📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নিরাপদ আশ্রয় লাভের উদ্দেশ্যে বায়তুল মুকাদ্দাস ত্যাগ

📄 নিরাপদ আশ্রয় লাভের উদ্দেশ্যে বায়তুল মুকাদ্দাস ত্যাগ


জন্মলাভের পর হযরত ঈসা (আ) প্রতিকূল পরিবেশের সম্মুখীন হন। তাঁহার অলৌকিক জন্ম, নবজাতক হিসাবে দোলনায় কথা বলা এবং আরও অলৌকিক কিছু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে লোকজন ধারণা করিতে শুরু করে যে, সম্ভবত এই শিশুই তাহাদের প্রতিশ্রুত মাসীহ বা ত্রাণকর্তা আর এই শিশুর বিষয়টি সেই সময়ে ইয়াহুদী রাজা হেরোদের দৃষ্টিও এড়ায় নাই। বর্ণিত আছে যে, হেরোদ রাজাও শিশু ঈসা (আ)-কে গোপনে হত্যা করিবার জন্য ষড়যন্ত্র শুরু করিয়াছিল। অন্যদিকে কিছু কিছু মুনাফিক শ্রেণীর ব্যক্তিদের মাধ্যমে ঈসা (আ)-এর জন্মকে কেন্দ্র করিয়া তিক্ত রটনাও গোটা পরিবেশকে বিষাক্ত করিয়া তুলিতেছিল। মোটকথা, এই অস্বস্তিকর ও নিরাপত্তাহীন পরিবেশে ঈসা (আ)-কে লালন-পালন করার জন্য তাহার মা উপযুক্ত মনে করেন নাই। তাই তিনি সন্তর্পণে ঈসা (আ)-কে লইয়া বায়তুল মুকাদ্দাস ত্যাগ করিলেন, যাহাতে শিশু ঈসার পরিচয় গোপন রাখিয়া সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে লালন-পালন করা সম্ভব হয়।
বায়তুল মুকাদ্দাস হইতে বাহির হইয়া ঈসা (আ)-এর মা কোথায় গিয়াছিলেন তাহা লইয়া অনেক কিংবদন্তি ইয়াহুদী ও খৃস্টান সমাজে সৃষ্টি হইয়াছে, যাহার যথার্থতা সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নহে।
বায়তুল মুকাদ্দাসের ইবাদতখানায় ঈসা (আ)-এর খৎনা অনুষ্ঠান সম্পন্ন হওয়ার পর মারয়াম (আ) স্বীয় সন্তানকে লইয়া গালীল প্রদেশে তাঁহার নিজ গ্রাম নাসরতে ফিরিয়া যান। আর এইভাবে তিনি সেইখানে লালিত-পালিত হন (লুক, ২:৩৯-৪০)।
রাজা হেরোদ সমস্ত প্রধান ধর্মীয় নেতা ডাকিয়া ইয়াহূদীর বেথেলহামে ঈসা (আ)-এর জন্মের বিষয়টি নিশ্চিত হন এবং তাঁহাকে হত্যা করিবার অভিপ্রায়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন (মথি, ২:১৬)। এদিকে মারয়ামের সহযোগী সাথী ইউসুফ স্বপ্নে আদিষ্ট হইলেন যে, হেরোদ শিশু ঈসাকে বিনাশ করিতে চায়। তাই তুমি মা-পুত্রকে লইয়া অতি শীঘ্র মিসরে চলিয়া যাও। আর তিনি ঘুম হইতে উঠিয়া তাহাদেরকে লইয়া মিসরে চলিয়া গেলেন এবং হেরোদের মৃত্যু পর্যন্ত সেখানেই রহিলেন (বার্নাবাসের বাইবেল, page ৬-৭; মথি সুসমাচার, ২:১৩-১৪)।
স্মর্তব্য, হযরত ঈসা (আ)-কে নাসরতে লইয়া যাওয়ার বর্ণনাটি একমাত্র লুক সুসমাচার সূত্রেই পাওয়া যায়। কিন্তু অপর অধিকাংশ বর্ণনায় দেখা যায় যে, তাঁহাকে লইয়া মিসরেই যাওয়া হইয়াছিল। যদিও মিসরে পালাইয়া যাওয়ার উপলক্ষ বা কারণ সম্পর্কে মতভেদ আছে।
আল্লামা রহমতুল্লাহ কীরানবী এই ঘটনার সমালোচনা করিয়াছেন। কেননা ঘটনার এক পর্যায়ে বলা হয় যে, পারস্য পণ্ডিতেরা ঈসা (আ)-এর সন্ধান লাভ করার পর স্বপ্নে আদিষ্ট হইয়া যখন নিজ দেশে ফিরিয়া গেলেন এবং হেরোদ রাজার সাথে সাক্ষাৎ করিলেন না তখন হেরোদ ভীষণ রাগিয়া গিয়াছিল এবং সেই পণ্ডিতদের নিকট হইতে যে সময়ের কথা সে জানিয়াছিল সেই সময়ের হিসাব মতে দুই বৎসর ও তাহার কম বয়সের যত ছেলে বেথেলহাম ও তাহার আশেপাশের জায়গাগুলিতে ছিল সকলকে হত্যা করার হুকুম দিয়াছিল (মথি, ২:১৬-১৭)।
আল্লামা রহমতুল্লাহ কীরানবী বলেন, এই বিষয়টি ঐতিহাসিক বর্ণনা ও যুক্তি উভয় দিক দিয়াই ভ্রান্ত বলিয়া ধরা যায়। ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, খৃস্টান ঐতিহাসিকসহ অন্যান্য নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিকদের কেহই ঐ ঘটনার উল্লেখ করেন নাই (রহমতুল্লাহ কীরানবী, ইযহারুল হক, ২খ, page ৩০৭-৩০৮)।
