📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 কুরআন ও হাদীছে হযরত ঈসা (আ)

📄 কুরআন ও হাদীছে হযরত ঈসা (আ)


হযরত ঈসা (আ) যুগে যুগে প্রেরিত নবীগণের অন্যতম মহান নবী। তাই ইসলামের মৌলিক উৎস কুরআন-হাদীসেও তাঁহার কথা আলোচনা করা হইয়াছে। এমনকি পূর্ববর্তী আম্বিয়ায়ে কিরামের মধ্যে আল-কুরআনে যাহাদের কথা বেশী বেশী আলোচনায় আসিয়াছে, তন্মেধ্যে হযরত ঈসা (আ) অন্যতম |
কুরআন মজীদে হযরত ঈসা' (আ)-এর জীবনের পূর্ণাঙ্গ ইতিবৃত্ত পাওয়া না গেলেও তাঁহার জীবন-প্রবাহের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ও ঘটনাবলী বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হইয়াছে। অধিকন্তু তাঁহার পূত-পবিত্র জীবনের উপক্রমণিকা হিসাবে তাঁহার মা হযরত মরিয়ম (আ)-এর জীবনের ঘটনাবলীও তুলিয়া ধরা হইয়াছে। আলোচনার স্থানগুলি ছকে দেখানো হইল:
ক্রমিক সূরার সংখ্যা নাম সূরা ও আয়াতের ক্রমিক সংখ্যা যে নামের উল্লেখ আছে ঈসা মসীহ আয়দুল্লাহ ইব্‌ন মারয়াম মোট আয়াত
১। বাকারা ২:৮৭, ১৩৬, ১৩৭, ১৩৮, ২৫৩ ৩ ২ ৫ ২৪ ২। আল ইমরান ৩:৪২-৬৪, ৮৪ ৫ ১ ২ ৫ ৩। নিসা ৪: ১৫৬-১৫৯, ১৭১-১৭২ ৩৩ ২ ১ ৬ ৪। মাইদা ৫:১৭-৪৬, ৭২, ৭৫, ১১০, ১২০ ৬ ৫ ১০ ১৮ ৫। আন'আম ৬:৮৫ ১ ১ ১ ৬। তাওবা ৯:৩০-৩১ ১ ১ ২ ৭১। মারয়াম ১৯:১৬-৩৫ ১ ১ ১ ১৯ ৮। মুমিনূন ২৩:৫০ ১ ১ ৯। আহযাব ৩৩ঃ ৭-৮ ১ ১ ২ ১০। শূরা ৪২: ১৩ ১ ১ ১১। যুখরুফ ৪৩:৫৭-৬৩ ১ ১ ২ ১২। হাদীদ ৫৭:২৭ ১ ১ ১ ১৩। সাফ ৬১:৬-১৪ ২ ২ ২
মোট ২৫ ১১ ১ ২৩

কুরআন কারীমের মোট ১৩টি সূরায় তাঁহার ও তাঁহার মায়ের আলোচনা আসিয়াছে। সেই সূরাগুলির ক্রমানুসারে তাঁহার সম্পর্কে আয়াতসমূহ নিম্নে উল্লেখ করা হইল।

وَلَقَدْ آتَيْنَا مُوسَى الْكِتَابَ وَقَفَّيْنَا مِنْ بَعْدِهِ بِالرُّسُلِ وَآتَيْنَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ الْبَيِّنَاتِ وَأَيَّدْنَاهُ بِرُوحِ الْقُدُسِ أَفَكُلْمَا جَاءَكُمْ رَسُولٌ بِمَا لا تَهْوَى أَنْفُسُكُمُ اسْتَكْبَرْتُمْ فَفَرِيقًا كَذَّبْتُمْ وَفَرِيقًا تَقْتُلُونَ .
"এবং নিশ্চয় আমি মূসাকে কিতাব দিয়াছি এবং তাহার পরে পর্যায়ক্রমে রাসূলগণকে প্রেরণ করিয়াছি, মারয়াম তনয় ঈসাকে স্পষ্ট প্রমাণ দিয়াছি এবং পবিত্র আত্মা দ্বারা তাহাকে শক্তিশালী করিয়াছি। তবে কি যখনই কোন রাসূল এমন কিছু আনিয়াছে যাহা তোমাদের মনঃপূত নহে তখনই তোমরা অহংকার করিয়াছ আর কতককে অস্বীকার করিয়াছ এবং কতককে হত্যা করিয়াছ" (২:৮৭)?

قُولُوا آمَنَّا بِاللَّهِ وَمَا أُنْزِلَ إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَاسْمَعِيلَ وَاسْحَقَ وَيَعْقُوبَ وَالْأَسْبَاطِ وَمَا أُوتِيَ مُوسَى وَعِيسَى وَمَا أُوتِيَ النَّبِيُّونَ مِنْ رَبِّهِمْ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّنْهُمْ وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ .
"তোমরা বল, আমরা আল্লাহতে ঈমান রাখি এবং যাহা আমাদের প্রতি এবং ইব্রাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব ও তাঁহার বংশধরগণের প্রতি অবতীর্ণ হইয়াছে এবং যাহা তাঁহাদের প্রতিপালকের নিকট হইতে' মূসা, ঈসা ও অন্যান্য নবীগণকে দেওয়া হইয়াছে। আমরা তাঁহাদের মধ্যে কোন পার্থক্য করি না এবং আমরা তাঁহার নিকট আত্মসমর্পণকারী" (২: ১৩৬)।

تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ مِنْهُمْ مَنْ كَلَّمَ اللهُ وَرَفَعَ بَعْضَهُمْ دَرَجَتِ وَآتَيْنَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ البَيِّنَاتِ وَأَيَّدَنَهُ بِرُوحِ الْقُدُسِ وَلَوْ شَاءَ اللهُ مَا اقْتَتَلَ الَّذِينَ مِنْ بَعْدِهِمْ مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَتْهُمُ الْبَيِّنَاتُ وَلَكِن اخْتَلَفُوا فَمِنْهُمْ مَنْ أَمَنَ وَمِنْهُمْ مَنْ كَفَرَ وَلَوْ شَاءَ اللهُ مَا اقْتَتَلُوا وَلَكِنَّ اللَّهَ يَفْعَلُ مَا يُرِيدُ.
"এই রাসূলগণ, আমি তাহাদের মধ্যে কাহাকেও কাহারও উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়াছি। তাহাদের মধ্যে এমন কেহ রহিয়াছে যাহার সহিত আল্লাহ কথা বলিয়াছেন, আবার কাহাকেও উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করিয়াছেন। মারয়াম তনয় ঈসাকে স্পষ্ট প্রমাণ প্রদান করিয়াছি ও পবিত্র আত্মা দ্বারা তাহাকে শক্তিশালী করিয়াছি। আল্লাহ ইচ্ছা করিলে তাহাদের পরবর্তীরা তাহাদের নিকট স্পষ্ট প্রমাণ সমাগত হওয়ার পর পারস্পরিক যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত হইত না; কিন্তু তাহাদের মধ্যে মতভেদ ঘটিল। ফলে তাহাদের কতক বিশ্বাস করিল এবং কতক কুফরী করিল। আল্লাহ্ ইচ্ছা করিলে তাহারা পারস্পরিক যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত হইত না; কিন্তু আল্লাহ যাহা ইচ্ছা তাহাই করেন" (২ঃ ২৫৩)।

إِذْ قَالَتِ الْمَلَئِكَةُ يُمَرِّيمُ إِنَّ اللهَ يُبَشِّرُكَ بِكَلِمَةٍ مِنْهُ اسْمُهُ الْمَسِيحُ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ وَجِيْهَا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَمِنَ الْمُقَرَّبِينَ ، وَيُكَلِّمُ النَّاسَ فِي الْمَهْدِ وَكَهْلاً وَمِنَ الصَّلِحِينَ ، قَالَتْ رَبِّ أَنِّي يَكُونُ لِي وَلَدٌ وَلَمْ يَمْسَسْنِي بَشَرٌ قَالَ كَذلِكَ اللهُ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ إِذَا قَضَى أَمْرًا فَإِنَّمَا يَقُولُ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ ، وَيُعَلِّمُهُ الْكِتَبَ والحكمة والتَّوْرَةَ وَالْإِنْجِيلَ وَرَسُولاً إِلى بَنِي إِسْرَائِيلَ أَنِّي قَدْ جِئْتُكُمْ بِآيَةٍ مِّنْ رَبِّكُمْ أَنِّي أَخْلُقُ لَكُمْ مِنَ الطيْنِ كَهَيْئَةِ الطَّيْرِ فَانْفُخُ فِيهِ فَيَكُونُ طَيْرًا بِإِذْنِ اللهِ وَأَبْرِئُ الْأَكْمَهَ وَالْأَبْرَصَ وَأَحْيِ الْمَوْتَى بِإِذْنِ اللَّهِ وَأُنَبِّئُكُمْ بِمَا تَأْكُلُونَ وَمَا تَدْخِرُونَ فِي بُيُوتِكُمْ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةً لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ ، وَمُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَى مِنَ التَّوْرَةِ وَلَأُحِلَّ لَكُمْ بَعْضَ الَّذِي حُرِّمَ عَلَيْكُمْ وَجِئْتُكُمْ بِآيَةٍ مِنْ رَبِّكُمْ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ ، إِنَّ اللَّهَ رَبِّي وَرَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ هَذَا صِرَاطٍ مُسْتَقِيمُ . فَلَمَّا أَحَسٌ عِيسَى مِنْهُمُ الْكُفْرَ قَالَ مَنْ أَنْصَارِي إِلَى اللَّهِ قَالَ الحَوَارِيُّونَ نَحْنُ أَنْصَارُ اللهِ أَمَنَّا بِاللهِ وَاشْهَدْ بَأَنَّا مُسْلِمُونَ . رَبَّنَا آمَنَّا بِمَا أَنْزَلْتَ وَاتَّبَعْنَا الرَّسُولَ فَاكْتُبْنَا مَعَ الشَّهِدِينَ ، وَمَكَرُوا وَمَكَرَ اللهُ وَاللَّهُ خَيْرُ المُكِرِينَ ، إِذْ قَالَ اللَّهُ يُعِيسَى إِنِّي مُتَوَفِّيْكَ وَرَافِعُكَ إِلَى وَمُطَهِّرُكَ مِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا وَجَاعِلُ الَّذِينَ اتَّبَعُوكَ فَوْقَ الَّذِينَ كَفَرُوا إِلَى يَوْمِ الْقِيمَةِ ثُمَّ إِلَى مَرْجِعُكُمْ فَاحْكُمُ بَيْنَكُمْ فِيْمَا كُنْتُمْ فِيْهِ تَخْتَلِفُونَ ، فَأَمَّا الَّذِينَ كَفَرُوا فَأَعَذِّبْهُمْ عَذَابًا شَدِيدًا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَمَا لَهُمْ مِنْ نُصِرِينَ ، وَأَمَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّلِحَتِ فَيُوَفِّيْهِمْ أُجُورَهُمْ وَاللهُ لا يُحِبُّ الظَّلِمِينَ .
"স্মরণ কর, যখন ফেরেশতাগণ বলিল, হে মারয়াম! আল্লাহ তোমাকে তাঁহার পক্ষ হইতে একটি কলেমার সুসংবাদ দিতেছেন। তাহার নাম মসীহ, মারয়াম তনয় ঈসা, সে ইহলোক ও পরলোকে সম্মানিত এবং সন্নিধ্যপ্রাপ্তগণের অন্যতম হইবে। সে দোলনায় থাকা অবস্থায় ও পরিণত বয়সে মানুষের সহিত কথা বলিবে এবং সে হইবে পুণ্যবানদের একজন। সে বলিল, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে কোন পুরুষ স্পর্শ করে নাই, আমার সন্তান হইবে কীভাবে? তিনি বলিলেন, এইভাবেই, আল্লাহ যাহা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। তিনি যখন কিছু স্থির করেন তখন বলেন, 'হও' এবং উহা হইয়া যায়। এবং তিনি তাহাকে শিক্ষা দিবেন কিতাব, হিকমত, তাওরাত ও ইনজীল এবং তাহাকে বনী ইসরাঈলের জন্য রাসূল করিবেন। সে বলিবে, আমি তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হইতে তোমাদের নিকট নিদর্শন লইয়া আসিয়াছি। আমি তোমাদের জন্য কর্দম দ্বারা একটি পক্ষীসদৃশ আকৃতি গঠন করিব, অতঃপর উহাতে আমি ফুৎকার দিব, ফলে আল্লাহ্র হুকুমে উহা পাখি হইয়া যাইবে। আমি জন্মান্ধ ও কুষ্ঠ ব্যাধিগ্রস্তকে নিরাময় করিব এবং আল্লাহ্র হুকুমে মৃতকে জীবন্ত করিব। তোমরা তোমাদের গৃহে যাহা আহার কর ও মওজুদ কর তাহা তোমাদিগকে বলিয়া দিব। তোমরা যদি মুমিন হও তবে উহাতে তোমাদের জন্য নিদর্শন রহিয়াছে। আমি আসিয়াছি তোমাদের সম্মুখে তাওরাতের যাহা রহিয়াছে উহার সমর্থকরূপে ও তাহাদের জন্য যাহা নিষিদ্ধ ছিল উহার কতগুলিকে বৈধ করিতে এবং আমি তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হইতে তোমাদের নিকট নিদর্শন লইয়া আসিয়াছি। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর আর আমাকে অনুসরণ কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার প্রতিপালক এবং তোমাদেরও প্রতিপালক, সুতরাং তোমরা তাঁহার ইবাদত করিবে। ইহাই সরল পথ। যখন ঈসা তাহাদের অবিশ্বাস উপলব্ধি করিল তখন সে বলিল, আল্লাহর পথে কাহারা আমার সাহায্যকারী? হাওয়ারীগণ বলিল, আমরাই আল্লাহ্ পথে সাহায্যকারী। আমরা আল্লাহে ঈমান আনিয়াছি। আমরা আত্মসমর্পণকারী, তুমি ইহার সাক্ষী থাক। হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি যাহা অবতীর্ণ করিয়াছ তাহাতে আমরা ঈমান আনিয়াছি এবং আমরা এই রাসূলের অনুসরণ করিয়াছি। সুতরাং আমাদিগকে সাক্ষ্যদানকারীদের তালিকাভুক্ত কর। আর তাহারা চক্রান্ত করিয়াছিল, আল্লাহও কৌশল করিয়াছিলেন, আল্লাহ কৌশলীদের শ্রেষ্ঠ। স্মরণ কর, যখন আল্লাহ বলিলেন, হে ঈসা! আমি তোমার কাল পূর্ণ করিতেছি এবং আমার নিকট তোমাকে তুলিয়া লইতেছি এবং যাহারা সত্যকে প্রত্যাখ্যান করিয়াছে তাহাদের মধ্য হইতে তোমাকে পবিত্র করিতেছি। আর তোমার অনুসারিগণকে কিয়ামত পর্যন্ত কাফিরদের উপর প্রাধান্য দিতেছি। অতঃপর আমার কাছে তোমাদের প্রত্যাবর্তন। তারপর যে বিষয়ে তোমাদের মতান্তর ঘটিতেছে আমি উহা মীমাংসা করিয়া দিব। যাহারা সত্য প্রত্যাখ্যান করিয়াছে আমি তাহাদিগকে ইহকালে ও পরকালে কঠোর শাস্তি প্রদান করিব এবং তাহাদের কোন সাহায্যকারী নাই। আর যাহারা ঈমান আনিয়াছে এবং সৎকর্ম করিয়াছে, তিনি তাহাদের প্রতিফল পুরাপুরিভাবে প্রদান করিবেন। আল্লাহ জালিমদেরকে পছন্দ করেন না" (৩:৪৫-৫৭)।

