📄 লুকমান (আ)-এর হাকীম হওয়ার উৎস ও প্রেক্ষাপট
বাহ্যত লুকমান (আ)-এর মধ্যে নবীসুলভ গুণাবলীর সমাবেশ ঘটিয়াছিল, কিন্তু তবুও তিনি নবী হইলেন না কেন এবং তাঁহার হাকীম হওয়া বা হিকমত লাভের প্রেক্ষাপট কি ছিল, এই প্রসংগে সাহাবী ও তাবি'ঈগণের বরাতে কতিপয় বর্ণনা পাওয়া যায়। এমনকি হাকীম তিরমিযী 'নাওয়াদির' (বিরল হাদীছ)-এ একটি মারফু' হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন যাহাতে বলা হইয়াছে যে, দাউদ (আ)-এর পূর্বে লুকমান (আ)-এর নিকট খিলাফতের প্রস্তাব করা হইলে তিনি বলিলেন, "যদি ইহা (আল্লাহর পক্ষ হইতে) প্রত্যক্ষ আদেশ হয় তবে নির্দ্বিধায় সানন্দে; আর যদি আমাকে উহাতে এখতিয়ার দেওয়া হয় তবে আমি উহার ব্যাপারে অব্যাহতিপ্রার্থী" (আদ-দুরুল মানছুরের বরাতে, মুফতী শফী, আহকামুল কুরআন)। ইবন উমার (রা) ও কাতাদার বরাতে এই প্রসংগে আরও চমকপ্রদ ও বিশদ বিরবণ পাওয়া যায়। 'আতিয়া সূত্রে বর্ণিত, ইবন 'উমার (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামকে বলিতে শুনিয়াছি: "লুকমান নবী ছিলেন না, তবে তিনি ছিলেন অতি চিন্তাশীল ও দৃঢ় বিশ্বাসের অধিকারী এক বান্দা। তিনি আল্লাহকে ভালবাসিলে আল্লাহও তাঁহাকে ভালবাসিলেন এবং হিকমাত দান করিয়া তাঁহার প্রতি অনুগ্রহ করিলেন এবং ন্যায়বিচার পরিচালনার জন্য তাঁহাকে খলীফা মনোনীত করিবার ব্যাপারে তাঁহাকে এখতিয়ার প্রদান করিলেন। লুকমান বলিলেন, হে প্রতিপালক! যদি আপনি আমাকে আমার ইচ্ছার উপর ছাড়িয়া দেন তবে আমি নিরাপত্তাকে কবুল করিলাম এবং বিপদকে বর্জন করিলাম। আর যদি ইহা আপনার প্রত্যক্ষ আদেশ হয় তবে বিনabak্যে ও নির্দ্বিধায় গ্রহণ করিব। কেননা, সে ক্ষেত্রে আপনিই আমাকে হেফাজত করিবেন।" ছা'লাবীর বর্ণনায় আরও আছে: "ফেরেশতা তখন অদৃশ্য হইতে আওয়াজ দিয়া বলিল, এরূপ কেন, হে লুকমান! তিনি বলিলেন, কেননা বিচারপতি একটি কঠিন ও অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিস্থিতিতে অবস্থান করে। নিপীড়িত লোকেরা সর্বত্র হইতে তাহার নিকট আগমন করে। যদি তাহাকে (আল্লাহর পক্ষ হইতে সঠিক বিচারের ব্যাপারে) সাহায্য করা হয়, তবে তো সে মুক্তি লাভ করে, আর বিচার ভুল করিলে জান্নাতের পথ হারাইয়া ফেলে। দুনিয়াতে নিচু থাকা তথায় নেতৃত্ব ও আভিজাত্যের চাইতে উত্তম। যে ব্যক্তি আখিরাতের উপর প্রাধান্য দেয় দুনিয়াকে, দুনিয়া তাহাকে বিমুখ করে এবং আখিরাতও তাহার হাতছাড়া হইয়া যায়। ফেরেশতারা লুকমানের এই সুন্দর কথনে বিস্মিত হইলেন। পরে লুকমান নিদ্রামগ্ন হইলে তাঁহাকে হিকমত দান করা হইল এবং নিদ্রা হইতে জাগ্রত হইয়া তিনি হিকমতপূর্ণ কথাবার্তা বলিতে লাগিলেন। পরবর্তী সময়ে দাউদ (আ)-কে (খিলাফতের জন্য) আহ্বান করা হইলে তিনি উহা কবুল করিলেন এবং লুকমান (আ)-এর কোন শর্ত আরোপ করিলেন না। ফলে তিনি (বিচারকার্যে) কয়েকবার বিচ্যুতির শিকার হইলেন। তবে প্রতি বারই আল্লাহ তাঁহাকে মাফ করিয়া দিলেন"। এই বর্ণনায় আরও আছে, লুকমান (আ) তাঁহার হিকমত দ্বারা দাউদ (আ)-কে সহায়তা করিতেন। একবার দাউদ (আ) তাঁহাকে বলিলেন, লুকমান! তোমার সৌভাগ্য তোমাকে হিকমত দেওয়া হইয়াছে এবং বিপদ হইতে দূরে রাখা হইয়াছে। আর দাউদকে খিলাফত দেওয়া হইয়াছে এবং তাহাকে সমস্যা ও বিপদের সম্মুখীন করা হইয়াছে (মুখতারু তাফসীরুল কুরতুবী, তাফসীরে মাজহারী, উরদু)।
