📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে হযরত মারয়াম (আ)

📄 বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে হযরত মারয়াম (আ)


আল-কুরআনে মারয়াম (مریم) শব্দটি যে ৩৪ বার উল্লিখিত হইয়াছে তন্মধ্যে আলাদাভাবে ১১ বার আসিয়াছে। ঈসা ইবন মারয়াম বলিয়া ১৩ বার, মাসীহ ইব্‌ন মারয়াম বলিয়া ৫ বার, মাসীহ ঈসা ইবন মারয়াম বলিয়া ৩ বার এবং শুধু ইব্‌ন মারয়াম বলিয়া ২ বার উল্লেখ করা হইয়াছে। আল-কুরআনে নিম্নবর্ণিত আয়াতসমূহে তাঁহার প্রসঙ্গে আলোচনা আসিয়াছে:
সূরার নাম আয়াত নং সূরা আল-ইমরান : ৩৩-৩৭, ৪২-৪৭ সূরা নিসা ১৫৬, ১৭১ সূরা মাইদা ১৭, ৭৩-৭৫, ১১০, ১১৬ সূরা মারয়াম ১৬-৩৭ সূরা মুমিনুন ৫০ সূরা তাহরীম ১২
উপরিউক্ত স্থানসমূহে হযরত মারয়াম (আ)-এর বংশ, জন্ম-বৃত্তান্ত, লালন-পালন, মজিদে আকসায় অবস্থান ও পবিত্র পরিবেশে ইবাদত-বন্দেগী, আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত হওয়া, ঈসা (আ)-কে আলৌকিকভাবে গর্ভে ধারণ ইত্যাদি বিষয়ের আলোচনা স্থান পাইয়াছে। আল কুরআনে হযরত মারয়াম (আ)-এর বিশেষ মর্যাদার উল্লেখ রহিয়াছে। একটি সূরার নামকরণ করা হইয়াছে সূরা মারয়াম। এই সূরা এবং সূরা আল-ইমরানেই তাঁহার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা রহিয়াছে।
হাদীছ গ্রন্থাবলীতেও তাঁহার জন্মকালীন অবস্থা ও চারিত্রিক শূচিতা এবং নারী সমাজে, দুনিয়া ও আখেরাতে তাঁহার মর্যাদার কথা বিবৃত হইয়াছে।
বাইবেলের নিউ টেস্টামেন্টের সুসমাচার ও পত্রাবলীতে মারয়াম সম্পর্কে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু কিছু তথ্য পরিবেশন করা হইয়াছে। পাশ্চাত্যের পণ্ডিতবর্গের মধ্যে যাহারা হযরত মারয়ামের জীবনী লিখিয়াছেন বা গবেষণা করিয়াছেন তাহারা একমত যে, শুধুমাত্র ঐ সকল বাইবেলীয় উৎসের উপর নির্ভর করিয়া মারয়াম (আ)-এর জীবনী লেখা সম্ভব নহে (দ্র. Encyclopaedia Britannica, vol.14, Page 996; The New Encyclopaedia Britannica, vol. 11, Page 560)।
বাইবেলে তাঁহার জীবনী সম্পর্কে প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়— যোশেফ (ইউসুফ)-এর বাগদত্তা হিসাবে নাসেরা পল্লীতে তাঁহার অবস্থান এবং সেখানে জিবরাঈল ফেরেশতা কর্তৃক গর্ভ ধারণের সংবাদ সম্পর্কিত ঘটনাবলী ও যিহুদার এক নগরে গিয়া যাকারিয়‍্যা (আ)-এর স্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত ও নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তন (লুক, ১: ২৬-৫৬), অতঃপর ঈসা (আ)-কে প্রসব ও নাসেরায় প্রত্যাবর্তন (লুক, ২: ১-৩৯) ও মিসরে গমন, আশ্রয় গ্রহণ এবং হেরোদ রাজার মৃত্যুর পর প্রত্যাবর্তন (মথি, ২ : ১-২৩) ইত্যাদি আলোচনায়।
'ঈসা (আ)-এর বার বৎসর বয়সে তাঁহাকে লইয়া জেরুসালেমে ইয়াহুদীদের পাসওভার (Pasover) অনুষ্ঠানে যোগদান (লুক, ২:৪১-৫২), গালীলের কান্না নগরীর এক বিবাহ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ ও পুত্রের সাথে কিছু দিন কফর নাহুমে অবস্থান (যোহন, ২: ১-৬,১২), 'ঈসা (আ) কর্তৃক স্বীয় শিষ্যদের শিক্ষা দেওয়ার সময় তাঁহার সাক্ষাত লাভের আবেদন (মথি, ১২ঃ ৪৬-৫০; মার্ক, ৩:৩১-৩৫, লুক, ৮:১৯-২১), ঈসাকে ফাঁসিতে ঝুলানোর কথিত ঘটনার সময় উপস্থিতি (মথি, ২৭: ৫৬; মার্ক, ১৫: ৪৭ যোহন, ১৯: ২৬), 'ঈসা (আ)-এর কথিত সমাধির পার্শ্বে গমন (মথি, ২৭: ৬১, ২৮: ১; মার্ক, ১৫: ৪০), ঈসা (আ) উর্ধারোহণের সময় শেষ বিদায়ী সাক্ষাত (মার্ক, ১৬: ৯), 'ঈসা (আ)-এর ঊর্ধ্বারোহণের পর তাঁহার সঙ্গে ইবাদতে নিবিষ্ট থাকা (প্রেরিতদের কার্য বিবরণ, ১: ১৪)।
