📄 ঈসা (আ)-এর লালন-পালনের দায়িত্বে মারয়াম (আ)
হযরত মারয়াম (আ) হযরত ঈসা (আ)-এর জন্মের পর তাঁহাকে লইয়া বায়তুল মুকাদ্দাসে বানু ইসরাঈলের নিকট আসা ও শিশু ঈসা-এর বক্তব্যে পরিস্থিতি মুকাবিলার বিষয়টি আল-কুরআনে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হইয়াছে। কিন্তু পরবর্তীতে হযরত মারয়াম (আ)-এর জীবনের ঘটনাবলী সুস্পষ্টভাবে জানা যায় না। আল-কুরআনে অন্য স্থানে শুধু এইটুকু বলা হইয়াছে: وَجَعَلْنَا ابْنَ مَرْيَمَ وَأُمَّهُ أَيَةً وَأَوَيْنَاهُمَا إِلَى رَبِّوَةٍ ذَاتٍ قَرَارٍ وَمَعِينٍ . "আর আমি মারয়াম তনয় ও তাহার জননীকে করিয়াছিলাম এক নিদর্শন, তাহাদিগকে আশ্রয় দিয়াছিলাম এক নিরাপদ ও প্রস্রবণবিশিষ্ট উচ্চ ভূমিতে" (২৩ঃ ৫০)।
কিন্তু হযরত মারয়াম (আ) তাঁহার সন্তানসহ যে প্রস্রবণবিশিষ্ট উচ্চ ভূমিতে আশ্রয় লইয়াছিলেন তাহা কোথায় অবস্থিত সেই সম্পর্কে বিভিন্ন রকম তথ্য পাওয়া যায়। ইবন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত, ঈসা (আ)-এর শিশু অবস্থা হইতেই বিভিন্ন রকম আশ্চর্যজনক ঘটনা সংঘটিত হইতেছিল। আর এইগুলির সংবাদ ইয়াহূদী সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হইতেছিল। অন্যদিকে ঈসা (আ) বড় হইতেছিলেন। তখন ইয়াহূদীগণ তাঁহার ক্ষতিসাধন করিবার জন্য ষড়যন্ত্র করিতে লাগিল। তাঁহার মাতা স্বীয় সন্তানের হিফাযতের ব্যাপারে শংকিত হইয়া পড়িলেন। এহেন অবস্থায় আল্লাহ তাআলা তাঁহাকে নির্দেশ দিলেন, তিনি যেন তাঁহার পুত্রসহ মিসরে চলিয়া যান। উপরিউক্ত আয়াতটি দ্বারা ইহার দিকেই ইঙ্গিত করা হইয়াছে (ইবন কাছীর, প্রাগুক্ত, page ৭১)। ইবন কাছীর ইবন আব্বাস (রা) হইতে নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রাপ্ত অন্য এক বর্ণনায় উল্লেখ করেন যে, নিরাপদ ভূমি বলিতে দামিশকের নদনদী সম্পন্ন এলাকা বুঝানো হইয়াছে (প্রাগুক্ত, page ৭২)। কাহারো কাহারো মতে রামলা অঞ্চল (প্রাগুক্ত)।
মথি সুসমাচারে উদ্ধৃত হইয়াছে, "প্রভুর এক দূত স্বপ্নে যোষেফকে দর্শন দিয়া কহিলেন, উঠ, শিশুটিকে ও তাহার মাতাকে লইয়া মিসরে পলায়ন কর। আর আমি যতদিন তোমাকে না বলি, তত দিন সেখানে থাক। কেননা হেরোদ শিশুটিকে বধ করিবার জন্য তাহার অনুসন্ধান করিবে। তখন যোষেফ উঠিয়া রাত্রিযোগে শিশুটিকে ও তাহার মাতাকে লইয়া মিসরে চলিয়া গেলেন এবং হেরোদের মৃত্যু পর্যন্ত সেখানে থাকিলেন" (দ্র. ২: ১৩-১৫)।
ওয়াহব ইবন মুনাব্বিহ বলিয়াছেন, ঈসা (আ) যখন ১৩ বৎসরে উপনীত হইলেন তখন আল্লাহ পাক ঈসাকে মিসর হইতে জেরুসালেমে লইয়া আসিবার আদেশ করিলেন। তখন তাঁহার মাতার খালাতো ভাই ইউসুফ উভয়কে গাধায় আরোহণ করাইয়া মিসর হইতে জেরুসালেমে লইয়া আসিলেন। তিনি মারয়াম (আ)-এর সহিত সেইখানেই অবস্থান করিতে লাগিলেন।
