📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বায়তুল মুকাদ্দাসে যাকারিয়‍্যা (আ)-এর তত্ত্বাবধানে মারয়াম (আ)

📄 বায়তুল মুকাদ্দাসে যাকারিয়‍্যা (আ)-এর তত্ত্বাবধানে মারয়াম (আ)


পূর্বেই আলোচিত হইয়াছে, এক কঠিন পরীক্ষা ও প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হইয়া মহান আল্লাহ পাকের ইচ্ছায় হযরত যাকারিয়‍্যা (আ) বরকতময় কন্যা মারয়াম (আ)-এর ভরণ-পোষণসহ সার্বিক তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। ইমাম রাযী উল্লেখ করেন, তিনি (মারয়াম) যখন যৌবনে পদার্পণ করিলেন তখন যাকারিয়‍্যা (আ) তাঁহার জন্য মসজিদে একটি কক্ষ তৈরি করিলেন, যাহার মধ্যভাগে দরজা রাখিলেন এমনভাবে যে, ইহাতে সিঁড়ি ছাড়া কেহ উঠিতে পারিত না। আর তিনি যখন বাহিরে কোথায়ও যাইতেন, ইহার দরজা বন্ধ করিয়া যাইতেন (রাযী, প্রাগুক্ত, ৮খ, page ৩০)।
আলুসী উল্লেখ করেন, ইহা ইব্‌ন আব্বাস হইতে বর্ণিত (রুহুল মা'আনী, ৩খ, page ১৩৯)। মারয়াম (আ) শৈশব কাল হইতেই কন্যা সন্তান হিসাবে মসাজিদে বিশেষ ব্যবস্থায় অবস্থান করিতেছিলেন, ইহাই অধিক যুক্তিযুক্ত। আলুসী এই মত সমর্থন করেন। হযরত মারয়াম (আ)-এর জন্য বিশেষ ব্যবস্থাস্বরূপ যেই কক্ষ নির্ধারিত হইয়াছিল, ইহা এক বিশেষ প্রযুক্তিতে তৈরী ছিল। আল-কুরআনে ইহাকে 'মিহ্রাব' নামে উল্লেখ করা হইয়াছে। ইমাম রাযীর উপরিউক্ত বর্ণনাসহ অনেক মুফাসসির উক্ত মিহরাবটির নির্মাণ কৌশল ও অবস্থান সম্পর্কে বৈচিত্র্যময় তথ্য পরিবেশন করিয়াছেন।
ভাষাবিদ আসমাঈ (أصعمی) -এর মতে ইহা ছিল এমন একটি কক্ষ যাহাতে প্রবেশ করিতে হইলে দেওয়ালের উপর দিয়া প্রবেশ করিতে হইত (রাযী, প্রাগুক্ত, ৮খ, page ৩০)। ইমাম রাযী, আবু উবায়দ ও যাজ্জায প্রমুখের মতে মিহরাব হইল মসজিদের সবচেয়ে সম্মানজনক ও সুউচ্চ স্থান (প্রাগুক্ত)। প্রত্যেক মজলিস কিংবা সালাত আদায় করিবার জায়গার অগ্রবর্তী স্থানকে মিহরাব বলা হয়। ইহা সকল মজলিসের প্রধান, সম্মানিত ও উত্তম স্থামকেই বুঝায়। এমনিভাবে ইহা মসজিদের অন্তর্গতও বটে (তাফসীরে তাবারী, আরবী সং, ৩খ, ১৬৬)।
মারয়াম (আ)-এর জন্য যেই মিহরাব বা কক্ষটি নির্ধারণ করা হইয়াছিল তাহা ছিল অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের জন্য নির্ধারিত বিশেষ কক্ষ, যাহা মসজিদের অভ্যন্তরেই এক পার্শ্বে ছিল। তাঁহার নিরাপত্তার জন্য ইহাকে বিশেষ স্থাপত্য শৈলীতে তৈরি করা হইয়াছিল। তাহা ছাড়া, পরপর সাতটি সরজা অতিক্রম করিয়া মারয়াম (আ)-এর নিকট পৌছানো যাইত। আরো নিরাপত্তার স্বার্থে এই দরজাগুলির চাবিসমূহ একমাত্র হযরত যাকারিয়‍্যা (আ)-এর কাছেই থাকিত, ইহাতে অন্য কাহারও প্রবেশাধিকার ছিল না (তাফসীরে তাবারী, ৫খ, page ৩৬০)।
