📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সূর্যের উদয়াচলে যুলকারনায়ন

📄 সূর্যের উদয়াচলে যুলকারনায়ন


যুলকারনায়নের পূর্ব দিগন্ত সফর সম্বন্ধে আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে বলেন: ثُمَّ أَتْبَعَ سَبَبًا ، حَتَّى إِذَا بَلَغَ مَطْلِعَ الشَّمْسِ وَجَدَهَا تَطْلُعُ عَلَى قَوْمٍ نَجْعَلُ لَهُمْ مِنْ دُونِهَا سِطْرًا ، كَذَالِكَ وَقَدْ أَحَطْنَا بِمَا لَدَيْهِ خُبْراً .
"আবার সে এক পথ ধরিল। চলিতে চলিতে যখন সূর্যোদয় স্থলে পৌঁছিল তখন সে দেখিল, উহা এমন এক সম্প্রদায়ের উপর উদিত হইতেছে যাহাদের জন্য সূর্যতাপ হইতে কোন অন্তরাল আমি সৃষ্টি করি নাই। প্রকৃত ঘটনা ইহাই, তাহার নিকট যাহা কিছু ছিল আমি সম্যক অবগত আছি” (১৮: ৮৯-৯১)।
অতএব যুলকারনায়ন অস্ত্রশস্ত্র ও সেনাবাহিনীর বিরাট বহর সহকারে পূর্ব দিগন্তে পৌছিয়া দেখিতে পাইলেন, পংকিল জলাশয় ভেদ করিয়া সূর্য উদিত হইতেছে। সেইখানে তিনি এমন এক জাতিকে দেখিলেন যাহারা উলঙ্গ, হিংস্র ও উন্মুক্ত প্রান্তরে যাযাবরের ন্যায় বসবাস করিতেছে। তাহাদের কোন পোশাক-পরিচ্ছদ, গৃহ ও তাঁবু ছিল না। সেইখানকার মাটি গৃহ নির্মাণের জন্য উপযুক্ত নহে। তাহারা ছিল কাফির। যুলকারনায়ন তাহাদের সহিত এমন আচরণ করিলেন, যেমন পশ্চিম দিগন্তের লোকদের সহতি করিয়াছিলেন (কাশশাফ, ২, ৪৯৮; তাফসীর কুরতুবী, ১১-১২, ৫৩).
ইবন কাছীর বলেন: পশ্চিম প্রান্ত হইতে পূর্ব দিগন্তে যাওয়ার পথে যেইসব জাতির দেখা হইত তিনি তাহাদের তাওহীদের দাওয়াত দিতেন। যদি তাহারা দাওয়াত কবুল করিত তবে ভাল, অন্যথায় তিনি তাহাদের সহিত লড়াই করিতেন। আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছায় তাহারা পরাজিত হইলে যুলকারনায়ন বিজিতদের সম্পত্তি, গবাদি পশু ও কর্মচারী নিজের নিয়ন্ত্রণাধীন আনিয়া সম্মুখপানে অগ্রসর হইতেন। এইভাবে পথ চলিতে চলিতে তিনি সূর্যের উদয়াচলে পৌছিলেন। সেইখানে দেখা গেল এক বিরাট জনবসতি। গাছপালাবিহীন এই প্রান্তরে বসবাসকারী মানুষগুলি দিগম্বর ও জংলী। গায়ের বর্ণ লাল, আকারে খাটো। সামুদ্রিক মাছই ছিল তাহাদের প্রধান খাদ্য। হযরত হাসান বসরী (র) বলেন: এইসব মানুষ সূর্যোদয়ের সময় মাটির গর্তে অথবা পানির মধ্যে সুড়ঙ্গে চলিয়া যাইত, সূর্যোদয়ের পর মাটির গর্ত অথবা পানি হইতে উঠিয়া এইদিক সেইদিক ঘুরাঘুরি করিত। এইসব লোকের কান ছিল বড় বড় এবং তাহাদের সহিত একটি করিয়া বাচ্চা ও বিছানা থাকিত। ইবন জারীর তাবারী বলেন: এই এলাকায় কোন পাহাড়-পর্বত নাই। দূর অতীতে এক সময় একটি সেনাদল এইখানে আসিয়া হাযির হইলে স্থানীয় জনগণ তাহাদিগকে বলিল, সূর্যোদয়ের সময় তোমরা এইখানে থাকিও না। জবাবে তাহারা বলিল, আমরা আজ রাত্রির মধ্যেই এই এলাকা ত্যাগ করিব। কিন্তু বল ঐসব উজ্জ্বল হাড়ের স্তূপ কি করিয়া এইখানে আসিল? তাহারা জবাব দিল, কিছু কাল পূর্বে এইখানে একটি সেনাদল আসে, সূর্যোদয়ের সময় তাহারা অবস্থান করিয়াছিল, ফলে সব লোকেরই মৃত্যু ঘটে। এইসব হাড়গোড় তাহাদেরই (তাফসীরে তাবারী, ৮, ১৩; তাফসীরে ইবন কাছীর, ৩, ০৯)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দুই পর্বত প্রাচীরে যুলকারনায়ন

📄 দুই পর্বত প্রাচীরে যুলকারনায়ন


এই প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে বলেন:
ثُمَّ أَتْبَعَ سَبَبًا. حَتَّى إِذَا بَلَغَ بَيْنَ السَّدِّيْنِ وَجَدَ مِنْ دُونِهِمَا قَوْمًا ، لأَيَكَادُونَ يَفْقَهُونَ قَوْلًا، قَالُوا يَاذَا الْقَرْنَيْنِ إِنَّ يَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ مُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ فَهَلْ نَجْعَلُ لَكَ خَرْجًا عَلَى أَنْ تَجْعَلَ بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمْ سَدًا . قَالَ مَا مَكَّنَى فِيْهِ رَبِّي خَيْرٌ فَأَعِينُونِي بِقُوَّةٍ أَجْعَلْ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُمْ رَدْمًا ، أَتُونِي زُبَرَ الْحَدِيدِ حَتَّى إِذَا سَأَوَى بَيْنَ الصَّدَفَيْنِ قَالَ انْفُخُوا حَتَّى إِذَا جَعَلَهُ نَاراً . قَالَ أَتُونِي أَفْرِغْ عَلَيْهِ قطراً . فَمَا اسْطَاعُوا أَنْ يَظْهَرُوهُ وَمَا اسْتَطَاعُوا لَهُ نَقْبًا .
