📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত মারয়াম (আ)-এর জন্মবৃত্তান্ত

📄 হযরত মারয়াম (আ)-এর জন্মবৃত্তান্ত


হযরত মারয়াম (আ)-এর জন্মের এক বিশেষ পটভূমি রহিয়াছে। (ক) জন্মের পটভূমি : হযরত ইমরান (আ)-এর স্ত্রী হান্না বিন্ত ফাকৃদা বন্ধ্যা ছিলেন। আর এইভাবেই তিনি বার্ধক্যে উপনীত হন। বর্ণিত আছে যে, বৃদ্ধাবস্থায় তিনি একবার বাড়ির আংগিনায় পায়চারি করিতে ছিলেন। এমন সময় দেখিতে পাইলেন, একটি পাখি নিজের বাচ্চাকে আদর-সোহাগ করিতেছে (হিফযুর রহমান সিউহারবী, কাসাসুল কুরআন, বঙ্গানুবাদ মাওলানা মুহাম্মদ মূসা ৪খ, page ৬)। অপর এক প্রসিদ্ধ বর্ণনায় আছে, হান্না তখন একটি গাছের ছায়ায় বসা ছিলেন। এই সময় হঠাৎ তাঁহার চোখে পড়িল, একটি পাখি তাহার ছানাকে আহার করাইতেছে। ইহা অবলোকনে তাঁহার নারী মন সন্তানের জন্য ব্যাকুল হইয়া উঠে। তিনি ছিলেন অত্যন্ত আল্লাহ- ভক্ত ও পরহেযগার মহিলা। তখন তিনি আল্লাহর কাছে দু'আ করিলেন যে, তাঁহাকে যদি একটি সন্তান দান করা হয় তবে তিনি তাহাকে বায়তুল মুকাদ্দাসের খেদমতের জন্য উৎসর্গ করিয়া দিবেন। ইব্‌ন জরীর তাবারী স্বীয় তাফসীরে ইকরিমা ও. মুহাম্মদ ইবন ইসহাকের সূত্রে ঐরূপ একটি বর্ণনা উল্লেখ করিয়াছেন (দ্র.তাফসীরে তাবারী, ৫খ, page ৩৪৩, ৩৪৫) আল্লামা ইন্ন কাছীর ও মুহাম্মদ ইবন ইসহাক প্রমুখ হইতে সেই রূপ বর্ণনা বিবৃত করিয়াছেন (দ্র. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ, page ৫২)।
উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, হযরত মারয়াম (আ)-এর জন্মের উপলক্ষ ছিল তাঁহার পুণ্যবতী মায়ের দু'আ। আল্লাহ্ পাক তাঁহার দু'আ কবুল করিয়াছিলেন।
(খ) হযরত মারয়াম (আ)-এর মাতা যখন অনুভব করিতে পারিলেন যে, তিনি সন্তান সম্ভবা তখন এই অনুভূতি তাঁহাকে এতই আন্দোলিত করিল যে, তিনি আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করিয়া ঘোষণাই দিয়া দিলেন যে, তাঁহার গর্ভের সন্তানকে তিনি হায়কালে সুলায়মানী তথা বায়তুল মুকাদ্দাসের খেদমতে উৎসর্গ করিয়া দিবেন। আল-কুরআনে উল্লিখিত হইয়াছে: إِذْ قَالَتِ امْرَأَتُ عِمْرَانَ رَبِّ إِنِّي نَذَرْتُ لَكَ مَا فِي بَطْنِي مُحَرِّرًا فَتَقَبَّلْ مِنِّي إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ . "স্মরণ করুন যখন ইমরানের স্ত্রী বলিয়াছিল, হে আমার প্রভু! আমার গর্ভে যাহা আছে তাহা একান্ত আপনার জন্য আমি উৎসর্গ করিলাম। সুতরাং আপনি আমার নিকট হইতে তাহা কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ" (৩ঃ ৩৫)।
উল্লেখ্য, তৎকালীন ইয়াহুদী সম্প্রদায়ের মধ্যে হায়কালে সুলায়মানীর খিদমতের জন্য সন্তান মানত করিবার প্রথা প্রচলিত ছিল (ইব্‌ন কাছীর, প্রাগুক্ত)। তাহারা মসজিদের খিদমত ও ইবাদাতেই নিয়োজিত থাকিত। পিতামাতার খিদমত বা বৈষয়িক কোন কাজে তাহাদেরকে নিয়োজিত করা হইত না। তাহারা বিবাহ শাদী করিত না, একমাত্র আখেরাতের কাজেই মশগুল থাকিত। তাই পিতা-মাতার খিদমতের দায়িত্ব হইতে তাহাদিগকে বিমুক্ত (মুহাররার) করা হইত (দ্র. কুরতুবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, page ৬৭; আরো দ্র. আলুসী, প্রাগুক্ত, ৩খ, page ১৩৩; শায়খ ইসমাঈল হাক্কী, তাফসীরু রূহুল বায়ান, ২খ, page ২৬)।
তাফসীরে খাযিনে উল্লেখ করা হইয়াছে, এই মানতের জন্য হান্নার স্বামী তাঁহাকে ভর্ৎসনা করিয়াছিলেন এই বলিয়া যে, হায়! সর্বনাশ! তুমি ইহা কি করিলে? তুমি কি জানিতে না, যদি তোমার পেটে কন্যা সন্তান থাকে তবে সে ঐ কাজের জন্য উপযুক্ত হইবেনা? অতঃপর ঐ মানত রক্ষার ব্যাপারে তাহারা উভয়ে খুব চিন্তিত হইয়া পড়িলেন (আল-বাগদাদী, তাফসীরুল খাযিন, ১খ, page ২২৯)।
