📄 ঈসা (আ)-এর জন্মলগ্নে সংঘটিত অলৌকিক ঘটনাবলী
বিশ্বে প্রতিটি মহামানব যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন প্রাকৃতিক পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতার উপর উহার অলৌকিক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়-এবং ঘটনা ঘটে। আল্লাহ্র রাসূল হযরত ঈসা (আ)-এরে জন্মলগ্নেও সেই ধরনের কিছু কিছু ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা ঘটে।
তাবারী আবূ হুরায়রা (রা) সূত্রে রাসূলুল্লাহ (সা) হইতে বর্ণনা করেন। তিনি বলিয়াছেন, বনী আদমের যে কোন সন্তান ভূমিষ্ট হইবার সাথে সাথে শয়তান তাহাকে স্পর্শ করে। এই স্পর্শের কারণে সে চীৎকার দিয়া উঠে। তবে মারয়াম (র) ও তাঁহার সন্তানের বিষয়টি ভিন্নরূপ। এরপর আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, হে শ্রোতাবৃন্দ! এই প্রসঙ্গে অত্র আয়াতটি পাঠ করা যায়।
وَإِنِّي أُعِيذُهَا بِكَ وَذُرِّيَّتَهَا مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّحِيمِ .
"আর আমি অভিশপ্ত শয়তান হইতে তাহার ও তাহার বংশধরদের জন্য তোমার শরণ লইতেছি" (সূরা আল ইমরান, ৩৬; দ্র. প্রাগুক্ত, page ৩৪৯)।
অপরদিকে বাইবেলেও ঈসা (আ)-এর জন্মলগ্নের কিছু অলৌকিক ঘটনার কথা বর্ণিত হইয়াছে (দ্র. বার্ণাবাসের বাইবেল, page ৪)।
এমনিভাবে বাইবেলীয় গ্রন্থাদিতে বর্ণিত আছে, হযরত ঈসা (আ)-এর জন্মের পর পারস্যের জ্যোতিষীরাও আসমানের তারকায় এক অস্বাভাবিক প্রভাব লক্ষ্য করিয়া ধারণা করিয়াছিল যে, নিশ্চয়ই আজ কোন মহামানবের জন্ম হইয়াছে। তাহাদের একটি দল আসমানে নক্ষত্রের তাৎপর্যময় গতিবিধি বিস্ময়ের সাথে পর্যবেক্ষণ করিতেছিলেন। উহাতে হঠাৎ একটি মহা উজ্জ্বল তারকার উদগতি তাহাদের দৃষ্টি এড়ায় নাই। নিজেদের মধ্যে এই আলামতের তাৎপর্য সম্পর্কে আলোচনা করিয়া তাহারা আসিয়া ইয়াহুদায় উপস্থিত হইলেন। জেরুসালেমে প্রবেশ করিয়া ইয়াহুদীদের নবজাত রাজার অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন। রাজা হেরোদ এই সংবাদ পাইয়া ভীত হইলেন। জ্যোতিষীদের আহবান করিয়া হেরোদ জানিতে চাহিলেন, আপনারা বলুন তো মসীহর জন্ম কোথায়? তাঁহার জন্ম বায়তুল লাহমেই হওয়া উচিত বলিয়া তাহারা অভিমত প্রকাশ করিলেন। হেরোদ বলিলেন, আপনারা তবে বায়তুল লাহমে যান। সেই শিশুকে আবিষ্কার করুন। 