📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মারয়াম (আ)-এর লালন-পালন

📄 মারয়াম (আ)-এর লালন-পালন


হযরত মারয়াম (আ) জন্মলাভের পর তাঁহার লালন-পালন, শিক্ষা-দীক্ষা ইত্যাদি বিষয়ে মূল দায়িত্ব পালন করেন তাঁহার খালু ও তৎকালীন নবী হযরত যাকারিয়া (আ)। তবে তিনি জন্মগ্রহণের পর বায়তুল মুকাদ্দাসে পেশের পূর্বে কত দিন মায়ের কাছে ছিলেন তাহা সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। এই সম্পর্কে মুসলিম ঐতিহাসিক ও মুফাস্সিরগণ বিভিন্ন রূপ তথ্য পরিবেশন করিয়াছেন:
১. ইবন কাছীর উল্লেখ করেন, অনেক মুফাসসির বর্ণনা করিয়াছেন যে, মারয়ামের মাতা যখন তাঁহাকে প্রসব করিলেন তখন তাঁহাকে একটি কাপড়ের টুকরায় আবৃত করিলেন। অতঃপর তাঁহাকে লইয়া মসজিদে আকসায় গেলেন এবং সেইখানে অবস্থানকারী আবেদগণের নিকট তাঁহাকে হাস্তস্তর করিলেন (ইবন কাছীর, বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., page ৫৭-৫৮)। ইবন জারীর তাবারীও কাতাদা, ইকরিমা ও সূদ্দী সূত্রে অনুরূপ বর্ণনা উদ্ধৃত করিয়াছেন (তাফসীরে তাবারী, ৫খ, page ৩৫৪-৩৫৫; কুরতুবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, page ৬৭)। ইবনুল আছীরও ঐকমত্য পোষণ করিয়াছেন (দ্র. আল-কামিল ফিত তারীখ, ১খ, page ২২৮)। হযরত হাসান বসরী (র) হইতে বর্ণিত যে, মারয়াম কখনো স্তন্য পান করেন নাই (দ্র. ইবনুল জাওযী, যাদুল মাসীর, ১খ, page ৩৮০; (আরো দ্র. রাযী, মাফাতীহুল গায়ব, ৮খ, page ২৮, ইসমাঈল হাক্বী, প্রাগুক্ত, page ২৯)। এই মর্মে মুকাতিল হইতে বর্ণিত আছে, মারয়ামের জন্য একজন ধাত্রী নিয়োগ করা হইয়াছিল। এইসব বর্ণনা হইতে প্রতীয়মান হয় যে, শিশুকাল হইতে তিনি মায়ের নিকট হইতে বিচ্ছিন্ন ছিলেন (ইবনুল জাওযী, প্রাগুক্ত)।
ইন জারীর তাবারী স্বীয় তাফসীরে মুহাম্মদ ইব্‌ন জাফর ইব্‌ন যুবায়র (র) হইতে এক বর্ণনায় উল্লেখ করেন, হযরত মারয়াম (আ)-এর মাতা ও পিতা মারা যাওয়ায় তাঁহার ইয়াতীম অবস্থায় হযরত যাকারিয়‍্যা (আ) তাঁহাকে লালন-পালন করেন (তাফসীরে তাবারী, ৫খ., page ৩৫৬)।
২. ইনসাইক্লোপিডিয়া এমেরিকানাতে উল্লিখিত আছে যে, ঈসা (আ)-এর জন্মের ৪০ দিন পর তাঁহাকে হায়কালে সুলায়মানীতে লইয়া বাওয়া হয়। আর ইহাই ইয়াহুদীদের রীতি (vol. 18, Page 345)। ইহা হইতে কেহ কেহ ধারণা করেন, জন্মের ৪০ দিন পর হযরত মারয়াম (আ)-কে তাঁহার মাতা মসজিদে আকসায় লইয়া গিয়াছিলেন।
৩. কাহারো কাহারো মতে দুধ ছাড়ানো অবস্থা অবধি হযরত মারয়াম (আ) তাঁহার মায়ের কাছেই লালিত-পালিত হইয়াছিলেন। আর সাধারণত দুধ ছাড়ানো হয় দুই কি আড়াই বৎসর কাল পরে। আল্লামা ইব্‌ন কাছীর এই মতটিকে প্রাধান্য দিয়াছেন। ইহার সপক্ষে দুইটি যুক্তি পেশ করা হয়ঃ
(এক) আল্লাহ পাক বলিয়াছেন, وَأَنْبَتَهَا نَبَاتًا حَسَنًا (তিনি তাহাকে সুন্দরভাবে বাড়াইয়া তুলিলেন)। ইহার পর বলিয়াছেন : وَكَفَّلَهَا زكريا (এবং যাকারিয়া তাহার লালন-পালনের দায়িত্ব বহন করিলেন)। এই আয়াতংশ দ্বারা ধারণা করা যায় যে, বাড়াইয়া তুলিবার পর যাকারিয়া (আ) লালন-পালনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