ইব্ন আবূ হাতিম কাতাদা হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, কাতাদা বলেন, আল্লাহ তা'আলা লুকমান হাকীমকে নবুওয়াত ও হিকমতের মধ্যে এখতিয়ার প্রদান করিলে তিনি নবুওয়াতের বিপরীতে হikmat গ্রহণ করিলেন। তখন তাঁহার নিদ্রামগ্ন অবস্থায় জিবরীল (আ) আগমন করিয়া তাঁহার অন্তরে হিকমত ঢালিয়া দিলেন। ফলে সকালে তিনি হিকমতপূর্ণ কথা বলিতে লাগিলেন। কাতাদার বর্ণনায় আরও আছে, লুকমানকে প্রশ্ন করা হইল, আপনার প্রতিপালক আপনাকে এখতিয়ার দেওয়া সত্ত্বেও আপনি নবুওয়াত কবুল না করিয়া হিকমতকে পসন্দ করিলেন কেন? জবাবে লুকমান বলিলেন, আমাকে দৃঢ়রূপে নবুওয়াত প্রদান করা হইল উহাতে আমি সাফল্যের আশা করিতাম এবং উহার দায়িত্ব পালনে উত্তীর্ণ হওয়ার আশা করিতাম। কেননা তখন আল্লাহ তা'আলাই আমার তত্ত্বাবধান করিতেন। কিন্তু আমাকে এখতিয়ার দেওয়া হইলে নবুওয়াতের দায়দায়িত্ব প্রতিপালনে আমি নিজেকে অপারগ মনে করিলাম। কেননা তখন ইহার দায় আমার নিজেকেই বহন করিতে হইত। এই কারণে আমি হিকমতকে পসন্দ করিয়াছি। এই রিওয়ায়াতটি সম্পর্কে ইব্ন কাছীর সন্দেহ প্রকাশ করিয়াছেন (বিদায়া, মুখতারু তাফসীরিল কুরতুবী, মা'আরিফুল কুরআন, ফাতহুল বারী, মা'আলিমুত তানযীল, মুফতী শফী, আহকামুল কুরআন, মা'আরিফুল কুরআন)।
ইবন কাছীর (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া) প্রমুখ হযরত লুকমানের হিকমত প্রাপ্তির সূত্র সম্পর্কে আরও কতিপয় বর্ণনা উল্লেখ করিয়াছেন। যেমন ইব্ন জারীর উমার ইব্ন কায়স হইতে বর্ণনা করেন, একদিন লুকমান (আ) একটি বিশাল মাহফিলে হিকমতের কথা শুনাইতেছিলেন। তখন সেখানে এক ব্যক্তি আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, তুমি কি সেই লোকটি নও যে অমুক মাঠে আমার সহিত ছাগল চরাইত? লুকমান (আ) বলিলেন, হাঁ, আমি সেই ব্যক্তি। লোকটি বলিল, তাহা হইলে এখন আমি তোমার প্রতি মানুষের ভক্তি-শ্রদ্ধা এবং তোমার যে মর্যাদা দেখিতেছি উহার উৎস কি? লুকমান বলিলেন, ইহার উৎস আমার দুইটি কাজ। একঃ সর্বদা সত্য কথা বলা; দুই: অনর্থক কথা ও কাজ হইতে নিজেকে সংযত রাখা। ইব্ন আবী হাতিম আবদুর রহমান ইব্ন আবূ ইয়াযীদ হইতে বর্ণনা করেন, আল্লাহ তা'আলা লুকমান হাকীমকে তাঁহার হিকমতের কারণে উচ্চ মর্যাদায় অভিহিত করিলে তাঁহার পূর্ব-পরিচিত এক ব্যক্তি তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিল, তুমি কি অমুকের পুত্রের দাস নও যে সেদিনও আমার ছাগল চরাইত? লুকমান বলিলেন, হাঁ। লোকটি বলিল, তবে তোমার এই প্রভৃত মর্যাদার কারণ কি? লুকমান বলিলেন, আল্লাহর তাকদীর, আমানত প্রত্যর্পণ, সত্য ভাষণ এবং অনর্থক কার্যকলাপ বর্জন। ইব্ন ওয়াহবের বর্ণনায় আছে, এক ব্যক্তি লুকমান হাকীমের সম্মুখে দাঁড়াইয়া বলিল, তুমি বনূ নাহহাসের গোলাম লুকমানই তো? লুকমান বলিলেন, হাঁ। লোকটি বলিল, তুমি ছাগলের রাখাল সেই কালো মানুষটিই তো? লুকমান বলিলেন, (ভাই), আমার কালো বর্ণটি দৃশ্যমানই। কিন্তু আমার ব্যাপারে তোমার বিস্ময়ের কারণ কি? লোকটি বলিল, তোমার