📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দুনিয়ার নারীকুলের মধ্যে মারয়াম (আ)-এর মর্যাদা

📄 দুনিয়ার নারীকুলের মধ্যে মারয়াম (আ)-এর মর্যাদা


এই সম্পর্কে আল-কুরআন ও হাদীছে আলোচনা উল্লেখ রহিয়াছে। আল-কুরআনে বলা হইয়াছে:
وَإِذْ قَالَتِ الْمَلَئِكَةُ يَا مَرْيَمُ إِنَّ اللهَ اصْطَفَاكِ وَطَهَّرَكِ وَاصْطَفَاكِ عَلَى نِسَاءِ الْعَالَمِينَ .
"যখন ফেরেশতাগণ বলিয়াছিল, হে মারয়াম! আল্লাহ তোমাকে মনোনীত ও পবিত্র করিয়াছেন, আর বিশ্বের নারীগণের মধ্যে তোমাকে মনোনীত করিয়াছেন" (৩: ৪২)।
হযরত মারয়াম তথা কোন মহিলার নবুওয়াত লাভের বিষয়টি কুরআন হাদীছের প্রত্যক্ষ, সুস্পষ্ট ও অকাট্য প্রমাণ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত নহে। ফলে পক্ষে বা বিপক্ষে যে কোন মত গ্রহণ করার অবকাশ রহিয়াছে। তবে নবুওয়াতের গুরুদায়িত্ব পালনে, দাওয়াত ও তাবলীগের কাজের ধরন ও মহিলাদের অবস্থান বিবেচনায় জমহুর আলিমগণ মহিলার নবী না হওয়াই অধিক যুক্তিসঙ্গত বলিয়া মত প্রকাশ করিয়াছেন। এই প্রসঙ্গে কয়েকজন প্রসিদ্ধ তাফসীরকারের মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। আল্লামা তাবারী মন্তব্য করেন, হযরত মারয়াম (আ) নবী ছিলেন না (তাফসীরে তাবারী, বৈরূত ১৯৫৬ খৃ, ১৬খ, page ৩৬)। হাফিয ইবন কাছীর বলেন:
اما قول الجمهور كما قد حكاه ابو الحسن الاشعرى وغيره من اهل السنة والجماعة من أن النبوة مخص بالرجال وليس في النساء نبية فيكون اعلى مقامات مريم كما قال الله تعالى ما المسيح بن مريم الارسول قد خلت من قبله الرسل وامه صديقة .
"জমহূরের মতে যেমনটি আহলুস সুন্নাতের ইমাম আবুল হাসান আশআরী ও অন্যান্য আলিম বর্ণনা করেন যে, নবুওয়াত পুরুষগণের বৈশিষ্ট্য, মহিলাগণের মধ্যে কেউ নবী ছিলেন না। তাই মারয়াম (আ)-এর সর্বোচ্চ মর্যাদা ছিল এই যে, তিনি ছিলেন সিদ্দীকা, যেমনটি আল্লাহ তা'আলা বলেন, মরিয়ম তনয় মসীহ....তাহার মাতা একজন সত্যপন্থী নারী" (বিদায়া, ২খ., ৫৯)।
আলুসী বলেন:
لان مريم لا نبوة لها على المشهور وهذا هو الذي ذهب اليه اهل السنة والشيعة وخالف في ذالك المعتزلة
"প্রসিদ্ধ মতে মারয়াম (আ) নবী ছিলেন না। আহলুস সুন্নাহ ও শীআপন্থী আলিমগণ এই মতই গ্রহণ করিয়াছেন। এই ব্যাপারে অবশ্য মুতাযিলা সম্প্রদায় ভিন্নমত পোষণ করেন" (আলুসী, তাফসীর, ৩খ, ১৪০; আরো দ্র. দরিয়াবাদী, তাফসীরে মাজেদী, page ৫০৯)।
প্রখ্যাত তাফসীরকার মুফতী মুহাম্মদ শফী বলেন, জমহুর উম্মতের মতে মারয়াম নবী ছিলেন না এবং কোন মহিলা নবী হইতে পারেন না (মাআরিফুল কুরআন, ৬খ, ৩৪)।
মহিলার নবুওয়াত লাভ সম্পর্কিত উপরিউক্ত দুই মত ছাড়াও তৃতীয় একটি মতেরও উল্লেখ করা প্রয়োজন। তাহা এই যে, এই বিষয়ে পক্ষে বা বিপক্ষে মত প্রকাশ না করিয়া নীরব থাকা উচিত। এই মত অবলম্বনকারিগণের মধ্যে শায়খ তকীউদ্দীন সুবকীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মাওলানা হিফযুর রহমান মন্তব্য করেন, সম্ভবত এই তৃতীয় মত অবলম্বনকারী উলামার সংখ্যাই অধিক (কাসাসুল কুরআন, ৪খ, page ৩২০-৩৩)।
কোন কোন মুফাস্সিরের মতে অত্র আয়াতে বিশ্ব-নারী বলিতে মারয়ামের পূর্ব ও পরের তথা সকল যুগের সকল নারীর কথা বুঝানো হইয়াছে (দ্র. আলুসী, প্রাগুক্ত, page ১৫৫)। এই মতের সমর্থনে কিছু হাদীছ দ্বারা দলীল পেশ করা হয়। সেইগুলি হইল :
১. হাফেজ ইবন আসাকির ইবন আব্বাস (রা.) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, মহানবী (স.) বলিয়াছেন, سيدة نساء أهل الجنة مريم بنت عمران ثم فاطمة ثم خديجة ثم آسية أمراة فرعون .