'যদি আপনারা তাঁহার সন্ধান পান তবে ফিরতি আসিয়া আমাকেও তাহা অবগত করাইবেন। কেননা আমিও তাঁহাকে তসলীম জানাইতে ইচ্ছা পোষণ করি। অবশ্য শেষ কথাটি তিনি ছলনা করিয়াই বলিলেন। অতএব পারসিক পণ্ডিতগণ জেরুসালেম হইতে প্রস্থান করিলেন। আর যেই তারকাটি প্রাচ্য দেশে তাহাদের গোচরীভূত হইয়াছিল সেইটি এখন তাহাদের সামনে বিচরণশীল হইল। পারসিক পণ্ডিতগণ তারকাটি অবলোকন করিয়া অসীম পুলক লাভ করিলেন। বায়তুল লাহমের শরতলীতে আসিয়া তারাটি যেন সোজা দাঁড়াইল সেই ছাউনির উপর যেখানে ঈসা (আ) জন্ম নিয়াছিলেন। অতএব পারসিক পণ্ডিতগণ সেখানে প্রবেশ করিলেন এবং মাতা পুত্রকে দেখিতে পাইয়া তাহারা নবজাতককে আদার আরয করিলেন। পারসিক পণ্ডিতগণ কুমারী মাতাকে তাহাদের আগমনের কারণ জানাইয়া সোনা-রূপাসহ মাল-মসলাপাতি নজরানারূপে পেশ করিলেন। তখন নিদ্রিত অবস্থায় হেরোদের কাছে ফিরিয়া না যাইবার জন্য তাহারা নবজাতকের হুঁশিয়ারী লাভ করিলেন। ফলে ভিন্ন পথ দিয়া তাহারা স্বদেশের পথ ধরিলেন (বার্ণাবাসের বাইবেল, ৫-৭)। ঐ ধরনের একটি বর্ণনা মথি সুসমাচারেও পাওয়া যায় (২ঃ ১-১২)।
এইভাবে আরও অনেক ঘটনা বর্ণিত আছে। কিন্তু বর্ণনাসূত্রের ধারাবাহিকতা না থাকায় ঐগুলি সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যায় না। তবে বিভিন্ন সূত্রে উপরিউক্ত ঘটনাগুলি বর্ণিত হওয়ায় সেইগুলির বাস্তবতাকে উড়াইয়া দেওয়া যায় না। মহান নবী ঈসা (আ)-এর জন্মলগ্নে তাহা ঘটিতেই পারে। প্রকৃত অবস্থা একমাত্র আল্লাহই অধিক জ্ঞাত।
📄 হযরত ঈসা (আ)-এর দাওয়াতী কার্যক্রমের সূচনা
হযরত ঈসা (আ) ওহীর মাধ্যমে যখন ইনজীল লাভ করিলেন, তখন তাহা বনী ইসরাঈলের মধ্যে প্রচার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। কিন্তু কখন, কিভাবে, কোথা হইতে তাঁহার দাওয়াতী কার্যক্রম সূচনা করিয়াছিলেন, তাহা সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় নাই। প্রচলিত সুসমাচারসমূহে এই সম্পর্কে বিভিন্ন রকম বর্ণনা পাওয়া যায়।
মথি সুসমাচারের বর্ণনায় জানা যায় যে, হযরত ইয়াহইয়া (আ) যত দিন সর্বসাধারণের মধ্যে দাওয়াতী কার্যক্রম চালাইয়া যাইতেছিলেন ততদিন হযরত ঈসা (আ) নীরব থাকেন। কিন্তু ইতোমধ্যে হযরত ইয়াহইয়া (আ) গ্রেফতার হইয়া জেলখানায় বন্দী হইয়া যান। হযরত ঈসা (আ) তাহা জানিতে পারিয়া গালীলে চলিয়া যান এবং স্বীয় নাসরত গ্রাম ছাড়িয়া সবূলুন ও নপ্তালি এলাকার মধ্যে মগের পাড়ের কফরনাহুর শহরে তাঁহার প্রচার কার্যক্রমের সূচনা করিয়া ঘোষণা করিলেন : "মন ফিরাও, কেননা স্বর্গরাজ্য সন্নিকট হইল" (মথি, ৪:১৭)।
