📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ঈসা (আ)-এর ঊর্ধ্বারোহণের মুহূর্তে মারয়াম (আ)

📄 ঈসা (আ)-এর ঊর্ধ্বারোহণের মুহূর্তে মারয়াম (আ)


হাফিয ইবন 'আসাকির ইয়াহইয়া ইবন হাবীবের সূত্রে উল্লেখ করেন, হযরত মারয়াম (আ) জিবরাঈল (আ)-এর দিকনির্দেশনায় ঐ গহীন জঙ্গলে গিয়া ঈসা (আ)-এর সাক্ষাত পাইলেন। ঈসা (আ) তাঁহাকে দেখিয়া দ্রুত তাঁহার পানে আগাইয়া আসিলেন এবং জড়াইয়া ধরিলেন, মাথায় চুমা খাইলেন, তাঁহার জন্য দু'আ করিলেন এবং বলিলেন, আম্মাজী! এই (ষড়যন্ত্রকারী) গোষ্ঠী আমাকে হত্যা করিতে পারে নাই, বরং আল্লাহই আমাকে তাঁহার কাছে উঠাইয়া নিয়াছেন এবং আপনার সাক্ষাতের অনুমতি দিলেন। অচিরেই আপনার মৃত্যু হইবে। অতঃএব আপনি সবর করুন, আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করুন। তাহার পর ঈসা (আ) উর্ধ্বারোহণ করিয়া চলিয়া গেলেন। মারয়াম (আ)-এর ইন্তিকাল পর্যন্ত তাঁহার সাথে ঈসা (আ)-এর আর সাক্ষাত হয় নাই (প্রাগুক্ত, page ৮৮)।
খৃস্টানদের বাইবেলে উল্লেখ রহিয়াছে, 'ঈসা (আ)-এর ঊর্ধ্বারোহণের সময় গালীল তথা, আল-খলীল প্রদেশের এক পল্লী পাহাড়ে তাঁহার এগারজন সাথীর সাথে তাঁহার সাক্ষাত হইয়াছিল। তাহাদের সাথে তাঁহার মাতা মারয়াম (আ)-ও ছিলেন (দ্র. মথি, ২৮: ১, ১৬; মার্ক, ১৬ : ১২, ২৪ : ১০, ২৪, ২৭-৪২)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ঈসা (আ)-এর ঊর্ধ্বারোহণের পর মারয়াম-এর অবস্থান

📄 ঈসা (আ)-এর ঊর্ধ্বারোহণের পর মারয়াম-এর অবস্থান


খৃস্টীয় উৎস হইতে জানা যায়, ঈসা (আ)-এর ঊর্ধ্বারোহণের পর তাঁহার এগারজন শিষ্য মারয়াম (আ)-সহ জেরুসালেমে ফিরিয়া আসিয়াছিলেন (দ্র. লুক সুসমাচার, ২৪ : ৫৩)। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি কোথায় কিভাবে অবস্থান করেন সেই সম্পর্কে কোন কিছু জানা যায় না। সম্ভবত ইয়াহুদীদের তল্লাশি ও ষড়যন্ত্রের মুখে ঈসা (আ)-এর এগারজন সাথীর সাথে মারয়াম (আ)-ও পাহাড়ে-জঙ্গলে আত্মগোপন করিয়াছিলেন এবং ইবাদত-বন্দেগীতে মশগুল থাকিয়া বাকি জীবন অতিবাহিত করিয়াছিলেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মারয়াম (আ)-এর ওফাত

📄 মারয়াম (আ)-এর ওফাত


পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে যে, মারয়াম (আ)-এর মৃত্যুর বিষয়ে ঈসা (আ) নিজেই আগাম সংবাদ দিয়াছিলেন। কিন্তু ঈসা (আ)-এর ঊর্ধ্বারোহণের পর কত বৎসর মারয়াম (আ) জীবিত ছিলেন সেই সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। হাফিয ইবন আসাকিরের বর্ণনা অনুযায়ী 'ঈসা (আ)-এর উত্তোলনের পর মারয়াম (আ) ৫ (পাঁচ) বৎসর জীবিত ছিলেন। তিনি ৫৩ বৎসর বয়সে ইনতিকাল