তাঁহার মিসর গমনের প্রাক্কালে প্রতিকূল পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ার আরও কিছু কারণ বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া যায়। কাযী মুহাম্মাদ ছানাউল্লাহ পানীপথী (র) সুদ্দী (র)-এর সূত্রে একটি বর্ণনা উল্লেখ করেন। সূদ্দী (র) বলেন, ঈসা (আ) মকতবে শিশুদের বলিতেন, কাহার বাপ কি খাবার তৈরী করিয়াছে। কাহাকে ও বলিতেন, যাইয়া দেখ বাড়ির সকলে এই খাইয়াছে। তোমার জন্য অমুক অমুক খাবার তুলিয়া রাখিয়াছে। ছেলেটি বাড়ি চলিয়া যাইত এবং সে খাবার চাহিত, না দিলে বায়না ধরিত, কান্নাকাটি করিত, শেষ পর্যন্ত তাহাদেরকে তাহা দিতেই হইত। তাহারা জিজ্ঞাসা করিত, কে বলিয়াছে তোমার জন্য এই খাবার রাখা হইয়াছে। সে বলিত, ঈসা (আ)। ফলে তাহারা তাহাদের শিশুদের আটকাইয়া রাখিল এবং বলিল, সে একজন যাদুকর। তাঁহার কাছে আর যাইও না। একবার তাহারা শিশুদের একটি ঘরে একত্র করিল। ঈসা (আ) তাহাদের ডাকিতে আসিলেন, কিন্তু তাহারা বলিল, তাহারা এইখানে নাই। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, তাহা হইলে এই ঘরে কি? তাহারা বলিল, এক পাল শূকর। তিনি বলিলেন : তবে তাহাই হইবে। তিনি চলিয়া গেলে তাহারা শিশুদের ছাড়িয়া দিতে আসিয়া দেখিল একপাল শূকর। মুহূর্তের মধ্যে এই সংবাদ বনূ ইসরাঈলে ছড়াইয়া পড়িল। ফলে তাহারা তাঁহার পিছনে লাগিয়া গেল। ঈসা (আ)-এর মা ভয় পাইয়া গেলেন, হয়ত তাহারা ঈসা (আ)-কে মারিয়াই ফেলিবে। সুতরাং তিনি তাঁহাকে লইয়া একটি গাধায় সওয়ার হইলেন এবং মিসরে পালাইয়া গেলেন (কাযী ছানাউল্লাহ পানিপথী, তাফসীরে মাযহারী, ২খ., page ২৯৬-২৯৭; তাফসীরে তাবারী, ৫খ, page ৪০৪)।
মোটকথা, একদিকে হেরোদের ষড়যন্ত্র, অন্যদিকে ঈসা (আ)-এর মাধ্যমে আশ্চর্যজনক ঘটনা প্রকাশিত হইবার প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট প্রতিকূল পরিস্থিতি তাঁহাকে অধিকাংশের মতে মিসরে আশ্রয় লইতে বাধ্য করিল। এই ধরনের আশ্রয়ের কথা আল-কুরআনেও উল্লেখ করা হইয়াছে। তবে তাহা মিসরে না অন্য কোথাও তাহা স্পষ্টভাবে বলা হয় নাই। বলা হইয়াছে :
وَجَعَلْنَا ابْنَ مَرْيَمَ وَأُمَّهُ آيَةً وَأَوَيْنَهُمَا إِلَى رَبِّوَةٍ ذَاتِ قَرَارٍ وَمَعِين .
"আর আমি মারয়াম তনয় ও তাহার জননীকে করিয়াছিলাম এক নিদর্শন, তাহাদিগকে আশ্রয় দিয়াছিলাম এক নিরাপদ ও প্রস্রবণবিশিষ্ট উচ্চ ভূমিতে” (২৩: ৫০)।
আল্লামা ইব্‌ন কাছীর বলেন, আয়াতে 'রাবওয়া' শব্দটির অর্থ সমতল ভূমি হইতে উচ্চ এলাকা যাহার শীর্ষদেশ সমতল ও বাসযোগ্য। এই প্রশস্ত উচ্চ ভূমি হওয়া সত্ত্বেও সেইখানে ঝরণাধারা প্রবাহিত ছিল (ইব্‌ন কাছীর, প্রাগুক্ত, ২খ, page ৭১-৭২)।
এই অঞ্চলটি সম্পর্কে মুফাসসিরীনে কেরাম-এর মধ্যে মতভেদ রহিয়াছে। কাহারও মতে ঈসার জন্মস্থান বেথেলহাম, কাহারও মতে বর্তমান দামিক্কের নদীমাতৃক অঞ্চল, কাহারও মতে রামলা অঞ্চল, কাহারও মতে মিসর (প্রাগুক্ত, page ৭২; আরও দ্র. তাফসীরে নাসাফী, ২খ, page ১৩৭)। তবে ইহার যে পরিচয় উক্ত আয়াতে বিধৃত হইয়াছে তাহা উচ্চ ভূমিতে নদী বা ঝর্না প্রবাহিত কোন এলাকায় হইবে। অধিকাংশের মতে, তাহা নীল নদ বিধৌত মিসর অঞ্চলকেই বুঝানো হইয়াছে। আল্লামা ইব্‌ন কাছীর খৃস্টানগণ ধারণা করিত যে, ঈসা (আ)-কে মিসরেই লইয়া যাওয়া হইয়াছিল তাঁহার মাতাসহ তিনি 'আয়ন শামস নামক শহরে বসবাস করিয়াছিলেন। খৃস্টানরা আরও বলে যে, মা মারয়াম ও মাসীহ যে গাছের ছায়াতলে অবস্থান করিতেন সেই গাছটি অনেক দিন পর্যন্ত টিকিয়াছিল। খৃস্টানগণ ইহার নামকরণ করিয়াছিল শাজারাতুল 'আযারা বা কুমারী বৃক্ষ যাহা পরিদর্শনের জন্য লোকজন ভ্রমণ করিত। ইহা আল-মাতারিয়া নামক শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত (আব আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার, প্রাগুক্ত)।