(দুই) পরবর্তী আয়াতাংশে উল্লেখ করা হয় যে, যাকারিয়া (আ) যখনই মারয়ামের ঘরে যাইতেন তখন খাদ্যবস্তু দেখিতে পাইতেন। আর ইহা প্রমাণ করে যে, মারয়াম তখন দুধ পান করা হাড়িয়া দিয়াছিলেন (দ্র. আর-রাযী, প্রাগুক্ত, page ২৯)। তিনি বলেন, আয়াতে উক্ত 'ওয়াও' অব্যয়টি "পরবর্তী” বুঝানোর জন্য নহে। হইতে পারে সব কয়টি ঘটনা একই সময়ে হইয়াছে অথবা খাদ্যবস্তু পাওয়ার ঘটনা ভরণ-পোষণের শেষ সময় কালের (প্রাগুক্ত)। ইমাম রাযীর মতে, দুধ ছাড়ানো পর্যন্ত নহে, বরং আরো শিশুকালে তাঁহাকে হস্তান্তর করা হয়। তিনি এই মত ব্যক্ত করিয়া ইহার বিপক্ষের যুক্তি খণ্ডন করিয়াছেন এবং বলিয়াছেন, ইহার সমর্থনে অনেক রিওয়ায়াত বিদ্যমান (দ্র. রাযী, প্রাগুক্ত, page ২৯)।
মাওলানা আবদুল মাজেদ দরিয়াবাদী স্বীয় তাফসীরে Hastings রচিত ডিকশনারী অব দ্য বাইবেল (৩খ., page ২৮৮) ও Budge রচিত Legends of Lady mary -এর বরাতে উল্লেখ করেন, "খৃষ্টীয় লিপি অনুসারে হযরত মারয়াম-কে তিন বৎসর বয়ঃক্রম কালে হায়কালে সুলায়মানীর সেবিকা হিসাবে গ্রহণ করা হয়। আর 'ইবাদতখানার সকল খাদেমই এই শিশুটিকে দেখিয়া খুবই আনন্দিত হয়” (তাফসীরে মাজেদী, ২খ., page ৫০)।
ইমাম আবু বকর জাসাসের মতে, ইবাদতে নিমগ্ন হওয়ার উপযুক্ত সময়েই মারয়ামকে হস্তান্তর করিবার মানত করা হইয়াছিল (দ্র. জাস্সাস, আহকামুল কুরআন, ২খ, page ১১)।
উপরিউক্ত মতামত পর্যালাচনায় দেখা যাইবে, ইব্‌ন কাছীরের দুধ ছাড়ানোর পর হস্তান্তরের মতটিই অধিক ভারসাম্যপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য। যদিও কোন কোন বর্ণনায় পাওয়া যায় তাঁহার মাতা শিশুকালেই, ইনতিকাল করেন, কিন্তু কখন ইনতিকাল করেন তাহা সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায় না। তাহা ছাড়া বর্ণিত আছে, ইয়াহূদী সমাজে ছোট শিশুদেরকেই মানত হিসাবে হায়কালে পেশ করা হইত। তাহারা বড় হওয়ার পর ইচ্ছা করিলে সেইখানে থাকিত অথবা চলিয়াও যাইতে পারিত (দ্র. তাফসীরে খাযেন, ১খ., page ২২৯)।
মারয়াম শিশু অবস্থায়েই কথা বলিতে পারিতেন। এই ধরনের একটি রিওয়ায়াত হযরত হাসান বসরী হইতে বর্ণিত আছে (ইবনুল জাওযী, প্রাগুক্ত, ১খ, page ৩৮০)। আরো বর্ণিত আছে যে, সাধারণ শিশু এক বৎসরে যতটুকু বৃদ্ধি পায়, হযরত মারয়াম (আ) এক দিনেই ততটুকু বৃদ্ধি পাইতেন (রাযী, প্রাগুক্ত, ৮খ., page ২৯; কুরতুবী, প্রাগুক্ত, ৪খ., page ৬৯)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 লালন-পালনের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য লটারী

📄 লালন-পালনের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য লটারী