যাকারিয়‍্যা (আ) দৈনিক তাঁহার পানাহার সামগ্রী, তৈল ইত্যাদি পৌঁছাইয়া দিতেন (তাফসীরে মাযহারী, ২খ, page ২৭৫)। বর্ণিত আছে, মারয়াম (আ) যখন ঋতুবতী হইতেন, তখন হযরত যাকারিয়‍্যা তাঁহার স্ত্রীর নিকট তাহাকে লইয়া যাইতেন, আবার পর্ষিত্র হওয়ার পর মসজিদে তাহার জন্য নির্দিষ্ট মিত্রাবে লইয়া আসিতেন (কুরতুবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, page ৭১)।
কাহারও কাহারও মতে মারয়ামের (আ) হায়েয হইত না। তিনি প্রকৃতিগতভাবে হায়েয হইতে পবিত্র ছিলেন (প্রাগুক্ত)। আল্লামা সিওহারবী উল্লেখ করেন, মারয়াম আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগীতে রত থাকিতেন। আর রাতের বেলায় তাঁহাকে যাকারিয়‍্যা (আ) নিজ স্ত্রী ও মারয়ামের খালা আইশা'র কাছে লইয়া আসিতেন এবং এইখানেই তিনি রাত্রি যাপন করিতেন (সিওহারবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, page ১০)।
কোন কোন মুফাস্সির বলেন, সব কিছুর পাশাপাশি হযরত যাকারিয়‍্যা (আ) হযরত মারয়াম (আ)-এর শিক্ষা-দীক্ষার দায়িত্বও পালন করিতেছিলেন (দ্র. তাফসীরে তাবারী, ৫খ, page ৩৫৪; ইবন কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম, ১খ, page ৩৬০)।
কাহারো মতে বায়তুল মুকাদ্দাসে কোন মানুষ মানতের ছেলে লইয়া আসিলে সেইখানে বসিয়া যাহারা তাওরাত লিখিতেন তাহারা লটারীর মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতেন যে, কে তাঁহাকে গ্রহণ করিবেন এবং বিদ্যা শিক্ষা দিবেন। এইভাবেই যাকারিয়‍্যা (আ) মারয়াম (রা)-এর দায়িত্ব গ্রহণ করিয়াছিলেন (দ্র. তাফসীরে তাবারী, প্রাগুক্ত)।
ইবন কাছীর বলেন, আল্লাহ পাক হযরত যাকারিয়‍্যা (আ)-কে মারয়াম (আ)-এর তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করিবার ফয়সালা করিয়াছিলেন তাঁহার মঙ্গলার্থেই, যাহাতে মারয়াম যাকারিয়‍্যার অগাধ 'ইলম ও 'আমলে সালিহ (নেককাজ) আয়ত্ত করিতে পারেন (ইবন কাছীর, প্রাগুক্ত)। আর এইভাবে তিনি এক দিকে মসজিদের পবিত্র পরিবেশ, অন্যদিকে নবী যাকারিয়া (আ)-এর নবুওয়াতী তরবিয়াতে লালিত-পালিত হইতে থাকিলেন।
কোন কোন বর্ণনায় পাওয়া যায়, তিনি হায়কালের খিদমতে কিছু কাজও করিতেন এবং নিজের প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদিও সংগ্রহ করিতেন। যেমন ইবন জারীর তাবারীর এক বর্ণনায় রহিয়াছে, হযরত মারয়াম (আ) যে, ইবাদতখানাতে থাকিতেন তাঁহার সাথে সেই ইবাদতখানায় আরো একটি বালক থাকিত, যাহার নাম ছিল ইউসুফ। তাহার মাতা-পিতাও তাহাকে ইবাদতখানার জন্য মানত করিয়াছিল। তাহারা উভয়ে সেইখানেই বসবাস করিতেন। তাহারা উভয়ে পানি আনার জন্য মাঠে যাইতেন এবং সেখান হইতে কলসী ভর্তি সুস্বাদু পানি লইয়া আসিতেন (দ্র. তাফসীরে তাবারী, ৫খ, ৩৮৪)।
