📄 হযরত ঈসা (আ)-এর জন্ম সম্পর্কে শুভ সুসংবাদ
হযরত 'মারয়াম (আ) সব সময় নিজ প্রকোষ্ঠে আল্লাহর ইবাদতে লিপ্ত থাকিতেন এবং বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া কখনো বাহিরে যাইতেন না। প্রসিদ্ধ বর্ণনামতে যখন তাঁহার বয়স ১৩, তখন একদিন তিনি মসজিদুল আকসার পূর্বদিকে পবিত্রতা অর্জনের উদ্দেশ্যে লোকজন হইতে পৃথক হইয়া নির্জনে অবস্থানরত ছিলেন। তখন হযরত জিবরাঈল (আ) মানুষের আকৃতিতে তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত হইলেন। হযরত মারয়াম (আ) একজন অপরিচিত লোককে এইভাবে পর্দাহীন অবস্থায় সামনে উপস্থিত দেখিয়া ভয় পাইয়া গেলেন। তিনি বলিলেন, তোমার মধ্যে যদি সামান্যতম আল্লাহ্ ভয় থাকে তাহা হইলে আমি আল্লাহর দোহাই দিয়া তোমা হইতে আশ্রয় চাহিতেছি। ফেরেশতা বলিলেন, মারয়াম! ভয়ের কোন কারণ নাই। আমি মানুষ নহি, আমি আল্লাহর ফেরেশতা। আমি তোমাকে একটি পুত্র সন্তান লাভের সুসংবাদ দিতে আসিয়াছি। পবিত্র কুরআনে এই প্রসঙ্গে ইরশাদ হইয়াছে:
وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ مَرْيَمَ إِذِ انْتَبَذَتْ مِنْ أَهْلِهَا مَكَانًا شَرْقِيًّا . فَاتَّخَذَتْ مِنْ دُونِهِمْ حِجَابًا فَأَرْسَلْنَا إِلَيْهَا رُوحَنَا فَتَمَثَّلَ لَهَا بَشَرًا سَوِيًّا . قَالَتْ إِنِّي أَعُوذُ بِالرَّحْمَنِ مِنْكَ إِنْ كُنْتَ تَقِيًّا . قَالَ إِنَّمَا أَنَا رَسُولُ رَبِّكِ لَأَهَبَ لَكِ غُلْمًا زَكِيًّا .
"বর্ণনা কর এই কিতাবে উল্লিখিত মারয়ামের কথা, যখন সে তাহার পরিবারবর্গ হইতে পৃথক হইয়া নিরালায় পূর্ব দিকে এক স্থানে আশ্রয় লইল, অতঃপর উহাদিগ হইতে পর্দা করিল। অতঃপর আমি তাহার নিকট আমার রূহকে পাঠাইলাম, সে তাহার নিকট পূর্ণ মানবাকৃতিতে আত্মপ্রকাশ করিল। মারয়াম বলিল, তুমি যদি আল্লাহকে ভয় কর তবে আমি তোমা হইতে দয়াময়ের শরণ লইতেছি। সে বলিল, আমি তো তোমার প্রতিপালক প্রেরিত, তোমাকে এক পবিত্র পুত্র দান করিবার জন্য” (১৯ : ১৬-১৯)।
হযরত মারয়াম (আ) পুত্র সন্তানের সংবাদ শুনিয়া বিস্ময়ের সহিত বলিলেন, "মারয়াম বলিল, কেমন করিয়া আমার পুত্র হইবে যখন আমাকে কোন পুরুষ স্পর্শ করে নাই এবং আমি ব্যভিচারিণীও নহি” (১৯ : ২০)?
