📄 অলৌকিকভাবে বেহেশতী খাদ্য লাভ
মারয়ামের শৈশব হইতেই তাঁহার প্রতি আল্লাহ পাকের বিশেষ দৃষ্টি পরিলক্ষিত হয়। এইজন্য শৈশব কালেই হযরত যাকারিয়্যা তাঁহার সম্পর্কে মন্তব্য করিয়াছিলেন, "নিশ্চয় ইমরানের কন্যার জন্য বিশেষ মর্যাদা রহিয়াছে” (তাফসীরে তাবারী, ৩খ., ১৮১)। হযরত যাকারিয়্যা তাঁহার খোঁজখবর নিতে প্রায়ই মরিয়ামের প্রকোষ্ঠে প্রবেশ করিতেন তাঁহার প্রতিপালনে আল্লাহ তাআলার বিশেষ দৃষ্টির কিছু কিছু দিক যাকারিয়্যা (আ)-এরও অজ্ঞাত ছিল, যাহা আল-কুরআনে স্পষ্টভাবেই বলা হইয়াছে:
كُلَّمَا دَخَلَ عَلَيْهَا زَكَرِيَّا الْمِحْرَابَ وَجَدَ عِنْدَهَا رِزْقًا قَالَ يَا مَرْيَمُ أَنَّى لَكِ هَذَا ، قَالَتْ هُوَ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَرْزُقُ مَنْ يُشَاءُ بِغَيْرِ حِسَابٍ .
"যখনই যাকারিয়্যা সেই মিহরাবে তাহার সহিত সাক্ষাত করিতে যাইত তখনই তাহার নিকট বিশেষ খাদ্যসামগ্রী দেখিতে পাইত। সে বলিত, হে মারয়াম! এইসব তুমি কোথা হইতে পাইলে? সে বলিত, উহা আল্লাহর নিকট হইতে। নিশ্চয়ই আল্লাহ যাহাকে ইচ্ছা অপরিমিত রিষ্ক দান করেন" (৩ঃ৩৭)।
ইবন কাছীর এই আয়াতের তাফসীরে মুজাহিদ, ইকরিমা, সাঈদ ইবন জুষায়র ও সুদ্দী প্রমুখের বরাতে লিখিয়াছেন, "যাকারিয়্যা (আ) তাঁহার নিকট শীতকালে গ্রীষ্মকালীন ফল এবং গ্রীষ্মকালে শীতকালীন ফল দেখিতে পাইতেন (ইবন কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম, ১খ, ৩৬০; ঐ লেখক, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ, ৫৪)। ইবন জারীর তাবারীও কাতাদা, হযরত ইবন আব্বাস প্রমুখ হইতেও ঐরূপ একটি বর্ণনা উল্লেখ করিয়াছেন। কাহারো কাহারো মতে ঐ আয়াতের অর্থ হইতেছে, যাকারিয়্যা (আ) যখন মিহরাবে মারয়াম (আ)-এর কাছে প্রবেশ করিতেন, তখন তাঁহাকে প্রদত্ত খাদ্যসামগ্রী ছাড়াও অতিরিক্ত খাদ্য দেখিতে পাইতেন। তখন তিনি এই অতিরিক্ত খাদ্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিতেন (তাফসীরে তাবারী, প্রাগুক্ত, page ৩৫৮-৯)।
ফখরুদ্দীন রাযী বর্ণনা করেন, আবু আলী আল-জুব্বাঈ তাঁহার তাফসীরে উল্লেখ করিয়াছেন, যাকারিয়্যা (আ) উহা দেখিয়া এই ভাবিয়া ভয় পাইয়াছিলেন যে, হয়ত এই রিফ এমন দিক হইতে আসিয়াছে যাহা আসা উচিত নহে (রাযী, প্রাগুক্ত, page ৩১)। ইমাম রাযী ইহাকে খবুই দুর্বল মত বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন (প্রাগুক্ত) এবং পূর্বোক্ত মতকে অকাট্য বলিয়া মন্তব্য করিয়াছেন (প্রাগুক্ত)। ইবন জারীর তাবারী ও ইবন ইস্হাক প্রথমোক্ত মতটি গ্রহণ করিয়াছেন (তাফসীরে তাবারী, প্রাগুক্ত, page ৩৬০)।
ইবন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত আছে যে, এইগুলি বেহেশতী ফল ছিল (আলুসী, প্রাগুক্ত, ৩খ, page ১৪০)। ইবন আব্বাস (রা) হইতে অপর এক বর্ণনায় আসিয়াছে, ইহার অর্থ হইতেছে যাকারিয়্যা (আ) মারয়াম (আ)-এর কাছে একটি থলির মধ্যে অসময়ের আঙ্গুর ফল দেখিতে পাইতেন (তাফসীরে তাবারী, প্রাগুক্ত, page ৩৫৭)। সাঈদ ইবন জুবায়র, ইবরাহীম নাখাঈ, মুজাহিদ (র)-এর নিকট হইতেও অনুরূপ বর্ণিত আছে (প্রাগুক্ত)।
'ইবন কাছীর ও রাযীর মতে উহা ছিল এক আশ্চর্যজনক ও বিস্ময়কর ধরনের খাদ্যবস্তু (ইবন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ, page ৫৩)। রিস্ক শব্দটি (অনির্দিষ্টবাচক শব্দ) আসিয়াছে বিস্ময় ও গুরুত্বপূর্ণ বলিয়া বুঝাইবার জন্য (প্রাগুক্ত, page ৩০)।