إِنَّ مَثَلَ عِيْسَى عِنْدَ اللَّهِ كَمَثَلِ أَدَمَ خَلَقَهُ مِنْ تُرَابٍ ثُمَّ قَالَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ
"আল্লাহর নিকট ঈসার দৃষ্টান্ত আদমের দৃষ্টান্ত সদৃশ। তিনি তাহাকে মৃত্তিকা হইতে সৃষ্টি করিয়াছিলেন, অতঃপর তাহাকে বলিয়াছিলেন, 'হও', ফলে সে হইয়া গেল" (৩ঃ ৫৯)।

قُلْ أَمَنَّا بِاللَّهِ وَمَا أُنْزِلَ عَلَيْنَا وَمَا أُنْزِلَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَاسْمُعِيلَ وَإِسْحَقَ وَيَعْقُوبَ وَالْأَسْبَاطِ وَمَا أُوتِيَ مُوسى وَعِيسَى وَمَا أُوتِيَ النَّبِيُّونَ مِنْ رَبِّهِمْ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّنْهُمْ وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ .
"বল, আমরা আল্লাহতে এবং আমাদের প্রতি যাহা অবতীর্ণ হইয়াছে এবং ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়া'কুব ও তাঁহার বংশধরগণের প্রতি যাহা অবর্তীর্ণ হইয়াছিল এবং যাহা মূসা ও অন্যান্য নবীগণকে তাহাদের প্রতিপালকের নিকট হইতে প্রদান করা হইয়াছে তাহাতে ঈমান আনিয়াছি, আমরা তাহাদের মধ্যে কোন তারতম্য করি না এবং তাঁহারই নিকট আত্মসমর্পণকারী" (৩:৮৪)।

وَبِكُفْرِهِمْ وَقَوْلِهِمْ عَلَى مَرْيَمَ بُهْتَانًا عَظِيمًا ، وَقَوْلِهِمْ إِنَّا قَتَلْنَا الْمَسِيحَ عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ رَسُولَ اللَّهِ وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ وَلَكِنْ شُبِّهَ لَهُمْ وَإِنَّ الَّذِينَ اخْتَلَفُوا فِيْهِ لَفِي شَكٍّ مِنْهُ مَا لَهُمْ بِهِ مِنْ عِلْمٍ إِلَّا اتَّبَاعَ الظَّنَّ وَمَا قَتَلُوهُ يَقِينَا . بَلْ رَّفَعَهُ اللَّهُ إِلَيْهِ وَكَانَ اللهُ عَزِيزًا حَكِيمًا ، وَإِنْ مِنْ أَهْلِ الْكِتَبِ إِلا لَيُؤْمِنُنَّ بِهِ قَبْلَ مَوْتِهِ وَيَوْمَ الْقِيمَةِ يَكُونُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا .
"এবং তাহারা লানত গ্রস্ত হইয়াছিল তাহাদের কুফুরীর জন্য ও মারয়ামের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের জন্য, আর আমরা আল্লাহর রাসূল মারয়াম তনয় ঈসা মসীহকে হত্যা করিয়াছি তাহাদের এই উক্তির জন্য। অথচ তাহারা তাহাকে হত্যা করে নাই, ক্রুশবিদ্ধও করে নাই, কিন্তু তাহাদের এইরূপ বিভ্রম হইয়াছিল। যাহারা তাহার বিরুদ্ধে মতভেদ করিয়াছিল তাহারা নিশ্চয়ই এই সম্বন্ধে সংশয়যুক্ত ছিল; এই সম্পর্কে অনুমানের অনুসরণ ব্যতীত তাহাদের কোন জ্ঞানই ছিল না। ইহা নিশ্চিত যে, তাহারা তাহাকে হত্যা করে নাই বরং আল্লাহ তাহাকে তাঁহার নিকট তুলিয়া লইয়াছেন; এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়। কিতাবীদের মধ্যে প্রত্যেকে তাহার মৃত্যুর পূর্বে তাহাকে বিশ্বাস করিবেই এবং কিয়ামতের দিন সে তাহাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে" (৪: ১৫৬-১৫৯)।

إِنَّا أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ كَمَا أَوْحَيْنَا إِلَى نُوحٍ وَالنَّبِيِّنَ مِنْ بَعْدِهِ وَأَوْحَيْنَا إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَعِيلَ وَإِسْحَقَ وَيَعْقُوبَ والأسباط وَعِيسَى وَأَيُّوبَ وَيُونُسَ وَهُرُونَ وَسُلَيْمَنَ وَآتَيْنَا دَاوُدَ زَبُورًا
"আমি তোমার নিকট ওহী প্রেরণ করিয়াছি, যেমন নূহ এবং তাহার পরবর্তী নবীগণের নিকট প্রেরণ করিয়াছিলাম, ইবরাহীম, ইয়া'কূব, ইসমাঈল, ইসহাক ও তাহার বংশধরগণ, ঈসা, আইয়ব, ইউনুস, হারুন এবং সুলায়মানের নিকটও ওহী প্রেরণ করিয়াছিলাম এবং দাউদকে যাবুর দিয়াছিলাম" (৪ঃ ১৬৩)।

يَأَهْلَ الْكِتٰبِ لَا تَغْلُوا فِي دِينِكُمْ وَلَا تَقُولُوا عَلَى اللهِ إِلا الْحَقَّ إِنَّمَا الْمَسِيحُ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ رَسُولُ اللَّهِ وَكَلِمَتُهُ الْقُهَا إِلَى مَرْيَمَ وَرُوْحٌ مِنْهُ فَامِنُوا بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ وَلَا تَقُولُوا ثَلْثَةٌ إِنْتَهُوا خَيْرًا لَكُمْ إِنَّمَا اللَّهُ إِلهُ وَاحِدٌ سُبْحْنَهُ أَنْ يَكُونَ لَهُ وَلَدٌ لَهُ مَا فِي السَّمواتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَكَفَى بِاللَّهِ وَكِيلاً ، لَنْ يُسْتَنْكِفَ الْمَسِيحُ أَنْ يَكُونَ عَبْدًا لِلَّهِ وَلَا المَلْئِكَةُ الْمُقَرِّبُونَ وَمَنْ يُسْتَنْكِفْ عَنْ عِبَادَتِهِ وَيَسْتَكْبِرْ فَسَيَحْشُرُهُمْ إِلَيْهِ جَمِيعًا
"হে কিতাবীগণ! তোমরা দীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করিও না এবং আল্লাহ সম্বন্ধে সত্য ব্যতীত বলিও না। মারয়াম তনয় ঈসা মসীহ তো আল্লাহ্র রাসূল এবং তাঁহার বাণী, যাহা তিনি মারয়ামের নিকট প্রেরণ করিয়াছিলেন ও তাঁহার আদেশ। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলে ঈমান আন এবং বলিও না, তিন। নিবৃত্ত হও, ইহা তোমাদের জন্য কল্যাণকর হইবে। আল্লাহ তো একমাত্র ইলাহ, তাঁহার সন্তান হইবে—তিনি ইহা হইতে পবিত্র। আসমানে যাহা কিছু আছে ও যমীনে যাহা কিছু আছে সব আল্লাহরই, কর্ম বিধানে আল্লাহই যথেষ্ট। মসীহ আল্লাহর বান্দা হাওয়াকে কখনো হেয় জ্ঞান করে না এবং ঘনিষ্ঠ ফেরেশতাগণও করে না। আর কেহ তাঁহার ইবাদতকে হেয় জ্ঞান করিলে এবং অহংকার করিলে তিনি তাহাদের সকলকে তাহার নিকট একত্র করিবেন" (৪:১৭১-১৭২)।

لَقَدْ كَفَرَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ هُوَ الْمَسِيحُ ابْنُ مَرْيَمَ قُلْ فَمَنْ يَمْلِكُ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا إِنْ أَرَادَ أَنْ يُهْلِكَ الْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَأُمَّهُ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا وَلِلَّهِ مُلْكُ السَّمَواتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ .
"যাহারা বলে, মারয়াম তনয় মসীহই আল্লাহ, তাহারা তো কুফরী করিয়াছেই। বল, আল্লাহ মারয়াম তনয় মসীহ, তাহার মাতা এবং দুনিয়ার সকলকে যদি ধ্বংস করিতে ইচ্ছা করেন, তবে তাঁহাকে বাঁধা দিবার শক্তি কাহার আছে? আসমানসমূহে ও যমীনে এবং ইহাদের মধ্যে যাহা কিছু আছে তাহার সার্বভৌমত্ব আল্লাহরই। তিনি যাহা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান" (৫ঃ১৭)।

وَقَفَّبْنَا عَلَى أَثَارِهِمْ بِعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ التَّوْرَةِ وَأَتَيْنُهُ الْإِنْجِيلَ فِيهِ هُدًى وَنُورٌ ومُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ التَّوْرَةِ وَهُدًى وَمَوْعِظَةً لِلْمُتَّقِينَ . وَلَيَحْكُمْ أَهْلُ الْإِنْجِيلِ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فِيهِ وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفُسِقُونَ .
"মারয়াম তনয় ঈসাকে তাহার পূর্বে অবতীর্ণ তাওরাতের সমর্থকরূপে উহাদের পশ্চাতে প্রেরণ করিয়াছিলাম এবং তাহার পূর্বে অবতীর্ণ তাওরাতের সমর্থকরূপে এবং মুত্তাকীদের জন্য পথের নির্দেশ ও উপদেশরূপে তাহাকে ইন্‌ন্জীল দিয়াছিলাম, ইহাতে ছিল পথের নির্দেশ ও আলো। ইনজীল অনুসারীগণ যেন আল্লাহ উহাতে যাহা অবতীর্ণ করিয়াছেন তদনুসারে বিধান দেয়। আল্লাহ যাহা অবতীর্ণ করিয়াছেন তদনুসারে যাহারা বিধান দেয় না তাহারা সত্যত্যাগী" (৫ঃ ৪৬-৪৭)।

لَقَدْ كَفَرَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ ثَالِثُ ثَلْقَةٍ وَمَا مِنْ إِله إِلا إِلهَ وَاحِدٌ وَإِنْ لَمْ يَنْتَهُوا عَمَّا يَقُولُونَ لَيَمَسَّنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ ، أَفَلَا يَتُوبُونَ إِلَى اللهِ وَيَسْتَغْفِرُونَهُ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ ، مَا الْمَسِيحُ ابْنُ مَرْيَمَ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ وَأُمَّهُ صِدِّيقَةٌ كَانَا يَأْكُلَانِ الطَّعَامَ أَنْظُرْ كَيْفَ نُبَيِّنَ لَهُمُ الْآيَاتِ ثُمَّ انْظُرْ أَنِّي يُؤْفَكُونَ
"যাহারা বলে, আল্লাহই মারয়াম তনয় মসীহ। তাহারা তো কুফরী করিয়াছেই। অথচ মসীহ বলিয়াছেন, হে বনু ইসরাঈল! তোমরা আমার প্রতিপালক আল্লাহর ইবাদত কর। কেহ আল্লাহর শরীক করিলে আল্লাহ তাহার জন্য জান্নাত নিষিদ্ধ করিবেন এবং তাহার আবাস জাহান্নাম। জালিমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নাই। যাহারা বলে, আল্লাহ তো তিনের মধ্যে একজন, তাহারা কুফরী করিয়াছেই-যদিও এক ইলাহ ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নাই। তাহারা যাহা বলে তাহা হইতে নিবৃত্ত না হইলে তাহাদের মধ্যে যাহারা কুফরী করিয়াছে তাহাদের উপর মর্মন্তুদ শাস্তি আপতিত হইবেই। তবে কি তাহারা আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করিবে না এবং তাঁহার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিবে না? আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। মারয়াম তনয় মসীহ তো কেবল একজন রাসূল; তাহার পূর্বে বহু রাসূল গত হইয়াছে এবং তাহার মাতা সত্যনিষ্ঠ ছিল। তাহারা উভয়ে খাদ্যাহার করিত। দেখ, আমি উহাদের জন্য আয়াতসমূহ কিরূপ বিশদভাবে বর্ণনা করি। আরও দেখ, উহারা কিভাবে সত্যবিমুখ হয়" (৫ : ৭২-৭৫)।

لُعِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ عَلَى لِسَانِ دَاوُدَ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ذَلِكَ بِمَا عَصَوْا وَكَانُوا يَعْتَدُونَ. كَانُوا لَا يَتَنَاهَوْنَ عَنْ مُنْكَرٍ فَعَلُوهُ لَبِئْسَ مَا كَانُوا يَفْعَلُونَ
"বনী ইসরাঈলের মধ্যে যাহারা কুফরী করিয়াছিল তাহারা দাউদ ও মারয়াম তনয় কর্তৃক অভিশপ্ত হইয়াছিল। ইহা এই হেতু যে, তাহারা ছিল অবাধ্য ও সীমালংঘনকারী। তাহারা যেসব গর্হিত কার্য করিত উহা হইতে তাহারা একে অন্যকে বারণ করিত না। তাহারা যাহা করিত তাহা কতই না নিকৃষ্ট" (৫ : ৭৮-৭৯)।

لَتَجِدَنَّ أَشَدَّ النَّاسِ عَدَاوَةً لِلَّذِينَ آمَنُوا الْيَهُودَ وَالَّذِينَ أَشْرَكُوا وَلَتَجِدَنَّ أَقْرَبَهُمْ مَوَدَةٌ لِلَّذِينَ آمَنُوا الَّذِينَ قَالُوا إِنَّا نَصْرَى ذَلِكَ بِأَنَّ مِنْهُمْ قِسَيْسِينَ وَرُهْبَانًا وَأَنَّهُمْ لَا يَسْتَكْبِرُونَ .
"অবশ্যই মুমিনদের প্রতি শত্রুতায় মানুষের মধ্যে ইয়াহুদী ও মুশরিকদিগকেই তুমি সর্বাধিক উগ্র দেখিবে এবং যাহারা বলে, 'আমরা খৃস্টান' মানুষের মধ্যে তাহাদিগকেই তুমি মুমিনদের নিকটতর বন্ধুরূপে দেখিবে। কারণ তাহাদের মধ্যে অনেক পণ্ডিত ও সংসারবিরাগী আছে, আর তাহারা অহংকারও করে না" (৫:৮২)।

إِذْ قَالَ اللهُ يُعِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ اذْكُرْ نِعْمَتِي عَلَيْكَ وَعَلَى وَالِدَتِكَ إِذْ أَيَّدَتُكَ بِرُوحِ الْقُدُسِ تُكَلِّمُ النَّاسَ فِي الْمَهْدِ وَكَهْلاً وَإِذْ عَلَّمْتُكَ الكتب والحِكْمَةَ وَالتَّوْرَاةَ وَالانْجِيلَ وَإِذْ تَخْلُقُ مِنَ الطَّيْنِ كَهَيْئَةِ الطَّيْرِ باذني فَتَنْفُخُ فِيهَا فَتَكُونُ طَيْرًا بِاذْنِي وَتُبْرِئُ الْأَكْمَهَ وَالْأَبْرَصَ بِاذْنِي وَاذْ تُخْرِجُ الْمَوْتَى بِاذْنِي وَإِذْ كَفَفْتُ بَنِي إِسْرَائِيلَ عَنْكَ إِذْ جِئْتَهُمْ بِالْبَيِّنَتِ فَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْهُمْ إِنْ هُذَا إِلَّا سِحْرٌ مُّبِينٌ .
"এবং যখন আল্লাহ বলিলেন, হে মারয়াম তনয় ঈসা! তোমার প্রতি ও তোমার জননীর প্রতি আমার অনুগ্রহ স্মরণ করঃ পবিত্র আত্মা দ্বারা আমি তোমাকে শক্তিশালী করিয়াছিলাম এবং তুমি দোলনায় থাকা অবস্থায় ও পরিণত বয়সে মানুষের সহিত কথা বলিতে, তোমাকে কিতাব, হিকমত, তাওরাত ও ইনজীল শিক্ষা দিয়াছিলাম, তুমি কর্দম দ্বারা আমার অনুমতিক্রমে পাখি সদৃশ আকৃতি গঠন করিতে এবং উহাতে ফুৎকার দিতে, ফলে আমার অনুমতিক্রমে উহা পাখি হইয়া যাইত। জন্মান্ধ ও কুষ্ঠ ব্যাধিগ্রস্তকে তুমি আমার অনুমতিক্রমে নিরাময় করিতে এবং আমার অনুমতিক্রমে মৃতকে জীবিত করিতে। আমি তোমা হইতে বনী ইসরাঈলকে নিবৃত্ত রাখিয়াছিলাম। তুমি যখন তাহাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শন আনিয়াছিলে তখন তাহাদের মধ্যে যাহারা কুফরী করিয়াছিল তাহারা বলিয়াছিল, ইহা তো স্পষ্ট যাদু" (৫: ১১০)।

وَإِذْ قَالَ اللَّهُ يُعِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ أَنْتَ قُلْتَ لِلنَّاسِ اتَّخِذُونِي وَأُمِّيَ الْهَيْنِ مِنْ دُوْنِ اللَّهِ قَالَ سُبْحْنَكَ مَا يَكُونُ لِي أَنْ أَقُولَ مَا لَيْسَ لِي بِحَقِّ إِنْ كُنْتُ قُلْتُهُ فَقَدْ عَلِمْتَهُ تَعْلَمُ مَا فِي نَفْسِي وَلَا أَعْلَمُ مَا فِي نَفْسِكَ إِنَّكَ أَنْتَ عَلامُ الْغُيُوبِ. مَا قُلْتُ لَهُمْ إِلا مَا أَمَرْتَنِي بِهِ أَنِ اعْبُدُوا اللهَ رَبِّي وَرَبَّكُمْ وَكُنْتُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا مَّا دُمْتُ فِيهِمْ فَلَمَّا تَوَفَّيْتَنِي كُنْتَ أَنْتَ الرَّقِيبَ عَلَيْهِمْ وَأَنْتَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدٌ . إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادَكَ وَأَنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ .
"আল্লাহ যখন বলিবেন, "হে মারইয়াম তনয় 'ঈসা! তুমি কি লোকদিগকে বলিয়াছিলে যে, তোমরা আল্লাহ্ ব্যতীত আমাকে ও আমার জননীকে দুই ইলারূপে গ্রহণ কর?" সে বলিবে, "তুমিই মহিমান্বিত! যাহা বলার অধিকার আমার নাই তাহা বলা আমার পক্ষে শোভন নহে। যদি আমি তা বলিতাম তবে তুমি তো তাহা জানিতে। আমার অন্তরের কথা তো তুমি অবগত আছ, কিন্তু তোমার অন্তরের কথা আমি অবগত নহি; তুমি তো অদৃশ্য সম্বন্ধে সম্যক পরিজ্ঞাত।" তুমি আমাকে যে আদেশ করিয়াছ তাহা ব্যতীত তাহাদিগকে আমি কিছুই বলি নাই, তাহা এইঃ "তোমরা আমার ও তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহর 'ইবাদত কর এবং যত দিন আমি তাহাদের মধ্যে ছিলাম তত দিন আমি ছিলাম তাহাদের কার্যকলাপের সাক্ষী, কিন্তু যখন তুমি আমাকে তুলিয়া লইলে তখন তুমিই তো ছিলে তাহাদের কার্যকলাপের তত্ত্বাবধায়ক এবং তুমিই সর্ববিষয়ে সাক্ষী।" "তুমি যদি তাহাদিগকে শাস্তি দাও তবে তাহারা তো তোমারই বান্দা, আর যদি তাহাদিগকে ক্ষমা কর তবে তুমি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়" (৫: ১১৬-১১৮)।

وَزَكَرِيَّا وَيَحْيَى وَعِيسَى وَالْيَاسَ كُلُّ مِنَ الصَّلِحِينَ .
"এবং যাকারিয়‍্যা, ইয়াহ্ইয়া, ঈসা এবং ইলয়াসকেও সৎপথে পরিচালিত করিয়াছিলাম; ইহারা সকলে সজ্জনদিগের অন্তর্ভুক্ত" (৬:৮৫)।

وَقَالَتِ الْيَهُودُ عُزَيْرُنِ ابْنُ اللَّهِ وَقَالَتِ النَّصْرَى المَسِيحُ ابْنُ اللهِ ذَلِكَ قَوْلُهُمْ بِأَفْوَاهِهِمْ يُضَاهِئُونَ قَوْلَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ قَبْلُ قَتَلَهُمُ اللَّهُ أَنَّى يُؤْفَكُونَ . اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَمَا أُمِرُوا إِلا لِيَعْبُدُوا إِلها واحداً لا إِلهَ إِلا هُوَ سُبْحُنَهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ .
"ইয়াহুদীরা বলে, উযায়র আল্লাহ্র পুত্র এবং খৃস্টানরা বলে, মসীহ আল্লাহ্র পুত্র। ইহা তাহাদের মুখের কথা। পূর্বে যাহারা কুফরী করিয়াছিল উহারা তাহাদের মত কথা বলে। আল্লাহ উহাদিগকে ধ্বংস করুন। আর কোন্ দিকে উহাদিগকে ফিরাইয়া দেওয়া হইয়াছে! তাহারা আল্লাহ ব্যতীত তাহাদের পণ্ডিতগণকে ও সংসার বিরাগিগণকে তাহাদের প্রভুরূপে গ্রহণ করিয়াছে এবং মারয়াম তনয় মসীহকেও। কিন্তু উহারা এক ইলাহের ইবাদত করিবার জন্যই আদিষ্ট হইয়াছিল। তিনি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নাই। তাহারা যাহাকে শরীক করে তাহা হইতে তিনি কত পবিত্র" (৯: ৩০-৩১)!