এই বর্ণনাটি ইবন ইসহাকের নিজস্ব। তিনি কোন্ উৎস হইতে ইহা গ্রহণ করিয়াছেন তাহা বলেন নাই। তাই এই বর্ণনায় সংশয়ের ঊর্ধ্বে নহে। কেহ কেহ ইহাকে ইসরাঈলীদের কল্পকাহিনীর আওতাভুক্ত মনে করেন। বিশেষত যেহেতু মারয়াম (আ)-এর লালন-পালন সুরক্ষিত অবস্থায় সম্পন্ন হইতেছিল সেই দৃষ্টিকোণ হইতে পানি আনিবার জন্য দূরে মাঠে গমন করা সঙ্গতিপূর্ণ নহে। আল্লাহই অধিক জ্ঞাত।
বায়তুল মুকাদ্দাসের পবিত্র অঙ্গনে হযরত যাকারিয়‍্যা (আ)-এর তত্ত্বাবধানে তাঁহার ভরণ-পোষণ, শিক্ষা-দীক্ষার কাজ অত্যন্ত সুচারুরূপে সম্পন্ন হইতেছিল। কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে: أَنْبَتَهَا نَبَاتًا حَسَنًا . "আর তাহাকে সুন্দরভাবে বাড়াইয়া তুলিলেন" (৩:৩৭)।
হযরত ইবন আব্বাস (রা) এই আয়াতের তাফসীরে বলেন, প্রভু তাঁহাকে তাঁহার ইরাদত ও আনুগত্যের উপর উত্তম তরবিয়াত প্রদান করিলেন (আলুসী, প্রাগুক্ত, ৩খ, ১৩৯)। আল্লামা আলুসী বলেন, অত্র আয়াতে তাঁহার তরবিয়াতের বিষয়টিকে রূপকার্থে উপস্থাপন করা হইয়াছে। কৃষক যেইভাবে প্রয়োজনে পানি সেচন করিয়া কৃষিক্ষেত্রের পরিচর্যা করে, বিভিন্ন আপদ হইতে রক্ষা করে, তাহার ফসলের জন্য ক্ষতিকর অন্য উদ্ভিদ সমূলে উপড়াইয়া ফেলে, তেমনি শস্যক্ষেত্রের মত তাঁহাকে পরিচর্যা করা হয় (প্রাগুক্ত)।
আল্লামা যামাখশারীও এই আয়াতের তফসীরে অনুরূপ কথা বলিয়াছেন (যামাখশারী, আল-কাশ্শাফ, বৈরুত, দারুল মা'রিফা, তা.বি., ১খ, ১৮৭)। অর্থাৎ দৈহিক গঠন বিন্যাস, আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ ও বিকাশ, চারিত্রিক পরিশুদ্ধতা ও মাধুর্য, ইবাদতে নিবিষ্টতা ও নিষ্ঠা, জ্ঞান-গরিমায় ও পাণ্ডিত্যে তথা সকল দিক দিয়া তাঁহাকে গড়িয়া তুলিবার জন্য আল্লাহ পাক উন্নত পরিচর্যার ব্যবস্থা করিয়া দিয়াছিলেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 অলৌকিকভাবে বেহেশতী খাদ্য লাভ

📄 অলৌকিকভাবে বেহেশতী খাদ্য লাভ


মারয়ামের শৈশব হইতেই তাঁহার প্রতি আল্লাহ পাকের বিশেষ দৃষ্টি পরিলক্ষিত হয়। এইজন্য শৈশব কালেই হযরত যাকারিয়‍্যা তাঁহার সম্পর্কে মন্তব্য করিয়াছিলেন, "নিশ্চয় ইমরানের কন্যার জন্য বিশেষ মর্যাদা রহিয়াছে” (তাফসীরে তাবারী, ৩খ., ১৮১)। হযরত যাকারিয়‍্যা তাঁহার খোঁজখবর নিতে প্রায়ই মরিয়ামের প্রকোষ্ঠে প্রবেশ করিতেন তাঁহার প্রতিপালনে আল্লাহ তাআলার বিশেষ দৃষ্টির কিছু কিছু দিক যাকারিয়‍্যা (আ)-এরও অজ্ঞাত ছিল, যাহা আল-কুরআনে স্পষ্টভাবেই বলা হইয়াছে:
كُلَّمَا دَخَلَ عَلَيْهَا زَكَرِيَّا الْمِحْرَابَ وَجَدَ عِنْدَهَا رِزْقًا قَالَ يَا مَرْيَمُ أَنَّى لَكِ هَذَا ، قَالَتْ هُوَ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَرْزُقُ مَنْ يُشَاءُ بِغَيْرِ حِسَابٍ .