"আবার সে এক পথ ধরিল, চলিতে চলিতে সে যখন দুই পর্বত প্রাচীরের মধ্যবর্তী স্থলে পৌছিল তখন তথায় সে এক সম্প্রদায়কে পাইল যাহারা কোন কথা বুঝিবার মত ছিল না। উহারা বলিল, হে যুলকারনায়ন! ইয়াজুজ ও মাজুজ পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করিতেছে। আমরা কি আপনাকে খরচ দিব যে, আপনি আমাদের ও উহাদের মধ্যে এক প্রাচীর গড়িয়া দিবেন? সে বলিল, আমার প্রতিপালক আমাকে যে ক্ষমতা দিয়াছেন তাহাই উৎকৃষ্ট। সুতরাং তোমরা আমাকে শ্রম দ্বারা সাহায্য কর, আমি তোমাদের ও উহাদের মধ্যস্থলে এক মযবুত প্রাচীর গড়িয়া দিব। তোমরা আমার নিকট লৌহপিণ্ডসমূহ আনয়ন কর। অতঃপর মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থান পূর্ণ হইয়া যখন লৌহস্তূপ দুই পর্বতের সমান হইল তখন সে বলিল, তোমরা হাঁপরে দম দিতে থাক। যখন ইহা অগ্নিবৎ উত্তপ্ত হইল তখন সে বলিল, তোমরা গলিত তাম্র আনয়ন কর, আমি উহা ঢালিয়া দেই ইহার উপর। ইহার পর তাহারা (ইয়াজুজ ও মাজুজ) উহা অতিক্রম করিতে পারিল না এবং উহা ভেদও করিতে পারিল না" (১৮:৯২-৯৭)।
যুলকারনায়ন উত্তর দিকে যাত্রা করিয়া যেই দুই পর্বতের মধ্যবর্তী স্থানে পৌঁছিলেন তাহা ছিল আরমেনিয়া ও আযারবায়জানের সন্নিহিত মঙ্গোলীয় ভূখণ্ডের একেবারে শেষ প্রান্ত (বাহরুল মুহীত, ৬খ, পৃ. ১৬৩)। যুলকারনায়ন সেইখানে যেই জাতিগোষ্ঠীর দেখা পাইলেন তাহারা বিশেষ একটি ভাষায় কথা বলিত। ফলে তাহারা অন্য মানুষের ভাষা বুঝিতে পারিত না এবং অন্যরাও তাহাদের ভাষা বুঝিত না। আল্লামা যামাখশারী বলেন যে, তাহারা বোবার মত ইশারা-ইঙ্গিতে কথা বলিত (কাশশাফ, ২খ, পৃ. ৪৯৮)। কিন্তু আল্লাহ পাক প্রদত্ত শক্তিতে বলীয়ান হইয়া যুলকারনায়ন তাহাদের ভাষা ও বাকরীতি বুঝিতে পারয়াছিলেন। ইমাম বাগাবী বলেন, যুলকারনায়ন দোভাষীর মাধ্যমে তাহাদের সহিত কথোপকথন করেন (তাফসীরে বাগাবী, ৩খ, পৃ. ১৮০)।
স্থানীয় জনগণ পর্বতের মধ্যখানে একটি শক্ত দেওয়াল তৈয়ার করিয়া দিবার উদ্দেশ্যে যুলকারনায়নকে বিপুল পরিমাণ লৌহখণ্ড, লাকড়ি এবং কয়লা যোগাড় করিয়া দিল। যুলকারনায়ন নীচে লাকড়ি ইহার উপর লৌহপিণ্ড, লৌহের উপর কয়লা, কয়লার উপর লাকড়ি, লাকড়ির উপর লৌহ খণ্ড এইভাবে স্তরের উপর স্তর তৈয়ার করিয়া হুকুম দিলেন আগুন ধরাইয়া ফুঁক দিতে থাক। প্রজ্বলিত অগ্নিশিখার দহনে লৌহপিণ্ড যখন লোহিত অঙ্গারের বর্ণ ধারণ করিল তখন তিনি তাম্র আনিবার হুকুম দিলেন। জনগণ তাম্রখণ্ড আনিয়া দিলে তিনি তাম্র পিণ্ডগুলি জ্বলন্ত লৌহের উপর ঢালিয়া দিলেন। এইভাবে লৌহখণ্ড গলিত তাম্রের সংমিশ্রণে পর্বতশৃঙ্গ সম এক শক্তিশালী প্রাচীর রচিত হইয়া গেল। ইয়াজুজ-মাজুজ নামক দুর্ধর্ষ পার্বত্য জাতির পক্ষে এই সুকঠিন প্রাচীর অতিক্রম ও ভেদ করা অসম্ভব হইয়া গেল। ফলে তাহাদের ভীষণ অত্যাচার ও উৎপীড়ন হইতে পার্শ্ববতী এলাকার জনগণ রেহাই পাইল। মাওলানা আবদুল মাজেদ দরিয়াবাদী বলেন, যুলকারনায়নের সহিত প্রাচীর নির্মাণে পারদর্শী একদল বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ছিলেন (তাফসীর কুরতুবী, ৮খ, পৃ. ৬২; তাফসীর মাযহারী, ৭খ, পৃ. ২৬৭-৮; তাফসীর ইবন কাছীর, ৩খ, পৃ. ১০; তাফসীরে মাজেদী, পৃ. ৬২০-১)।