দুয়ারে মানুষের এই ভিড় এবং দলে দলে আগমন এবং তোমার বক্তব্য-ভাষণে তাহাদের আকর্ষণ ও তুষ্টিই বিস্ময়ের কারণ। লুকমান বলিলেন, ভ্রাতুষ্পুত্র! আমি তোমাকে যাহা বলিব তদনুসারে কাজ করিলে তুমিও আমার মত হইতে পারিবে। লোকটি বলিল, সে সব কি কাজ? লুকমান বলিলেন, "আমার দৃষ্টিকে অবনত রাখা, জিহ্বা নিয়ন্ত্রণে রাখা, আমার খাদ্যের নিষ্কলুষতা অর্থাৎ হালাল খাদ্যে তুষ্টি, আমার লজ্জাস্থানের হিফাজত করা, ওয়াদা প্রতিপালন করা এবং মেহমানকে সমাদর করা, প্রতিবেশীর রক্ষণাবেক্ষণ করা এবং অনর্থক কথা ও কাজ পরিত্যাগ করা। এই কাজগুলি আমাকে ঐ অবস্থায় পৌঁছাইয়াছে যাহা তুমি প্রত্যক্ষ করিতেছ" (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, মুখতারু তাফসীরিল কুরতুবী, মা'আরিফুল কুরআন)। একবার লুকমান (আ) এক ব্যক্তিকে বিশেষ দৃষ্টিতে তাকাইতে দেখিয়া তাহাকে বলিলেন, যদি তুমি আমার ওষ্ঠাধর ভারী দেখিয়া থাক তবে এই দুই ওষ্ঠের মধ্য হইতে কোমল কথা বাহির হয় এবং তুমি যদি আমাকে কালো দেখিয়া থাক, তবে আমার অন্তরটি সাদা (মুখতারু তাফসীরিল কুরতুবী)। ইব্ন আবী হাতিম আবু দারদা (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, লুকমান (আ)-এর আলোচনা প্রসংগে একদিন তিনি বলিলেন, লুকমান হাকীম ধনবল-জনবলে বলীয়ান ছিলেন না, উল্লেখযোগ্য কোন বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন না, তবে তিনি ছিলেন গম্ভীর প্রকৃতির নিরবতাপ্রিয়, অতি চিন্তাশীল ও সুগভীর দৃষ্টিসম্পন্ন। তিনি দিনের বেলা কখনও ঘুমাইতেন না। কেহ তাঁহাকে জনসমক্ষে থুথু ফেলিতে, গালি দিতে অথবা গলা পরিষ্কার করিতে, মানুষের দৃষ্টিসীমায় পেশাব-পায়খানা করিতে ও গোসল করিতে দেখে নাই। তিনি অহেতুক কথা বলিতেন না, হাসিতেন না, কোন কথার পুনরুক্তি করিতেন না। তবে কেহ কোঁন হিকমতের কথা পুনরায় শুনাইবার অনুরোধ করিলে বলিতেন। তিনি রাজদরবারে ও বিচারকদের এজলাসে দেখার জন্য গমনাগমন করিতেন, ভাবিতেন এবং সেখান হইতে শিক্ষার বিষয় আহরণ করিতেন। এইসব কারণেই তাঁহাকে হিকমত দান করা হইয়াছিল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া)।
📄 পবিত্র কুরআন ও হাদীছে লুকমান প্রসংগ
পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে যে, কুরআন মজীদে লুকমান (আ)-এর উল্লেখ রহিয়াছে। কুরআন মজীদের ৩১নং সূরাটির নাম রাখা হইয়াছে 'লুকমান', যাহা এই ঐতিহাসিক মনীষীর নামকে চিরন্তন করিয়া রাখিয়াছে। এই সূরায় আল্লাহ তা'আলার একত্বের সমর্থনে এবং শিরক ও কুফরী বাতিল হওয়া প্রসংগে লুকমানের প্রজ্ঞাপূর্ণ বাণীসমূহ স্থান পাইয়াছে। সূরার ১২ হইতে ১৯তম আয়াতে লুকমান (আ)-কে হিকমত প্রদান এবং লুকমান কর্তৃক তাঁহার পুত্রকে প্রদত্ত উপদেশের উল্লেখ রহিয়াছে। এই প্রসংগে ইরশাদ হইয়াছে:
"আমি লুকমানকে জ্ঞান দান করিয়াছিলাম এবং বলিাছিলাম, আল্লাহ্র প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সে তো তাহা করে নিজেরই জন্য এবং কেহ অকৃতজ্ঞ হইলে আল্লাহ তো অভাবমুক্ত, প্রশংসার্হ” (৩১: ১২)।