করেন (ইবন কাছীর, প্রাগুক্ত)। কুরতুবী উল্লেখ করেন, খৃস্টানদের ধারণামতে মারয়াম (আ) ঈসা (আ)-এর উত্তোলনের পর ছয় বৎসর বাঁচিয়াছিলেন। তখন তাঁহার মোট বয়স ছিল ৫৬ বৎসর (কুরতুবী, প্রাগুক্ত, ১১ খ, page ৯১)। আল্লামা কিরমানী উল্লেখ করেন, ঈসা (আ)-এর উত্তোলনের পর মারয়াম (আ) ৬৬ বৎসর জীবিত ছিলেন। তখন তাঁহার বয়স হইয়াছিল ১১২ বছর (দ্র. কিরমানী, শারহ বুখারী, ১১খ, ৬১)।
The World Book Encyclopedia-এর ভাষ্য অনুসারে মারয়ামের শেষ জীবন সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়। ইহা বিশ্বাস করা হয়, তিনি জেরুসালেমে প্রায় ৬৩ খৃস্টাব্দে মারা যান (vol. 13, Page 191; আরো দ্র. Ency. Americana, vol. 18, Page 347)। খৃষ্টানগণ, বিশেষত ক্যাথলিক সমাজ ধারণা করে যে, মারয়ামের মৃত্যুর পর তাঁহাকে স্বর্গে উঠাইয়া নেওয়া হয় (Ency. Britannica, vol. 14, page 998)। ঐসব মতামত তাহাদের ধারণা মাত্র। প্রকৃত অবস্থা আল্লাহই অধিক জ্ঞাত।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মারয়াম (আ) কি নবী ছিলেন?

📄 মারয়াম (আ) কি নবী ছিলেন?


মারয়াম (আ) নবী ছিলেন কি না ইহা লইয়া আলিমগণের মধ্যে পরস্পরবিরোধী মতামত রহিয়াছে। 'আল্লামা ইব্‌ন হাযম উল্লেখ করেন, উহা এমন প্রসঙ্গ যাহা সম্পর্কে আমাদের যুগে কর্ডোভায় (স্পেন) প্রচণ্ড মতবিরোধ সৃষ্টি হইয়াছে। কেননা একদল আলিমের মতে কোন মহিলা নবী হইতে পারেন না। আর যেই লোক বলে, স্ত্রীলোক নবী হইতে পারে সে একটি বিদ'আতের জন্ম দিল। অপর দলের মতে মহিলারা নবী হইতে পারেন এবং নবী হইয়াছেনও। তৃতীয় একদল আলিম এই ব্যাপারে নীরব ভূমিকা অবলম্বন করিয়াছেন (দ্র. ইবন হাম্, আল-ফাস্স ফিল মিলালি ওয়াল আহওয়াই ওয়ান নিহাল, ৫খ, ১৭)।
যাঁহারা মহিলাদের নবী হওয়ার পক্ষে মতামত দিয়াছেন তাঁহাদের মধ্যে মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক, আবুল হাসান আশআরী, ইমাম ইবন হাযম কুরতুবী প্রমুখ উল্লেখযোগ্য (দ্র. 'আসকালানী, ফাতহুল বারী, ৬খ, page ৩৬৮; ইবন হাযম, প্রাগুক্ত; 'আয়নী, 'উমদাতুল কারী, ১৫খ, page ৩০৯; কুরতুবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, page ৮৩; সিওহারবী, প্রাগুক্ত, page ১৩)। এমনকি ইবন হাযম দাবি করিয়াছেন, ছয়জন মহিলা নবী ছিলেন। তাঁহারা হইলেন হাওয়া, সারা, হাজেরা, উম্মে মূসা, আসিয়া ও মারয়াম (আ) (দ্র. ইবন হাযম, প্রাগুক্ত)।