হাফেয ইব্‌ন আসাকির ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণনা করেন, হযরত হান্না স্বীয় স্বামীর ভর্ৎসনা শুনিয়াই আল্লাহর নিকট দু'আ করিয়াছিলেন: نَذَرْتُ لَكَ مَا فِي بَطْنِي مُحَرِّرًا فَتَقَبَّلْ مِنِّي . "হে প্রভু! আমার গর্ভে যাহা আছে তাহা একান্তভাবে আপনার জন্য উৎসর্গ করিলাম। আপনি আমার পক্ষ হইতে কবুল করুন" (৩: ৩৫)।
বস্তুত ইহা তাঁহার পুত্র সন্তান লাভেরই প্রার্থনা (রূহুল মা'আনী, ৩খ, page ১৩৩)। অধিকাংশ মুফাস্সির-এর মতে, হযরত মারয়াম (আ) মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায়ই তাঁহার পিতা ইনতিকাল করেন (দ্র. প্রাগুক্ত, তাফসীরে তাবারী, ৫খ, page ৩৪৩; আলুসী, রূহুল মা'আনী, ৩খ, page ১৩৬)।
যথাসময়ে হযরত হান্নার গর্ভে কন্যা সন্তানের জন্ম হয়, তিনি যাহার নাম রাখেন মারয়াম (আ)। এইখানে উল্লেখ্য যে, তিনি কখন ও কোথায় জন্মগ্রহণ করেন সে বিষয়ে ঐতিহাসিকগণের মধ্যে যথেষ্ট মতপার্থক্য রহিয়াছে। তবে যদি ধরিয়া লওয়া হয় যে, তাঁহার ১৩ বৎসর বয়সের সময় ঈসা (আ) জন্মগ্রহণ করেন, তাহা হইলে বলা যায়, তিনি খৃস্টপূর্ব ১৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন।
ইনসাইক্লোপিডিয়া অব এমেরিকানাতে হযরত মারয়ামের জন্মস্থান সম্পর্কে বিভিন্ন স্থানের উল্লেখ রহিয়াছে। কোনটিতে তাঁহার জন্মস্থান হিসাবে নাসেরা (Nazreth) জনপল্লী, কোনটিতে সেপোরিশ (Sepphoris) এবং অন্য আরেকটিতে জেরুসালেম (Jerusalem) শহরের নাম উল্লেখ করা হইয়াছে। তবে জেরুসালেম হওয়ার দিকটিই অধিক যুক্তিযুক্ত (Encyclopedia Americana, vol. 14., Page 345H)।
জন্মোত্তর কালে তাঁহার মায়ের আক্ষেপ ও দু'আ : হযরত মারয়াম (আ) জন্মগ্রহণ করিবার পর তাঁহার মাতা যেই অনুভূতি ব্যক্ত করিয়াছিলেন তাহাতে তাঁহার আফসোস-এর সুর প্রতিধ্বনিত হইয়াছে, (দ্র. ইসমাঈল হাক্বী, প্রাগুক্ত, ৩খ, page ২৭), যাহার ইশারা আল-কুরআনেও আসিয়াছে নিম্নোক্তভাবে: فَلَمَّا وَضَعَتْهَا قَالَتْ رَبِّ إِنِّي وَضَعْتُهَا أُنْثَى . "তারপর সে যখন সন্তান প্রসব করিল তখন বলিল, হে আমার প্রভু! আমি তো কন্যা সন্তান প্রসব করিয়াছি" (৩: ৩৬)।
এই মেয়ে তোমার ইবাদতগাহের খেদমত কিভাবে সম্পন্ন করিবে (দ্র. তাফসীরে মাজেদী, ২খ, page ৪৯)। হযরত মারয়ামের মাতা অত্যন্ত বিনয় ও নম্রতা সহকারে মহান আল্লাহর দরবারে মুনাজাত করিতেছিলেন যে, তাঁহার মানত ছেলে সন্তানের লক্ষ্যেই ছিল, যাহাতে সে সুচারুরূপে হায়কালে সুলায়মানীর খেদমত করিতে পারে। কিন্তু মানতের পর তাহা কন্যা সন্তান হওয়ায় তাহাকে দিয়া মানত পুরা করা তো সম্ভব হইবে না। কন্যা সন্তান তো ঋতুবতী অবস্থায় মসজিদে অবস্থান করিতে পারিবে না। তাহা ছাড়া পুরুষের সঙ্গে কন্যা সন্তানের সহ-অবস্থান শোভনীয় হইবে না। সমাজে মহিলাদের দ্বারা গীর্জার খেদমতের কোন ব্যবস্থাও প্রবর্তিত ছিল না (তাফসীরে মাজেদী, প্রাগুক্ত)।
মোটকথা, উপরিউক্ত কারণে তাঁহার মাতা কিছুটা আক্ষেপের সুরেই স্বীয় অনুভূতি প্রকাশ করিলেন (দ্র. শাওকানী, ফাতহুল কাদীর, ১খ, page ৩৩৪)। কুরআন কারীমে বলা হইয়াছে: وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا وَضَعَتْ وَلَيْسَ الذَّكَرُ كَالْأُنْثَى . "সে যাহা প্রসব করিয়াছে, আল্লাহ তাহা সম্যক অবগত। ছেলে তো মেয়ের মত নহে" (৩ঃ৩৬)।
আল-কুরআনের এই বক্তব্যটি আল্লাহ পাকের উক্তি হিসাবে ধরা যায়। কিন্তু وضعت শব্দে কোন কোন কিরাআত-এ "পেশ" ধরা হয়, যাহাতে অর্থ হয় "আমি যাহা প্রসব করিয়াছি তাহা সম্পর্কে আল্লাহই সম্যক জ্ঞাত” (তাফসীর তাবারী, ৫খ, page ৩৪৬)। এই কিরাআত দ্বারা বুঝা যায় ইহা তাহার উক্তি। কেহ কেহ পরবর্তী বাক্যটি وَلَيْسَ الذكرُ كَالْأَنْثَى মারয়ামের মায়ের হওয়ার বিষয়টি অধিক গ্রহণযোগ্য বলিয়া মত প্রকাশ করিয়াছেন। কিন্তু অধিকাংশের মতে ইহা আল্লাহর উক্তি। "ছেলে তো মেয়ের মত নহে” ইব্‌ন আমির প্রমুখের কিরাআত হিসাবে ইহাও হান্নার উক্তি। অর্থাৎ বায়তুল মুকাদ্দাসের সেবায় এই সন্তান উৎসর্গের উপযুক্ত না হওয়ার কারণ পুত্র সন্তান শক্তি-সামর্থ্যের কারণে গীর্জার সেবায় কন্যা সন্তানের মত দুর্বল নহে। তাহার পর্দাজনিত কোন বাধা আর রজঃ-ও প্রসব-জনিত স্রাবের অসুবিধা ইত্যাদিও নাই।