মাওলানা আবদুল মাজেদ দরিয়াবাদী উল্লেখ করেন, কোন কোন আধুনিক তাফসীরকার 'রিযিক' অর্থ ফয়েয ও জ্ঞান-বিজ্ঞান করিয়াছেন। কিন্তু ইহা প্রসিদ্ধ মুফাস্সির ও বিশেষজ্ঞগণের মতের পরিপন্থী। এই ধরনের ব্যাখ্যা তাফসীরী নীতিমালা লংঘনের শামিল (দরিয়াবাদী, প্রাগুক্ত, page ৫২)। মোটকথা, দুনিয়ার খাদ্যবস্তুর ঐ সকল খাদ্যদ্রব্যের সহিত কোন মিল ছিল না (আলুসী, প্রাগুক্ত, page ১৪০)। সেইজন্য হযরত যাকারিয়্যা (আ) প্রশ্ন করিয়াছিলেন-এইগুলি কোথা হইতে পাইয়াছ? আর তিনি উত্তর দিয়াছিলেন-এইগুলি আল্লাহর পক্ষ হইতে। এইভাবেই হযরত মারয়াম (আ) বারবার গায়েবী মদদ পাইতে থাকেন। পিতৃ-মাতৃহীন মারয়াম শিশু অবস্থা হইতে এক পবিত্র পরিবেশে ও পুরাপুরি ধর্মীয় চেতনায় লালিত-পালিত হইয়া আসিতেছিলেন। এইভাবে তিনি আল্লাহর নৈকট্য লাভ করিতেছিলেন এবং তাহার মাধ্যমে বিশেষ কারামত তথা অলৌকিক ঘটনা প্রকাশ পাইতেছিল।
মুতাযিলী সম্প্রদায় উহা মারয়ামের কারামত বলিতে অস্বীকার করিয়া উহার ব্যাখ্যায় বলিয়াছেন-উহা যাকারিয়্যার মুজিযা হইলে তিনি এই ব্যাপারে জানিতেন না কেন? আর ঈসা (আ)-এর মুজিযা কি করিয়া হইতে পারে? তিনি তো তখনও জনন্মগ্রহণ করেন নাই।
📄 মারয়াম (আ)-এর ইবাদত-বন্দেগী ও কঠোর সাধনা
সেই শৈশব কাল হইতেই মারয়াম (আ) মসজিদে আকসায় এক আল্লাহর নবীর তরবিয়াতে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের আশায় কঠোর সাধনা ও ইবাদতে মশগুল থাকেন। অবশ্য হায়কালে সুলায়মানীর খিদমতের পালা আসিলে তাহাও তিনি অত্যন্ত যত্নের সহিত সুসম্পন্ন করিতেন (সিওহারবী, প্রাগুক্ত, page ১১)। এমনিভাবে তিনি দিনরাত ইবাদতে নিমগ্ন থাকিয়া সময় অতিবাহিত করিতেছিলেন, এমনকি তাঁহার তাকওয়া ও 'ইবাদত বানু ইসরাঈলের মধ্যে প্রবাদে পরিণত হয়। আর যত্রতত্র তাঁহার ইবাদত-বন্দেগীর ও একনিষ্ঠ সাধনার কথা আলোচিত হইতে থাকে (প্রাগুক্ত)।
ইবন কাছীর (র) উল্লেখ করেন, তিনি যখন প্রাপ্তবয়স্কা হইলেন তখন ইবাদতে এতই কঠোর সাধনা করিতে থাকিলেন যে, ইবাদতে তাঁহার সময়ে তাহার সমকক্ষ আর কেহ ছিল না। আর তাঁহার মধ্যে এমন কিছু কিছু অবস্থা দেখা দিতে লাগিল, যাহাতে হযরত যাকারিয়্যা (আ)-ও মোহিত হইতে লাগিলেন (ইবন কাছীর, প্রাগুক্ত, ২খ, page ৫৯)।
📄 ফেরেশতার মাধ্যমে মর্যদার ঘোষণা ও আরো কঠোর সাধনার নির্দেশ লাভ
হযরত মারয়াম (আ) স্বীয় প্রভুর ইবাদত ও সান্নিধ্য লাভের সাধনায় রত ছিলেন একযুগ পর্যন্ত। নিজের কর্মব্যস্ততার মধ্য দিয়া নিষ্কলুষ জীবন যাপন করিবার পর তাঁহার সেই সাধনা আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয়। আল্লাহ পাক তাঁহার কাজে এতই খুশী হইয়াছিলেন যে, তাঁহার তাকওয়া ও ইবাদত কবুল হওয়ার স্বীকৃতি এবং নারীকূলের মধ্যে বিশেষ মর্যাদা প্রদানের ঘোষণা ফেরেশতা পাঠাইয়া তাঁহাকে অবহিত করেন। আল্লাহ বলেন, وَإِذْ قَالَتِ الْمَلَائِكَةُ يَا مَرْيَمُ إِنَّ اللهَ اصْطَفَاكِ وَطَهْرَكَ وَاصْطَفَاكِ عَلَى نِسَاءِ الْعَالَمِينَ . "যখন ফেরেশতাগণ বলিয়াছিল, হে মারয়াম! আল্লাহ-তোমাকে মনোনীত ও পবিত্র করিয়াছেন এবং বিশ্বের নারীকূলের মধ্যে তোমাকে মনোনীত করিয়াছেন" (৩: ৪২)।
ইমাম ইবন জারীর তাবারীর মতে, আল্লাহর বাণী اصطفاك এর অর্থ তোমাকে মনোনীত করিয়াছেন, তোমাকে তাঁহার আনুগত্যের জন্য বাছিয়া লইয়াছেন, তাঁহার মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তোমাকেই নির্বাচন করিয়াছেন (তাফসীরে তাবারী, ৩খ, page ১৭৯-১৮০)।
اصطفى শব্দ صفوة হইতে উদ্ভূত যাহার অর্থ সবচেয়ে পূত-পবিত্র নিষ্কলুষ কিছু বাছিয়া লওয়া (কুরতুবী, প্রাগুক্ত, ২খ, page ১৩৩)।
মাওলানা হানাউল্লাহ পানিপথী ইহার ব্যাখ্যায় বলেন, "তিনি তোমাকে তাঁহার সত্তাগত তাজাল্লী দ্বারা কবুল করিয়া লইয়াছেন। সুফিয়ায়ে কিরাম এ তাজাল্লীকে নবুওয়াতের বৈশিষ্ট্য বলিয়া অভিহিত করেন। মৌলিকভাবে আম্বিয়ায়ে কিরাম এই বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হইয়া থাকেন। আর সিদ্দীকগণ তাহা উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেন। মারয়াম (আ) সিদ্দীকা ছিলেন" (তাফসীরে মাযহারী, ২খ, page ২৮৫)।
