📄 যুলকারনায়ন কি নবী ছিলেন?
হযরত ইবরাহীম (আ)-এর সমসাময়িক যুলকারনায়ন পদব্রজে মক্কা মুকাররামা আগমন করিলে হযরত ইবরাহীম (আ) তাঁহাকে আন্তরিক অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন। মুখোমুখী হইতেই তিনি হযরত ইবরাহীমকে সালাম দেন এবং তাঁহার সহিত করমর্দন করেন। বলা হইয়া থাকে, তিনিই সর্বপ্রথম করমর্দনকারী ব্যক্তি। হযরত ইবরাহীম (আ) তাঁহার জন্য দোআ করেন এবং তাঁহাকে কিছু উপদেশ দান করেন। যুলকারনায়ন হযরত ইবরাহীম (আ)-এর সহিত তাওয়াফ ও কুরবানী সম্পন্ন করেন (ইবন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২, ১০৮-১২)। ইমাম ইবন হাজার আসকালানী (র) বলেন: ان ذالقرين قدم مكة فوجد ابراهيم واسماعيل يبنيان الكعبة فاستفهمهما عن ذلك فقال نحن عبدان اوران فقال من يشهد لكما فقامت خمسة كبش فشهدت فقال قد صدقتم.
"যুলকারনায়ন যখন মক্কায় আসিয়াছিলেন তখন তিনি হযরত ইবরাহীম (আ) ও হযরত ইসমাঈলকে (আ)-কে পবিত্র কা'বা গৃহে নির্মাণ কাজে ব্যস্ত দেখিতে পাইলেন। তিনি তাঁহাদের নিকট এই ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করিলে তাঁহার জবাবে বলিলেন, আমরা উভয়ই (এই ক্ষেত্রে আল্লাহর) নির্দেশপ্রাপ্ত বান্দা। তিনি জানিতে চাহিলেন, এই কথার প্রমাণ কি? ইহাতে পাঁচটি দুম্বা জাতীয় পশু দাঁড়াইয়া সাক্ষ্য দিল। অতঃপর তিনি বলিলেন, আপনারা সত্য বলিয়াছেন" (ফাতহুল বারী, ৬, ৩২৮)।
শাব্বীর আহমাদ উছমানী (র) বলেন, হযরত ইবরাহীম (আ)-এর দোআর বরকতে যুলকারনায়ন পৃথিবীর পূর্ব-পশ্চিম প্রান্ত পরিভ্রমণ ও দেশজয় করেন এবং অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হন (তাফসীর উছমানী, মদীনা ১৪০৯ হি., ৪০৪)। শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবন তায়মিয়া ও হাফিজ ইবন কাছীর (র) যুলকারনায়ন নবী ছিলেন বলিয়া অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন (মাওলানা আবুল কালাম আযাদ, তারজুমানুল কুরআন, ২, ৪৫৩)।
"আমি বলিলাম, হে যুলকারনায়ন" (قلنا يذا القرنين) আল্লাহ তা'আলার এই সম্বোধন দ্বারা যদি ধরিয়া লওয়া যায় তিনি নবী ছিলেন তাহা হইলে আপত্তির কিছু নাই। কারণ ওহীর মাধ্যমে তাঁহাকে ইহা বলা হইয়াছে। আর যদি তাঁহার নবুওয়াত স্বীকার করা না হয়, তাহা হইলে মনে করিতে হইবে কোন পয়গাম্বরের মধ্যস্থাতায় তাঁহাকে এই সম্বোধন করা হইয়াছে। যেমন বর্ণিত আছে, হযরত খিযির (আ) তাঁহার সাথী ছিলেন। অধিকন্তু