"জান্নাতে নারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হইলেন মারয়াম বিনতে ইমরান, অতঃপর ফাতিমা, অতঃপর খাদীজা, অতঃপর ফিরআউনের স্ত্রী আছিয়া" (ইবন্ কাছীর, প্রাগুক্ত, page ৫৬; আলুসী, প্রাগুক্ত)।
ইবন কাছীর এই হাদীছের ব্যাখ্যায় বলেন, এইখানে 'চুম্মা' (অতঃপর) শব্দ দ্বারা ক্রম অর্থ লওয়া হইয়াছে। কিন্তু ইবন মারদাওয়ায়হ এই হাদীছটি আবদুল্লাহ ইবন আবু জাফর আর-রাযীর সনদে এবং ইবন আসাকির অপর এক সূত্রে আনাস (রা) হইতে বর্ণনা করেন। তাহাতে 'চুম্মা' (অতঃপর) শব্দের পরিবর্তে 'ওয়াও' (এবং) উল্লেখ করা হইয়াছে, যাহার দ্বারা ধারাক্রম বুঝায় না (ইবন কাছীর, প্রাগুক্ত, page ৫৫-৫৭)। আনাস (রা) হইতে বর্ণিত হাদীসটির ভাষ্য নিম্নরূপ:
خير نساء العالمين أربع مريم بنت عمران وآسية إمراة فرعون وخديجة بنت خوليد وفاطمة بنت محمد رسول الله .
"জগৎশ্রেষ্ঠ মহিলা চারজন: মারয়াম বিনতে ইমরান, ফিরআওনের স্ত্রী আসিয়া, খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ এবং আল্লাহ রাসূল মুহাম্মদ (স)-এর কন্যা ফাতিমা" (তাফসীরে তাবারী, প্রাগুক্ত; ইবন কাছীর, page ৩৮৩; ৫৫)।
২. ইবন জারীর তাবারী এক সূত্রে আবূ হুরায়রা (রা) ও কাতাদা (র) হইতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন : উট-এর আরোহিণী কুরায়শ বংশীয় পূণ্যবান নারিগণই উত্তম নারী। তাহারা তাহাদের সন্তানদের প্রতি শৈশবকালে অধিক স্নেহময়ী এবং স্বামীর সম্পদের পরম সংরক্ষণকারিণী” (প্রাগুক্ত)।
হযরত কাতাদা (র) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলিয়াছেন, আমি যদি এই তথ্য পাইতাম যে, মারয়াম উটে চড়িয়া ছিলেন, তাহা হইলে অন্য কাহাকেও তাঁহার উপর মর্যাদা দিতাম না (প্রাগুক্ত)। মারয়াম (আ)-এর সকল নারীর উপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভের বিষয়টি উপরিউক্ত হাদীছের আলোকে স্পষ্ট নহে, বরং ইহাতে কুরায়শ বংশীয় হিসাবে খাদীজা (রা) ও ফাতিমা (রা)-এর মর্যাদার প্রতি ইঙ্গিত রহিয়াছে।
৩. আবূ মূসা আশআরী (রা) হইতে বর্ণিত, নবী করীম (সা) বলিয়াছেন, كَمُلَ مِنَ الرِّجَالِ كَثِيرٌ وَلَمْ يَكْمُلْ مِنَ النِّسَاءِ إِلَّا مَرْيَمُ بِنْتُ عِمْرَانَ وَآسِيَةُ إِمْرَأَةُ فِرْعَوْنَ وَفَضْلُ عَائِشَةَ عَلَى النِّسَاءِ كَفَضْلِ التَّرِيدِ عَلَى سَائِرِ الطَّعَامِ . "পুরুষদের মধ্যে অনেকেই পূর্ণত্বে পৌছিয়াছেন, কিন্তু নারীদের মধ্যে পৌঁছিয়াছেন শুধু মারয়াম বিনতে ইমরান ও ফির'আওন পত্নী আসিয়া। আর খাদ্যের মধ্যে ছারীদ যেমন শ্রেষ্ঠ, ঠিক তেমনি নারীকূলের মধ্যে 'আইশা শ্রেষ্ঠ" (সহীহ বুখরী, কিতাবু আহাদীছিল আম্বিয়া, দ্র. কিরমানী, প্রাগুক্ত)।
'আল্লামা ছানাউল্লাহ পানিপথী এই দলীলের ব্যাখ্যায় বলেন, "আমার মতে এখানে নবী (সা.) অতীত কালের নারীদের মধ্যে মারয়াম ও আসিয়ার পূর্ণত্বের কথা উল্লেখ করিয়াছেন। কেননা তিনি সাথে সাথে 'আইশা (রা)-এর শ্রেষ্ঠত্বও তুলিয়া ধরিয়াছেন, যাহা দ্বারা বুঝা যায়, মারয়াম ও আসিয়ার উপরেও তাঁহার মর্যাদা ছিল বেশি (তাফসীরে মাযহারী, ২খ, page ২৮৬)।
৪. তিরিমিযী শরীফে উম্মু সালামা (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে যে, ফাতিমা (রা.) বলেনঃ أَخْبَرَنِي رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنِّي سَيِّدَةُ نِسَاءِ أَهْلِ الْجَنَّةِ إِلَّا مَرْيَمُ بِنْتُ عِمْرَانَ . "রাসূলুল্লাহ (সা) আমাকে জানাইয়াছেন, আমি বেহেশতী নারিগণের নেত্রী, তবে মারয়াম বিনতে ইমরান ব্যতীত (তিরমিযী, আবওয়াবুল মানাকিব, দিল্লী, তা. বি., ২খ, page ২২০)।