অর্থাৎ “তওবা কর, কেননা আসমানী বাদশাহী সন্নিকটে আসিয়াছে"। অতঃপর ঈসা (আ) গালীল শহরের তীরবর্তী এলাকায় দাওয়াতী কাজ করিতে লাগিলেন এবং সাগরে মাছ ধরা অবস্থায় সিবাদিয়ের দুই পুত্র ইয়া'কুব ও ইউহান্নাকে তাহার দাওয়াতের প্রতি আকৃষ্ট করিতে সক্ষম হন। অবশ্যই তাহারা দুইজন ঈসা (আ)-এর সাথী হইয়া যান। অতঃপর ঈসা (আ) তাহার সাথীদ্বয়কে লইয়া গালীল প্রদেশের সমস্ত জায়গায় ঘুরিয়া ঘুরিয়া ইয়াহুদীদের ভিন্ন ভিন্ন মজলিসখানায় শিক্ষা দিতে লাগিলেন। ইহা ছাড়া তিনি বেহেশতী রাজ্যের সুখবর প্রচার করিতে এবং লোকদের সমস্ত রকম রোগ ভাল করিতে লাগিলেন। সমস্ত সিরিয়া প্রদেশে তাঁহার কথা ছড়াইয়া পড়িল। যে সমস্ত লোক নানা রকম রোগে ও ভীষণ যন্ত্রণায় কষ্ট পাইতেছিল, যাহাদের ভূতে ধরিয়াছিল এবং যাহারা মৃগী ও পক্ষাঘাত রোগে ভুগিতেছিল, লোকেরা তাহাদিগকে ঈসা (আ)-এর নিকট আনিল। তিনি তাহাদের সকলকে সুস্থ করিলেন। গালীল, দিকাপালি, জেরুসালেম এহুদিয়া এবং জর্ডানের অন্য পার হইতে অনেক লোক ঈসার পিছনে চলিল (মথি, ৪:২৩-২৫; আরও দ্র. মার্ক, ১:১৪)।
লুক সুসমাচারের বর্ণনা অনুযায়ি প্রায় ৩০ বৎসর বয়সে ঈসা (আ) তাঁহার কার্য আরম্ভ করেন (লুক ৩:২৩)। যোহন সুসমাচারে আরও বলা হইয়াছে, দিবসে ঈসা (আ) প্রকাশ্য কার্যের আরম্ভ করিলেন। আর তাহা ছিল কান্না নগরে এক বিবাহ অনুষ্ঠানে, যেখানে তিনি পানিকে দ্রাক্ষারসে পরিণত করেন। সেই অনুষ্ঠানে তাঁহার মা জননী মারয়ামের সঙ্গেও সাক্ষাত হয়। এইভাবে কিছু দিন পর ইয়াহুদীদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান সন্নিকটে হইলে ঈসা জেরুসালেমে চলিয়া যান। অতঃপর তিনি ইবাদতখানায় দেখিতে পাইলেন যে, লোকেরা ইবাদতখানার মধ্যে গরু, ভেড়া আর কবুতর বিক্রী করিতেছে এবং টাকা বদল করিয়া দিবার লোকেরাও বসিয়া আছে। এই সমস্ত দেখিয়া তিনি দড়ি দিয়া একটা চাবুক তৈরী করিলেন আর তাহা দিয়া সমস্ত গরু, ভেড়া এবং লোকদেরও সেই জায়গা হইতে তাড়াইয়া দিলেন। টাকা বদল করিয়া দিবার লোকদের টাকা-পয়সা ছড়াইয়া দিয়া তিনি তাহাদের টেবিলগুলি উল্টাইয়া ফেলিলেন (যোহন ২: ১-১৫)। উপরিউক্ত বর্ণনায় দেখা যায় যে, ঈসা (আ) তাঁহার প্রকাশ্যে দাওয়াতী কাজের সূচনা করিয়াছিলেন গালীল প্রদেশে। মথির বর্ণনামতে, তাহা শুরু করেন তিনি কফরনাতুন শহরে এবং পরবর্তীতে গালীল সাগরের পাড়ে।