মথি সুসমাচারে আসিয়াছে, হেরোদ রাজার মৃত্যুর পর ইউসুফ স্বপ্নে আদিষ্ট হইয়াই মারয়াম (আ) ও তাঁহার পুত্রকে লইয়া মিসর হইতে ইসরাঈলী অঞ্চলে ফিরিয়া আসিয়াছিলেন এবং আল খলীল প্রদেশের নাসরাত জনপল্লীতে বসবাস করিতে থাকিলেন (দ্র. মথি, ২ঃ ১৯-২৩)।
লুক সুসমাচারে আসিয়াছে, শিশু ঈসা (আ) যখন বলবান হইলেন, প্রতি বৎসর নিস্তার পর্ব উদযাপনে যেরুসালেমে আসিতেন। এইভাবে একবার মারয়াম (আ) স্বীয় পুত্র ঈসাকে উৎসবের মধ্যে হারাইয়া ফেলিলেন, পরে তাহাকে ইয়াহুদী আলেমদের সহিত বিতর্কে লিপ্ত অবস্থায় পাইলেন। অতঃপর তাহারা সকলেই নাসরাতে ফিরিয়া গেলেন এবং তাহাদের সাথেই রহিলেন (দ্র. লুক, ২: ৪০-৫২)।
কিন্তু ঈসা (আ)-এর নবুওয়াত প্রাপ্তির পর মারয়ামের ভূমিকা কি ছিল ইতিহাস এই ব্যাপারে নীরব। সম্ভবত তিনিও তাঁহাকে সমর্থন করিয়াছিলেন। তবে কিভাবে ও কখন তাঁহার সঙ্গে সাক্ষাত হইত তাহা জানা যায় নাই। মারয়াম (আ) কাহার সহিত কোথায় অবস্থান করিতেন তাহাও জানা যায় না। ঈসা (আ)-এর ঊর্ধারোহণের পূর্বে মারয়াম (আ) সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, আল-খলীল প্রদেশের 'কান্না নগরে এক বিবাহ অনুষ্ঠানে ঈসা (আ)-এর সহিত মারয়াম (আ)-এর সাক্ষাত হইয়াছিল (দ্র. যোহন সুসমাচার, ২: ১-২)। আর একবার ঈসা (আ) তাঁহার শিশুদেরকে শিক্ষা প্রদান করিতেছিলেন, সেইখানে হযরত মারয়াম (আ) তাঁহার সাক্ষাতের জন্য আসিয়াছিলেন (দ্র. মার্ক: ৩: ৩১-৩২)।
এই সকল তথ্যের ভিত্তিতে ধারণা করা যায়, ঈসা (আ) যদিও পাহাড়-পর্বতে, নদ-নদীর তীরে ও গ্রামাঞ্চলে ঘুরিয়া বেড়াইতেন তবুও তাঁহার মাতা হযরত মারয়াম (আ)-এর সাথে তাঁহার কিছু যোগাযোগ ছিল। কেননা আল-কুরআনেও আসিয়াছে, 'তিনি ছিলেন স্বীয় মাতার সাথে সদাচারী' (১৯ঃ ৩২)। তাই বিচ্ছিন্ন হইয়া থাকিবার প্রশ্নই উঠে না। অবশ্যই যোগাযোগ ছিল। কিন্তু তৎকালীন ইয়াহুদী সমাজের বৈরী পরিবেশের কারণে হয়ত অনেক তথ্য অজানা রহিয়া গিয়াছে।
বাইবেলে উল্লেখ আছে যে, কথিত যীশুকে যেখানে শূলিতে চড়ানো হয় সেইখানে আরও কিছু মহিলাসহ হযরত মারয়াম (আ) উপস্থিত ছিলেন (দ্র. যোহন সুসমাচার, ১৯: ২৫-২৭)। সেইখানে ঈসা (আ) তাঁহার মাতাকে সান্ত্বনা দিয়াছিলেন এবং তাঁহার এক শিস্যকে তাঁহার দায়িত্ব নেওয়ার জন্য উপদেশ দিয়াছিলেন (প্রাগুক্তা, ১৯: ২৫-২৭)।
📄 ঈসা (আ)-এর ঊর্ধ্বারোহণের মুহূর্তে মারয়াম (আ)
হাফিয ইবন 'আসাকির ইয়াহইয়া ইবন হাবীবের সূত্রে উল্লেখ করেন, হযরত মারয়াম (আ) জিবরাঈল (আ)-এর দিকনির্দেশনায় ঐ গহীন জঙ্গলে গিয়া ঈসা (আ)-এর সাক্ষাত পাইলেন। ঈসা (আ) তাঁহাকে দেখিয়া দ্রুত তাঁহার পানে আগাইয়া আসিলেন এবং জড়াইয়া ধরিলেন, মাথায় চুমা খাইলেন, তাঁহার জন্য দু'আ করিলেন এবং বলিলেন, আম্মাজী! এই (ষড়যন্ত্রকারী) গোষ্ঠী আমাকে হত্যা করিতে পারে নাই, বরং আল্লাহই আমাকে তাঁহার কাছে উঠাইয়া নিয়াছেন এবং আপনার সাক্ষাতের অনুমতি দিলেন। অচিরেই আপনার মৃত্যু হইবে। অতঃএব আপনি সবর করুন, আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করুন। তাহার পর ঈসা (আ) উর্ধ্বারোহণ করিয়া চলিয়া গেলেন। মারয়াম (আ)-এর ইন্তিকাল পর্যন্ত তাঁহার সাথে ঈসা (আ)-এর আর সাক্ষাত হয় নাই (প্রাগুক্ত, page ৮৮)।