"যখনই যাকারিয়্যা সেই মিহরাবে তাহার সহিত সাক্ষাত করিতে যাইত তখনই তাহার নিকট বিশেষ খাদ্যসামগ্রী দেখিতে পাইত। সে বলিত, হে মারয়াম! এইসব তুমি কোথা হইতে পাইলে? সে বলিত, উহা আল্লাহর নিকট হইতে। নিশ্চয়ই আল্লাহ যাহাকে ইচ্ছা অপরিমিত রিষ্ক দান করেন" (৩ঃ৩৭)।
ইবন কাছীর এই আয়াতের তাফসীরে মুজাহিদ, ইকরিমা, সাঈদ ইবন জুষায়র ও সুদ্দী প্রমুখের বরাতে লিখিয়াছেন, "যাকারিয়‍্যা (আ) তাঁহার নিকট শীতকালে গ্রীষ্মকালীন ফল এবং গ্রীষ্মকালে শীতকালীন ফল দেখিতে পাইতেন (ইবন কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম, ১খ, ৩৬০; ঐ লেখক, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ, ৫৪)। ইবন জারীর তাবারীও কাতাদা, হযরত ইবন আব্বাস প্রমুখ হইতেও ঐরূপ একটি বর্ণনা উল্লেখ করিয়াছেন। কাহারো কাহারো মতে ঐ আয়াতের অর্থ হইতেছে, যাকারিয়‍্যা (আ) যখন মিহরাবে মারয়াম (আ)-এর কাছে প্রবেশ করিতেন, তখন তাঁহাকে প্রদত্ত খাদ্যসামগ্রী ছাড়াও অতিরিক্ত খাদ্য দেখিতে পাইতেন। তখন তিনি এই অতিরিক্ত খাদ্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিতেন (তাফসীরে তাবারী, প্রাগুক্ত, page ৩৫৮-৯)।
ফখরুদ্দীন রাযী বর্ণনা করেন, আবু আলী আল-জুব্বাঈ তাঁহার তাফসীরে উল্লেখ করিয়াছেন, যাকারিয়‍্যা (আ) উহা দেখিয়া এই ভাবিয়া ভয় পাইয়াছিলেন যে, হয়ত এই রিফ এমন দিক হইতে আসিয়াছে যাহা আসা উচিত নহে (রাযী, প্রাগুক্ত, page ৩১)। ইমাম রাযী ইহাকে খবুই দুর্বল মত বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন (প্রাগুক্ত) এবং পূর্বোক্ত মতকে অকাট্য বলিয়া মন্তব্য করিয়াছেন (প্রাগুক্ত)। ইবন জারীর তাবারী ও ইবন ইস্হাক প্রথমোক্ত মতটি গ্রহণ করিয়াছেন (তাফসীরে তাবারী, প্রাগুক্ত, page ৩৬০)।
ইবন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত আছে যে, এইগুলি বেহেশতী ফল ছিল (আলুসী, প্রাগুক্ত, ৩খ, page ১৪০)। ইবন আব্বাস (রা) হইতে অপর এক বর্ণনায় আসিয়াছে, ইহার অর্থ হইতেছে যাকারিয়‍্যা (আ) মারয়াম (আ)-এর কাছে একটি থলির মধ্যে অসময়ের আঙ্গুর ফল দেখিতে পাইতেন (তাফসীরে তাবারী, প্রাগুক্ত, page ৩৫৭)। সাঈদ ইবন জুবায়র, ইবরাহীম নাখাঈ, মুজাহিদ (র)-এর নিকট হইতেও অনুরূপ বর্ণিত আছে (প্রাগুক্ত)।
'ইবন কাছীর ও রাযীর মতে উহা ছিল এক আশ্চর্যজনক ও বিস্ময়কর ধরনের খাদ্যবস্তু (ইবন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ, page ৫৩)। রিস্ক শব্দটি (অনির্দিষ্টবাচক শব্দ) আসিয়াছে বিস্ময় ও গুরুত্বপূর্ণ বলিয়া বুঝাইবার জন্য (প্রাগুক্ত, page ৩০)।