তিনি আরও কয়েকটি দিক তুলিয়া ধরিয়াছেন। যথা: (১) মারয়ামকে হিফাজত ও মাগফিরাতের মাধ্যমে সকল গুনাহ হইতে পবিত্র করিয়াছেন। (২) শয়তান তাঁহাকে স্পর্শও করিতে পারে নাই। ইহা তাঁহার মায়ের পূর্ববর্তী সেই দু'আ যাহা আল্লাহ পাক কবুল করিয়াছিলেন তাহার বরকতে। (৩) কাহারও কাহারও মতে এই পবিত্রতার অর্থ পুরুষের স্পর্শ হইতে দূরে থাকা। (৪) কেহ কেহ বলেন, আল্লাহ পাক তাঁহাকে মাসিক ঋতু হইতে পবিত্র রাখিয়াছিলেন (দ্র. তাফসীরে মাযহারী, প্রাগুক্ত)।
আর উপরিউক্ত আয়াতে طهرك-এর অর্থের ব্যাখ্যায় ইবন জারীর তাবারী বলেন, মহিলাদের দীনী ব্যাপারে যে সকল সীমাবদ্ধতা বিদ্যমান সেইগুলি হইতে মারয়ামকে পবিত্র করিয়াছেন (তাফসীরে তাবারী, প্রাগুক্ত, ৫খ, ৩৮২)। মোটকথা, তিনি ইবাদত-বন্দেগী ও চারিত্রিক নিষ্কলুষতার এতই উচ্চ স্তরে অবস্থান করিতেছিলেন যে, নারীকূলের মধ্যে হযরত মারয়াম এই সম্মান ও মর্যাদার স্বীকৃতি পাওয়ারই যোগ্য হইয়া গিয়াছিলেন। উপরিউক্ত সম্মান ও মর্যাদায় আরো সমুন্নত রাখিবার জন্য আল্লাহ পাক তাঁহাকে অধিক কঠোর সাধনায় নিমগ্ন হওয়ার জন্য নির্দেশ প্রদান করিয়াছিলেন। আল-কুরআনের পরবর্তী আয়াতে বলা হইয়াছে: يَا مَرْيَمُ اقْنتي لربك واسجدي واركعي مع الراكعين . "হে মারয়াম! তোমার প্রতিপালকের অনুগত হও ও সিজদা কর এবং যাহারা রুকু করে তাহাদের সহিত রুকু কর" (৩:৪৩)।
এই আয়াতের ' ُثُشُ ّ শব্দের ব্যাখ্যায় মুফাস্সিরগণ বিভিন্ন অর্থ বর্ণনা করিয়াছেন। মুজাহিদের মতে ইহার অর্থ সালাতে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়ানো। আয়াতের মমার্থ হইল—হে মারয়াম! তুমি নামাযে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়াইবে (তাফসীরে তাবারী, প্রাগুক্ত, page ৩৮৪)। মুজাহিদ (র) হইতে অপর এক বর্ণনায় আসিয়াছে, হযরত মারয়াম (আ)-কে ঐ আদেশ দেওয়ার পর তিনি নামাযে এত দীর্ঘক্ষণ দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া আদায় করিতেন যে, তাঁহার পা দুইটি ফুলিয়া যাইত। অপর এক বর্ণনায় আসিয়াছে, তাঁহার পায়ের গিটদ্বয় ফুলিয়া গিয়াছিল (প্রাগুক্ত, page ৩৮৫)। ইহা ছাড়া ইমাম আওযাঈ আলোচ্য আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় বলেন, হযরত মারয়াম (আ) যখন সালাতে দাঁড়াইতেন, তখন এমনকি তাঁহার দুইটি পা হইতে পুঁজ গড়াইয়া পড়িত (তাফসীরে তাবারী, প্রাগুক্ত, page ৩৮৫; আলুসী, প্রাগুক্ত, page ১৫৭)।
আবু সাঈদ খুদরী (রা) রাসূলুল্লাহ (স) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন। তিনি বলেন, কুরআন মজীদের যেইখানে الْقُنُوت শব্দ উল্লিখিত হইয়াছে, সেইখানেই উহার অর্থ আল্লাহর আনুগত্য (তাফসীরে তাবারী, প্রাগুক্ত)। কাতাদা, সূদ্দী প্রমুখ তাফসীরকারকগণ ঐ আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় বলেন, হে মারয়াম! তুমি তোমার প্রতিপালকের আনুগত্য কর (প্রাগুক্ত)। হযরত সাঈদ (র) ইবন জুবায়র-এর মতে কুনূতের অর্থ একনিষ্ঠ হওয়া (প্রাগুক্ত)। হাসান বসরী (র)-এর মতে উহার অর্থ তোমার প্রতিপালকের ইবাদত কর (প্রাগুক্ত)।
মোটকথা, ইবাদত হইল আনুগত্যের প্রতীক। উভয়ের মধ্যে কোন দ্বন্দু নাই। মুমিন জীবনে সকল কাজ যাহা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও আনুগত্য প্রদর্শনের জন্য করা হয় সবই ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। আর হযরত মারয়াম (আ)-এর ক্ষেত্রে সব কয়টি অর্থই প্রযোজ্য। সেইজন্য ইমাম ইবন জারীর তাবারী ঐ আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় বলিয়াছেন, 'বিশুদ্ধ যুক্তিতর্ক ও দলীলসহ আমরা প্রমাণ করিয়াছি যে, রুকু সিজদার উদ্দেশ্য আনুগত্য ও ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি বিনয়ী ও নম্র হওয়া। এই প্রেক্ষিতে আয়াতের মর্ম হইল, 'হে মারয়াম! মনোনয়ন দ্বারা, পবিত্রকরণ দ্বারা এবং তোমার যুগের নারী জাতির মধ্যে তোমাকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করিয়া আল্লাহ তাআলা তোমাকে যে সম্মান দিয়াছেন, ইহার কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তুমি তোমার প্রতিপালকের একনিষ্ঠভাবে ইবাদত কর। সে সকল লোকের সাথে তুমিও বিনয়ী হও যাহারা তাঁহার প্রতি বিনয়ী' (তাফসীরে তাবারী, প্রাগুক্ত, page ৩৮৫-৩৮৬)।