মুহাম্মদ ইবন ইসহাক বলেন, অধিকাংশ ফিকহবিদের মত হইতেছে মহিলারা নবী হইতে পারেন (সিউহারবী, প্রাগুক্ত), আর মারয়াম (আ) নবী ছিলেন। অবশ্য কুরতুবী সারা ও হাজেরার নাম উল্লেখ করেন নাই। ইবন ইসহাকের মতকে 'আল্লামা সুহায়লী অধিকাংশ ফকীহ-এর মত বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন (দ্র. আসকালানী, প্রাগুক্ত)। 'আল্লামা তকীউদ্দীন সুকী এই মত সমর্থন করিয়াছেন (দ্র. আলুসী, প্রাগুক্ত, ৩খ, page ১৫৪)। ইবন হাযম ও কুরতুবীর মতকে 'আল্লামা ইবনুস সায়্যিদ প্রাধান্য দিয়াছেন (প্রাগুক্ত)। তাহারা নিজ নিজ মতের পক্ষে কয়েকটি দলীল পেশ করিয়াছেন। যেমনঃ
১. আল-কুরআনে মারয়াম (আ) সম্পর্কে যেইসব ঘটনা উল্লেখ করা হইয়াছে, তাহাতে পরিষ্কার দেখা যায় যে, তাঁহার কাছে ফেরেশতা আল্লাহর পক্ষ হইতে ওহী লইয়া আসিয়াছিলেন এবং বিভিন্ন সুসংবাদ ও দিকনির্দেশনা প্রদান করিয়াছিলেন। যেমন ফেরেশতা মানব রূপ ধারণ করিয়া মারয়াম (আ)-কে সম্বোধন করিয়াছিলেন, যাহা আল-কুরআনে স্পষ্টভাবে উক্ত হইয়াছে: فَأَرْسَلْنَا إِلَيْهَا رُوحَنَا فَتَمَثَّلَ لَهَا بَشَرًا سَوِيًّا . قَالَتْ إِنِّي أَعُوذُ بِالرَّحْمَنِ مِنْكَ إِنْ كُنْتَ تَقِيًّا . قَالَ إِنَّمَا لَنَا رَسُولُ رَبَّكَ لأَهَبَ لَكَ غُلَامًا زَكيًّا . "অতএব আমি তাহার নিকট আমার রূহ (ফেরেশতা) পাঠাইলাম.........সে বলিল, আমি তো আপনার রবের প্রেরিত যেন আপনাকে একটি পবিত্র পুত্র সন্তান দান করিতে পারি" (১৯:১৭-১৯)।
এই প্রেক্ষিতে ইবন হাযম বলেন, "ইহা তো প্রকৃত ওহীর মাধ্যমে প্রকৃত নবুওয়ত (ইবন হাযম, প্রাগুক্ত, page ১৮)।
২. বিশেষ করিয়া সূরা মারয়ামে হযরত মারয়াম (আ) সম্পর্কে যেইভাবে বর্ণনা দেওয়া হইয়াছে তাহাতে সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, তিনি নবী ছিলেন। কেননা নবী-রাসূলগণ সম্পর্কে কুরআন কারীমে যেই ভঙ্গিতে আলোচনা করা হইয়াছে, এইখানে হযরত মারয়াম (আ)-এর ক্ষেত্রেও সেই প্রকাশ ভংগীই অবলম্বন করা হইয়াছে। যেমন: "আর এই কিতাবে মূসার কাহিনী বর্ণনা করুন"..... (১৯:৫১)। وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ مُوسَى "আর এই কিতাবে ইদ্রীসের কাহিনী বর্ণনা করুন"..... (১৯:৫৬)। وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ اِدْرِيسَ "আর এই কিতাবে ইসমাঈলের কাহিনী বর্ণনা করুন".... (১৯:৫৪)। وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ إِسْمَاعِيلَ "আর এই কিতাবে ইবরাহীমের কাহিনী বর্ণনা করুন".... (১৯:৪১)। وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ إِبْرَاهِيمَ “আর এই কিতাবে মারয়ামের কাহিনী বর্ণনা করুন"....(১৯:১৬)। وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ مَرْيَمَ অনন্তর সূরা আল ইমরানে আল্লাহর ফেরেশতা তাঁহার বাণীবাহক হইয়া হযরত মারয়াম (আ)-কে যেইভাবে সম্বোধন করিয়াছেন তাহাও এই দাবির পক্ষে সুস্পষ্ট প্রমাণ (সিউহারবী, প্রাগুক্ত, page ১৬)।
