📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 যুলকারনায়নের

📄 যুলকারনায়নের


এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বিশ্ববিজয়

📄 বিশ্ববিজয়


এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সূর্যের উদয়াচলে যুলকারনায়ন

📄 সূর্যের উদয়াচলে যুলকারনায়ন


যুলকারনায়নের পূর্ব দিগন্ত সফর সম্বন্ধে আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে বলেন: ثُمَّ أَتْبَعَ سَبَبًا ، حَتَّى إِذَا بَلَغَ مَطْلِعَ الشَّمْسِ وَجَدَهَا تَطْلُعُ عَلَى قَوْمٍ نَجْعَلُ لَهُمْ مِنْ دُونِهَا سِطْرًا ، كَذَالِكَ وَقَدْ أَحَطْنَا بِمَا لَدَيْهِ خُبْراً .
"আবার সে এক পথ ধরিল। চলিতে চলিতে যখন সূর্যোদয় স্থলে পৌঁছিল তখন সে দেখিল, উহা এমন এক সম্প্রদায়ের উপর উদিত হইতেছে যাহাদের জন্য সূর্যতাপ হইতে কোন অন্তরাল আমি সৃষ্টি করি নাই। প্রকৃত ঘটনা ইহাই, তাহার নিকট যাহা কিছু ছিল আমি সম্যক অবগত আছি” (১৮: ৮৯-৯১)।
অতএব যুলকারনায়ন অস্ত্রশস্ত্র ও সেনাবাহিনীর বিরাট বহর সহকারে পূর্ব দিগন্তে পৌছিয়া দেখিতে পাইলেন, পংকিল জলাশয় ভেদ করিয়া সূর্য উদিত হইতেছে। সেইখানে তিনি এমন এক জাতিকে দেখিলেন যাহারা উলঙ্গ, হিংস্র ও উন্মুক্ত প্রান্তরে যাযাবরের ন্যায় বসবাস করিতেছে। তাহাদের কোন পোশাক-পরিচ্ছদ, গৃহ ও তাঁবু ছিল না। সেইখানকার মাটি গৃহ নির্মাণের জন্য উপযুক্ত নহে। তাহারা ছিল কাফির। যুলকারনায়ন তাহাদের সহিত এমন আচরণ করিলেন, যেমন পশ্চিম দিগন্তের লোকদের সহতি করিয়াছিলেন (কাশশাফ, ২, ৪৯৮; তাফসীর কুরতুবী, ১১-১২, ৫৩).
ইবন কাছীর বলেন: পশ্চিম প্রান্ত হইতে পূর্ব দিগন্তে যাওয়ার পথে যেইসব জাতির দেখা হইত তিনি তাহাদের তাওহীদের দাওয়াত দিতেন। যদি তাহারা দাওয়াত কবুল করিত তবে ভাল, অন্যথায় তিনি তাহাদের সহিত লড়াই করিতেন। আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছায় তাহারা পরাজিত হইলে যুলকারনায়ন বিজিতদের সম্পত্তি, গবাদি পশু ও কর্মচারী নিজের নিয়ন্ত্রণাধীন আনিয়া সম্মুখপানে অগ্রসর হইতেন। এইভাবে পথ চলিতে চলিতে তিনি সূর্যের উদয়াচলে পৌছিলেন। সেইখানে দেখা গেল এক বিরাট জনবসতি। গাছপালাবিহীন এই প্রান্তরে বসবাসকারী মানুষগুলি দিগম্বর ও জংলী। গায়ের বর্ণ লাল, আকারে খাটো। সামুদ্রিক মাছই ছিল তাহাদের প্রধান খাদ্য। হযরত হাসান বসরী (র) বলেন: এইসব মানুষ সূর্যোদয়ের সময় মাটির গর্তে অথবা পানির মধ্যে সুড়ঙ্গে চলিয়া যাইত, সূর্যোদয়ের পর মাটির গর্ত অথবা পানি হইতে উঠিয়া এইদিক সেইদিক ঘুরাঘুরি করিত। এইসব লোকের কান ছিল বড় বড় এবং তাহাদের সহিত একটি করিয়া বাচ্চা ও বিছানা থাকিত। ইবন জারীর তাবারী বলেন: এই এলাকায় কোন পাহাড়-পর্বত নাই। দূর অতীতে এক সময় একটি সেনাদল এইখানে আসিয়া হাযির হইলে স্থানীয় জনগণ তাহাদিগকে বলিল, সূর্যোদয়ের সময় তোমরা এইখানে থাকিও না। জবাবে তাহারা বলিল, আমরা আজ রাত্রির মধ্যেই এই এলাকা ত্যাগ করিব। কিন্তু বল ঐসব উজ্জ্বল হাড়ের স্তূপ কি করিয়া এইখানে আসিল? তাহারা জবাব দিল, কিছু কাল পূর্বে এইখানে একটি সেনাদল আসে, সূর্যোদয়ের সময় তাহারা অবস্থান করিয়াছিল, ফলে সব লোকেরই মৃত্যু ঘটে। এইসব হাড়গোড় তাহাদেরই (তাফসীরে তাবারী, ৮, ১৩; তাফসীরে ইবন কাছীর, ৩, ০৯)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দুই পর্বত প্রাচীরে যুলকারনায়ন