ইহা আল্লাহর উক্তিও হইতে পারে। সেই হিসাবে ইহার অর্থ হইবে, তুমি যে পুত্র কামনা করিয়াছিলে তাহা তো এই কন্যার মত নহে, বরং এ কন্যা তো তদপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর। বাক্যের গঠন প্রণালীর দিকে লক্ষ্য করিলে শেষোক্ত অর্থই বেশী যুক্তিযুক্ত বলিয়া প্রতীয়মান হয়। ইহা হান্নার উক্তি হইলে বাক্যটি وليست الأنثى كالذكر 'কন্যা তো পুত্রের মত নহে' হইত (তাফসীর মাযহারী, ২খ., page ২৭২)। যাহাই হউক হযরত হান্নার নিজের পক্ষ হইতে অথবা ইলহামের মাধ্যমে জ্ঞাত হইয়া সান্ত্বনা লাভ করিয়া ও উক্ত কন্যা সন্তানের মর্যাদার ইঙ্গিত পাইয়া তাহার ভবিষ্যত জীবন পূত পবিত্র হইবার জন্য দু'আ করিলেন। হযরত মারয়াম (আ)-এর মাতা মারয়ামের জন্য এইভাবে দু'আ করিয়াছিলেনঃ وَإِنِّي أُعِيدُهَا بِكَ وَذُرِّيَّتُهَا مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّحِيمِ. "আর অবশ্যই আমি তাহার ও তাহার বংশধরদের অভিশপ্ত শয়তান হইতে রক্ষা করিবার জন্য তোমার আশ্রয়ে সোপর্দ করিয়া দিতেছি"।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। মহানবী (স) বলিয়াছেন: "যে কোন শিশুর জন্ম হয়, শয়তান নিজে তাহাকে স্পর্শ করে, শুধুমাত্র মারয়াম ও তাহার পুত্র (ঈসা) ইহার ব্যতিক্রম", (সহীহ বুখারী, কিতাবুত তাফসীর, কিরমানীর ভাষ্যসহ, ১৭খ., page ৫০)।
- ইমাম তাবারী স্বীয় তাফসীরে কাতাদার সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, প্রত্যেক আদম সন্তানকে শয়তান তাহার পার্শ্বদেশ স্পশ করে, কিন্তু হযরত ঈসা ইবন মারয়াম (আ) ও তাঁহার মাতাকে স্পর্শ করিতে পারে নাই। তাঁহাদের ও শয়তানের মধ্যে একটি পর্দা বা আড়াল সৃষ্টি করা হইয়ছিল। তখন সে পর্দায় স্পর্শ করিয়াছিল, কিন্তু তাঁহাদের কাছে শয়তানের স্পর্শ পৌঁছিতে পারে নাই” (দ্র. তাফসীরে তাবারী, ৩খ., page ১৬১৮৯)।
ইহা দ্বারা বুঝা যায় যে, আল্লাহ পাক হযরত মারয়াম (আ)-এর মায়ের দু'আ পূর্ণরূপে কবুল করিয়াছিলেন। সেইজন্য তাঁহাদের শরীরে শয়তানের স্পর্শ লাগিতে দেন নাই, যাহা হইতে এমনকি অন্যান্য নবী ও ওলীগণও মুক্ত ছিলেন না (দ্র. কুরতবী, প্রাগুক্ত, ৪খ. page ৬৮)। রাসূলুল্লাহ (স)-ও শয়তানের স্পর্শ হইতে নিরাপদ ছিলেন (রূহুল মা'আনী, ৩খ, page ১৩৮)। কোন কোন বর্ণনায় আছে, হযরত ফাতিমা (রা)-ও তাঁহার সন্তান হাসান-হুসায়নের ব্যাপারেও মহানবী-এর ঐরূপ দু'আয় তাঁহারা শয়তান হইতে নিরাপদ ছিলেন (দ্র. তাফসীরে মাযহারী, ২খ. page ২৭৩)। কুরআন কারীমে হযরত মারয়াম (আ)-এর মায়ের দু'আ কবুল হওয়া এবং উত্তমভাবে পালিত হওয়ার কথা বিধৃত হইয়াছে এই আয়াতে:- فَتَقَبَّلُهَا رَبُّهَا بِقَبُولٍ حَسَنٍ وَأَنْبَتَهَا نَبَاتًا حَسَنًا . "অতঃপর তাহার প্রতিপালক তাহাকে উত্তমরূপ কবুল করিলেন এবং তাহাকে সুন্দরভাবে লালন-পালন করিলেন" (৩৪ঃ ৩৭)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মারয়াম (আ)-এর লালন-পালন

📄 মারয়াম (আ)-এর লালন-পালন


হযরত মারয়াম (আ) জন্মলাভের পর তাঁহার লালন-পালন, শিক্ষা-দীক্ষা ইত্যাদি বিষয়ে মূল দায়িত্ব পালন করেন তাঁহার খালু ও তৎকালীন নবী হযরত যাকারিয়া (আ)। তবে তিনি জন্মগ্রহণের পর বায়তুল মুকাদ্দাসে পেশের পূর্বে কত দিন মায়ের কাছে ছিলেন তাহা সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। এই সম্পর্কে মুসলিম ঐতিহাসিক ও মুফাস্সিরগণ বিভিন্ন রূপ তথ্য পরিবেশন করিয়াছেন:
১. ইবন কাছীর উল্লেখ করেন, অনেক মুফাসসির বর্ণনা করিয়াছেন যে, মারয়ামের মাতা যখন তাঁহাকে প্রসব করিলেন তখন তাঁহাকে একটি কাপড়ের টুকরায় আবৃত করিলেন। অতঃপর তাঁহাকে লইয়া মসজিদে আকসায় গেলেন এবং সেইখানে অবস্থানকারী আবেদগণের নিকট তাঁহাকে হাস্তস্তর করিলেন (ইবন কাছীর, বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., page ৫৭-৫৮)। ইবন জারীর তাবারীও কাতাদা, ইকরিমা ও সূদ্দী সূত্রে অনুরূপ বর্ণনা উদ্ধৃত করিয়াছেন (তাফসীরে তাবারী, ৫খ, page ৩৫৪-৩৫৫; কুরতুবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, page ৬৭)। ইবনুল আছীরও ঐকমত্য পোষণ করিয়াছেন (দ্র. আল-কামিল ফিত তারীখ, ১খ, page ২২৮)। হযরত হাসান বসরী (র) হইতে বর্ণিত যে, মারয়াম কখনো স্তন্য পান করেন নাই (দ্র. ইবনুল জাওযী, যাদুল মাসীর, ১খ, page ৩৮০; (আরো দ্র. রাযী, মাফাতীহুল গায়ব, ৮খ, page ২৮, ইসমাঈল হাক্বী, প্রাগুক্ত, page ২৯)। এই মর্মে মুকাতিল হইতে বর্ণিত আছে, মারয়ামের জন্য একজন ধাত্রী নিয়োগ করা হইয়াছিল। এইসব বর্ণনা হইতে প্রতীয়মান হয় যে, শিশুকাল হইতে তিনি মায়ের নিকট হইতে বিচ্ছিন্ন ছিলেন (ইবনুল জাওযী, প্রাগুক্ত)।
ইন জারীর তাবারী স্বীয় তাফসীরে মুহাম্মদ ইব্‌ন জাফর ইব্‌ন যুবায়র (র) হইতে এক বর্ণনায় উল্লেখ করেন, হযরত মারয়াম (আ)-এর মাতা ও পিতা মারা যাওয়ায় তাঁহার ইয়াতীম অবস্থায় হযরত যাকারিয়‍্যা (আ) তাঁহাকে লালন-পালন করেন (তাফসীরে তাবারী, ৫খ., page ৩৫৬)।
২. ইনসাইক্লোপিডিয়া এমেরিকানাতে উল্লিখিত আছে যে, ঈসা (আ)-এর জন্মের ৪০ দিন পর তাঁহাকে হায়কালে সুলায়মানীতে লইয়া বাওয়া হয়। আর ইহাই ইয়াহুদীদের রীতি (vol. 18, Page 345)। ইহা হইতে কেহ কেহ ধারণা করেন, জন্মের ৪০ দিন পর হযরত মারয়াম (আ)-কে তাঁহার মাতা মসজিদে আকসায় লইয়া গিয়াছিলেন।
৩. কাহারো কাহারো মতে দুধ ছাড়ানো অবস্থা অবধি হযরত মারয়াম (আ) তাঁহার মায়ের কাছেই লালিত-পালিত হইয়াছিলেন। আর সাধারণত দুধ ছাড়ানো হয় দুই কি আড়াই বৎসর কাল পরে। আল্লামা ইব্‌ন কাছীর এই মতটিকে প্রাধান্য দিয়াছেন। ইহার সপক্ষে দুইটি যুক্তি পেশ করা হয়ঃ
(এক) আল্লাহ পাক বলিয়াছেন, وَأَنْبَتَهَا نَبَاتًا حَسَنًا (তিনি তাহাকে সুন্দরভাবে বাড়াইয়া তুলিলেন)। ইহার পর বলিয়াছেন : وَكَفَّلَهَا زكريا (এবং যাকারিয়া তাহার লালন-পালনের দায়িত্ব বহন করিলেন)। এই আয়াতংশ দ্বারা ধারণা করা যায় যে, বাড়াইয়া তুলিবার পর যাকারিয়া (আ) লালন-পালনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
(দুই) পরবর্তী আয়াতাংশে উল্লেখ করা হয় যে, যাকারিয়া (আ) যখনই মারয়ামের ঘরে যাইতেন তখন খাদ্যবস্তু দেখিতে পাইতেন। আর ইহা প্রমাণ করে যে, মারয়াম তখন দুধ পান করা হাড়িয়া দিয়াছিলেন (দ্র. আর-রাযী, প্রাগুক্ত, page ২৯)। তিনি বলেন, আয়াতে উক্ত 'ওয়াও' অব্যয়টি "পরবর্তী” বুঝানোর জন্য নহে। হইতে পারে সব কয়টি ঘটনা একই সময়ে হইয়াছে অথবা খাদ্যবস্তু পাওয়ার ঘটনা ভরণ-পোষণের শেষ সময় কালের (প্রাগুক্ত)। ইমাম রাযীর মতে, দুধ ছাড়ানো পর্যন্ত নহে, বরং আরো শিশুকালে তাঁহাকে হস্তান্তর করা হয়। তিনি এই মত ব্যক্ত করিয়া ইহার বিপক্ষের যুক্তি খণ্ডন করিয়াছেন এবং বলিয়াছেন, ইহার সমর্থনে অনেক রিওয়ায়াত বিদ্যমান (দ্র. রাযী, প্রাগুক্ত, page ২৯)।
মাওলানা আবদুল মাজেদ দরিয়াবাদী স্বীয় তাফসীরে Hastings রচিত ডিকশনারী অব দ্য বাইবেল (৩খ., page ২৮৮) ও Budge রচিত Legends of Lady mary -এর বরাতে উল্লেখ করেন, "খৃষ্টীয় লিপি অনুসারে হযরত মারয়াম-কে তিন বৎসর বয়ঃক্রম কালে হায়কালে সুলায়মানীর সেবিকা হিসাবে গ্রহণ করা হয়। আর 'ইবাদতখানার সকল খাদেমই এই শিশুটিকে দেখিয়া খুবই আনন্দিত হয়” (তাফসীরে মাজেদী, ২খ., page ৫০)।
ইমাম আবু বকর জাসাসের মতে, ইবাদতে নিমগ্ন হওয়ার উপযুক্ত সময়েই মারয়ামকে হস্তান্তর করিবার মানত করা হইয়াছিল (দ্র. জাস্সাস, আহকামুল কুরআন, ২খ, page ১১)।
