📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত লুকমান (আ)-এর নবুওয়াত প্রসংগ

📄 হযরত লুকমান (আ)-এর নবুওয়াত প্রসংগ


হযরত লুকমান নবী ছিলেন কিনা এই প্রসংগেও পূর্বসূরী মনীষীদের মধ্যে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। অধিকাংশের মতে তিনি নবী ছিলেন না। শুধু ইকরিমা ও শা'বী হইতে তাঁহার নবী হওয়ার কথা বর্ণিত হইয়াছে (ফাতহুল বারী, মুখতারুত তাফসীরিল কুরতুবী, মাদারিক ও খাযিনের বরাতে মুফতী' শফী, আহকামুল কুরআন, মা'আরিফুল কুরআন)। ইব্‌ন ওয়াহ্হ্ সূত্রে মুহাম্মাদ ইব্‌ন ইসহাকের একটি বর্ণনা পূর্বে উল্লিখিত হইয়াছে যাহাতে ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতেও লুকমানের নবী হওয়ার কথা বলা হইয়াছে। "নবী ছিলেন, রাসূল ছিলেন না" (কাসাসুল কুরআন; বরাত, কিতাবুত তীজান)। বাগাবী বলিয়াছেন, এই বিষয়ে আলিমগণের ঐক্যমত্য রহিয়াছে যে, লুকমান 'হাকীম' ছিলেন, নবী ছিলেন না। একাকী ইক্রিক্রমা তাঁহাকে নবী বলিয়াছেন (মা'আলিমুত তানযীল)। পবিত্র কুরআনের সূরা লুকমানে তাঁহার সারগর্ভ ও প্রজ্ঞাপূর্ণ উপদেশমালার কথা বিশেষ গুরুত্বের সহিত বর্ণিত হইলেও উহার বর্ণনাভংগীতে এবং কোন আয়াত বা শব্দে এমন কোন ইংগিত পাওয়া যায় না যাহা দ্বারা লুকমানের নবী হওয়া বুঝা যাইতে পারে। এই কারণে অধিকাংশ মনীষী তাঁহার নবী না হওয়ার মত পোষণ করিয়াছেন। এমন কি ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতেও নবী না হওয়ার বর্ণনাও রহিয়াছে। এই প্রসংগে ইব্‌ন কাছীর সুস্পষ্ট বক্তব্য প্রদান করিয়াছেন। তিনি লিখিয়াছেন: "জমহূরের প্রসিদ্ধ উক্তি এই যে, তিনি হাকীম ও ওয়ালী ছিলেন, নবী ছিলেন না। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে তাঁহার প্রশংসা করিয়া তাঁহার সর্বাধিক প্রিয়পাত্র স্বীয় পুত্রকে প্রদত্ত তাঁহার উপদেশগুলির বর্ণনা প্রদান করিয়াছেন" (আল-বিদায়া)। অদ্রূপ "আমি লুকমানকে হিকমত দান করিয়াছিলাম.......") আয়াতের ব্যাখ্যায় কাতাদা হইতে বর্ণিত হইয়াছে, "(হিকমাত অর্থ) ফিকহ ও ইসলাম; তিনি নবী ছিলেন না; তাঁহার নিকট ওহী প্রেরণ করা হয় নাই। পূর্বসূরীদের অনেকের বরাতে এইরূপ বর্ণিত হইয়াছে। তাহাদের মধ্যে রহিয়াছেন মুজাহিদ, সা'ঈদ ইবনুল মুসায়‍্যাব এবং ইব্‌ন আব্বাস (রা) প্রমুখ" (প্রাগুক্ত, কাসাসুল কুরআন, আম্বিয়ায়ে কুরআন, রূহুল মা'আনী, মাজহারী, মা'আরিফুল কুরআন, মুখতারু তাফসীরিল কুরতুবী, ফাতহুল বারী)। সা'ঈদ ইবনুল মুসায়্যাবের বর্ণনা "আল্লাহ তাহাকে হিকমত দিয়াছেন, নবুওয়াত দেন নাই..... ইতোপূর্বে উল্লিখিত হইয়াছে, জমহূরের মতে হিকমত অর্থ সুবুদ্ধি, বুদ্ধিমত্তা, তীক্ষ্ণ মেধা, প্রজ্ঞা, ইল্ম ও ইল্ল্ম অনুসারে আমল এবং এক কথায় কথা ও কাজে সুষ্ঠুতা সম্পন্ন হওয়া" (রূহুল মা'আনী, মা'আরিফুল কুরআন, মুখতাসার ইব্‌ন কাছীর)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 লুকমান (আ)-এর হাকীম হওয়ার উৎস ও প্রেক্ষাপট