অতএব দেখা যাইতেছে যে, খৃস্টানদের চারটি সুসমাচারে হযরত মারয়াম (আ)-এর জীবনের বিভিন্ন ঘটনার বিচ্ছিন্নভাবে কিছু তথ্য রহিয়াছে। বিশেষত তাঁহার জন্ম, বংশ, পিতা-মাতা, লালন-পালন ও বায়তুল মাকদিসে অবস্থান সম্পর্কে চারিটি সুসমাচারে কিছুই উল্লেখ নাই।
তবে মাওলানা আবুল কালাম আযাদ উল্লেখ করিয়াছেন, "উনিশ শতকে পরিত্যক্ত বাইবেলের যে সংকলন ভ্যাটিকানের গ্রন্থাগারে পাওয়া গিয়াছে, তাহাতে হযরত মারয়ামের জন্মের এই বিলুপ্ত ঘটনার উল্লেখ আছে। ইহাতে মনে হয় যে, অন্তত চতুর্থ শতাব্দীর প্রথম ভাগ পর্যন্ত ঘটনার এই বিলুপ্ত অংশও কিতাবের অংশ বলিয়া বিশ্বাস করা হইত, যেইভাবে অবশিষ্ট অংশগুলিকে কিতাবের অংশ বলিয়া মনে করা হয় (মাওলানা আবুল কালাম আযাদ, তরজমানুল কুরআন, ৪খ, page ৫৮৮-৫৮৯)।
খৃস্টানদের ধর্মীয় গ্রন্থের অনেক কিছুই অবলুপ্ত। তাই বর্তমানে তাহাদের কাছে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এককভাবে নির্ভরশীল না হইয়া বিভিন্ন উৎসের সমন্বয়ে তাঁহার জীবন-বৃত্তান্তের মোটামুটি একটি আলেখ্য তুলিয়া ধরা যায়।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বংশ পরিচয়

📄 বংশ পরিচয়


ঐতিহাসিকগণ একমত যে, হযরত মারয়াম (আ)-এর পিতার নাম 'ইমরান ও মাতার নাম হান্না। আল কুরআনেও তাঁহাকে 'ইমরানের কন্যা বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছে (৬৬:১২)। বাইবেলে মারয়াম (আ)-এর পিতা-মাতার নাম উল্লেখ না থাকিলেও ইমরান (খৃস্টান কিংবদন্তিতে তাঁহার নাম ইওয়াখীম (Ioachim) এবং হান্না (Anna)-এর নাম পুরাতন বর্ণনায় পাওয়া যায় (দ্র Encyclopedia Americana, vol. 18. Page 345)।
যাহা হউক বনূ ইসরাঈলের মধ্যে হযরত 'ইমরান একজন একনিষ্ঠ ইবাদতগুযার ও সঠিক ব্যক্তি বলিয়া খ্যাত ছিলেন। এই কারণে তাহাদের নামাযে ইমামতির দায়িত্বও তাঁহার উপর ন্যস্ত ছিল। এমনকি বর্ণিত আছে যে, তিনি ইসরাঈলের পক্ষে কুরবানী পেশ করিতেন (দ্র.তাবারী, তাফসীর, বঙ্গানুবাদ, ইসলামিক ফাউণ্ডেশন বাংলাদেশ, ৫খ, ৩৫৫; আন্-নাসাফী, মাদারিকুত তানযীল, ১খ, ২১৬)।
তাহা ছাড়া, তাঁহার জীবদ্দশায় তিনি মসজিদে আকসার খাদিমদের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন (দরিয়াবাদী, তাফসীরে মাজেদী, বঙ্গানুবাদ, ২খ., ৬২)। এক বর্ণনায় দেখা যায়, তিনি বনু ইসরাঈলের হযরত হারুন (আ)-এর বংশধর ছিলেন। আল-কুরআনেও হযরত মারয়াম (আ)-কে উত্ত হাজ্বন (হারূনের বোন) বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে (১৯: ২৮)। এই মতটি ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত (ইবনুল জাওযী, যাদুল মাসীর, ৫খ, ২২৭)।
মুসলিম ঐতিহাসিক ও মুফাস্সিরগণ হযরত মারয়াম (আ)-এর পিতা 'ইমরানের এক বংশলতিকার উল্লেখ করিয়াছেন যাহা হযরত সুলায়মান ইব্‌ন দাউদ (আ) পর্যন্ত পৌঁছিয়াছে।
ইব্‌ন কাছীর ঐতিহাসিক মুহাম্মাদ ইব্‌ন ইসহাক ইব্‌ন য়াসার-এর বরাতে ইমরানের বংশলতিকা নিম্নরূপ বর্ণনা করেছেন এবং আত-তাবারী তাঁহার তাফসীর গ্রন্থে 'ইমরান ইব্‌ন বাশিম ইব্‌ন মীশা ইব্‌ন হিযকিয়া ইব্‌ন ইব্রাহীম ইব্‌ন গারায়া ইব্‌ন নাউশ ইব্‌ন আজার ইব্‌ন বাহ্ওয়া ইব্‌ন নাযিম ইব্‌ন মুকাসিত ইব্‌ন ঈশা ইব্‌ন ইয়ায ইব্‌ন রুখায়ইম ইব্‌ন সুলায়মান ইব্‌ন দাউদ (আ) (দ্র. তাফসীরে ইব্‌ন কাছীর, ১খ, page ৩৫৮)। তবে ইব্‌ন কাছীর আল-বিদায়াতে কিছু পার্থক্যসহ বংশলতিকা উল্লেখ করিয়াছেন।