ইমাম বাগাবী লিখিয়াছেন, যুলকারনায়ন কর্তৃক নির্মিত প্রাচীরের দৈর্ঘ্য ১২০০ হাত, প্রস্থ ৫০ হাত এবং উচ্চতা ১০০ হাত (তাফসীর বাগাবী, ৩খ, পৃ. ১৮২)। প্রাচীর নির্মাণ সমাপ্ত হইবার পর যুলকারনায়ন আল্লাহ তা'আলার শোকার আদায় করেন এবং আল্লাহ্র ইচ্ছা অনুযায়ী এই প্রাচীর যে একদিন ধ্বংসপ্রাপ্ত হইবে তাহারও ইঙ্গিত দেন। কারণ আল্লাহ পাকের অস্তিত্ব ছাড়া দুনিয়ার কোন সৃষ্টি চিরস্থায়ী নয়। এই প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে বলা হইয়াছে:
قَالَ هَذَا رَحْمَةً مِّنْ رَبِّي فَإِذَا جَاءَ وَعْدُ رَبِّي جَعَلَهُ دَكَّاءَ وَكَانَ وَعْدُ رَبِّي حَقًّا .
"সে (যুলকারনায়ন) বলিল, ইহা আমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ। যখন আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হইবে তখন তিনি উহাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করিয়া দিবেন এবং আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি সত্য” (১৮:৯৮)।
এইখানে 'প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি' তিন অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে। (এক) যে কোন মুহূর্তে আল্লাহ তাআলা এই প্রাচীর বিধ্বস্ত করিয়া দিতে পারেন অথবা (দুই) কিয়ামতের দিনই আল্লাহ এই প্রাচীরকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করিয়া দিতে পারেন অথবা (তিন) ইয়াজুজ-মাজুজের আবির্ভাবের সময় ইহা ধ্বংস করিয়া দিতে পারেন (মাআরিফুল কুরআন, ৫খ, পৃ. ৬৪১-২; তাফহীমুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ৪৭)।
ঐতিহাসিক তাবারী, ইবন কাছীর ও ইয়াকৃত বর্ণনা করেন যে, ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমার ইবন খাত্তাব (রা) আযারবায়জান জয় করার পর ২২ হিজরী সালে সুরাকা ইবন আমরকে বাবুল আবওয়াবে (দারবান্দ) অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেন। সুরাকা (রা) মূল অভিযান পরিচালনার পূর্বে আবদুর রহমান ইবন রাবীআকে অগ্রবর্তী সেনাদলের প্রধান নিযুক্ত করিয়া তথায় প্রেরণ করেন। আবদুর রহমান যখন আর্মেনীয় অঞ্চলে পৌঁছেন তখন এলাকার শাসনকর্তা শহরবরায যুদ্ধ ছাড়াই আত্মসমর্পণ করেন। অতঃপর তিনি বাবুল আবওয়াব অভিমুখে যাত্রা করিবার প্রস্তুতি নিলেন। এই মুহূর্তে শহরবরায তাঁহাকে বলিলেন, আমি যুলকারনায়নের প্রাচীর পর্যবেক্ষণের জন্য একজন লোক পাঠাইয়াছিলাম। সে আপনাকে বিস্তারিত তথ্য দিতে পারিবে। অতঃপর লোকটিকে সেনাপতি আবদুর রহমানের নিকট হযির করা হইল সে প্রাচীরের এবং ইহার সন্নিহিত এলাকার মানুষের অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দান করে (তাবারী, ৩খ, পৃ. ২৩৫-২৩৯; আল-বিদায়া, ৭খ, পৃ. ১২২-১২৫; মু'জামুল বুলদান, বাবুল আবওয়াব অধ্যায়)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ইয়াজুজ-মাজুজ প্রসঙ্গ

📄 ইয়াজুজ-মাজুজ প্রসঙ্গ