বস্তুত এই বর্ণনাধারা লুকমান (আ)-এর নবী না হইয়া 'হাকীম' হওয়ার স্পষ্ট ইংগিত বহন করে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা) হইতে বর্ণিত একটি হাদীছে উল্লেখ রহিয়াছে: "যাহারা ঈমান আনিয়াছে এবং তাহাদের ঈমানকে জুলুম দ্বারা কলুষিত করে নাই, নিরাপত্তা তাহাদেরই জন্য এবং তাহারাই সৎপথপ্রাপ্ত” (৬ঃ ৮২) শীর্ষক আয়াত নাযিল হইলে প্রতিভাত হয় যে, উহার প্রকাশ্য অর্থ অর্থাৎ ঈমান আনয়নের পরে কোনও প্রকার অন্যায় আচরণ করিলে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। ইহাতে সাহাবীগণ বিচলিত হইয়া পড়েন এবং বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের মধ্যে এমন কে আছে যে তাহার ঈমানকে কোন না কোন অন্যায় (জুলুম) দ্বারা কলুষিত করে নাই? (সুতরাং আমাদের মুক্তির উপায় কি?) তখন তাঁহাদের সান্ত্বনা প্রদান করিয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলিলেন, "তোমরা যেইরূপ ধারণা করিয়াছ (আয়াতের মর্ম) সেইরূপ নহে। তোমরা কি লুকমানের সেই কথা শুন নাই যাহা তিনি তাহার পুত্রকে বলিয়াছিলেন যে, "শিরকই হইল বড় জুলুম" (বুখারী, ২খ., ৭০৪, কিতাবুত তাফসীর, মুসলিম, ১খ., ৭৭, কিতাবুল ঈমান)? অর্থাৎ পূর্বোক্ত আয়াতে জুলুম দ্বারা উদ্দেশ্য শিরক যাহা দ্বারা আখেরাতে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়।
ইহা ছাড়া ইব্ন হিশামের সীরাত ও ইবনুল আছীরের উসদুল গাবা গ্রন্থে লুকমানের সহীফা সংক্রান্ত একটি ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। সুওয়ায়দ ইব্ন সামিত ছিলেন মদীনার একজন প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি, যিনি স্বীয় প্রজ্ঞা, বীরত্ব, কাব্যচর্চা ও বংশ মর্যাদার কারণে মদীনাবাসীদের নিকট 'কামিল' উপাধিতে ভূষিত ছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের হিজরতের কিছুকাল পূর্বে এই সুওয়ায়দ হজ্জ অথবা উমরা পালনের উদ্দেশে মক্কায় আগমন করিলেন। নবুওয়াত প্রাপ্তির পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম হজ্জব্রত পালনে আগত লোকদিগকে ইসলামের দাওয়াত দিতেন। তিনি সুওয়ায়দকেও ইসলামের দাওয়াত প্রদান করিলে তিনি বলিলেন, 'সম্ভবত আপনার নিকট যাহা আছে তাহা আমার নিকট যাহা আছে উহারই অনুরূপ। নবী আলায়হিস সালাম বলিলেন, আপনার নিকট কি আছে? সুওয়ায়দ বলিলেন, সাহীফা-ই লুকমান অর্থাৎ লুকমানের হিকমতপূর্ণ বাণীমালা। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের অনুরোধে সুওয়ায়দ উক্ত সাহীফার কিছু অংশ পাঠ করিয়া শুনাইলে নবী আলায়হিস সালাম বলিলেন, খুবই সুন্দর বক্তব্য; তবে আমার নিকট যাহা আছে উহা আরো উত্তম। সুওয়ায়দ উহা শুনিতে চাহিলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাহাকে পবিত্র কুরআনের কিছু অংশ তিলাওয়াত করিয়া শুনাইলেন। সুওয়ায়দ অকপটে স্বীকার করিলেন যে, নিঃসন্দেহে ইহা সাহীফায়ে লুকমান হইতে উত্তম। মদীনা প্রত্যাবর্তনের কিছু কাল পরে সুওয়ায়দ বু'আছ যুদ্ধে নিহত হন (ইবনুল আছীর, উসদুল গাবা, ২খ., ৩৭৮; দা. মা. ই., ১৯খ., ১২৯)।
📄 পবিত্র কুরআনে উদ্ধৃত লুকমান (আ)-এর উপদেশসমূহ
পবিত্র কুরআনের সূরা লুকমানে লুকমান (আ) কর্তৃক তাঁহার পুত্রকে প্রদত্ত উপদেশমালার বর্ণনা নিম্নরূপ:
"স্মরণ কর, যখন লুকমান তাহার পুত্রকে উপদেশ দিতে গিয়া বলিয়াছিল, হে বৎস! আল্লাহর কোন শরীক করিও না। নিশ্চয় শিরক চরম জুলুম। আমি তো মানুষকে তাহার পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়াছি। জননী সন্তানকে কষ্টের পর কষ্ট বরণ করিয়া গর্ভে ধারণ করে এবং তাহার দুধ ছাড়ান হয় দুই বৎসরে। সুতরাং আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। প্রত্যাবর্তন তো আমারই নিকট। তোমার পিতা-মাতা যদি তোমাকে পীড়াপীড়ি করে আমার সমকক্ষ দাঁড় করাইতে, যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নাই, তুমি তাহাদের কথা মানিও না, তবে পৃথিবীতে তাহাদের সহিত বসবাস করিবে সদ্ভাবে এবং যে বিশুদ্ধ চিত্তে আমার অভিমুখী হইয়াছে তাহার পথ অবলম্বন কর, অতঃপর তোমাদের প্রত্যাবর্তন আমারই নিকট এবং তোমরা যাহা করিতে সে বিষয়ে আমি তোমাদিগকে অবহিত করিব। হে বৎস! ক্ষুদ্র বস্তুটি যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয় এবং উহা যদি থাকে শিলাগর্ভে অথবা আকাশে কিংবা মৃত্তিকার নীচে, আল্লাহ তাহাও উপস্থিত করিবেন। আল্লাহ সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবগত। হে বৎস! সালাত কায়েম করিও, সৎকর্মের নির্দেশ দিও, আর অসৎ কর্মে নিষেধ করিও এবং আপদে-বিপদে ধৈর্য ধারণ করিও। ইহা তো দৃঢ় সংকল্পের কাজ। অহংকার বশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করিও না এবং পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে বিচরণ করিও না; নিশ্চয় আল্লাহ কোন উদ্ধত, অহংকারীকে পসন্দ করেন না। তুমি পদক্ষেপ করিও সংযতভাবে এবং তোমার কন্ঠস্বর নীচু করিও; নিশ্চয় স্বরের মধ্যে গর্দভের স্বরই সর্বাপেক্ষা অপ্রীতিকর" (৩১: ১৩-১৯)।
লুকমান (আ)-এর উল্লিখিত উপদেশমালায় তাওহীদ অবলম্বন ও শিরক্ বর্জন, আল্লাহ্র পূর্ণাংগ ইলম ও কুদরতে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন, আদর্শ ব্যক্তি ও সুষ্ঠু সমাজ গঠনের দৃঢ় সংকল্পের কর্মসূচী বাস্তবায়ন এবং শিষ্টাচার অবলম্বনের উল্লেখ রহিয়াছে (দ্র., সীউহারবী, কাসাসুল কুরআন ৩খ., ৪১-৪৬; মুফতী শফী, মা'আরিফুল কুরআন, ৭খ, ৩৬-৪০; জামীল আহমদ, আম্বিয়ায়ে কুরআন, ৩খ., ৫২০-৫২৩)।
📄 হযরত লুকমান (আ)-এর উপদেশাবলী
সাহীফায়ে লুকমান বা লুকমান (আ)-এর বাণী সম্বলিত পুস্তিকা বর্তমান কালে বিদ্যমান না থাকিলেও বহু তাফসীর ও ইতিহাস গ্রন্থে উহার বিবরণ উদ্বৃত হইয়াছে। এই প্রসঙ্গে ওয়াহব ইবন মুনাব্বিহ বলেন, 'আমি লুকমান (আ)-এর হিকমত ও জ্ঞানগর্ভ বাণী সংক্রান্ত দশ হাজারের অধিক অধ্যায় অধ্যয়ন করিয়াছি (মুখতাসার তাফসীরুল কুরতুবী, পৃ. ৬২৩; মা'আরিফুল কুরআন, ৭খ, ৩৫)। ইবন আবী হাতিমের আহরিত হাম্স ইবন উমারের একটি বর্ণনায় আছে, একদিন লুকমান (আ) সরিষা ভর্তি একটি পৌটলা নিজের কাছে রাখিয়া স্বীয় পুত্রকে উপদেশ দিতে লাগিলেন এবং একটি উপদেশ দেওয়ার পর একটি করিয়া সরিষার দানা বাহির করিতে লাগিলেন। এইভাবে উপদেশ দিতে দিতে সরিষার সকল দানা বাহির করিয়া নিঃশেষ করিলেন (আল বিদায়া, ২খ, ১২৭)।
ইবন কাছীর তাঁহার তাফসীরে ও ইতিহাস গ্রন্থে (ইবন কাছীর, ৩খ., সূরা লুকমান; বিদায়া, ২খ, ১২৭, ১২৮, ১২৯) ইমাম আহমাদ (র)-এর কিতাবু'য-যুহৃদ ও অন্যান্য গ্রন্থের বরাতে লুকমান (আ)-এর অনেক বাণী উদ্ধৃত করিয়াছেন। এখানে উহার অংশবিশেষ উপস্থাপন করা হইল।