ইহা নবুওয়াতের ওহী না হইয়া আভিধানিক অর্থে ওহী হওয়ার সম্ভাবনা রহিয়াছে। যেমন হযরত "মূসা (আ)-এর মাতার নিকট ওহী পাঠাইয়াছি” (أوحينا الى ام موسی) শব্দ ব্যবহার করা হইয়াছে পবিত্র কুরআনে। অথচ তিনি নবী ও রাসূল ছিলেন না। আবূ হায়্যান আন্দালুসী 'বাহরুল মুহীত' নামক তাফসীর গ্রন্থে বলেন: এইখানে যুলকারনায়নকে যেই আদেশ দেওয়া হইয়াছে, তাহা হইতেছে হত্যা ও শাস্তির আদেশ। এই ধরনের আদেশ সাধারণত নবুওয়াতের ওহী ছাড়া দেওয়া যায় না। কাশফ, ইলহাম অথবা অন্য কোন উপায়ে তাহা হইতে পারে না। সুতরাং যুলকারনায়নকে নবী মানিতে হইবে অথবা তাঁহার আমলে একজন নবীর উপস্থিতি স্বীকার করিতে হইবে, যাহার মাধ্যমে তাঁহাকে সম্বোধন করা হইয়াছে। ইহা ছাড়া অন্য কোন ব্যাখ্যার সুযোগ নাই (বাহরুল মুহীত, ৬, ১৫৭-১৬২; তাফসীরে মাজেদী, ৬১৯)। মুজাহিদ (র) বলেন, আল্লাহ তা'আলা সরাসরি যুলকারনায়নকে সম্বোধন করেন ও ওহী প্রেরণ করেন। ইহার দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, তিনি নবী ছিলেন ও ওহীয়ে ইলাহীর বাহক ছিলেন (তাফসীরে মাযহারী, ৭, ২৬৫)। ইমাম বাগাবী বলেন: বিশুদ্ধতম অভিমত হইতেছে যে, যুলকারনায়ন নবী ছিলেন না। ওহীর অর্থ হইতেছে এইখানে ইলহাম যাহা আল্লাহর ওলীদের নিকট আসে (তাফসীর বাগাবী, ৩, ১৭৮-১৮২)।
সানাউল্লাহ পানিপথী (র) এই প্রসঙ্গে অভিমত প্রকাশ করেন যে, সম্ভবত কোন পয়গম্বরের মাধ্যমে তিনি এই বাণী লাভ করিয়াছেন। বনূ ইসরাঈলের কোন পয়গম্বরকে তাঁহার সহিত দেওয়া হইয়াছিল তাঁহাকে সাহায্য করিবার উদ্দেশ্যে (তাফসীর মাযহারী, ৭, ২৬৬)। ইবন হাজার আসকালানী অভিমত প্রকাশ করেন যে, الا ان يحمل البعث على غير سيالة النبوة "যুলকারনায়ন আল্লাহর পক্ষ হইতে একটি জাতির নিকট প্রেরিত হইয়াছিলেন এই কথা সত্য, তবে তাঁহাকে নবুওয়াতের দায়িত্ব দেওয়া হয় নাই" (ফাতহুল বারী, ৬, ২৯৪)।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন: لا ادرى ذوالقرنين نيبا او لا "যুলকারনায়ন নবী ছিলেন কিনা তাহা আমি জানি না" (ফাতহুল বারী, বৈরূত, ৬, ৩৮৩)।