ইয়াজুজ-মাজুজ মানব সম্প্রদায়ভুক্ত এবং ইয়াফিছ ইবন নূহ (আ)-এর বংশধর। ইউরোপীয় ভাষায় ইয়াজুজ Gog আর মাজুজ Magog নামে পরিচিত (কাসাসুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ১৮৪)। এশিয়ার উত্তরে তিব্বত-চীন হইয়া ককেশাস পর্বতমালার শেষপ্রান্ত পর্যন্ত তাহাদের অধিবাস। হিযকীলের সহীফা (অধ্যায়, ৩৮-৩৯) অনুযায়ী রাশিয়া ও মস্কোর অধিবাসিগণই হইতেছে ইয়াজুজ ও মাজুজ। ইসরাঈলী ইতিহাসবিদ ইউসিফুস ইয়াজুজ-মাজুজ বলিতে 'সিনমিনিঈন' জাতি-গোষ্ঠীকে বুঝাইয়াছেন, যাহারা কৃষ্ণ সাগরের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে বসবাস করে (তাফহীমূল কুরআন, ৩খ, পৃ. ৪৬)। খৃস্টপূর্ব ৬৫০ সালে ইহাদের একটি বিশাল বাহিনী পর্বত চূড়া হইতে নামিয়া ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় জনপদ লণ্ডভণ্ড করিয়া দেয় (কাসাসুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ১৯০)। ধর্মবিশ্বাসের দিক দিয়া তাহারা উদীয়মান সূর্য ও নীল আকাশের পূজারী। তবে তাহাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক লোক এমনও রহিয়াছে যাহারা আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাসী, কিন্তু রিসালাত ও আখিরাত সম্বন্ধে তাহাদের কোন ধারণা নাই (মুফতী মুহাম্মদ শফী, মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, পৃ. ৬৩৩)। তাহাদের মধ্যে মূল পার্বত্য অঞ্চলে যাহারা বাস করিত তাহারা ছিল বর্বর, অসভ্য, হিংস্র ও যালিম। কিন্তু যাহারা নৃতাত্ত্বিকভাবে একই জাতি-গোষ্ঠীভুক্ত হইয়াও সভ্যতার পরশে সমতলবাসীদের সহিত আধুনিক জীবন ধারায় অভ্যস্ত হইয়া গিয়াছে তাহারা এই নামের অন্তর্ভুক্ত নয়।
মোগল, তুর্কী, তাতার ও মঙ্গোলীয়রা হইতেছে ইয়াজুজ-মাজুজের অধস্তন পুরুষ। মঙ্গোলিয়া বা ককেশাসের ঐসব গোত্র যখন তাহাদের কেন্দ্রে থাকিত তখন তাহারা ইয়াজুজ-মাজুজ। ঐখান হইতে বাহির হইয়া শত শত বৎসর ব্যাপী সভ্য জগতে সমাজবদ্ধ জীবনে বসবাস করার পর তাহাদের হিংস্রতা ও বর্বরতা কিছুটা লোপ পায়। কেন্দ্রের সহিত তাহাদের আর যোগাযোগ থাকে নাই, এমনকি একে অপরের পরিচয় পর্যন্ত ভুলিয়া যায় (কাসাসুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ১৯৪)।
ইবনুল আছীর বলেন, ইয়াজুজ-মাজুজ তাতারীদের সমগোত্রীয় হইলেও শক্তি, নিপীড়ন ও অরাজকতা সৃষ্টির যোগ্যতা তাতারীদের তুলনায় ইয়াজুজ-মাজুজের বেশী (আল-কামিল, ১খ, পৃ. ৪৮)।
ইয়াজুজ-মাজুজের লুণ্ঠন ও ধ্বংসযজ্ঞের পরিধি এশিয়া ও ইউরোপের বিশাল এলাকাব্যাপী বিস্তৃত ছিল। তিব্বত ও চীন হইতে ককেশাসের পর্বতমালার পাদদেশ পর্যন্ত ছিল তাহাদের আক্রমণস্থল (মাআরিফুল কুরআন, পৃ. ৮২৪)।
ইমাম কুরতুবী বলেন, ইয়াজুজ-মাজুজের বাইশটি গোত্রের মধ্যে একুশটি গোত্রকে যুলকারনায়ন প্রাচীর দ্বারা আবদ্ধ করিয়া দিয়াছিলেন। যেই গোত্রটি প্রাচীরের বাহীরে রহিয়া গিয়াছে তাহারা হইল তুর্কী। এই তুর্কী-তাতারী ফিৎনা ষষ্ঠ হিজরীতে ইসলামী খিলাফতকে তছনছ করিয়া দেয়। চেঙ্গীয খানের আক্রমণে মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশ ধ্বংস হইয়া যায় এবং ১২৫৮ খ্রস্টাব্দে হালাকু খান সভ্যতার লীলাভূমি বাগদাদ বিধ্বস্ত করিয়া দেয়। বাগদাদের বিশ লক্ষ জনবসতির মধ্যে ষোল লক্ষ মোঙ্গলদের হস্তে প্রাণ হারায়। ইমাম কুরতুবীর মতে ইহারাই হইল ইয়াজুজ-মাজুজের অগ্রবর্তী সেনাদল; সরাসরি ইয়াজুজ-মাজুজ নহে। কারণ হযরত ঈসা (আ)-এর আবির্ভাবের পূর্বে ইয়াজুজ-মাজুজ আসিতে পারে না (আল-জামি লি-আহকামিল কুরআন, ১১খ, পৃ. ৫৮)।