উপরিউক্ত বর্ণনাগুলি পর্যালোচনা করিলে দেখা যাইবে, ইবন ইসহাকের প্রথম বর্ণনায় হযরত মারয়াম (আ)-এর পূর্বপুরুষের তালিকায় দাউদ (আ) পর্যন্ত ১৬ জন, দ্বিতীয় বর্ণনায় ১৮ জন, তাবারীর বর্ণনায় ১৭ জন এবং ইব্‌ন আসাকিরের বর্ণনায় ২৬ জন। তবে ইমরান যে দাউদের বংশধর ছিলেন এই ব্যাপারে কাহারো দ্বিমত নাই (দ্র. ইব্‌ন কাছীর, প্রাগুক্ত)।
মারয়াম (আ)-এর পূর্বপুরুষগণ বনু ইসরাঈলের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ছিলেন। মারয়াম (আ)-এর মাতাও বনূ ইসরাঈলের সম্ভ্রান্ত ধর্মীয় পরিবারের মহিলা ছিলেন। তিনি হান্না বিন্ত ফাকূদ বা ফাকৃয ইব্‌ন কাবীল (দ্র. তাফসীরে ইব্‌ন কাছীর, প্রাগুক্ত, page ৩৫৯, রূহুল মা'আনী, ৩খ, page ১৩৩)।
আল্লামা ইবনুল 'আরাবী উল্লেখ করেন, ইমরান ইব্‌ন মাছানের দুই কন্যা ছিল একজনের নাম হান্নাহ, অপরজনের নাম য়ানাম (ইবনুল আরাবী, আহকামুল কুরআন)। এই মতটি জমহূরের মতের বিপরীত ও অগ্রহণযোগ্য। কাহারো মতে যাকারিয়‍্যা (আ)-এর স্ত্রী ঈশায়া মায়ের দিক দিয়া হান্নার বোন আর বাপের দিক দিয়া মারয়ামের বোন। আল্লামা আলুসী এই মতটিকে দুর্বল বলিয়াছেন। সহীহ হাদীছে হযরত ঈসা (আ) ও হযরত ইয়াহইয়া (আ)-কে যে খালাতো ভাই বলা হইয়াছে তাহা আক্ষরিক অর্থে নহে, বরং রূপক অর্থে খালাতো বোনের ছেলেকেও খালাতো ভাই বলা যায়।
মহিউস সুন্নাহ বাগাবীর মতে ঈশায়া ও হান্নাহ ফাকুযের কন্যা ছিলেন (প্রাগুক্ত)। অনেক তাফসীরকার লিখিয়াছেন, সিরিয়ায় হান্নার নামে একটি প্রসিদ্ধ গীর্জা রহিয়াছে এবং দামিশক নগরীতে তাঁহার কবর রহিয়াছে (দ্র. কুরতুবী, প্রাগুক্ত, page ৬৫; তাফসীরে মাজেদী, ২খ, page ৪৮)। ইমরান ও তাঁহার স্ত্রী উচ্চ ও সম্ভ্রান্ত রাজকীয় বংশের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ইমরানের এই পরিবার-পরিজন সম্পর্কে আল-কুরআনেও প্রশংসা করা হইয়াছে। এমনকি তাঁহাদেরকে আল্লাহর মনোনীত বংশ হিসাবে উল্লেখ করা হইয়াছে। বলা হইয়াছে: إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَى آدَمَ وَنُوحًا وَآلَ إِبْرَاهِيمَ وَآلَ عِمْرَانَ عَلَى الْعَالَمِينَ "অবশ্যই আল্লাহ আদম, নূহ এবং ইবরাহীম-এর বংশধর ও ইমরানের বংশধরকে সমগ্র বিশ্ব জাহানে মনোনীত করিয়াছেন" (৩ঃ ৩৩)।
আয়াতে উল্লিখিত ইমরান দ্বারা মারয়ামের পিতাকেই বুঝানো হইয়াছে (দ্র. তাফসীরে ইব্‌ কাছীর, ১খ, page ৩৫৮)। আর ইহাই হাসান বাসরী ও ওয়াহবের মত, যাহাকে অধিকাংশ মুফাসসির গ্রহণ করিয়াছেন। কাহারো কাহারো মতে, ঐ আয়াতে ইমরান দ্বারা মূসা (আ)-এর পিতা 'ইমরান ইব্‌ন ইয়াসহারকে বুঝানো হইয়াছে। তাই আল 'ইমরান দ্বারা মূসা ও হারুন (আ) এবং তাঁহাদের বংশধরকে বুঝানো হইয়াছে। আর এই মতের প্রবক্তা মুকাতিল ইব্‌ন সুলায়মান (দ্র. ইবনুল জাওযী, যাদুল মাসীর, ১খ, page ৩৭৫; রূহুল মা'আনী, ৩খ, page ১৩১)। আল্লামা মারাগী আল 'ইমরান (৩: ৩৩) এবং ইমরা'আতু 'ইমরান (৩: ৩৫)-এ উল্লিখিত 'ইমরান ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। তাঁহার মতে, প্রথম ইমরান হযরত মূসা (আ)-এর পিতা এবং দ্বিতীয় ইমরান মারয়াম (আ)-এর পিতা। আর উভয়ের মধ্যে প্রায় ১৮০০ বৎসরের ব্যবধান (তাফসীরুল মারাগী, ৩খ, page ১৪৪)।
কিন্তু পূর্ববর্তী ও পরবর্তী যুগের অধিকাংশ মুফাস্সির-এর মতে উভয় আয়াতেই হযরত মারয়াম (আ)-এর পিতাকে বুঝানো হইয়াছে। আর ইহাই পূর্বাপর প্রসঙ্গের সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ :
(ক) উপরিউক্ত আয়াতে আল ইব্রাহীম বলিয়া নিকটতম ইশারায় মূসা (আ) ও হারূনের কথা আসিয়া গিয়াছে। তাই পুনরুক্তির প্রয়োজন নাই।
(খ) আল ইমরান উল্লেখের পরেই মারয়াম পিতা ইমরানের স্ত্রীর কথা আলোচনা করা হইয়াছে। ইহা হইতেই প্রতীয়মান হয় যে, তিনি মারয়াম (আ)-এর পিতা ছিলেন।
(গ) সূরা আল 'ইমরানে হযরত মারয়াম ও ঈসা (আ)-এর কথাই বেশী আলোচিত হইয়াছে। তাহাতে মূসা (আ)-এর প্রসঙ্গের উল্লেখ নাই।
সুতরাং প্রকৃত অবস্থা আল্লাহই জ্ঞাত। এইখানে উভয় ইমরানই উদ্দেশ্য হওয়ার সম্ভাবনা থাকিলেও আয়াতের পূর্বাপর সম্পর্ক, ঈসা (আ) ও তাঁহার মাতাকে কেন্দ্র করিয়া মানব সৃষ্টির বিশেষ কীর্তির প্রতি লক্ষ্য করিয়া বলা যায়, এইখানে মারয়ামের পিতা ইমরান গ্রহণ করাই অধিকতর যুক্তিসংগত (দ্র. আলুসী, রূহুল মা'আনী, প্রাগুক্ত, page ১৩১; তাফসীরে মাজেদী, ২খ, page ৪৭)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত মারয়াম (আ)-এর জন্মবৃত্তান্ত

📄 হযরত মারয়াম (আ)-এর জন্মবৃত্তান্ত


হযরত মারয়াম (আ)-এর জন্মের এক বিশেষ পটভূমি রহিয়াছে। (ক) জন্মের পটভূমি : হযরত ইমরান (আ)-এর স্ত্রী হান্না বিন্ত ফাকৃদা বন্ধ্যা ছিলেন। আর এইভাবেই তিনি বার্ধক্যে উপনীত হন। বর্ণিত আছে যে, বৃদ্ধাবস্থায় তিনি একবার বাড়ির আংগিনায় পায়চারি করিতে ছিলেন। এমন সময় দেখিতে পাইলেন, একটি পাখি নিজের বাচ্চাকে আদর-সোহাগ করিতেছে (হিফযুর রহমান সিউহারবী, কাসাসুল কুরআন, বঙ্গানুবাদ মাওলানা মুহাম্মদ মূসা ৪খ, page ৬)। অপর এক প্রসিদ্ধ বর্ণনায় আছে, হান্না তখন একটি গাছের ছায়ায় বসা ছিলেন। এই সময় হঠাৎ তাঁহার চোখে পড়িল, একটি পাখি তাহার ছানাকে আহার করাইতেছে। ইহা অবলোকনে তাঁহার নারী মন সন্তানের জন্য ব্যাকুল হইয়া উঠে। তিনি ছিলেন অত্যন্ত আল্লাহ- ভক্ত ও পরহেযগার মহিলা। তখন তিনি আল্লাহর কাছে দু'আ করিলেন যে, তাঁহাকে যদি একটি সন্তান দান করা হয় তবে তিনি তাহাকে বায়তুল মুকাদ্দাসের খেদমতের জন্য উৎসর্গ করিয়া দিবেন। ইব্‌ন জরীর তাবারী স্বীয় তাফসীরে ইকরিমা ও. মুহাম্মদ ইবন ইসহাকের সূত্রে ঐরূপ একটি বর্ণনা উল্লেখ করিয়াছেন (দ্র.তাফসীরে তাবারী, ৫খ, page ৩৪৩, ৩৪৫) আল্লামা ইন্ন কাছীর ও মুহাম্মদ ইবন ইসহাক প্রমুখ হইতে সেই রূপ বর্ণনা বিবৃত করিয়াছেন (দ্র. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ, page ৫২)।
উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, হযরত মারয়াম (আ)-এর জন্মের উপলক্ষ ছিল তাঁহার পুণ্যবতী মায়ের দু'আ। আল্লাহ্ পাক তাঁহার দু'আ কবুল করিয়াছিলেন।
(খ) হযরত মারয়াম (আ)-এর মাতা যখন অনুভব করিতে পারিলেন যে, তিনি সন্তান সম্ভবা তখন এই অনুভূতি তাঁহাকে এতই আন্দোলিত করিল যে, তিনি আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করিয়া ঘোষণাই দিয়া দিলেন যে, তাঁহার গর্ভের সন্তানকে তিনি হায়কালে সুলায়মানী তথা বায়তুল মুকাদ্দাসের খেদমতে উৎসর্গ করিয়া দিবেন। আল-কুরআনে উল্লিখিত হইয়াছে: إِذْ قَالَتِ امْرَأَتُ عِمْرَانَ رَبِّ إِنِّي نَذَرْتُ لَكَ مَا فِي بَطْنِي مُحَرِّرًا فَتَقَبَّلْ مِنِّي إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ . "স্মরণ করুন যখন ইমরানের স্ত্রী বলিয়াছিল, হে আমার প্রভু! আমার গর্ভে যাহা আছে তাহা একান্ত আপনার জন্য আমি উৎসর্গ করিলাম। সুতরাং আপনি আমার নিকট হইতে তাহা কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ" (৩ঃ ৩৫)।
