📄 ঈসা (আ)-এর জন্ম তারিখ
ঈসা (আ)-এর জন্মস্থান লইয়া যেমন মতপার্থক্য রহিয়াছে, তেমনিভাবে তাঁহার জন্মসন তারিখ নির্ণয়েও মতপার্থক্য রহিয়াছে। যথা : ঐতিহাসিক ভিনসেন্ট টেইলর (Vincent Taylor)-এর মতে ঈসা-এর জন্ম খৃস্টপূর্ব ৮ সালেও হইতে পারে (J. Lehman, The Jews Report, pages 14-15); Encylopaedia Britannica (vol. 13, page 55)-এর মতে সম্ভবত খৃস্টপূর্ব ৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন।
খৃস্টীয় ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে ডাইওনেসিয়াস এক্সিগিওস (Disnysius Exigius) দ্বারা প্রণীত এনোডমিনি (Anno Domini সংক্ষেপে AD) নামে খৃস্টীয় পঞ্জিকার হিসাব অনুসারে হয়রত ঈসা (আ) ১ খৃস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার সময় হইতেই খৃস্টীয় সন হিসাব করা হয়। ঈসা (আ)-এর জন্মের তারিখ হিসাবে ঐ সনটিই বেশি প্রচলিত হইয়া আসিতেছে, যাহা মুসলিম ঐতিহাসিকগণও সমর্থন করিয়াছেন (দ্র. ড. মুহাম্মদ আত্-তায়্যিব আন্-নাজ্জার, তারীখুল আম্বিয়া, page ২৭৬)।
ড. সাজ্জাদ হোসাইন উল্লেখ করেন যে, বলা হয় ঈসা (আ) তিন খৃস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন (Syed Sajjad Husain, page 21)। আতাউর রহীম উল্লেখ করেন যে, লুক সুসামাচার অনুসারে দেখা যায়, আদমশুমারীর সময়ে ঈসা (আ) জন্মগ্রহণ করেন আর আদমশুমারী অনুষ্ঠিত হয় ৬ খৃস্টাব্দে (M. Ataur Rahim, Jesus A prophet of Islam, page 17)। মোটকথা ঈসা (আ) কোন সালে জন্মগ্রহণ করেন তাহা সঠিকভাবে জানা যায় না।
বার্নাবাসের বাইবেলে আসিয়াছে যে, খৃস্টীয় সনের সাথে ঈসা (আ)-এর জন্মসনের সম্পর্ক নাই। এইজন্য খৃস্টান পণ্ডিতগণও বর্তমান খৃস্টীয় পঞ্জিকার সমালোচনা করিয়াছেন এবং ইহা যে ঈসার জন্মের তারিখের সহিত সম্পর্কযুক্ত নহে, তাহাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করিয়াছেন (Encylopedia Americana, Vol. 16, page 41)। মোটকথা খৃস্টপূর্ব ১১ হইতে ৪-এর মধ্যে যে কোন সনে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তবে খৃস্টপূর্ব ৬ সাল হওয়ার সম্ভাবনাই বেশী।
📄 বার্নাবাসের বাইবেল সম্পর্কে একটি সংশয়ের অপনোদন
উল্লেখ, বার্ণাবাসের গসপেলে বর্ণিত বিভিন্ন আকীদা-বিশ্বাস ও দিকনির্দেশনার মত কিছু কিছু বিষয় ইসলামী আকীদা মোতাবেক হওয়ার কারণে পৌলীয় খৃস্টানগণ ধারণা করে যে, এই গ্রন্থটি মুসলমানদের দ্বারা রচিত। তাহারা এই গ্রন্থটি সম্পর্কে সংশয় সৃষ্টি করিয়া ইহার গুরুত্বকে খাটো করিবার চেষ্টা অব্যাহত রাখিয়াছে। কিন্তু ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক পর্যালোচনায় তাহাদের এই সংশয় অমূলক বলিয়া স্পষ্ট হইয়া যায়।
(১) বার্ণাবাসের বাইবেলটি তাওহীদপন্থী আকীদা-বিশ্বাস ও ধ্যানধারণায় না হইলে খৃস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে তাওহীদপন্থী ইরানিয়াস যুক্তি প্রদর্শনে কেন বার্ণাবাসের বাইবেল ব্যবহার করিতেন ? মুহাম্মাদ (আ)-এর নেতৃত্বে দাওয়াত শুরু হয় সপ্তম শতাব্দীতে। আর তাওহীদের সমর্থনে যুক্তি প্রয়োগে ইরানিয়াস উক্ত গ্রন্থটি ব্যবহার করেন দ্বিতীয় শতাব্দীতে। অতএব ইহা মুসলমানদের রচিত বলিয়া ধারণা অমূলক।
(২) বার্ণাবাসের বাইবেল ত্রিত্ববাদের বিরুদ্ধে এবং তাওহীদের পক্ষে না হইলে, চতুর্থ শতাব্দীতে পৌলিয় খৃস্টানগণ উহা নিষিদ্ধ করিল কেন?