আল্লামা আলুসী বাগদাদী তাতারীগণ যে ইয়াজুজ-মাজুজ তাহা স্বীকার করেন না, তবে তাতারী ফিৎনা ও ধ্বংসযজ্ঞকে ইয়াজুজ-মাজুজের বর্বরতা ও হিংস্রতার সমতুল্য বলিয়া মনে করেন (রূহুল মা'আনী, ১৬খ, পৃ. ৪৪) ।
ইয়াজুজ-মাজুজেরা দলবদ্ধভাবে পর্বত হইতে নামিয়া লোকালয়ে ঝাপাইয়া পড়ে এবং ধ্বংসলীলা চালায়। তাহাদের উৎপীড়ন ও বর্বরতা হইতে বাঁচিবার জন্য পৃথিবীর বহু জায়গায় বড় আকারের প্রাচীর নির্মিত হইয়াছে। যুলকারনায়ন ককেশাসের দুই পর্বতের মধ্যবর্তী স্থানে লৌহ ও তাম্রের গলিত প্রাচীর তৈয়ার করিবার পূর্বে ইয়াজুজ-মাজুজ, যাহারা সংখ্যায় ছিল প্রায় চার লক্ষ, লোকালয়ে আক্রমণ চালাইয়া গাছপালা ধ্বংস করিয়া দিত, ফসল ও তরকারী সাবাড় করিয়া ফেলিত, শুকনা দ্রব্য ও খাদ্যসামগ্রী লুণ্ঠন করিত। তাহাদের ধ্বংসযজ্ঞ হইতে শিশুরাও রেহাই পাইত না (তাফসীর মাযহারী, ৭খ, পৃ. ২৬৭-৮; তাফসীর ইবন কাছীর, ৩খ, পৃ. ১০)।
যুলকারনায়নের প্রাচীর নির্মিত হইবার ফলে ইয়াজুজ-মাজুজের সেইসব সম্প্রদায় ঐপারে আবদ্ধ হইয়া পড়িয়াছিল, কিয়ামত দিবসের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তাহারা সেইখানে আবদ্ধ থাকিবে। হযরত ঈসা (আ) অবতরণ করিয়া দাজ্জালকে যখন নিধন করিবেন, তখন ইয়াজুজ-মাজুজের আবির্ভাব ঘটিবে। যুলকারনায়নের প্রাচীর বিধ্বস্ত হইয়া সমতল ভূমির সমান হইয়া যাইবে। এই প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে বলা হইয়াছে:
حَتَّى إِذَا فُتِحَتْ يَأْجُوجُ وَمَأْجُوجُ وَهُمْ مِنْ كُلِّ حَدَبٍ يَنْسِلُوْنَ.
"যখন ইয়াজুজ-মাজুজকে মুক্তি দেওয়া হইবে, তাহারা প্রত্যেক উচ্চভূমি হইতে দ্রুত ছুটিয়া আসিবে" (২১: ৯৬)।
ইয়াজুজ-মাজুজ মুক্ত পঙ্গপালের মত একযোগে পার্বত্য এলাকা হইতে বাহির হইয়া দ্রুত গতিতে সমতল ভূমিতে ছড়াইয়া পড়িবে। নিষ্ঠুর অত্যাচার ও ভয়ানক নিপীড়ন চালাইয়া মানুষের রক্ত লইয়া তাহারা হোলি খেলিবে। তাহাদিগকে বাধা দেওয়ার শক্তি কাহারও থাকিবে না (তাফসীরে উছমানী, পৃ. ৪৩৯)।
হযরত ঈসা (আ) আল্লাহর হুকুমে মুসলমানদের সঙ্গে লইয়া তূর পর্বতে সুরক্ষিত কেল্লায় আশ্রয় লইবেন। এই বর্বর জাতি নিত্য ব্যবহার্য দ্রব্যসামগ্রী, আসবাবপত্র এবং নদীর পানি নিঃশেষ কিরয়া দিবে। তাহাদের আক্রমণ অভিযানে জনবসতি বিরান হইয়া যাইবে। অবশেষে হযরত ঈসা (আ)-এর দোআর বরকতে অত্যাচারী ইয়াজুজ-মাজুজের অগণিত লোক ধ্বংস হইয়া যাইবে। তাহাদের মৃতদেহের দুর্গন্ধে পৃথিবীতে বসবাস করা দুরূহ হইয়া পড়িবে। আল্লাহ পাক লাশগুলিকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করিবেন অথবা অদৃশ্য করিয়া দিবেন এবং বৃষ্টির মাধ্যমে সমগ্র ভূপৃষ্ঠকে ধৌত করিয়া পরিষ্কার করিয়া দিবেন (মাআরিফুল কুরআন, বাংলা, পৃ. ৮২৪)। অতঃপর চল্লিশ বৎসর পৃথিবীতে শান্তি, শৃঙ্খলা ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠিত থাকিবে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 যুলকারনায়নের প্রাচীর কোথায় অবস্থিত?