ইহা ছাড়া ফ্রান্সের এক প্রত্নতাত্ত্বিক মিসর হইতে ৮৩ খৃস্টাব্দের একটি লিখিত পাণ্ডুলিপি আবিষ্কার করেন, মাসীহ বাল্যকালে মিসরে অবস্থানের কথা উল্লেখ আছে (ইসলামী ইনসাইক্লোপেডিয়া, উর্দু, সম্পাদনা সৈয়দ কাসিম মাহমুদ, page ১১০৮)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 স্বদেশ নাসেরাতে প্রত্যাবর্তন ও বসবাস

📄 স্বদেশ নাসেরাতে প্রত্যাবর্তন ও বসবাস


হযরত ঈসা (আ)-এর মাতার জন্মস্থান ছিল নাসরাত জনপল্লী। হযরত মারয়াম স্বীয় সন্তানকে লইয়া কখন বিদেশ বিভূঁই হইতে স্বদেশভূমি নাসেরাতে আসিয়াছিলেন সেই ব্যাপারে মতবিরোধ আছে। মথি সুসমাচার, বার্নাবাসের বাইবেল ও কতিপয় মুসলিম ঐতিহাসিকের মতে ইয়াহুদী রাজা হেরোদের মৃত্যুর পরই তিনি মিসর হইতে নাসেরাতে চলিয়া আসিয়াছিলেন (মথি, ২:২০-২৩; বার্নাবাসের বাইবেল, page ৭; তারীখে তাবারী, ১খ, page ৭২৯)। বার্নাবাসের বর্ণনামতে তখন ঈসা (আ)-এর বয়স ছিল সাত বৎসর (বার্নাবাসের বাইবেল, প্রগুক্ত)।
ওয়াইব ইবন মুনাব্বিই-এর এক বর্ণনায় দেখা যায়, ঈসা (আ)-এর ১২ বছর বয়স হওয়া পর্যন্ত তিনি মিসরেই ছিলেন। অন্য বর্ণনায় দেখা যায়, তিনি সেখানে ১৩ বৎসরে পদার্পণ করিবার পর তাঁহাকে মিসর হইতে জেরুসালেমে ফিরিয়া আসিবার আদেশ দেয়া হয় (ইবন কাছীর, প্রাগুক্ত, page ৭০-৭২)।
আল্লামা হিফযুর রহমান সিউহারবী উল্লেখ করেন, হযরত মারয়াম (আ) শিশু ঈসা (আ)-কে লইয়া মিসরে তাঁহার কোন আত্মীয়ের কাছে চলিয়া যান এবং পরে সেখান হইতে নাসেরায় চলিয়া আসেন। ঈসা (আ) যখন তের বৎসরে পদার্পণ করিলেন তখন তিনি তাঁহাকে সাথে করিয়া পুনরায় বায়তুল মুকাদ্দাসে ফিরিয়া আসিলেন (সিওহারবী, কাসাসুল কুরআন, ৪খ, page ৪১)।
মথি ও বার্নাবাসের বাইবেল হযরত ঈসা (আ) ও তাঁহার মাতার মিসর হইতে ফিরিয়া আসার উপলক্ষ হিসাবে উল্লেখ করা হয় যে, হেরোদের মৃত্যুর পর একদা স্বপ্নযোগে মারয়ামের সাথী ইউসুফ আদিষ্ট হইলেন যে, তিনি যেন তাহাদেরকে লইয়া ইয়াহুদায় ফিরিয়া আসেন (বার্নাবাসের বাইবেল, page ৭; মথি, ২: ১৯-২০)। অন্য বর্ণনায় আছে যে, ঈসা (আ)-এর বয়স বার অতিবাহিত হওয়ার পর বায়তুল মুকাদ্দাসের শাসকের মৃত্যু হইলে হযরত যাকারিয়া (আ) হযরত মারয়ামকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। তখন হযরত মারয়াম (আ) তাঁহার সন্তানসহ বায়তুল মুকাদ্দাসে ফিরিয়া আসিলেন (ইসলামী বিশ্বকোষ, ইসলামিক ফাউণ্ডেশন, ঢাকা, বাংলাদেশ, ৫খ, page ৫০৫)।
উল্লেখ্য যে, খৃস্টানদের বাইবেলসহ মুসলিম ঐতিহাসিকদের অধিকাংশ কিতাবে বর্ণিত হয় যে, নবুওয়াত লাভ পর্যন্ত তিনি সেই নাসেরাত পল্লীতেই বসবাস করিয়াছিলেন এবং খৃস্টানদের কিছু কিছু উৎস ইংগিত করে যে, সেই নাসরাত হইতে তিনি মারয়াম এবং ইউসুফের সহিত বার্ষিক উৎসব বা ঈদুল ফেসাখ পালনের জন্য প্রতি বৎসর জেরুসালেমে আগমন করিতেন।
তাঁহার বয়স যখন বার বৎসর তখন জেরুসালেমে ঈদ উৎসবে অংশগ্রহণ শেষে ইবাদতখানার ইয়াহুদী আলেমদের সহিত আলোচনায় লিপ্ত হইয়াছিলেন বলিয়া উল্লেখ আছে। অবশেষে মারয়াম এক দিনের পথ চলিয়া যাওয়ার পর তাঁহাকে না পাইয়া আবার জেরুসালেমে ফিরিয়া আসিয়া ইবাদতখানায় ঈসা (আ)-কে পাইলেন। অতঃপর ঈসা (আ) তাহাদের সঙ্গে নাসেরাতে ফিরিয়া গেলেন এবং তাহাদের সাথেই রহিলেন (দ্র. লুক, ২: ৪১-৫১)। ইহা হইতে বুঝা যায়, নবুওয়াত লাভ পর্যন্ত সময়টুকু তিনি নাসেরাতেই কাটাইয়াছিলেন। সেইজন্য তাঁহাকে নাসরাতের ঈসা বলিয়া অভিহিত করা হইত (মথি, ২: ২৩)।
তবে কোন কোন বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, তিনি মিসর হইতে জেরুসালেমে ফিরিয়া আসেন এবং নবুওয়াত লাভ পর্যন্ত তিনি সেখানেই অবস্থান করিয়াছিলেন (ইবন কাছীর, ২খ, page ৭২)। তবে ইহা তৎকালীন প্রেক্ষাপট ও প্রসিদ্ধ বর্ণনার পরিপন্থী। কারণ মথি ও বার্নাবাসের বাইবেলের তথ্যে দেখা যায় যে, হেরোদ মুত্যুবরণ করিলেও তাহার পুত্র আকিলাস সেই পদে সমাসীন হন। তিনিও পিতার ন্যায় প্রতিহিংসাপরায়ণ জানিতে পারিল সেখানে বসবাস ভীতিপ্রদ বিবেচনায় ঈসা (আ)-কে ইয়াহূদীয়া প্রদেশের জেরুসালেম হইতে গালীল প্রদেশের নাসরাত জনপল্লীতে লইয়া যাওয়া হয় এবং তিনি সেখানেই বসবাস করেন (বার্নাবাসের বাইবেল, প্রাগুক্ত, ২: ২২-২৩)। অতএব তিনি দুইবার হিজরত করেন। একবার জেরুসালেম হইতে মিসরে, আবার জেরুসালেম হইতে নাসেরাতে।