যোহন সুসমাচারের মতে বেথানিয়া গ্রামে তাঁহার সঙ্গী-সাথী গ্রহণ কাজের সূচনা করেন এবং কান্না গ্রামের বিবাহভোজ অনুষ্ঠান হইতেই প্রকাশ্য প্রচারকার্য শুরু করেন এবং পরবর্তীতে তিনি জেরুসালেমে বায়তুল মুকাদ্দাসে গমন করেন। বার্ণাবাসের বাইবেলে আছে যে, ফেরেশতা জিবরাঈল কর্তৃক ইনজীল কিতাব লাভের পর ঈসা (আ) তাঁহার মাতাকে সবকিছু অবগত করিয়া তাঁহার খেদমত হইতে অব্যাহতি চাহিলেন। মারয়াম এই সকল কথা শুনিয়া বলিলেন, "পুত্র! তোমার জন্মের আগেই আমাকে এই সকল বলা হইয়াছে। নুবুওয়াতের কাজে যোগদানের উদ্দেশ্যে জন্মদাত্রীর খেদমত হইতে পূর্ব দিন হইতে তিনি বিদায় গ্রহণ করিলেন। আর জেরুসালেমে প্রবেশ করিলেন। জেরুসালেমের প্রবেশপথে একজন কুষ্ঠ ব্যধিগ্রস্ত ব্যক্তির সাক্ষাত পাইলেন। সে ঈসার নিকট আবেদন করিল যেন তিনি তাহার রোগমুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে দু'আ করেন। অবশেষে ঈসা (আ)-এর দু'আর বরকতে যখন ঐ লোকটি রোগমুক্তি লাভ করিল তখন আনন্দে আত্মহারা হইয়া চিৎকার করিতে শুরু করিল যে, তোমরা আসিয়া দেখ, ইনি আল্লাহর নবী। আর তখন তাঁহাকে ঘিরিয়া লোকজন একত্র হইতে শুরু করে। এই কথা জেরুসালেম শহরে প্রচারিত হওয়ার পর এমনভাবে লোকের সমাগম হয় যে, মসজিদ প্রাঙ্গণে তিল ধারণের ঠাই পর্যন্ত রহিল না। কর্তব্যরত খাদেমগণ হযরত ঈসার নিকট আরয করিলেন, জনাব! সমবেত জনতা আপনাকে দেখিতে চায়। আপনার কথা শুনিতে চায়। ঐ মিনারায় আরোহণ করিয়া তাহাদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন। ঈসা (আ) তখন সেই মিনারায় দাঁড়াইয়া জনতার উদ্দেশ্যে ওয়াজ করিলেন। সেই ওয়াজে আল্লাহর অনন্ত মহিমা বর্ণনা, প্রথম মানব আদম (আ)-কে শয়তানের প্ররোচনা, তৎপরবর্তীতে হাবিল-কাবিলের ঘটনা, মহাপ্লাবন ও লোহিত সাগরে ফেরাউনকে ডুবাইয়া ধ্বংস করা ইত্যাদি বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনারও উদ্ধৃতি দিয়েছেন এবং ইবরাহীম (আ) ও তাঁহার সন্তানদের প্রতি সনাতন ওয়াদা ও মূসা (আ)-এর মাধ্যমে পবিত্র শরীআত জারী করার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। সাথে সাথে আল্লাহর বাণী ভুলিয়া যাওয়া এবং মিথ্যা অহমিকায় মত্ত হওয়ার ব্যাপারে জনতাকে সতর্ক করেন এবং ইয়াহুদী রিববীদেরও সমালোচনা করেন। অবশেষে জনতা পাপ মোচনের জন্য দু'আ করিতে ঈসার নিকট আবেদন জানাইল। কিন্তু রিববী ও ধর্মীয় নেতারা নিজেদের প্রতি নিন্দা, তিরস্কার ও ধিককারের কারণে ঈসা (আ)-এর প্রতি মনে মনে বিদ্বিষ্ট হইয়া উঠিল। এমনকি উপস্থিত রিববী, কাতিব ও ধর্মবেত্তারা ঈসার মৃত্যুদণ্ড দাবি করে।