হযরত মারয়াম (আ)-এর মাতা যখন তাঁহাকে পূর্ববর্তী মানত অনুসারে বায়তুল মুকাদ্দাসে লইয়া গেলেন, তখন হায়কালের সেবায়েতদের মধ্যে তিনি কাহার তত্ত্বাবধানে থাকিবেন তাহা লইয়া সমস্যা দেখা দিল। প্রত্যেকেই মারয়াম (আ)-এর তদারকির দায়িত্ব গ্রহণ করিয়া গৌরবান্বিত হইতে চাহিয়াছিলেন। কেননা হযরত মারয়াম তাহাদের ইমামের কন্যা এবং বায়তুল মুকাদ্দাসে উৎসর্গকৃত সর্বপ্রথম কন্যা সন্তান। বনূ ইসরাঈলের লোকেরা বলিল, আমাদেরই বেশী হক। কারণ সে আমাদের ইমামের কন্যা।
অবশ্য আল্লাহর নবী যাকারিয়‍্যা (আ), যিনি সেইখানের পুরোহিতগণের প্রধানও ছিলেন (রূহুল মাআনী, ৩খ, page ১৩৮), তিনি মারয়াম-এর খালু হিসাবে আত্মীয়, তার দাবিতে মারয়াম (আ)-এর তত্ত্বাবধায়ক হইবার প্রস্তাব করিয়াছিলেন।
আল্লামা তাবারী ইকরিমা (র) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, হযরত যাকারিয়‍্যা (আ) তখন বলিয়াছিলেন, "তোমরা সকলে তাহাকে আমার নিকট রাখিয়া দাও- অর্থাৎ তাহার লালন-পালনের দায়িত্ব আমাকে বহন করিতে দাও। কেননা তাহার খালা আমার স্ত্রী" (দ্র. তাফসীরে তাবারী, প্রাগুক্ত, ৫খ., page ৩৫৫)।
যাকারিয়া (আ)-এর ঐ প্রস্তাবে তাহারা রাযী হইল না। সকলেই তাহাদের দাবির উপর অটল রহিল। অবশেষে লটারীর মাধ্যমে তাহা মীমাংসার জন্য সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে ইহাতে ২৭ জন অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন (ইবনুল জাওযী, প্রাগুক্ত, ১খ., page ৩৭)। আর ইমাম বাকের (রা)-এর মতে নিক্ষিপ্ত কলমের সংখ্যা ছিল ৬টি (দ্র. আলুসী, প্রাগুক্ত, ৩খ, page ১৫৯)। তবে প্রথম বর্ণনাটি অধিক প্রসিদ্ধ। কিন্তু কতবার ও কিভাবে লটারী অনুষ্ঠিত হইয়াছিল সেই সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। আল-কুরআনে বলা হইয়াছে: ذلِكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ نُوحِيهِ إِلَيْكَ وَمَا كُنْتَ لَدَيْهِمْ إِذْ يُلْقُونَ أَقْلَامَهُمْ أَيُّهُمْ يَكْفُلُ مَرْيَمَ وَمَا كُنْتَ لَدَيْهِمْ اذْ يَخْتَصِمُونَ . "ইহা অদৃশ বিষয়ের সংবাদ, যাহা আপনাকে ওহী দ্বারা অবহিত করিতেছি। আর আপনি তখন তাহাদের মাঝে ছিলেন না, যখন তাহারা কলম নিক্ষেপ করিতেছিল, মারয়ামের লালন পালনের দায়িত্ব কে বহন করিবে (তাহা নির্ণয়ে) এবং আপনি তখনও তাহাদের মধ্যে হাযির ছিলেন না যখন তাহারা (ঐ ব্যাপারে) বাদানুবাদ করিতেছিল" (৩:৪৪)।
উক্ত লটারীতে কি ধরনের কলম, কিভাবে, কোথায় নিক্ষেপ করা হইয়াছিল সে সম্পর্কে মুফাসসিরগণ বিভিন্ন মত ব্যক্ত করিয়াছেন। আল্লামা ইব্‌ন কাছীর উল্লেখ করেন, মুফাস্সিরগণ বলেন, প্রতিদ্বন্দ্বীগণের প্রত্যেকেই নিজ নিজ কলম চিহ্নিত করিয়া এক স্থানে রাখেন। অতঃপর একজন আপ্রাপ্তবয়ষ্ক বালককে সেইগুলি হইতে যে কোন একটি লইয়া আসিবার জন্য নির্দেশ দিল। অতঃপর সে একটি কলম লইয়া আসিলে দেখা গেল তাহা যাকারিয়‍্যা (আ)-এর কলম। কিন্তু ইহাতে তাহারা সম্মত না হইয়া পুনরায় লটারী দিতে চাহিল। তাহা এই পদ্ধতিতে যে, সকলে নদীতে তাহাদের কলম নিক্ষেপ করিবে। যাহার কলম স্রোতে ভাসিয়া গিয়া স্থির থাকিবে, মতান্তরে উল্টা দিকে প্রবাহিত হইবে, তিনিই বিজয়ী হইবেন। তাহারা তাহাই করিল। ফলে দেখা গেল হযরত