উপরিউক্ত মতামত পর্যালাচনায় দেখা যাইবে, ইব্‌ন কাছীরের দুধ ছাড়ানোর পর হস্তান্তরের মতটিই অধিক ভারসাম্যপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য। যদিও কোন কোন বর্ণনায় পাওয়া যায় তাঁহার মাতা শিশুকালেই, ইনতিকাল করেন, কিন্তু কখন ইনতিকাল করেন তাহা সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায় না। তাহা ছাড়া বর্ণিত আছে, ইয়াহূদী সমাজে ছোট শিশুদেরকেই মানত হিসাবে হায়কালে পেশ করা হইত। তাহারা বড় হওয়ার পর ইচ্ছা করিলে সেইখানে থাকিত অথবা চলিয়াও যাইতে পারিত (দ্র. তাফসীরে খাযেন, ১খ., page ২২৯)।
মারয়াম শিশু অবস্থায়েই কথা বলিতে পারিতেন। এই ধরনের একটি রিওয়ায়াত হযরত হাসান বসরী হইতে বর্ণিত আছে (ইবনুল জাওযী, প্রাগুক্ত, ১খ, page ৩৮০)। আরো বর্ণিত আছে যে, সাধারণ শিশু এক বৎসরে যতটুকু বৃদ্ধি পায়, হযরত মারয়াম (আ) এক দিনেই ততটুকু বৃদ্ধি পাইতেন (রাযী, প্রাগুক্ত, ৮খ., page ২৯; কুরতুবী, প্রাগুক্ত, ৪খ., page ৬৯)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 লালন-পালনের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য লটারী

📄 লালন-পালনের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য লটারী


হযরত মারয়াম (আ)-এর মাতা যখন তাঁহাকে পূর্ববর্তী মানত অনুসারে বায়তুল মুকাদ্দাসে লইয়া গেলেন, তখন হায়কালের সেবায়েতদের মধ্যে তিনি কাহার তত্ত্বাবধানে থাকিবেন তাহা লইয়া সমস্যা দেখা দিল। প্রত্যেকেই মারয়াম (আ)-এর তদারকির দায়িত্ব গ্রহণ করিয়া গৌরবান্বিত হইতে চাহিয়াছিলেন। কেননা হযরত মারয়াম তাহাদের ইমামের কন্যা এবং বায়তুল মুকাদ্দাসে উৎসর্গকৃত সর্বপ্রথম কন্যা সন্তান। বনূ ইসরাঈলের লোকেরা বলিল, আমাদেরই বেশী হক। কারণ সে আমাদের ইমামের কন্যা।
অবশ্য আল্লাহর নবী যাকারিয়‍্যা (আ), যিনি সেইখানের পুরোহিতগণের প্রধানও ছিলেন (রূহুল মাআনী, ৩খ, page ১৩৮), তিনি মারয়াম-এর খালু হিসাবে আত্মীয়, তার দাবিতে মারয়াম (আ)-এর তত্ত্বাবধায়ক হইবার প্রস্তাব করিয়াছিলেন।
আল্লামা তাবারী ইকরিমা (র) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, হযরত যাকারিয়‍্যা (আ) তখন বলিয়াছিলেন, "তোমরা সকলে তাহাকে আমার নিকট রাখিয়া দাও- অর্থাৎ তাহার লালন-পালনের দায়িত্ব আমাকে বহন করিতে দাও। কেননা তাহার খালা আমার স্ত্রী" (দ্র. তাফসীরে তাবারী, প্রাগুক্ত, ৫খ., page ৩৫৫)।
যাকারিয়া (আ)-এর ঐ প্রস্তাবে তাহারা রাযী হইল না। সকলেই তাহাদের দাবির উপর অটল রহিল। অবশেষে লটারীর মাধ্যমে তাহা মীমাংসার জন্য সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে ইহাতে ২৭ জন অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন (ইবনুল জাওযী, প্রাগুক্ত, ১খ., page ৩৭)। আর ইমাম বাকের (রা)-এর মতে নিক্ষিপ্ত কলমের সংখ্যা ছিল ৬টি (দ্র. আলুসী, প্রাগুক্ত, ৩খ, page ১৫৯)। তবে প্রথম বর্ণনাটি অধিক প্রসিদ্ধ। কিন্তু কতবার ও কিভাবে লটারী অনুষ্ঠিত হইয়াছিল সেই সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। আল-কুরআনে বলা হইয়াছে: ذلِكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ نُوحِيهِ إِلَيْكَ وَمَا كُنْتَ لَدَيْهِمْ إِذْ يُلْقُونَ أَقْلَامَهُمْ أَيُّهُمْ يَكْفُلُ مَرْيَمَ وَمَا كُنْتَ لَدَيْهِمْ اذْ يَخْتَصِمُونَ . "ইহা অদৃশ বিষয়ের সংবাদ, যাহা আপনাকে ওহী দ্বারা অবহিত করিতেছি। আর আপনি তখন তাহাদের মাঝে ছিলেন না, যখন তাহারা কলম নিক্ষেপ করিতেছিল, মারয়ামের লালন পালনের দায়িত্ব কে বহন করিবে (তাহা নির্ণয়ে) এবং আপনি তখনও তাহাদের মধ্যে হাযির ছিলেন না যখন তাহারা (ঐ ব্যাপারে) বাদানুবাদ করিতেছিল" (৩:৪৪)।