'আল্লামা ছানাউল্লাহ পানিপথী বলেন, এ হাদীছ দ্বারা বুঝা যায়, মারয়াম (আ) ফাতিমা (রা)-এর চাইতে নিম্ন মর্যাদার নহেন। কিন্তু তিনি যে ফাতিমার চাইতে শ্রেষ্ঠ তাহা বুঝা যায় না (প্রাগুক্ত)।
ইবন জারীর তাবারী স্বীয় তাফসীরে এক সূত্রে হযরত আম্মার ইবন সা'দ (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলিয়াছেন, "আমার উম্মতের মহিলাদের মধ্যে খাদীজা (রা)-কে শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া হইয়াছে যেমন জগতের সকল নারীর মধ্যে মারয়াম (আ)-কে শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া হইয়াছে" (তাফসীরে তাবারী, ৫খ., page ৩৮৩)।
অপরদিকে অধিকাংশ মুফাসসিরের প্রসিদ্ধ মত হইল, মারয়ামের উদ্দেশ্যে আল্লাহর বাণী "বিশ্বের নারীকুলের মধ্যে তোমাকে মনোনীত করিয়াছি"-এর মধ্য 'বিশ্ব' দ্বারা উদ্দেশ্য তৎকালীন বিশ্ব অর্থাৎ হযরত মারয়ামের সমসাময়িক বিশ্বে তিনি ছিলেন শ্রেষ্ঠ নারী। ইবন জারীর তাবারী, ইবন কাছীরসহ অনেকে এই মতটিকে প্রাধান্য দিয়াছেন (দ্র. তাফসীরে তাবারী, প্রাগুক্ত, page ৩৮২; ইবন কাছীর, প্রাগুক্ত, page ৪৯)। এই ব্যাপারে দলীল হিসাবে তাহারা বলেন, অতীতের অনেকের শ্রেষ্ঠত্বের কথা আল-কুরআনে বলা হইয়াছে, যাহার দ্বারা তাহাদের সমসাময়িক যুগকে বুঝানো হইয়াছে। যেমন হযরত মূসা (আ) সম্পর্কে বলা হইয়াছে: قَالَ يَا مُوسَى إِنِّي اصْطَفَيْتُكَ عَلَى النَّاسِ بِرِسَالَاتِي وَبِكَلامِي فَخُذْ مَا أَتَيْتُكَ وَكُنْ مِّنَ الشَّاكِرِينَ . "তিনি বলিলেন, হে মূসা! আমি তোমাকে আমার রিসালাত ও ব্যাক্যালাপ দ্বারা মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়াছি। সুতরাং আমি যাহা দিলাম তাহা গ্রহণ কর এবং কৃতজ্ঞ হও” (৭: ১৪৪)।
আর এই কথা প্রসিদ্ধ যে, হযরত ইব্রাহীম (আ) মর্যাদাগত দিক দিয়া হযরত মূসা (আ) হইতে শ্রেষ্ঠ। আর হযরত মুহাম্মাদ (স) তাঁহাদের উভয়ের চেয়ে শ্রেষ্ঠ (ইবন কাছীর, প্রাগুক্ত, page ৫৪)। এমনিভাবে আল-কুরআনে বানু ইসরাঈল সম্পর্কে বলা হয় : وَلَقَدِ اخْتَرْنَاهُمْ عَلَى عِلْمٍ عَلَى الْعَالَمِينَ . "আমি জানিয়া শুনিয়াই উহাদিগকে বিশ্বে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়াছিলাম" (৪৪: ৩২)।
এই ধরনের আয়াতগুলিতে বিশ্ব বলিতে তৎকালীন বিশ্ব বুঝানো হইয়াছে। কেননা উম্মতে মুহাম্মাদী পূর্ববর্তী সকল উম্মত হইতে শ্রেষ্ঠ। আল্লাহ পাক উম্মতে মুহাম্মাদী সম্পর্কে অন্য আয়াতে ঘোষণা দিয়াছেন: كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلَوْ أَمَنَ أَهْلُ الْكِتَابِ لَكَانَ خَيْرًا لَّهُمْ . "তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানবজাতির জন্য তোমাদের আবির্ভাব হইয়াছে। তোমরা সৎকার্যের নির্দেশ দান কর, অসৎকার্যে নিষেধ কর এবং আল্লাহকে বিশ্বাস কর। আহলে কিতাব (ইয়াহুদী-নাসারা) যদি ঈমান আনিত তবে তাহাদের জন্য কল্যাণকর হইত" (৩: ১১০)।
উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, পূর্ববর্তী উম্মতের কোন জাতি বা ব্যক্তির বিশ্বের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের কথা যাহা আসিয়াছে তাহা দ্বারা তৎকালীন বিশ্ব বুঝানো হইয়াছে। তাই মারয়াম (আ) তৎকালীন বিশ্বে সর্বশ্রেষ্ঠ মহিলা ছিলেন। হাফিয ইবন আসাকির বর্ণিত কোন কোন হাদীছে যেইখানে মারয়াম (আ)-এর নাম প্রথমে উল্লেখ করা হইয়াছে, আবার তাহারই বর্ণিত অন্য একটি হাদীছে মারয়াম (আ)-এর নাম সর্বশেষে উল্লেখ করা হইয়াছে। যেমন রাসূলুল্লাহ (সা.) বলিয়াছেন:
حسبك منهن أربع سيدات نساء العالمين فاطمة بنت محمد وخديجة بنت خوليد واسية بنت مزاحم ومريم بنت عمران .