মাওলানা আবদুল মাজেদ দরিয়াবাদী উল্লেখ করেন, কোন কোন আধুনিক তাফসীরকার 'রিযিক' অর্থ ফয়েয ও জ্ঞান-বিজ্ঞান করিয়াছেন। কিন্তু ইহা প্রসিদ্ধ মুফাস্সির ও বিশেষজ্ঞগণের মতের পরিপন্থী। এই ধরনের ব্যাখ্যা তাফসীরী নীতিমালা লংঘনের শামিল (দরিয়াবাদী, প্রাগুক্ত, page ৫২)। মোটকথা, দুনিয়ার খাদ্যবস্তুর ঐ সকল খাদ্যদ্রব্যের সহিত কোন মিল ছিল না (আলুসী, প্রাগুক্ত, page ১৪০)। সেইজন্য হযরত যাকারিয়‍্যা (আ) প্রশ্ন করিয়াছিলেন-এইগুলি কোথা হইতে পাইয়াছ? আর তিনি উত্তর দিয়াছিলেন-এইগুলি আল্লাহর পক্ষ হইতে। এইভাবেই হযরত মারয়াম (আ) বারবার গায়েবী মদদ পাইতে থাকেন। পিতৃ-মাতৃহীন মারয়াম শিশু অবস্থা হইতে এক পবিত্র পরিবেশে ও পুরাপুরি ধর্মীয় চেতনায় লালিত-পালিত হইয়া আসিতেছিলেন। এইভাবে তিনি আল্লাহর নৈকট্য লাভ করিতেছিলেন এবং তাহার মাধ্যমে বিশেষ কারামত তথা অলৌকিক ঘটনা প্রকাশ পাইতেছিল।
মুতাযিলী সম্প্রদায় উহা মারয়ামের কারামত বলিতে অস্বীকার করিয়া উহার ব্যাখ্যায় বলিয়াছেন-উহা যাকারিয়‍্যার মুজিযা হইলে তিনি এই ব্যাপারে জানিতেন না কেন? আর ঈসা (আ)-এর মুজিযা কি করিয়া হইতে পারে? তিনি তো তখনও জনন্মগ্রহণ করেন নাই।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মারয়াম (আ)-এর ইবাদত-বন্দেগী ও কঠোর সাধনা

📄 মারয়াম (আ)-এর ইবাদত-বন্দেগী ও কঠোর সাধনা


সেই শৈশব কাল হইতেই মারয়াম (আ) মসজিদে আকসায় এক আল্লাহর নবীর তরবিয়াতে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের আশায় কঠোর সাধনা ও ইবাদতে মশগুল থাকেন। অবশ্য হায়কালে সুলায়মানীর খিদমতের পালা আসিলে তাহাও তিনি অত্যন্ত যত্নের সহিত সুসম্পন্ন করিতেন (সিওহারবী, প্রাগুক্ত, page ১১)। এমনিভাবে তিনি দিনরাত ইবাদতে নিমগ্ন থাকিয়া সময় অতিবাহিত করিতেছিলেন, এমনকি তাঁহার তাকওয়া ও 'ইবাদত বানু ইসরাঈলের মধ্যে প্রবাদে পরিণত হয়। আর যত্রতত্র তাঁহার ইবাদত-বন্দেগীর ও একনিষ্ঠ সাধনার কথা আলোচিত হইতে থাকে (প্রাগুক্ত)।
ইবন কাছীর (র) উল্লেখ করেন, তিনি যখন প্রাপ্তবয়স্কা হইলেন তখন ইবাদতে এতই কঠোর সাধনা করিতে থাকিলেন যে, ইবাদতে তাঁহার সময়ে তাহার সমকক্ষ আর কেহ ছিল না। আর তাঁহার মধ্যে এমন কিছু কিছু অবস্থা দেখা দিতে লাগিল, যাহাতে হযরত যাকারিয়‍্যা (আ)-ও মোহিত হইতে লাগিলেন (ইবন কাছীর, প্রাগুক্ত, ২খ, page ৫৯)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ফেরেশতার মাধ্যমে মর্যদার ঘোষণা ও আরো কঠোর সাধনার নির্দেশ লাভ

📄 ফেরেশতার মাধ্যমে মর্যদার ঘোষণা ও আরো কঠোর সাধনার নির্দেশ লাভ


হযরত মারয়াম (আ) স্বীয় প্রভুর ইবাদত ও সান্নিধ্য লাভের সাধনায় রত ছিলেন একযুগ পর্যন্ত। নিজের কর্মব্যস্ততার মধ্য দিয়া নিষ্কলুষ জীবন যাপন করিবার পর তাঁহার সেই সাধনা আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয়। আল্লাহ পাক তাঁহার কাজে এতই খুশী হইয়াছিলেন যে, তাঁহার তাকওয়া ও ইবাদত কবুল হওয়ার স্বীকৃতি এবং নারীকূলের মধ্যে বিশেষ মর্যাদা প্রদানের ঘোষণা ফেরেশতা পাঠাইয়া তাঁহাকে অবহিত করেন। আল্লাহ বলেন, وَإِذْ قَالَتِ الْمَلَائِكَةُ يَا مَرْيَمُ إِنَّ اللهَ اصْطَفَاكِ وَطَهْرَكَ وَاصْطَفَاكِ عَلَى نِسَاءِ الْعَالَمِينَ . "যখন ফেরেশতাগণ বলিয়াছিল, হে মারয়াম! আল্লাহ-তোমাকে মনোনীত ও পবিত্র করিয়াছেন এবং বিশ্বের নারীকূলের মধ্যে তোমাকে মনোনীত করিয়াছেন" (৩: ৪২)।