উক্ত লটারীতে কি ধরনের কলম, কিভাবে, কোথায় নিক্ষেপ করা হইয়াছিল সে সম্পর্কে মুফাসসিরগণ বিভিন্ন মত ব্যক্ত করিয়াছেন। আল্লামা ইব্‌ন কাছীর উল্লেখ করেন, মুফাস্সিরগণ বলেন, প্রতিদ্বন্দ্বীগণের প্রত্যেকেই নিজ নিজ কলম চিহ্নিত করিয়া এক স্থানে রাখেন। অতঃপর একজন আপ্রাপ্তবয়ষ্ক বালককে সেইগুলি হইতে যে কোন একটি লইয়া আসিবার জন্য নির্দেশ দিল। অতঃপর সে একটি কলম লইয়া আসিলে দেখা গেল তাহা যাকারিয়‍্যা (আ)-এর কলম। কিন্তু ইহাতে তাহারা সম্মত না হইয়া পুনরায় লটারী দিতে চাহিল। তাহা এই পদ্ধতিতে যে, সকলে নদীতে তাহাদের কলম নিক্ষেপ করিবে। যাহার কলম স্রোতে ভাসিয়া গিয়া স্থির থাকিবে, মতান্তরে উল্টা দিকে প্রবাহিত হইবে, তিনিই বিজয়ী হইবেন। তাহারা তাহাই করিল। ফলে দেখা গেল হযরত যাকারিয়‍্যা (আ)-এর কলম স্রোতের উল্টা প্রবাহিত হইল, আর বাকীদের কলম পানির সহিত ভাসিয়া গেল। কিন্তু তাহারা ইহাতেও সন্তুষ্ট না হইয়া তৃতীয় বারের মত আর একটি লটারীতে অবতীর্ণ হইতে চাহিল। তাহা এই পদ্ধতিতে যে, যাহারা কলম স্রোতের সহিত ভাসিয়া যাইবে তিনিই বিজয়ী হইবেন, আর যাহাদের কলম স্রোতের উল্টা দিকে যাইবে তাহারা নহে। অতঃপর দেখা গেল হযরত যাকারিয়‍্যা (আ)-এর কলম স্রোতের সহিত ভাসিয়া গেল এবং অন্যদের কলম স্রোতের উল্টা দিকে যাইতে লাগিল। ইহাতেও তিনি বিজয়ী হইলেন। আর এইভাবে তিনি হযরত মারয়াম (আ)-এর লালন-পালনের যিম্মাদারী লাভ করিলেন (দ্র. ইব্‌ন কাছীর, আল-বিদায়া, ওয়ান-নিহায়া, ২খ, page ৫৩)
আল্লামা আলুসী কিছু পার্থক্যসহ লটারীর এই ধরনের উল্লেখ করিয়াছেন। ইহাতে দ্বিতীয় পর্যায়ের লটারীতে যাহার কলম "পানির উপর ভাসিয়া উঠিবে তিনিই বিজয়ী হইবেন" বলিয়া সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হইয়াছিল (দ্র. আলুসী, রূহুল মা'আনী, ৩খ, page ১৩৮)।
অধিকাংশ মুফাস্সিসরের মতে যেই নদীর পানিতে কলমগুলি নিক্ষেপ করা হইয়াছিল তাহার নাম জর্দার্ন নদী (দ্র. তাফসীরে তাবারী, ৫খ, page ৩৫৩)। নিক্ষিপ্ত কলমের স্বরূপ লইয়াও মতভেদ আছে। তাবারীর মতে সেইগুলি ছিল তীর (তাবারী, তাফসীর, ৫খ., page ৩৮৮)। রাযীর মতে সেইগুলি ছিল লাঠি (রীযী, প্রাগুক্ত, ৮খ, page ৪৫)। অধিকাংশের মতে সেগুলি ঐ কলমসমূহ যাহা দ্বারা তাহারা তাওরাত লিপিবদ্ধ করিত (প্রাগুক্ত)। কাহারাও মতে সেইগুলি পিতলের তৈরী ছিল (আলুসী, প্রাগুক্ত, page ১৫৯)।
তবে কলম নিক্ষেপের পর তাহা স্রোতে স্থির থাকার, ভিন্ন বর্ণনায় বিপরীত দিকে যাওয়ার মতটি অধিকাংশ মুফাসসির গ্রহণ করিয়াছেন। ইবনুল আরাবী ইহার সমর্থনে একটি হাদীছ উল্লেখ করিয়াছেন। নবী (সা) বলেন, "সকলের কলমই ভাসিয়া গেল এবং যাকারিয়‍্যা (আ)-এর কলম থামিয়া গেল। ইহা ছিল একটি মু'জিযা। তিনি নবী ছিলেন। অতএব তাঁহার মাধ্যমে মু'জিযা প্রকাশিত হইল" (ইবনুল আরাবী, আহকামুল কুরআন, ২খ., page ২৭৩)।
আল্লামা হিফযুর রহমান সিওহারবী তিনবার লটারী অনুষ্ঠিত হওয়ার বর্ণনাটিকে ইসরাঈলী বর্ণনা বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন (দ্র. কাসাসুল কুরআন, বঙ্গানুবাদ: মুহাম্মদ মূসা, ইসলামিক ফাউণ্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা ১৯৮৯ খৃ., ১৪০৯ হি., ৪খ, page ৯৯)।
মোটকথা, লটারী যতবার ও যেইভাবেই অনুষ্ঠিত হউক না কেন, ইহার চূড়ান্ত ফলাফল যাকারিয়‍্যা (আ)-এর পক্ষেই গেল। আর তাঁহার প্রতিযোগিগণ যখন দেখিল আল্লাহর সাহায্য যাকারিয়‍্যা (আ)-এর অনুকূলেই রহিয়াছে, তখন তাঁহারা নির্দ্বিধায় এই সিদ্ধান্ত মানিয়া লইল।
ইমাম রাযী ঐ পুরোহিতগণের আগ্রহের কারণ বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন: (১) কাহারো মতে মারয়ামের পিতা ইমরান (রা) ছিলেন তাহাদের ইমাম। (২) তাঁহার মাতা আল্লাহর ইবাদত ও বায়তুল্লাহর খিদমতের জন্য তাঁহাকে উৎসর্গ করিয়া দিয়াছিলেন। (৩) মারয়াম ও তাঁহার সন্তান ঈসা সম্পর্কে ঐশী গ্রন্থাদিতে যে উল্লেখ রহিয়াছে তাহা তাহারা জানিত (দ্র. রাযী, প্রাগুক্ত, ৮খ, page ৪৬)।
মারয়ামের সাথে পারিবারিক সম্পর্ক, মারয়াম সম্পর্কে আল্লাহর সিদ্ধান্ত, নেককার আল্লাহভীরু ও বিশ্বস্ত লোকের মাধ্যমে প্রতিপালন, শিক্ষা-দীক্ষা এই সব দিক চিন্তা করিলে হযরত যাকারিয়‍্যার মত ব্যক্তিই সেই সময় উক্ত দায়িত্ব পালনে অধিক উপযুক্ত ছিলেন। তাই যাকারিয়‍্যা (আ) এককভাবেই তাঁহার লালন-পালন করিয়াছিলেন এবং ইহাই যুক্তিযুক্ত।