📄 হযরত ঈসা (আ)-এর নামকরণ ও উপাধি
আল-কুরআনের ভাষ্য দ্বারা বুঝা যায় যে, ঈসা মাসীহ বা মসীহ ঈসা নামকরণটি আল্লাহ্র পক্ষ হইতেই স্থিরীকৃত হইয়াছে এবং তাহা ঈসা (আ)-এর জন্মের পূর্বেই। ফেরেশতা আসিয়া যখন মারয়াম (আ)-এর কাছে ঈসা (আ)-এর জন্ম সম্পর্কে শুভ সংবাদ দিতেছিলেন তখন ফেরেশতা বলিয়াছিলেন যে, তাঁহার নাম হইবে মাসীহ ঈসা ইবন মারয়াম (দ্র. ৩ঃ৪৫)।
অবশ্য মথি সুসমাচারে আসিয়াছে যে, মারয়াম অলৌকিকভাবে গর্ভধারণের পর তাঁহার সাথী ইউসুফের নিকট স্বপ্নে ফেরেশতা দেখা দিয়া তাহাকে আদেশ করেন, "তুমি তাহার নাম যীশু রাখিবে" (মথি সুসমাচার, ১: ২১)। পরবর্তীতে ইউসুফ তাঁহার নাম যীশুই রাখিলেন (প্রাগুক্ত, ১৪ ২৫)। অপরদিকে লুক সুসমাচারে বলা হইয়াছে যে, জিবরাঈল ফেরেস্তা মারয়াম (আ)-কে আদেশ করিলেন যে, তাহার গর্ভের পুত্রের নাম যীশু রাখিবে (লুক সুসমাচার, ২৬: ৩২)।
তাঁহার প্রসিদ্ধ নাম ঈসা। মাসীহ তাঁহার উপাধি, ইব্ন মারয়াম তাঁহার ডাকনাম। কুনিয়াতগুলির মধ্যে কোথাও তাঁহাকে মাসীহ, কোথাও তাঁহাকে মাসীহ ইব্ন মারয়াম, কোথাও মাসীহ ঈসা ইবন মারয়াম, কোথাও শুধু ইব্ন মারয়াম। ইতিপূর্বে ইহার একটি তালিকা দেওয়া হইয়াছে।
ঈসা শব্দটি আরবী। হিব্রুতে যিহোশূয় (Jehoshuah) অথবা যশূয়া (Joshua) আরবীতে উচ্চারণে ইহা ইয়াশু বা ইয়াশূ। ইহার অর্থ ত্রাণকর্তা, সায়্যিদ বা সরদার, নেতা ইত্যাদি। Encyclopedia Americana-এর বর্ণনামতে ঈসা (আ)-এর সমসাময়িক কালে প্রায় ১৯ জন ব্যক্তির নাম ছিল ঈসা (vol.16, page 41)। গ্রীক ভাষায় বলা হয় জেসাস (Jesus,) যাহাকে ইংরেজী ও বাংলা সংস্করণে যীশু বলা হয়। মাসীহ শব্দটি হিব্রু মাশীয়াখ (Mashyach) বা মাসীয়াহ (Mesiah)-এর আরবী রূপ।
গ্রীক ভাষায় তাঁহাকে বলা হয় খৃস্ট (Christ)। মাসীহ শব্দটি উৎপত্তিমূলে আরবী বা হিব্রু ইহা লইয়া প্রচুর মতভেদ আছে। আল্লামা কুরতুবীর মতে, ইহা মূলত অনারব শব্দ যাহা আরবীতে প্রচলিত। ইন ফারিস-এর মতে মাসীহ সিদ্দীক বা মসৃণ মুদ্রা (কুরতুবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, page ৮৮)। আরবীতে মাসাহা শব্দটির অর্থ লেপন করা, স্পর্শ করা, পরিভ্রমণ করা ইত্যাদি। কিন্তু ঈসা (আ)-এর কেন মাসীহ নামকরণ করা হইল এই সম্পর্কেও বিভিন্ন বিশ্লেষণ পাওয়া যায়, এমনকি ইব্ন আব্বাস (রা) থেকেই একাধিক মত বর্ণিত আছে। নিম্নে কয়েকটি মতামত পেশ করা গেল:
১১. যেহেতু ঈসা (আ) কোন 'রোগাক্রান্ত ব্যক্তিকে স্পর্শ করিলেই সেই ব্যক্তি রোগমুক্ত হইত সেইজন্য ঈসা (আ)-কে মাসীহ বলা হয়।
২. কাহারও মতে তিনি পরিভ্রমণ করিয়া বেড়াইতেন। আর এই পরিভ্রমণ হইতেই তাঁহার নামকরণ হয় মাসীহ (দ্র. ফীরোযাবাদী, তানবীরুল মিয়াস মিন তাফসীরি ইব্ন আব্বাস, page ৬১)।
৩. কাহারও মতে ঈসা (আ)-এর পায়ের পাতা সমান ছিল, তাই তাঁহাকে মাসীহ বলা হইত। 'আতা (র)-এর সূত্রে ইহা ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত (ইবনুল জাওযী, প্রাগুক্ত, ১খ., page ৩২৯)।
৪. কাহারও মতে তাঁহার শরীরে বরকতময় তৈল দ্বারা লেপন করা ছিল, যাহা ছিল খুবই সুগন্ধিযুক্ত।
৫. কাহারও মতে জিবরাঈল (আ) তাঁহাকে স্বীয় পাখা দ্বারা স্পর্শ করার কারণে তাঁহার উপাধি হয় মাসীহ (আবু হায়্যান, আল-বাহরুল মুহীত, ৩খ, page ১৫২)।
৬. ইব্ন আব্বাস (রা), ইব্ন জুবায়র প্রমুখের মতে মাসীহ অর্থ রাজা (ফীরোযাবাদী, প্রাগুক্ত, আবু হায়্যান, প্রাগুক্ত, page ১৫৩)।
ইব্ন আব্বাস উল্লেখ করেন, বর্ণিত আছে যে, বনী ইসরাঈলের রাজা শৌলের সময় হইতে রাজাকে মাসীহুর রব (সদাপ্রভু অভিষিক্ত) বলা হইত। যেমন ওল্ড টেস্টামেন্টে (২ শমূয়েল, ১: ১৪) আসিয়াছে, হযরত দাউদ (আ) শৌল রাজাকে মাসীহর রব বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন (ইব্ন আশূর, তাফসীরুত্ তাহরীর ওয়াত্-তানবীর, ৩খ, page ২৪৬)। আর এই রাজাদেরকে শুই উপাধি প্রদানের ধারা বনু ইসরাঈল সমাজে চালু ছিল। ঞ্জতাহারা বিশ্বাস করিত যে, আল্লাহর পক্ষ হইতে এমন একজ "মাসীহ আগমন করিবেন, যিনি তাহাদেরকে সকল অত্যাচার-অনাচার, পাপ-পঙ্কিলতা হইতে মুক্ত করিবেন। আর সেই দিক দিয়া হযরত ঈসাকে মাসীহ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
তাঁহাকে যখন তাঁহার বিরোধীরা গ্রেফতার করিয়া হত্যার চেষ্টা করিয়াছিল, তখন তাহারা তাঁহাকে 'ইয়াহুদীদের রাজা' বলিয়া ঠাট্টা-বিদ্রূপ করিতেছিল (মথি, ২৭ : ৩০; মার্ক, ১৫: ৩২; লুক ২৩: ৩৮; যোহন ১৯ : ৩)। পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে যে, বনু ইসরাঈলের কাঙ্খিত ত্রাণকর্তা রাজাকে মাসীহ বলিয়া অভিহিত করা হইত।
📄 ঈসা (আ)-এর দাওয়াতী এলাকা