মারয়াম (আ)-এর জন্য উপরিউক্ত আদেশটির শেষাংশ অর্থাৎ وَارْكَعِيْ مَعَ الرَّاكِعِيْنَ -এর ব্যাখ্যায় মুফাস্সিরগণ তাঁহার সম্পর্কে অনেক তথ্য তুলিয়া ধরিয়াছেন। অধিকাংশের মতে 'রুকুকারীদের সাথে রুকু কর' এই আদেশের অর্থ হইল সালাত আদায়কারীদের সাথে জামাআতে সালাত আদায় কর (আলুসী, প্রাগুক্ত, page ১৫৭)। কেহ কেহ ধারণা করেন যে, মারয়ামকে আদেশ করা হইয়াছিল, রুকুক্কারিগণ যেই ধরনের কাজ করে তুমি তাহাদের সাথে নামাযে শরীক না হইলেও সেই ধরনের কাজ কর (দ্র. কুরতুবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, page ৮৫; আরও দ্র. আলুসী, প্রাগুক্ত)।
আলুসী উক্ত ধারণা খণ্ডন করিয়াছেন। তাহাদের যুক্তি ছিল, মারয়াম (আ) তাঁহার মিহরাবে নামায পড়িতেন। তাহা ছাড়া তিনি যুবতী ছিলেন আর জামাআতে নামায পড়া যুবতীদের জন্য মাকরূহ (আলুসী, প্রাগুক্ত)। আলুসী এই যুক্তিগুলির খণ্ডনে বলেন, ইহা বিনা প্রয়োজনে মূল বক্তব্যকে পরিহার করার শামিল। মারয়াম (আ) মিহরাবে নামায পড়িতেন তাহা স্বীকার্য বিষয়, কিন্তু তাই বলিয়া ইহা প্রমাণ করে না যে, তিনি জামাআতে নামায আদায় করিতেন না। মিহরাবে থাকিয়াই জামাতে শরীক হওয়ার সম্ভাবনা রহিয়াছে। আর আমাদের পূর্ববর্তী শরীআতে যুবতী মহিলাদের জামাআতে সালাত আদায় করা মাকরুহ ছিল-এই ধরনের কথাও প্রমাণিত নহে; বরং সালাত আদায় করা জামাআতে মাকরূহ ছিল না বলিয়া ইমাম মাতুরীদী উল্লেখ করিয়াছেন। আর ইহাও বলা হয় যে, যাহাদের সাথে তিনি সালাত আদায় করিতেন, তাহারা সকলেই তাহার মাহরাম ছিলেন।
মোটকথা, মারয়াম (আ) আল্লাহর আনুগত্যে উৎসর্গকারী সমভাবাপন্ন লোকজনের সাথেই ইবাদতে অংশগ্রহণ করিতে আদিষ্ট হইয়াছিলেন। অত্যন্ত ইবাদতগুযার ও সচ্চরিত্রা নারী মারয়াম (আ) আল্লাহর নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে তাঁহার জীবনে বাস্তবায়ন করিয়া জগৎবাসী নারীকূলের মুখ উজ্জ্বল করিয়াছিলেন। আল্লাহ পাক তাঁহার সেই ভূমিকায় এতই সন্তুষ্ট হইয়াছিলেন যে, পিতৃবিহীন সন্তান ধারণের জন্য তাঁহাকে মনোনীত করেন। ঈসা (আ)-কে গর্ভ ধারণের সুসংবাদ লইয়া যখন হঠাৎ ফেরেশতার আগমন ঘটে, তখন তিনি তাঁহাকে চিনিতে না পারিয়া যেই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করিয়াছিলেন তাহা হইতে তাঁহার বিষয়টি অনুধাবন করা যায়। আগন্তুকের উদ্দেশ্যে তিনি বলিয়াছিলেন- যাহা আল-কুরআনেও নিম্নোক্ত আয়াতে আসিয়াছে "সে (মারয়াম) বলিল, আল্লাহকে ভয় কর যদি তুমি মুত্তাকী হও যে, আমি তোমা হইতে দয়াময় (আল্লাহ)-র আশ্রয় প্রার্থনা করিতেছি" (১৯:১৮)।
ইহা দ্বারা প্রমাণিত হয়, মারয়াম (আ)-এর মধ্যে তাকওয়া-পরহেযগারীর চেতনা সদা জাগ্রত ছিল।
📄 অলৌকিকভাবে ঈসা (আ)-কে গর্ভে ধারণ
আল্লাহ তা'আলা কাহারও মাধ্যম ব্যতীতই আদম (আ)-কে সৃষ্টি করিয়াছেন। বর্ণিত আছে, "হযরত হাওয়া (আ)-কে আদম (আ)-এর পাঁজরের হাড় হইতে সৃষ্টি করিয়াছেন তথা কোন নারীর গর্ভ ছাড়াই তাঁহাকে সৃষ্টি করিয়াছিলেন। শুধু বাকী ছিল পিতা ছাড়া একমাত্র মায়ের মাধ্যমে কোন মানব সন্তান সৃষ্টি করা। আল্লাহর সৃষ্টির পূর্ণাঙ্গ বিধানে সেই সৌভাগ্যবতী মা কে হইবেন-তাহারই ছিল অপেক্ষা। পুণ্যশীলা মারয়াম (আ) ও তাঁহার মায়ের ইবাদত ও দু'আর কথা পূর্বেই বর্ণনা করা হইয়াছে। কোন রকম পুরুষের স্পর্শবিহীন সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য সারা বিশ্বময় নারীর মধ্য হইতে আল্লাহ পাক হযরত মারয়াম (আ)-কেই নির্বাচন করিলেন। এই শুভ সংবাদটি তিনি তাঁহার ফেরেশতা জিবরাঈল-এর মাধ্যমেই সেই মহিয়সী নারী মারয়াম (আ)-কে প্রদান করিয়াছিলেন। তবে তাহা কখন? সে সুসংবাদটি মারয়াম (আ)-কে সন্তানের রূহ গর্ভে ফুঁকিয়া দেওয়ার সময় তাৎক্ষণিকভাবেই, না ইহার পূর্বেই দিয়াছিলেন? এই সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে কিছু বলা হয় নাই। তবে আল-কুরআনের দুই স্থানে মারয়ামের গর্ভ ধারণের বিষয়টি আলোচিত হইয়াছেঃ প্রথমত সূরা আল-ইমরানে, দ্বিতীয়ত সূরা মারয়ামে। সূরা আলে ইমরানে বলা হইয়াছে:
إِذْ قَالَتِ الْمَلَائِكَةُ إِنَّ اللَّهَ يُبَشِّرُكِ بِكَلِمَةٍ مِّنْهُ اسْمُهُ الْمَسِيحُ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ وَجِيْهَا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَمِنَ الْمُقَرَّبِينَ وَيُكَلِّمُ النَّاسَ فِي الْمَهْدِ وَكَهْلاً وَمِنَ الصَّالِحِينَ . قَالَتْ رَبِّ أَنِّي يَكُونُ لِي وَلَدٌ وَلَمْ يَمْسَسْنِي بَشَرٌ قَالَ كَذلِكَ اللهُ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ إِذَا قَضَى أَمْرًا فَإِنَّمَا يَقُولُ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ .
"স্মরণ কর, যখন ফেরেশতাগণ বলিল, হে মারয়াম! নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাকে তাঁহার পক্ষ হইতে একটি কালেমার সুসংবাদ দিতেছেন। তাহার নাম মসীহ, মারয়াম তনয় 'ঈসা, সে দুনিয়া ও আখিরাতে সম্মানিত এবং সান্নিধ্যপ্রাপ্তগণের অন্যতম হইবে। দোলনায় থাকা অবস্থায় ও পরিণত বয়সে সে মানুষের সহিত কথা বলিবে এবং সে হইবে পূণ্যবানদের একজন। সে (মারয়াম) বলিল, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে কোন পুরুষ স্পর্শ করে নাই, আমার সন্তান হইবে কীভাবে? তিনি বলিলেন, 'এইভাবেই', আল্লাহ যাহা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। তিনি যখন কিছু স্থির করেন, তখন বলেন, 'হও' এবং উহা হইয়া যায়” (৩:৪৫-৪৭)।
হাসান বসরী (র) বলিয়াছেন, মারয়াম ছোটকাল হইতেই বুদ্ধিমতী ছিলেন। আর তখনই তাঁহার নিকট সেই সুসংবাদটি আসিবার সম্ভাবনা আছে। তবে আলুসী এই অভিমতকে দুর্বল বলিয়া মন্তব্য করিয়াছেন (আলুসী, প্রাগুক্ত, ৩খ, page ১৬০)।
মোটকথা, ফেরেশতা তাঁহার নিকট একাধিকবার আসিয়াছিলেন, এমনকি শৈশবে বেহেশতী খাবার লইয়াও আসিতেন। সেই সময় কোন এক মুহূর্তে প্রথম সুসংবাদটি লাভ করিয়া থাকিতে পারেন। যদিও কোন কোন তাফসীরকার ঐ সুসংবাদকে ইলহাম আকারে কিংবা কোন গায়বী আওয়াজ আকারে হইতে পারে বলিয়া অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন (দ্র. তাফসীরে মাজেদী, ২খ, ৫৯)। কিন্তু প্রকৃত অবস্থা আল্লাহই জ্ঞাত। খাদ্য লইয়া সরাসরি ফেরেশতা আগমনের বিষয়টিকে অসম্ভব বলা যায় না। কেননা মারয়াম (আ) সেইগুলিকে আল্লাহর পক্ষ হইতে আগত বলিয়া স্পষ্ট ঘোষণা করিয়াছেন, যাহা আল-কুরআনেও স্পষ্টভাবে উদ্ধৃত হইয়াছে (দ্র. ৩: ৩৭)। তবে ঈসা (আ)-কে গর্ভে ধারণের সুসংবাদ লইয়া একজন ফেরেশতা, প্রসিদ্ধ মতে জিবরাঈল (আ) মারয়ামের নিকট আগমন করিয়াছিলেন, যাহা আল-কুরআনের সূরা মারয়ামে স্পষ্টভাবে উল্লিখিত হইয়াছে। বলা হইয়াছে:
وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ مَرْيَمَ إِذِ انْتَبَذَتْ مِنْ أَهْلِهَا مَكَانًا شَرْقِيًّا، فَاتَّخَذَتْ مِنْ دُونِهِمْ حِجَابًا فَأَرْسَلْنَا إِلَيْهَا رُوحَنَا فَتَمَثَّلَ لَهَا بَشَرًا سَوِيًا . قَالَتْ إِنِّي أَعُوذُ بِالرَّحْمَنِ مِنْكَ إِنْ كُنْتَ تَقِيًّا . قَالَ إِنَّمَا أَنَا رَسُولُ رَبِّكِ لِأَهَبَ لَكِ غُلَامًا زَكِيًّا . قَالَتْ أَنِّي يَكُونُ لِي غُلَامٌ وَلَمْ يَمْسَسْنِي بَشَرٌ وَلَمْ أَكُ بَغِيًّا . قَالَ كَذَا لِكِ قَالَ رَبُّكَ هُوَ عَلَى هَيِّنٌ وَلِنَجْعَلَهُ آيَةً لِلنَّاسِ وَرَحْمَةً مِّنَّا وَكَانَ أَمْراً مَقْضِيًا . فَحَمَلَتْهُ فَانْتَبَذَتْ بِهِ مَكَانًا قَصِيًّا .
