📄 হযরত লুকমান (আ)-এর উপদেশাবলী
সাহীফায়ে লুকমান বা লুকমান (আ)-এর বাণী সম্বলিত পুস্তিকা বর্তমান কালে বিদ্যমান না থাকিলেও বহু তাফসীর ও ইতিহাস গ্রন্থে উহার বিবরণ উদ্বৃত হইয়াছে। এই প্রসঙ্গে ওয়াহব ইবন মুনাব্বিহ বলেন, 'আমি লুকমান (আ)-এর হিকমত ও জ্ঞানগর্ভ বাণী সংক্রান্ত দশ হাজারের অধিক অধ্যায় অধ্যয়ন করিয়াছি (মুখতাসার তাফসীরুল কুরতুবী, পৃ. ৬২৩; মা'আরিফুল কুরআন, ৭খ, ৩৫)। ইবন আবী হাতিমের আহরিত হাম্স ইবন উমারের একটি বর্ণনায় আছে, একদিন লুকমান (আ) সরিষা ভর্তি একটি পৌটলা নিজের কাছে রাখিয়া স্বীয় পুত্রকে উপদেশ দিতে লাগিলেন এবং একটি উপদেশ দেওয়ার পর একটি করিয়া সরিষার দানা বাহির করিতে লাগিলেন। এইভাবে উপদেশ দিতে দিতে সরিষার সকল দানা বাহির করিয়া নিঃশেষ করিলেন (আল বিদায়া, ২খ, ১২৭)।
ইবন কাছীর তাঁহার তাফসীরে ও ইতিহাস গ্রন্থে (ইবন কাছীর, ৩খ., সূরা লুকমান; বিদায়া, ২খ, ১২৭, ১২৮, ১২৯) ইমাম আহমাদ (র)-এর কিতাবু'য-যুহৃদ ও অন্যান্য গ্রন্থের বরাতে লুকমান (আ)-এর অনেক বাণী উদ্ধৃত করিয়াছেন। এখানে উহার অংশবিশেষ উপস্থাপন করা হইল।
(১) ইবন উমার (রা) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম হইতে বর্ণনা করেন, লুকমান হাকীম বলিতেন, আল্লাহ তা'আলা কাহাকেও কোন কিছুর আমানতদার বানাইলে তাহার কর্তব্য উহার হিফাজত করা। (২) কাসিম ইবন মুখায়মির রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম হইতে বর্ণনা করেন, লুকমান (আ) তাঁহার পুত্রকে উপদেশ দিয়া বলিলেন, তুমি মুখোশ লাগাইয়া মুখমণ্ডল আচ্ছাদিত করিবে না; কেননা উহা রাত্রিকালে বিশ্বাসঘাতকতাতুল্য এবং দিনের বেলা নিন্দনীয়। (৩) সিররী ইবন ইয়াহইয়া হইতে বর্ণিত, লুকমান (আ) তাঁহার পুত্রকে বলিলেন, হে বৎস! হিকমত ও প্রজ্ঞা ফকীরকে বাদশাহর মসনদে সমাসীন করে। (৪) আওন ইবন আবদুল্লাহ হইতে বর্ণিত, তুমি কোন মজলিসে গেলে প্রথমে মজলিসের লোকদিগকে সালাম করিয়া কোন এক প্রান্তে বসিয়া পড়িবে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত মজলিসের আলোচনা শেষ না হইবে ততক্ষণ কোন কথা বলিবে না। যদি দেখ যে, তাহারা আল্লাহ্র স্মরণে মশগুল হয় তবে তুমিও তাহাদের সহিত অংশগ্রহণ করিবে। আর তাহারা বাজে কথায় লিপ্ত হইলে তুমি সেই স্থান ত্যাগ করিয়া অন্যত্র উত্তম মজলিসের সন্ধান করিবে। (৫) উবায়দ ইবন উমায়র হইতে বর্ণিত, তুমি উত্তম মজলিসের সন্ধানে থাকিবে; যখন এমন কোন মজলিস পাইবে যাহাতে আল্লাহ্ কথা আলোচিত হয় তখন তাহাদের সহিত বসিয়া পড়িবে। কেননা তুমি আলিম হইলে তোমার ইল্ম উপকার সাধন করিবে, আর তুমি নির্বোধ হইলে তাহারা তোমাকে আলিম বানাইয়া দিবে এবং আল্লাহ তা'আলা তাহাদের প্রতি রহমত বর্ষণ করিলে তুমিও উহাতে অংশীদার হইতে পারিবে। (৬) যে মজলিসে আল্লাহ্ কথা আলোচিত হয় না, সেখানে তুমি বসিবে না, কেননা তুমি আলিম হইলে তোমার ইল্ম কোন কাজে আসিবে না; আর তুমি নির্বোধ হইলে তাহারা তোমাকে আরো নির্বোধ বানাইবে এবং কখনও তাহাদের উপর আল্লাহর ক্রোধ আপতিত হইলে তুমিও উহাতে আক্রান্ত হইবে। (৭) মু'মিনদের রক্ত ঝরায় এমন কোন শক্তিধরের প্রতি ঈর্ষান্বিত হইবে না; কেননা তাহার জন্য আল্লাহ্র নিকট এমন এক ঘাতক আছে যে কখনো মরে না। (৮) হে বৎস! আল্লাহ্ আনুগত্যকে তিজারতরূপে গ্রহণ কর, বিনা পুঁজিতে তোমার হাতে মুনাফা আসিতে থাকিবে। (৯) হে বৎস! আল্লাহ তা'আলাকে ভয় কর এবং লোকের সম্মান লাভের উদ্দেশ্যে আল্লাহ ভীতির প্রদর্শনী করিও না, অথচ তোমার অন্তর পংকিলতায় পূর্ণ। (১০) হে বৎস! মূর্খ লোকের বন্ধুত্বের প্রতি আকৃষ্ট হইও না; কেননা সে মনে করিবে যে, তুমি তাহার মূর্খতার কাজগুলি পসন্দ করিতেছ। জ্ঞানীর অসন্তুষ্টিকে বেপরোয়া হইয়া উড়াইয়া দিও না; কেননা তাহা হইলে সে তোমার প্রতি উদাসীন হইবে এবং তোমাকে বর্জন করিবে। (১১) জ্ঞানীদের মুখে আল্লাহ প্রদত্ত শক্তি নিহিত রহিয়াছে, আল্লাহ তাঁহার মর্ষী অনুসারে যেইরূপ করিতে চাহেন, জ্ঞানীদের কথা ও কাজের জন্য 'সেইরূপ উপকরণ সৃষ্টি করিয়া দেন। (১২) হে বৎস! নিরবতার পরিণতিতে কখনও অনুতপ্ত হইতে হয় না; কথা বলা রৌপ্য হইলে নিরবতা স্বর্ণতুল্য। (১৩) হে বৎস! সর্বদা মন্দ হইতে দূরে অবস্থান করিবে। তাহা হলে মন্দও তোমা হইতে দূরে থাকিবে। কেননা, মন্দ হইতেই মন্দের উৎপত্তি'। (১৪) হে বৎস! কোন কিছুর প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহী ও কৌতূহলী হইবে না। কেননা, অতি আগ্রহ আপনজনকে আপনজন হইতে দূরে সরাইয়া দেয়। হে বৎস! মাত্রাতিরিক্ত ক্রোধ হইতে আত্মসংবরণ করিবে; কেননা প্রচণ্ড ক্রোধ জ্ঞানীর অন্তরকে মৃতপ্রায় বানাইয়া দেয়। (১৫) হে বৎস! মিষ্টীভাষী হও, হাসিমুখ হও, তাহা হইলে তুমি মানুষের নিকট সেই ব্যক্তির চাইতেও