উল্লেখ্য, তৎকালীন ইয়াহুদী সম্প্রদায়ের মধ্যে হায়কালে সুলায়মানীর খিদমতের জন্য সন্তান মানত করিবার প্রথা প্রচলিত ছিল (ইব্‌ন কাছীর, প্রাগুক্ত)। তাহারা মসজিদের খিদমত ও ইবাদাতেই নিয়োজিত থাকিত। পিতামাতার খিদমত বা বৈষয়িক কোন কাজে তাহাদেরকে নিয়োজিত করা হইত না। তাহারা বিবাহ শাদী করিত না, একমাত্র আখেরাতের কাজেই মশগুল থাকিত। তাই পিতা-মাতার খিদমতের দায়িত্ব হইতে তাহাদিগকে বিমুক্ত (মুহাররার) করা হইত (দ্র. কুরতুবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, page ৬৭; আরো দ্র. আলুসী, প্রাগুক্ত, ৩খ, page ১৩৩; শায়খ ইসমাঈল হাক্কী, তাফসীরু রূহুল বায়ান, ২খ, page ২৬)।
তাফসীরে খাযিনে উল্লেখ করা হইয়াছে, এই মানতের জন্য হান্নার স্বামী তাঁহাকে ভর্ৎসনা করিয়াছিলেন এই বলিয়া যে, হায়! সর্বনাশ! তুমি ইহা কি করিলে? তুমি কি জানিতে না, যদি তোমার পেটে কন্যা সন্তান থাকে তবে সে ঐ কাজের জন্য উপযুক্ত হইবেনা? অতঃপর ঐ মানত রক্ষার ব্যাপারে তাহারা উভয়ে খুব চিন্তিত হইয়া পড়িলেন (আল-বাগদাদী, তাফসীরুল খাযিন, ১খ, page ২২৯)।
হাফেয ইব্‌ন আসাকির ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণনা করেন, হযরত হান্না স্বীয় স্বামীর ভর্ৎসনা শুনিয়াই আল্লাহর নিকট দু'আ করিয়াছিলেন: نَذَرْتُ لَكَ مَا فِي بَطْنِي مُحَرِّرًا فَتَقَبَّلْ مِنِّي . "হে প্রভু! আমার গর্ভে যাহা আছে তাহা একান্তভাবে আপনার জন্য উৎসর্গ করিলাম। আপনি আমার পক্ষ হইতে কবুল করুন" (৩: ৩৫)।
বস্তুত ইহা তাঁহার পুত্র সন্তান লাভেরই প্রার্থনা (রূহুল মা'আনী, ৩খ, page ১৩৩)। অধিকাংশ মুফাস্সির-এর মতে, হযরত মারয়াম (আ) মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায়ই তাঁহার পিতা ইনতিকাল করেন (দ্র. প্রাগুক্ত, তাফসীরে তাবারী, ৫খ, page ৩৪৩; আলুসী, রূহুল মা'আনী, ৩খ, page ১৩৬)।
যথাসময়ে হযরত হান্নার গর্ভে কন্যা সন্তানের জন্ম হয়, তিনি যাহার নাম রাখেন মারয়াম (আ)। এইখানে উল্লেখ্য যে, তিনি কখন ও কোথায় জন্মগ্রহণ করেন সে বিষয়ে ঐতিহাসিকগণের মধ্যে যথেষ্ট মতপার্থক্য রহিয়াছে। তবে যদি ধরিয়া লওয়া হয় যে, তাঁহার ১৩ বৎসর বয়সের সময় ঈসা (আ) জন্মগ্রহণ করেন, তাহা হইলে বলা যায়, তিনি খৃস্টপূর্ব ১৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন।
ইনসাইক্লোপিডিয়া অব এমেরিকানাতে হযরত মারয়ামের জন্মস্থান সম্পর্কে বিভিন্ন স্থানের উল্লেখ রহিয়াছে। কোনটিতে তাঁহার জন্মস্থান হিসাবে নাসেরা (Nazreth) জনপল্লী, কোনটিতে সেপোরিশ (Sepphoris) এবং অন্য আরেকটিতে জেরুসালেম (Jerusalem) শহরের নাম উল্লেখ করা হইয়াছে। তবে জেরুসালেম হওয়ার দিকটিই অধিক যুক্তিযুক্ত (Encyclopedia Americana, vol. 14., Page 345H)।
জন্মোত্তর কালে তাঁহার মায়ের আক্ষেপ ও দু'আ : হযরত মারয়াম (আ) জন্মগ্রহণ করিবার পর তাঁহার মাতা যেই অনুভূতি ব্যক্ত করিয়াছিলেন তাহাতে তাঁহার আফসোস-এর সুর প্রতিধ্বনিত হইয়াছে, (দ্র. ইসমাঈল হাক্বী, প্রাগুক্ত, ৩খ, page ২৭), যাহার ইশারা আল-কুরআনেও আসিয়াছে নিম্নোক্তভাবে: فَلَمَّا وَضَعَتْهَا قَالَتْ رَبِّ إِنِّي وَضَعْتُهَا أُنْثَى . "তারপর সে যখন সন্তান প্রসব করিল তখন বলিল, হে আমার প্রভু! আমি তো কন্যা সন্তান প্রসব করিয়াছি" (৩: ৩৬)।