"এই কিতাবে মারয়ামের কথা বর্ণনা কর, যখন সে তাহার পরিবারবর্গ হইতে পৃথক হইয়া নিরালায় পূর্বদিকে এক স্থানে আশ্রয় লইল, অতঃপর উহাদিগ হইতে সে পর্দা করিল। অতঃপর আমি তাহার নিকট আমার রূহকে (জিবরাঈল) পাঠাইলাম। সে তাহার নিকট পূর্ণ মানবাকৃতিতে আত্মপ্রকাশ করিল। মারয়াম বলিল, আল্লাহকে ভয় কর যদি মুত্তাকী হও, আমি তোমা হইতে দয়াময়ের শরণ লইতেছি। সে বলিল, আমি তো তোমার প্রতিপালক প্রেরিত, তোমাকে এক পবিত্র পুত্র দান করিবার জন্য। মারয়াম বলিল, কেমন করিয়া আমার পুত্র হইবে যখন আমাকে কোন পুরুষ স্পর্শ করে নাই এবং আমি ব্যভিচারিণীও নহি? সে বলিল, এইরূপই হইবে। তোমার প্রতিপালক বলিয়াছেন, ইহা আমার জন্য সহজসাধ্য এবং আমি উহাকে এইজন্য সৃষ্টি করিব যেন সে হয় মানুষের জন্য এক অনুগ্রহ; ইহা তো স্থিরীকৃত ব্যাপার। তৎপর সে গর্ভে উহাকে ধারণ করিল; অতঃপর তৎসহ এক দূরবর্তী স্থানে চলিয়া গেল” (১৯: ১৬-২২)।
*ফেরেশতার সাথে উপরিউক্ত কথোপকথনে স্পষ্ট যে, জিবরাঈল (আ) মানব আকৃতি ধারণ করিয়া মারয়াম (আ)-এর নিকট আগমন করিয়া প্রথমে সেই সুসংবাদটি দেন। প্রথমত মায়য়াম (আ) সেই অবস্থায় সন্তান ধারণের সংবাদটি মানিয়া লইতে ছিলেন না।
ইমাম আবু জাফর তাবারী এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ফেরেশতা হযরত মারয়াম (আ)-কে যখন মহান আল্লাহর পক্ষ হইতে একটি 'কালেমা'র সুসংবাদ দিলেন, তখন তিনি বলিলেন, হে আমার প্রতিপালক! কোন্ পদ্ধতিতে আমার সন্তান হইবে? আমি বিবাহ করিব এবং সেই দাম্পত্য জীবনে স্বামীর পক্ষ হইতে আমার গর্ভে সন্তান আসিবে, না কি কোন মানুষের স্পর্শ ব্যতীত সরাসরি আমার উদরে সন্তান জন্ম লাভ করিবে? আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে জানাইলেন, আল্লাহ তা'আলা এইভাবেই সৃষ্টি করিতে পারেন অর্থাৎ কোন মানুষের স্পর্শ ব্যতীত তিনি তোমার গর্ভে সন্তান সৃষ্টি করিবেন। ইহা মানুষের জন্য নিদর্শন ও শিক্ষণীয় বিষয় হিসাবে থাকিবে (তাফসীরে তাবারী, প্রাগুক্ত, page ৩৯৫-৩৯৬)।
হযরত মারয়াম (আ)-কে সুসংবাদ দেওয়ার ঘটনার পর তিনি ঈসা (আ)-কে গর্ভে ধারণ করেন। আল-কুরআনের অন্যত্র হযরত মারয়াম (আ) সম্পর্কে বলা হইয়াছে: وَمَرْيَمَ ابْنَةَ عِمْرَانَ الَّتِي أَحْصَنَتْ فَرْجَهَا فَنَفَخْنَا فِيهِ مِنْ رُوحِنَا . "আরও দৃষ্টান্ত দিতেছেন ইমরান-তনয়া মারয়ামের, যে তাহার সতীত্ব রক্ষা করিয়াছিল, ফলে আমি তাহার মধ্যে রূহ ফুঁকিয়া দিয়াছিলাম" (৬৬ঃ ১২)।
ইবন কাছীর উল্লেখ করেন, সলফে সালেহীনের মধ্যে অনেকেই উল্লেখ করিয়াছেন যে, জিবরাঈল (আ) হযরত মারয়ামের জামার বুকের ফাঁকা অংশে ফুঁক দেন। অতঃপর সেই ফুঁ তাঁহার গর্ভাশয়ে পৌঁছিয়া যায়। ইবন কাছীর আরো উল্লেখ করেন, কাহারও মতে জিবরাঈল (আ) মারয়াম (আ)-এর মুখের ভিতরে ফুঁ দিয়াছিলেন, আবার কাহারও মতে জিবরাঈল নহে বরং রূহ (আত্মা)-টি নিজেই মারয়ামের মুখ দিয়া ভিতরে চলিয়া যায়। কিন্তু এই ধরনের বক্তব্য আল-কুরআনের স্পষ্ট বর্ণনার পরিপন্থী। কেননা কুরআনে স্পষ্টত বুঝা যায়, মারয়াম (আ)-এর কাছে মানবাকৃতি জিবরাঈল (আ)-কে পাঠানো হইয়াছিল। তিনি মারয়াম (আ)-এর মুখে নহে, তাঁহার জামার বুকের ফাঁকা অংশে রূহ ফুঁকিয়া দিয়াছিলেন (প্রাগুক্ত)।