যুলকারনায়ন সম্বন্ধে হযরত আলী (রা)-কে প্রশ্ন করা হইলে তিনি বলেন, যুলকারনায়ন নবীও নহেন, বাদশাহও নহেন। তিনি এমন এক পুণ্যবান আল্লাহ্র বান্দা যিনি আল্লাহকে ভালবাসিতেন। আল্লাহও তাঁহাকে ভালবাসিতেন। তাঁহাকে অনেক অত্যাশ্চর্য বরকত দান করেন। মেঘ ও বাতাসকে তাঁহার হুকুমের অধীন করিয়া দেওয়া হয়, ফলে মুহূর্তের মধ্যে তিনি পূর্ব হইতে পশ্চিমে এবং পশ্চিম হইতে পূর্ব প্রান্ত পর্যন্ত পরিভ্রমণ করিতে পারিতেন। রাত্রি ও দিন ছিল তাঁহার জন্য সমান। অন্ধকার রাত্রিতেও তিনি আলোক রশ্মির সাহায্যে চলাফেরা করিতে পারিতেন। সমস্ত সড়ক ও জনপদ থাকিত তাঁহার জন্য উন্মুক্ত। মওসূমের পরিবর্তনের ফলে তাঁহার যাত্রাপথ বিঘ্নিত হইত না (ফাতহুল বারী, ৬, ২৯৬, ৩৮৩; আল-বিদায়া, ২, ১১৩; তাফসীর মাযহারী, ৭, ২৬২-৩; কাশশাফ, ২, ৪৯৬; তাফসীর কুরতুবী, ১১-১২, ৪৮)।
যুলকারনায়ন পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষা জানিতেন এবং প্রতিটি বস্তুর জ্ঞান ছিল তাঁহার নখদর্পণে। যমীনের সমস্ত ছোট বড় নিদর্শনসমূহের জ্ঞান আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে দান করিয়াছিলেন। যেই জনগোষ্ঠীর সহিত তিনি যুদ্ধ করিতেন তিনি তাঁহাদের ভাষাও জানিতেন এবং সেই ভাষায় তিনি কথোপকথন করিতেন (তাফসীর ইবন কাছীর, ৩, ০৬)।
ঐতিহাসিক বর্ণনায় জানা যায় যে, সমগ্র দুনিয়ায় শাসন ক্ষমতা প্রতিষ্ঠাকারী চারজন সম্রাট অতিক্রান্ত হইয়াছেন, তন্মধ্যে দুই জন ছিলেন মু'মিন এবং দুইজন কাফির। মু'মিন দুইজন হইলেন, হযরত সুলায়মান (আ) ও যুলকারনায়ন এবং কাফির দুইজন নমরুদ ও বুখতে নাসর। আশ্চর্যের বিষয় যে, যুলকারনায়ন নামে পৃথিবীতে একাধিক ব্যক্তি খ্যাতি লাভ করিয়াছেন এবং প্রতি যুগের যুলকারনায়নের সহিত সিকান্দার (ALEXANDER) উপাধিটিও যুক্ত রহিয়াছে (যামাখশারী, কাশশাফ, ২, ৪৯৬; মা'আরিফুল কুরআন, ৫, ৬১৭-৮)।
ইতিহাস প্রসিদ্ধ গ্রীক বীর আলেকজান্ডারকে অনেকে কুরআনে বর্ণিত যুলকারনায়ন হিসাবে অভিহিত করেন। আবূ হায়্যান আন্দালুসী 'বাহরুল মুহীত'-এ এবং মাহমুদ আলুসী বাগদাদী 'রূহুল মা'আনী' নামক তাফসীরে মেসডোনিয়ার আলেকজান্ডারকে (সিকান্দার রুমী মাকদূনী) কুরআনে উল্লেখিত যুলকারনায়ন বলিয়া অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন (বাহরুল মুহীত, ৬, ১৫৭-১৬২; রূহুল মা'আনী, ১৬, ২৫-২৬)। কিন্তু ইতিহাসবিদ আবুল ফিদা হাফিজ ইবন কাছীর উপরিউক্ত অভিমত খণ্ডন করিয়া বলেন, গ্রীক বীর আলেকজান্ডার ও কুরআনে বর্ণিত যুলকারনায়ন পৃথক দুই ব্যক্তি। তাঁহার বিখ্যাত ইতিহাস গ্রন্থ 'আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া'-তে গ্রীসের আলেকজান্ডারের বংশতালিকা উপস্থাপনা করেন, যাহা উপরে গিয়া হযরত ইবরাহীম (আ)-এর সহিত মিলিয়া যায়। ইবন কাছীর বলেনঃ