(১) ইবন উমার (রা) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম হইতে বর্ণনা করেন, লুকমান হাকীম বলিতেন, আল্লাহ তা'আলা কাহাকেও কোন কিছুর আমানতদার বানাইলে তাহার কর্তব্য উহার হিফাজত করা। (২) কাসিম ইবন মুখায়মির রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম হইতে বর্ণনা করেন, লুকমান (আ) তাঁহার পুত্রকে উপদেশ দিয়া বলিলেন, তুমি মুখোশ লাগাইয়া মুখমণ্ডল আচ্ছাদিত করিবে না; কেননা উহা রাত্রিকালে বিশ্বাসঘাতকতাতুল্য এবং দিনের বেলা নিন্দনীয়। (৩) সিররী ইবন ইয়াহইয়া হইতে বর্ণিত, লুকমান (আ) তাঁহার পুত্রকে বলিলেন, হে বৎস! হিকমত ও প্রজ্ঞা ফকীরকে বাদশাহর মসনদে সমাসীন করে। (৪) আওন ইবন আবদুল্লাহ হইতে বর্ণিত, তুমি কোন মজলিসে গেলে প্রথমে মজলিসের লোকদিগকে সালাম করিয়া কোন এক প্রান্তে বসিয়া পড়িবে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত মজলিসের আলোচনা শেষ না হইবে ততক্ষণ কোন কথা বলিবে না। যদি দেখ যে, তাহারা আল্লাহ্র স্মরণে মশগুল হয় তবে তুমিও তাহাদের সহিত অংশগ্রহণ করিবে। আর তাহারা বাজে কথায় লিপ্ত হইলে তুমি সেই স্থান ত্যাগ করিয়া অন্যত্র উত্তম মজলিসের সন্ধান করিবে। (৫) উবায়দ ইবন উমায়র হইতে বর্ণিত, তুমি উত্তম মজলিসের সন্ধানে থাকিবে; যখন এমন কোন মজলিস পাইবে যাহাতে আল্লাহ্ কথা আলোচিত হয় তখন তাহাদের সহিত বসিয়া পড়িবে। কেননা তুমি আলিম হইলে তোমার ইল্ম উপকার সাধন করিবে, আর তুমি নির্বোধ হইলে তাহারা তোমাকে আলিম বানাইয়া দিবে এবং আল্লাহ তা'আলা তাহাদের প্রতি রহমত বর্ষণ করিলে তুমিও উহাতে অংশীদার হইতে পারিবে। (৬) যে মজলিসে আল্লাহ্ কথা আলোচিত হয় না, সেখানে তুমি বসিবে না, কেননা তুমি আলিম হইলে তোমার ইল্ম কোন কাজে আসিবে না; আর তুমি নির্বোধ হইলে তাহারা তোমাকে আরো নির্বোধ বানাইবে এবং কখনও তাহাদের উপর আল্লাহর ক্রোধ আপতিত হইলে তুমিও উহাতে আক্রান্ত হইবে। (৭) মু'মিনদের রক্ত ঝরায় এমন কোন শক্তিধরের প্রতি ঈর্ষান্বিত হইবে না; কেননা তাহার জন্য আল্লাহ্র নিকট এমন এক ঘাতক আছে যে কখনো মরে না। (৮) হে বৎস! আল্লাহ্ আনুগত্যকে তিজারতরূপে গ্রহণ কর, বিনা পুঁজিতে তোমার হাতে মুনাফা আসিতে থাকিবে। (৯) হে বৎস! আল্লাহ তা'আলাকে ভয় কর এবং লোকের সম্মান লাভের উদ্দেশ্যে আল্লাহ ভীতির প্রদর্শনী করিও না, অথচ তোমার অন্তর পংকিলতায় পূর্ণ। (১০) হে বৎস! মূর্খ লোকের বন্ধুত্বের প্রতি আকৃষ্ট হইও না; কেননা সে মনে করিবে যে, তুমি তাহার মূর্খতার কাজগুলি পসন্দ করিতেছ। জ্ঞানীর অসন্তুষ্টিকে বেপরোয়া হইয়া উড়াইয়া দিও না; কেননা তাহা হইলে সে তোমার প্রতি উদাসীন হইবে এবং তোমাকে বর্জন করিবে। (১১) জ্ঞানীদের মুখে আল্লাহ প্রদত্ত শক্তি নিহিত রহিয়াছে, আল্লাহ তাঁহার মর্ষী অনুসারে যেইরূপ করিতে চাহেন, জ্ঞানীদের কথা ও কাজের জন্য 'সেইরূপ উপকরণ সৃষ্টি করিয়া দেন। (১২) হে বৎস! নিরবতার পরিণতিতে কখনও অনুতপ্ত হইতে হয় না; কথা বলা রৌপ্য হইলে নিরবতা স্বর্ণতুল্য। (১৩) হে বৎস! সর্বদা মন্দ হইতে দূরে অবস্থান করিবে। তাহা হলে