তখন ফেরেশতা বলিলেন:
قَالَ كَذَلِكِ قَالَ رَبُّكِ هُوَ عَلَى هَيِّنٌ وَلِنَجْعَلَهُ آيَةً لِلنَّاسِ وَرَحْمَةً مِّنَّا وَكَانَ أَمْرًا مَّقْضِيًّا
"এইরূপই হইবে। তোমার প্রতিপালক বলিয়াছেন, ইহা আমার জন্য সহজসাধ্য এবং আমি উহাকে এইজন্য সৃষ্টি করিব যেন সে হয় মানুষের জন্য এক নিদর্শন ও আমার নিকট হইতে এক অনুগ্রহ; ইহা তো এক স্থিরীকৃত ব্যাপার" (১৯ : ২১)।
বর্তমান প্রচলিত বাইবেলেও এই বিষয়টির উল্লেখ রহিয়াছে। যেমন লুক সুসমাচারে উল্লেখ্য আছে: দূত তাহাকে কহিলেন, মারয়াম! ভয় করিও না। কেননা তুমি ঈশ্বরের নিকটে অনুগ্রহ পাইয়াছ। আর দেখ তুমি গর্ভবতী হইয়া পুত্র প্রসব করিবে ও তাহার নাম যীশু রাখিবে। তিনি মহান হইবেন। তখন মারয়াম দূতকে কহিলেন, ইহা কিরূপে হইবে? আমি ত পুরুষকে জানি না। দূত উত্তর করিয়া তাঁহাকে কহিলেন, পবিত্র আত্মা তোমার উপরে আসিবেন এবং পরাৎপরের শক্তি তোমার উপর ছায়া করিবে। এই কারণে যে, পবিত্র সন্তান জন্মিবে" (লুক, ১: ২৬-২৮)। বার্নাবাসের বাইবেলেও অনুরূপ বর্ণিত হইয়াছে। উল্লেখ্য যে, লুক সুসমাচারের ভাষ্যমতে হযরত মারয়ামের কাছে জিবরাঈল ফেরেশতা উক্ত সুসংবাদ লইয়া আসিয়াছিলেন যখন হযরত মারয়াম গালীল প্রদেশের নাসেরা জনপল্লীতে অবস্থান করিতেছিলেন (লুক সুসমাচার, ১: ২৬)।
অপরদিকে বার্নাবাসের বাইবেলে উল্লেখ করা হইয়াছে, মারয়াম তাঁহার কামরায় অর্থাৎ বায়তুল মুকাদ্দাসের কামরায় অবস্থান করিতেছিলেন। আর বায়তুল মুকাদ্দাসের ঐ কামরাটি পূর্ব দিকে অবস্থিত। সম্ভবত এইজন্য আল-কুরআনে মাকান শরকি বলা হইয়াছে (১৯:১৬)। ইবন কাছীরসহ প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিকদের মতে তখন মারয়াম মসজিদের পূর্ব দিকেই অবস্থান করিতেছিলেন (ইবনে কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ২খ, page ৫৯)। আর ভৌগোলিক পর্যালোচনায় দেখা গিয়াছে, বায়তুল মুকাদ্দাস হইতে নাসেরা জনপল্লীটি পূর্ব দিকে নহে, বরং উত্তর দিকে অবস্থিত।
📄 বার্গাবাসের গসপেল
বার্ণাবাসের গসপেল
পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে যে, খৃস্টানদের প্রাথমিক যুগে প্রচলিত গসপেলসমূহের মধ্যে বার্ণাবাসের গসপেল ছিল অন্যতম। পরবর্তীতে এক শ্রেণীর খৃস্টানদের দ্বারা তাহা নিষিদ্ধ ঘোষিত হইয়াছিল। আরও মজার ব্যাপার এই যে, উক্ত গ্রন্থটি খৃস্টান সমাজে প্রচলিত সুসমাচারের অনেক তথ্যকে সমর্থন করে না। উক্ত গ্রন্থে ত্রিত্ববাদের পরিবর্তে তাওহীদি ভাবধারা পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু এই গ্রন্থটির লেখক বার্ণাবাস কে ছিলেন, কখন কিভাবে তাহা রচনা করেন এবং তাহার পাণ্ডুলিপি খৃস্ট সমাজের প্রাচীন গ্রন্থাগার হইতে কিভাবে উদ্ধার করা হয় তাহা লইয়া গবেষকগণ অনুসন্ধান চালাইয়া আসিতেছেন। এই সম্পর্কে নিম্নে সংক্ষেপে কিছু আলোচনা করা হইল।
লেখক পরিচিতি: ঐতিহাসিকগণের মতে বার্ণাবাস ছিলেন একজন ইয়াহুদী, যিনি সাইপ্রাসে জন্মগ্রহণ করেন (Md. Ataur Rahim, Ibid, Page 54)। তিনি যুসেস (ইসু) বা যুসেফ (ইউসুফ) নামেও পরিচিত ছিলেন। তাহার সম্পর্কে উপরিউক্ত চারটি সুসমাচার- এ খুব কমই আলোচনা আসিয়াছে। চারটি গসপেলের উল্লেখকৃত তথ্যে জানা যায়, ইউসুফ নামে এক ব্যক্তি কথিত ক্রুশবিদ্ধ যীশুর লাশ দাফন করিয়াছিল। অনেকের ধারণামতে সেই ইউসুফই হইলেন বার্ণাবাস। তাহার সম্পর্কে মথি সুসমাচারে বলা হয় : "পরে সন্ধ্যা হইলে আরিমাথিয়ার একজন ধনবান লোক আসিলেন, তাহার নাম যোষেফ, তিনি নিজেও যীশুর শিষ্য হইয়াছিলেন, পীলাতের নিকেট গিয়া যীশুর দেহ যাজ্ঞা করিলেন" (মথি ২৭ঃ ৫৭-৫৮)। মার্ক, লুক ও যোহন সুসমাচারেও অনুরূপ বর্ণনা রহিয়াছে (দ্র. মার্ক সুসমাচার ১৫ঃ ৪২-৪৩; লুক সুসমাচার, ২৩ঃ ৫০-৫২)।
(১) চার সুমাচারের বর্ণনা অনুযায়ী তিনি অরিমাতিয়া জনপল্লীর অধিবাসি ছিলেন।
(২) চারটি সুমাচারের মতে তিনি ঈসা (আ)-এর কমপক্ষে অনুসারী ছিলেন। তবে যোহনের মতে তিনি তাহার পরিচয় গোপন রাখিতেন।
(৩) তিনি ধনবান ছিলেন (মথি)।
(৪) তিনি মন্ত্রী পরিষদের সম্ভ্রান্ত সদস্য ছিলেন (মার্ক ও লুক)।
(৫) তিনি ইয়াহুদী ছিলেন (মথি)।
(৬) স্বর্গরাজ্যের অপেক্ষায় ছিলেন (মার্ক)।
(৭) তিনি একজন সৎ ও ধার্মিক লোক ছিলেন (লুক)।
(৮) তিনি ঈসা (আ)-এর বিরুদ্ধে ইয়াহুদীদের ষড়যন্ত্র ও কার্যকলাপ সমর্থন করিতেন না (লুক)।
(৯) ইয়াহুদীদের ভয়ে নিজের পরিচয় গুপ্ত রাখিলেও (যোহনের বর্ণনামতে) প্রকৃতপক্ষে তিনি সাহসী লোক ছিলেন (মার্ক)।
