও পাতিয়া দিও এবং যে তোমার চোপা তুলিয়া লয়, তাহাকে আঙরাখাটিও (জামা) লইতে বারণ করিও না। যে কেহ তোমার কাছে যাজ্ঞা করে, তাহাকে দিও এবং যে তোমার দ্রব্য তুলিয়া লয়, তাহার কাছে তাহা আর চাহিও না, আর তোমরা যেরূপ ইচ্ছা কর যে, লোকে তোমাদের প্রতি করে, তোমরাও তাহাদের প্রতি সেইরূপ করিও” (লুক, ৬: ২৭-৩২)।
মোটকথা, হযরত ঈসা (আ) ছিলেন মানব দরদী। মানুষের দুঃখ-কষ্ট তিনি সহ্য করিতে পারিতেন না। তাহাদের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবে তিনি সর্বাত্মক চেষ্টা করিতেন। মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি, সৌহার্দমূলক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা ও তাহা রক্ষার জন্য তিনি প্রয়াস চালাইতেন। সাথে সাথে তাহার শিষ্যদেরকে এই সকল বিষয়ে শিক্ষা দিতেন। তাঁহার মত তাহার সাথীগণ এই ক্ষেত্রে আদর্শ হিসাবে প্রতিভাত হন। তাই আল-কুরআনেও তাহাদের গুণসমূহ উল্লেখ করা হইয়াছে এবং তাহাদের প্রশংসা বিবৃত হইয়াছে। আল্লাহপাক বলেন:
ثُمَّ قَفَّيْنَا عَلَى آثَارِهِمْ بِرُسُلِنَا وَقَفَّيْنَا بِعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ وَآتَيْنَهُ الْإِنْجِيلَ وَجَعَلْنَا فِي قُلُوبِ الَّذِينَ اتَّبَعُوهُ رَأْفَةً ورَحْمَةً وَرَهْبَانِيَّةٌ ابْتَدَعُوهَا مَا كَتَبْنَهَا عَلَيْهِمْ إِلَّا ابْتِغَاءَ رِضْوَانِ اللَّهِ فَمَا رَعَوْهَا حَقَّ رِعَايَتِهَا .
"অতঃপর আমি তাহাদিগের অনুগামী করিয়াছিলাম আমার রাসূলগণকে এবং অনুগামী করিয়াছিলাম মারয়াম-তনয় ঈসাকে, আর তাহাকে দিয়াছিলাম ইঞ্জীল এবং তাহার অনুসারীদিগের অন্তরে দিয়াছিলাম করুণা ও দয়া। কিন্তু সন্ন্যাসবাদ, ইহা তো উহারা নিজেরাই আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের জন্য প্রবর্তন করিয়াছিল, আমি উহাদিগকে ইহার বিধান দেই নাই, অথচ ইহাও উহারা যথাযথভাবে পালন করে নাই" (৫৭ঃ ২৭)।
হযরত ঈসা (আ)-এর প্রচারকাজে দেখা যায়, তিনি অপরাধীদেরকে ঘৃণা করিতেন না, এমনকি তাহাদের সাথে আহার করিতেন। ইহা ইয়াহুদী নেতারা পছন্দ করিত না। তাঁহার সাথীদের মধ্যেও কেহ কেহ তাহা পছন্দ করিত না। তাই তিনি তাহাদেরকে এই বলিয়া সতর্ক করিতেন, অপরাধীকে ঘৃণা করিয়া দূরে সরাইয়া দিলে সে হেদায়াত পাইবে কোথা হইতে? তাহার প্রতি সদয় ব্যবহার করিয়া দীনের প্রতি তাহাকে আকৃষ্ট করাই ছিল হযরত ঈসা (আ)-এর হিকমত।
মোটকথা, হযরত ঈসা (আ)-এর শিক্ষার মধ্যে ক্ষমা, দয়া ও মানবপ্রেম ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মানুষের প্রতি ঐকান্তিক দয়া ও ভালবাসার প্রেরণায় স্বজাতির লোকজনের সকল স্তরের ব্যক্তিদের নিকট তিনি গমন করিতেন এবং যথাসম্ভব তাহাদেরকে আপন করিয়া লইয়া হেদায়াত করিতেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 পাহাড়ে ঈসা (আ) প্রদত্ত উপদেশ