মোটকথা, জibraeel-এর ফুঁকের মাধ্যমেই তিনি গর্ভবতী হইয়াছিলেন। যখন সেই ফেরেশতার মুখেই উচ্চারিত হইয়াছিল, আমি তোমাকে এক পবিত্র সন্তান দান করিতে প্রেরিত হইয়াছি (দ্র. ১৯ : ১৬-১৯), আবার অন্য একাধিক আয়াতে রূহ ফুঁক্রিয়া দেওয়ার কথাও উল্লিখিত হইয়াছে।
এই ঘটনাটি সম্পর্কে এমনকি খৃস্টানদের বাইবেলেও ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, ঈসা মাসীহ (আ)-এর মাতা মারয়ামের বিবাহের কথাবার্তা ইউসুফের সহিত সম্পন্ন হইয়াছিল; কিন্তু ইউসুফের সহিত মিলনের পূর্বেই রূহুল কুদুস-এর আগমনের পর আল্লাহ তা'আলার কুদরতে তিনি গর্ভবতী হন (দ্র. মথি, সুসমাচার ১৪ ১৮)।
উল্লেখ্য, জিবরাঈল (আ) কোথায় মারয়াম (আ)-এর সামনে হাযির হইয়াছিলেন ইহা লইয়া বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। আল-কুরআনে সে স্থানটিকে মাকান শারকী (পূর্বদিকে এক স্থান) বলিয়া উল্লেখ করা হয়। মুফাস্স্সিরীনে কেরাম 'পূর্বদিক' বলিতে মসজিদে আকসার মিহরাবের পূর্বদিক বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। হইতে পারে ইহা মসজিদের অভ্যন্তরেই পূর্বদিকে কিংবা দেয়ালের অপর পার্শ্বে পূর্বদিকে (কুরতুবী, প্রাগুক্ত, ১১ খ., page ৯০)। মারয়াম (আ) স্বীয় পরিজন হইতে মসজিদের পূর্ব দিকে নিরালায় পর্দার আড়ালে অবস্থান করিতেছিলেন। সুদ্দীর মতে, তিনি তখুন হায়েযের জন্য দেয়ালের আড়ালে অবস্থান করিতেছিলেন (তাফসীরে তাবারী, ১৬ খ, page ৪৫-৪৬)। কারণ তাঁহার হায়েব সমাগম হইলে স্বভাবত যেই স্থানে বসিয়া ইবাদত করিতেন তাহা হইতে দূরে চলিয়া যাইতেন। আর সেইখানেই পবিত্রতার জন্য অপেক্ষা করিতেন। একবার যখন তিনি পবিত্র অবস্থায় সেই স্থানে পদার্পণ করেন, তখনই জিবরাঈলের আগমন ঘটিয়াছিল (রাযী, প্রাগুক্ত, ২১খ, page ১৯৬)। কাহারও মতে, যখন তিনি পবিত্রতার জন্য গোসল করিতে পূর্বদিকে পর্দার আড়ালে গমন করিয়াছিলেন তখন জিবরাঈল (আ) আগমন করেন। এইজন্য ইমাম রাযী মাকান শারকী বলিতে বায়তুল মুকাদ্দাসের পূর্বদিক কিংবা তাঁহার বাড়ির পূর্বদিক বুঝানো হইয়াছে বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন (প্রাগুক্ত)।
মোটকথা, বায়তুল মুকাদ্দাসের অভ্যন্তরে পূর্বদিকে যেইখানে মারয়াম পর্দার আড়ালে ইতিকাফে থাকিতেন সেই স্থানটি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। মাওলানা আবদুল হক হাক্কানী উল্লেখ করেন, মারয়াম (আ) হায়েয হইতে পবিত্র হইয়া যখন তাঁহার হুজরায় অবস্থান করিতেছিলেন, সেই অবস্থায় জিবরাঈল (আ) আগমন করেন (তাফসীরে হাক্কানী, তৃতীয় পারা, page ৫২)।
অপরদিকে খৃস্টানদের বাইবেলে বর্ণিত হইয়াছে, জিবরাঈল (আ) গ্যালিল (আল-খালীজ শহর)-এর নাসিরাহ (নাযেরাথ) নামীয় পল্লীতে এক কুমারীর নিকট অবতরণ করিলেন, যাহার বিবাহের কথাবার্তা হযরত দাউদ (আ)-এর বংশীয় এক যুবকের সহিত সম্পন্ন হইয়াছিল, যাহার নাম যোসেফ এবং কুমারীর নাম মারয়াম (দ্র. লুক সুসমাচার, ১৪ ২৬-২৭; আরও দ্র. মথি, ১৪১৮)।
খৃস্টানদের বাইবেলের এই তথ্য আল-কুরআনে উল্লিখিত তথ্যের সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ নহে। কারণ বাইবেলে উল্লিখিত নাসেরাহ জেরুসালেম হইতে উত্তর দিকে অবস্থিত, পূর্ব দিকে নহে (সায়্যিদ মওদূদী, তাফহীমুল কুরআন, ৩খ, page ৬৩)।