৩. সহীহ বুখারীতে এক হাদীছে আসিয়াছে, মহানবী (স) বলিয়াছেন: كَمَلَ مِنَ الرِّجَالِ كَثِيرٌ وَلَمْ يَكْمُلْ مِنَ النِّسَاءِ إِلَّا آسِيَةُ امْرَأَةُ فِرْعَوْنَ وَمَرْيَمُ بِنْتُ عِمْرَانَ "পুরুষদের মধ্যে অনেকেই পূর্ণতায় পৌঁছিয়াছেন। কিন্তু নারীদের মধ্যে কেবল ফিরআউনের স্ত্রী আছিয়া এবং ইমরান-এর কন্যা মারয়াম এই পূর্ণতায় পৌঁছিতে পারিয়াছেন" (বুখারী, কিতাবু আম্বিয়া, بَابُ قَالَتِ الْمَلَائِكَةُ مِنَ الْخِ 'আসকালানী, প্রাগুক্ত, page ৩৬৭)।
৪. মারয়াম (আ) সম্পর্কে আল-কুরআনে আল্লাহর বাণী اِصْطَفَاكَ عَلَى نِسَاءِ الْعَالَمِينَ “বিশ্ব জগতের নারীকুলের মধ্যে তোমাকে মনোনীত করিয়াছেন"। ইবন হাজার আসকালানী উল্লেখ করেন, এই আয়াত দ্বারা দলীল পেশ করা হয় যে, মারয়াম (আ) নবী ছিলেন ('আসকালানী, প্রাগুক্ত, page ৩৬৮)।
অপরদিকে অনেক 'আলেমে দীন মত ব্যক্ত করিয়াছেন যে, মারয়াম (আ) নবী ছিলেন না, বরং সিদ্দীকা ছিলেন। এই মতের প্রবক্তাগণের মধ্যে হাসান বসরী, ইমামুল হারামাইন শায়খ আবদুল 'আযীয, কাযী 'ইয়াদ, আবু বকর আল-জাস্সাস, ফখরুদ্দীন রাযী, ইবন কাছীর প্রমুখ (দ্র. ইবন হাজার 'আসকালানী, প্রাগুক্ত; জাসসাস, প্রাগুক্ত, ২খ, page ১২; রাযী, প্রাগুক্ত; ইবন কাছীর, প্রাগুক্ত, ২খ, page ৫৫)।
আবুল হাসান 'আশআরীর সূত্রে ইবন কাছীর উল্লেখ করেন, জমহুর তথা অধিকাংশ আলেমের ইহাই মত (ইবন কাছীর, প্রাগুক্ত)। কাযী ইয়াদও বলিয়াছেন যে, ইহাই জমহুরের মত (আসকালানী, প্রাগুক্ত)। আর ইমামুল হারামাইন আল্লামা কিরমানীও এই ব্যাপারে ইজমার দাবি করিয়াছেন (প্রাগুক্ত; কিরমানী প্রাগুক্ত, ১৪খ, page ৬০)। এই সকল 'আলেমের মতে মহিলারা নবী হইতে পারেন না তথা মারয়াম (আ)-ও নবী ছিলেন না। তাঁহারা নিজেদের মতের সমর্থনে নিম্নোক্ত দলীলগুলি পেশ করিয়া থাকেন :
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ إِلَّا رِجَالًا نُوحِي إِلَيْهِمْ . "আপনার পূর্বে আমি যে নবী-রাসূল পাঠাইয়াছি তাহারা সকলে পুরুষই ছিল, আমি তাহাদের কাছে ওহী পাঠাইতাম" (১২: ১০৯)।
২. হযরত মারয়াম (আ) যে নবী ছিলেন না বরং সিদ্দীকা ছিলেন, তাহা আল-কুরআনেও একটি আয়াতে উল্লেখ করা হইয়াছে।
مَا الْمَسِيحُ بْنُ مَرْيَمَ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ وَأُمُّهُ صِدِّيقَةٌ . "মারয়াম তনয় মাসীহ তো একজন রাসূল মাত্র। তাহার পূর্বে আরও অনেক রাসূল গত হইয়াছে। তাহার মা ছিল একজন সিদ্দীকা তথা সত্যপন্থী মহিলা" (৫৪৭৫)।