ইমাম ইবন জারীর তাবারীর মতে, আল্লাহর বাণী اصطفاك এর অর্থ তোমাকে মনোনীত করিয়াছেন, তোমাকে তাঁহার আনুগত্যের জন্য বাছিয়া লইয়াছেন, তাঁহার মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তোমাকেই নির্বাচন করিয়াছেন (তাফসীরে তাবারী, ৩খ, page ১৭৯-১৮০)।
اصطفى শব্দ صفوة হইতে উদ্ভূত যাহার অর্থ সবচেয়ে পূত-পবিত্র নিষ্কলুষ কিছু বাছিয়া লওয়া (কুরতুবী, প্রাগুক্ত, ২খ, page ১৩৩)।
মাওলানা হানাউল্লাহ পানিপথী ইহার ব্যাখ্যায় বলেন, "তিনি তোমাকে তাঁহার সত্তাগত তাজাল্লী দ্বারা কবুল করিয়া লইয়াছেন। সুফিয়ায়ে কিরাম এ তাজাল্লীকে নবুওয়াতের বৈশিষ্ট্য বলিয়া অভিহিত করেন। মৌলিকভাবে আম্বিয়ায়ে কিরাম এই বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হইয়া থাকেন। আর সিদ্দীকগণ তাহা উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেন। মারয়াম (আ) সিদ্দীকা ছিলেন" (তাফসীরে মাযহারী, ২খ, page ২৮৫)।
তিনি আরও কয়েকটি দিক তুলিয়া ধরিয়াছেন। যথা: (১) মারয়ামকে হিফাজত ও মাগফিরাতের মাধ্যমে সকল গুনাহ হইতে পবিত্র করিয়াছেন। (২) শয়তান তাঁহাকে স্পর্শও করিতে পারে নাই। ইহা তাঁহার মায়ের পূর্ববর্তী সেই দু'আ যাহা আল্লাহ পাক কবুল করিয়াছিলেন তাহার বরকতে। (৩) কাহারও কাহারও মতে এই পবিত্রতার অর্থ পুরুষের স্পর্শ হইতে দূরে থাকা। (৪) কেহ কেহ বলেন, আল্লাহ পাক তাঁহাকে মাসিক ঋতু হইতে পবিত্র রাখিয়াছিলেন (দ্র. তাফসীরে মাযহারী, প্রাগুক্ত)।
আর উপরিউক্ত আয়াতে طهرك-এর অর্থের ব্যাখ্যায় ইবন জারীর তাবারী বলেন, মহিলাদের দীনী ব্যাপারে যে সকল সীমাবদ্ধতা বিদ্যমান সেইগুলি হইতে মারয়ামকে পবিত্র করিয়াছেন (তাফসীরে তাবারী, প্রাগুক্ত, ৫খ, ৩৮২)। মোটকথা, তিনি ইবাদত-বন্দেগী ও চারিত্রিক নিষ্কলুষতার এতই উচ্চ স্তরে অবস্থান করিতেছিলেন যে, নারীকূলের মধ্যে হযরত মারয়াম এই সম্মান ও মর্যাদার স্বীকৃতি পাওয়ারই যোগ্য হইয়া গিয়াছিলেন। উপরিউক্ত সম্মান ও মর্যাদায় আরো সমুন্নত রাখিবার জন্য আল্লাহ পাক তাঁহাকে অধিক কঠোর সাধনায় নিমগ্ন হওয়ার জন্য নির্দেশ প্রদান করিয়াছিলেন। আল-কুরআনের পরবর্তী আয়াতে বলা হইয়াছে: يَا مَرْيَمُ اقْنتي لربك واسجدي واركعي مع الراكعين . "হে মারয়াম! তোমার প্রতিপালকের অনুগত হও ও সিজদা কর এবং যাহারা রুকু করে তাহাদের সহিত রুকু কর" (৩:৪৩)।