খৃস্টানদের বাইবেলে উল্লেখ রহিয়াছে, 'ঈসা (আ)-এর ঊর্ধ্বারোহণের সময় গালীল তথা, আল-খলীল প্রদেশের এক পল্লী পাহাড়ে তাঁহার এগারজন সাথীর সাথে তাঁহার সাক্ষাত হইয়াছিল। তাহাদের সাথে তাঁহার মাতা মারয়াম (আ)-ও ছিলেন (দ্র. মথি, ২৮: ১, ১৬; মার্ক, ১৬ : ১২, ২৪ : ১০, ২৪, ২৭-৪২)।
📄 ঈসা (আ)-এর ঊর্ধ্বারোহণের পর মারয়াম-এর অবস্থান
খৃস্টীয় উৎস হইতে জানা যায়, ঈসা (আ)-এর ঊর্ধ্বারোহণের পর তাঁহার এগারজন শিষ্য মারয়াম (আ)-সহ জেরুসালেমে ফিরিয়া আসিয়াছিলেন (দ্র. লুক সুসমাচার, ২৪ : ৫৩)। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি কোথায় কিভাবে অবস্থান করেন সেই সম্পর্কে কোন কিছু জানা যায় না। সম্ভবত ইয়াহুদীদের তল্লাশি ও ষড়যন্ত্রের মুখে ঈসা (আ)-এর এগারজন সাথীর সাথে মারয়াম (আ)-ও পাহাড়ে-জঙ্গলে আত্মগোপন করিয়াছিলেন এবং ইবাদত-বন্দেগীতে মশগুল থাকিয়া বাকি জীবন অতিবাহিত করিয়াছিলেন।
📄 মারয়াম (আ)-এর ওফাত
পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে যে, মারয়াম (আ)-এর মৃত্যুর বিষয়ে ঈসা (আ) নিজেই আগাম সংবাদ দিয়াছিলেন। কিন্তু ঈসা (আ)-এর ঊর্ধ্বারোহণের পর কত বৎসর মারয়াম (আ) জীবিত ছিলেন সেই সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। হাফিয ইবন আসাকিরের বর্ণনা অনুযায়ী 'ঈসা (আ)-এর উত্তোলনের পর মারয়াম (আ) ৫ (পাঁচ) বৎসর জীবিত ছিলেন। তিনি ৫৩ বৎসর বয়সে ইনতিকাল করেন (ইবন কাছীর, প্রাগুক্ত)। কুরতুবী উল্লেখ করেন, খৃস্টানদের ধারণামতে মারয়াম (আ) ঈসা (আ)-এর উত্তোলনের পর ছয় বৎসর বাঁচিয়াছিলেন। তখন তাঁহার মোট বয়স ছিল ৫৬ বৎসর (কুরতুবী, প্রাগুক্ত, ১১ খ, page ৯১)। আল্লামা কিরমানী উল্লেখ করেন, ঈসা (আ)-এর উত্তোলনের পর মারয়াম (আ) ৬৬ বৎসর জীবিত ছিলেন। তখন তাঁহার বয়স হইয়াছিল ১১২ বছর (দ্র. কিরমানী, শারহ বুখারী, ১১খ, ৬১)।
The World Book Encyclopedia-এর ভাষ্য অনুসারে মারয়ামের শেষ জীবন সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়। ইহা বিশ্বাস করা হয়, তিনি জেরুসালেমে প্রায় ৬৩ খৃস্টাব্দে মারা যান (vol. 13, Page 191; আরো দ্র. Ency. Americana, vol. 18, Page 347)। খৃষ্টানগণ, বিশেষত ক্যাথলিক সমাজ ধারণা করে যে, মারয়ামের মৃত্যুর পর তাঁহাকে স্বর্গে উঠাইয়া নেওয়া হয় (Ency. Britannica, vol. 14, page 998)। ঐসব মতামত তাহাদের ধারণা মাত্র। প্রকৃত অবস্থা আল্লাহই অধিক জ্ঞাত।