এই মেয়ে তোমার ইবাদতগাহের খেদমত কিভাবে সম্পন্ন করিবে (দ্র. তাফসীরে মাজেদী, ২খ, page ৪৯)। হযরত মারয়ামের মাতা অত্যন্ত বিনয় ও নম্রতা সহকারে মহান আল্লাহর দরবারে মুনাজাত করিতেছিলেন যে, তাঁহার মানত ছেলে সন্তানের লক্ষ্যেই ছিল, যাহাতে সে সুচারুরূপে হায়কালে সুলায়মানীর খেদমত করিতে পারে। কিন্তু মানতের পর তাহা কন্যা সন্তান হওয়ায় তাহাকে দিয়া মানত পুরা করা তো সম্ভব হইবে না। কন্যা সন্তান তো ঋতুবতী অবস্থায় মসজিদে অবস্থান করিতে পারিবে না। তাহা ছাড়া পুরুষের সঙ্গে কন্যা সন্তানের সহ-অবস্থান শোভনীয় হইবে না। সমাজে মহিলাদের দ্বারা গীর্জার খেদমতের কোন ব্যবস্থাও প্রবর্তিত ছিল না (তাফসীরে মাজেদী, প্রাগুক্ত)।
মোটকথা, উপরিউক্ত কারণে তাঁহার মাতা কিছুটা আক্ষেপের সুরেই স্বীয় অনুভূতি প্রকাশ করিলেন (দ্র. শাওকানী, ফাতহুল কাদীর, ১খ, page ৩৩৪)। কুরআন কারীমে বলা হইয়াছে: وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا وَضَعَتْ وَلَيْسَ الذَّكَرُ كَالْأُنْثَى . "সে যাহা প্রসব করিয়াছে, আল্লাহ তাহা সম্যক অবগত। ছেলে তো মেয়ের মত নহে" (৩ঃ৩৬)।
আল-কুরআনের এই বক্তব্যটি আল্লাহ পাকের উক্তি হিসাবে ধরা যায়। কিন্তু وضعت শব্দে কোন কোন কিরাআত-এ "পেশ" ধরা হয়, যাহাতে অর্থ হয় "আমি যাহা প্রসব করিয়াছি তাহা সম্পর্কে আল্লাহই সম্যক জ্ঞাত” (তাফসীর তাবারী, ৫খ, page ৩৪৬)। এই কিরাআত দ্বারা বুঝা যায় ইহা তাহার উক্তি। কেহ কেহ পরবর্তী বাক্যটি وَلَيْسَ الذكرُ كَالْأَنْثَى মারয়ামের মায়ের হওয়ার বিষয়টি অধিক গ্রহণযোগ্য বলিয়া মত প্রকাশ করিয়াছেন। কিন্তু অধিকাংশের মতে ইহা আল্লাহর উক্তি। "ছেলে তো মেয়ের মত নহে” ইব্‌ন আমির প্রমুখের কিরাআত হিসাবে ইহাও হান্নার উক্তি। অর্থাৎ বায়তুল মুকাদ্দাসের সেবায় এই সন্তান উৎসর্গের উপযুক্ত না হওয়ার কারণ পুত্র সন্তান শক্তি-সামর্থ্যের কারণে গীর্জার সেবায় কন্যা সন্তানের মত দুর্বল নহে। তাহার পর্দাজনিত কোন বাধা আর রজঃ-ও প্রসব-জনিত স্রাবের অসুবিধা ইত্যাদিও নাই।
ইহা আল্লাহর উক্তিও হইতে পারে। সেই হিসাবে ইহার অর্থ হইবে, তুমি যে পুত্র কামনা করিয়াছিলে তাহা তো এই কন্যার মত নহে, বরং এ কন্যা তো তদপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর। বাক্যের গঠন প্রণালীর দিকে লক্ষ্য করিলে শেষোক্ত অর্থই বেশী যুক্তিযুক্ত বলিয়া প্রতীয়মান হয়। ইহা হান্নার উক্তি হইলে বাক্যটি وليست الأنثى كالذكر 'কন্যা তো পুত্রের মত নহে' হইত (তাফসীর মাযহারী, ২খ., page ২৭২)। যাহাই হউক হযরত হান্নার নিজের পক্ষ হইতে অথবা ইলহামের মাধ্যমে জ্ঞাত হইয়া সান্ত্বনা লাভ করিয়া ও উক্ত কন্যা সন্তানের মর্যাদার ইঙ্গিত পাইয়া তাহার ভবিষ্যত জীবন পূত পবিত্র হইবার জন্য দু'আ করিলেন। হযরত মারয়াম (আ)-এর মাতা মারয়ামের জন্য এইভাবে দু'আ করিয়াছিলেনঃ وَإِنِّي أُعِيدُهَا بِكَ وَذُرِّيَّتُهَا مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّحِيمِ. "আর অবশ্যই আমি তাহার ও তাহার বংশধরদের অভিশপ্ত শয়তান হইতে রক্ষা করিবার জন্য তোমার আশ্রয়ে সোপর্দ করিয়া দিতেছি"।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। মহানবী (স) বলিয়াছেন: "যে কোন শিশুর জন্ম হয়, শয়তান নিজে তাহাকে স্পর্শ করে, শুধুমাত্র মারয়াম ও তাহার পুত্র (ঈসা) ইহার ব্যতিক্রম", (সহীহ বুখারী, কিতাবুত তাফসীর, কিরমানীর ভাষ্যসহ, ১৭খ., page ৫০)।