(৩) বর্তমান বার্ণাবাসের গ্রন্থটি মুসলিম সমাজ বা মুসলমানদের নিয়ন্ত্রিত কোন লাইব্রেরী হইতে উদ্ধার করা হয় নাই, বরং জগৎশ্রেষ্ঠ খৃস্টান পৌলদের লাইব্রেরী হইতে খৃস্টান নেতৃবৃন্দই ইহা উদ্ধার করেন এবং ইহার ইংরাজী অনুবাদকও ছিলেন একজন খৃস্টান। তাহার নাম সাইল। মোটকথা, উদ্ধার সম্পর্কিত ঘটনাবলী খৃস্টীয় পরিমণ্ডলে তাহাদের কর্তৃত্বাধীনে সংঘটিত হইয়াছে বরং খৃস্টানদের হেফাজতেই তাহা সংরক্ষিত হইয়াছে। তাহার পরও কোন মুসলমানকে উহার সহিত জড়াইয়া দেওয়া অবান্তর।
(৪) ইসলামী ভাবধারার সাথে উক্ত গ্রন্থটির সব কথার মিল নাই। যেমন, ঈসা (আ)-কে আকাশে উত্থিত করিবার পর তাঁহার মাতা ও শিষ্যদের সঙ্গে পুনঃসাক্ষাতের ঘটনাটি কুরআন-হাদীছে বর্ণিত নাই।
বার্ণাবাসের সুসমাচারে ৩১ নং অধ্যায়ে উল্লেখ করা হইয়াছে যে, "সিজারের যাহা প্রাপ্য সিজারকে দাও আর আল্লাহর যাহা প্রাপ্য আল্লাহকে দাও" (মথি: ২২: ২১)। আর ইহা ঈসা (আ)-এর বাণী (page ৩৬)। কিন্তু এই ধারণাটি ইসলামী ভাবধারা বিরুদ্ধ। কেননা ধর্ম ও রাজনীতির এই ধরনের ব্যবচ্ছেদ ইসলাম সমর্থন করে না (অধ্যায়, ২৪, page ২৫)। তেমনিভাবে আসমানের সংখ্যা ৯ বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে (অধ্যায় ১০৫, page ১২৬), কিন্তু কুরআন-হাদীছের বর্ণনা অনুযায়ী আসমানের সংখ্যা ৭টি। এইভাবে প্রচুর অমিল রহিয়াছে।
(৫) আল কুরআন সত্য, তাই বার্ণাবাসে কোন সত্য আসিলে তাহা মিলিয়া যাইতেই পারে। যেমনিভাবে বর্তমান প্রচলিত সুসমাচারসমূহে আসা কিছু কিছু তথ্যের সাথে কুরআনের বর্ণিত তথ্যের কিছু কিছু মিল রহিয়াছে। যেমন, ইনজীল তথা ঈসা (আ)-এর মিশনকে মূসা (আ)-এর মিশনের পরিপূরক ও সত্যায়নকারী হিসাবে ঘোষণা, তাহার প্রদত্ত বক্তৃতার কিছু কিছু বাণী ইত্যাদি। তাই বলিয়া এই সুসমাচারগুলিও মুসলমানগণ লিখিয়াছেন, তাহা কোন খৃস্টান দাবি করিতে পারেন না।
(৬) বাইবেলের পুরাতন নিয়মে ঈসা (আ)-এর আগমনের অনেক সুসংবাদ আসিয়াছে, যাহা পূর্বেই আমরা দেখিয়াছি। এমনকি মথির সুসমাচারে ও ইয়াসাআ নবী কর্তৃক সুসংবাদেও ঈসা (আ) মসীহ্ নাম উল্লেখ করা হইয়াছে, এমনিভাবে তাঁহার জন্মস্থান পর্যন্ত বর্ণিত হইয়াছে। সুতরাং ঈসা (আ)-এর পরে আগত মুহাম্মাদ (স) সম্পর্কে সুসংবাদ প্রদানে ঈসা (আ) নবী মুহাম্মাদ (স)-এর নাম নেওয়া অবাস্তব কিছু নহে। এই ধরনের নাম উল্লেখ করিলেই তাহা মুসলমানদের দ্বারা লিখিত হইবে এই ধারণা যথাযথ নহে।