প্রিয় হইবে, যে তাহাদিগকে সর্বদা দান-খয়রাত করিয়া থাকে।” (১৬) "কোমলতা প্রজ্ঞার মূল।” (১৭) "যেমন বীজ বপন করিবে, তেমন ফসল কর্তন করিবে।” (১৮) "নিজের বন্ধু ও পিতার বন্ধুর সহিত বন্ধুত্ব রক্ষা করিবে।” (১৯) আবূ কিলাবা হইতে বর্ণিত, "লোকেরা লুকমানকে জিজ্ঞাসা করিল, সর্বাধিক ধৈর্যশীল ব্যক্তি কে? তিনি বলিলেন, 'যাহার ধৈর্যের পশ্চাতে নির্যাতন থাকে না। লোকেরা বলিল, স্বরচাইতে বড় আলিম কে? লুকমান বলিলেন, যে ব্যক্তি অন্যের ইল্ম দ্বারা নিজের ইলমকে সমৃদ্ধ করিতে থাকে। লোকেরা বলিল, সর্বোত্তম ব্যক্তি কে? লুকমান (রা) বলিলেন, ধনবান। লোকেরা বলিল, সম্পদে ধনবান? লুকমান (রা) বলিলেন, না, ধনবান সেই ব্যক্তি, যে নিজের অভ্যন্তরে কোন কল্যাণ সন্ধান করিলে উহা বিদ্যমান পায়, অন্যথায় নিজেকে অপর মানুষ হইতে অমুখাপেক্ষী রাখে।” (২০) সুলায়মান ইবন 'উয়ায়না হইতে বর্ণিত, "লুকমান (আ)-কে জিজ্ঞাসা করা হইল, সর্বাধিক নিকৃষ্ট ব্যক্তি কে? তিনি বলিলেন, যে মন্দ কাজ করে এবং মানুষ তাহাকে মন্দ কাজ করিতে দেখিয়া মন্দ মনে করিবে ইহার তোয়াক্কা করে না।” (২১) "যাহারা মানুষের মনোরঞ্জনের উদ্দেশ্যে কথা বলে, আল্লাহ তাহাদের অস্থিসমূহ বিচূর্ণ করিবেন।” (২২) তুমি তোমার জ্ঞাত বিষয়গুলিকে এখনও কার্যে বাস্তবায়িত কর নাই, এই অবস্থায় তোমার অজ্ঞাত বিষয়ের জ্ঞান আহরণে কোন কল্যাণ নাই। কেননা, ইহার দৃষ্টান্ত সেই ব্যক্তির ন্যায় যে কাঠ কুড়াইয়া একটি গাট বাঁধিল এবং উহা তুলিয়া নিতে অক্ষম হইল। তারপরও সে কাঠ কুড়াইয়া গাটের সহিত বাধিতে লাগিল।” (২৩) আবূ সা'ঈদ হইতে বর্ণিত, লুকমান তাঁহার পুত্রকে বলিলেন, নেককার মুত্তাকী লোকেরাই যেন তোমার দস্তরখানে খাবার গ্রহণ করে এবং বুদ্ধি পরামর্শ তুমি হক্কানী আলিমগণের নিকট হইতেই গ্রহণ করিবে” (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, মুখতারু তাফসীরিল কুরতুবী, মা'আরিফুল কুরআন)।
(২৪) বাগাবী হাসান হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, লুকমান (আ) তাঁহার পুত্রকে বলিলেন, হে বৎস! তুমি এই সাধারণ মোরগটির চাইতেও অপারগ হইও না, এইভাবে যে, সে তো শেষ রাত্রে ঘুম হইতে জাগ্রত হইয়া ডাকিতে থাকিল আর তুমি তখন তোমার আরামের শয্যায় সুখনিদ্রায় বিভোর রহিলে (তাফসীরে মাজহারী, ২খ., ২৫)। (২৫) "হে বৎস! দুনিয়া একটি গভীর সমুদ্র। ইহাতে