হযরত ঈসা (আ)-এর মাতার জন্মস্থান ছিল নাসরাত জনপল্লী। হযরত মারয়াম স্বীয় সন্তানকে লইয়া কখন বিদেশ বিভূঁই হইতে স্বদেশভূমি নাসেরাতে আসিয়াছিলেন সেই ব্যাপারে মতবিরোধ আছে। মথি সুসমাচার, বার্নাবাসের বাইবেল ও কতিপয় মুসলিম ঐতিহাসিকের মতে ইয়াহুদী রাজা হেরোদের মৃত্যুর পরই তিনি মিসর হইতে নাসেরাতে চলিয়া আসিয়াছিলেন (মথি, ২:২০-২৩; বার্নাবাসের বাইবেল, page ৭; তারীখে তাবারী, ১খ, page ৭২৯)। বার্নাবাসের বর্ণনামতে তখন ঈসা (আ)-এর বয়স ছিল সাত বৎসর (বার্নাবাসের বাইবেল, প্রগুক্ত)।
ওয়াইব ইবন মুনাব্বিই-এর এক বর্ণনায় দেখা যায়, ঈসা (আ)-এর ১২ বছর বয়স হওয়া পর্যন্ত তিনি মিসরেই ছিলেন। অন্য বর্ণনায় দেখা যায়, তিনি সেখানে ১৩ বৎসরে পদার্পণ করিবার পর তাঁহাকে মিসর হইতে জেরুসালেমে ফিরিয়া আসিবার আদেশ দেয়া হয় (ইবন কাছীর, প্রাগুক্ত, page ৭০-৭২)।
আল্লামা হিফযুর রহমান সিউহারবী উল্লেখ করেন, হযরত মারয়াম (আ) শিশু ঈসা (আ)-কে লইয়া মিসরে তাঁহার কোন আত্মীয়ের কাছে চলিয়া যান এবং পরে সেখান হইতে নাসেরায় চলিয়া আসেন। ঈসা (আ) যখন তের বৎসরে পদার্পণ করিলেন তখন তিনি তাঁহাকে সাথে করিয়া পুনরায় বায়তুল মুকাদ্দাসে ফিরিয়া আসিলেন (সিওহারবী, কাসাসুল কুরআন, ৪খ, page ৪১)।
মথি ও বার্নাবাসের বাইবেল হযরত ঈসা (আ) ও তাঁহার মাতার মিসর হইতে ফিরিয়া আসার উপলক্ষ হিসাবে উল্লেখ করা হয় যে, হেরোদের মৃত্যুর পর একদা স্বপ্নযোগে মারয়ামের সাথী ইউসুফ আদিষ্ট হইলেন যে, তিনি যেন তাহাদেরকে লইয়া ইয়াহুদায় ফিরিয়া আসেন (বার্নাবাসের বাইবেল, page ৭; মথি, ২: ১৯-২০)। অন্য বর্ণনায় আছে যে, ঈসা (আ)-এর বয়স বার অতিবাহিত হওয়ার পর বায়তুল মুকাদ্দাসের শাসকের মৃত্যু হইলে হযরত যাকারিয়া (আ) হযরত মারয়ামকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। তখন হযরত মারয়াম (আ) তাঁহার সন্তানসহ বায়তুল মুকাদ্দাসে ফিরিয়া আসিলেন (ইসলামী বিশ্বকোষ, ইসলামিক ফাউণ্ডেশন, ঢাকা, বাংলাদেশ, ৫খ, page ৫০৫)।
উল্লেখ্য যে, খৃস্টানদের বাইবেলসহ মুসলিম ঐতিহাসিকদের অধিকাংশ কিতাবে বর্ণিত হয় যে, নবুওয়াত লাভ পর্যন্ত তিনি সেই নাসেরাত পল্লীতেই বসবাস করিয়াছিলেন এবং খৃস্টানদের কিছু কিছু উৎস ইংগিত করে যে, সেই নাসরাত হইতে তিনি মারয়াম এবং ইউসুফের সহিত বার্ষিক উৎসব বা ঈদুল ফেসাখ পালনের জন্য প্রতি বৎসর জেরুসালেমে আগমন করিতেন।
তাঁহার বয়স যখন বার বৎসর তখন জেরুসালেমে ঈদ উৎসবে অংশগ্রহণ শেষে ইবাদতখানার ইয়াহুদী আলেমদের সহিত আলোচনায় লিপ্ত হইয়াছিলেন বলিয়া উল্লেখ আছে। অবশেষে মারয়াম এক দিনের পথ চলিয়া যাওয়ার পর তাঁহাকে না পাইয়া আবার জেরুসালেমে ফিরিয়া আসিয়া ইবাদতখানায় ঈসা (আ)-কে পাইলেন। অতঃপর ঈসা (আ) তাহাদের সঙ্গে নাসেরাতে ফিরিয়া গেলেন এবং তাহাদের সাথেই রহিলেন (দ্র. লুক, ২: ৪১-৫১)। ইহা হইতে বুঝা যায়, নবুওয়াত লাভ পর্যন্ত সময়টুকু তিনি নaserাতেই কাটাইয়াছিলেন। সেইজন্য তাঁহাকে নাসরাতের ঈসা বলিয়া অভিহিত করা হইত (মথি, ২: ২৩)।