📄 দুই পর্বত প্রাচীরে যুলকারনায়ন


এই প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে বলেন:
ثُمَّ أَتْبَعَ سَبَبًا. حَتَّى إِذَا بَلَغَ بَيْنَ السَّدِّيْنِ وَجَدَ مِنْ دُونِهِمَا قَوْمًا ، لأَيَكَادُونَ يَفْقَهُونَ قَوْلًا، قَالُوا يَاذَا الْقَرْنَيْنِ إِنَّ يَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ مُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ فَهَلْ نَجْعَلُ لَكَ خَرْجًا عَلَى أَنْ تَجْعَلَ بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمْ سَدًا . قَالَ مَا مَكَّنَى فِيْهِ رَبِّي خَيْرٌ فَأَعِينُونِي بِقُوَّةٍ أَجْعَلْ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُمْ رَدْمًا ، أَتُونِي زُبَرَ الْحَدِيدِ حَتَّى إِذَا سَأَوَى بَيْنَ الصَّدَفَيْنِ قَالَ انْفُخُوا حَتَّى إِذَا جَعَلَهُ نَاراً . قَالَ أَتُونِي أَفْرِغْ عَلَيْهِ قطراً . فَمَا اسْطَاعُوا أَنْ يَظْهَرُوهُ وَمَا اسْتَطَاعُوا لَهُ نَقْبًا .
"আবার সে এক পথ ধরিল, চলিতে চলিতে সে যখন দুই পর্বত প্রাচীরের মধ্যবর্তী স্থলে পৌছিল তখন তথায় সে এক সম্প্রদায়কে পাইল যাহারা কোন কথা বুঝিবার মত ছিল না। উহারা বলিল, হে যুলকারনায়ন! ইয়াজুজ ও মাজুজ পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করিতেছে। আমরা কি আপনাকে খরচ দিব যে, আপনি আমাদের ও উহাদের মধ্যে এক প্রাচীর গড়িয়া দিবেন? সে বলিল, আমার প্রতিপালক আমাকে যে ক্ষমতা দিয়াছেন তাহাই উৎকৃষ্ট। সুতরাং তোমরা আমাকে শ্রম দ্বারা সাহায্য কর, আমি তোমাদের ও উহাদের মধ্যস্থলে এক মযবুত প্রাচীর গড়িয়া দিব। তোমরা আমার নিকট লৌহপিণ্ডসমূহ আনয়ন কর। অতঃপর মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থান পূর্ণ হইয়া যখন লৌহস্তূপ দুই পর্বতের সমান হইল তখন সে বলিল, তোমরা হাঁপরে দম দিতে থাক। যখন ইহা অগ্নিবৎ উত্তপ্ত হইল তখন সে বলিল, তোমরা গলিত তাম্র আনয়ন কর, আমি উহা ঢালিয়া দেই ইহার উপর। ইহার পর তাহারা (ইয়াজুজ ও মাজুজ) উহা অতিক্রম করিতে পারিল না এবং উহা ভেদও করিতে পারিল না" (১৮:৯২-৯৭)।