وَاذْكُرْ فِي الْكِتٰبِ مَرْيَمَ إِذِ انْتَبَذَتْ مِنْ أَهْلِهَا مَكَانًا شَرْقِيًّا . فَاتَّخَذَتْ مِنْ دُونِهِمْ حِجَابًا فَأَرْسَلْنَا إِلَيْهَا رُوحَنَا فَتَمَثَّلَ لَهَا بَشَرًا سَوِيًّا . قَالَتْ إِنِّي أَعُوذُ بِالرَّحْمَنِ مِنْكَ إِنْ كُنْتَ تَقِيًّا . قَالَ إِنَّمَا أَنَا رَسُولُ رَبِّكَ لاهَبَ لَكِ غُلُمَّا زَكِيًّا . قَالَتْ أَنَّى يَكُونُ لِي غُلْمٌ وَلَمْ يَمْسَسْنِي بَشَرٌ وَلَمْ أَكُ بَغِيًّا . قَالَ كَذَلِكَ قَالَ رَبُّكِ هُوَ عَلَى هَيِّنٌ وَلِنَجْعَلَهُ أَيَةٌ لِلنَّاسِ وَرَحْمَةً مِنَّا وَكَانَ أَمْرًا مَّقْضِيًّا . فَحَمَلَتْهُ فَانْتَبَذَتْ بِهِ مَكَانًا قَصِيًّا . فَأَجَاءَهَا الْمَخَاضُ إِلَى جِذْعِ النَّخْلَةِ قَالَتْ يُلَيْتَنِي مِنْ قَبْلَ هذا وَكُنْتُ نَسَبًا مَنْسِيًّا . فَنَادَهَا مِنْ تَحْتِهَا أَلَّا تَحْزَنِي قَدْ جَعَلَ رَبُّكِ تَحْتَكِ سَرِيًّا . وَهُزِّي إِلَيْكِ بِجِذْعِ النَّخْلَةِ تُسْقِطَ عَلَيْكِ رُطَبًا جَنِيًّا . فَكُلِي وَاشْرَبِي وَقَرِّى عَيْنًا فَإِمَّا تَرَيَنَّ مِنَ الْبَشَرِ أَحَدًا فَقُولِي إِنِّي نَذَرْتُ لِلرَّحْمَنِ صَوْمًا فَلَنْ أَكَلِمَ الْيَوْمَ إِنْسِيًّا . فَأَتَتْ بِهِ قَوْمَهَا تَحْمِلُهُ قَالُوا يُرْيَمُ لَقَدْ جِئْتِ شَيْئًا فَرِّيًّا . يَا أُخْتَ هَرُوْنَ مَا كَانَ أَبُوكِ امْرَأَ سَوْءٍ وَمَا كَانَتْ أُمُّكِ بَغِيًّا . فَأَشَارَتْ إِلَيْهِ قَالُوا كَيْفَ نُكَلِّمُ مَنْ كَانَ فِي الْمَهْدِ صَبِيًّا - قَالَ إِنِّي عَبْدُ اللَّهِ أُثْنِيَ الْكِتٰبَ وَجَعَلَنِي نَبِيًّا ، وَجَعَلَنِي مُبْرَكًا أَيْنَ مَا كُنْتُ وَأَوْصُنِي بِالصَّلوٰةِ والزكوة مَا دُمْتُ حَيًّا ، وبَرَّاً بِوَالِدَتِي وَلَمْ يَجْعَلْنِي جَبَّارًا شَقِيًّا . وَالسَّلٰمُ عَلَى يَوْمَ وُلِدْتُ وَيَوْمَ أَمُوْتُ وَيَوْمَ أُبْعَثُ حَيًّا . ذلكَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ قَوْلَ الْحَقِّ الَّذِي فِيهِ يَمْتَرُونَ. مَا كَانَ لِلَّهِ أَنْ يَتَّخِذَ مِنْ وَلَدٍ سُبْحْنَهُ إِذَا قَضَى أَمْرًا فَإِنَّمَا يَقُولُ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ. وَإِنَّ اللَّهَ رَبِّي وَرَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ هَذَا صِرَاطٌ مُسْتَقِيمُ .
"বর্ণনা কর এই কিতাবে উল্লিখিত মারয়ামের কথা, যখন সে তাহার পরিবারবর্গ হইতে পৃথক হইয়া নিরালায় পূর্বদিকে এক স্থানে আশ্রয় লইল, অতঃপর উহাদিগ হইতে পর্দা করিল। অতঃপর আমি তাহার নিকট আমার রূহকে পাঠাইলাম। সে তাহার নিকট পূর্ণ মানবাকৃতিতে আত্মপ্রকাশ করিল। মারয়াম বলিল, তুমি যদি আল্লাহকে ভয় কর তবে আমি তোমা হইতে দয়াময়-এর শরণ লইতেছি। সে বলিল, আমি তো তোমার প্রতিপালক প্রেরিত, তোমাকে এক পবিত্র পুত্র দান করিবার জন্য। মারয়াম বলিল, কেমন করিয়া আমার পুত্র হইবে যখন আমাকে কোন পুরুষ স্পর্শ করে নাই এবং আমি ব্যভিচারিণীও নহি? সে বলিল, এইরূপই হইবে। তোমার প্রতিপালক বলিয়াছেন, ইঁহা আমার জন্য সহজসাধ্য এবং আমি উহাকে এইজন্য সৃষ্টি করিব যেন সে হয় মানুষের জন্য এক নিদর্শন এবং আমার নিকট হইতে এক অনুগ্রহ। ইহা তো এক স্থিরীকৃত ব্যাপার। তৎপর সে গর্ভে উহাকে ধারণ করিল, অতঃপর তৎসহ এক দূরবর্তী স্থানে চলিয়া গেল। প্রসব বেদনা তাহাকে এক খর্জুর বৃক্ষতলে আশ্রয় লইতে বাধ্য করিল। সে বলিল, হায় ইহার পূর্বে আমি যদি মরিয়া যাইতাম ও লোকের স্মৃতি হইতে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হইতাম। ফেরেশতারা তাহার নিম্নপার্শ্ব হইতে আহবান করিয়া তাহাকে বলিল, তুমি দুঃখ করিও না, তোমার পাদদেশে তোমার প্রতিপালক এক নহর সৃষ্টি করিয়াছেন, তুমি তোমার দিকে খর্জুর বৃক্ষের কাণ্ড নাড়া দাও, উহা তোমাকে সুপক্ক তাজা খর্জুর দান করিবে। সুতরাং আহার কর, পান কর ও চক্ষু জুড়াও। মানুষের মধ্যে কাহাকেও যদি তুমি দেখ তখন বলিও, আমি দয়াময়ের উদ্দেশে মৌনতা অবলম্বনের মানত করিয়াছি। সুতরাং আজ আমি কিছুতেই কোন মানুষের সহিত বাক্যালাপ করিব না। অতঃপর সে সন্তানকে লইয়া তাহার সম্প্রদায়ের নিকট উপস্থিত হইল। উহারা বলিল, হে মারয়াম! তুমি তো এক অদ্ভুত কাণ্ড করিয়া বসিয়াছ। হে হারুন ভগ্নি! তোমার পিতা অসৎ ব্যক্তি ছিল না এবং তোমার মাতাও ছিল না ব্যভিচারিণী। অতঃপর মারয়াম সন্তানের প্রতি ইংগিত করিল। উহারা বলিল, যে কোলের শিশু তাহার সহিত আমরা কেমন' করিয়া কথা বলিব? সে বলিল, আমি তো আল্লাহর বান্দা। তিনি আমাকে কিতাব দিয়াছেন, আমাকে নবী করিয়াছেন। যেখানেই আমি থাকি না কেন তিনি আমাকে বরকতময় করিয়াছেন। তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়াছেন যত দিন জীবিত থাকি তত দিন সালাত ও যাকাত আদায় করিতে, আর আমাকে আমার মাতার প্রতি অনুগত করিয়াছেন এবং তিনি আমাকে করেন নাই উদ্ধত ও হতভাগ্য। আমার প্রতি শান্তি যেদিন আমি জন্মলাভ করিয়াছি, যেদিন আমার মৃত্যু হইবে এবং যেদিন জীবিত অবস্থায় আমি পুনরুত্থিত হইব। এই-ই মারয়াম তনয় ঈসা। আমি বলিলাম সত্য কথা, যে বিষয়ে উহারা বিতর্ক করে। সন্তান গ্রহণ করা আল্লাহ্র কাজ নহে; তিনি পবিত্র, মহিমাময়। তিনি যখন কিছু স্থির করেন তখন বলেন, 'হও' এবং উহা হইয়া যায়। আল্লাহ্ আমার প্রতিপালক ও তোমাদের প্রতিপালক। সুতরাং তোমরা তাঁহার ইবাদত কর, ইহাই সরল পথ" (১৯ : ১৬-৩৬)।

وَجَعَلْنَا ابْنَ مَرْيَمَ وَأُمَّهُ أَيَةً وَأَوَيْنُهُمَا إِلى ربوة ذات قَرَارٍ ومَعِين .
"এবং আমি মারয়াম তনয় ও তাহার জননীকে করিয়াছিলাম এক নিদর্শন, তাহাদিগকে আশ্রয় দিয়াছিলাম এক নিরাপদ ও প্রস্রবণ বিশিষ্ট উচ্চ ভূমিতে" (২৩:৫০)।

وَاِذْ أَخَذْنَا مِنَ النَّبِيِّنَ مِيْثَاقَهُمْ وَمِنْكَ وَمِنْ نُوحٍ وَأَبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ وَأَخَذْنَا مِنْهُمْ مِيثَاقًا غليظا
"স্মরণ কর যখন আমি নবীদের নিকট হইতে অংগীকার গ্রহণ করিয়াছিলাম এবং তোমার নিকট হইতেও এবং নূহ, ইবরাহীম, মূসা, মারয়াম তনয় ঈসার নিকট হইতেও। তাহাদের নিকট হইতে গ্রহণ করিয়াছিলাম দৃঢ় অংগীকার" (৩৩ঃ ৭)।

شَرَعَ لَكُمْ مِنَ الدِّيْنِ مَا وَصَّى بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيْهِ كَبُرَ عَلَى الْمُشْرِكِينَ مَا تَدْعُوهُمْ إِلَيْهِ اللَّهُ يَجْتَبِي إِلَيْهِ مَنْ يَشَاءُ وَيَهْدِي إِلَيْهِ مَنْ يُنيبُ .
"তিনি তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করিয়াছেন দীন, যাহার নির্দেশ দিয়াছিলেন তিনি নূহকে আর আমি যাহা ওহী করিয়াছি তোমাকে এবং যাহার নির্দেশ দিয়াছিলাম ইবরাহীম, মূসা ও ঈসাকে, এই বলিয়া যে, তোমরা দীনকে প্রতিষ্ঠিত কর এবং উহাতে মতভেদ করিও না। তুমি মুশরিকদিগকে যাহার প্রতি আহবান করিতেছ তাহা উহাদের নিকট দুর্বহ মনে হয়। আল্লাহ যাহাকে, ইচ্ছা দীনের প্রতি আকৃষ্ট করেন এবং যে তাঁহার অভিমুখী তাহাকে দীনের দিকে পরিচালিত করেন" (৪২: ১৩)।

وَلَمَّا ضُرِبَ ابْنُ مَرْيَمَ مَثَلاً إِذَا قَوْمُكَ مِنْهُ يَصِدُّونَ
"যখন মারয়াম তনয়ের দৃষ্টান্ত উপস্থিত করা হয়, তখন তোমার সম্প্রদায় শোরগোল আরম্ভ করিয়া দেয়" (৪৩:৫৭)।

إِنْ هُوَ إِلا عَبْدُ أَنْعَمْنَا عَلَيْهِ وَجَعَلْنَهُ مَثَلاً لِبَنِي إِسْرَاءيْلَ
"সেতো ছিল আমারই এক বান্দা যাহাকে আমি অনুগ্রহ করিয়াছিলাম এবং করিয়াছিলাম বনী ইসরাঈলের জন্য দৃষ্টান্ত" (৪৩:৫৯)।

وَلَمَّا جَاءَ عِيسَى بِالْبَيِّنَتِ قَالَ قَدْ جِئْتُكُمْ بِالْحِكْمَةِ وَلَأُبَيِّنَ لَكُمْ بَعْضَ الَّذِي تَخْتَلِفُونَ فِيهِ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ إِنَّ اللَّهَ هُوَ رَبِّي وَرَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ هَذَا صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٌ . فَاخْتَلَفَ الْأَحْزَابُ مِنْ بَيْنِهِمْ فَوَيْلٌ لِلَّذِينَ ظَلَمُوا مِنْ عَذَابِ يَوْمِ الِيم .
"ঈসা যখন স্পষ্ট নিদর্শনসহ আসিল তখন সে বলিয়াছিল, আমি তো তোমাদের নিকট আসিয়াছি প্রজ্ঞাসহ এবং তোমরা যে বিষয়ে মতভেদ করিতেছ তাহা স্পষ্ট করিয়া দিবার জন্য। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার অনুসরণ কর। আল্লাহই তো আমার প্রতিপালক এবং তোমাদেরও প্রতিপালক। অতএব তোমরা তাঁহার ইবাদত কর; ইহাই সরল পথ। অতঃপর উহাদের বিভিন্ন দল মতানৈক্য সৃষ্টি করিল; সুতরাং জালিমদের জন্য দুর্ভোগ মর্মন্তুদ দিবসের শাস্তির" (৪৩: ৬৩-৬৫)।

ثُمَّ قَفَّيْنَا عَلَى آثَارِهِمْ بِرُسُلِنَا وَقَفَّيْنَا بِعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ وَأَتَيْنَهُ الْإِنْجِيلَ وَجَعَلْنَا فِي قُلُوبِ الَّذِينَ اتَّبَعُوهُ رَافَةً وَرَحْمَةً وَرَهْبَانِيَّةٌ ابْتَدَعُوهَا مَا كَتَبْنَهَا عَلَيْهِمْ إِلا ابْتِغَاءَ رِضْوَانِ اللَّهِ فَمَا رَعَوْهَا حَقَّ رِعَايَتِهَا فَأَتَيْنَا الَّذِينَ آمَنُوا مِنْهُمْ أَجْرَهُمْ وَكَثِيرٌ مِّنْهُمْ فَسِقُونَ .
"অতঃপর আমি তাহাদেরকে পশ্চাতে অনুগামী করিয়াছিলাম আমার রাসূলগণকে এবং অনুগামী করিয়াছিলাম মারয়াম তনয় ঈসাকে, আর তাহাকে দিয়াছিলাম ইনজীল এবং তাহার অনুসারীদের অন্তরে দিয়াছিলাম করুণা ও দায়। কিন্তু সন্ন্যাসবাদ- ইহা তো উহারা নিজেরাই আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের জন্য প্রবর্তন করিয়াছিল। আমি উহাদিগকে ইহার বিধান দেই নাই। অথচ ইহাও উহারা যথাযথভাবে পালন করে নাই। উহাদের মধ্যে যাহারা ঈমান আনিয়াছিল, উহাদিগকে আমি- দিয়াছিলাম পুরস্কার এবং উহাদের অধিকাংশই সত্যত্যাগী" (৫৭: ২৭)।

وَإِذْ قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ يُبَنِي إِسْرَاءِيلَ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَى مِنَ التَّوْرَاةِ وَمُبَشِّرًا بِرَسُولٍ يَأْتِي مِنْ بَعْدِي اسْمُهُ أَحْمَدُ فَلَمَّا جَاءَهُمْ بِالْبَيِّنَتِ قَالُوا هَذَا سِحْرٌ مُّبِينٌ .
"স্মরণ কর, মারয়াম তনয় ঈসা বলিয়াছিল, হে বানু ইসরাঈল! আমি তোমাদের নিকট আল্লাহ্র রাসূল এবং আমার পূর্ব হইতে তোমাদের নিকট যে তাওরাত রহিয়াছে আমি তাহার সমর্থক এবং আমার পরে আহমাদ নামে যে রাসূল আসিবে আমি তাহার সুসংবাদদাতা। পরে সে যখন স্পষ্ট নিদর্শনসহ উহাদের নিকট আসিল তখন উহারা বলিতে লাগিল, ইহা তো এক স্পষ্ট যাদু" (৬১:৬)।

يُأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا أَنْصَارَ اللهِ كَمَا قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ لِلحَوَارِينَ مَنْ أَنْصَارِي إِلَى اللَّهِ قَالَ الحَوَارِبُونَ نَحْنُ أَنْصَارُ اللَّهِ فَأَمَنَتْ طَائِفَةٌ مِّنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ وَكَفَرَتْ طَائِفَةً فَأَيْدَنَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَى عَدُوِّهِمْ فَأَصْبَحُوا ظَهِرِينَ
"হে মু'মিনগণ আল্লাহর দীনের সাহায্যকারী হও, যেমন মারয়াম তনয় ঈসা হাওয়ারীগণকে বলিয়াছিল, আল্লাহর পথে কে আমার সাহায্যকারী হইবে? হাওয়ারীগণ বলিয়াছিল, আমরাই আল্লাহর পথে সাহায্যকারী। অতঃপর বনী ইসরাঈলের একদল ঈমান আনিল এবং একদল কুফরী করিল। পরে আমি মু'মিনদেরকে শক্তিশালী করিলাম তাহাদের শত্রুদিগের মুকাবিলায়; ফলে তাহারা বিজয়ী হইল" (৬১: ১৪)।