তবে বার্ণাবাস নিজেই নিকোডেমাস ও আবাবি মাথিয়ার ইউসুফ বলিয়া ঐ ব্যক্তির পরিচয় দেন (বার্ণাবাসের বাইবেল, page ২৬০)। তাই এই ইউসুফ নামের ব্যক্তিটি তিনি নিজেই কিনা তাহা লইয়া সংশয় আছে। তবে প্রেরিতের কার্যাবলীতে বার্ণাবাসের পরিচয় স্পষ্টভাবে বিবৃত হয়। প্রেরিতদের কার্যবিবরণে অনেকবার তাহার প্রসঙ্গ আসিয়াছে। যেমন: "আর যোষেফ, যাঁহাকে প্রেরিতেরা বার্নবা নাম দিয়াছিলেন— অনুবাদ করিলে, এই নামের অর্থ প্রবোধের সন্তান— যিনি লেবীয় এবং জাতিতে কুপ্রীয়, তাঁহার এক খণ্ড ভূমি থাকাতে তিনি তাহা বিক্রয় করিয়া তাহার মূল্য আনিয়া প্ররিতদের চরণে রাখিলেন" (প্রেরিত ৪:৩৬-৩৭)।
এইভাবে কলসীয়দের পত্রে পৌল উল্লেখ করিয়াছেন, "আমার সহবন্দি আরিস্টার্থ এবং বার্নবার কুটুম্ব, মার্ক যাঁহার বিষয়ে তোমরা আজ্ঞা পাইয়াছ; তিনি যদি তোমাদের কাছে উপস্থিত হন, তবে তাঁহাকে গ্রহণ করিও” (পলের কলসীয় পত্র, ৪: ১০)।
উপরিউক্ত উদ্ধৃতিসমূহ পর্যালোচনা করিলে বার্ণাবাসের নিম্নোক্ত পরিচয় পাওয়া যায়: (১) তিনি সাইপ্রাসের অধিবাসী ছিলেন। (২) তাহার নাম ছিল ইউসুফ, যাহাকে তাহার সাথীবর্গ বার্ণবা উপাধিতে ভূষিত করেন। আর বার্ণবা অর্থ নসীহতের সন্তান। অর্থাৎ তিনি হৃদয় নিড়ানো বক্তব্যের মাধ্যমে মানুষের মাঝে ওয়াজ নসীহত করিতে পারিতেন, যেইজন্য তাহাকে উপরিউক্ত উপাধি প্রদান করা হয়। (৩) তিনি দাওয়াতের জন্য অন্যান্য প্রেরিতদের সহায়তায় নিজস্ব সম্পদ দান করার ক্ষেত্রে ছিলেন খুবই উন্মুক্ত হস্ত। (৪) তিনি ছিলেন পূতঃ পবিত্র ও আধ্যাত্মিক শক্তিতে বলিয়ান। সম্মানিত, সম্ভ্রান্ত ও পরিচ্ছন্ন ব্যক্তিত্বের অধিকারী। (৫) আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনায় তিনি দাওয়াত প্রচারে পৌলকে সাথে লইয়াছিলেন। (৬) প্রাথমিক গির্জামণ্ডলী তাহাকে এন্টিওক ও তারতুস নগরীতে পঠাইয়াছিলেন। (৭) কথিত দ্বিতীয় সুসমাচারের লেখক মার্কের সাথে তাহার আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। (৮) তিনি পৌলকে হেদায়াত দানে চেষ্টা করিয়াছিলেন। সেই পৌল যে ঈসা (আ)-এর অনুসারীদের উপর হত্যা নির্যাতনের স্টীম রোলার চালাইয়াছিল। (৯) সম্ভবত মার্কের সাথে তাহার আত্মীয়তার সূত্রে বলা যায়, বার্ণবাই মার্ককে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা দিয়াছিলেন। তাই বলা হয় যে, মাসীহ ইলাহ হওয়ার বিষয়টি মার্ক অস্বীকার করিতেন (ইউসুফ সালাবী, প্রাগুক্ত, page ৫৯-৬০)।
📄 মায়ের গর্ভে হযরত ঈসা (আ)