(৭) গসপেলটি অনেক দিন গোপনীয় অবস্থায় ছিল। তাই প্রামাণ্য সূত্রগত দিক দিয়া ইহা বিচ্ছিন্ন। তবে এই দিক দিয়া অন্যান্য সুসমাচারের চাইতে ইহার মর্যাদা কম নহে। কারণ সেগুলির এই একই অবস্থা বরং সেইগুলি কোন প্রত্যক্ষদর্শী কর্তৃক রচিত নহে। কিন্তু বার্ণাবাসে আসা ঈসা (আ)-এর বাণীগুলি প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা। গ্রন্থটি এই দিক দিয়া অনন্য।
এই সকল কারণে অন্যান্য সুসমাচারের তুলনায় বার্ণাবাসের সুসমাচারের প্রতি মুসলমানদের আগ্রহ ও কৌতুহল অধিক। তাই বলিয়া তাহা মুসলমানদের রচনা বলা অযৌক্তিক ও বাস্তবতার পরিপন্থী। খৃস্ট সমাজের তাওহীদী ধারার অস্তিত্ব সম্পর্কে খৃস্টান গবেষকগণও দ্বিমত পোষণ করেন নাই। অতএব নির্দ্বিধায় বলা যায়, গ্রন্থটি হয় বার্ণাবাসের স্বহস্তে লিখিত বা নূন্যপক্ষে তাহার চিন্তাধারা ও বর্ণনার উপর ভিত্তি করিয়া তাহার কোন অনুসারী কর্তৃক রচিত।
📄 হযরত ঈসা (আ)-এর দাওয়াতী কার্যক্রমের সূচনা
হযরত ঈসা (আ) ওহীর মাধ্যমে যখন ইনজীল লাভ করিলেন, তখন তাহা বনী ইসরাঈলের মধ্যে প্রচার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। কিন্তু কখন, কিভাবে, কোথা হইতে তাঁহার দাওয়াতী কার্যক্রম সূচনা করিয়াছিলেন, তাহা সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় নাই। প্রচলিত সুসমাচারসমূহে এই সম্পর্কে বিভিন্ন রকম বর্ণনা পাওয়া যায়।
মথি সুসমাচারের বর্ণনায় জানা যায় যে, হযরত ইয়াহইয়া (আ) যত দিন সর্বসাধারণের মধ্যে দাওয়াতী কার্যক্রম চালাইয়া যাইতেছিলেন ততদিন হযরত ঈসা (আ) নীরব থাকেন। কিন্তু ইতোমধ্যে হযরত ইয়াহইয়া (আ) গ্রেফতার হইয়া জেলখানায় বন্দী হইয়া যান। হযরত ঈসা (আ) তাহা জানিতে পারিয়া গালীলে চলিয়া যান এবং স্বীয় নাসরত গ্রাম ছাড়িয়া সবূলুন ও নপ্তালি এলাকার মধ্যে মগের পাড়ের কফরনাহুর শহরে তাঁহার প্রচার কার্যক্রমের সূচনা করিয়া ঘোষণা করিলেন : "মন ফিরাও, কেননা স্বর্গরাজ্য সন্নিকট হইল" (মথি, ৪:১৭)।
অর্থাৎ “তওবা কর, কেননা আসমানী বাদশাহী সন্নিকটে আসিয়াছে"। অতঃপর ঈসা (আ) গালীল শহরের তীরবর্তী এলাকায় দাওয়াতী কাজ করিতে লাগিলেন এবং সাগরে মাছ ধরা অবস্থায় সিবাদিয়ের দুই পুত্র ইয়া'কুব ও ইউহান্নাকে তাহার দাওয়াতের প্রতি আকৃষ্ট করিতে সক্ষম হন। অবশ্যই তাহারা দুইজন ঈসা (আ)-এর সাথী হইয়া যান। অতঃপর ঈসা (আ) তাহার সাথীদ্বয়কে লইয়া গালীল প্রদেশের সমস্ত জায়গায় ঘুরিয়া ঘুরিয়া ইয়াহুদীদের ভিন্ন ভিন্ন মজলিসখানায় শিক্ষা দিতে লাগিলেন। ইহা ছাড়া তিনি বেহেশতী রাজ্যের সুখবর প্রচার করিতে এবং লোকদের সমস্ত রকম রোগ ভাল করিতে লাগিলেন। সমস্ত সিরিয়া প্রদেশে তাঁহার কথা ছড়াইয়া পড়িল। যে সমস্ত লোক নানা রকম রোগে ও ভীষণ যন্ত্রণায় কষ্ট পাইতেছিল, যাহাদের ভূতে ধরিয়াছিল এবং যাহারা মৃগী ও পক্ষাঘাত রোগে ভুগিতেছিল, লোকেরা তাহাদিগকে ঈসা (আ)-এর নিকট আনিল। তিনি তাহাদের সকলকে সুস্থ করিলেন। গালীল, দিকাপালি, জেরুসালেম এহুদিয়া এবং জর্ডানের অন্য পার হইতে অনেক লোক ঈসার পিছনে চলিল (মথি, ৪:২৩-২৫; আরও দ্র. মার্ক, ১:১৪)।