মন্দও তোমা হইতে দূরে থাকিবে। কেননা, মন্দ হইতেই মন্দের উৎপত্তি'। (১৪) হে বৎস! কোন কিছুর প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহী ও কৌতূহলী হইবে না। কেননা, অতি আগ্রহ আপনজনকে আপনজন হইতে দূরে সরাইয়া দেয়। হে বৎস! মাত্রাতিরিক্ত ক্রোধ হইতে আত্মসংবরণ করিবে; কেননা প্রচণ্ড ক্রোধ জ্ঞানীর অন্তরকে মৃতপ্রায় বানাইয়া দেয়। (১৫) হে বৎস! মিষ্টীভাষী হও, হাসিমুখ হও, তাহা হইলে তুমি মানুষের নিকট সেই ব্যক্তির চাইতেও প্রিয় হইবে, যে তাহাদিগকে সর্বদা দান-খয়রাত করিয়া থাকে।” (১৬) "কোমলতা প্রজ্ঞার মূল।” (১৭) "যেমন বীজ বপন করিবে, তেমন ফসল কর্তন করিবে।” (১৮) "নিজের বন্ধু ও পিতার বন্ধুর সহিত বন্ধুত্ব রক্ষা করিবে।” (১৯) আবূ কিলাবা হইতে বর্ণিত, "লোকেরা লুকমানকে জিজ্ঞাসা করিল, সর্বাধিক ধৈর্যশীল ব্যক্তি কে? তিনি বলিলেন, 'যাহার ধৈর্যের পশ্চাতে নির্যাতন থাকে না। লোকেরা বলিল, স্বরচাইতে বড় আলিম কে? লুকমান বলিলেন, যে ব্যক্তি অন্যের ইল্ম দ্বারা নিজের ইলমকে সমৃদ্ধ করিতে থাকে। লোকেরা বলিল, সর্বোত্তম ব্যক্তি কে? লুকমান (রা) বলিলেন, ধনবান। লোকেরা বলিল, সম্পদে ধনবান? লুকমান (রা) বলিলেন, না, ধনবান সেই ব্যক্তি, যে নিজের অভ্যন্তরে কোন কল্যাণ সন্ধান করিলে উহা বিদ্যমান পায়, অন্যথায় নিজেকে অপর মানুষ হইতে অমুখাপেক্ষী রাখে।” (২০) সুলায়মান ইবন 'উয়ায়না হইতে বর্ণিত, "লুকমান (আ)-কে জিজ্ঞাসা করা হইল, সর্বাধিক নিকৃষ্ট ব্যক্তি কে? তিনি বলিলেন, যে মন্দ কাজ করে এবং মানুষ তাহাকে মন্দ কাজ করিতে দেখিয়া মন্দ মনে করিবে ইহার তোয়াক্কা করে না।” (২১) "যাহারা মানুষের মনোরঞ্জনের উদ্দেশ্যে কথা বলে, আল্লাহ তাহাদের অস্থিসমূহ বিচূর্ণ করিবেন।” (২২) তুমি তোমার জ্ঞাত বিষয়গুলিকে এখনও কার্যে বাস্তবায়িত কর নাই, এই অবস্থায় তোমার অজ্ঞাত বিষয়ের জ্ঞান আহরণে কোন কল্যাণ নাই। কেননা, ইহার দৃষ্টান্ত সেই ব্যক্তির ন্যায় যে কাঠ কুড়াইয়া একটি গাট বাঁধিল এবং উহা তুলিয়া নিতে অক্ষম হইল। তারপরও সে কাঠ কুড়াইয়া গাটের সহিত বাধিতে লাগিল।” (২৩) আবূ সা'ঈদ হইতে বর্ণিত, লুকমান তাঁহার পুত্রকে বলিলেন, নেককার মুত্তাকী লোকেরাই যেন তোমার দস্তরখানে খাবার গ্রহণ করে এবং বুদ্ধি পরামর্শ তুমি হক্কানী আলিমগণের নিকট হইতেই গ্রহণ করিবে” (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, মুখতারু তাফসীরিল কুরতুবী, মা'আরিফুল কুরআন)।
(২৪) বাগাবী হাসান হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, লুকমান (আ) তাঁহার পুত্রকে বলিলেন, হে বৎস! তুমি এই সাধারণ মোরগটির চাইতেও অপারগ হইও না, এইভাবে যে, সে তো শেষ রাত্রে ঘুম হইতে জাগ্রত হইয়া ডাকিতে থাকিল আর তুমি তখন তোমার আরামের শয্যায় সুখনিদ্রায় বিভোর রহিলে (তাফসীরে মাজহারী, ২খ., ২৫)। (২৫) "হে বৎস! দুনিয়া একটি গভীর সমুদ্র। ইহাতে অনেক মানুষের সলিল সমাধি হইয়াছে, এই সমুদ্রের বুকে আল্লাহভীতিকে তুমি জাহাজ বানাও এবং ঈমানের পণ্য দ্বারা উহা ভর্তি কর এবং আল্লাহ্র উপর ভরসাকে উহার পাল বানাও। তবে আশা করা যায় যে, তুমি মুক্তি পাইবে (অন্যথায়) তুমি মুক্তি পাইবে বলিয়া মনে করি না। (২৬) যে