অনেক মানুষের সলিল সমাধি হইয়াছে, এই সমুদ্রের বুকে আল্লাহভীতিকে তুমি জাহাজ বানাও এবং ঈমানের পণ্য দ্বারা উহা ভর্তি কর এবং আল্লাহ্র উপর ভরসাকে উহার পাল বানাও। তবে আশা করা যায় যে, তুমি মুক্তি পাইবে (অন্যথায়) তুমি মুক্তি পাইবে বলিয়া মনে করি না। (২৬) যে ব্যক্তির অভ্যন্তরে তাহার উপদেশদাতা থাকে তাহার জন্য আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হইতে একজন হিফাজতকারী নিযুক্ত হন। যে ব্যক্তি মানুষের সহিত নিজের সম্পর্কে ইনসাফের আচরণ করে আল্লাহ তা'আলা তাহার ইজ্জত বৃদ্ধি করিয়া দেন। আল্লাহ তা'আলার আনুগত্যে অবনমিত হওয়া পাপাচারের দ্বারা মর্যাদাবান হওয়ার চাইতে শ্রেয়। (২৭) পিতা কর্তৃক সন্তানকে শাসন করা ফসলে সার প্রদানের ন্যায়। (২৮) হে বৎস! ঋণগ্রস্ত হইও না, কেননা উহা দিবসে লাঞ্ছনা ও রাত্রিতে দুশ্চিন্তার কারণ। (২৯) হে বৎস! আল্লাহ তা'আলার প্রতি এই পরিমাণ আশাবাদী হইবে যাহা তোমাকে তাঁহার অবাধ্যতায় দুঃসাহসী না করে। আর তাঁহাকে এই পরিমাণ ভয় করিবে যাহা তোমাকে তাঁহার রহমত হইতে নিরাশ করে না। (৩০) মানুষ মিথ্যাবাদী হইলে তাহার প্রভাব নিঃশেষ হইয়া যায় এবং বদ-স্বভাবী হইলে তাঁহার দুঃখ বৃদ্ধি পায়। অতি ভারী পাথর স্থানান্তর করা নির্বোধকে বুদ্ধিদানের চাইতে সহজ। (৩১) হে বৎস! আমি ভারী লোহা, পাথর ও অন্যান্য ভারী বস্তু বহন করিয়াছি, কিন্তু মন্দ প্রতিবেশীর চাইতে অধিক ভারী কিছু বহন করিয়া নাই। আমি বহু তিক্ত বস্তুর স্বাদ আস্বাদন করিয়াছি, কিন্তু দারিদ্র্যের চাইতে অধিক তিক্ত কোন বস্তু দেখি নাই। (৩২) হে বৎস! তুমি কোন মূর্খকে তোমার দূতরূপে পাঠাইবে না; দূত হিসাবে কোন বুদ্ধিমান ব্যক্তি না পাইলে নিজেই নিজের দূত হইবে। (৩৩) হে বৎস! মিথ্যা চূড়ান্তরূপে বর্জন করিবে। কেননা উহা চড়ুই পাখীর গোশতের ন্যায় অত্যন্ত আকর্ষণীয়, কিন্তু অনতিবিলম্বে উহা প্রতিপক্ষকে উত্তপ্ত করিয়া তোলে। (৩৪) হে বৎস! জানাযায় (শোক সভায়) অংশগ্রহণ করিবে, বিবাহের আনন্দ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করিবে না। কেননা, জানাযা তোমাকে আখিরাত স্মরণ করাইয়া দিবে আর বিবাহের অনুষ্ঠান দুনিয়াকে তোমার নিকট আকর্ষণীয় করিয়া দিবে। (৩৫) হে বৎস! পরিতৃপ্ত উদরে পুনঃভক্ষণ করিওনা, কেননা, উহা ভক্ষণ করিবার চাইতে কুকুরের সম্মুখে রাখিয়া