وَمَرْيَمَ ابْنَتَ عِمْرَنَ الَّتِي أَحْصَنَتْ فَرْجَهَا فَنَفَحْنَا فِيهِ مِنْ رُوحِنَا وَصَدَّقَتْ بِكَلِمَتِ رَبِّهَا وَكُتُبِهِ وَكَانَتْ مِنَ الفنتين.
"আরও দৃষ্টান্ত দিতেছেন ইমরান-তনয়া মারয়ামের, যে তাহার সতীত্ব রক্ষা করিয়াছিল, ফলে আমি তাহার মধ্যে রূহ ফুঁকিয়া দিয়াছিলাম এবং সে তাহার প্রতিপালকের বাণী ও তাঁহার কিতাবসমূহ সত্য বলিয়া গ্রহণ করিয়াছিল; সি ছিল অনুগতদের একজন" (৬৬: ১২)।

এই আয়াতে রূহ বলিতে হযরত ঈসা (আ)-এর রূহকেই বুঝানো হইয়াছে।

এখানে স্মর্তব্য যে, মহানবী (স)-এর হাদীছের পাশাপাশি তাঁহার সাহাবীগণ হইতে ও ইসরাঈলী উৎস হইতে যেসব বর্ণনা পাওয়া যায়, সেইগুলি নব্য ইসলাম ধর্মগ্রহণকারী সাহাবীগণ হইতে গ্রহণ করা হইয়াছে বলিয়া প্রতীয়মান হয়। তন্মধ্যে কা'ব আল-আহবার (র) ও ওয়াহব ইবন মুনাব্বিহ (র) প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ঈসা (আ)-এর ইন্জীল সম্পর্কে আল কুরআন