📄 যুলকারনায়নের প্রাচীর কোথায় অবস্থিত?


আব্বাসী খলীফা ওয়াছিক বিল্লাহ ২২৭-২৩৩ হিজরী সালে যুলকারনায়ন কর্তৃক নির্মিত প্রাচীর পৃথিবীর কোথায় অবস্থিত তাহা খুঁজিয়া বাহির করিবার জন্য সাল্লাম আত্-তরজমান-এর নেতৃত্বে ৫০ সদস্যের একটি সেনাদল প্রেরণ করেন। দুই বৎসরের বেশী সময় তাহারা দেশের পর দেশ সফর করিয়া অবশেষে উক্ত প্রাচীরের নিকট পৌঁছিতে সক্ষম হন, যাহা লৌহ ও তাম্র দিয়া নির্মিত। তাহারা দেখিতে পান যে, নিচে বিশাল আকারের দরজা রহিয়াছে এবং দরজাটি বড় বড় তালা দ্বারা আবদ্ধ। প্রাচীরটি অত্যধিক উচু, শত চেষ্টা করিয়াও উপরে উঠা সম্ভব নহে। উভয় দিক দিয়া বিশাল পর্বতশ্রেণী সমান্তরাল রেখায় বহুদূর চলিয়া গিয়াছে। প্রাচীরের সন্ধান পাইতে তাহাদের দুই বৎসর সময় লাগিয়াছিল (ফখরুদ্দীন রাযী, তাফসীর কাবীর, ৫খ, পৃ. ৫১৩; তাফসীর ইবন কাছীর, ৩খ, পৃ. ১১)।
ইবন খালদুন যুলকারনায়নের প্রাচীর এবং ইহার অবস্থান স্থল সম্পর্কে ভৌগোলিক ব্যাখ্যা প্রদান করিয়াছেন: সপ্তম ভূখণ্ডের নবম অংশে পশ্চিম দিকে তুর্কীদের কানজাক ও চর্কস নামে অভিহিত গোত্রসমূহ বসবাস করে এবং পূর্ব দিকে ইয়াজুজ-মাজুজের বসতি বিদ্যমান। তাহাদের উভয়ের মধ্যস্থলে ককেশাস পর্বতমালা অবস্থিত। এই পর্বতমালা চতুর্থ ভূখণ্ডের পূর্ব দিকে অবস্থিত, ভূমধ্য সাগর হইতে শুরু হইয়া এই ভূখণ্ডেরই শেষ উত্তর প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। ইহার পর ভূমধ্য সাগর হইতে পৃথক হইয়া উত্তর-পশ্চিম দিকে বিস্তৃত হইয়া পশ্চিম খণ্ডের নবম অংশে প্রবেশ করিয়াছে। এই জায়গা হইতে তাহা আবার প্রথম দিকে মোড় লইয়াছে এবং সপ্তম ভূখণ্ডের নবম অংশে প্রবেশ করিয়াছে। এইখানে পৌঁছিয়া তাহা দক্ষিণ হইতে উত্তর-পশ্চিম দিকে চলিয়া গিয়াছে। এই পর্বতমালার মধ্যস্থলে সিকান্দারী প্রাচীর অবস্থিত যাহার সংবাদ পবিত্র কুরআন প্রদান করিয়াছে (ইবন খালদুন, মুকাদ্দিমা, পৃ. ৭৯; মা'আরিফুল কুরআন, সংক্ষিপ্ত বাংলা, পৃ. ৮২৬)।
আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মিরী (র) যুলকারনায়নের প্রাচীরের অবস্থানস্থল সম্পর্কে মন্তব্য করেন যে, দুষ্কৃতকারী ও বর্বর মানুষদের লুণ্ঠন হইতে আত্মরক্ষার জন্য পৃথিবীতে একটি নহে বরং বহু প্রাচীর নির্মাণ করা হইয়াছে। এইগুলি বিভিন্ন রাজা-বাদশাহ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে নির্মাণ করিয়াছেন। তন্মধ্যে সর্ববৃহৎ ও সর্বপ্রসিদ্ধ হইতেছে চীনের প্রাচীর। আবু হায়্যান আন্দালুসীর মতে ইহার দৈর্ঘ্য প্রায় ১২০০ মাইল এবং নির্মাতা হইতেছেন চীন সম্রাট ফাগফুর। হযরত আদম (আ) পৃথিবীতে অবতরণের ৩,৪৬০ বৎসর পর চীনের প্রাচীর নির্মিত হয়। এই প্রাচীরকে মোগলরা 'আনকুদাহ' ও তুর্কীরা 'বুরকুরকা' বলিয়া অভিহিত করিয়া থাকে। এমনি ধরনের আরও কয়েকটি প্রাচীর অনারব বাদশাহগণ নির্মাণ করিয়াছিলেন, যেইগুলি উত্তর দিকে অবস্থিত (আকীদাতুল ইসলাম ফী হায়াতি ঈসা আলায়হিস সালাম, পৃ. ১৯৮)।