তবে কোন কোন বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, তিনি মিসর হইতে জেরুসালেমে ফিরিয়া আসেন এবং নবুওয়াত লাভ পর্যন্ত তিনি সেখানেই অবস্থান করিয়াছিলেন (ইবন কাছীর, ২খ, page ৭২)। তবে ইহা তৎকালীন প্রেক্ষাপট ও প্রসিদ্ধ বর্ণনার পরিপন্থী। কারণ মথি ও বার্নাবাসের বাইবেলের তথ্যে দেখা যায় যে, হেরোদ মুত্যুবরণ করিলেও তাহার পুত্র আকিলাস সেই পদে সমাসীন হন। তিনিও পিতার ন্যায় প্রতিহিংসাপরায়ণ জানিতে পারিল সেখানে বসবাস ভীতিপ্রদ বিবেচনায় ঈসা (আ)-কে ইয়াহূদীয়া প্রদেশের জেরুসালেম হইতে গালীল প্রদেশের নাসরাত জনপল্লীতে লইয়া যাওয়া হয় এবং তিনি সেখানেই বসবাস করেন (বার্নাবাসের বাইবেল, প্রাগুক্ত, ২: ২২-২৩)। অতএব তিনি দুইবার হিজরত করেন। একবার জেরুসালেম হইতে মিসরে, আবার জেরুসালেম হইতে নাসেরাতে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 তাওরাতের সত্যায়ন ও উহার শিক্ষা পুনর্জীবিত করা

📄 তাওরাতের সত্যায়ন ও উহার শিক্ষা পুনর্জীবিত করা


হযরত ঈসা (আ)-কে আল্লাহ তাওরাত ও ইনজীল শিক্ষা দিয়াছিলেন। হযরত ঈসা (আ) ছিলেন তাওরাতের সত্যায়নকারী। যেমন আল-কুরআনে বলা হইয়াছে:
وَمُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَى مِنَ التَّوْرَةِ . "আমি আসিয়াছি আমার সম্মুখে তাওরাতের যাহা আসিয়াছে উহার সমর্থকরূপে" (৩ঃ ৫০)।
ইহার অর্থ আমার পূর্বে যাহা ছিল আমি তাহার সমর্থক। শায়খ আলুসী বলেন যে, তাওরাতের সত্যায়ন অর্থ হইল উহাতে হিকমত ও সঠিক কথা যাহা আছে সবগুলি সম্পর্কে ঈমান আনা (আলুসী, প্রাগুক্ত, ৩খ, page ১৭১)।
মোটকথা, ঈসা (আ)-এর পয়গামের গোটা লক্ষ্যসমূহের মধ্যে ছিল তাওরাতের স্বীকৃতি দান, অস্বীকারকারীদের বিভিন্ন সন্দেহ নিরসন এবং বিভিন্ন বিকৃতির অপসারণ। তাওরাতকে সত্যায়নের অর্থ তাহাই (রাযী, প্রাগুক্ত, ৭খ, page ৬২)।
ঈসা (আ) কর্তৃক সত্যায়ন ও সমর্থনের বিষয়টি মথি সুসমাচারেও আসিয়াছে (৫: ১৭-১৮)। তিনি তাওরাতের শরীআত রহিত করিতে আসেন নাই, বরং তাহার তাসদীক ও পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে আসিয়াছেন। লুক সুসমাচারে আসিয়াছে, তুমি আজ্ঞা সকল জান, ব্যভিচার করিও না, নরহত্যা করিও না, চুরি করিও না, মিথ্যা সাক্ষ্য দিও না, তোমার পিতা-মাতাকে সমাদর করিও (লুক, ১৮: ১৯-২১)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ঈসা (আ)-এর শিক্ষালাভ

📄 ঈসা (আ)-এর শিক্ষালাভ


ঈসা (আ) ছিলেন আল্লাহর নবী। তাই তাঁহার মূল শিক্ষক ছিলেন স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। আল্লাহই তাঁহাকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের গভীর ব্যুৎপত্তি দান করিয়াছিলেন। আল-কুরাআনেও সরাসরি সেই শিক্ষা দেওয়ার নেয়ামত সম্পর্কে উল্লেখ আছে। বলা হইয়াছে-
"আল্লাহ বলিবেন, হে মারয়াম তনয় ঈসা! তোমার প্রতি ও তোমার জননীর প্রতি আমার অনুগ্রহ স্মরণ কর: পবিত্র আত্মা দ্বারা আমি তোমাকে শক্তিশালী করিয়াছিলাম এবং তুমি দোলনায় থাকা অবস্থায় ও পরিণত বয়সে মানুষের সাথে কথা বলিতে, তোমাকে কিতাব, হিকমত, তাওরাত ও ইনজীল শিক্ষা দিয়াছিলাম" (১৯:১১০)।
ঈসা (আ)-এর লালন-পালন ও শিক্ষার ব্যাপারে বাইবেলেও কিছু কিছু ইশারা পাওয়া যায়। "পরে বালকটি বাড়িয়া উঠিতে ও বলবান হইতে লাগিলেন, জ্ঞানে পূর্ণ হইতে থাকিলেন, আর ঈশ্বরের অনুগ্রহ তাহার উপর ছিল" (লুক, ২:৪০)। বার বৎসর বয়সে জেরুসালেমে যাত্রাশেষে যখন আবার তিনি নাসরাতে ফিরিয়া যান সেই অবস্থা সম্পর্কেও নিম্নরূপ বিবরণ রহিয়াছে: "পরে যীশু জ্ঞানে ও বয়সে এবং ঈশ্বরের ও মনুষ্যের নিকটে অনুগ্রহে বৃদ্ধি পাইতে থাকিলেন (লুক, ২ঃ ৫২; আরো দ্র. বার্নাবাসের বাইবেল, page ৭)।
মোটকথা, আল্লাহই তাঁহাকে ইলহাম ও ওহীর মাধ্যমে সব শিক্ষা দেন। প্রাচীন তাফসীর গ্রন্থসমূহেও এমন একাধিক বর্ণনা পাওয়া যায়, যাহাতে তাঁহার মাতা তাঁহাকে শিক্ষালয়ে ভর্তি করিয়া দেওয়ার একটি ধারণা সৃষ্টি হয়।