কোন কোন বর্ণনামতে, জিবরাঈল (আ) মারয়াম (আ)-কে ঐ সুসংবাদ শুনাইয়া তাঁহার মুখের ভিতর হযরত ঈসা (আ)-এর রূহ মুবারক ফুঁকিয়া দেন। কিন্তু প্রসিদ্ধ মতে জিবরাঈল (আ) মারয়াম (আ)-এর জামার কলারের ফাঁক দিয়া ফুঁক দিলেন আর এইভাবে তাঁহার গর্ভে ঈসা (আ)-এর রূহ পৌঁছিয়া গেল (ইব্ন কাছীর, প্রাগুক্ত, ২খ, page ৫৯)।
যাই হউক, এইভাবে কিছুকাল পর তিনি নিজেকে অন্তঃসত্তা অনুভব করিলেন। এই প্রসঙ্গে বলা হইয়াছে:
"আরও দৃষ্টান্ত দিতেছেন ইমরান তনয়া মারয়ামের, যে তাহার সতীত্ব রক্ষা করিয়াছিল, ফলে আমি তাহার মধ্যে রূহ ফুঁকিয়া দিয়াছিলাম এবং সে তাহার প্রতিপালকের বাণী ও তাহার কিতাবসমূহ সত্য বলিয়া গ্রহণ করিয়াছিল; সে ছিল অনুগতদিগের একজন" (৬৬:১২)।
উল্লেখ্য, হযরত মারয়াম অন্তঃসত্তা হওয়ার পর হযরত ঈসা (আ) তাঁহার গর্ভে কত সময় ছিলেন সে সম্পর্কে প্রচুর মতবিরোধ রহিয়াছে। তন্মধ্যে নিম্নে কয়েকটি উল্লেখ করা হইল :
হযরত মারয়াম ঈসা (আ)-কে গর্ভে ধারণের সাথে সাথেই প্রসব করেন। ইবনুল জাওযীর বর্ণনা মতে ইহা ইব্ন আব্বাসের মত। আর উহার অর্থ তাঁহার গর্ভ ধারণের সময়কাল দীর্ঘ ছিল না। তবে ইহার অর্থ এই নয় যে, তাৎক্ষণিকভাবে তিনি সন্তান প্রসব করেন। কেননা আল্লাহ পাক বলিয়াছেন:
فَحَمَلَتْهُ فَانْتَبَذَتْ بِهِ مَكَانًا قَصِيًّا . فَأَجَاءَهَا الْمَخَاضُ إِلى جِذْعِ النَّخْلَةِ قَالَتْ يُلَيْتَنِي مِنْ قَبْلَ هُذَا وَكُنْتُ نَسِيَا مُنْسِيًّا
"তৎপর সে গর্ভে উহাকে ধারণ করিল, অতঃপর তৎসহ এক দূরবর্তী স্থানে চলিয়া গেল, প্রসব বেদনা তাহাকে এক খর্জুর বৃক্ষতলে আশ্রয় লইতে বাধ্য করিল” (১৯ : ২২-২৩)।
এই আয়াত দ্বারা বুঝা যায় যে, গর্ভ ধারণ আর প্রসব করিবার মাঝামাঝি এতটুকু সময় ছিল যাহাতে দূরবর্তী স্থানে যাওয়া সম্ভব হয় (ইবনুল জাওযী, যাদুল মাসীর, ৫খ., page ১৫৪)।
গর্ভধারণের ক্ষণকাল পরই প্রসব করেন। ইহা ছা'লাবীর মত (প্রাগুক্ত)। ইহার সমর্থনে দলীল হিসাবে নিম্নোক্ত আয়াতটি উল্লেখ করা হয় : إِنَّ مَثَلَ عِيْسَى عِنْدَ اللَّهِ كَمَثَلِ آدَمَ خَلَقَهُ مِنْ تُرَابٍ ثُمَّ قَالَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ "আল্লাহর নিকট ঈসার দৃষ্টান্ত আদমের দৃষ্টান্ত সদৃশ। তাহাকে মৃত্তিকা হইতে সৃষ্টি করিয়াছিলেন, অতঃপর তাহাকে বলিয়াছিলেন, 'হও', ফলে সে হইয়া গেল" (৩ঃ ৫৯)।