যাকারিয়‍্যা (আ)-এর কলম স্রোতের উল্টা প্রবাহিত হইল, আর বাকীদের কলম পানির সহিত ভাসিয়া গেল। কিন্তু তাহারা ইহাতেও সন্তুষ্ট না হইয়া তৃতীয় বারের মত আর একটি লটারীতে অবতীর্ণ হইতে চাহিল। তাহা এই পদ্ধতিতে যে, যাহারা কলম স্রোতের সহিত ভাসিয়া যাইবে তিনিই বিজয়ী হইবেন, আর যাহাদের কলম স্রোতের উল্টা দিকে যাইবে তাহারা নহে। অতঃপর দেখা গেল হযরত যাকারিয়‍্যা (আ)-এর কলম স্রোতের সহিত ভাসিয়া গেল এবং অন্যদের কলম স্রোতের উল্টা দিকে যাইতে লাগিল। ইহাতেও তিনি বিজয়ী হইলেন। আর এইভাবে তিনি হযরত মারয়াম (আ)-এর লালন-পালনের যিম্মাদারী লাভ করিলেন (দ্র. ইব্‌ন কাছীর, আল-বিদায়া, ওয়ান-নিহায়া, ২খ, page ৫৩)
আল্লামা আলুসী কিছু পার্থক্যসহ লটারীর এই ধরনের উল্লেখ করিয়াছেন। ইহাতে দ্বিতীয় পর্যায়ের লটারীতে যাহার কলম "পানির উপর ভাসিয়া উঠিবে তিনিই বিজয়ী হইবেন" বলিয়া সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হইয়াছিল (দ্র. আলুসী, রূহুল মা'আনী, ৩খ, page ১৩৮)।
অধিকাংশ মুফাস্সিসরের মতে যেই নদীর পানিতে কলমগুলি নিক্ষেপ করা হইয়াছিল তাহার নাম জর্দার্ন নদী (দ্র. তাফসীরে তাবারী, ৫খ, page ৩৫৩)। নিক্ষিপ্ত কলমের স্বরূপ লইয়াও মতভেদ আছে। তাবারীর মতে সেইগুলি ছিল তীর (তাবারী, তাফসীর, ৫খ., page ৩৮৮)। রাযীর মতে সেইগুলি ছিল লাঠি (রীযী, প্রাগুক্ত, ৮খ, page ৪৫)। অধিকাংশের মতে সেগুলি ঐ কলমসমূহ যাহা দ্বারা তাহারা তাওরাত লিপিবদ্ধ করিত (প্রাগুক্ত)। কাহারাও মতে সেইগুলি পিতলের তৈরী ছিল (আলুসী, প্রাগুক্ত, page ১৫৯)।
তবে কলম নিক্ষেপের পর তাহা স্রোতে স্থির থাকার, ভিন্ন বর্ণনায় বিপরীত দিকে যাওয়ার মতটি অধিকাংশ মুফাসসির গ্রহণ করিয়াছেন। ইবনুল আরাবী ইহার সমর্থনে একটি হাদীছ উল্লেখ করিয়াছেন। নবী (সা) বলেন, "সকলের কলমই ভাসিয়া গেল এবং যাকারিয়‍্যা (আ)-এর কলম থামিয়া গেল। ইহা ছিল একটি মু'জিযা। তিনি নবী ছিলেন। অতএব তাঁহার মাধ্যমে মু'জিযা প্রকাশিত হইল" (ইবনুল আরাবী, আহকামুল কুরআন, ২খ., page ২৭৩)।
আল্লামা হিফযুর রহমান সিওহারবী তিনবার লটারী অনুষ্ঠিত হওয়ার বর্ণনাটিকে ইসরাঈলী বর্ণনা বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন (দ্র. কাসাসুল কুরআন, বঙ্গানুবাদ: মুহাম্মদ মূসা, ইসলামিক ফাউণ্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা ১৯৮৯ খৃ., ১৪০৯ হি., ৪খ, page ৯৯)।
মোটকথা, লটারী যতবার ও যেইভাবেই অনুষ্ঠিত হউক না কেন, ইহার চূড়ান্ত ফলাফল যাকারিয়‍্যা (আ)-এর পক্ষেই গেল। আর তাঁহার প্রতিযোগিগণ যখন দেখিল আল্লাহর সাহায্য যাকারিয়‍্যা (আ)-এর অনুকূলেই রহিয়াছে, তখন তাঁহারা নির্দ্বিধায় এই সিদ্ধান্ত মানিয়া লইল।
ইমাম রাযী ঐ পুরোহিতগণের আগ্রহের কারণ বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন: (১) কাহারো মতে মারয়ামের পিতা ইমরান (রা) ছিলেন তাহাদের ইমাম। (২) তাঁহার মাতা আল্লাহর ইবাদত ও বায়তুল্লাহর খিদমতের জন্য তাঁহাকে উৎসর্গ করিয়া দিয়াছিলেন। (৩) মারয়াম ও তাঁহার সন্তান ঈসা সম্পর্কে ঐশী গ্রন্থাদিতে যে উল্লেখ রহিয়াছে তাহা তাহারা জানিত (দ্র. রাযী, প্রাগুক্ত, ৮খ, page ৪৬)।