ফাম্মা যুলকারনাইন ইছানি ফাহুওয়া ইসকান্দার ইবনু ফিলিবাসিল মাকদূনিআল ইউনানি আল মিসরি বানিউল ইসকান্দারিয়্যাতি আল্লাযী ইউওয়ারিখু বিআইয়ামিহির রুমু ওয়া কানা মুতাআখখিরান আনিল আউয়ালি বিদাহরিন তাওয়ীলিন ওয়া কানা হাذا কাবলা মাসীহিন বিনাহবুন মিন ছালাছা মিআতি সানাতিন ওয়া কানা আরতাত্বালিসুল ফাইলুসূফু ওয়াজীরুহূ ওয়া হুওয়ার রাবদিয়্যু কাবla দাআ ওয়া আযাল্লা মূলূকাল ফারসি ওয়া ওয়াত্বাআ আরদাহুম ওয়া ইন্নামা নাবাহনা আলাইহি লিআন্না কাসীরান মিনান নাসি ই'তাক্বিদু আন্নahuma ওয়াহিদুন ওয়া আন্নাল মাযকূরু ফিল ক্বুরআনি হুওয়াল্লাযী কানা তাত্তালিসু ওয়াজীরাহু খাইকাউ বিসাবাবি যালিকা খত্বাুন কাবীরুওঁ ওয়া ফাসাদুন আ'রীদুন তাওয়ীলুন ফা ইন্নাল আউয়ালা কানা আ'বদান মু'মিনান সালিহান ওয়া মালিকান আ'দিলান ওয়া ওয়াজীরাহুল খিযরা ক্বাদ কানা নাবিইয়ান আ'লা মা ক্বাররারনাহু কাবলা হাذا ওয়া আম্মাস সাানি ফাকানা মুশরিকান কানা ওয়াজীরাহু ফাইলুসূফান। ওয়া ক্বাদ কানা বাইনাহুমা আযিদু মিনাল ফারসানাতিন ফাআইনা হাذا আ'ন হাذا লা ইয়াছতাবিয়ানি ওয়ালা ইয়াশতাবিহানি।
"দ্বিতীয় যুলকারনায়ন ছিলেন ফিলিপ-এর পুত্র সিকান্দার (আলেকজাণ্ডার) যিনি মাকদূনী, ইউনানী ও মিসরী নামে পরিচিত। তিনি আলেকজান্দ্রিয়া শহরের প্রতিষ্ঠাতা এবং রোমের ইতিহাস তাঁহার যমানায় খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে। তিনি প্রথম সিকান্দার হইতে সুদীর্ঘ কাল পরে জন্মগ্রহণ করেন। হযরত ঈসা (আ)-এর ৩০০ বৎসর পূর্বে তিনি জন্মলাভ করেন। তাঁহার মন্ত্রী ছিলেন দার্শনিক এরিস্টোটল। দারাকে তিনি হত্যা করেন এবং পারস্য সম্রাটদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করিয়া বিপুল এলাকা করায়ত্ত করেন। অনেকের বিশ্বাস যে, উভয়ই এক ব্যক্তি এবং তিনিই পবিত্র কুরআনে বর্ণিত যুলকারনায়ন যাহার মন্ত্রী এরিস্টোটল। ইহাই মূলত বিরাট বিভ্রান্তি ও দীর্ঘ মেয়াদী বিতর্কের অন্যতম কারণ। প্রথমোক্ত ব্যক্তি ছিলেন নেককার, মু'মিন ও ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ যাহার মন্ত্রী ছিলেন খিযির (আ)। তিনি নবী ছিলেন বলিয়া পূর্বে উল্লেখ করিয়াছি। দ্বিতীয় ব্যক্তি ছিলেন মুশরিক যাহার মন্ত্রী এরিস্টোটল। দুইজনের মধ্যখানে দুই হাজার বৎসরের অধিক ব্যবধান। কোথায় ইনি আর কোথায় তিনি। সুতরাং উভয় সিকান্দার বা যুলকারনায়ন যে একই ব্যক্তি নহেন ইহাতে সন্দেহের লেশ মাত্র নাই (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২, ১০৬; আহমদ আলী সাহারানপূরী, হাশিয়া বুখারী, ১, ৪৭২)।