কেহ কেহ বলেন, মারয়ামের ছোটকালে একবার লটারী হয়, আবার বড় হওয়ার পর দায়িত্ব নেওয়ার জন্য আবার লটারী অনুষ্ঠিত হয় (আলুসী, রূহুল মা'আনী, ৩খ, page ১৫৯)। ইহা একটি দুর্বল মত যাহার পক্ষে কোন ঐতিহাসিক প্রমাণ নাই।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বায়তুল মুকাদ্দাসে যাকারিয়‍্যা (আ)-এর তত্ত্বাবধানে মারয়াম (আ)

📄 বায়তুল মুকাদ্দাসে যাকারিয়‍্যা (আ)-এর তত্ত্বাবধানে মারয়াম (আ)


পূর্বেই আলোচিত হইয়াছে, এক কঠিন পরীক্ষা ও প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হইয়া মহান আল্লাহ পাকের ইচ্ছায় হযরত যাকারিয়‍্যা (আ) বরকতময় কন্যা মারয়াম (আ)-এর ভরণ-পোষণসহ সার্বিক তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। ইমাম রাযী উল্লেখ করেন, তিনি (মারয়াম) যখন যৌবনে পদার্পণ করিলেন তখন যাকারিয়‍্যা (আ) তাঁহার জন্য মসজিদে একটি কক্ষ তৈরি করিলেন, যাহার মধ্যভাগে দরজা রাখিলেন এমনভাবে যে, ইহাতে সিঁড়ি ছাড়া কেহ উঠিতে পারিত না। আর তিনি যখন বাহিরে কোথায়ও যাইতেন, ইহার দরজা বন্ধ করিয়া যাইতেন (রাযী, প্রাগুক্ত, ৮খ, page ৩০)।
আলুসী উল্লেখ করেন, ইহা ইব্‌ন আব্বাস হইতে বর্ণিত (রুহুল মা'আনী, ৩খ, page ১৩৯)। মারয়াম (আ) শৈশব কাল হইতেই কন্যা সন্তান হিসাবে মসাজিদে বিশেষ ব্যবস্থায় অবস্থান করিতেছিলেন, ইহাই অধিক যুক্তিযুক্ত। আলুসী এই মত সমর্থন করেন। হযরত মারয়াম (আ)-এর জন্য বিশেষ ব্যবস্থাস্বরূপ যেই কক্ষ নির্ধারিত হইয়াছিল, ইহা এক বিশেষ প্রযুক্তিতে তৈরী ছিল। আল-কুরআনে ইহাকে 'মিহ্রাব' নামে উল্লেখ করা হইয়াছে। ইমাম রাযীর উপরিউক্ত বর্ণনাসহ অনেক মুফাসসির উক্ত মিহরাবটির নির্মাণ কৌশল ও অবস্থান সম্পর্কে বৈচিত্র্যময় তথ্য পরিবেশন করিয়াছেন।
ভাষাবিদ আসমাঈ (أصعمی) -এর মতে ইহা ছিল এমন একটি কক্ষ যাহাতে প্রবেশ করিতে হইলে দেওয়ালের উপর দিয়া প্রবেশ করিতে হইত (রাযী, প্রাগুক্ত, ৮খ, page ৩০)। ইমাম রাযী, আবু উবায়দ ও যাজ্জায প্রমুখের মতে মিহরাব হইল মসজিদের সবচেয়ে সম্মানজনক ও সুউচ্চ স্থান (প্রাগুক্ত)। প্রত্যেক মজলিস কিংবা সালাত আদায় করিবার জায়গার অগ্রবর্তী স্থানকে মিহরাব বলা হয়। ইহা সকল মজলিসের প্রধান, সম্মানিত ও উত্তম স্থামকেই বুঝায়। এমনিভাবে ইহা মসজিদের অন্তর্গতও বটে (তাফসীরে তাবারী, আরবী সং, ৩খ, ১৬৬)।
মারয়াম (আ)-এর জন্য যেই মিহরাব বা কক্ষটি নির্ধারণ করা হইয়াছিল তাহা ছিল অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের জন্য নির্ধারিত বিশেষ কক্ষ, যাহা মসজিদের অভ্যন্তরেই এক পার্শ্বে ছিল। তাঁহার নিরাপত্তার জন্য ইহাকে বিশেষ স্থাপত্য শৈলীতে তৈরি করা হইয়াছিল। তাহা ছাড়া, পরপর সাতটি সরজা অতিক্রম করিয়া মারয়াম (আ)-এর নিকট পৌছানো যাইত। আরো নিরাপত্তার স্বার্থে এই দরজাগুলির চাবিসমূহ একমাত্র হযরত যাকারিয়‍্যা (আ)-এর কাছেই থাকিত, ইহাতে অন্য কাহারও প্রবেশাধিকার ছিল না (তাফসীরে তাবারী, ৫খ, page ৩৬০)।
যাকারিয়‍্যা (আ) দৈনিক তাঁহার পানাহার সামগ্রী, তৈল ইত্যাদি পৌঁছাইয়া দিতেন (তাফসীরে মাযহারী, ২খ, page ২৭৫)। বর্ণিত আছে, মারয়াম (আ) যখন ঋতুবতী হইতেন, তখন হযরত যাকারিয়‍্যা তাঁহার স্ত্রীর নিকট তাহাকে লইয়া যাইতেন, আবার পর্ষিত্র হওয়ার পর মসজিদে তাহার জন্য নির্দিষ্ট মিত্রাবে লইয়া আসিতেন (কুরতুবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, page ৭১)।
কাহারও কাহারও মতে মারয়ামের (আ) হায়েয হইত না। তিনি প্রকৃতিগতভাবে হায়েয হইতে পবিত্র ছিলেন (প্রাগুক্ত)। আল্লামা সিওহারবী উল্লেখ করেন, মারয়াম আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগীতে রত থাকিতেন। আর রাতের বেলায় তাঁহাকে যাকারিয়‍্যা (আ) নিজ স্ত্রী ও মারয়ামের খালা আইশা'র কাছে লইয়া আসিতেন এবং এইখানেই তিনি রাত্রি যাপন করিতেন (সিওহারবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, page ১০)।