ইবন জারীর তাবারী স্বীয় তাফসীরে ইবন ইসহাকের সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলিয়াছেন, হযরত ঈসা (আ)-এর বয়স যখন নয় কি দশ তখন তাঁহার মাতা তাঁহাকে এক মকতবে ভর্তি করিয়া দিলেন। জনৈক শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে তিনি থাকিতেন। কিন্তু তাঁহাকে কোন কিছু শিখাইতে গেলে তিনি নিজেই তাহা বলিয়া দিতেন। শিক্ষক বলিতেন, আরে এই ছেলের কাণ্ড দেখিয়া তোমরা কি বিস্মিত হইতেছ না? আমি কিছু শিখাইতে গেলে দেখি উক্ত বিষয়ে সে আমার চাইতেও বেশী জানে (তাফসীরে তাবারী, ৫খ, page ৪০৩)। ইবন কাছীর বলেন, তাঁহার বয়স যখন ৭ বৎসর তখন তাঁহার মা তাঁহাকে মকতবে শিক্ষার জন্য পাঠান কিন্তু কোন বিষয় শিক্ষক বলিবার পূর্বেই তিনি তাহা বলিয়া দিতে শুরু করিতেন (প্রাগুক্ত, page ৭১)।
আলুসী এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন যে, ইহাই প্রমাণ করে যে, তাঁহার ইল্ম ছিল পুরাটিই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন প্রদত্ত (তাফসীর, ৩খ, page ১৬৭)। এইজন্য দেখা যায়, তাঁহার জন্ম সম্পর্কে তাঁহার মায়ের নিকট যখন সুসংবাদ দেওয়া হইয়াছিল তখন তাঁহাকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যাহা কিছু শিক্ষা দিবেন তাহার কথাও বলিয়া দেওয়া হইয়াছিল। যেমন আল্লাহ্র বাণী:
وَيُعَلِّمُهُ الْكِتَبَ والحِكْمَةَ وَالتَّوْرَة وَالْإِنْجِيلَ .
"এবং তিনি তাহাকে শিক্ষা দিবেন কিতাব, হিকমত, তাওরাত ও ইঞ্জীল" (৩ঃ৪৮)।
উপরিউক্ত আয়াতে কিতাব শিক্ষা দিবেন বলার সূত্র ধরিয়া মুফাসসিরীনে কিরাম বলেন যে, আল্লাহ পাক হযরত ঈসা (আ)-কে সুন্দর হাতের লিখা শিক্ষা দিয়াছিলেন (আলাউদ্দীন বাগদাদী, তাফসীরুল খাযিন, ১খ, page ২৫১; আরও দ্র. তাফসীরে মাযহারী, ২খ, page ২৯২)। ইবন জারীর তাবারী বলেন যে, তারপর তাঁহাকে কিতাব অর্থাৎ লিখন পদ্ধতি শিক্ষা দেন (তাফসীরে তাবারী, ৫খ, page ৩৯৬)। আর হিকমত শিক্ষার অর্থ হইল বিভিন্ন জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং শরীয়তের বিধানসমূহ শিক্ষা দেওয়া (তাফসীরুল খাযিন, প্রাগুক্ত)।
বর্ণিত আছে যে, তিনি রঞ্জন বিদ্যাও অর্জন করিয়াছিলেন। তাঁহার মা এক রঙ কারকের (সাব্বাগ) নিকট তাঁহাকে প্রেরণ করিয়াছিলেন যেন তাঁহাকে এই বিষয়ে শিক্ষা দেন। অথচ ঐ সাব্বাগ যখন তাহাকে কিছু শিক্ষা দিতেন তখন মনে হইত যেন ঈসা (আ)-ই তাহার চাইতে বেশী জানেন। একদা ঐ সাব্বাগ কোন এক কাজে কোথাও চলিয়া গেলেন এবং বলিয়া গেলেন, এখানে বিভিন্ন প্রকারের কাপড় আছে এবং প্রত্যেকটিতে চিহ্ন দেওয়া আছে, এইগুলিকে ঐসকল রঙ দ্বারা রঞ্জিত কর। অতঃপর ঈসা (আ) এক ধরনের দানা জ্বালাইলেন এবং তাহাতে সব কাপড় রাখিয়া দিলেন আর বলিলেন, আমি যেরূপ ইচ্ছা করি আল্লাহ্র নির্দেশে সেরূপ হইয়া যাও। অনন্তর সেই সাব্বাগ ফিরিয়া আসিল। আর ঈসা (আ) যাহা করিয়াছিলেন সেই ব্যাপারে তাহাকে অবহিত করিলেন।
তখন সে বলিল, তুমি তো সব কাপড় নষ্ট করিয়া দিয়াছ। ঈসা (আ) বলিলেন, যান, অতঃপর দেখুন। অনন্তর সেই ব্যক্তি কাপড় বাহির করা শুরু করিল যাহা একটি তাহার চাহিদামত ছিল লাল, অন্যটি সবুজ, আরেকটি হলুদ। অতঃপর উপস্থিত সকলেই তাহা দেখিয়া আশ্চর্য হইল (আলুসী, প্রাগুক্ত, ৩খ, page ১৭৬)।
Encyclopaedia Britannica-এর বর্ণনামতে ঈসা (আ) কৃষিজীবি মানুষের মধ্যে বসবাস করিতেন (Vol. 13, page 15)। তাই সম্ভবত তিনি কৃষি বিদ্যাতেও পারদর্শী হইয়া উঠিয়াছিলেন।
Encyclopedia Americana মন্তব্য করে যে, ঈসা গালিলীতে বাস করার কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও পর্যটন পথের সংস্পর্শে ছিলেন, যেখান হইতে ব্যবসায়ীরা মিসর ও উত্তর আফ্রিকা, ব্যাবিলন, ভারতবর্ষ, স্পেন ইত্যাদি এলাকার লোকজনের আসা-যাওয়া ছিল। তাহা ছাড়া গালিল ছিল ইয়াহুদী, অ-ইয়াহুদী, পৌত্তলিক, ধনী, গরীব, বিভিন্ন ধরনের লোকের বাসস্থল। তাই গরীব ও নিম্ন শ্রেণীর লোকদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করা তাঁহার বৈশিষ্ট্য ছিল (vol. 16, page 42)।