পূর্বে উল্লিখিত হইয়াছে যে, যুলকারনায়ন নামে পরিচিত সিকান্দার মাকদুনী (Alexander of Macidonea) মুশরিক ও যালিম ছিলেন। নিজকে খোদা দাবি করিতেও তিনি কুণ্ঠিত হন নাই, এমন কি শত্রুর বক্ষে বর্শাবিদ্ধ করিয়া তিনি আনন্দ পাইতেন। শরীরিক নির্যাতন সহ্য করিতে না পারিয়া তাঁহার বন্ধুগণ যখন আর্তচিৎকার করিত তখন তিনি তাচ্ছিল্যভরে মুচকি হাসিতেন। পুটারক (PLOTARK) বলেন, মানুষ শিকারের মাধ্যমে স্বস্তি ও সুখানুভূতি লাভ করিবার পুরাতন অভ্যাস ছিল তাঁহার। প্যাসার গ্যাডা (PASARGADAE) দখল করিবার পর এক কোটি ত্রিশ লাখ পাউণ্ডের সহায় সম্পত্তি তিনি লুট করেন এবং শহরের সমস্ত পুরুষ সদস্যকে হত্যা করিয়া নারীদের দাসীতে পরিণত করেন (The Encyclopaedia Britannica, v1, 493-5)।
পক্ষান্তরে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত যুলকারনায়ন ছিলেন সত্যনিষ্ঠ, ন্যায়পরায়ণ, আল্লাহওয়ালা ও প্রাজারঞ্জক বাদশাহ। মাওলানা হিফযুর রহমান সিওহারবী ও মাওলানা সায়্যিদ আবুল আ'লা মওদূদী পারস্য ও 'মিডিয়ার রাজা 'সাইরাস' (কায়খসরু, মৃত্যু খৃষ্টপূর্ব ৫৩৯) কুরআনে বর্ণিত যুলকারনায়ন বলিয়া অভিমত প্রকাশ করেন। সাইরাস প্রচীন কালের খ্যাতনামা দিগ্বিজয়ী ছিলেন, কিন্তু তাঁহার অভিযান পরিচালনায় যুলুম ও অত্যাচারের চিহ্ন ছিল না, বরং তিনি ছিলেন সৎ ও ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ। আসমানী কিতাবসমূহে তাঁহার পূর্ণ বিবরণ রহিয়াছে (কাসাসুল কুরআন, ৩, ১৩৪)।
এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকার নিবন্ধকার বলেন, ব্যাবিলনে যখন তিনি অভিযান পরিচালনা করিলেন, তখন ইয়াহুদীরা পারস্যবাসীদের মুক্তিদাতা ও একেশ্বরবাদী বলিয়া শ্লোগান দিতে থাকে। ইহাতে সন্দেহ নাই যে, সাইরাস জেরুসালেম ও ইয়াহুদীদের উপসনালয় হায়কাল ইয়াহুদীদের হস্তে প্রত্যর্পণ করেন এবং তাহাদেরকে ফিলিস্তীন প্রত্যাবর্তনের অনুমতি প্রদান করেন (The Encyclopaedia Britannica, vol. vi, 752)