অতএব আল্লাহ তা'আলা যেখানে বলিলেন, "হইয়া যাও", সেখানে গর্ভ ধারণের সময়কাল সম্পর্কে চিন্তা করা যায় না (আলুসী, রূহুল মা'আনী, ১৬খ, page ৭৯)।
এতদ্ব্যতীত তাঁহার গর্ভকাল ৩ ঘণ্টা, ৯ ঘণ্টা, ৬ মাস, ৭ মাস, ও ৮ মাস ছিল বলিয়া বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লিখিত হইয়াছে (আল-মাওয়ারদী, তাফসীর, ৩খ, page ৬২; দ্র. আলুসী, প্রাগুক্ত, page ৭৯-৮০)।
ঐ গর্ভকালীন সময় ছিল ৯ মাস। ইব্ন কাছীর এই মতটিকেই অগ্রাধিকার দিয়াছেন। আর আলুসী ইহাকে ইব্ন আব্বাস (রা) হইতেও বর্ণনা করিয়াছেন। ইহার প্রবক্তাদের মতে, অন্যান্য নারী স্বাভাবিকভাবে ৯ মাসে যেমনি করিয়া সন্তান প্রসব করে তেমনি ৯ মাস পর মারয়াম (আ) হযরত ঈসা (আ)-কে প্রসব করিয়াছিলেন (ইব্ন কাছীর, প্রাগুক্ত; আলুসী, প্রাগুক্ত)। ইন্ন কাছীর ইহার সহিত আরও বলিয়াছেন যে, এই সময়ের ব্যতিক্রম হইলে অবশ্যই তাহা কুরআন-হাদীছে উল্লেখ থাকিত (ইন্ন কাছীর, প্রাগুক্ত)। আলুসীর মতে এই বর্ণনা ব্যতীত অন্য কোন বর্ণনা সহীহ নহে (দ্র. আলুসী, প্রাগুক্ত)। প্রখ্যাত তাবিঈ হযরত মুজাহিদ (র) হইতে বর্ণিত, মারয়াম বলিয়াছেন-
"আমি যখন একাকী থাকিতাম তখন সে (ঈসা) আমার সহিত কথা বলিত। আর যখন আমি মানুষের মধ্যে থাকিতাম সে আমার পেটে তাসবীহ পাঠ করিত" (ইব্ন কাছীর, প্রাগুক্ত)।
বাইবেলের বর্ণনা অনুসারে হযরত ঈসা যখন তাঁহার মায়ের পেটে ছিলেন তখন তাঁহার মা মারয়াম আপন জাতির ইউসুফ নামে একজন সৎ মিস্ত্রীকে নিজের জীবনসঙ্গী করিয়া লইয়াছিলেন (লুক সুসমাচার, ২ঃ ৫-৬; বার্ণাবাসের বইবেল, page ২)। ইন্ন কাছীর বলেন, সালাফে সালেহীনের মধ্যে অনেকেই উল্লেখ করিয়াছেন যে, হযরত মারয়ামের গর্ভধারণের আলামত যখন স্পষ্ট হইয়া উঠিতেছিল তখন প্রথম জানিতে পারেন ইউসুফ আন্-নাজ্জার। তিনি মারয়ামের খালাত ভাই ছিলেন। মারয়ামের একদিকে পূত পবিত্রতা ও ইবাদত-পরহেযগারি, অন্যদিকে তাঁহার ঐ অবস্থা অবলোকন করিয়া তিনি খুবই আশ্চর্যান্বিত হন। একদিন তিনি মারয়ামকে জিজ্ঞাসা করিয়া প্রকৃত অবস্থা তথা ফেরেস্তার সুসংবাদ জানিয়া লইয়া আর কিছু বলেন নাই (ইব্ন কাছীর, প্রাগুক্ত, ২খ. page ৬০)। কিন্তু বাইবেলে আসিয়াছে যে, ইউসুফ মারয়ামের সহিত বিবাহের পূর্ব-চুক্তি ভঙ্গ করিয়া বিচ্ছিন্ন থাকিবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিলে স্বপ্নে ফেরেশতা কর্তৃক প্রকৃত অবস্থা জানিয়া তাহার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করিয়া লইয়াছিলেন (মথি, ১: ২০-২১; বার্ণাবাসের বাইবেল, page ৩)।