📄 ঈসা (আ)-এর ইন্জীল সম্পর্কে আল কুরআন


যুগে যুগে মানব সমাজে যে সমস্ত আসমানী গ্রন্থ অবতীর্ণ হইয়াছে তন্মধ্যে ইন্‌ঞ্জীলের প্রসঙ্গটি আল-কুরআনে অত্যন্ত গুরুত্বের সহিত বর্ণিত হইয়াছে। খোদ ইন্‌ন্জীল শব্দটি ৬টি সূরার ১২টি আয়াতে বারটি স্থানে উল্লেখ করা হইয়াছে (দ্র. মুহাম্মাদ ফুআদ আবদুল বাকী, আল-মু'জাম আল-মুফাস্ লি আলফাজিল কুরআনিল কারীম, page ৬৮৮)। সেই স্থানগুলি নিম্নরূপ: (১) ৩:৩, ৪৮, ৬৫; (২) ৫:৪৬, ৪৭, ৬৬, ৬৮, ১১০; (৩) ৭৫:১৫৭; (৪) ৯:১১১; (৫) ৪৮: ২৯; (৬) ৫৭:২৭।
উপরিউক্ত আয়াতগুলিতে হযরত ঈসা (আ)-কে প্রদত্ত ইন্জীল সম্পর্কেও যথাযথ মর্যাদা প্রদর্শনমূলক মৌলিক তথ্য প্রদান করা হইয়াছে এবং ইন্‌ন্জীল নাযিল হওয়ার পর এই গ্রন্থের ব্যাপারে খৃস্টানদের ভূমিকা সম্পর্কেও আলোকপাত করা হইয়াছে। আল-কুরআনে এই গ্রন্থ সম্পর্কে নিম্নরূপ তথ্য উপস্থাপন করা হইয়াছে।
(১) ইন্‌ন্জীল আল্লাহ প্রদত্ত আসমানী গ্রন্থঃ আল-কুরআনে স্পষ্ট ঘোষণা করা হয় যে, তাওরাত ও আল-কুরআনুল কারীমের মত ইন্‌ন্জীলও আল্লাহর পক্ষ হইতে নাযিলকৃত একটি আসমানী গ্রন্থের নাম। ইরশাদ হইয়াছে:
اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ. نَزَّلَ عَلَيْكَ الْكِتَبَ بِالحَقِّ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيْهِ وَأَنْزَلَ السُّورَةَ وَالْإِنْجِيلَ مِنْ قَبْلُ هُدًى لِلنَّاسِ وَأَنْزَلَ الْفُرْقَانَ إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا بِأَ يُتِ اللَّهِ لَهُمْ عَذَابٌ شَدِيدٌ ، وَاللَّهُ عَزِيزٌ ذُو انْتِقَامِ.
"আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নাই, তিনি চিরঞ্জীব, সর্বসত্তার ধারক। তিনি সত্যসহ তোমার প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করিয়াছেন, যাহা উহার পূর্বের কিতাবের সমর্থক। আর তিনি অবতীর্ণ করিয়াছিলেন তাওরাত ও ইন্‌ন্জীল, ইতোপূর্বে মানবজাতির সৎপথ প্রদর্শনের জন্য; এবং তিনি ফুরকানও অবতীর্ণ করিয়াছেন। যাহারা আল্লাহর নিদর্শনকে প্রত্যাখ্যান করে তাহাদের জন্য কঠোর শাস্তি আছে। আল্লাহ মহা পরাক্রমশালী, দণ্ডদাতা" (৩: ২-৪)।
উল্লেখ্য, উক্ত আয়াতে ফুরকান দ্বারা শেষ আসমানী গ্রন্থ আল-কুরআনকে বুঝাইয়াছে, যাহার পূর্বেই তাওরাত ও ইন্‌ন্জীল নাযিল করা হইয়াছিল।
(২) ইন্‌ন্জীল গ্রন্থ হযরত ঈসা (আ)-এর উপর অবতীর্ণ : ইন্জীল গ্রন্থটি যে ঈসা (আ)-এর উপর অবতীর্ণ করা হয় ইহা স্পষ্টভাবে বারবার উল্লেখ করা হইয়াছে। যেমন ইরশাদ হইয়াছে:
ثُمَّ قَفَّيْنَا عَلَى أَثَارِهِمْ بِرُسُلِنَا وَقَفَّيْنَا بِعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ وَأَتَيْنُهُ الْإِنْجِيلَ.
"অতঃপর আমি তাহাদের পশ্চাতে অনুগামী করিয়াছিলাম আমার রাসূলগণকে এবং অনুগামী করিয়াছিলাম মারয়াম তনয় ঈসাকে, আর তাহাকে দিয়াছিলাম ইন্‌ন্জীল" (৫৭:২৭)।
(৩) ইন্‌ন্জীল ছিল পথনির্দেশ ও আলোর উৎস: ইহা ছিল মানব জীবন পরিচালনার দিকনির্দেশনায় ভরপুর, যাহার অনুসরণ করিলে সেই সময়ে মানব জীবনে অন্ধকার দুরীভূত হইয়া জীবন চলার পথ আলোকিত হইত। ইরশাদ হইয়াছে:
وَقَفَّيْنَا عَلَى أَثَارِهِمْ بِعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ التَّوْرَةِ. وَأَتَيْنُهُ الْإِنْجِيلَ فِيْهِ هُدًى ونور .
"মারয়াম তনয় ঈসাকে তাহার পূর্বে অবতীর্ণ তাওরাতের সমর্থকরূপে উহাদের পশ্চাতে প্রেরণ করিয়াছিলাম এবং তাহার পূর্বে অবতীর্ণ তাওরাতের সমর্থকরূপে এবং মুত্তাকীদের জন্য পথের নির্দেশ ও উপদেশরূপে তাহাকে ইন্‌ঞ্জীল দিয়াছিলাম, উহাতে ছিল পথের নির্দেশ ও আলো" (৫:৪৬)।
(৪) ইন্‌ন্জীল কিতাব তাওরাতের সত্যায়নকারী : মূসা (আ)-এর উপর নাযিলকৃত তাওরাতের মৌলিক শিক্ষার মধ্যে ঈসা (আ)-এর জীবনকালে যাহা কিছু সুরক্ষিত ছিল হযরত ঈসা (আ) তাহা নিজে মানিতেন এবং ইন্‌ন্জীল কিতাবও উহার সত্যতা প্রমাণ করিত (দ্র. মথি, ৫ : ১৭-১৮)। ইন্‌ন্জীলের শরীআত ছিল তাওরাতেরই পরিপূরক ও সমর্থক। ইন্‌ন্জীল দ্বারা তাওরাতের বিধান খুব অল্পই রহিত করা হয়। তাওরাতের শিক্ষার সমর্থনকারী ইন্‌ন্জীলের এই ভূমিকার কথা আল-কুরআনে উল্লেখ করা হইয়াছে:
وأَتَيْنُهُ الإِنْجِيلَ فِيهِ هُدًى وَنُورُ . وَمُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ التَّوْرَةِ .
"আর আমি তাহাকে ইন্‌ন্জীল প্রদান করিয়াছিলাম যাহার মধ্যে রহিয়াছে হিদায়াত ও আলো, আর উহা সত্যতা নিরূপণকারী পশ্চাতের বিষয়াদির তাওরাতের" (৫:৪৬)।
(৫) ইন্‌ন্জীল ছিল মুত্তাকীদের জন্য হেদায়াত ও উপদেশ বাণীতে সমৃদ্ধ: আল-কুরআনে আরও ঘোষণা করা হয় যে, জীবনে যারা তাকওয়া অবলম্বন করিতে চায়, তাহাদের জন্য ইন্‌ঞ্জীলে অনেক শিক্ষণীয় বিষয় রহিয়াছে। এমন নসীহত ও হৃদয়গ্রাহী কথাবার্তা রহিয়াছে যাহা দ্বারা তাহারা উপকৃত হইবে। তাহাদের হৃদয় মনে আলোড়ন সৃষ্টি করিবে। তাই উপরিউক্ত আয়াতে ইন্‌ন্জীল সম্পর্কে আর ও বলা হয়:
وَهُدًى وَمَوْعِظَةً لِلْمُتَّقِينَ
"আর আল্লাহভীরু লোকদের জন্য পূর্ণাঙ্গ হেদায়াত ও নসীহত ছিল" (৫:৪৬)।
(৬) ইন্‌ন্জীল ছিল ঈসা (আ)-এর উপর আল্লাহ্ পাকের স্মরণীয় নি'মত:
وَإِذْ قَالَ اللَّهُ يُعِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ اذْكُرْ نِعْمَتِي عَلَيْكَ وَعَلَى وَالِدَتِكَ إِذْ أَيَّدَتُكَ بِرُوحِ الْقُدُسِ تُكَلِّمُ النَّاسَ في الْمَهْدِ وَكَهْلاً وَاذْ عَلَّمْتُكَ الْكِتَبَ والحِكْمَةَ وَالتَّوْرَاةَ وَالانْجِيلَ .
"আল্লাহ বলিবেন, হে মারয়াম তনয় ঈসা! তোমার প্রতি ও তোমার জননীর প্রতি আমার অনুগ্রহ স্মরণ কর। পবিত্র আত্মা দ্বারা আমি তোমাকে শক্তিশালী করিয়াছিলাম এবং তুমি দোলনায় থাকা অবস্থায় ও পরিণত বয়সে মানুষের সহিত কথা বলিতে, তোমাকে কিতাব, হিকমত, তাওরাত ও ইন্‌ন্জীল শিক্ষা দিয়াছিলাম" (৫:১১০)।
(৭) ইন্‌ন্জীল ছিল খৃস্ট সমাজের জন্য বিশেষ বিধান: আল-কুরআনে উল্লেখ আছে যে, ইন্‌ন্জীলে আল্লাহ্র নাযিল করা এমন আইন-কানুন ছিল যাহার দ্বারা তাহারা বিতর্কিত ও মতানৈক্যপূর্ণ বিষয়ে ফয়সালা ও বিচার করিত। ইরশাদ হইয়াছে:
وَلَيَحْكُمْ أَهْلُ الْإِنْجِيلِ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فِيْهِ وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفُسِقُونَ .
"ইন্‌ন্জীল বিশ্বাসিগণ উহাতে আল্লাহ্র নাযিল করা আইন অনুযায়ী যেন ফয়সালা ও বিচার করে। আর যাহারাই আল্লাহ্ নাযিল করা আইন অনুযায়ী বিচার ফায়সালা করিবে না, তাহারাই ফাসেক" (৫:৪৭)।
وَلَمَّا جَاءَ عِيسَى بِالْبَيِّنَتِ قَالَ قَدْ جِئْتُكُمْ بِالْحِكْمَةِ وَلِأُبَيِّنَ لَكُمْ بَعْضَ الَّذِي تَخْتَلِفُونَ فِيهِ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ إِنَّ اللَّهَ هُوَ رَبِّي وَرَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ هَذَا صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمُ.
"ঈসা যখন স্পষ্ট নিদর্শনসহ আসিল, সে বলিয়াছিল, আমি তো তোমাদিগের নিকট আসিয়াছি প্রজ্ঞাসহ এবং তোমরা যে বিষয়ে মতভেদ করিতেছ তাহা স্পষ্ট করিয়া দিবার জন্য। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার অনুসরণ কর। আল্লাহই তো আমার প্রতিপালক এবং তোমাদিগেরও প্রতিপালক। অতএব তোমরা তাঁহার ইবাদত কর; ইহাই সরল পথ" (৪৩:৬৩)।
(৮) ইন্জীল বানু ইসরাঈলের উন্নতি ও সমৃদ্ধির চাবিকাঠি:
وَلَوْ أَنَّهُمْ أَقَامُوا التَّوْرَةَ وَالْإِنْجِيلَ وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْهِمْ مَنْ رَّبِّهِمْ لَا كَلُوا مِنْ فَوْقِهِمْ وَمِنْ تَحْتِ أَرْجُلِهِمْ مِنْهُمْ أُمَّةٌ مُقْتَصِدَةً وَكَثِيرٌ مِّنْهُمْ سَاءَ مَا يَعْمَلُونَ .
"তাহারা যদি তাওরাত, ইন্‌ন্জীল ও তাহাদের প্রতিপালকের নিকট হইতে তাহাদের প্রতি যাহা অবতীর্ণ হইয়াছে তাহা প্রতিষ্ঠিত করিত তাহা হইলে তাহারা তাহাদের উপর ও পদতল হইতে আহার্য লাভ করিত। তাহাদের মধ্যে একদল রহিয়াছে যাহারা মধ্যপন্থী, কিন্তু তাহাদের অধিকাংশ যাহা করে তাহা নিকৃষ্ট" (৫: ৬৬)।
(৯) আল-কুরআন ইন্‌ন্জীল গ্রন্থের সত্যায়নকারী: অতীত আসমানী গ্রন্থাবলীর মধ্য হইতে যাহা কিছু অবিকৃত অবস্থায় রহিয়াছে আল-কুরআন উহার সত্যতা স্বীকার করে এবং যাহা বিকৃত ও পরিবর্তিত তাহা সংশোধন করিয়াছে। এখন যাহা কিছু কুরআনের অনুরূপ ও উহার সহিত সংগতিপূর্ণ বলিয়া বিবেচিত হইবে তাহাই আল্লাহর কালাম মনে করিতে হইবে। এই মর্মে ইরশাদ হইয়াছে:
وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَبَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ الْكِتَبِ وَمُهَيْمِنًا عَلَيْهِ فَاحْكُمْ بَيْنَهُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ لِكُلٍّ جَعَلْنَا مِنْكُمْ شِرْعَةً وَمِنْهَاجًا وَلَوْ شَاءَ اللَّهُ لَجَعَلَكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً وَلَكِنْ لِيَبْلُوكُمْ فِي مَا أَتْكُمْ فَاسْتَبِقُوا الْخَيْرَاتِ إِلَى اللَّهِ مَرْجِعُكُمْ جَمِيعًا فَيُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنْتُمْ فِيهِ تَخْتَلِفُونَ .
"তোমাদের প্রতি সত্যসহ কিতাব অবতীর্ণ করিয়াছি ইহার পূর্বে অবতীর্ণ কিতাবের সমর্থক ও সংরক্ষকরূপে। সুতরাং আল্লাহ যাহা অবতীর্ণ করিয়াছেন তদনুসারে তুমি তাহাদের বিচার নিষ্পত্তি করিও এবং যে সত্য তোমার নিকট আসিয়াছে তাহা ত্যাগ করিয়া তাহাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করিও না। তোমাদের প্রত্যেকের জন্য আইন ও স্পষ্ট পথ নির্ধারণ করিয়াছি। ইচ্ছা করিলে আল্লাহ তোমাদিগকে এক জাতি করিতে পারিতেন। কিন্তু তিনি তোমাদিগকে যাহা দিয়াছেন তদ্দ্বারা তোমাদিগকে পরীক্ষা করিতে চাহেন। সুতরাং সৎকর্মে তোমরা প্রতিযোগিতা কর। আল্লাহ্ দিকেই তোমাদের সকলের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর তোমরা যে বিষয়ে মতভেদ করিতে সে সম্বন্ধে তিনি তোমাদিগকে অবহিত করিবেন" (৫:৪৮)।
(১০) ইন্জীলের কিছু কিছু বিষয় আল-কুরআনের সহিত সাদৃশ্যপূর্ণ:
إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَى مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَيَقْتُلُونَ وَيُقْتَلُونَ وَعْدًا عَلَيْهِ حَقًّا فِي التَّوْرَةِ وَالْإِنْجِيلِ وَالْقُرْآنِ وَمَنْ أَوْفَى بِعَهْدِهِ مِنَ اللَّهِ فَاسْتَبْشِرُوا بِبَيْعِكُمُ الَّذِي بَايَعْتُمْ بِهِ وَذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ .
"আল্লাহ্ মু'মিনদিগের নিকট হইতে তাহাদিগের জীবন ও সম্পদ ক্রয় করিয়া লইয়াছেন, তাহাদিগের জন্য জান্নাত আছে ইহার বিনিময়ে। তাহারা আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে, নিধন করে ও নিহত হয়। তাওরাত, ইন্‌ন্জীল ও কুরআনে এই সম্পর্কে তাহাদের দৃঢ় প্রতিশ্রুতি রহিয়াছে। নিজ প্রতিজ্ঞা পালনে আল্লাহ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর কে আছে? তোমরা যে সওদা করিয়াছ সেই সওদার জন্য আনন্দ কর এবং উহাই মহা সাফল্য" (৯:১১১)।
উপরিউক্ত বাণীটির কিছু ইঙ্গিত বর্তমানে প্রচলিত বাইবেলে পাওয়া যায়। যেমন: "ধন্য যাহারা ধার্মিকতার জন্য তাড়িত হইয়াছে, কারণ স্বর্গরাজ্য তাহাদেরই" (মথি সুসমাচার, ৫: ১০)।
এই গ্রন্থের অন্যত্র আরও বলা হইয়াছে: "আর যে কোন ব্যক্তি আমার নামের জন্য বাটি, কি ভ্রাতা, কি ভাগিনা, কি পিতা, কি মাতা, কি সন্তান, কি গোত্র পরিত্যাগ করিয়াছে সে তাহার মত গুণ পাইবে; এবং অনন্ত জীবনের অধিকারী হইবে" (মথি সুসমাচার, ১৯: ২৯)।
(১১) ইন্‌ন্জীল হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর নবুওয়তের দলীল : ইন্জীলকে শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর নবুওয়তের দলীল হিসাবে পেশ করা হইয়াছে। কেননা সেই ইন্‌ন্জীলে মহানবী (স)-এর শুভাগমনের সুসংবাদ ছিল, তাঁহার পরিচিতিমূলক গুণাবলী আলোচনা করা হইয়াছিল। এই মর্মে ইরশাদ হইয়াছে:
الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوبًا عِنْدَهُمْ فِي التَّوْرَةِ وَالْإِنْجِيلِ يَأْمُرُهُمْ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهُهُمْ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الخَبَئِثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلُلَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ .
"যাহারা অনুসরণ করে বার্তাবাহক উম্মী নবীর, যাহার উল্লেখ তাহারা লিপিবদ্ধ আকারে তাহাদের নিকট পাইবে তাওরাত ও ইন্‌ঞ্জীলে। এইভাবে যে, সে তাহাদের নেক কাজের আদেশ করে, বদ কাজ হইতে বিরত রাখে, তাহাদের জন্য পাক জিনিসসমূহ হালাল ও নাপাক জিনিসগুলিকে হারাম করে। আর তাহাদের উপর হইতে সেই বোঝা সরাইয়া দেয় যাহা তাহাদের উপর চাপানো ছিল এবং সেই বাধা ও বন্ধনসমূহ খুলিয়া দেয়, যাহাতে তাহারা বন্দী ছিল" (৭ঃ ১৫৭)।
দৃষ্টান্তস্বরূপ বর্তমান বাইবেলের পূরাতন ও নূতন নিয়মের নিম্নলিখিত স্থানসমূহ দেখা যাইতে পারে : দ্বিতীয় বিবরণ, ১৮: ১৫-১৯, মথি, ২১: ২৩-৪৬, যোহন ১: ১৯-২১, ১৪: ১৫-১৭, ১৫: ২৫-২৬, ১৬: ৭-১৫। এইসব স্থানে হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর আগমন সম্পর্কে সুস্পষ্ট ইংগিত রহিয়াছে। এমনিভাবে বার্নাবাসের বাইবেলে আরও স্পষ্ট করিয়া মহানবী (স)-এর নামসহ তাঁহার শুভাগমনের সংবাদ উদ্ধৃত হইয়াছে (বার্নাবাসের বাইবেল, page ২০৪)।
(১২) ইন্‌ন্জীলে হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর সাহাবীগণের উল্লেখ: আল-কুরআনে এই মর্মে ইরশাদ হইয়াছেঃ
مُحَمَّدٌ رَّسُولُ اللهِ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ تَرْهُمْ رُكَعًا سُجَّدًا يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِّنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِمْ مِّنْ أَثَرِ السُّجُودِ ذَلِكَ مَثَلُهُمْ فِي التَّوْرَةِ وَمَثَلُهُمْ فِي الْإِنْجِيلِ كَزَرْعٍ أَخْرَجَ شَطْنَهُ فَأَزَرَهُ فَاسْتَغْلَظَ فَاسْتَوَى عَلَى سُوقِهِ يُعْجِبُ الزَّرَاعَ لِيَغِيظَ بِهِمُ الْكُفَّارَ وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّلِحَتِ مِنْهُمْ مُغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا.
"মুহাম্মাদ আল্লাহ্র রাসূল; তাহার সহচরগণ কাফিরদিগের প্রতি কঠোর এবং নিজদিগের মধ্যে পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল। আল্লাহ্র অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় তুমি তাহাদিগকে রুকু ও সিজদায় অবনত দেখিবে। তাহাদিগের মুখমণ্ডলে সিজদার চিহ্ন থাকিবে, তাওরাতে তাহাদিগের বর্ণনা এইরূপ এবং ইন্‌ন্জীলেও এইরূপ। তাহাদিগের দৃষ্টান্ত একটি চারাগাছ, যাহা হইতে নির্গত হয় কিশলয়, অতঃপর ইহা শক্ত ও পুষ্ট হয় এবং পরে কাণ্ডের উপর দাঁড়ায় দৃঢ়ভাবে যাহা চাষীর জন্য আনন্দদায়ক। এইভাবে আল্লাহ্ মু'মিনদিগের সমৃদ্ধি দ্বারা কাফিরদিগের অন্তর্জালা সৃষ্টি করেন। যাহারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে আল্লাহ্ তাহাদিগকে প্রতিশ্রুতি দিয়াছেন ক্ষমা ও মহাপুরস্কারের" (৪৮ : ২৯)।
এই দৃষ্টান্তটি ইন্‌ন্জীলে হযরত ঈসা (আ)-এর একটি ওয়াজ প্রসঙ্গে বর্ণিত হইয়াছে যাহা সুসমাচারেও উদ্ধৃত হইয়াছে নিম্নরূপ : "তিনি আরও কহিলেন, ঈশ্বরের রাজ্য এইরূপ। কোন ব্যক্তি যেন ভূমিতে বীজ বুনে; পরে রাত দিন নিদ্রা যায় ও উঠে। ইতোমধ্যে ঐ বীজ অংকুরিত হইয়া বাড়িয়া উঠে, কিরূপে আপনি ফল উৎপন্ন করে; প্রথমে অংকুর, পরে শীষ, তাহার পর শীষের মধ্যে পূর্ণ শষ্য। কিন্তু ফল পাকিলে সে তৎক্ষণাৎ কাস্তে লাগায়। কেননা শষ্য কাটিবার সময় উপস্থিত। তাহা একটি সরিষার দানার তুল্য। সেই বীজ ভূমিতে বুনিবার সময় ভূমির সকল বীজের মধ্যে অতি ক্ষুদ্র বটে; কিন্তু বুনা হইলে তাহা অংকুরিত হইয়া সকল শাক হইতে বড় হইয়া উঠে, এবং বড় বড় ডাল ফেলে। তাহাতে আকাশের পক্ষিগণ তাহার ছায়ার নীচে বাস করিতে পারে" (মার্ক সুসমাচার, ৪ : ২৬-৩২; আরো দ্র. মথি, ১৩ : ৩১-৩২)।
(১৩) ইসলাম গ্রহণের পথে ইন্‌ন্জীল খৃস্টানদের জন্য আলোকবর্তিকা : খৃস্ট সমাজকে দীনের দাওয়াত প্রসঙ্গে আল-কুরআনে ইন্‌ন্জীলকেই দলীল হিসাবে পেশ করা হইয়াছে। কেননা ইন্‌ন্জীলের আহবান ছিল পরবর্তীতে আল-কুরআনের আহবানকে মানিয়া লওয়া। এইজন্যই আল-কুরআনে বলা হইয়াছে:
قُلْ يُأَهْلَ الْكِتٰبِ لَسْتُمْ عَلَى شَيْءٍ حَتَّى تُقِيمُوا التورة وَالْإِنْجِيلَ وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْكُمْ مَنْ رَّبِّكُمْ.
"বলল, হে কিতাবীগণ! তোমরা কোনক্রমেই কোন মৌলিক জিনিসের উপর দণ্ডায়মান নও যতক্ষণ পর্যন্ত তাওরাত ও ইন্‌ন্জীল এবং তোমাদের রব-এর নিকট হইতে তোমাদের প্রতি যাহা নাযিল করা হইয়াছে তাহা প্রতিষ্ঠিত না করিবে" (৫ : ৬৮)।
প্রকৃত কথা এই যে, ইয়াহুদী ও খৃস্টানগণ যদি এইসব কিতাবে উল্লিখিত আল্লাহ ও নবীগণের প্রদত্ত শিক্ষার উপর দৃঢ়ভাবে দণ্ডায়মান হইত তাহা হইলে হযরত নবী করীম (স)-এর আগমন কালে তাহারা একটি সত্যপন্থী জাতিরূপে গণ্য হইতে পারিত।
(১৪) ইন্‌ন্জীলের কারণে নাসারাদের সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শন: তাওরাত, যাবূর, ইন্‌ন্জীলে আংশিক পরিবর্তিত হইলেও দীনের মূল বিষয় সংরক্ষিত ছিল। যেই কারণে তাওরাত, যাবুর ও ইন্‌ন্জীলের অনুসারীদেরকে আল-কুরআন 'আহলে কিতাব' বলিয়া বারবার সম্বোধন করিয়াছে। ইয়াহুদী ও নাসারাগণকে ৩১ বার আহলে কিতাব বা কিতাবীগণ বলিয়া সম্বোধন করা হইয়াছে এবং ২৩ বার তাহাদেরকে ঐ ব্যক্তিবর্গ বলিয়া সম্বোধন করা হইয়াছে "যাহাদেরকে কিতাব দেওয়া হইয়াছে" কিংবা "কিতাবের উত্তরাধিকারী বানানো হইয়াছে"। যাহারা কিতাবের অধিকারী তাহারা জ্ঞানের অধিকারী ও রক্ষক। অতএব খৃস্টানরা ইন্‌ন্জীল কিতাবের সাথে নিজেদেরকে সম্পর্কিত করিবার কারণে আহলে কিতাব বলিয়া তাহাদেরকে জগৎবাসীর মধ্যে বিশেষ সম্মান ও মর্যাদা প্রদান করা হইয়াছে। তাহাদের কন্যা সন্তান মুসলমানদের জন্য বিবাহ করা হালাল এবং তাহাদের তৈরী হালাল খাবার গ্রহণের অনুমতি প্রদান করা হইয়াছে।
قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا إِلَى كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ إِلا نَعْبُدَ إِلا اللَّهَ وَلَا نُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا وَلَا يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ فَإِنْ تَوَلَّوا فَقُولُوا اشْهَدُوا بِأَنَّا مُسْلِمُونَ .
"তুমি বল, হে কিতাবীগণ! আইস সে কথায় যাহা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই; যেন আমরা আল্লাহ ব্যতীত কাহারও ইবাদত না করি, কোন কিছুকেই তাঁহার শরীক না করি এবং আমাদের কেহ কাহাকেও আল্লাহ ব্যতীত রব হিসাবে গ্রহণ না করে। যদি তাহারা মুখে ফিরাইয়া লয় তবে বল, তোমরা সাক্ষী থাক, আমরা মুসলমান" (৩: ৬৪-৬৫)।
(১৫) ইন্‌ন্জীলের প্রতি ঈমান মুসলিম আকীদার অংশ: ইন্‌ন্জীলসহ সকল আসমানী কিতাবের উপর ঈমান আনার জন্য মুসলমানদের প্রতি নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে। যেমন আল্লাহর বাণী:
أَمَنَ الرَّسُولُ بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْهِ مِنْ رَبِّهِ وَالْمُؤْمِنُونَ . كُلُّ أَمَنَ بِاللَّهِ وَمَلْئِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ منْ رُّسُلِهِ وَقَالُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا غُفْرَانَكَ رَبَّنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ .
"রাসূল, তাহার প্রতি তাহার প্রতিপালকের পক্ষ হইতে যাহা অবতীর্ণ হইয়াছে তাহাতে ঈমান আনিয়াছে এবং মুমিনগণও। তাহাদের সকলে আল্লাহে, তাঁহার ফেরেশতাগণে, তাঁহার কিতাবসমূহে এবং তাঁহার রাসূলগণে ঈমান আনয়ন করিয়াছে। তাহারা বলে, আমরা তাঁহার রাসূলগণের মধ্যে কোন তারতম্য করি না; আর তাহারা বলে, আমরা শুনিয়াছি এবং পালন করিয়াছি। হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা তোমার ক্ষমা চাই আর প্রত্যাবর্তন তোমারই নিকট" (২: ২৮৫)।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أُمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَالْكِتَابِ الَّذِي نَزَّلَ عَلَى رَسُولِهِ وَالْكِتَابِ الَّذِي أَنْزَلَ مِنْ قَبْلُ .
"হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহে, তাঁহার রাসূলে, তিনি যে কিতাব তাঁহার রাসূলের প্রতি অবতীর্ণ করিয়াছেন তাহাতে এবং যে কিতাব তিনি পূর্বে অবতীর্ণ করিয়াছেন তাহাতে ঈমান আন" (৪: ১৩৬)।
ইব্‌ন কাছীর বলেন যে, রাসূলের উপর অবতীর্ণ কিতাব বলিতে আল-কুরআনুল কারীমকে বুঝানো হইয়াছে, আর উহার পূর্বে নাযিল করা কিতাব বলিতে পূর্ববর্তী সকল কিতাব বুঝানো হইয়াছে (ইব্‌ন কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল আজীম, ১০ খ., page ৫৬৬)।
উপরিউক্ত আয়াতের দ্বারা বুঝা যায়, একজন মুসলমান তাহার ঈমানের ক্ষেত্রে যদি কোন রাসূলকে বাদ দিয়া অন্য রাসূলকে গ্রহণ করে কিংবা কোন কিতাবকে বাদ দিয়া অন্য কিতাব গ্রহণ করে তাহা হইলে সে মুমিন হইবে না। এইজন্য আল-কুরআনে ঘোষণা করা হইয়াছে:
وَمَنْ يَكْفُرْ بِاللَّهِ وَمَلَئِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا بَعِيدًا .
"কেহ আল্লাহ, তাঁহার ফেরেশতা, তাঁহার কিতাব, তাঁহার রাসূল এবং পরকালকে প্রত্যাখ্যান করিলে সে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট হইয়া পড়িবে” (৪: ১৩৬)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 অন্যান্য ধর্মগ্রন্থে হযরত ঈসা (আ)