মারয়ামের সাথে পারিবারিক সম্পর্ক, মারয়াম সম্পর্কে আল্লাহর সিদ্ধান্ত, নেককার আল্লাহভীরু ও বিশ্বস্ত লোকের মাধ্যমে প্রতিপালন, শিক্ষা-দীক্ষা এই সব দিক চিন্তা করিলে হযরত যাকারিয়‍্যার মত ব্যক্তিই সেই সময় উক্ত দায়িত্ব পালনে অধিক উপযুক্ত ছিলেন। তাই যাকারিয়‍্যা (আ) এককভাবেই তাঁহার লালন-পালন করিয়াছিলেন এবং ইহাই যুক্তিযুক্ত।
কেহ কেহ বলেন, মারয়ামের ছোটকালে একবার লটারী হয়, আবার বড় হওয়ার পর দায়িত্ব নেওয়ার জন্য আবার লটারী অনুষ্ঠিত হয় (আলুসী, রূহুল মা'আনী, ৩খ, page ১৫৯)। ইহা একটি দুর্বল মত যাহার পক্ষে কোন ঐতিহাসিক প্রমাণ নাই।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বায়তুল মুকাদ্দাসে যাকারিয়‍্যা (আ)-এর তত্ত্বাবধানে মারয়াম (আ)

📄 বায়তুল মুকাদ্দাসে যাকারিয়‍্যা (আ)-এর তত্ত্বাবধানে মারয়াম (আ)


পূর্বেই আলোচিত হইয়াছে, এক কঠিন পরীক্ষা ও প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হইয়া মহান আল্লাহ পাকের ইচ্ছায় হযরত যাকারিয়‍্যা (আ) বরকতময় কন্যা মারয়াম (আ)-এর ভরণ-পোষণসহ সার্বিক তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। ইমাম রাযী উল্লেখ করেন, তিনি (মারয়াম) যখন যৌবনে পদার্পণ করিলেন তখন যাকারিয়‍্যা (আ) তাঁহার জন্য মসজিদে একটি কক্ষ তৈরি করিলেন, যাহার মধ্যভাগে দরজা রাখিলেন এমনভাবে যে, ইহাতে সিঁড়ি ছাড়া কেহ উঠিতে পারিত না। আর তিনি যখন বাহিরে কোথায়ও যাইতেন, ইহার দরজা বন্ধ করিয়া যাইতেন (রাযী, প্রাগুক্ত, ৮খ, page ৩০)।
আলুসী উল্লেখ করেন, ইহা ইব্‌ন আব্বাস হইতে বর্ণিত (রুহুল মা'আনী, ৩খ, page ১৩৯)। মারয়াম (আ) শৈশব কাল হইতেই কন্যা সন্তান হিসাবে মসাজিদে বিশেষ ব্যবস্থায় অবস্থান করিতেছিলেন, ইহাই অধিক যুক্তিযুক্ত। আলুসী এই মত সমর্থন করেন। হযরত মারয়াম (আ)-এর জন্য বিশেষ ব্যবস্থাস্বরূপ যেই কক্ষ নির্ধারিত হইয়াছিল, ইহা এক বিশেষ প্রযুক্তিতে তৈরী ছিল। আল-কুরআনে ইহাকে 'মিহ্রাব' নামে উল্লেখ করা হইয়াছে। ইমাম রাযীর উপরিউক্ত বর্ণনাসহ অনেক মুফাসসির উক্ত মিহরাবটির নির্মাণ কৌশল ও অবস্থান সম্পর্কে বৈচিত্র্যময় তথ্য পরিবেশন করিয়াছেন।
ভাষাবিদ আসমাঈ (أصعمی) -এর মতে ইহা ছিল এমন একটি কক্ষ যাহাতে প্রবেশ করিতে হইলে দেওয়ালের উপর দিয়া প্রবেশ করিতে হইত (রাযী, প্রাগুক্ত, ৮খ, page ৩০)। ইমাম রাযী, আবু উবায়দ ও যাজ্জায প্রমুখের মতে মিহরাব হইল মসজিদের সবচেয়ে সম্মানজনক ও সুউচ্চ স্থান (প্রাগুক্ত)। প্রত্যেক মজলিস কিংবা সালাত আদায় করিবার জায়গার অগ্রবর্তী স্থানকে মিহরাব বলা হয়। ইহা সকল মজলিসের প্রধান, সম্মানিত ও উত্তম স্থামকেই বুঝায়। এমনিভাবে ইহা মসজিদের অন্তর্গতও বটে (তাফসীরে তাবারী, আরবী সং, ৩খ, ১৬৬)।