মোটকথা, তাঁহার নবুওয়ত-পূর্ব জীবন সম্পর্কে সঠিক তথ্য কমই জানা যায়। ইবন কাছীর (র) ইসহাক ইবন বিশর-এর সূত্রে আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলিয়াছেন, ঈসা (আ) সেই শিশুকালে যখন কথা বলিতে শুরু করেন তখন প্রথমেই আল্লাহ্র প্রশংসামূলক স্তুতি এমনভাবে করিতে শুরু করিয়াছিলেন যাহা মানুষ কখনও শুনে নাই। তিনি সূর্য, চন্দ্র, পাহাড়, নদী, ঝরনা এই ধরনের কোন কিছুকেই ডাকেন নাই বা তাহাদের কাছে প্রার্থনা করেন নাই, বরং একমাত্র আল্লাহরই মাহাত্ম্য ঘোষণা করিয়াছেন। ইবন কাছীর এই সূত্রে হযরত ঈসা (আ)-এর এক দীর্ঘ দু'আর উল্লেখ করিয়াছেন (দ্র. প্রাগুক্ত)। মোটকথা, বার বৎসর হইতে উনত্রিশ বৎসর বয়স পর্যন্ত ঈসা (আ) কিভাবে অতিবাহিত করেন, কোথায় ছিলেন, বাইবেলগুলি এই ব্যাপারে নীরব ভূমিকা পালন করে। আল-কুরআন ও হাদীছে এই ব্যাপারে বিস্তারিত ও সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য পাওয়া যায় না। আল্লাহই অধিক জ্ঞাত।

ঈসা (আ) ছিলেন আল্লাহর নবী। তাই তাঁহার মূল শিক্ষক ছিলেন স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। আল্লাহই তাঁহাকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের গভীর ব্যুৎপত্তি দান করিয়াছিলেন। আল-কুরাআনেও সরাসরি সেই শিক্ষা দেওয়ার নেয়ামত সম্পর্কে উল্লেখ আছে। বলা হইয়াছে-
"আল্লাহ বলিবেন, হে মারয়াম তনয় ঈসা! তোমার প্রতি ও তোমার জননীর প্রতি আমার অনুগ্রহ স্মরণ কর: পবিত্র আত্মা দ্বারা আমি তোমাকে শক্তিশালী করিয়াছিলাম এবং তুমি দোলনায় থাকা অবস্থায় ও পরিণত বয়সে মানুষের সাথে কথা বলিতে, তোমাকে কিতাব, হিকমত, তাওরাত ও ইনজীল শিক্ষা দিয়াছিলাম" (১৯:১১০)।
ঈসা (আ)-এর লালন-পালন ও শিক্ষার ব্যাপারে বাইবেলেও কিছু কিছু ইশারা পাওয়া যায়। "পরে বালকটি বাড়িয়া উঠিতে ও বলবান হইতে লাগিলেন, জ্ঞানে পূর্ণ হইতে থাকিলেন, আর ঈশ্বরের অনুগ্রহ তাহার উপর ছিল" (লুক, ২:৪০)। বার বৎসর বয়সে জেরুসালেমে যাত্রাশেষে যখন আবার তিনি নাসরাতে ফিরিয়া যান সেই অবস্থা সম্পর্কেও নিম্নরূপ বিবরণ রহিয়াছে: "পরে যীশু জ্ঞানে ও বয়সে এবং ঈশ্বরের ও মনুষ্যের নিকটে অনুগ্রহে বৃদ্ধি পাইতে থাকিলেন (লুক, ২ঃ ৫২; আরো দ্র. বার্নাবাসের বাইবেল, page ৭)।
মোটকথা, আল্লাহই তাঁহাকে ইলহাম ও ওহীর মাধ্যমে সব শিক্ষা দেন। প্রাচীন তাফসীর গ্রন্থসমূহেও এমন একাধিক বর্ণনা পাওয়া যায়, যাহাতে তাঁহার মাতা তাঁহাকে শিক্ষালয়ে ভর্তি করিয়া দেওয়ার একটি ধারণা সৃষ্টি হয়।
ইবন জারীর তাবারী স্বীয় তাফসীরে ইবন ইসহাকের সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলিয়াছেন, হযরত ঈসা (আ)-এর বয়স যখন নয় কি দশ তখন তাঁহার মাতা তাঁহাকে এক মকতবে ভর্তি করিয়া দিলেন। জনৈক শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে তিনি থাকিতেন। কিন্তু তাঁহাকে কোন কিছু শিখাইতে গেলে তিনি নিজেই তাহা বলিয়া দিতেন। শিক্ষক বলিতেন, আরে এই ছেলের কাণ্ড দেখিয়া তোমরা কি বিস্মিত হইতেছ না? আমি কিছু শিখাইতে গেলে দেখি উক্ত বিষয়ে সে আমার চাইতেও বেশী জানে (তাফসীরে তাবারী, ৫খ, page ৪০৩)। ইবন কাছীর বলেন, তাঁহার বয়স যখন ৭ বৎসর তখন তাঁহার মা তাঁহাকে মকতবে শিক্ষার জন্য পাঠান কিন্তু কোন বিষয় শিক্ষক বলিবার পূর্বেই তিনি তাহা বলিয়া দিতে শুরু করিতেন (প্রাগুক্ত, page ৭১)।
আলুসী এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন যে, ইহাই প্রমাণ করে যে, তাঁহার ইল্ম ছিল পুরাটিই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন প্রদত্ত (তাফসীর, ৩খ, page ১৬৭)। এইজন্য দেখা যায়, তাঁহার জন্ম সম্পর্কে তাঁহার মায়ের নিকট যখন সুসংবাদ দেওয়া হইয়াছিল তখন তাঁহাকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যাহা কিছু শিক্ষা দিবেন তাহার কথাও বলিয়া দেওয়া হইয়াছিল। যেমন আল্লাহ্র বাণী:
وَيُعَلِّمُهُ الْكِتَبَ والحِكْمَةَ وَالتَّوْرَة وَالْإِنْجِيلَ .