"নারীদের মধ্যে বিশ্বশ্রেষ্ঠ চারজনের উল্লেখই তোমার জন্য যথেষ্ট। তাহারা হইল: ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ, খাদীজা বিনতে খুওয়ায়লিদ, আসিয়া বিনতে মুযাহিম ও মারয়াম বিনতে ইমরান" (ইবন কাছীর, প্রাগুক্ত)।
এইভাবে মারয়াম (আ)-কে সমকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহিলা হিসাবে ধরিলে তিনি ফাতিমা ও খাদীজা (রা)-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ গণ্য হইবেন। অথচ অন্যান্য হাদীছে তাঁহাদের উভয়কেও বলা হইয়াছে।
হযরত আসিয়া (রা)-এর শ্রেষ্ঠত্ব এইজন্য যে, তিনি নবী মূসা (আ)-কে লালন-পালন করিয়াছিলেন। আর হযরত মারয়াম (আ)-এর শ্রেষ্ঠত্ব এইজন্য যে, তিনি ঈসা (আ)-এর জন্মদানকারিনী, লালন-পালনকারিনী। এমনিভাবে হযরত খাদীজাতুল কুবরা (রা.) সর্বশ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মাদ (স.)-এর সুখে-দুঃখে পার্শ্বে দাঁড়াইয়াছিলেন। তিনিই প্রথম মুসলমান। নিজের অগাধ ধন-সম্পদ সবকিছু আল্লাহর রাস্তায় বিলাইয়া দিয়াছিলেন। তাই আল্লাহর দীনের বিজয়ে খাদীজা (রা.)-এর ভূমিকা কোনভাবে খাটো করিয়া দেখিবার অবকাশ নাই। আবু দাউদ, নাসাঈ ও হাকেম ইবন আব্বাস (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন:
أفضل نساء أهل الجنة خديجة بنت خويلد وفاطمة بنت محمد .
"জান্নাতবাসিনী নারীদের মধ্যে খাদীজা বিন্ত খুওয়ায়লিদ ও ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ সর্বশ্রেষ্ঠ” (তাফসীরে মাযহারী, প্রাগুক্ত, page ২৮৬)।
অপর কয়েকটি হাদীছে হযরত ফাতিমা (রা)-কে সাধারণভাবে সর্বশ্রেষ্ঠ বলা হয়, যেইখানে মারায়াম (আ)-এর নাম আলাদা করা হয় নাই। বুখারী ও মুসলিম শরীফে 'আইশা (রা) হইতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ
يا فاطمة الاترضين أن تكونى سيدة نساء أهل الجنة أو نساء المؤمنين
"হে ফাতিমা! তুমি কি ইহাতে খুশী নও যে, তুমি জান্নাতবাসিনী নারীদের বা মুমিন নারীদের নেত্রী হইবে" (প্রাগুক্ত)?
উল্লিখিত হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, ফাতিমা (রা) মারয়াম (আ) হইতেও শ্রেষ্ঠ। কেননা, তিনি যুগ ও কাল নির্বিশেষে সকল জান্নাতী নারীদের নেত্রী। তাঁহার এই বিশেষত্বকে কোন কালের সাথে নির্দিষ্ট করা চলে না। পক্ষান্তরে মারয়াম (আ) সম্পর্কে বলা হইয়াছে, তাঁহাকে বিশ্বের নারীদের মধ্যে মনোনীত করা হইয়াছে। উহা তৎকালীন বিশ্বের জন্য নির্দিষ্ট হইতে পারে (প্রাগুক্ত)। উল্লেখ্য, উপরিউক্ত আলোচনা দ্বারা হযরত মারয়াম (আ)-এর মর্যাদা খাট করা উদ্দেশ্য নহে। মূল প্রশ্নটি দাঁড়াইয়াছিল সার্বিকভাবে সর্বশ্রেষ্ঠ মর্যাদার ক্ষেত্রে। অন্যথায় সারা বিশ্বের নারী সমাজের মধ্যে মারয়াম (আ)-কে আল্লাহ পাক বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেন এবং বিভিন্ন মর্যাদায় ভূষিত করেন।
প্রথমত, তিনি তাঁহার মায়ের আকুল প্রার্থনায় অকালে জন্মলাভ করেন। দ্বিতীয়ত, আল্লাহ পাক প্রথম হইতেই তাঁহাকে বাছাই করিয়া লইয়াছিলেন, যে কারণে মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও বায়তুল মুকাদ্দাসের খেদমতে মানত হিসাবে তাঁহাকে কবুল করা হয়। তিনিই এই ক্ষেত্রে প্রথম মহিলা। তৃতীয়ত, তাঁহার নিকট আল্লাহর পক্ষ হইতে সরাসরি বেহেশতী খাবার আসিত এবং তাঁহার মাধ্যমে বিভিন্ন কারামত প্রকাশ পাইয়াছিল। যেমন অমৌসুমী ফল, শুকনা খেজুর গাছ হইতে তাজা খেজুর লাভ, তাঁহার জন্য সুমিষ্ট প্রস্রবণ প্রবাহিতকরণ, শিশু সন্তানটির কথার দ্বারা তাঁহার পবিত্রতার ঘোষণা ইত্যাদি। চতুর্থত, তিনি আল্লাহর ইবাদতের ক্ষেত্রে নারী সমাজে এক আদর্শনীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হইয়া উঠিয়াছিলেন। পঞ্চমত, তিনি নির্মল চরিত্র, অনাবিল প্রকৃতি এবং দৈহিক সৌন্দর্য ও আধ্যাত্মিক উৎকর্ষে উন্নীত হইয়াছিলেন। এমনকি স্বয়ং আল্লাহ পাক তাঁহার নিষ্কলুষ চারিত্রিক গুণের প্রশংসা করিয়াছেন। আল-কুরআনে বলা হইয়াছে:
وَمَرْيَمَ ابْنَتَ عِمْرَانَ الَّتِي أَحْصَنَتْ فَرْجَهَا .