মারয়াম (আ)-এর জন্য যেই মিহরাব বা কক্ষটি নির্ধারণ করা হইয়াছিল তাহা ছিল অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের জন্য নির্ধারিত বিশেষ কক্ষ, যাহা মসজিদের অভ্যন্তরেই এক পার্শ্বে ছিল। তাঁহার নিরাপত্তার জন্য ইহাকে বিশেষ স্থাপত্য শৈলীতে তৈরি করা হইয়াছিল। তাহা ছাড়া, পরপর সাতটি সরজা অতিক্রম করিয়া মারয়াম (আ)-এর নিকট পৌছানো যাইত। আরো নিরাপত্তার স্বার্থে এই দরজাগুলির চাবিসমূহ একমাত্র হযরত যাকারিয়‍্যা (আ)-এর কাছেই থাকিত, ইহাতে অন্য কাহারও প্রবেশাধিকার ছিল না (তাফসীরে তাবারী, ৫খ, page ৩৬০)।
যাকারিয়‍্যা (আ) দৈনিক তাঁহার পানাহার সামগ্রী, তৈল ইত্যাদি পৌঁছাইয়া দিতেন (তাফসীরে মাযহারী, ২খ, page ২৭৫)। বর্ণিত আছে, মারয়াম (আ) যখন ঋতুবতী হইতেন, তখন হযরত যাকারিয়‍্যা তাঁহার স্ত্রীর নিকট তাহাকে লইয়া যাইতেন, আবার পর্ষিত্র হওয়ার পর মসজিদে তাহার জন্য নির্দিষ্ট মিত্রাবে লইয়া আসিতেন (কুরতুবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, page ৭১)।
কাহারও কাহারও মতে মারয়ামের (আ) হায়েয হইত না। তিনি প্রকৃতিগতভাবে হায়েয হইতে পবিত্র ছিলেন (প্রাগুক্ত)। আল্লামা সিওহারবী উল্লেখ করেন, মারয়াম আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগীতে রত থাকিতেন। আর রাতের বেলায় তাঁহাকে যাকারিয়‍্যা (আ) নিজ স্ত্রী ও মারয়ামের খালা আইশা'র কাছে লইয়া আসিতেন এবং এইখানেই তিনি রাত্রি যাপন করিতেন (সিওহারবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, page ১০)।
কোন কোন মুফাস্সির বলেন, সব কিছুর পাশাপাশি হযরত যাকারিয়‍্যা (আ) হযরত মারয়াম (আ)-এর শিক্ষা-দীক্ষার দায়িত্বও পালন করিতেছিলেন (দ্র. তাফসীরে তাবারী, ৫খ, page ৩৫৪; ইবন কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম, ১খ, page ৩৬০)।
কাহারো মতে বায়তুল মুকাদ্দাসে কোন মানুষ মানতের ছেলে লইয়া আসিলে সেইখানে বসিয়া যাহারা তাওরাত লিখিতেন তাহারা লটারীর মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতেন যে, কে তাঁহাকে গ্রহণ করিবেন এবং বিদ্যা শিক্ষা দিবেন। এইভাবেই যাকারিয়‍্যা (আ) মারয়াম (রা)-এর দায়িত্ব গ্রহণ করিয়াছিলেন (দ্র. তাফসীরে তাবারী, প্রাগুক্ত)।
ইবন কাছীর বলেন, আল্লাহ পাক হযরত যাকারিয়‍্যা (আ)-কে মারয়াম (আ)-এর তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করিবার ফয়সালা করিয়াছিলেন তাঁহার মঙ্গলার্থেই, যাহাতে মারয়াম যাকারিয়‍্যার অগাধ 'ইলম ও 'আমলে সালিহ (নেককাজ) আয়ত্ত করিতে পারেন (ইবন কাছীর, প্রাগুক্ত)। আর এইভাবে তিনি এক দিকে মসজিদের পবিত্র পরিবেশ, অন্যদিকে নবী যাকারিয়া (আ)-এর নবুওয়াতী তরবিয়াতে লালিত-পালিত হইতে থাকিলেন।
কোন কোন বর্ণনায় পাওয়া যায়, তিনি হায়কালের খিদমতে কিছু কাজও করিতেন এবং নিজের প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদিও সংগ্রহ করিতেন। যেমন ইবন জারীর তাবারীর এক বর্ণনায় রহিয়াছে, হযরত মারয়াম (আ) যে, ইবাদতখানাতে থাকিতেন তাঁহার সাথে সেই ইবাদতখানায় আরো একটি বালক থাকিত, যাহার নাম ছিল ইউসুফ। তাহার মাতা-পিতাও তাহাকে ইবাদতখানার জন্য মানত করিয়াছিল। তাহারা উভয়ে সেইখানেই বসবাস করিতেন। তাহারা উভয়ে পানি আনার জন্য মাঠে যাইতেন এবং সেখান হইতে কলসী ভর্তি সুস্বাদু পানি লইয়া আসিতেন (দ্র. তাফসীরে তাবারী, ৫খ, ৩৮৪)।