উক্ত তালিকা হইতে বুঝা যায়, হযরত ঈসা (আ) তাঁহার স্বল্প সময়ের দাওয়াতী কার্যক্রম ইয়াহুদী অধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকা পরিভ্রমণ করিয়াছেন। তৎকালীন সময়ে তাহাদের তিনটি প্রদেশ ছিল যাহা হেরোদের তিন পুত্রের মধ্যে বিভক্ত ছিল। আরকে লাউসের ইয়াহুদীরা এনটি পাসের গালীল, দিকাপলি এবং ফিলিপের কৈসরিয়া ফিলিপের বিভিন্ন গ্রামে-গঞ্জে তিনি ভ্রমণ করিয়াছেন এবং ইয়াহুদী আলেমসহ সাধারণ মানুষকে দাওয়াত দিয়াছেন। সাথে সাথে সমাজকল্যাণে রোগ-ব্যাধি নিরাময়ে অলৌকিক কর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে গোটা ইয়াহুদী অঞ্চলে এক অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি করিয়াছিলেন। যেখানেই যাইতেন হাজার হাজার মানুষ তাঁহার পেছনে ছুটিয়া যাইত। মথি ও মার্ক সুসমাচার হইতে জানা যায় যে, তিনি প্রথমে গালীল প্রদেশে প্রচার কাজ চালাইয়া যান, অতঃপর ফিলিপের কৈসরীয়ার কিছু অংশ তথা গালীল সাগরের অপর তীরের অঞ্চলসমূহে দাওয়াতী কাজ করেন, অতঃপর ইয়াহুদীয়া প্রদেশে আগমন করেন এবং যিরীহো ও জেরুসালেমে দাওয়াতী কাজ সমাপ্ত করেন। জেরুসালেম আসার পর আর ফিরিয়া যান নাই।
এখানেই ইয়াহুদী ধর্মীয় নেতারা তাঁহার বিরুদ্ধে হত্যার ষড়যন্ত্র করে এবং তিনি বিভিন্ন পাহাড়-পর্বতে আত্মগোপন করিয়া আর মাঝে মধ্যে বায়তুল মুকাদ্দাসে আসিয়া দাওয়াতী কাজ করেন। লুক সুসমাচারে বর্ণিত তথ্যে দেখা যায়, নবুওয়াতের প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি জর্ডান নদীর তীর হইতে জেরুসালেম পর্যন্ত সফর করিয়াছিলেন, অতঃপর গালীল প্রদেশে চলিয়া গিয়াছিলেন। জেরুসালেমে শয়তানের বিভিন্ন প্ররোচনা প্রত্যাখ্যান করার ঘটনার কথা উল্লেখ করা হইলেও দাওয়াতী কাজের ব্যাপারে তেমন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ নাই। তাই সেই সুসমাচারেও দাওয়াতী কার্যক্রমের তৎপরতা গালীল প্রদেশ হইতে শুরু করার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হইয়াছে। আর শেষ সময়ে জেরুসালেম আগমনের কথা বলা হইয়াছে।