"মারয়াম বিনতে ইমরান যে তাহার গোপনাঙ্গকে পবিত্র রাখিয়াছে (সতীত্ব ধরিয়া রাখিয়াছে)" (৬৬:১২)।
ষষ্ঠত, তিনিই সেই মহিলা যিনি একাধিকবার ফেরেশতার সরাসরি সাক্ষাত লাভ করিয়াছেন এবং কথা বলিয়াছেন। সপ্তমত, পুরুষের স্পর্শ ব্যতিরেকে কেবল তাঁহার একার অস্তিত্ব হইতে হযরত মাসীহ ঈসা (আ)-এর মত একজন মহান নবীর জন্মদান করা হইয়াছে। এই বৈশিষ্ট্য দুনিয়ার আর কোন নারী লাভ করে নাই (দ্র. রাযী, প্রাগুক্ত, page ৪৩; আরো দ্র. তাফসীরে উসমানী, ১খ, page ২৩২)। আল-কুরআনে তাঁহাকে ও তাঁহার সন্তানকে কিয়ামতের নির্দশন হিসাবে আখ্যায়িত করা হইয়াছে:
وَجَعَلْنَا ابْنَ مَرْيَمَ وَأُمَّهُ أَيَةً وَأَوَيْنَا هُمَا إِلَى رَبِّوَةٍ ذَاتِ قَرَارٍ وَمَعِينٍ .
"আর আমি মারয়াম-তনয় ও তাহার জননীকে করিয়াছিলাম এক নিদর্শন, তাহাদিগকে আশ্রয় দিয়াছিলাম এক নিরাপদ ও প্রস্রবণবিশিষ্ট উচ্চ ভূমিতে” (২৩:৫০)।
পৃথিবীর খুব কম মহিলাই আল্লাহ তাআলার পক্ষ হইতে ঐ ধরনের সরাসরি সাহায্য ও করুণা লাভে ধন্য হইয়াছেন। এইজন্য তাঁহার নামে আল-কুরআনের একটি সূরার নামকরণ করা হইয়াছে। জগতের অন্য কোন মহিলার নামে কোন সূরার নামকরণ করা হয় নাই।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ইয়াহুদী ও খৃস্টান জগতে মারয়াম (আ) সম্পর্কে বাড়াবাড়ি ও তাহা খণ্ডন

📄 ইয়াহুদী ও খৃস্টান জগতে মারয়াম (আ) সম্পর্কে বাড়াবাড়ি ও তাহা খণ্ডন


কুরআন-সুন্নাহে বর্ণিত বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে মুসলমানগণ হযরত মারয়াম (আ)-কে যেইরূপ আদর্শ স্থানীয় মহিলা হিসাবে ধারণা পোষণ করিয়া থাকেন, ইয়াহুদী ও খৃস্টানগণ তেমনি ধারণা পোষণ করে না। ইয়াহুদী ও খৃস্টান জগত মারয়াম (আ) সম্পর্কে বাড়াবাড়ি করিয়াছে, বিরূপ ও বিকৃত মন্তব্য করিয়াছে। কেহ তাঁহাকে মর্যাদাহীন প্রমাণ করিতে গিয়া বাড়াবাড়ি করিয়াছে, অন্যরা তাঁহাকে বেশী মর্যাদা দিতে গিয়া সীমা লংঘন করিয়াছে।
স্মর্তব্য যে, হযরত মারয়াম (আ) যখন পিতৃহীন সন্তান ঈসা (আ)-কে জন্ম দেন, তখন ইয়াহুদীগণ প্রথমে মারয়াম (আ) সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করে। কিন্তু যখন তাহারা ঈসা (আ)-এর অলৌকিক জন্মের প্রমাণ দোলনা হইতে মুজিযাসুলভ কথা বলিবার মাধ্যমে পাইল, তখন এই মহান ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে ইয়াহুদীদের আর কোনরূপ সন্দেহ রহিল না। অতঃপর তাহারা সতীসাধ্বী মারয়াম (আ)-কে পরবর্তী ত্রিশ বৎসর পর্যন্ত কোন অপবাদ দেয় নাই, আর ঈসা (আ)-কেও কখনও অবৈধ সন্তান বলিয়া তিরস্কার করে নাই। হযরত ঈসা (আ)-এর বয়স যখন ত্রিশ বৎসর হইল তখন তিনি নবুওয়াত লাভ করিয়া দাওয়াতী কাজ শুরু করিলেন। তিনি ইয়াহুদী সমাজের, বিশেষত ইয়াহুদী আলেম সমাজের বিভিন্ন ত্রুটি-বিচ্যুতি যখন প্রকাশ করিতে আরম্ভ করিলেন তখনই তাহারা 'ঈসা (আ)-এর বিরোধিতায় লিপ্ত হয়। তাহারা কেবল ঈসা (আ) সম্পর্কে কটূক্তি ও নিন্দাবাদ করিয়াই ক্ষান্ত হইল না, বরং তাঁহার সতী সাধ্বী মাতাকেও জঘন্য অপবাদ দিতে লাগিল যে, মারয়াম ব্যভিচারিণী ও ঈসা তাঁহার ব্যভিচারের ফসল (নাউযুবিল্লাহ)।
কুরআন মজীদে ইয়াহুদীদের এই অপবাদের নিন্দা জানানো হইয়াছে। এই অপবাদ দেওয়ার জন্য তাহাদের উপর লানত বর্ষিত হইয়াছে। যেমন আল্লাহ আ'তালার বাণী:
وَبِكُفْرِهِمْ وَقَوْلُهُمْ عَلَى مَرْيَمَ بُهْتَانًا عَظِيمًا .