দেওয়া উত্তম। (৩৬) হে বৎস! মিষ্ট হইও না, তাহা হইলে লোকেরা তোমাকে গিলিয়া ফেলিবে; তিক্ত হইও না, তাহা হইল লোকেরা তোমাকে ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দিবে। (৩৭) হে বৎস! তুমি কাহারো সহিত বন্ধুত্ব স্থাপনের ইচ্ছা করিলে অগ্রে তাহাকে যাচাই করিবার জন্য কোন কিছু দ্বারা তাহাকে রাগাইয়া দিবে। রাগান্বিত অবস্থায়ও সে তোমার সহিত ন্যায়সংগত আচরণ করিলেই তাঁহাকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করিবে; অন্যথায় তাহাকে বর্জন করিবে। (৩৮) তোমার সহকর্মী ও বন্ধুর সহিত তোমার আচরণ হইবে এমন যেন তোমার নিকট তাহার কোন প্রয়োজন নাই এবং তাহাকে ব্যতীত তোমার গত্যন্তর নাই। (৩৯) হে বৎস! এমন ব্যক্তির ন্যায় হও যে কাহারও প্রশংসার প্রত্যাশী নহে এবং তাহাদের নিন্দার পাত্রও নহে। এমন হইলে সে হইবে আত্মপ্রত্যয়ী এবং মানুষও তাহার ব্যবহারে খুশী থাকিবে। (৪০) হে বৎস! তোমার মুখ নিঃসৃত উক্তির ব্যাপারে তুমি সংযত থাকিবে। কেননা, তোমার নীরবতা পর্যন্তই তোমার নিরাপত্তা। কথা শুধু ততটুকুই বলিবে যতটু তোমার উপকারে আসিবে (তাফসীরে রূহুল মা'আনী)।
📄 লুকমান (আ)-এর হিকমত সংক্রান্ত ঘটনা
বিভিন্ন গ্রন্থে লুকমান (আ)-এর প্রজ্ঞাপূর্ণ বাণী ও কর্মের বহু বিবরণ রহিয়াছে। এইগুলির মধ্য হইতে অধিকাংশ গ্রন্থে উদ্ধৃত দুইটি ঘটনা দ্বারা লুকমান (আ)-এর প্রজ্ঞার গভীরতা অনুধাবন করা যায়।
(১) বায়হাকীর শু'আবুল ঈমানে ও হাকিমের মুসতাদরাক গ্রন্থে প্রামাণ্য সনদে হযরত আনাস (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে যে, হযরত দাউদ (আ) একদিন বর্ম তৈরী করিতেছিলেন এবং লুকমান উহা দেখিয়া অভিভূত হইতেছিলেন। তিনি দাউদ (আ)-কে উহার কার্যকারিতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিতে চাহিতেছিলেন। কিন্তু তাঁহার প্রজ্ঞা তাঁহাকে প্রশ্ন করা হইতে বিরত রাখিতেছিল। হযরত দাউদ (আ) বর্ম তৈরী সম্পন্ন করিলেন এবং উহা পরিধান করিয়া বলিলেন, যুদ্ধবস্ত্র কতই না উত্তম। তখন লুকমান (আ) বলিলেন, নীরবতা অবলম্বন' হিকমত। তবে এই বিধান পালনকারীর সংখ্যা অত্যন্ত অপ্রতুল (অর্থাৎ প্রশ্নের জন্য মুখ না খুলিয়াও লুকমান বর্ম তৈরীর উদ্দেশ্য অবহিত হইলেন)। দাউদ (আ) তখন বলিলেন, যথার্থরূপে তোমার নাম 'হাকীম' হইয়াছে।