- ইমাম তাবারী স্বীয় তাফসীরে কাতাদার সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, প্রত্যেক আদম সন্তানকে শয়তান তাহার পার্শ্বদেশ স্পশ করে, কিন্তু হযরত ঈসা ইবন মারয়াম (আ) ও তাঁহার মাতাকে স্পর্শ করিতে পারে নাই। তাঁহাদের ও শয়তানের মধ্যে একটি পর্দা বা আড়াল সৃষ্টি করা হইয়ছিল। তখন সে পর্দায় স্পর্শ করিয়াছিল, কিন্তু তাঁহাদের কাছে শয়তানের স্পর্শ পৌঁছিতে পারে নাই” (দ্র. তাফসীরে তাবারী, ৩খ., page ১৬১৮৯)।
ইহা দ্বারা বুঝা যায় যে, আল্লাহ পাক হযরত মারয়াম (আ)-এর মায়ের দু'আ পূর্ণরূপে কবুল করিয়াছিলেন। সেইজন্য তাঁহাদের শরীরে শয়তানের স্পর্শ লাগিতে দেন নাই, যাহা হইতে এমনকি অন্যান্য নবী ও ওলীগণও মুক্ত ছিলেন না (দ্র. কুরতবী, প্রাগুক্ত, ৪খ. page ৬৮)। রাসূলুল্লাহ (স)-ও শয়তানের স্পর্শ হইতে নিরাপদ ছিলেন (রূহুল মা'আনী, ৩খ, page ১৩৮)। কোন কোন বর্ণনায় আছে, হযরত ফাতিমা (রা)-ও তাঁহার সন্তান হাসান-হুসায়নের ব্যাপারেও মহানবী-এর ঐরূপ দু'আয় তাঁহারা শয়তান হইতে নিরাপদ ছিলেন (দ্র. তাফসীরে মাযহারী, ২খ. page ২৭৩)। কুরআন কারীমে হযরত মারয়াম (আ)-এর মায়ের দু'আ কবুল হওয়া এবং উত্তমভাবে পালিত হওয়ার কথা বিধৃত হইয়াছে এই আয়াতে:- فَتَقَبَّلُهَا رَبُّهَا بِقَبُولٍ حَسَنٍ وَأَنْبَتَهَا نَبَاتًا حَسَنًا . "অতঃপর তাহার প্রতিপালক তাহাকে উত্তমরূপ কবুল করিলেন এবং তাহাকে সুন্দরভাবে লালন-পালন করিলেন" (৩৪ঃ ৩৭)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মারয়াম (আ)-এর লালন-পালন

📄 মারয়াম (আ)-এর লালন-পালন


হযরত মারয়াম (আ) জন্মলাভের পর তাঁহার লালন-পালন, শিক্ষা-দীক্ষা ইত্যাদি বিষয়ে মূল দায়িত্ব পালন করেন তাঁহার খালু ও তৎকালীন নবী হযরত যাকারিয়া (আ)। তবে তিনি জন্মগ্রহণের পর বায়তুল মুকাদ্দাসে পেশের পূর্বে কত দিন মায়ের কাছে ছিলেন তাহা সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। এই সম্পর্কে মুসলিম ঐতিহাসিক ও মুফাস্সিরগণ বিভিন্ন রূপ তথ্য পরিবেশন করিয়াছেন:
১. ইবন কাছীর উল্লেখ করেন, অনেক মুফাসসির বর্ণনা করিয়াছেন যে, মারয়ামের মাতা যখন তাঁহাকে প্রসব করিলেন তখন তাঁহাকে একটি কাপড়ের টুকরায় আবৃত করিলেন। অতঃপর তাঁহাকে লইয়া মসজিদে আকসায় গেলেন এবং সেইখানে অবস্থানকারী আবেদগণের নিকট তাঁহাকে হাস্তস্তর করিলেন (ইবন কাছীর, বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., page ৫৭-৫৮)। ইবন জারীর তাবারীও কাতাদা, ইকরিমা ও সূদ্দী সূত্রে অনুরূপ বর্ণনা উদ্ধৃত করিয়াছেন (তাফসীরে তাবারী, ৫খ, page ৩৫৪-৩৫৫; কুরতুবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, page ৬৭)। ইবনুল আছীরও ঐকমত্য পোষণ করিয়াছেন (দ্র. আল-কামিল ফিত তারীখ, ১খ, page ২২৮)। হযরত হাসান বসরী (র) হইতে বর্ণিত যে, মারয়াম কখনো স্তন্য পান করেন নাই (দ্র. ইবনুল জাওযী, যাদুল মাসীর, ১খ, page ৩৮০; (আরো দ্র. রাযী, মাফাতীহুল গায়ব, ৮খ, page ২৮, ইসমাঈল হাক্বী, প্রাগুক্ত, page ২৯)। এই মর্মে মুকাতিল হইতে বর্ণিত আছে, মারয়ামের জন্য একজন ধাত্রী নিয়োগ করা হইয়াছিল। এইসব বর্ণনা হইতে প্রতীয়মান হয় যে, শিশুকাল হইতে তিনি মায়ের নিকট হইতে বিচ্ছিন্ন ছিলেন (ইবনুল জাওযী, প্রাগুক্ত)।
ইন জারীর তাবারী স্বীয় তাফসীরে মুহাম্মদ ইব্‌ন জাফর ইব্‌ন যুবায়র (র) হইতে এক বর্ণনায় উল্লেখ করেন, হযরত মারয়াম (আ)-এর মাতা ও পিতা মারা যাওয়ায় তাঁহার ইয়াতীম অবস্থায় হযরত যাকারিয়‍্যা (আ) তাঁহাকে লালন-পালন করেন (তাফসীরে তাবারী, ৫খ., page ৩৫৬)।