এই আয়াতে রাসূলগণের প্রসঙ্গ আলোচনা করিয়া মারয়ামকে সিদ্দীকা হিসাবে আখ্যায়িত করা হইয়াছে। উল্লেখ্য, কুরআন কারীম সূরা নিসায় নি'আমতপ্রাপ্তদের যেই তালিকা দিয়াছে তাহা এই ব্যাপারে চূড়ান্ত দলীল। অর্থাৎ (সিদ্দীক)-এর মর্যাদা নবুওয়াতের মর্যাদার পর বলা হইয়াছে : فَأُولَئِكَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِنَ النَّبِيِّينَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصَّالِحِينَ وَحَسُنَ أُولَئِكَ رَفِيقًا . "(যেইসব লোক আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের আনুগত্য করিবে) তাহারা সেই লোকদের সংগী হইবে যাহাদের প্রতি আল্লাহ নি'আমত দান করিয়াছেন। তাহারা হইতেছে নবীগণ, সত্যবাদী তথা সিদ্দীকগণ, শহীদগণ এবং নেক্কার লোকসকল। তাহারা যাহাদের সঙ্গী-সাথী হইবে, তাহাদের পক্ষে উহারা কতই না উত্তম সাথী" (৪: ৬৯)!
এই মতাবলম্বিগণ পূর্বোক্ত দলের যুক্তি খণ্ডন করিয়াছেন। যেমন বলা হইয়াছে, ফেরেশতার সহিত কথাবার্তা বলাই নবুওয়াতের প্রমাণ নহে। আল্লামা আসকালানী বলেন, ফেরেশতাগণ এমন অনেক ব্যক্তির সহিত কথা বলিয়াছেন যাহারা নবী ছিলেন না বলিয়া সকলেই একমত। বর্ণিত আছে যে, কোন এক ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে তাহাদের এক ভাইয়ের সাক্ষাতে বাহির হইয়াছিলেন। তখন ফেরেশতাগণ তাহাকে সুসংবাদ দেন যে, তাহাকে আল্লাহ পাক তেমনি ভালবাসেন যেমনি তিনি তাহার ভাইকে ভালবাসেন (আলুসী, প্রাগুক্ত)।
দ্বিতীয়ত, বলা হয়, সূরা মারয়ামে হযরত মারয়াম (আ)-কে বিশেষভাবে বর্ণনা করিবার উদ্দেশ্য হইল, তিনি ছিলেন আল্লাহর কুদরতের এক নিদর্শন যিনি পিতাবিহীন সন্তান জন্ম দিয়াছিলেন। তিনি ছিলেন উচ্চাঙ্গের আবেদ ও মুত্তাকী। ইহাতে তিনি নবী ছিলেন বলিয়া প্রমাণিত হয় না।
তৃতীয়ত, সারা বিশ্বের নারীকুলের মধ্যে মনোনীত করিবার অর্থ সম্পর্কে মতভেদ রহিয়াছে। কাহারও মতে তৎকালীন বিশ্বের, কাহারও মতে গোটা নারী জাতির। এই বিতর্কিত বিষয় দ্বারা দলীল পেশ করা শক্তিশালী নহে।
চতুর্থত, মারায়ম ও আছিয়ার পূর্ণাঙ্গতায় পৌঁছার অর্থ নবুওয়াতের স্তরে পৌঁছা বুঝায় না।
আল্লামা কিরমানী বলেন, "কামাল তথা পূর্ণাঙ্গতা শব্দটি দ্বারা উভয়ের নবুওয়াত লাভ করা বুঝায় না। কেননা কোন বস্তু বা বিষয়ের ক্ষেত্রে পরিপূর্ণতা ও শেষ পর্যায়ে পৌঁছার ব্যাপারেই উহা ব্যবহৃত হয়। আর নারীরা যেইসব উন্নত মর্যাদায় পৌঁছিয়া থাকেন তাহারা উভয়েই সেই মর্যাদায় পৌছিয়াছিলেন" (প্রাগুক্ত)।
পঞ্চমত, কুরআন মজীদের বহু স্থানে নবী এবং রাসূল শব্দদ্বয়কে সমার্থবোধক শব্দ হিসাবে ব্যবহার করা হইয়াছে" (উদাহরণস্বরূপ দ্র. ২: ১৩৬, ২১৩; ৩:৮৪, ৪:২০, ৪৪)। সাধারণত উভয়ের মধ্যে পার্থক্য করা হয় যে, রাসূলকে কিতাব দেওয়া হয়, নবীকে কিতাব দেওয়া হয় না। অথচ বলা হইয়াছে: وَإِذْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ النَّبِيِّينَ لَمَا آتَيْتُكُمْ مِنْ كِتَابٍ وَحِكْمَةٍ . "আর যখন আল্লাহ নবীদের থেকে অঙ্গীকার লইলেন যে, আমি তোমাদেরকে কিতাব ও হিকমত যাহা কিছু দিয়াছি" (৩:৮১)।