কোন কোন মুফাস্সির বলেন, সব কিছুর পাশাপাশি হযরত যাকারিয়‍্যা (আ) হযরত মারয়াম (আ)-এর শিক্ষা-দীক্ষার দায়িত্বও পালন করিতেছিলেন (দ্র. তাফসীরে তাবারী, ৫খ, page ৩৫৪; ইবন কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম, ১খ, page ৩৬০)।
কাহারো মতে বায়তুল মুকাদ্দাসে কোন মানুষ মানতের ছেলে লইয়া আসিলে সেইখানে বসিয়া যাহারা তাওরাত লিখিতেন তাহারা লটারীর মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতেন যে, কে তাঁহাকে গ্রহণ করিবেন এবং বিদ্যা শিক্ষা দিবেন। এইভাবেই যাকারিয়‍্যা (আ) মারয়াম (রা)-এর দায়িত্ব গ্রহণ করিয়াছিলেন (দ্র. তাফসীরে তাবারী, প্রাগুক্ত)।
ইবন কাছীর বলেন, আল্লাহ পাক হযরত যাকারিয়‍্যা (আ)-কে মারয়াম (আ)-এর তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করিবার ফয়সালা করিয়াছিলেন তাঁহার মঙ্গলার্থেই, যাহাতে মারয়াম যাকারিয়‍্যার অগাধ 'ইলম ও 'আমলে সালিহ (নেককাজ) আয়ত্ত করিতে পারেন (ইবন কাছীর, প্রাগুক্ত)। আর এইভাবে তিনি এক দিকে মসজিদের পবিত্র পরিবেশ, অন্যদিকে নবী যাকারিয়া (আ)-এর নবুওয়াতী তরবিয়াতে লালিত-পালিত হইতে থাকিলেন।
কোন কোন বর্ণনায় পাওয়া যায়, তিনি হায়কালের খিদমতে কিছু কাজও করিতেন এবং নিজের প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদিও সংগ্রহ করিতেন। যেমন ইবন জারীর তাবারীর এক বর্ণনায় রহিয়াছে, হযরত মারয়াম (আ) যে, ইবাদতখানাতে থাকিতেন তাঁহার সাথে সেই ইবাদতখানায় আরো একটি বালক থাকিত, যাহার নাম ছিল ইউসুফ। তাহার মাতা-পিতাও তাহাকে ইবাদতখানার জন্য মানত করিয়াছিল। তাহারা উভয়ে সেইখানেই বসবাস করিতেন। তাহারা উভয়ে পানি আনার জন্য মাঠে যাইতেন এবং সেখান হইতে কলসী ভর্তি সুস্বাদু পানি লইয়া আসিতেন (দ্র. তাফসীরে তাবারী, ৫খ, ৩৮৪)।
এই বর্ণনাটি ইবন ইসহাকের নিজস্ব। তিনি কোন্ উৎস হইতে ইহা গ্রহণ করিয়াছেন তাহা বলেন নাই। তাই এই বর্ণনায় সংশয়ের ঊর্ধ্বে নহে। কেহ কেহ ইহাকে ইসরাঈলীদের কল্পকাহিনীর আওতাভুক্ত মনে করেন। বিশেষত যেহেতু মারয়াম (আ)-এর লালন-পালন সুরক্ষিত অবস্থায় সম্পন্ন হইতেছিল সেই দৃষ্টিকোণ হইতে পানি আনিবার জন্য দূরে মাঠে গমন করা সঙ্গতিপূর্ণ নহে। আল্লাহই অধিক জ্ঞাত।
বায়তুল মুকাদ্দাসের পবিত্র অঙ্গনে হযরত যাকারিয়‍্যা (আ)-এর তত্ত্বাবধানে তাঁহার ভরণ-পোষণ, শিক্ষা-দীক্ষার কাজ অত্যন্ত সুচারুরূপে সম্পন্ন হইতেছিল। কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে: أَنْبَتَهَا نَبَاتًا حَسَنًا . "আর তাহাকে সুন্দরভাবে বাড়াইয়া তুলিলেন" (৩:৩৭)।
হযরত ইবন আব্বাস (রা) এই আয়াতের তাফসীরে বলেন, প্রভু তাঁহাকে তাঁহার ইরাদত ও আনুগত্যের উপর উত্তম তরবিয়াত প্রদান করিলেন (আলুসী, প্রাগুক্ত, ৩খ, ১৩৯)। আল্লামা আলুসী বলেন, অত্র আয়াতে তাঁহার তরবিয়াতের বিষয়টিকে রূপকার্থে উপস্থাপন করা হইয়াছে। কৃষক যেইভাবে প্রয়োজনে পানি সেচন করিয়া কৃষিক্ষেত্রের পরিচর্যা করে, বিভিন্ন আপদ হইতে রক্ষা করে, তাহার ফসলের জন্য ক্ষতিকর অন্য উদ্ভিদ সমূলে উপড়াইয়া ফেলে, তেমনি শস্যক্ষেত্রের মত তাঁহাকে পরিচর্যা করা হয় (প্রাগুক্ত)।
আল্লামা যামাখশারীও এই আয়াতের তফসীরে অনুরূপ কথা বলিয়াছেন (যামাখশারী, আল-কাশ্শাফ, বৈরুত, দারুল মা'রিফা, তা.বি., ১খ, ১৮৭)। অর্থাৎ দৈহিক গঠন বিন্যাস, আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ ও বিকাশ, চারিত্রিক পরিশুদ্ধতা ও মাধুর্য, ইবাদতে নিবিষ্টতা ও নিষ্ঠা, জ্ঞান-গরিমায় ও পাণ্ডিত্যে তথা সকল দিক দিয়া তাঁহাকে গড়িয়া তুলিবার জন্য আল্লাহ পাক উন্নত পরিচর্যার ব্যবস্থা করিয়া দিয়াছিলেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00