অপর দিকে বার্নাবাসের বাইবেল হইতে জানা যায়, তাঁহার দাওয়াতী কাজের মূল কেন্দ্রভূমি ছিল জেরুসালেম। এখান হইতেই তিনি দাওয়াতী কাজের সূচনা করিয়াছিলেন এবং বারবার এখানে ফিরিয়া আসিতেন। বায়তুল মুকাদ্দাসের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে অবস্থিত যয়তুন পাহাড়ে তিনি রাত্রে ইবাদতে মশগুল থাকিতেন এবং জেরুসালেম হইতে জর্ডান সীমান্তবর্তী মরু অঞ্চল পর্যন্ত দাওয়াতী কাজ করেন। অতঃপর গালীল প্রদেশের কান্না গ্রাম, নাসরত, কাফুরনাহুম, নায়ানে দাওয়াতী কাজ করেন অতঃপর সঙ্গীগণসহ তিনি আবার জেরুসালেম ও জর্ডানের মরু অঞ্চলে আসিয়াছিলেন এমনকি তিনি সিনাই পর্বত পর্যন্ত ভ্রমণ করিয়াছিলেন। অতঃপর জেরুসালেমে নায়িন, কাফুর নাহুম অঞ্চলে ফিরিয়া গিয়াছিলেন এবং আবার জেরুসালেমে আসিয়া সেইখানে দাওয়াতী কাজ করিয়া কৈসরীয়া ফিলিপী গালীলের নাসরত, সুমিরীয় পাহাড়ী অঞ্চল, এমনকি সিনাই পর্বত ও জর্ডান নদীর তীরবর্তী অঞ্চলসহ মরু অঞ্চলে গমন করিতেও কুণ্ঠাবোধ করেন নাই। বার্নাবাসের বাইবেল থেকে আরও জানা যায় যে, হযরত ঈসা (আ) সিরিয়ার দামেস্ক পর্যন্ত গিয়াছিলেন এবং ইয়াহুদী বসতিগুলিতে দাওয়াতী কাজ করিয়াছিলেন। তবে যেখানেই যান বারবারই তিনি জেরুসালেমে ফিরিয়া আসিয়াছেন।
বার্নাবাসের বাইবেলে হযরত ঈসার আটবার জেরুসালেমে প্রত্যাবর্তনের কথা উল্লেখ রহিয়াছে। আসলে এই তথ্যটিই অধিক গ্রহণযোগ্য বলিয়া মনে হয়। কারণ জেরুসালেম ছিল সেই পবিত্র ভূমি যেখানে রহিয়াছে প্রধান ইবাদতখানা বায়তুল মুকাদ্দাস এবং বনী ইসরাঈলে আসা নবীগণের পদচারণকৃত অঞ্চল। তেমনি সেইখানে রহিয়াছে ইয়াহুদীদের বড় বড় ধর্মীয় নেতাদের আবাসস্থল ও সাধারণ জনগণের তীর্থ যাত্রার কেন্দ্রভূমি। তাই ঈসা (আ) জেরুসালেম আগমনকে প্রাধান্য দিয়াছেন, যদিও তিনটি অঞ্চলের বিভিন্ন গ্রামে-গঞ্জে যাওয়াকে তিনি উপেক্ষা করেন নাই। দাওয়াতের স্বার্থে তিনি নির্দিষ্ট কোন ঠিকানা গ্রহণ করেন নাই। দাওয়াতী সফরই ছিল তাঁহার তৎপরতার মৌলিক অংশ। ইয়াহুদী আহবার ও রিব্বিদের চরম বিরোধিতা ও নিজের জীবনের ঝুঁকিকে উপেক্ষা করিয়া দাওয়াতী কাজকে বেগবান করিবার জন্য বিভিন্ন অঞ্চলে ছুটিয়া বেড়াইয়াছেন।
প্রচারের কাজকে আরও দ্রুত, বেগবান ও প্রসারিত করিবার জন্য নিজে যেমনি বিভিন্ন এলাকায় গমন করিয়াছেন তেমনিভাবে তাঁহার প্রধান বারজন সাথীসহ আরও অন্যান্য অনুসারীদের বিভিন্ন অঞ্চলে দাওয়াতের দায়িত্ব দিয়া প্রেরণ করিয়াছিলেন। বার্নাবাসের সুসমাচারে বর্ণিত হইয়াছে যে, লোকজন এতই আকৃষ্ট হইয়া পড়িয়াছিল যে, তাহারা হযরত ঈসা (আ)-কে প্রায়ই নিজেদের রাজা হিসাবে ঘোষণা দেওয়ার চেষ্টা করিত। কিন্তু ঈসা (আ) নিজেই তাহাদিগকে নিবৃত্ত করিতেন (বার্নাবাসের বাইবেল, page ১৭০, ১৭১)।