লুক সুসমাচারের বর্ণনা অনুযায়ি প্রায় ৩০ বৎসর বয়সে ঈসা (আ) তাঁহার কার্য আরম্ভ করেন (লুক ৩:২৩)। যোহন সুসমাচারে আরও বলা হইয়াছে, দিবসে ঈসা (আ) প্রকাশ্য কার্যের আরম্ভ করিলেন। আর তাহা ছিল কান্না নগরে এক বিবাহ অনুষ্ঠানে, যেখানে তিনি পানিকে দ্রাক্ষারসে পরিণত করেন। সেই অনুষ্ঠানে তাঁহার মা জননী মারয়ামের সঙ্গেও সাক্ষাত হয়। এইভাবে কিছু দিন পর ইয়াহুদীদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান সন্নিকটে হইলে ঈসা জেরুসালেমে চলিয়া যান। অতঃপর তিনি ইবাদতখানায় দেখিতে পাইলেন যে, লোকেরা ইবাদতখানার মধ্যে গরু, ভেড়া আর কবুতর বিক্রী করিতেছে এবং টাকা বদল করিয়া দিবার লোকেরাও বসিয়া আছে। এই সমস্ত দেখিয়া তিনি দড়ি দিয়া একটা চাবুক তৈরী করিলেন আর তাহা দিয়া সমস্ত গরু, ভেড়া এবং লোকদেরও সেই জায়গা হইতে তাড়াইয়া দিলেন। টাকা বদল করিয়া দিবার লোকদের টাকা-পয়সা ছড়াইয়া দিয়া তিনি তাহাদের টেবিলগুলি উল্টাইয়া ফেলিলেন (যোহন ২: ১-১৫)। উপরিউক্ত বর্ণনায় দেখা যায় যে, ঈসা (আ) তাঁহার প্রকাশ্যে দাওয়াতী কাজের সূচনা করিয়াছিলেন গালীল প্রদেশে। মথির বর্ণনামতে, তাহা শুরু করেন তিনি কফরনাতুন শহরে এবং পরবর্তীতে গালীল সাগরের পাড়ে।
যোহন সুসমাচারের মতে বেথানিয়া গ্রামে তাঁহার সঙ্গী-সাথী গ্রহণ কাজের সূচনা করেন এবং কান্না গ্রামের বিবাহভোজ অনুষ্ঠান হইতেই প্রকাশ্য প্রচারকার্য শুরু করেন এবং পরবর্তীতে তিনি জেরুসালেমে বায়তুল মুকাদ্দাসে গমন করেন। বার্ণাবাসের বাইবেলে আছে যে, ফেরেশতা জিবরাঈল কর্তৃক ইনজীল কিতাব লাভের পর ঈসা (আ) তাঁহার মাতাকে সবকিছু অবগত করিয়া তাঁহার খেদমত হইতে অব্যাহতি চাহিলেন। মারয়াম এই সকল কথা শুনিয়া বলিলেন, "পুত্র! তোমার জন্মের আগেই আমাকে এই সকল বলা হইয়াছে। নুবুওয়াতের কাজে যোগদানের উদ্দেশ্যে জন্মদাত্রীর খেদমত হইতে পূর্ব দিন হইতে তিনি বিদায় গ্রহণ করিলেন। আর জেরুসালেমে প্রবেশ করিলেন। জেরুসালেমের প্রবেশপথে একজন কুষ্ঠ ব্যধিগ্রস্ত ব্যক্তির সাক্ষাত পাইলেন। সে ঈসার নিকট আবেদন করিল যেন তিনি তাহার রোগমুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে দু'আ করেন। অবশেষে ঈসা (আ)-এর দু'আর বরকতে যখন ঐ লোকটি রোগমুক্তি লাভ করিল তখন আনন্দে আত্মহারা হইয়া চিৎকার করিতে