"আর তাহারা লানতগ্রস্ত হইয়াছিল তাহাদের কুফরীর জন্য ও মারয়ামের বিরুদ্ধে গুরুতর অপবাদের জন্য" (৪: ১৫৬)।
ইয়াহুদীদের মধ্যে কেহ কেহ তাঁহার সম্পর্কে আল্লাহর নবী যাকারিয়‍্যা (আ)-কেও অপবাদ দিয়া থাকে। আর এইজন্য বলা হয়, যাকারিয়‍্যা (আ)-কে হত্যার কারণও তাহাই (দ্র. ইবনুল আছীর, প্রাগুক্ত)। তাহাদের কেহ কেহ আর এক আবিদ ইউসুফের সহিত জড়িত করিয়া মারয়াম (আ)-কে অপবাদ দিয়া থাকে। অথচ ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী এমন তথ্যও আছে, ইউসুফের সহিত মারয়ামের কোন কালেই বিবাহ হয় নাই, উভয়ে অত্যন্ত ধার্মিক ইবাদতগুযার ছিলেন (তাফসীরে মাজেদী, ২খ., page ৪৩৫; The new Encyclopedia of Britanica, vol. 1, Page 562. এইসব ভিত্তিহীন রটনাকে আল-কুরআনে গুরুতর অপবাদ (বুহতান আযীম) বলিয়া আখ্যায়িত করা হইয়াছে।
মোটকথা, তাহাদের ঐ অপবাদের সূত্র ধরিয়াই ইয়াহুদী সাহিত্যে হযরত মারয়াম (আ)-এর গর্ভে ঈসা (আ)-এর অলৌকিক জন্মের ঘটনা অস্বীকার করা হয় (ইসলামী বিশ্বকোষ, ১৮খ, page ১২৪)। এনসাইক্লোপেডিয়া বাইবেলিকায় Mary নিবন্ধে এই ব্যাপারে বিশদ আলোচনা করা হইয়াছে এবং সুসমাচারসমূহের (Gospels) বরাত দিয়া এই কথা প্রমাণিত করিবার চেষ্টা করা হইয়াছে যে, হযরত ঈসা (আ)-এর জন্ম অলৌকিক ছিল না। যেমন লুকের সুসমাচারের বরাতে মন্তব্য করা হয়, আমরা আরো অগ্রসর হইয়া বলিতে পারি যে, লুকের প্রথম দুই অধ্যায় কুমারীরা সন্তান জন্মের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য বহন করে (ইসলামী বিশ্বকোষ, ১৮খ, ১২৪)।
আর উক্ত বরাতে এই কথাও প্রতিপন্ন করিবার চেষ্টা করা হইয়াছে যে, হযরত মারয়াম (আ) কোন উচ্চ মর্যাদার অধিকারিনী ছিলেন না; বরং তিনিও উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত গুনাহের কলংক হইতে বাঁচিয়া থাকিতে পারেন নাই (ইসলামী বিশ্বকোষ, ১৮খ, ১২৪)। 'এই পর্যায়ে শুধু ইয়াহুদী লেখক বা নাস্তিক পর্যায়ের পাশ্চাত্যের নব্য খৃষ্টবাদীদের প্রচেষ্টাই নহে বরং খোদ সুসমাচারসমূহেও হযরত মারয়াম (আ)-এর প্রতি যথাযথ শিষ্টাচার ও সম্মান প্রদর্শন করা হয় নাই।
যথা মথি লিখিত সুসমাচারে রহিয়াছে, "যখন তিনি জনতার নিকট এই সকল কথা বলিতেছিলেন এমন সময়ে দেখ, তাঁহার মাতা ও ভাই বাহিরে দাঁড়াইয়াছিলেন এবং তাঁহার সহিত কথা বলিতে চাহিতেছিলেন। কেহ তাঁহাকে বলিলঃ আপনার মাতা ও ভ্রাতারা বাহিরে দাঁড়াইয়া রহিয়াছেন এবং আপনার সহিত কথা বলিতে চাহিতেছেন। তিনি সংবাদদাতাকে উত্তরে বলিলেন, আমার মাতা কে? আমার ভ্রাতারাই বা কাহারা? পরে তিনি তাঁহার শাগরিদগণের দিকে হাত বাড়াইয়া কহিলেনঃ এই দেখ, আমার মাতা ও আমার ভ্রাতারা; কেননা যে কেহ আমার স্বর্গস্থ পিতার ইচ্ছা পালন করে সেই আমার ভ্রাতা, ভগিনী ও মাতা (মথি, ১২: ৪৬-৫০, মার্ক, ৩: ৩১-৫; লুক, ৮: ১৯-২১; আরও (দ্র. মথিঃ ১৩: ৫৫; মার্ক, ৬: ৩, লুক, ৮: ২০)।
অথচ কুরআন কারীম, যাহা আল্লাহ তা'আলার শাশ্বত ও সংরক্ষিত বাণী, তাহাতে ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের মারয়াম সম্পর্কে অপবাদ ও অসম্মান প্রদর্শনকে সুস্পষ্টভাবে খণ্ডন করিয়াছে এবং উভয় সম্প্রদায়ের ভুলগুলি চিহ্নিত করিয়া দিয়াছে। হযরত মারয়াম (আ)-কে একজন মুত্তাকী, পবিত্র চরিত্রের অধিকারিনী, সতী সাধ্বী, ফেরেশতার সহিত বাক্যালাপকারিনী, সিদ্দীকা এবং অতি উচ্চতর পর্যায়ের আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বের অধিকারিনী মহিলা হিসাবে উল্লেখ করা হইয়াছে (দ্র. ৩: ৩৬-৩৭, ৪২, ৪৫)। সূরা আম্বিয়ায় হযরত মারয়াম (আ)-এর নির্মল অত্যুজ্জ্বল চারিত্রিক মাধুর্যের বর্ণনা আসিয়াছে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায়:
وَالَّتِي أَحْصَنَتْ فَرْجَهَا فَنَفَخْنَا فِيهَا مِنْ رُوحِنَا وَجَعَلْنَاهَا وَابْنَهَا أَيَةً لِلْعَالَمِينَ .