এই বর্ণনাটি ইবন ইসহাকের নিজস্ব। তিনি কোন্ উৎস হইতে ইহা গ্রহণ করিয়াছেন তাহা বলেন নাই। তাই এই বর্ণনায় সংশয়ের ঊর্ধ্বে নহে। কেহ কেহ ইহাকে ইসরাঈলীদের কল্পকাহিনীর আওতাভুক্ত মনে করেন। বিশেষত যেহেতু মারয়াম (আ)-এর লালন-পালন সুরক্ষিত অবস্থায় সম্পন্ন হইতেছিল সেই দৃষ্টিকোণ হইতে পানি আনিবার জন্য দূরে মাঠে গমন করা সঙ্গতিপূর্ণ নহে। আল্লাহই অধিক জ্ঞাত।
বায়তুল মুকাদ্দাসের পবিত্র অঙ্গনে হযরত যাকারিয়‍্যা (আ)-এর তত্ত্বাবধানে তাঁহার ভরণ-পোষণ, শিক্ষা-দীক্ষার কাজ অত্যন্ত সুচারুরূপে সম্পন্ন হইতেছিল। কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে: أَنْبَتَهَا نَبَاتًا حَسَنًا . "আর তাহাকে সুন্দরভাবে বাড়াইয়া তুলিলেন" (৩:৩৭)।
হযরত ইবন আব্বাস (রা) এই আয়াতের তাফসীরে বলেন, প্রভু তাঁহাকে তাঁহার ইরাদত ও আনুগত্যের উপর উত্তম তরবিয়াত প্রদান করিলেন (আলুসী, প্রাগুক্ত, ৩খ, ১৩৯)। আল্লামা আলুসী বলেন, অত্র আয়াতে তাঁহার তরবিয়াতের বিষয়টিকে রূপকার্থে উপস্থাপন করা হইয়াছে। কৃষক যেইভাবে প্রয়োজনে পানি সেচন করিয়া কৃষিক্ষেত্রের পরিচর্যা করে, বিভিন্ন আপদ হইতে রক্ষা করে, তাহার ফসলের জন্য ক্ষতিকর অন্য উদ্ভিদ সমূলে উপড়াইয়া ফেলে, তেমনি শস্যক্ষেত্রের মত তাঁহাকে পরিচর্যা করা হয় (প্রাগুক্ত)।
আল্লামা যামাখশারীও এই আয়াতের তফসীরে অনুরূপ কথা বলিয়াছেন (যামাখশারী, আল-কাশ্শাফ, বৈরুত, দারুল মা'রিফা, তা.বি., ১খ, ১৮৭)। অর্থাৎ দৈহিক গঠন বিন্যাস, আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ ও বিকাশ, চারিত্রিক পরিশুদ্ধতা ও মাধুর্য, ইবাদতে নিবিষ্টতা ও নিষ্ঠা, জ্ঞান-গরিমায় ও পাণ্ডিত্যে তথা সকল দিক দিয়া তাঁহাকে গড়িয়া তুলিবার জন্য আল্লাহ পাক উন্নত পরিচর্যার ব্যবস্থা করিয়া দিয়াছিলেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 অলৌকিকভাবে বেহেশতী খাদ্য লাভ

📄 অলৌকিকভাবে বেহেশতী খাদ্য লাভ


মারয়ামের শৈশব হইতেই তাঁহার প্রতি আল্লাহ পাকের বিশেষ দৃষ্টি পরিলক্ষিত হয়। এইজন্য শৈশব কালেই হযরত যাকারিয়‍্যা তাঁহার সম্পর্কে মন্তব্য করিয়াছিলেন, "নিশ্চয় ইমরানের কন্যার জন্য বিশেষ মর্যাদা রহিয়াছে” (তাফসীরে তাবারী, ৩খ., ১৮১)। হযরত যাকারিয়‍্যা তাঁহার খোঁজখবর নিতে প্রায়ই মরিয়ামের প্রকোষ্ঠে প্রবেশ করিতেন তাঁহার প্রতিপালনে আল্লাহ তাআলার বিশেষ দৃষ্টির কিছু কিছু দিক যাকারিয়‍্যা (আ)-এরও অজ্ঞাত ছিল, যাহা আল-কুরআনে স্পষ্টভাবেই বলা হইয়াছে:
كُلَّمَا دَخَلَ عَلَيْهَا زَكَرِيَّا الْمِحْرَابَ وَجَدَ عِنْدَهَا رِزْقًا قَالَ يَا مَرْيَمُ أَنَّى لَكِ هَذَا ، قَالَتْ هُوَ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَرْزُقُ مَنْ يُشَاءُ بِغَيْرِ حِسَابٍ .