📄 পাহাড়ে ঈসা (আ) প্রদত্ত উপদেশ


হযরত ঈসা (আ) ছিলেন অনলবর্ষী বাগ্মী। তিনি বিভিন্ন স্থানে গিয়া হৃদয়গ্রাহী ভাষায় উপমা ও উদাহরণের মাধ্যমে ওয়াজ-নসীহত করিতেন। তিনি যেখানেই যাইতেন লোকদের মধ্যে একটা সাড়া পড়িয়া যাইত। লোকেরা তাহার জন্য জীবন উৎসর্গ করিতে প্রস্তুত হইয়া যাইত (আনওয়ারে আম্বিয়া, page ২৮৭)।
এইভাবে যখন তিনি গালীল প্রদেশে ঘুরিয়া ফিরিয়া শিক্ষা দিতেছিলেন এবং নানারকম রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদেরকে সুস্থ করিতেছিলেন তখন তাঁহার পিছনে অনেক লোকজন চলিতে শুরু করিল। মথি সুসমাচারের বর্ণনামতে, সেখানে গালীল, দিকাপলি, জেরুসালেম, এহুদিয়া ও জর্ডানের অন্য পার হইতে আগত অনেক লোক ছিল। তাহারা কফরনাহুম-এর রাস্তার এক পাহাড়ের পাদদেশে আসিলে ঈসা (আ) এক দীর্ঘ ভাষণ প্রদান করেন (মথি, ৪ঃ ২৩-২৫)। উহা ঈসা (আ)-এর ঐতিহাসিক পাহাড়ী খুতবা (Sarmon on the mount) হিসাবে খ্যাতি লাভ করিয়াছে। হযরত ঈসা (আ) সুযোগ বুঝিয়া প্রায়ই খুৎবা দিতেন, যাহা সুসমাচারসমূহে বিচ্ছিন্নভাবে ছড়াইয়া ছিটাইয়া আছে। কিন্তু ঐ খুৎবাটি দীর্ঘ যাহা মথি সুসমাচারে ৫-৭ পর্যন্ত তিনটি অধ্যায়ে বর্ণিত হইয়াছে। বাইবেলের নানা বিকৃতি সত্ত্বেও উক্ত পাহাড়ী খুৎবাটিতে একসংগে ঈসা (আ)-এর অনেক শিক্ষা সন্নিবেশিত হইয়াছে বলিয়া গবেষকগণ মনে করেন। ইহার বিশেষ কয়েকটি অংশ নিম্নরূপ:
"ধন্য যাহারা আত্মাতে দীনহীন, কারণ স্বর্গরাজ্য তাহাদেরই।
ধন্য যাহারা শোক করে, কারণ তাহারা সান্ত্বনা পাইবে।
ধন্য যাহারা মৃদুশীল, কারণ তাহারা দেশের অধিকারী হইবে।
ধন্য যাহারা ধার্মিকতার জন্য ক্ষুধিত ও তৃষিত, কারণ তাহারা পরিতৃপ্ত হইবে।
ধন্য যাহারা দয়াশীল, কারণ তাহারা দয়া পাইবে।
ধন্য যাহারা নির্মূলান্তঃকরণ, কারণ তাহারা ঈশ্বরের দর্শন পাইবে।
"তোমরা পৃথিবীতে আপনাদের জন্য ধন সঞ্চয় করিও না, এখানে কীটে ও মর্ত্যায় ক্ষয় করে, চোরেও সিঁধ কাটিয়া চুরি করে। কিন্তু স্বর্গে আপনাদের জন্য ধন সঞ্চয় কর। সেখানে কীটে ও মর্ত্যায় ক্ষয় করে না। সেখানে চোরেও সিঁধ কাটিয়া চুরি করে না।
"তোমরা বিচার করিও না, যেন বিচারিত না হও। কেননা যেরূপ বিচারে তোমরা বিচার কর সেই রূপ বিচারে তোমরাও বিচারিত হইবে এবং যে পরিমাণে পরিমাণ কর, সেই পরিমাণে তোমাদের নিমিত্ত পরিমাণ করা যাইবে। আর তোমার ভ্রাতার চক্ষে যে কুটা আছে, তাহাই কেন দেখিতেছ? কিন্তু তোমার চক্ষে যে কড়িকাঠ আছে, তাহা কেন ভাবিয়া দেখিতেছ না?