এই আয়াতের ' ُثُشُ ّ শব্দের ব্যাখ্যায় মুফাস্সিরগণ বিভিন্ন অর্থ বর্ণনা করিয়াছেন। মুজাহিদের মতে ইহার অর্থ সালাতে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়ানো। আয়াতের মমার্থ হইল—হে মারয়াম! তুমি নামাযে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়াইবে (তাফসীরে তাবারী, প্রাগুক্ত, page ৩৮৪)। মুজাহিদ (র) হইতে অপর এক বর্ণনায় আসিয়াছে, হযরত মারয়াম (আ)-কে ঐ আদেশ দেওয়ার পর তিনি নামাযে এত দীর্ঘক্ষণ দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া আদায় করিতেন যে, তাঁহার পা দুইটি ফুলিয়া যাইত। অপর এক বর্ণনায় আসিয়াছে, তাঁহার পায়ের গিটদ্বয় ফুলিয়া গিয়াছিল (প্রাগুক্ত, page ৩৮৫)। ইহা ছাড়া ইমাম আওযাঈ আলোচ্য আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় বলেন, হযরত মারয়াম (আ) যখন সালাতে দাঁড়াইতেন, তখন এমনকি তাঁহার দুইটি পা হইতে পুঁজ গড়াইয়া পড়িত (তাফসীরে তাবারী, প্রাগুক্ত, page ৩৮৫; আলুসী, প্রাগুক্ত, page ১৫৭)।
আবু সাঈদ খুদরী (রা) রাসূলুল্লাহ (স) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন। তিনি বলেন, কুরআন মজীদের যেইখানে الْقُنُوت শব্দ উল্লিখিত হইয়াছে, সেইখানেই উহার অর্থ আল্লাহর আনুগত্য (তাফসীরে তাবারী, প্রাগুক্ত)। কাতাদা, সূদ্দী প্রমুখ তাফসীরকারকগণ ঐ আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় বলেন, হে মারয়াম! তুমি তোমার প্রতিপালকের আনুগত্য কর (প্রাগুক্ত)। হযরত সাঈদ (র) ইবন জুবায়র-এর মতে কুনূতের অর্থ একনিষ্ঠ হওয়া (প্রাগুক্ত)। হাসান বসরী (র)-এর মতে উহার অর্থ তোমার প্রতিপালকের ইবাদত কর (প্রাগুক্ত)।
মোটকথা, ইবাদত হইল আনুগত্যের প্রতীক। উভয়ের মধ্যে কোন দ্বন্দু নাই। মুমিন জীবনে সকল কাজ যাহা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও আনুগত্য প্রদর্শনের জন্য করা হয় সবই ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। আর হযরত মারয়াম (আ)-এর ক্ষেত্রে সব কয়টি অর্থই প্রযোজ্য। সেইজন্য ইমাম ইবন জারীর তাবারী ঐ আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় বলিয়াছেন, 'বিশুদ্ধ যুক্তিতর্ক ও দলীলসহ আমরা প্রমাণ করিয়াছি যে, রুকু সিজদার উদ্দেশ্য আনুগত্য ও ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি বিনয়ী ও নম্র হওয়া। এই প্রেক্ষিতে আয়াতের মর্ম হইল, 'হে মারয়াম! মনোনয়ন দ্বারা, পবিত্রকরণ দ্বারা এবং তোমার যুগের নারী জাতির মধ্যে তোমাকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করিয়া আল্লাহ তাআলা তোমাকে যে সম্মান দিয়াছেন, ইহার কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তুমি তোমার প্রতিপালকের একনিষ্ঠভাবে ইবাদত কর। সে সকল লোকের সাথে তুমিও বিনয়ী হও যাহারা তাঁহার প্রতি বিনয়ী' (তাফসীরে তাবারী, প্রাগুক্ত, page ৩৮৫-৩৮৬)।