(২) ইব্ন আবূ শায়বা, ইমাম আহমাদ ও ইব্ন জারীর খালিদ রি'ঈ হইতে বর্ণনা করেন, একবার লুকমান (আ)-এর মনিব তাঁহাকে বলিল, একটি ছাগল যবেহ করিয়া আমার জন্য উহার সর্বোত্তম দুইটি অংশ নিয়া আস। তখন লুকমান একটি ছাগল যবেহ করিয়া উহার জিহ্বা 'ও কলিজা (হৃৎপিণ্ড) আনিয়া মনিবের সম্মুখে উপস্থিত করিলেন। মনিব বলিল, এই দুই অংশের চেয়ে উত্তম কিছু ছিল না? লুকমান শুধু 'না' বলিয়া নীরব রহিলেন। এই ঘটনার পর কিছু দিন অতিবাহিত হইল। পরে অন্য একদিন মনিব তাহাকে বলিল, একটি ছাগল যবেহ কর এবং উহার সর্বাধিক নিকৃষ্ট দুইটি অংশ ফেলিয়া দাও (নিয়া আস)। লুকমান (আ) একটি ছাগল যবেহ করিয়া উহার জিহ্বা ও কলিজা ফেলিয়া দিলেন (নিয়া-আসিলেন)। মনিব বলিল, তোমাকে ছাগল যবেহ করিয়া উত্তম দুই অংশ আনিতে বলিলে জিহ্বা ও কলিজা হাজির করিলে এবং নিকৃষ্ট দুই অংশ ফেলিয়া দিতে বলিলে সেই জিহ্বা ও কলিজাই ফেলিয়া দিলে? লুকমান (আ) বলিলেন, "এই দুইটি জিনিস এমন যে, ইহারা উত্তম হইলেও ইহার চেয়ে নিকৃষ্টও আর কিছু নাই" (বিদায়া, ফাতহুল বারী, মুখতাসার তাফসীর কুরতুবী, তাফসীর মাজহারী, উরদু, ৬ অন্যান্য)।
📄 উপসংহার
হযরত লুকমান (আ) সেই স্বল্প সংখ্যক অনন্যসাধারণ ও বিশিষ্ট ভাগ্যবানদের অন্যতম, পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ যাহাদের নাম উল্লেখ করিয়াছেন এবং নবী-রাসূল না হওয়া সত্ত্বেও তাঁহার নামে একটি সূরার নামকরণ করিয়াছেন এবং মানবজাতির কল্যাণে তাঁহার উপদেশ ও বাণী উদ্ধৃত করিয়া তাঁহার সত্তাকে অমরত্ব দান করিয়াছেন।
📄 গ্রন্থপঞ্জী
(ক) কুরআন ও তাফসীর: (১) আল-কুরআনুল করীম, ১৯শ মুদ্রণ, ইসলামিক ফাউণ্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা ১৪১৭/১৯৯৭, প্রধানত আয়াতসমূহের তরজমার জন্য; (২) আল্লামা ফখরুদ্দীন রাযী, আত-তাফসীরুল কাবীর, ৩য় সং, বৈরূত তা. বি., ৩, ১০৯-১২; ৬, ১৬৯-১৯২; ১০, ১২০-৩; ১১, ১০৭-৯; ১২, ৬৩-৪; ১৫, ৩৬-৪০; ২০, ২২৮, ২৩০; ২২, ১৯৪-২০১; ২৪, ১৮৪; ২৫, ২৪৫-৬; ২৬, ১৮৩-২০০; (৩) মুফতী মুহাম্মাদ শফী, মাআরিফুল কুরআন (বাংলা অনুবাদ), ১, ২৬৬-৮, ৬৬৪-৭০, ই. ফা. বা., ৬ষ্ঠ সং, ঢাকা ১৪১২/১৯৯২; ৫, ১ম সং, ঢাকা ১৪০৩/১৯৮২, ৫৬১; ৬, ৩য় সং, ঢাকা ১৪১২/১৯৯২, ২১৩-২১, ৬২০-২৩; ৭, ৪র্থ সং, ঢাকা ১৪১৫/১৯৯৪, ২৫০-৪; ৪৮৮-৯৮; (৪) ঐ লেখক, মাআরেফুল কোরআন, সংক্ষিপ্ত সৌদী সংস্করণ (বাংলা), মদীনা মুনাওয়ারা ১৪১৩ হি.; (৫) সায়্যিদ আবুল আলা মওদূদী, তাফহীমুল কুরআন, ২২শ সং, ১, লাহোর ১৯৮৩, ৮৩-৪, টীকা ৮২-৮৩; ১৮৫-৯২, টীকা ২৬৮-২৭৪; ২, ১৬শ সং, লাহোর ১৪০২/১৯৮২, ৮৯-৯২, টীকা ১২২-১২৫; ৫৯৫-৮, টীকা ৭, ৬২৪, টীকা ৬৩; ৬২৪-৫, টীকা ৬৩; ৩, লাহোর ১৯৮২ খৃ., ১৭৩-৬, টীকা ৭০-৭৩; ৫৬১-২, টীকা ১৮-২০; ৪, ১১শ সং, লাহোর ১৯৮১, ১৭৮, টীকা ১৪, ৩২৩-৩১, টীকা ১৬-২৮; (৬) আবদুল মাজেদ দরিয়াবাদী, তাফসীরে মাজেদী, বাংলা অনুবাদ, ১ম সং, ই. ফা. বা., ঢাকা ১৪১৫/১৯৯৪, ১, ৪৭৩-৮৪; (৭) শায়খুল হিন্দ মাহমূদুল হাসান, কুরআন মজীদের উর্দু তরজমা, মাওলানা শব্বীর আহমাদ উছমানীর টীকাযুক্ত, মদীনা মুনাওয়ারা ১৪০৯/১৯৮৯, ১৩, টীকা ৪; ৫১, টীকা ১-৩, ৫২, টীকা ১-৩; ২২৭, টীকা ৪-৭, ২২৮, টীকা ১; ৩৮১, টীকা ১০; ৪৩৭, টীকা ৮-১২; ৫০৩, টীকা ১১-১২; ৫৭১, টীকা ৮, ৫৭২, টীকা ১; ৬০৪, টীকা ১০, ৬০৫, টীকা ১-৮; (৮) ইবন কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল আজীম (তাফসীরে ইব্ন কাছীর), ১ (বাংলা অনুবাদ), ই. ফা. বা., ২য় সং, ঢাকা ১৪১৩/১৯৯২, ৩৫৫-৬১; (৯) আয-যামাখশারী (৪৬৭-৫৩৮ হি.), আল-কাশশাফ, বৈরূত তা. বি., ৩, ৩৬৩-৭২; (১১) আল-বায়দাবী, আন্ওয়ারুত তানযীল ফী ইসরারির তা'বীল (তাফসীরে বায়দাবী), দেওবন্দ, ইউ.পি., ৩, ২৩১-৩৩; (১২) ইবনুল আরাবী (৪৬৮-৫৪ও হি.), আহ্কামুল কুরআন, বৈরূত তা. বি., ৪, ১৬৩৬; (১৩) আবূ বকর আল-জাসসাস, আহ্কামুল কুরআন, ৩, দারুল ফিকার, বৈরূত তা. বি.; (১৪) আবূ আবদিল্লাহ মুহাম্মাদ ইব্ন আহমদ আল-কুরতুবী, আহ্কামুল কুরআন, বৈরূত তা. বি., ১৪ ও ১৫।
(খ) হাদীছের গ্রন্থাবলী ও উহার ভাষ্য গ্রন্থসমূহঃ (১) সহীহ আল-বুখারী (বাংলা সংস্করণ), আধুনিক প্রকাশনী, ঢাকা; (২) সহীহ মুসলিম (বাংলা সংস্করণ), ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ; (৩) সুনান আবু দাউদ, মূল আরবী সংস্করণ ও ই. ফা. বা.-এর বাংলা সংস্করণ; (৪) জামে আত-তিরমিযী (বাংলা সংস্করণ), বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, ঢাকা; (৫) সুনান ইবন মাজা (মূল আরবী), ভারতীয় সংস্করণ ও বৈরূত হইতে প্রকাশিত ফুয়াদ আবদুল বাকী সম্পাদিত সংস্করণ; (৬) মুওয়াত্তা ইমাম মালেক (আরবী সংস্করণ); (৭) আল-হাকেম, আল-মুসতাদরাক, দারুল কুতুব আল-আরাবী, বৈরূত তা. বি., ২, কিতাবু তাওয়ারীখিল মুতাকাদ্দিমীন আনিল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন, যিক্র নবী দাউদ (আ); (৮) খতীব তাবরীযী, মিশকাতুল মাসাবীহ, বাংলা অনুবাদ. মেশকাত শরীফ, এমদাদিয়া লাইব্রেরী, ৪র্থ মুদ্রণ, ঢাকা ১৯৭৮ খৃ., কিতাবুল ঈমান, বাবুল ইতিসাম বিল-কিতাব ওয়াস-সুন্নাহ।