আল্লাহর নির্দেশে হযরত জিবরাঈল (আ) ফুঁক দেওয়ার কিছুকাল পর হযরত মারয়াম নিজেকে অন্তঃসত্ত্বা অনুভব করিলেন। এইভাবে দিনরাত অতিবাহিত হইতে লাগিল। কিন্তু গর্ভে ধারণকৃত সন্তান সম্পর্কে সুসংবাদ তাঁহার জন্য এক অস্বস্তিকর অবস্থার সৃষ্টি করিল (সিওহারবী, প্রাগুক্ত, ৩৫)। তাঁহার চলাফেরা ক্রমে সংকীর্ণ হইতে লাগিল। আর তিনি বুঝিতে পারিলেন, অনেক লোকই তাঁহার ব্যাপারে বাজে মন্তব্য করিবে (ইব্ন কাছীর, প্রাগুক্ত, page ৬০)।
ইবন কাছীর আরও উল্লেখ করেন, ওয়াহ্ব ইবন মুনাববিহসহ অনেকে উল্লেখ করিয়াছেন, তাঁহার গর্ভ ধারণের প্রাথমিক পর্যায়ে এই ব্যাপারে সর্বপ্রথম যিনি বিষয়টি আঁচ করিতে পরিয়াছিলেন তিনি হইলেন বানু ইসরাঈলেরই এক আবিদ ব্যক্তি, যাহার নাম ইউসুফ ইবন রা'কৃষ্ণ আন্-নাজ্জার, যিনি সম্পর্কে মারয়ামের খালাতো ভাই। তিনি মারয়ামের ঐ অবস্থা দেখিয়া বিস্ময় প্রকাশ করিতে শুরু করিলেন। একদা তিনি মারয়াম (আ)-কে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, হে মারয়াম! বীজ ব্যতীত কোন্ কিছু কি উৎপন্ন হয়? মারয়াম বলিলেন, হাঁ, অন্যথায় প্রথম উদ্ভিদ কে সৃষ্টি করিয়াছেন? তিনি আবার বলিলেন, পানি ও বৃষ্টি ব্যতীত কোন গাছ জন্মায়? মারয়াম উত্তরে বলিলেন, হাঁ, প্রথম গাছটি অন্যথায় কে সৃষ্টি করিলেন? তিনি আবার প্রশ্ন করিলেন, পুরুষ ব্যতীত কোন সন্তান হয়? মারয়াম জবাবে বলিলেন, হাঁ হয়। নিশ্চয় আল্লাহ পাক আদমকে নারী-পুরুষ ছাড়াই সৃষ্টি করিয়াছেন। তখন তিনি বলিলেন, মারয়াম! তুমি আমাকে-ঘটনাটি খুলিয়া বল। তখন মারয়াম (আ) তাঁহাকে আল্লাহ পাকের পক্ষ হইতে প্রাপ্ত সুসংবাদের কথা জানাইলেন এবং বলিলেন, গর্ভস্থ এই সন্তানের নাম হইবে ঈসা; সে দুনিয়া ও আখেরাতে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী হইবে (প্রাগুক্ত)।
বাইবেলে উল্লেখ আছে যে, মারয়ামের গর্ভধারণের বিষয়টি জানিতে পারিয়া ইউসুফ তাঁহাকে ত্যাগ করিতে ইচ্ছা করিয়াছিলেন। কিন্তু স্বপ্নে প্রকৃত ঘটনা জানিতে পারিয়া তাঁহাকে ত্যাগ করা হইতে বিরত থাকেন। স্বপ্নে প্রভুর এক দূত তাহাকে দর্শন দিয়া কহিলেন, যোষেফ, দায়ুদ সন্তান, তোমার স্ত্রী মারুয়ামকে গ্রহণ করিতে ভয় করিও না, কেননা তাহার গর্ভে যাহা জন্মিয়াছে, তাহা পবিত্র আত্মা হইতে হইয়াছে, আর তিনি পুত্র প্রসব করিবেন এবং তুমি তাহার নাম যীশু (ত্রাণকর্তা) রাখিবে, কারণ তিনিই আপন প্রজাদিগকে তাহাদের পাপ হইতে ত্রাণ করিবেন' (মথি সুসমাচার, ১: ২০-২২)।
ইবন কাছীরের বর্ণণামতে দেখা যায়, হযরত যাকারিয়্যা (আ)-ও মারয়ামকে ঐরূপ প্রশ্ন করিয়াছিলেন (ইবন কাছীর, প্রাগুক্ত)। ঐতিহাসিক সুদ্দী কয়েকজন সাহাবী (রা)-এর বরাতে উল্লেখ করিয়াছেন, মারয়াম (আ) একদিন তাঁহার খালার নিকট গেলেন। তখন তাঁহার খালা ইয়াহুয়াকে গর্ভে ধারণ করিয়াছিলেন এবং তাঁহাকে উদ্দেশ্য করিয়া তিনি বলিলেন, আমার গর্ভে সন্তানের উপস্থিতি অনুভব করিতেছি। অতঃপর মারয়াম (আ)-ও তাঁহাকে বলিলেন, আমিও আমার গর্ভে সন্তানের উপস্থিতি অনুভব করিতেছি। তৎপর ইয়াহইয়ার মাতা তাঁহাকে বলিলেন, আমি অনুভব করিতেছি আমার গর্ভস্থ সন্তান তোমার গর্ভস্থ সন্তানের প্রতি সিজদা অবনত (প্রাগুক্ত)। ইবন কাছীর ইবন আবী হাতিমের সূত্রে ইমাম মালিক হইতেও ঐরূপ একটি বর্ণনা উল্লেখ করিয়াছেন (প্রাগুক্ত)।