"অতএব যে কেহ আমার এই সকল বাক্য শুনিয়া পালন করে, তাহাকে এমন একজন বুদ্ধিমান লোকের তুল্য বলিতে হইবে, যে পাষাণের উপর আপন গৃহ নির্মাণ করিল। পরে বৃষ্টি নামিল, বন্যা আসিল, বায়ু বহিল এবং সেই গৃহে লাগিল, তথাপি তাহা পড়িল না। কারণ পাষাণের উপরে তাহার ভিত্তিমূল স্থাপিত হইয়াছিল। আর যে কেহ আমার এই সকল বাক্য শুনিয়া পালন না করে, তাহাকে এমন একজন নির্বোধ তুল্য বলিতে হইবে, যে বালুকার উপর আপন গৃহ নির্মাণ করিল। পরে বৃষ্টি নামিল, বন্যা আসিল, বায়ু বহিল এবং সেই গৃহে আঘাত করিল, তাহাতে তাহা পড়িয়া গেল ও তাহার পতন ঘোরতর হইল" (দ্র. মথি, ৫:৪৩-৪৮, ৬:১-৩৪, ৭:২৪-২৭)।
উক্ত ভাষণের বিশেষ গুরুত্ব পূর্ণ কয়েকটি দিক হইল: ইবাদতের ক্ষেত্রে রোযা রাখিবার বিষয়ে শিক্ষা (৬: ১৬-১৮), দান করিবার বিষয়ে শিক্ষা (৬: ৫-৭), ইখলাসের বিষয়ে শিক্ষা (৬: ১-৫, ১৬-১৮), এক আল্লাহর ইবাদত করিবার শিক্ষা (৬: ২৪), বেহেস্তের পাথেয় সংক্রান্ত শিক্ষা (৬: ১৯-২১), ইবাদতে মধ্য পন্থা অবলম্বন ও বাহুল্য পরিহারের শিক্ষা (৫: ৭), কপটতা পরিহারের শিক্ষা (৬: ১৬-১৮), প্রচার কাজে ঘর হইতে বহির হওয়ার শিক্ষা (৬: ২৬-২৯), হেকমত ও দীনের তত্ত্বকথা যথাস্থানে ব্যবহারের শিক্ষা (৭:৬)।
মাওলানা আবুল কালাম আযাদ তাহার তরজমানুল কুরআন নামক গ্রন্থে এবং মুহাম্মদ জামীল আহমাদ তাঁহার আম্বিয়ায়ে কুরআন নামক গ্রন্থে হযরত ঈসা (আ)-এর শিক্ষা, বিশেষ করিয়া পাহাড়ী খুৎবার শিক্ষা ও বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনা করিয়াছেন? কুরআন ও সুন্নাহর শিক্ষার মধ্যে সামঞ্জস্যের বিষয়টি রহিয়াছে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত ঈসা (আ)-এর দাওয়াতের পদ্ধতি

📄 হযরত ঈসা (আ)-এর দাওয়াতের পদ্ধতি


হযরত ঈসা (আ) আল্লাহর নির্দেশে তাহার সমকালীন প্রেক্ষাপট পর্যবেক্ষণ করিয়া তাঁহার দাওয়াতী পদ্ধতি গ্রহণ করেন।
তাঁহার সেই দা'ওয়াতের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলি নিম্নে আলোচনা করা হইল. (দ্র. নিবন্ধকারের মানহাজুদ দাওয়াহ ওয়াদ দু'আত ফিল-কুরআনিল কারীম, ১৯৯৭ খৃ., page ২৩১-২৩৯)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00