ব্যক্তির অভ্যন্তরে তাহার উপদেশদাতা থাকে তাহার জন্য আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হইতে একজন হিফাজতকারী নিযুক্ত হন। যে ব্যক্তি মানুষের সহিত নিজের সম্পর্কে ইনসাফের আচরণ করে আল্লাহ তা'আলা তাহার ইজ্জত বৃদ্ধি করিয়া দেন। আল্লাহ তা'আলার আনুগত্যে অবনমিত হওয়া পাপাচারের দ্বারা মর্যাদাবান হওয়ার চাইতে শ্রেয়। (২৭) পিতা কর্তৃক সন্তানকে শাসন করা ফসলে সার প্রদানের ন্যায়। (২৮) হে বৎস! ঋণগ্রস্ত হইও না, কেননা উহা দিবসে লাঞ্ছনা ও রাত্রিতে দুশ্চিন্তার কারণ। (২৯) হে বৎস! আল্লাহ তা'আলার প্রতি এই পরিমাণ আশাবাদী হইবে যাহা তোমাকে তাঁহার অবাধ্যতায় দুঃসাহসী না করে। আর তাঁহাকে এই পরিমাণ ভয় করিবে যাহা তোমাকে তাঁহার রহমত হইতে নিরাশ করে না। (৩০) মানুষ মিথ্যাবাদী হইলে তাহার প্রভাব নিঃশেষ হইয়া যায় এবং বদ-স্বভাবী হইলে তাঁহার দুঃখ বৃদ্ধি পায়। অতি ভারী পাথর স্থানান্তর করা নির্বোধকে বুদ্ধিদানের চাইতে সহজ। (৩১) হে বৎস! আমি ভারী লোহা, পাথর ও অন্যান্য ভারী বস্তু বহন করিয়াছি, কিন্তু মন্দ প্রতিবেশীর চাইতে অধিক ভারী কিছু বহন করিয়া নাই। আমি বহু তিক্ত বস্তুর স্বাদ আস্বাদন করিয়াছি, কিন্তু দারিদ্র্যের চাইতে অধিক তিক্ত কোন বস্তু দেখি নাই। (৩২) হে বৎস! তুমি কোন মূর্খকে তোমার দূতরূপে পাঠাইবে না; দূত হিসাবে কোন বুদ্ধিমান ব্যক্তি না পাইলে নিজেই নিজের দূত হইবে। (৩৩) হে বৎস! মিথ্যা চূড়ান্তরূপে বর্জন করিবে। কেননা উহা চড়ুই পাখীর গোশতের ন্যায় অত্যন্ত আকর্ষণীয়, কিন্তু অনতিবিলম্বে উহা প্রতিপক্ষকে উত্তপ্ত করিয়া তোলে। (৩৪) হে বৎস! জানাযায় (শোক সভায়) অংশগ্রহণ করিবে, বিবাহের আনন্দ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করিবে না। কেননা, জানাযা তোমাকে আখিরাত স্মরণ করাইয়া দিবে আর বিবাহের অনুষ্ঠান দুনিয়াকে তোমার নিকট আকর্ষণীয় করিয়া দিবে। (৩৫) হে বৎস! পরিতৃপ্ত উদরে পুনঃভক্ষণ করিওনা, কেননা, উহা ভক্ষণ করিবার চাইতে কুকুরের সম্মুখে রাখিয়া দেওয়া উত্তম। (৩৬) হে বৎস! মিষ্ট হইও না, তাহা হইলে লোকেরা তোমাকে গিলিয়া ফেলিবে; তিক্ত হইও না, তাহা হইল লোকেরা তোমাকে ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দিবে। (৩৭) হে বৎস! তুমি কাহারো সহিত বন্ধুত্ব স্থাপনের ইচ্ছা করিলে অগ্রে তাহাকে যাচাই করিবার জন্য কোন কিছু দ্বারা তাহাকে রাগাইয়া দিবে। রাগান্বিত অবস্থায়ও সে তোমার সহিত ন্যায়সংগত আচরণ করিলেই তাঁহাকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করিবে; অন্যথায় তাহাকে বর্জন করিবে। (৩৮) তোমার সহকর্মী ও বন্ধুর সহিত তোমার আচরণ হইবে এমন যেন তোমার নিকট তাহার কোন প্রয়োজন নাই এবং তাহাকে ব্যতীত তোমার গত্যন্তর নাই। (৩৯) হে বৎস! এমন ব্যক্তির ন্যায় হও যে কাহারও প্রশংসার প্রত্যাশী নহে এবং তাহাদের নিন্দার পাত্রও নহে। এমন হইলে সে হইবে আত্মপ্রত্যয়ী এবং মানুষও তাহার ব্যবহারে খুশী থাকিবে। (৪০) হে বৎস! তোমার মুখ নিঃসৃত উক্তির ব্যাপারে তুমি সংযত থাকিবে। কেননা, তোমার নীরবতা পর্যন্তই তোমার নিরাপত্তা। কথা শুধু ততটুকুই বলিবে যতটু তোমার উপকারে আসিবে (তাফসীরে রূহুল মা'আনী)।