(গ) ইতিহাস ও অন্যান্য গ্রন্থাবলী : (১) ইবন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, চতুর্থ সংস্করণ, বৈরূত ১৪০৮/১৯৭৮, ১নং বালাম, ২; (২) ইবনুল আছীর, আল-কামিল ফিত তা'রীখ, ১ম সংস্করণ, বেরূত ১৪০৭/১৯৮৭, ১ম খণ্ড; (৩) ইব্ন আসাকির, তাহযীব তা'রীখ দিমাশক আল-কাবীর, ২য় সং, বৈরূত ১৩৯৯/১৯৭৯, ৫ম খণ্ড; (৪) আবদুল ওয়াহ্হাব আন-নাজ্জার, কাসাসুল আম্বিয়া, দারুল ফিকার, বৈরূত তা. বি; (৫) আনওয়ারে আম্বিয়া (লেখক অজ্ঞাত), শায়খ গোলাম আলী এণ্ড সন্স, ৫ম সং., লাহোর ১৯৮৫ খৃ.; (৬) ইবন জারীর আত-তাবারী, তা'রীখুল উমাম ওয়াল মুলুক, ১; (৭) আবূ ইসহাক আহমাদ ইব্ন মুহাম্মাদ আছ-ছা'আলিবী, কাসাসুল আম্বিয়া (আল-আরাইসুল বায়ান নামে প্রসিদ্ধ); (৮) হিফজুর রহমান, কাসাসুল কুরআন (বাংলা অনুবাদ), ২য় খণ্ড, এমদাদিয়া লাইব্রেরী, ২য় সং, ঢাকা ১৯৯৭; (৯) সায়্যিদ আবুল আ'লা মওদূদী, তাফহীমাত (২য় খণ্ড), বাংলা অনুবাদ. নির্বাচিত রচনাবলী, আধুনিক প্রকাশনী, ১ম সং, ঢাকা ১৪১২/১৯৯১, ২, ৫৩-৭৫; (১০) আল-মুনজিদ ফিল-আলাম, শিরো, দাউদ; (১১) শাহ ওয়ালিউল্লাহ দিলাবী, তা'বীলুল আহাদীছ ফী রুমূযি কাসাসিল আম্বিয়া, মাতবা' আহমাদী, দিল্লী তা. বি., ৫৩-৭৫; (১২) মুহাম্মাদ জামীল আহমাদ, আম্বিয়া-ই কুরআন, লাহোর তা. বি., ৩, ৩৮-৯২।
(ঘ) পাশ্চাত্য উৎস : (১) পবিত্র বাইবেল, পুরাতন ও নূতন নিয়ম, বাংলাদেশ বাইবেল সোসাইটি, ঢাকা; (২) Encyclopaedia Britannica, London, 15th ed., vol. 5; (৩) Encyclopedia of Religion, New York London, vol. 4; (৪) Encyclopedia Americana, U.S.A., vol. 8; (৫) Encyclopaedia of World Biography, New York, vol. 3; (৬) বুতরুস আল-বুসতানী, দাইরাতুল মাআরিফ, বৈরূত, তা. বি., ৭ম খণ্ড, ৭৪-৫, শিরো. দাউদ; ৬, ৩, শিরো, তাবৃত; ৯, ৪৪১-২, শিরো. সান্ত; (৭) Faith of the World, Manas Publications, Delhi, 1st ed. 1860, Repr. 1986. (৮) Michael H. Hart, The 100, A Ranking of the most influential persons in History, Meera Publication, Madras (India) 1991.