শুরু করিল যে, তোমরা আসিয়া দেখ, ইনি আল্লাহর নবী। আর তখন তাঁহাকে ঘিরিয়া লোকজন একত্র হইতে শুরু করে। এই কথা জেরুসালেম শহরে প্রচারিত হওয়ার পর এমনভাবে লোকের সমাগম হয় যে, মসজিদ প্রাঙ্গণে তিল ধারণের ঠাই পর্যন্ত রহিল না। কর্তব্যরত খাদেমগণ হযরত ঈসার নিকট আরয করিলেন, জনাব! সমবেত জনতা আপনাকে দেখিতে চায়। আপনার কথা শুনিতে চায়। ঐ মিনারায় আরোহণ করিয়া তাহাদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন। ঈসা (আ) তখন সেই মিনারায় দাঁড়াইয়া জনতার উদ্দেশ্যে ওয়াজ করিলেন। সেই ওয়াজে আল্লাহর অনন্ত মহিমা বর্ণনা, প্রথম মানব আদম (আ)-কে শয়তানের প্ররোচনা, তৎপরবর্তীতে হাবিল-কাবিলের ঘটনা, মহাপ্লাবন ও লোহিত সাগরে ফেরাউনকে ডুবাইয়া ধ্বংস করা ইত্যাদি বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনারও উদ্ধৃতি দিয়েছেন এবং ইবরাহীম (আ) ও তাঁহার সন্তানদের প্রতি সনাতন ওয়াদা ও মূসা (আ)-এর মাধ্যমে পবিত্র শরীআত জারী করার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। সাথে সাথে আল্লাহর বাণী ভুলিয়া যাওয়া এবং মিথ্যা অহমিকায় মত্ত হওয়ার ব্যাপারে জনতাকে সতর্ক করেন এবং ইয়াহুদী রিববীদেরও সমালোচনা করেন। অবশেষে জনতা পাপ মোচনের জন্য দু'আ করিতে ঈসার নিকট আবেদন জানাইল। কিন্তু রিববী ও ধর্মীয় নেতারা নিজেদের প্রতি নিন্দা, তিরস্কার ও ধিককারের কারণে ঈসা (আ)-এর প্রতি মনে মনে বিদ্বিষ্ট হইয়া উঠিল। এমনকি উপস্থিত রিববী, কাতিব ও ধর্মবেত্তারা ঈসার মৃত্যুদণ্ড দাবি করে।
📄 ঈসা (আ)-এর জন্মলগ্নে সংঘটিত অলৌকিক ঘটনাবলী
বিশ্বে প্রতিটি মহামানব যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন প্রাকৃতিক পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতার উপর উহার অলৌকিক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়-এবং ঘটনা ঘটে। আল্লাহ্র রাসূল হযরত ঈসা (আ)-এরে জন্মলগ্নেও সেই ধরনের কিছু কিছু ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা ঘটে।
তাবারী আবূ হুরায়রা (রা) সূত্রে রাসূলুল্লাহ (সা) হইতে বর্ণনা করেন। তিনি বলিয়াছেন, বনী আদমের যে কোন সন্তান ভূমিষ্ট হইবার সাথে সাথে শয়তান তাহাকে স্পর্শ করে। এই স্পর্শের কারণে সে চীৎকার দিয়া উঠে। তবে মারয়াম (র) ও তাঁহার সন্তানের বিষয়টি ভিন্নরূপ। এরপর আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, হে শ্রোতাবৃন্দ! এই প্রসঙ্গে অত্র আয়াতটি পাঠ করা যায়।
وَإِنِّي أُعِيذُهَا بِكَ وَذُرِّيَّتَهَا مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّحِيمِ .
"আর আমি অভিশপ্ত শয়তান হইতে তাহার ও তাহার বংশধরদের জন্য তোমার শরণ লইতেছি" (সূরা আল ইমরান, ৩৬; দ্র. প্রাগুক্ত, page ৩৪৯)।
অপরদিকে বাইবেলেও ঈসা (আ)-এর জন্মলগ্নের কিছু অলৌকিক ঘটনার কথা বর্ণিত হইয়াছে (দ্র. বার্ণাবাসের বাইবেল, page ৪)।
এমনিভাবে বাইবেলীয় গ্রন্থাদিতে বর্ণিত আছে, হযরত ঈসা (আ)-এর জন্মের পর পারস্যের জ্যোতিষীরাও আসমানের তারকায় এক অস্বাভাবিক প্রভাব লক্ষ্য করিয়া ধারণা করিয়াছিল যে, নিশ্চয়ই আজ কোন মহামানবের জন্ম হইয়াছে। তাহাদের একটি দল আসমানে নক্ষত্রের তাৎপর্যময় গতিবিধি বিস্ময়ের সাথে পর্যবেক্ষণ করিতেছিলেন। উহাতে হঠাৎ একটি মহা উজ্জ্বল তারকার উদগতি তাহাদের দৃষ্টি এড়ায় নাই। নিজেদের মধ্যে এই আলামতের তাৎপর্য সম্পর্কে আলোচনা করিয়া তাহারা আসিয়া ইয়াহুদায় উপস্থিত হইলেন। জেরুসালেমে প্রবেশ করিয়া ইয়াহুদীদের নবজাত রাজার অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন। রাজা হেরোদ এই সংবাদ পাইয়া ভীত হইলেন। জ্যোতিষীদের আহবান করিয়া হেরোদ জানিতে চাহিলেন, আপনারা বলুন তো মসীহর জন্ম কোথায়? তাঁহার জন্ম বায়তুল লাহমেই হওয়া উচিত বলিয়া তাহারা অভিমত প্রকাশ করিলেন। হেরোদ বলিলেন, আপনারা তবে বায়তুল লাহমে যান। সেই শিশুকে আবিষ্কার করুন। 'যদি আপনারা তাঁহার সন্ধান পান তবে ফিরতি আসিয়া আমাকেও তাহা অবগত করাইবেন। কেননা আমিও তাঁহাকে তসলীম জানাইতে ইচ্ছা পোষণ করি। অবশ্য শেষ কথাটি তিনি ছলনা করিয়াই বলিলেন। অতএব পারসিক পণ্ডিতগণ জেরুসালেম হইতে প্রস্থান করিলেন। আর যেই তারকাটি প্রাচ্য দেশে তাহাদের গোচরীভূত হইয়াছিল সেইটি এখন তাহাদের সামনে বিচরণশীল হইল। পারসিক পণ্ডিতগণ তারকাটি অবলোকন করিয়া অসীম পুলক লাভ করিলেন। বায়তুল লাহমের শরতলীতে আসিয়া তারাটি যেন সোজা দাঁড়াইল সেই ছাউনির উপর যেখানে ঈসা (আ) জন্ম নিয়াছিলেন। অতএব পারসিক পণ্ডিতগণ সেখানে প্রবেশ করিলেন এবং মাতা পুত্রকে দেখিতে পাইয়া তাহারা নবজাতককে আদার আরয করিলেন। পারসিক পণ্ডিতগণ কুমারী মাতাকে তাহাদের আগমনের কারণ জানাইয়া সোনা-রূপাসহ মাল-মসলাপাতি নজরানারূপে পেশ করিলেন। তখন নিদ্রিত অবস্থায় হেরোদের কাছে ফিরিয়া না যাইবার জন্য তাহারা নবজাতকের হুঁশিয়ারী লাভ করিলেন। ফলে ভিন্ন পথ দিয়া তাহারা স্বদেশের পথ ধরিলেন (বার্ণাবাসের বাইবেল, ৫-৭)। ঐ ধরনের একটি বর্ণনা মথি সুসমাচারেও পাওয়া যায় (২ঃ ১-১২)।
এইভাবে আরও অনেক ঘটনা বর্ণিত আছে। কিন্তু বর্ণনাসূত্রের ধারাবাহিকতা না থাকায় ঐগুলি সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যায় না। তবে বিভিন্ন সূত্রে উপরিউক্ত ঘটনাগুলি বর্ণিত হওয়ায় সেইগুলির বাস্তবতাকে উড়াইয়া দেওয়া যায় না। মহান নবী ঈসা (আ)-এর জন্মলগ্নে তাহা ঘটিতেই পারে। প্রকৃত অবস্থা একমাত্র আল্লাহই অধিক জ্ঞাত।