"আর সেই নারী, যে নিজ সতীত্বকে রক্ষা করিয়াছিল, অতঃপর তাহার মধ্যে আমি আমার রূহ ফুঁকিয়া দিয়াছিলাম এবং তাহাকে ও তাঁহার পুত্রকে করিয়াছিলাম বিশ্ববাসীর জন্য এক নিদর্শন" (২১ঃ ৯১)।
সূরা তাহরীমের একটি আয়াতে হযরত মারয়াম (আ)-এর ক্রিয়াকলাপকে এক মহান রূহানী ব্যক্তিত্বের গুণে ভূষিত করিয়া পেশ করা হইয়াছে:
وَمَرْيَمَ ابْنَتَ عِمْرَانَ الَّتِي أَحْصَنَتْ فَرْجَهَا فَنَفَخْنَا فِيهِ مِنْ رُّوحِنَا وَصَدَّقَتْ بِكَلِمَاتِ رَبَّهَا وَكُتُبِهِ وَكَانَتْ مِنَ الْقَانِتِينَ .
"(আল্লাহ আরও দৃষ্টান্ত দিতেছেন) ইমরান তনয়া মারয়ামের, যে তাহার সতীত্ব হিফাযত করিয়াছিল। ফলে আমি তাহার মধ্যে রূহ ফুঁকিয়া দিয়ছিলাম এবং সে তাহার প্রতিপালকের বাণী ও তাহার কিতাবসমূহ সত্য বলিয়া গ্রহণ করিয়াছিল; সে ছিল অনুগতদের একজন" (৬৬:১২)।
অপরদিকে খৃস্টানগণ হযরত মারয়াম (আ)-কে সম্মান প্রদর্শনের ক্ষেত্রে অতিশয় বাড়াবাড়ি করিয়া থাকে। তাহাদের শিল্প, সংগীত ও সাহিত্যে হযরত মারয়াম (আ) একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করিয়া আছেন। তাঁহার প্রশংসা ও প্রার্থনায় নিবেদিত হয় বিশেষ সংগীত। খৃস্টান জগত মারয়াম (আ) সম্পর্কে যে সকল ধারণার জন্ম দিয়াছে তাহাকে দর্শনে রূপ দিয়াছে যাহাকে Doctrine of Mary বা Mariology বলা হয়। যদিও এই ধারণাগুলি একদিনে গড়িয়া উঠে নাই (Encyclopaedia of Britanica, Vol. 14, Page 996)।
এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকায় ঐ দর্শনের আলোকে যুগে যুগে প্রাপ্ত তত্ত্বের ভিত্তিতে মারয়ামকে বিভিন্ন অভিধায় অভিহিত করা হইয়াছে। যেমন, কুমারী মাতা (Virgin mother), প্রভু মাতা (Mother of god) বা প্রভুর বাহক (God bearer), চির কুমারী (ever virgin), আদি পাপমুক্ত (Immaculate), স্বশরীরে স্বর্গে প্রবেশকারিনী (Assumed into the Heaven), (দ্র. প্রাগুক্ত, page ৯৯৭)। The new Encyclopaedia of Britanica তে তাঁহাকে দ্বিতীয় হাওয়া (Second Eve) নামেও আখ্যায়িত করা হইয়াছে (১১খ., page ৫৬১)।
এইগুলি শুধু তাঁহার উপাধিই নহে, বরং খৃস্টানদের আকীদারও অংশ। এইজন্য তাঁহার প্রতি খৃস্টান চার্চ (রোমান ক্যাথলিক হউক বা অর্থোডক্স হউক) স্তুতিমূলক বিশেষ প্রার্থনা (Rosary) পালন করে।
টিকাঃ
১. ইবনুল আরাবীর আহকামুল কুরআন (২খ, ২৮০), আল-মানার (৬খ, ৩৯২) এবং তাফসীরে তাবারীতেও (১০খ, ৯৭) এই ধরনের বর্ণনা রহিয়াছে।
২. আল্লামা ইবনুল আরাবীর আহকামুল কুরআন (২খ, ২৮০) এবং রূহুল মা'আনীতে (১৬খ, ৩০) এই ধরনের বর্ণনা রহিয়াছে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 গ্রন্থপঞ্জী

📄 গ্রন্থপঞ্জী


গ্রন্থপঞ্জী: (১) William Little, H.W. Fowler and lessie Coulson, The Shorter Oxford English dictionary on historical priciple, vol. 2 (Oxford : clorind on 1973); (২) বাইবেল বঙ্গানুবাদ (ঢাকা: বাংলাদেশ বাইবেল সোসাইটি, ১৯৯৩/৯৭);
(৩) Colliers Encyclopedia, vol. 15 (New York : Macmillan Educational Corporation, 1977); (৪) The Encyclopedia Americana, vol. 18 (Danbury : Americana Corporation, 1979); (৫) আবুল কাসিম আল-হুসায়ন ইবন মুহাম্মাদ (রাগিব আল-ইসফাহানী হিসাবে পরিচিত), আল-মুফরাদাতু ফী গরীবিল কুরআন (বৈরূত, দারুল মারিফা, তা. বি.); (৬) আলাউদ্দীন আল-বাগদাদী, আল-খাযিন, লুবাবুত্-তাবীল ফী মা'আনিয়ি‍্যত তানযীল (তাফসীরে খাযিন হিসাবে প্রসিদ্ধ) (বৈরূত, দারুল মারিফা, তা. বি.); (৭) আবুল কাসিম জারুল্লাহ আয-যামাখশারী, আল-কাশশাফ (বৈরূত, দারুল মারিফা, তা. বি.); (৮) আবূ আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ আল-আনসারী আল-কুরতুবী আল-জামিলি-আহকামিল কুরআন (বৈরূত, দারু ইহয়াইত্ তুরাছিল আরাবী, তা. বি.); (৯) কাযী ফাখরুদ্দীন আর-রাযী, আত্-তাফসীরুল কবীর (বৈরূত, দারু ইয়াইত তুরাছিল আরাবী, তা. বি.); (১০) শায়খ যাদাহ্, হাশিয়া আলা তাফসীরিল বায়দাবী (তাফসীরে বায়দাবীর উপর টীকা; মুলতান: মাক্কাবা ইমদাদিয়া, তা. বি.); ১২. রায়দাবী, তাফসীর বায়দাবী (কলিকাতা, এম বশীর হাসান এন্ড সন্স, তা. বি.); ১৩. ফীরোযাবাদী, আল-কামূসুল মুহীত; (১৪) ইমাম 'আবদুল্লাহ আহমদ ইব্‌ন মাহমূদ আন-নাসাফী, মাদারিকুত্ তানযীল ওয়া হাকায়িকুত্ তাবীল (তাফসীরে নাসাফী হিসাবে প্রসিদ্ধ, করাচী, কাদেমী কুতুবখানা, তা.বি.); (১৫) Encyclopaedia Britannica, vol.14 (Chicago : Ency. Britannica LTD,1962); (১৬) The New Encyclopaedia Britannica, vol.11, (Chicago : Encyclopaedia Britannica Inc. 1980); (১৭) মাও. আবুল কালাম আযাদ, তরজমানুল কুরআন, ৪খ, নয়াদিল্লী, সাতিয়া একাডেমী, ৩য় সং, ১৯৮০; (১৮) আবূ জাফর মুহাম্মাদ ইব্‌ন জারীর তাবারী, জামিউল বায়ান ফী তাফসীরিল কুরআন, আরবী, বৈরূত: দারুল মারিফা, ১৩৯৮ হি./১৯৭৮ খৃ., ও বঙ্গানুবাদ তাফসীরে তাবারী শরীফ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা ১৯৯৪; (১৯) আবদুল মাজেদ দরিয়াবাদী, তাফসীরে মাজেদী, বঙ্গানুবাদ মাওলানা মহাম্মদ ওবাইদুর রহমান মল্লিক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা ১৯৯৪; (২০) ইবনুল জাওযী, যাদুল মাসীর, (দামিঙ্ক: আল-মাক্তাবুল ইসলামী, ১ম সং, ১৩৮৪ হি./১৯৬৪ খৃ.); (২১) ইবন কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম (বৈরূত: দারুল মারিফা, ১৪০০ হি./১৯৮০ খৃ.); (২২) ঐ, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া (কায়রোঃ দারুদ দায়‍্যান, ১৪০৮ হি./১৯৮৮ খৃ.); (২৩) ইবনুল আরাবী, আহকামুল কুরআন (বৈরূত: দারুল মারিফা তা.বি:); (২৪) সায়্যিদ মাহমূদ আলুসী, রূহুল মা'আনী (বৈরূত: দারু ইহয়াইত্ তুরাছিল আরাবী, তা.বি.); (২৫) মাও. হিফযুর রহমান, সিউহারবী, কাসাসুল কুরআন, ৪খ., বঙ্গানুবাদ মাওলানা মুহাম্মদ মূসা (ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১৯৮৯ খৃ./১৪০৯ হি.); ২৬. ছানাউল্লাহ পানিপথি, তাফসীরে মাযহারী, বঙ্গানুবাদ ই.ফা.বা. ১৯৯৭ খৃ.; (২৭) কিরমানী, শারহি সহীহিল বুখারী, বৈরূত, দারু ইহয়াইত্ তুরাছিল আরাবী, ১৪০১ হি./১৯৮১ খৃ.; (২৮) জাস্সাস, আহকামুল কুরআন, দামিশক: দারুল ফিক্স তা.বি.; (২৯) ইসমাঈল হাক্বী, রূহুল বায়ান, বৈরূত, দারু ইহয়াইত্ তুরাছিল আরাবী, ১৪০৫ হি./১৯৮৫ খৃ.; (৩০) আবদুল হক হাক্কানী, তাফসীরে হাক্কানী, দিল্লী: ইতিকাদ পাবলিকেশান্স হাউস, তা.বি.; (৩১) মাও. মওদূদী, তাফহীমুল কুরআন, উর্দু (৩খ. page ৬৩), দিল্লী: মারকখী মাক্কাবা ইসলামী, ১৯৮২ খৃ.; (৩২) ইবনুল আছীর, আল-কামিল ফিত্ তারীখ, বৈরূত, দারুল কুতুবিল ইসলামিয়া, ১৪০৭ হি./১৯৮৭ খৃ.; (৩৩) ইবন হাজার আসকালানী, ফাতহুল বারী (বৈরূত), দারু ইহয়াইত্ তুরাছিল আরাবী, ১৪০২ হি.; (৩৪) ইব্‌ন হাযম, আল-ফিসাল ফিল মিলাল ওয়াল আহ্‌ওয়াই ওয়ান-নিহাল (৫খ, page ১৭), বৈরূত, দারুল মারিফা, ১৩৯৫ হি./১৯৭৫ খৃ.; (৩৫) বদরুদ্দীন আয়নী, উমদাতুল কারী, শারহু সাহীহিল বুখারী, বৈরুত, দারু ইহয়াইত্ তুরাছিল আরাবী, তা.বি.; (৩৬) সুনান তিরমিযী, দিল্লী, কুতুবখানা রশীদিয়া, তা.বি; (৩৭) John R. Hinnclis, who's who of world Religions, London, Macmillan press, 1991।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00