মারয়াম (আ)-এর জন্য উপরিউক্ত আদেশটির শেষাংশ অর্থাৎ وَارْكَعِيْ مَعَ الرَّاكِعِيْنَ -এর ব্যাখ্যায় মুফাস্সিরগণ তাঁহার সম্পর্কে অনেক তথ্য তুলিয়া ধরিয়াছেন। অধিকাংশের মতে 'রুকুকারীদের সাথে রুকু কর' এই আদেশের অর্থ হইল সালাত আদায়কারীদের সাথে জামাআতে সালাত আদায় কর (আলুসী, প্রাগুক্ত, page ১৫৭)। কেহ কেহ ধারণা করেন যে, মারয়ামকে আদেশ করা হইয়াছিল, রুকুক্কারিগণ যেই ধরনের কাজ করে তুমি তাহাদের সাথে নামাযে শরীক না হইলেও সেই ধরনের কাজ কর (দ্র. কুরতুবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, page ৮৫; আরও দ্র. আলুসী, প্রাগুক্ত)।
আলুসী উক্ত ধারণা খণ্ডন করিয়াছেন। তাহাদের যুক্তি ছিল, মারয়াম (আ) তাঁহার মিহরাবে নামায পড়িতেন। তাহা ছাড়া তিনি যুবতী ছিলেন আর জামাআতে নামায পড়া যুবতীদের জন্য মাকরূহ (আলুসী, প্রাগুক্ত)। আলুসী এই যুক্তিগুলির খণ্ডনে বলেন, ইহা বিনা প্রয়োজনে মূল বক্তব্যকে পরিহার করার শামিল। মারয়াম (আ) মিহরাবে নামায পড়িতেন তাহা স্বীকার্য বিষয়, কিন্তু তাই বলিয়া ইহা প্রমাণ করে না যে, তিনি জামাআতে নামায আদায় করিতেন না। মিহরাবে থাকিয়াই জামাতে শরীক হওয়ার সম্ভাবনা রহিয়াছে। আর আমাদের পূর্ববর্তী শরীআতে যুবতী মহিলাদের জামাআতে সালাত আদায় করা মাকরুহ ছিল-এই ধরনের কথাও প্রমাণিত নহে; বরং সালাত আদায় করা জামাআতে মাকরূহ ছিল না বলিয়া ইমাম মাতুরীদী উল্লেখ করিয়াছেন। আর ইহাও বলা হয় যে, যাহাদের সাথে তিনি সালাত আদায় করিতেন, তাহারা সকলেই তাহার মাহরাম ছিলেন।
মোটকথা, মারয়াম (আ) আল্লাহর আনুগত্যে উৎসর্গকারী সমভাবাপন্ন লোকজনের সাথেই ইবাদতে অংশগ্রহণ করিতে আদিষ্ট হইয়াছিলেন। অত্যন্ত ইবাদতগুযার ও সচ্চরিত্রা নারী মারয়াম (আ) আল্লাহর নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে তাঁহার জীবনে বাস্তবায়ন করিয়া জগৎবাসী নারীকূলের মুখ উজ্জ্বল করিয়াছিলেন। আল্লাহ পাক তাঁহার সেই ভূমিকায় এতই সন্তুষ্ট হইয়াছিলেন যে, পিতৃবিহীন সন্তান ধারণের জন্য তাঁহাকে মনোনীত করেন। ঈসা (আ)-কে গর্ভ ধারণের সুসংবাদ লইয়া যখন হঠাৎ ফেরেশতার আগমন ঘটে, তখন তিনি তাঁহাকে চিনিতে না পারিয়া যেই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করিয়াছিলেন তাহা হইতে তাঁহার বিষয়টি অনুধাবন করা যায়। আগন্তুকের উদ্দেশ্যে তিনি বলিয়াছিলেন- যাহা আল-কুরআনেও নিম্নোক্ত আয়াতে আসিয়াছে "সে (মারয়াম) বলিল, আল্লাহকে ভয় কর যদি তুমি মুত্তাকী হও যে, আমি তোমা হইতে দয়াময় (আল্লাহ)-র আশ্রয় প্রার্থনা করিতেছি" (১৯:১৮)।
ইহা দ্বারা প্রমাণিত হয়, মারয়াম (আ)-এর মধ্যে তাকওয়া-পরহেযগারীর চেতনা সদা জাগ্রত ছিল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00