📄 বার্ণাবাসের ধর্মীয় মর্যাদা
বার্ণাবাস ও পল সুদীর্ঘ কাল একই সঙ্গে রহিয়াছিলেন এবং খৃষ্ট ধর্মমত প্রচার করিয়াছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে পলের সাথে বার্ণাবাসের বিচ্ছেদ ঘটে। লুকের বর্ণনামতে বিভিন্ন স্থানে প্রচারকাজে বার্ণাবাস তাহার আত্মীয় মার্ককে সংগে রাখিতে চাহিলে পল কোন কারণে আপত্তি করেন। ইহাতেই মতান্তর হয় এবং উভয়ের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটিয়া যায়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় যে, পরবর্তীতে পল স্বয়ং মার্ককে সহযাত্রী করিয়া লইলেন কিন্তু বার্ণাবাসের সংগে তাহার মিলন হইল না। প্রকৃতপক্ষে বিরোধ মার্ককে সঙ্গে নেওয়ার কারণে নহে, বরং তাহা ছিল ধর্মীয় মতবিরোধ কেন্দ্রিক। কেননা ভিন্ন জাতীয় লোকদের মধ্য হইতে নবদীক্ষিত খৃস্টানদের বিভিন্ন আচার-আচরণের ব্যাপারে পল ছিল সমর্থক। এমনিভাবে হযরত মূসা (আ)-এর শরীআতের অনুষ্ঠানাদি এবং খৎনা ইত্যাদি রহিত করাই ছিল তাহার বৈপ্লবিক মতবাদের অন্যতম অঙ্গ। ইহার সমর্থনে তাহার পত্রাবলীতে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন যুক্তি দেখাইতেও পল দ্বিধাবোধ করি নই (রোমীয়, ১: ২৫, ৩ঃ৩০)।
সুতরাং পল তাহার নূতন অনুসারীদের পক্ষে খৎনা এবং হযরত মূসা (আ)-এর শরীআতের অন্যান্য অনুষ্ঠানাদি অবশ্য পালনীয় বলিয়া মনে না করিতে শুরু করেন। অপরদিকে বার্ণাবাস কোন মতেই এই সমস্ত পরিত্যাগ করিতে মোটেই প্রস্তুত ছিলেন না। কারণ ইবরাহীম (আ) ও মূসা (আ)-এর শরীআতে তাহা স্পষ্টভাবেই লিপিবদ্ধ করা হইয়াছে (আদিপুস্তক, ১৭: ১০-১৪; লেবীয় পুস্তক, ১২:৩)।
বার্ণাবাস প্রথমদিকে সরল বিশ্বাসে পলের সমর্থন এবং তাহার সম্পর্কে ভাল ধারণা রাখিলেও ক্রমেই তাহার কাছে পলের আসল স্বরূপ প্রকাশ পাইতে থাকে। এমন এক পর্যায় বার্ণাবাস পলের খৃস্ট ধর্ম বিরোধী সকল আকীদা ও মতবাদের তীব্র সমালোচনা করেন এবং তখনই উভয়ের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়া যায়। আর সেই প্রেক্ষাপটেই বার্ণাবাস তাহার গসপেলটি রচনা করেন, যাহাতে ঈসা (আ)-এর শিক্ষা এবং খৃস্ট ধর্মের প্রকৃত চিত্র পরিবেশন করিয়া পৌলীয় চিন্তাধারার প্রতিবাদ করেন।