যুলকারনায়ন উত্তর দিকে যাত্রা করিয়া যেই দুই পর্বতের মধ্যবর্তী স্থানে পৌঁছিলেন তাহা ছিল আরমেনিয়া ও আযারবায়জানের সন্নিহিত মঙ্গোলীয় ভূখণ্ডের একেবারে শেষ প্রান্ত (বাহরুল মুহীত, ৬খ, পৃ. ১৬৩)। যুলকারনায়ন সেইখানে যেই জাতিগোষ্ঠীর দেখা পাইলেন তাহারা বিশেষ একটি ভাষায় কথা বলিত। ফলে তাহারা অন্য মানুষের ভাষা বুঝিতে পারিত না এবং অন্যরাও তাহাদের ভাষা বুঝিত না। আল্লামা যামাখশারী বলেন যে, তাহারা বোবার মত ইশারা-ইঙ্গিতে কথা বলিত (কাশশাফ, ২খ, পৃ. ৪৯৮)। কিন্তু আল্লাহ পাক প্রদত্ত শক্তিতে বলীয়ান হইয়া যুলকারনায়ন তাহাদের ভাষা ও বাকরীতি বুঝিতে পারয়াছিলেন। ইমাম বাগাবী বলেন, যুলকারনায়ন দোভাষীর মাধ্যমে তাহাদের সহিত কথোপকথন করেন (তাফসীরে বাগাবী, ৩খ, পৃ. ১৮০)।
স্থানীয় জনগণ পর্বতের মধ্যখানে একটি শক্ত দেওয়াল তৈয়ার করিয়া দিবার উদ্দেশ্যে যুলকারনায়নকে বিপুল পরিমাণ লৌহখণ্ড, লাকড়ি এবং কয়লা যোগাড় করিয়া দিল। যুলকারনায়ন নীচে লাকড়ি ইহার উপর লৌহপিণ্ড, লৌহের উপর কয়লা, কয়লার উপর লাকড়ি, লাকড়ির উপর লৌহ খণ্ড এইভাবে স্তরের উপর স্তর তৈয়ার করিয়া হুকুম দিলেন আগুন ধরাইয়া ফুঁক দিতে থাক। প্রজ্বলিত অগ্নিশিখার দহনে লৌহপিণ্ড যখন লোহিত অঙ্গারের বর্ণ ধারণ করিল তখন তিনি তাম্র আনিবার হুকুম দিলেন। জনগণ তাম্রখণ্ড আনিয়া দিলে তিনি তাম্র পিণ্ডগুলি জ্বলন্ত লৌহের উপর ঢালিয়া দিলেন। এইভাবে লৌহখণ্ড গলিত তাম্রের সংমিশ্রণে পর্বতশৃঙ্গ সম এক শক্তিশালী প্রাচীর রচিত হইয়া গেল। ইয়াজুজ-মাজুজ নামক দুর্ধর্ষ পার্বত্য জাতির পক্ষে এই সুকঠিন প্রাচীর অতিক্রম ও ভেদ করা অসম্ভব হইয়া গেল। ফলে তাহাদের ভীষণ অত্যাচার ও উৎপীড়ন হইতে পার্শ্ববতী এলাকার জনগণ রেহাই পাইল। মাওলানা আবদুল মাজেদ দরিয়াবাদী বলেন, যুলকারনায়নের সহিত প্রাচীর নির্মাণে পারদর্শী একদল বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ছিলেন (তাফসীর কুরতুবী, ৮খ, পৃ. ৬২; তাফসীর মাযহারী, ৭খ, পৃ. ২৬৭-৮; তাফসীর ইবন কাছীর, ৩খ, পৃ. ১০; তাফসীরে মাজেদী, পৃ. ৬২০-১)।
ইমাম বাগাবী লিখিয়াছেন, যুলকারনায়ন কর্তৃক নির্মিত প্রাচীরের দৈর্ঘ্য ১২০০ হাত, প্রস্থ ৫০ হাত এবং উচ্চতা ১০০ হাত (তাফসীর বাগাবী, ৩খ, পৃ. ১৮২)। প্রাচীর নির্মাণ সমাপ্ত হইবার পর যুলকারনায়ন আল্লাহ তা'আলার শোকার আদায় করেন এবং আল্লাহ্র ইচ্ছা অনুযায়ী এই প্রাচীর যে একদিন ধ্বংসপ্রাপ্ত হইবে তাহারও ইঙ্গিত দেন। কারণ আল্লাহ পাকের অস্তিত্ব ছাড়া দুনিয়ার কোন সৃষ্টি চিরস্থায়ী নয়। এই প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে বলা হইয়াছে:
قَالَ هَذَا رَحْمَةً مِّنْ رَبِّي فَإِذَا جَاءَ وَعْدُ رَبِّي جَعَلَهُ دَكَّاءَ وَكَانَ وَعْدُ رَبِّي حَقًّا .
"সে (যুলকারনায়ন) বলিল, ইহা আমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ। যখন আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হইবে তখন তিনি উহাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করিয়া দিবেন এবং আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি সত্য” (১৮:৯৮)।
এইখানে 'প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি' তিন অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে। (এক) যে কোন মুহূর্তে আল্লাহ তাআলা এই প্রাচীর বিধ্বস্ত করিয়া দিতে পারেন অথবা (দুই) কিয়ামতের দিনই আল্লাহ এই প্রাচীরকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করিয়া দিতে পারেন অথবা (তিন) ইয়াজুজ-মাজুজের আবির্ভাবের সময় ইহা ধ্বংস করিয়া দিতে পারেন (মাআরিফুল কুরআন, ৫খ, পৃ. ৬৪১-২; তাফহীমুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ৪৭)।
ঐতিহাসিক তাবারী, ইবন কাছীর ও ইয়াকৃত বর্ণনা করেন যে, ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমার ইবন খাত্তাব (রা) আযারবায়জান জয় করার পর ২২ হিজরী সালে সুরাকা ইবন আমরকে বাবুল আবওয়াবে (দারবান্দ) অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেন। সুরাকা (রা) মূল অভিযান পরিচালনার পূর্বে আবদুর রহমান ইবন রাবীআকে অগ্রবর্তী সেনাদলের প্রধান নিযুক্ত করিয়া তথায় প্রেরণ করেন। আবদুর রহমান যখন আর্মেনীয় অঞ্চলে পৌঁছেন তখন এলাকার শাসনকর্তা শহরবরায যুদ্ধ ছাড়াই আত্মসমর্পণ করেন। অতঃপর তিনি বাবুল আবওয়াব অভিমুখে যাত্রা করিবার প্রস্তুতি নিলেন। এই মুহূর্তে শহরবরায তাঁহাকে বলিলেন, আমি যুলকারনায়নের প্রাচীর পর্যবেক্ষণের জন্য একজন লোক পাঠাইয়াছিলাম। সে আপনাকে বিস্তারিত তথ্য দিতে পারিবে। অতঃপর লোকটিকে সেনাপতি আবদুর রহমানের নিকট হযির করা হইল সে প্রাচীরের এবং ইহার সন্নিহিত এলাকার মানুষের অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দান করে (তাবারী, ৩খ, পৃ. ২৩৫-২৩৯; আল-বিদায়া, ৭খ, পৃ. ১২২-১২৫; মু'জামুল বুলদান, বাবুল আবওয়াব অধ্যায়)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00