হিফযুর রহমান সিউহারবী এই প্রসঙ্গে বলেন, ইয়াজুজ-মাজুজের লুণ্ঠন ও ধ্বংসযজ্ঞের পরিধি বিশাল এলাকা ব্যাপী বিস্তৃত ছিল। একদিকে ককেশিয়ার পাদদেশে বসবাসকরীরা এবং তিব্বত ও চীনের অধিবাসীরা ছিল তাহাদের সার্বক্ষণিক আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু। ইয়াজুজ-মাজুজের আগ্রাসন হইতে আত্মরক্ষার জন্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে প্রাচার নির্মিত হইয়াছে। তন্মধ্যে সর্ববৃহৎ ও প্রসিদ্ধ হইতেছে 'চীনের প্রাচীর' (কাসাসুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ১৯৫-৬)।
দ্বিতীয় প্রাচীর মধ্য এশিয়ার বুখারা ও তিরমিযের নিকটে অবস্থিত। ইহার অবস্থান স্থলের নাম 'দারবান্দ'। এই প্রাচীরটি খ্যাতনামা মোঙ্গল বীর তৈমুর লঙ-এর আমলে বিদ্যমান ছিল। রোমান সম্রাটের বিশেষ সভাসদ সীলা বরজর জার্মানী তাঁহার গ্রন্থে ইহার উল্লেখ করিয়াছেন। স্পেনের সম্রাট ক্যাহাইলের দূত ক্ল্যামসু তাহার ভ্রমণবৃত্তান্তে এই প্রাচীরের বর্ণনা দিয়াছেন। ১৪০৩ খৃস্টাব্দে যখন তিনি সম্রাটের দূত হিসাবে তৈমুর লঙ্গের দরবারে পৌঁছেন তখন এই স্থান অতিক্রম করেন। তিনি লিখিয়াছেন, বাবুল হাদীদের প্রাচীর মাওসিলের ঐ পথে অবস্থিত যাহা সমরকন্দ ও ভারতের মধ্যস্থলে বিদ্যমান (শায়খ তানতাভী, তাফসীর জাওহারী, ৯খ, পৃ. ১৯৮)।
তৃতীয় প্রাচীর: আবদুল মাজেদ দরিয়াবাদী মধ্য এশিয়ার পশ্চিম অংশে হাসার জেলায় আরেকটি দারবান্দের উল্লেখ করিয়াছেন। ইহা বুখারা হইতে ১৫০ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে, ৩৮ ডিগ্রী অক্ষাংশ ও ৬৭ ডিগ্রী দ্রাঘিমাংশে। ইউরোপীয় পরিব্রাজক মার্কো পোলো এই প্রাচীরের কথা তাঁহার ভ্রমণ কাহিনীতে উল্লেখ করিয়াছেন (তাফসীরে মাজেদী, পৃ. ৬২০)।
চতুর্থ প্রাচীর রাশিয়ার দাগিস্থানে অবস্থিত। ইহাও দারবান্দ ও বাবুল আবওয়াব নামে খ্যাত। দারবান্দ রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন দাগিস্তানের একটি শহরের নাম, যাহা কাস্পিয়ান সাগরের পশ্চিম তীরে অবস্থিত। ইহা তিন ডিগ্রী উত্তর অক্ষাংশ হইতে ৪৩ ডিগ্রী উত্তর অক্ষাংশ এবং ১৫ ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমা হইতে ৪৮ ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমা পর্যন্ত বিস্তৃত। ইহাকে 'দারবান্দ নওশেরওয়া' নামে অভিহিত করা হয়। তবে বাবুল আবওয়াব নামে ইহা বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ। প্রাচীন ইতিহাসবিদগণের মতে ইহার চার পার্শ্ব প্রাচীর দ্বারা সুরক্ষিত ছিল এবং ইহাকে 'আবওয়াবুল আলবানিয়া' ও 'বাবুল হাদীদ' বলা হইত। কারণ প্রাচীরে বড় বড় লৌহ ফটক রহিয়াছে (বুস্তানী, দাইরাতুল মা'আরিফ, ৭খ, পৃ. ৬৫১; ইয়াকৃত হামাবী, মু'জামুল বুলদান, ৮খ, পৃ. ৯)।