"এবং তিনি তাহাকে শিক্ষা দিবেন কিতাব, হিকমত, তাওরাত ও ইঞ্জীল" (৩ঃ৪৮)।
উপরিউক্ত আয়াতে কিতাব শিক্ষা দিবেন বলার সূত্র ধরিয়া মুফাসসিরীনে কিরাম বলেন যে, আল্লাহ পাক হযরত ঈসা (আ)-কে সুন্দর হাতের লিখা শিক্ষা দিয়াছিলেন (আলাউদ্দীন বাগদাদী, তাফসীরুল খাযিন, ১খ, page ২৫১; আরও দ্র. তাফসীরে মাযহারী, ২খ, page ২৯২)। ইবন জারীর তাবারী বলেন যে, তারপর তাঁহাকে কিতাব অর্থাৎ লিখন পদ্ধতি শিক্ষা দেন (তাফসীরে তাবারী, ৫খ, page ৩৯৬)। আর হিকমত শিক্ষার অর্থ হইল বিভিন্ন জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং শরীয়তের বিধানসমূহ শিক্ষা দেওয়া (তাফসীরুল খাযিন, প্রাগুক্ত)।
বর্ণিত আছে যে, তিনি রঞ্জন বিদ্যাও অর্জন করিয়াছিলেন। তাঁহার মা এক রঙ কারকের (সাব্বাগ) নিকট তাঁহাকে প্রেরণ করিয়াছিলেন যেন তাঁহাকে এই বিষয়ে শিক্ষা দেন। অথচ ঐ সাব্বাগ যখন তাহাকে কিছু শিক্ষা দিতেন তখন মনে হইত যেন ঈসা (আ)-ই তাহার চাইতে বেশী জানেন। একদা ঐ সাব্বাগ কোন এক কাজে কোথাও চলিয়া গেলেন এবং বলিয়া গেলেন, এখানে বিভিন্ন প্রকারের কাপড় আছে এবং প্রত্যেকটিতে চিহ্ন দেওয়া আছে, এইগুলিকে ঐসকল রঙ দ্বারা রঞ্জিত কর। অতঃপর ঈসা (আ) এক ধরনের দানা জ্বালাইলেন এবং তাহাতে সব কাপড় রাখিয়া দিলেন আর বলিলেন, আমি যেরূপ ইচ্ছা করি আল্লাহ্র নির্দেশে সেরূপ হইয়া যাও। অনন্তর সেই সাব্বাগ ফিরিয়া আসিল। আর ঈসা (আ) যাহা করিয়াছিলেন সেই ব্যাপারে তাহাকে অবহিত করিলেন।
তখন সে বলিল, তুমি তো সব কাপড় নষ্ট করিয়া দিয়াছ। ঈসা (আ) বলিলেন, যান, অতঃপর দেখুন। অনন্তর সেই ব্যক্তি কাপড় বাহির করা শুরু করিল যাহা একটি তাহার চাহিদামত ছিল লাল, অন্যটি সবুজ, আরেকটি হলুদ। অতঃপর উপস্থিত সকলেই তাহা দেখিয়া আশ্চর্য হইল (আলুসী, প্রাগুক্ত, ৩খ, page ১৭৬)।
Encyclopaedia Britannica-এর বর্ণনামতে ঈসা (আ) কৃষিজীবি মানুষের মধ্যে বসবাস করিতেন (Vol. 13, page 15)। তাই সম্ভবত তিনি কৃষি বিদ্যাতেও পারদর্শী হইয়া উঠিয়াছিলেন।
Encyclopedia Americana মন্তব্য করে যে, ঈসা গালিলীতে বাস করার কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও পর্যটন পথের সংস্পর্শে ছিলেন, যেখান হইতে ব্যবসায়ীরা মিসর ও উত্তর আফ্রিকা, ব্যাবিলন, ভারতবর্ষ, স্পেন ইত্যাদি এলাকার লোকজনের আসা-যাওয়া ছিল। তাহা ছাড়া গালিল ছিল ইয়াহুদী, অ-ইয়াহুদী, পৌত্তলিক, ধনী, গরীব, বিভিন্ন ধরনের লোকের বাসস্থল। তাই গরীব ও নিম্ন শ্রেণীর লোকদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করা তাঁহার বৈশিষ্ট্য ছিল (vol. 16, page 42)।
মোটকথা, তাঁহার নবুওয়ত-পূর্ব জীবন সম্পর্কে সঠিক তথ্য কমই জানা যায়। ইবন কাছীর (র) ইসহাক ইবন বিশর-এর সূত্রে আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলিয়াছেন, ঈসা (আ) সেই শিশুকালে যখন কথা বলিতে শুরু করেন তখন প্রথমেই আল্লাহ্র প্রশংসামূলক স্তুতি এমনভাবে করিতে শুরু করিয়াছিলেন যাহা মানুষ কখনও শুনে নাই। তিনি সূর্য, চন্দ্র, পাহাড়, নদী, ঝরনা এই ধরনের কোন কিছুকেই ডাকেন নাই বা তাহাদের কাছে প্রার্থনা করেন নাই, বরং একমাত্র আল্লাহরই মাহাত্ম্য ঘোষণা করিয়াছেন। ইবন কাছীর এই সূত্রে হযরত ঈসা (আ)-এর এক দীর্ঘ দু'আর উল্লেখ করিয়াছেন (দ্র. প্রাগুক্ত)। মোটকথা, বার বৎসর হইতে উনত্রিশ বৎসর বয়স পর্যন্ত ঈসা (আ) কিভাবে অতিবাহিত করেন, কোথায় ছিলেন, বাইবেলগুলি এই ব্যাপারে নীরব ভূমিকা পালন করে। আল-কুরআন ও হাদীছে এই ব্যাপারে বিস্তারিত ও সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য পাওয়া যায় না। আল্লাহই অধিক জ্ঞাত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00