মাওলানা সায়্যিদ আবুল আলা মওদুদী এই প্রসঙ্গে যেই অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন তাহা বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য: ইতিহাসের দৃষ্টিকোণে সাইরাসের রাজ্যসীমা উত্তরে ককেশাস পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। দুশমন পর্যন্ত তাঁহার ন্যায়-ইনসাফের প্রশংসা করিয়াছেন। বাইবেলের বর্ণনা এই কথারই সাক্ষ্য দেয় যে, তিনি অবশ্যই খোদাভীরু বাদশাহ ছিলেন, যিনি বনূ ইসরাঈলকে আল্লাহর ইবাদত করার শর্তে ব্যাবিলনের বন্দীদশা হইতে মুক্তি দান করেন এবং লা শারীক আল্লাহর ইবাদতের জন্য বায়তুল মাকদিসে দ্বিতীয় হায়কালে সুলায়মানী নির্মাণ করেন। ইহার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা নিশ্চয় স্বীকার করিতে পারি যে, পবিত্র কুরআন নাযিল হওয়ার পূর্বে যত বিশ্ববিজেতা অতিবাহিত হইয়াছেন তাঁহাদের তুলনায় সাইরাসের মধ্যে যুলকারনায়নের অধিকাংশ নিদর্শন পাওয়া যায়। কিন্তু নির্দিষ্টভাবে তাঁহাকে যুলকারনায়ন বলিবার জন্য আরও অধিকতর প্রমাণের প্রয়োজন রহিয়াছে। এতদসত্ত্বেও পবিত্র কুরআনে যত নিদর্শন বর্ণিত হইয়াছে তাহা অন্য কোন বিশ্ববিজেতার তুলনায় সাইরাসের মধ্যে অধিকতর পরিদৃষ্ট হয়।
সাইরাস প্রাচীন ইরানের শাসক ছিলেন। খৃস্টপূর্ব ৫৪৯ সালের কাছাকাছি তাঁহার উত্থান কাল। অল্প দিনের মধ্যে তিনি মিডিয়া ও লিডিয়ার (Asia Minor) রাজত্বসমূহ করায়ত্ব করিয়া খৃস্টপূর্ব ৫৩৯ সালে ব্যাবিলন জয় করেন। ইহার পর কোন শক্তি তাঁহার যাত্রাপথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করিতে সাহস করে নাই। তাঁহার দেশ জয়ের ধারাবাহিকতা বর্তমান তুর্কিস্তান হইতে একদিকে মিসর ও লিবিয়া, অপর দিকে গ্রেস ও মেসিডোনিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। উত্তর দিকে তাঁহার রাজ্যসীমা কাফকাস (ককেশাস) রাজত্ব ও খাওয়ারিজম পর্যন্ত ছড়াইয়া পড়ে। কার্যত তৎকালীন পুরা সভ্য জগত তাঁহার প্রভাবাধীন ছিল (তাফহীমুল কুরআন, ৩, ৪৪)। মাওলানা আবুল কালাম আযাদ নিশ্চিতভাবে সাইরাসকে কুরআনে বর্ণিত যুলকারনায়ন হিসাবে চিহ্নিত করিয়াছেন (তরজমানুল কুরআন, ২, ৪৬৩)।
📄 যুলকারনায়নের
এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।
📄 বিশ্ববিজয়
এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।
📄 সূর্যের উদয়াচলে যুলকারনায়ন
যুলকারনায়নের পূর্ব দিগন্ত সফর সম্বন্ধে আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে বলেন: ثُمَّ أَتْبَعَ سَبَبًا ، حَتَّى إِذَا بَلَغَ مَطْلِعَ الشَّمْسِ وَجَدَهَا تَطْلُعُ عَلَى قَوْمٍ نَجْعَلُ لَهُمْ مِنْ دُونِهَا سِطْرًا ، كَذَالِكَ وَقَدْ أَحَطْنَا بِمَا لَدَيْهِ خُبْراً .