এই আয়াত দ্বারা বুঝা যায়, নবীগণকেও কিতাব দেওয়া হয়। আর মারয়ামকে কিতাব দেওয়া হইয়াছিল এই মর্মে কোন প্রমাণ নাই। কাহারো মতে নবুওয়াত অর্থ (আল্লাহর পক্ষ হইতে) সংবাদ প্রাপ্তি আর রিসালাত অর্থ তাহা পৌছানো। কিন্তু এই পার্থক্য যথাযথ নহে। কারণ কোন নবীকে আল্লাহর পক্ষ হইতে বার্তা দেওয়া হইবে আর তিনি তাহা পৌঁছাইবেন না বা না পৌঁছাইলেও চলিবে ইহা সমর্থনযোগ্য নহে। অথচ আল-কুরআনে রাসূল অভিধায় ব্যবহৃত আয়াতে যেই দায়িত্বের কথা বলা হইয়াছে নবী অভিধায় ব্যবহৃত আয়াতে একই দায়িত্বের কথা উল্লেখ করা হইয়াছে। যেমন রাসূল সম্পর্কে বলা হইয়াছে: رُسُلًا مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا . "সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রাসূল পাঠাইয়াছি, যাহাতে রাসূলগণের পর আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোন অভিযোগ বাকী না থাকে। আল্লাহ পরাক্রান্ত, প্রজ্ঞাময়" (৪: ১৬৫)।
এমনিভাবে নবীগণ সম্পর্কে বলা হইয়াছে: كَانَ النَّاسُ أُمَّةً وَاحِدَةً فَبَعَثَ اللهُ النَّبِيِّينَ مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ وَأَنْزَلَ مَعَهُمُ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِيَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ فِيمَا اخْتَلَفُوا فِيهِ . "সমস্ত মানুষ একই উম্মতভুক্ত ছিল। তাহার পর আল্লাহ নবীগণকে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী- রূপে প্রেরণ করেন এবং তাহাদের সাথে সত্য কিতাব নাযিল করেন, মানুষের মধ্যে সেই বিষয়ে মীমাংসা করিবার জন্য, যাহা লইয়া তাহারা মতবিরোধ সৃষ্টি করিয়াছিল" (২: ২১৩)।
উপরিউক্ত আয়াত দ্বারা বুঝা যাইতেছে, নবীগণও সতর্ককারী ও সুসংবাদ দানকারী তথা দাওয়াতী কাজে নিমগ্ন ছিলেন, তাঁহাদিগকে কিতাব দান করা হইয়াছিল। তাঁহারা মানুষের মধ্যে ফয়সালাকারী ছিলেন। আর মারয়াম (আ) ঐ ধরনের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন বলিয়া কোন উল্লেখ পাওয়া যায় না। তিনি ছিলেন আবেদ, সিদ্দীকা। পিতৃহীন সন্তান ধারণের জন্যই তাঁহাকে বিশেষভাবে লালন করা করা হইয়াছিল। তিনি ছিলেন আল্লাহ্র ওলী, আর ওলীগণের মাধ্যমে কারামতের প্রকাশ ঘটিয়া থাকে। তাই আল্লাহর পক্ষ হইতে আহার্য লাভ তাঁহার একটি কারামত, নবী হিসাবে মুজিযা নহে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00