📄 অন্যান্য ধর্মগ্রন্থে হযরত ঈসা (আ)


বর্তমান বিশ্বে হযরত ঈসা (আ)-এর অনুসারী হওয়ার দাবিদার খৃস্টানদের ধর্মীয় গ্রন্থ হইল বাইবেল। এই গ্রন্থের দুইটি অংশ: ১. ওল্ড টেস্টামেন্ট ও ২. নিউ টেস্টামেন্ট। খৃস্টান জগত ঈসা (আ)-এর জীবনের জন্য নিউ টেস্টামেন্টকেই আদি উৎস মনে করে। ঈসা (আ)-এর জীবনী সম্পর্কে মৌখিক উৎস হইল ৪টি গসপেল: মথি, মার্ক, লুক ও যোহন। মথি ও লুক গসপেল বা সুসমাচারে ঈসা (আ)-এর বংশলতিকা উল্লেখ করা হইয়াছে। চারটি গসপেলই ঈসা (আ)-এর বাপ্তিস্ম গ্রহণ করা, শয়তানের আহবান প্রত্যাখ্যান করা, হাওয়ারী গ্রহণ করা, শরীয়াতের কিছু কিছু বিধিবিধান, চারিত্রিক দিকনির্দেশনা, ঈসা (আ) কর্তৃক বিভিন্ন অলৌকিক বিষয়ের অবতারণা করা, বিভিন্ন ধরনের রোগীকে সুস্থ করা, বিভিন্ন উপমা-উদাহরণ দিয়া সঙ্গীদিগকে শিক্ষা দেওয়া, ইয়াহুদী পণ্ডিতদের সহিত যুক্তি-তর্কে লিপ্ত হওয়া, বিভিন্ন স্থানে গিয়া তাঁহার দীন প্রচার করা, অবশেষে ইয়াহুদীদের ষড়যন্ত্র ও রোমান শাসক পীলাতের সৈন্যদের হাতে গ্রেফতার হইয়া ফাঁসিকাষ্ঠে মৃত্যুবরণ করিয়া তিন দিন পর মৃত্যুর উপর জয়লাভ করার কথা বিবৃত হইয়াছে। খৃস্টজগতের দাবি অনুসারে এই গসপেলগুলি ৬৫-১২৫ খৃস্টাব্দ-এর মধ্যবর্তী সময়ে লিখিত হইয়াছে (Encyclopedia Americana, vol. 16, page 41) ।
কতিপয় পত্রাবলীতে যাহা আসিয়াছে, তন্মধ্যে হযরত ঈসা-এর ইয়াহূদী হিসাবে জন্মলাভ (গালাতীয়, ৩: ১৬, রোমীয়, ৯:৫), তিনি দাউদের বংশধর (রোমীয়, ১: ৩-৪), তাঁহার মানবীয় চরিত্রের কিছু কিছু দিক, যেমন নম্রতা, ভদ্রতা (২ করিন্থীয়, ১০:১, ১ করিন্থীয়, ১৩), এমনিভাবে অন্যায়ভাবে তাঁহাকে ক্রুশে বিদ্ধ করিয়া হত্যা করিবার দাবি (১ করিন্থীয়, ২:৮, ২ করিন্থীয়, ১৩: ৪) ইত্যাদি। এই চিঠিগুলির মধ্যে অধিকাংশই সেন্ট পল কর্তৃক লিখিত। উপরিউক্ত গসপেলসমূহে ও পত্রাবলীতে ঈসা (আ)-কে আল্লাহ্ পুত্র (নাউযুবিল্লাহ) বলিয়া আখ্যা দিয়া অতি মানবীয় সত্তায় রূপান্তরিত করিবার চেষ্টা অব্যাহত ছিল। সেইগুলি বিশেষ উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করিয়া রচিত যাহা খৃস্টান গবেষকদের দৃষ্টিও এড়ায় নাই। Encyclopaedia Britannica তে বলা হয়, Each of the four Gospels is written from a prospective and for a purpose even though the prospective and the purpose may not always be lasy to discern to day (vol. 13, page 14)।
তাহা ছাড়া ঐ উৎসগুলিতে ঈসা (আ)-এর জীবনী সম্পর্কে খুব অল্পই তথ্য পরিবেশন করা হইয়াছে। ইহার উপর নির্ভর করিয়া ঈসা (আ)-এর কোন গ্রহণযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য জীবনী লিখা সম্ভব নয়। রুডলফ, জ্যাকস জারমিয়াসের মত অনেক বাইবেল বিশেষজ্ঞও সেই সত্যটি নির্দ্বিধায় স্বীকার করিয়াছেন।
মূলত প্রাথমিক যুগে ঈসা (আ)-এর এক শ্রেণীর ভক্তরা তাঁহার সম্পর্কে যেই ধরনের বিশ্বাস পোষণ করিত এবং লোক সম্মুখে প্রচার করিত তাহাই মানুষের মুখে মুখে চলিয়া আসিতেছিল। সেই মৌখিক বর্ণনার ভিত্তিতেই উপরিউক্ত গ্রন্থ ও পত্রাবলী সংকলিত হইয়াছে (Encyclopedia Americana, vol. 16, page 41)
আর ঐগুলিতে ঈসা (আ)-এর জীবনের ঘটনাপঞ্জী কালানুক্রমিক গ্রন্থনা অনুসারেও বিন্যস্ত করা হয় নাই, বরং বিচ্ছিন্নভাবে ঈসা (আ)-এর বিভিন্ন শিক্ষা ও কিছু কিছু কার্যাবলী বিবৃত করা হইয়াছে, এমন কি তাঁহার জীবনের অনেক অধ্যায় সম্পর্কে কিছুই বলা হয় নাই। যেমন শিশুকাল হইতে সাত বৎসর পর্যন্ত তাঁহার অবস্থা, সাত হইতে বার বৎসর বয়সে জেরুসালেম আগমনের পূর্বাবস্থায় তিনি কোথায় কি অবস্থায় ছিলেন তাহার সম্পর্কে ঐ উৎসগুলি নীরব। এমনিভাবে জেরুসালেম হইতে নাসেরাতে ফিরার পর তাঁহার ত্রিশ বৎসর বয়স পর্যন্ত তিনি কোথায় কিভাবে ছিলেন, কি করিয়াছেন তাহার সম্পর্কে কিছুই জানা যায় নাই। সেইজন্য উনিশ শতকের কতিপয় পশ্চিমা খৃস্টান সমালোচক ঈসা বা যিশু নামে কোন ব্যক্তির অস্তিত্বকেই অস্বীকার করিয়াছেন (Encyclopaedia Britannica, vol. 13, page 14)।
এই মতামতে বাড়াবাড়ি করা হইয়াছে নিঃসন্দেহে। কারণ খৃস্টানদের উৎস ছাড়াও তৎকালীন বিশ্বের অন্যান্য এলাকার ঐতিহাসিকদের লেখায়ও নাসেরাতের মাসীহ ঈসা তথা যীশু খৃস্টের কথা উল্লেখ করা হইয়াছে। যেমন: রোমান লেখক টাসিটাস, সোয়টনিয়াস, প্লেনি দি ইয়ংগার এবং ইয়াহুদী ঐতিহাসিক জুসেফাস প্রমুখ।
ঈসা (আ)-এর সমসাময়িক ঐতিহাসিকগণ তাঁহার আগমনের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করিয়াছেন। দুঃখজনক হইলেও সত্য যে, তাঁহার চেয়ে আরও অনেক প্রাচীন ব্যক্তিবর্গের জীবনী স্পষ্টভাবে সংরক্ষিত হইয়াছে, কিন্তু ঈসা (আ)-এর অনুসারীরা তাঁহার জীবনী ভালভাবে সংরক্ষণ করিতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়াছেন। আল-কুরআন যদি নাযিল না হইত তাহা হইলে নবী হিসাবে ঈসা (আ) কি ছিলেন এবং কি ছিলেন না তাহা সম্পর্কে জগৎবাসীর নিকট অস্পষ্টতা থাকিয়াই যাইত।
উল্লেখ্য যে, ত্রিত্ববাদীদের উপরিউক্ত চারিটি গসপেল ও পত্রাবলী ছাড়াও অনেক গসপেল রচিত হইয়াছিল, যাহা ৩২৫ খৃস্টাব্দে অনুষ্ঠিত খৃষ্টীয় সম্মেলনে বাতিল বলিয়া ঘোষণা করা হইয়াছিল। সেইগুলিতে ঈসা সম্পর্কে ত্রিত্ববাদ বিরোধী তথ্য পরিবেশন করা হইয়াছিল (মুতাওয়াল্লী ইউসুফ শালাবী, আদওয়া আলাল মাসীহিয়্যা, page ৬২)। ইহাতে অন্যান্য গসপেলের মতই ঈসা (আ)-এর বিভিন্ন শিক্ষা, কার্যাবলী ও ঘটনাবলীর কথা উল্লেখ করা হইয়াছে। তবে তাঁহার তাওহীদের শিক্ষা, মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী, কিয়ামতের আলামত এই সব বিষয় স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করা হইয়াছে, সাথে সাথে ঈসা (আ)-কে ক্রুশবিদ্ধ করার ঘটনাকেও অবান্তর বলিয়া অস্বীকার করা হইয়াছে। ইহাতে বলা হইয়াছে, ঈসা (আ)-কে ফেরেশতার মাধ্যমে সশরীরে স্বর্গারোহণ করানো হইয়াছে। আর সৈন্যরা যাহাকে ক্রুশবিদ্ধ করিয়াছিল তাহার নাম ছিল জুদাস (বার্নাবাসের বাইবেল, বঙ্গানুবাদ আফজাল চৌধুরী, page ২৫৪-২৫৫)। কিন্তু তাহা সত্ত্বেও এই গ্রন্থে ঈসা (আ)-এর ঘটনাবহুল জীবনের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায় না। আর ঈসা (আ) সম্পর্কে খৃস্টান সম্প্রদায়ের ভ্রান্ত ধারণা একমাত্র কুরআন ও সুন্নাহ পরিবেশিত তথ্যের মাধ্যমেই দূরিভূত হইতে পারে।
ইয়াহুদীদের ধর্মীয় গ্রন্থ তালমুদের যে অংশ প্রথম ও দ্বিতীয় খৃস্টীয় শতাব্দীতে লিখা হইয়াছে তাহাতেও ঈসা (আ)-এর প্রসঙ্গ আসিয়াছে এবং তাহাতে তাঁহার পরিচয় বিকৃত করা হইয়াছে (The new Encyclopaedia Britannica, vol.10, Page 145)। নিঃসন্দেহে তালমুদ ঈসা (আ)-এর প্রতি আক্রমণাত্মক ও বিদ্বেষপ্রসূত তথ্যে ভরপুর।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ইনুজীল সংরক্ষিত না থাকার কারণ

📄 ইনুজীল সংরক্ষিত না থাকার কারণ


ঈসা (আ)-এর ঊর্ধ্বগমনের পর তাঁহার অনুসারীরা ইন্‌ন্জীলকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করিতে সক্ষম হয় নাই। উহার কারণ নিম্নরূপ:
প্রথমত: অনুসারীদের আত্মগোপন অবস্থা। ইয়াহুদী ও রোমানদের সাঁড়াশী আক্রমণের মুখে ঈসা (আ)-এর ঊর্ধ্ব গমনের পরেও তাঁহার অনুসারীরা আত্মগোপন করিয়াই থাকিতেন, পাহাড়-পর্বতের গুহায়, বনে-জংগলে বাস করিতেন। আর গোপনে ইন্জীলের বাণী প্রচার করিতেন, এমনকি কাহাকেও সনাক্ত করা হইলেও তিনি ঈসা (আ)-এর অনুসারী নহেন বলিয়া দাবি করিতেন এবং নিজ পরিচয় গোপন করিতেন। অধিকন্তু যদি তাহার কাছে ইন্‌ন্জীলের কোন অংশবিশেষ থাকিত তাহাও ঈসা (আ)-এর নহে বলিয়া দাবি করিতেন। বর্ণিত আছে যে, "The Shepherd" নামে একটি গ্রন্থ ছিল যাহা হারমাস (Hermas) নামে এক ব্যক্তির গ্রন্থের শিক্ষার সাথে ঈসা (আ)-এর শিক্ষার অনেক সাদৃশ্য ছিল। তাই প্রাথমিক যুগের খৃস্টানরা এই গ্রন্থের গুরুত্ব দিত ও তাহা নিজেই বহন করিত (Md. Ataur Rahim, Ibid, page 48-53)। ধারণা করা হয় যে, ইহাও তাওহীদপন্থী খৃস্টানদের এক ধর্মীয় উৎস ছিল, যাহাতে ঈসা (আ)-এরও শিক্ষার সংকলন ছিল, যাহা অন্য নামে প্রচলিত ছিল। আর তাহা নির্যাতন হইতে বাঁচার জন্যই।
দ্বিতীয়ত: হাওয়ারীদের বিচ্ছিন্ন অবস্থান ও শাহাদাত বরণ: বর্ণিত আছে যে, হযরত ঈসা (আ)-এর পর তাঁহার অনুসারী হাওয়ারীগণ তৎকালীন বিশ্বের বিভিন্ন এলাকায় ছড়াইয়া পড়েন। তৎকালীন যোগাযোগ ব্যবস্থা অনুন্নত থাকার কারণে তাহারা পরস্পর ছিলেন বিচ্ছিন্ন। তাই লিখিত ইন্‌ন্জীলটি কাহার কাছে ছিল, তাহা জানা যায় নাই। তবে তাহারা যতটুকু স্মৃতিতে ছিল ততটুকুই মানুষের নিকট বর্ণনা করিতেন। কিন্তু পরবর্তীতে তাহারা একে একে শাহাদাত বরণ করেন (ইব্‌ন হাযম, আল-ফিসাল ফিল মিলাম ওয়াল আহওয়ায়ে ওয়ান নিহাল, ১খ, page ২৫৩)।
এইভাবে সময় যতই অতিবাহিত হইতে থাকে ভুলিয়া যাওয়ার মাত্রাও তত বৃদ্ধি পাইতে থাকে। তাওরাত যেমনি ইউশা ইব্‌ন নূন, দাউদ (আ), সুলায়মান (আ) প্রমুখ রাষ্ট্রনায়কের পৃষ্ঠপোষকতা পাইয়াছিল, কিন্তু ইন্‌ন্জীল গ্রন্থটি সংরক্ষণে ও সংকলনে সেই ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা পায় নাই। সেই জন্য তাহা বিস্মৃত হইয়া যাওয়া স্বাভাবিক।
তৃতীয়ত: ইয়াহুদীদের ষড়যন্ত্র কার্যকর ছিল, বিশেষত ধর্মীয় নেতাদের বিভিন্ন পাপাচার তথা ধর্ম ব্যবসার বিরুদ্ধে ঈসা (আ)-এর নূতন দাওয়াতের যে ধরনের প্রসার ঘটিতেছিল তাহা বন্ধ করিবার জন্য তাহারা মরিয়া হইয়া উঠিয়াছিল। তাই তাহাদের কেহ কেহ পরিকল্পিতভাবে খৃষ্ট ধর্মে প্রবেশ করিয়া ইয়াহুদী ধর্মনেতাদের নিকট হইতে ঘুষ লইয়া এবং ঈসার অনুসারীদের সহিত অবস্থান করে। ইয়াহুদীদের ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবে তাহাদের কেহ খৃস্ট ধর্মে প্রবেশ করিয়া ইন্‌ন্জীল গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি আত্মস্থ করে এবং তাহার যে অংশ তৎকালীন ইয়াহুদী সমাজের সাথে বিরোধপূর্ণ ছিল তাহা গোপন করে। অবশেষে তাহা ধ্বংসই করিয়া ফেলে। এইভাবে ইন্‌ন্জীলের বিভিন্ন অংশ হারাইয়া যায়। শুধু ততটুকুই বাকী থাকে, যতটুকু অনুসারীদের স্মৃতিতে ছিল।
চতুর্থত: ইয়াহুদীদের ভিতর হইতে যাহারা খৃস্ট ধর্মে দীক্ষিত হইয়াছিল তাহারা খৃষ্ট ধর্মের অপব্যাখ্যা দেওয়া শুরু করিয়াছিল। গবেষণায় প্রমাণিত হইয়াছে যে, সেন্ট পলও তাহাদের মধ্যে একজন। ইন্জীলের অনেক বাণী বিকৃত হইয়া যায়, যাহাকে আল-কুরআনের পরিভাষায় 'তাহরীফ' (বিকৃতি) বলা হইয়াছে। তাহারা ইন্‌ন্জীলের বিভিন্ন বাণীতে টিকামূলক বিভিন্ন ব্যাখ্যা সংযোজন করিতেন এবং পরবর্তীতে যাহারা শুনিতেন তাহারা মূল বক্তব্য ও ব্যাখ্যার মধ্যে খুব কমই পার্থক্য করিতে পারিতেন। সে কারণে স্মৃতিতে যতটুকু ছিল তাহারও অনেক পরিবর্তন ও পরিবর্ধন ঘটে। বলা হয় যে, ইন্‌ন্জীলের মূল ভাষ্য বিলুপ্ত হওয়ার পিছনে তাহাদের ভূমিকাই বেশী।
পঞ্চমত: ঈসা (আঃ)-এর নবুওয়ত কাল ছিল সংক্ষিপ্ত অর্থাৎ মাত্র তিন বৎসর। এই সময়ে যথেষ্ট সংখ্যক পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করিবার বিষয়টি ছিল কঠিন। তাহা ছাড়া এই স্বল্প সময়ে ঈসা (আ) দাওয়াতী কাজ ও বিরোধীদের ষড়যন্ত্র মুকাবিলায়েই বেশী ব্যস্ত থাকেন। তাই বেশী পরিমাণে পাণ্ডুলিপি না থাকায় তাহা হারাইয়া যাওয়া বা বিলুপ্ত হওয়া আরো সহজ হয়। মোটকথা, মূল ইন্‌ন্জীলের বিরাট অংশ বিলুপ্ত হওয়ার প্রধান কারণ ছিল চারটি:
(১) অনুসারীদের বিস্মৃতি,
(২) ঘুষ গ্রহণের মাধ্যমে অংশগ্রহণ করা,
(৩) অনুসারীদের নিজস্ব মতামত প্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য কিছু কিছু ভাষ্য পরিবর্তন এবং নিজেরা তাহা লিখিয়া আল্লাহর বাণী বা ইন্‌ন্জীলের অংশ বলিয়া দাবি করা,
(৪) ব্যাখ্যা করিতে গিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে বা ভাষান্তরিত করিতে গিয়া মূল ভাষ্যের বিকৃতি সাধন!
এই চারটি ধরনকে আল-কুরআন অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলিয়া ধরিয়াছে। প্রথমত ভুলিয়া যাওয়া সম্পর্কে বলা হইয়াছে:
وَمِنَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّا نَصَارَى أَخَذْنَا مِيثَاقَهُمْ فَنَسُوا حَظًّا مِّمَّا ذُكِّرُوا بِهِ فَأَغْرَيْنَا بَيْنَهُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَسَوْفَ يُنَبِّئُهُمُ اللَّهُ بِمَا كَانُوا يَصْنَعُونَ .
"যাহারা বলে, আমরা খৃস্টান, তাহাদেরও অংগীকার গ্রহণ করিয়াছিলাম, কিন্তু তাহারা যাহা উপদিষ্ট হইয়াছিল তাহার এক অংশ ভুলিয়া গিয়াছে। সুতরাং আমি তাহাদের মধ্যে কিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী শত্রুতা ও বিদ্বেষ জাগরুক রাখিয়াছি। তাহারা যাহা করিত আল্লাহ তাহাদিগকে তাহা জানাইয়া দিবেন” (৫:১৪)।
দ্বিতীয়ত, কিছু কিছু অংশ লুকাইয়া ফেলা হয়। এই মর্মে বলা হইয়াছে:
يَا أَهْلَ الْكِتَابِ قَدْ جَاءَكُمْ رَسُولُنَا يُبَيِّنُ لَكُمْ كَثِيرًا مِّمَّا كُنْتُمْ تُخْفُونَ مِنَ الْكِتَابِ وَيَعْفُوا عَنْ كَثِيرٍ قَدْ جَاءَكُمْ مِنَ اللَّهِ نُورٌ وَكِتَابٌ مُبِينٌ .
"হে কিতাবীগণ! আমার রাসূল তোমাদের নিকট আসিয়াছে, তোমরা কিতাবের যাহা গোপন করিতে সে উহার অনেক তোমাদের নিকট প্রকাশ করে এবং অনেক উপেক্ষা করিয়া থাকে। আল্লাহ্ নিকট হইতে এক জ্যোতি ও স্পষ্ট কিতাব তোমাদের নিকট আসিয়াছে" (৫:১৫)।
তৃতীয়ত, অর্থের লোভে নিজেরা লিখে দাবি করিত ইহা ইন্‌ন্জীলের অংশ অর্থাৎ পরিবর্তন সাধন করিত। এই সম্পর্কে বলা হইয়াছে:
فَوَيْلٌ لِلَّذِينَ يَكْتُبُونَ الْكِتَابَ بِأَيْدِيهِمْ ثُمَّ يَقُولُونَ هذا من عند الله لِيَشْتَرُوا بِهِ ثَمَنًا قَلِيْلاً فَوَيْلٌ لَهُمْ مِّمَّا كَتَبَتْ أَيْدِيهِمْ وَوَيْلٌ لَهُمْ مِّمَّا يَكْسِبُونَ .
"সুতরাং দুর্ভোগ তাহাদের জন্য যাহারা নিজ হাতে কিতাব রচনা করে এবং তুচ্ছ মূল্য প্রাপ্তির জন্য বলে, ইহা আল্লাহ্র নিকট হইতে। তাহাদের হাত যাহা রচনা করিয়াছে তাহার জন্য শান্তি তাহাদের এবং যাহা তাহারা উপার্জন করে তাহার জন্য শান্তি তাহাদের" (২ঃ ৭৯)।
চতুর্থত, মূল ভাষ্যে বিকৃতি সাধন করা। এই সম্পর্কে বলা হইয়াছে:
يُحَرِّفُونَ الْكَلِمَ عَنْ مَوَاضِعِهِ
"তাহারা শব্দগুলির আমল অর্থের বিকৃতি ঘটাইত" (৫: ১৩)।
يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لِمَ تَلْبِسُونَ الْحَقِّ بِالْبَاطِلِ وَتَكْتُمُونَ الْحَقِّ وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ .
"হে কিতাবীগণ! তোমরা কেন সত্যকে মিথ্যার সহিত মিশ্রিত কর এবং সত্য গোপন কর যখন তোমরা জান" (৩ঃ ৭১)?
মোটকথা, উপরিউক্ত কারণে মূল ইন্‌ন্জীল বিলুপ্ত হয়। স্মৃতিকথা হইতে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে যাহা সংকলিত হইয়াছে তাহাতে বিক্ষিপ্ত এক ইন্‌ন্জীলের কিছু কিছু রহিয়াছে, যাহা সনাক্ত করাও কঠিন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00