"আবার সে এক পথ ধরিল। চলিতে চলিতে যখন সূর্যোদয় স্থলে পৌঁছিল তখন সে দেখিল, উহা এমন এক সম্প্রদায়ের উপর উদিত হইতেছে যাহাদের জন্য সূর্যতাপ হইতে কোন অন্তরাল আমি সৃষ্টি করি নাই। প্রকৃত ঘটনা ইহাই, তাহার নিকট যাহা কিছু ছিল আমি সম্যক অবগত আছি” (১৮: ৮৯-৯১)।
অতএব যুলকারনায়ন অস্ত্রশস্ত্র ও সেনাবাহিনীর বিরাট বহর সহকারে পূর্ব দিগন্তে পৌছিয়া দেখিতে পাইলেন, পংকিল জলাশয় ভেদ করিয়া সূর্য উদিত হইতেছে। সেইখানে তিনি এমন এক জাতিকে দেখিলেন যাহারা উলঙ্গ, হিংস্র ও উন্মুক্ত প্রান্তরে যাযাবরের ন্যায় বসবাস করিতেছে। তাহাদের কোন পোশাক-পরিচ্ছদ, গৃহ ও তাঁবু ছিল না। সেইখানকার মাটি গৃহ নির্মাণের জন্য উপযুক্ত নহে। তাহারা ছিল কাফির। যুলকারনায়ন তাহাদের সহিত এমন আচরণ করিলেন, যেমন পশ্চিম দিগন্তের লোকদের সহতি করিয়াছিলেন (কাশশাফ, ২, ৪৯৮; তাফসীর কুরতুবী, ১১-১২, ৫৩).
ইবন কাছীর বলেন: পশ্চিম প্রান্ত হইতে পূর্ব দিগন্তে যাওয়ার পথে যেইসব জাতির দেখা হইত তিনি তাহাদের তাওহীদের দাওয়াত দিতেন। যদি তাহারা দাওয়াত কবুল করিত তবে ভাল, অন্যথায় তিনি তাহাদের সহিত লড়াই করিতেন। আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছায় তাহারা পরাজিত হইলে যুলকারনায়ন বিজিতদের সম্পত্তি, গবাদি পশু ও কর্মচারী নিজের নিয়ন্ত্রণাধীন আনিয়া সম্মুখপানে অগ্রসর হইতেন। এইভাবে পথ চলিতে চলিতে তিনি সূর্যের উদয়াচলে পৌছিলেন। সেইখানে দেখা গেল এক বিরাট জনবসতি। গাছপালাবিহীন এই প্রান্তরে বসবাসকারী মানুষগুলি দিগম্বর ও জংলী। গায়ের বর্ণ লাল, আকারে খাটো। সামুদ্রিক মাছই ছিল তাহাদের প্রধান খাদ্য। হযরত হাসান বসরী (র) বলেন: এইসব মানুষ সূর্যোদয়ের সময় মাটির গর্তে অথবা পানির মধ্যে সুড়ঙ্গে চলিয়া যাইত, সূর্যোদয়ের পর মাটির গর্ত অথবা পানি হইতে উঠিয়া এইদিক সেইদিক ঘুরাঘুরি করিত। এইসব লোকের কান ছিল বড় বড় এবং তাহাদের সহিত একটি করিয়া বাচ্চা ও বিছানা থাকিত। ইবন জারীর তাবারী বলেন: এই এলাকায় কোন পাহাড়-পর্বত নাই। দূর অতীতে এক সময় একটি সেনাদল এইখানে আসিয়া হাযির হইলে স্থানীয় জনগণ তাহাদিগকে বলিল, সূর্যোদয়ের সময় তোমরা এইখানে থাকিও না। জবাবে তাহারা বলিল, আমরা আজ রাত্রির মধ্যেই এই এলাকা ত্যাগ করিব। কিন্তু বল ঐসব উজ্জ্বল হাড়ের স্তূপ কি করিয়া এইখানে আসিল? তাহারা জবাব দিল, কিছু কাল পূর্বে এইখানে একটি সেনাদল আসে, সূর্যোদয়ের সময় তাহারা অবস্থান করিয়াছিল, ফলে সব লোকেরই মৃত্যু ঘটে। এইসব হাড়গোড় তাহাদেরই (তাফসীরে তাবারী, ৮, ১৩; তাফসীরে ইবন কাছীর, ৩, ০৯)।