"যখনই যাকারিয়্যা সেই মিহরাবে তাহার সহিত সাক্ষাত করিতে যাইত তখনই তাহার নিকট বিশেষ খাদ্যসামগ্রী দেখিতে পাইত। সে বলিত, হে মারয়াম! এইসব তুমি কোথা হইতে পাইলে? সে বলিত, উহা আল্লাহর নিকট হইতে। নিশ্চয়ই আল্লাহ যাহাকে ইচ্ছা অপরিমিত রিষ্ক দান করেন" (৩ঃ৩৭)।
ইবন কাছীর এই আয়াতের তাফসীরে মুজাহিদ, ইকরিমা, সাঈদ ইবন জুষায়র ও সুদ্দী প্রমুখের বরাতে লিখিয়াছেন, "যাকারিয়‍্যা (আ) তাঁহার নিকট শীতকালে গ্রীষ্মকালীন ফল এবং গ্রীষ্মকালে শীতকালীন ফল দেখিতে পাইতেন (ইবন কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম, ১খ, ৩৬০; ঐ লেখক, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ, ৫৪)। ইবন জারীর তাবারীও কাতাদা, হযরত ইবন আব্বাস প্রমুখ হইতেও ঐরূপ একটি বর্ণনা উল্লেখ করিয়াছেন। কাহারো কাহারো মতে ঐ আয়াতের অর্থ হইতেছে, যাকারিয়‍্যা (আ) যখন মিহরাবে মারয়াম (আ)-এর কাছে প্রবেশ করিতেন, তখন তাঁহাকে প্রদত্ত খাদ্যসামগ্রী ছাড়াও অতিরিক্ত খাদ্য দেখিতে পাইতেন। তখন তিনি এই অতিরিক্ত খাদ্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিতেন (তাফসীরে তাবারী, প্রাগুক্ত, page ৩৫৮-৯)।
ফখরুদ্দীন রাযী বর্ণনা করেন, আবু আলী আল-জুব্বাঈ তাঁহার তাফসীরে উল্লেখ করিয়াছেন, যাকারিয়‍্যা (আ) উহা দেখিয়া এই ভাবিয়া ভয় পাইয়াছিলেন যে, হয়ত এই রিফ এমন দিক হইতে আসিয়াছে যাহা আসা উচিত নহে (রাযী, প্রাগুক্ত, page ৩১)। ইমাম রাযী ইহাকে খবুই দুর্বল মত বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন (প্রাগুক্ত) এবং পূর্বোক্ত মতকে অকাট্য বলিয়া মন্তব্য করিয়াছেন (প্রাগুক্ত)। ইবন জারীর তাবারী ও ইবন ইস্হাক প্রথমোক্ত মতটি গ্রহণ করিয়াছেন (তাফসীরে তাবারী, প্রাগুক্ত, page ৩৬০)।
ইবন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত আছে যে, এইগুলি বেহেশতী ফল ছিল (আলুসী, প্রাগুক্ত, ৩খ, page ১৪০)। ইবন আব্বাস (রা) হইতে অপর এক বর্ণনায় আসিয়াছে, ইহার অর্থ হইতেছে যাকারিয়‍্যা (আ) মারয়াম (আ)-এর কাছে একটি থলির মধ্যে অসময়ের আঙ্গুর ফল দেখিতে পাইতেন (তাফসীরে তাবারী, প্রাগুক্ত, page ৩৫৭)। সাঈদ ইবন জুবায়র, ইবরাহীম নাখাঈ, মুজাহিদ (র)-এর নিকট হইতেও অনুরূপ বর্ণিত আছে (প্রাগুক্ত)।
'ইবন কাছীর ও রাযীর মতে উহা ছিল এক আশ্চর্যজনক ও বিস্ময়কর ধরনের খাদ্যবস্তু (ইবন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ, page ৫৩)। রিস্ক শব্দটি (অনির্দিষ্টবাচক শব্দ) আসিয়াছে বিস্ময় ও গুরুত্বপূর্ণ বলিয়া বুঝাইবার জন্য (প্রাগুক্ত, page ৩০)।
মাওলানা আবদুল মাজেদ দরিয়াবাদী উল্লেখ করেন, কোন কোন আধুনিক তাফসীরকার 'রিযিক' অর্থ ফয়েয ও জ্ঞান-বিজ্ঞান করিয়াছেন। কিন্তু ইহা প্রসিদ্ধ মুফাস্সির ও বিশেষজ্ঞগণের মতের পরিপন্থী। এই ধরনের ব্যাখ্যা তাফসীরী নীতিমালা লংঘনের শামিল (দরিয়াবাদী, প্রাগুক্ত, page ৫২)। মোটকথা, দুনিয়ার খাদ্যবস্তুর ঐ সকল খাদ্যদ্রব্যের সহিত কোন মিল ছিল না (আলুসী, প্রাগুক্ত, page ১৪০)। সেইজন্য হযরত যাকারিয়‍্যা (আ) প্রশ্ন করিয়াছিলেন-এইগুলি কোথা হইতে পাইয়াছ? আর তিনি উত্তর দিয়াছিলেন-এইগুলি আল্লাহর পক্ষ হইতে। এইভাবেই হযরত মারয়াম (আ) বারবার গায়েবী মদদ পাইতে থাকেন। পিতৃ-মাতৃহীন মারয়াম শিশু অবস্থা হইতে এক পবিত্র পরিবেশে ও পুরাপুরি ধর্মীয় চেতনায় লালিত-পালিত হইয়া আসিতেছিলেন। এইভাবে তিনি আল্লাহর নৈকট্য লাভ করিতেছিলেন এবং তাহার মাধ্যমে বিশেষ কারামত তথা অলৌকিক ঘটনা প্রকাশ পাইতেছিল।
মুতাযিলী সম্প্রদায় উহা মারয়ামের কারামত বলিতে অস্বীকার করিয়া উহার ব্যাখ্যায় বলিয়াছেন-উহা যাকারিয়‍্যার মুজিযা হইলে তিনি এই ব্যাপারে জানিতেন না কেন? আর ঈসা (আ)-এর মুজিযা কি করিয়া হইতে পারে? তিনি তো তখনও জনন্মগ্রহণ করেন নাই।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00