পঞ্চম প্রাচীর বাবুল আবওয়াব হইতে পশ্চিম দিকে ককেশিয়ার সুউচ্চ মালভূমিতে অবস্থিত। সেইখানে দুই পাহাড়ের মধ্যস্থলে দারিয়াল নামে প্রসিদ্ধ একটি গিরিপথ রহিয়াছে। এই পঞ্চম প্রাচীরটি কাক্কায় অথবা জাবালে কোফা অথবা কাফ্ পর্বতমালার প্রাচীর নামে খ্যাত। বুস্তানী এই সম্পর্কে বলেন, বাবুল আবওয়াব প্রাচীরের সন্নিকটে আরও একটি প্রাচীর রহিয়াছে যাহা পশ্চিম দিকে আগাইয়া গিয়াছে। সম্ভবত পারস্যবাসীরা উত্তরাঞ্চলীয় বর্বরদের হাত হইতে আত্মরক্ষার জন্য ইহা নির্মাণ করিয়াছিল। ইহার নির্মাতা সম্পর্কে সঠিক ও বিশুদ্ধ কোন বর্ণনা জানা যায় নাই। প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে কেহ কেহ আলেকজান্ডার, কেহ কেহ সম্রাট নওশেরওয়াঁর নাম উল্লেখ করিয়াছেন। ইয়াকৃত বলেন, গলিত তাম্র দ্বারা উহা নির্মিত (দাইরাতুল মা'আরিফ, ৭খ, পৃ. ৬৫২)।
হিফযুর রহমান সিউহারচী বলেন, এইসব প্রাচীর উত্তর দিকে অবস্থিত এবং প্রায় একই উদ্দেশ্যে নির্মিত। তাই এইগুলির মধ্যে যুলকারনায়নের প্রাচীর কোল্টিটি তাহা নির্ণয় করা কঠিন। শেষোক্ত দুইটি প্রাচীরের ব্যাপারে অধিক মতভিন্নতা দেখা দিয়াছে। কেননা উভয় স্থানের নাম দারবান্দ এবং উভয় স্থলে প্রাচীরও বিদ্যমান রহিয়াছে। উল্লিখিত পাঁচটি প্রাচীরের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে প্রাচীন হইতেছে চীনের প্রাচীর। ইহা যুলকারনায়নের প্রাচীর নহে, এই বিষয়ে সবাই একমত। ইহা উত্তর দিকে নহে, দূর প্রাচ্যে অবস্থিত। কুরআন পাকের ইঙ্গিত দ্বারা বুঝা যায় যে, যulkarনায়নের প্রাচীরটি উত্তর ভূখণ্ডে অবস্থিত। এখন উত্তর ভূখণ্ডে অবস্থিত তিনটি প্রাচীর সম্পর্কিত পর্যালোচনা বাকী রহিয়া গেল। তন্মধ্যে মাসউদী, ইস্তাখ্রী, হামাবী প্রমুখ ইতিহাসবিদ সাধারণভাবে সেই প্রাচীরকে যুলকারনায়নের প্রাচীর বলিয়া অভিহিত করেন যাহা দাগিস্তানে অথবা ককেশাস এলাকা বাবুল আবওয়াবের দারবান্দ নামক স্থানে কাস্পিয়ান সাগরের তীরে অবস্থিত। বুখারা ও তিরমিযের দারবান্দে অবস্থিত প্রাচীরকে যাহারা যুলকারনায়নের প্রাচীর বলিয়াছেন, তাঁহারা সম্ভবত দারবান্দ নামের কারণে বিভ্রান্ত হইয়াছেন। এখন যুলকারনায়নের প্রাচীরের অবস্থান প্রায় নির্দিষ্ট হইয়া গিয়াছে অর্থাৎ দুইটি প্রাচীরের মধ্যে যে কোন একটি হইতে পারে। (এক) দাগিস্তান ককেশাসের এলাকা বাবুল আবওয়াবের দারবান্দের প্রাচীর। (দুই) আরও উচ্চে কাফ্কায অথবা কাফ্ অথবা ককেশাস্ পর্বতমালায় অবস্থিত প্রাচীর। উভয় স্থানে প্রাচীরের অস্তিত্ব ইতিহাসবিদদের নিকট প্রমাণিত সত্য। উভয় প্রাচীরের মধ্যে ককেশাস পর্বতমালায় অবস্থিত দারিয়ালের দুই সুউচ্চ পর্বতের গিরিপথে লৌহ ও তাম্র নির্মিত প্রাচীরকে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত যুলকারনায়নের প্রাচীর বলিয়া ওয়াহব ইবন মুনাব্বিহ, আবু হায়্যান আন্দালুসী, আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মিরী, মাওলানা আবুল কালাম আযাদ প্রমুখ অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন (কাসাসুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ১৯৫-২০৭; মা'আরিফুল কুরআন, পৃ. ৮২৬-৭; Encyclopaedia Britannica, 11th ed, vol. xiii, P. 526; তরজমানুল কুরআন, ২খ, পৃ. ৪৬২-৪)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00