২. ইনসাইক্লোপিডিয়া এমেরিকানাতে উল্লিখিত আছে যে, ঈসা (আ)-এর জন্মের ৪০ দিন পর তাঁহাকে হায়কালে সুলায়মানীতে লইয়া বাওয়া হয়। আর ইহাই ইয়াহুদীদের রীতি (vol. 18, Page 345)। ইহা হইতে কেহ কেহ ধারণা করেন, জন্মের ৪০ দিন পর হযরত মারয়াম (আ)-কে তাঁহার মাতা মসজিদে আকসায় লইয়া গিয়াছিলেন।
৩. কাহারো কাহারো মতে দুধ ছাড়ানো অবস্থা অবধি হযরত মারয়াম (আ) তাঁহার মায়ের কাছেই লালিত-পালিত হইয়াছিলেন। আর সাধারণত দুধ ছাড়ানো হয় দুই কি আড়াই বৎসর কাল পরে। আল্লামা ইব্‌ন কাছীর এই মতটিকে প্রাধান্য দিয়াছেন। ইহার সপক্ষে দুইটি যুক্তি পেশ করা হয়ঃ
(এক) আল্লাহ পাক বলিয়াছেন, وَأَنْبَتَهَا نَبَاتًا حَسَنًا (তিনি তাহাকে সুন্দরভাবে বাড়াইয়া তুলিলেন)। ইহার পর বলিয়াছেন : وَكَفَّلَهَا زكريا (এবং যাকারিয়া তাহার লালন-পালনের দায়িত্ব বহন করিলেন)। এই আয়াতংশ দ্বারা ধারণা করা যায় যে, বাড়াইয়া তুলিবার পর যাকারিয়া (আ) লালন-পালনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
(দুই) পরবর্তী আয়াতাংশে উল্লেখ করা হয় যে, যাকারিয়া (আ) যখনই মারয়ামের ঘরে যাইতেন তখন খাদ্যবস্তু দেখিতে পাইতেন। আর ইহা প্রমাণ করে যে, মারয়াম তখন দুধ পান করা হাড়িয়া দিয়াছিলেন (দ্র. আর-রাযী, প্রাগুক্ত, page ২৯)। তিনি বলেন, আয়াতে উক্ত 'ওয়াও' অব্যয়টি "পরবর্তী” বুঝানোর জন্য নহে। হইতে পারে সব কয়টি ঘটনা একই সময়ে হইয়াছে অথবা খাদ্যবস্তু পাওয়ার ঘটনা ভরণ-পোষণের শেষ সময় কালের (প্রাগুক্ত)। ইমাম রাযীর মতে, দুধ ছাড়ানো পর্যন্ত নহে, বরং আরো শিশুকালে তাঁহাকে হস্তান্তর করা হয়। তিনি এই মত ব্যক্ত করিয়া ইহার বিপক্ষের যুক্তি খণ্ডন করিয়াছেন এবং বলিয়াছেন, ইহার সমর্থনে অনেক রিওয়ায়াত বিদ্যমান (দ্র. রাযী, প্রাগুক্ত, page ২৯)।
মাওলানা আবদুল মাজেদ দরিয়াবাদী স্বীয় তাফসীরে Hastings রচিত ডিকশনারী অব দ্য বাইবেল (৩খ., page ২৮৮) ও Budge রচিত Legends of Lady mary -এর বরাতে উল্লেখ করেন, "খৃষ্টীয় লিপি অনুসারে হযরত মারয়াম-কে তিন বৎসর বয়ঃক্রম কালে হায়কালে সুলায়মানীর সেবিকা হিসাবে গ্রহণ করা হয়। আর 'ইবাদতখানার সকল খাদেমই এই শিশুটিকে দেখিয়া খুবই আনন্দিত হয়” (তাফসীরে মাজেদী, ২খ., page ৫০)।
ইমাম আবু বকর জাসাসের মতে, ইবাদতে নিমগ্ন হওয়ার উপযুক্ত সময়েই মারয়ামকে হস্তান্তর করিবার মানত করা হইয়াছিল (দ্র. জাস্সাস, আহকামুল কুরআন, ২খ, page ১১)।
উপরিউক্ত মতামত পর্যালাচনায় দেখা যাইবে, ইব্‌ন কাছীরের দুধ ছাড়ানোর পর হস্তান্তরের মতটিই অধিক ভারসাম্যপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য। যদিও কোন কোন বর্ণনায় পাওয়া যায় তাঁহার মাতা শিশুকালেই, ইনতিকাল করেন, কিন্তু কখন ইনতিকাল করেন তাহা সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায় না। তাহা ছাড়া বর্ণিত আছে, ইয়াহূদী সমাজে ছোট শিশুদেরকেই মানত হিসাবে হায়কালে পেশ করা হইত। তাহারা বড় হওয়ার পর ইচ্ছা করিলে সেইখানে থাকিত অথবা চলিয়াও যাইতে পারিত (দ্র. তাফসীরে খাযেন, ১খ., page ২২৯)।
মারয়াম শিশু অবস্থায়েই কথা বলিতে পারিতেন। এই ধরনের একটি রিওয়ায়াত হযরত হাসান বসরী হইতে বর্ণিত আছে (ইবনুল জাওযী, প্রাগুক্ত, ১খ, page ৩৮০)। আরো বর্ণিত আছে যে, সাধারণ শিশু এক বৎসরে যতটুকু বৃদ্ধি পায়, হযরত মারয়াম (আ) এক দিনেই ততটুকু বৃদ্ধি পাইতেন (রাযী, প্রাগুক্ত, ৮খ., page ২৯; কুরতুবী, প্রাগুক্ত, ৪খ., page ৬৯)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00