📄 লুকমান (আ)-এর হাকীম হওয়ার উৎস ও প্রেক্ষাপট


বাহ্যত লুকমান (আ)-এর মধ্যে নবীসুলভ গুণাবলীর সমাবেশ ঘটিয়াছিল, কিন্তু তবুও তিনি নবী হইলেন না কেন এবং তাঁহার হাকীম হওয়া বা হিকমত লাভের প্রেক্ষাপট কি ছিল, এই প্রসংগে সাহাবী ও তাবি'ঈগণের বরাতে কতিপয় বর্ণনা পাওয়া যায়। এমনকি হাকীম তিরমিযী 'নাওয়াদির' (বিরল হাদীছ)-এ একটি মারফু' হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন যাহাতে বলা হইয়াছে যে, দাউদ (আ)-এর পূর্বে লুকমান (আ)-এর নিকট খিলাফতের প্রস্তাব করা হইলে তিনি বলিলেন, "যদি ইহা (আল্লাহর পক্ষ হইতে) প্রত্যক্ষ আদেশ হয় তবে নির্দ্বিধায় সানন্দে; আর যদি আমাকে উহাতে এখতিয়ার দেওয়া হয় তবে আমি উহার ব্যাপারে অব্যাহতিপ্রার্থী" (আদ-দুরুল মানছুরের বরাতে, মুফতী শফী, আহকামুল কুরআন)। ইবন উমার (রা) ও কাতাদার বরাতে এই প্রসংগে আরও চমকপ্রদ ও বিশদ বিরবণ পাওয়া যায়। 'আতিয়া সূত্রে বর্ণিত, ইবন 'উমার (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামকে বলিতে শুনিয়াছি: "লুকমান নবী ছিলেন না, তবে তিনি ছিলেন অতি চিন্তাশীল ও দৃঢ় বিশ্বাসের অধিকারী এক বান্দা। তিনি আল্লাহকে ভালবাসিলে আল্লাহও তাঁহাকে ভালবাসিলেন এবং হিকমাত দান করিয়া তাঁহার প্রতি অনুগ্রহ করিলেন এবং ন্যায়বিচার পরিচালনার জন্য তাঁহাকে খলীফা মনোনীত করিবার ব্যাপারে তাঁহাকে এখতিয়ার প্রদান করিলেন। লুকমান বলিলেন, হে প্রতিপালক! যদি আপনি আমাকে আমার ইচ্ছার উপর ছাড়িয়া দেন তবে আমি নিরাপত্তাকে কবুল করিলাম এবং বিপদকে বর্জন করিলাম। আর যদি ইহা আপনার প্রত্যক্ষ আদেশ হয় তবে বিনabak্যে ও নির্দ্বিধায় গ্রহণ করিব। কেননা, সে ক্ষেত্রে আপনিই আমাকে হেফাজত করিবেন।" ছা'লাবীর বর্ণনায় আরও আছে: "ফেরেশতা তখন অদৃশ্য হইতে আওয়াজ দিয়া বলিল, এরূপ কেন, হে লুকমান! তিনি বলিলেন, কেননা বিচারপতি একটি কঠিন ও অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিস্থিতিতে অবস্থান করে। নিপীড়িত লোকেরা সর্বত্র হইতে তাহার নিকট আগমন করে। যদি তাহাকে (আল্লাহর পক্ষ হইতে সঠিক বিচারের ব্যাপারে) সাহায্য করা হয়, তবে তো সে মুক্তি লাভ করে, আর বিচার ভুল করিলে জান্নাতের পথ হারাইয়া ফেলে। দুনিয়াতে নিচু থাকা তথায় নেতৃত্ব ও আভিজাত্যের চাইতে উত্তম। যে ব্যক্তি আখিরাতের উপর প্রাধান্য দেয় দুনিয়াকে, দুনিয়া তাহাকে বিমুখ করে এবং আখিরাতও তাহার হাতছাড়া হইয়া যায়। ফেরেশতারা লুকমানের এই সুন্দর কথনে বিস্মিত হইলেন। পরে লুকমান নিদ্রামগ্ন হইলে তাঁহাকে হিকমত দান করা হইল এবং নিদ্রা হইতে জাগ্রত হইয়া তিনি হিকমতপূর্ণ কথাবার্তা বলিতে লাগিলেন। পরবর্তী সময়ে দাউদ (আ)-কে (খিলাফতের জন্য) আহ্বান করা হইলে তিনি উহা কবুল করিলেন এবং লুকমান (আ)-এর কোন শর্ত আরোপ করিলেন না। ফলে তিনি (বিচারকার্যে) কয়েকবার বিচ্যুতির শিকার হইলেন। তবে প্রতি বারই আল্লাহ তাঁহাকে মাফ করিয়া দিলেন"। এই বর্ণনায় আরও আছে, লুকমান (আ) তাঁহার হিকমত দ্বারা দাউদ (আ)-কে সহায়তা করিতেন। একবার দাউদ (আ) তাঁহাকে বলিলেন, লুকমান! তোমার সৌভাগ্য তোমাকে হিকমত দেওয়া হইয়াছে এবং বিপদ হইতে দূরে রাখা হইয়াছে। আর দাউদকে খিলাফত দেওয়া হইয়াছে এবং তাহাকে সমস্যা ও বিপদের সম্মুখীন করা হইয়াছে (মুখতারু তাফসীরুল কুরতুবী, তাফসীরে মাজহারী, উরদু)।
ইব্‌ন আবূ হাতিম কাতাদা হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, কাতাদা বলেন, আল্লাহ তা'আলা লুকমান হাকীমকে নবুওয়াত ও হিকমতের মধ্যে এখতিয়ার প্রদান করিলে তিনি নবুওয়াতের বিপরীতে হikmat গ্রহণ করিলেন। তখন তাঁহার নিদ্রামগ্ন অবস্থায় জিবরীল (আ) আগমন করিয়া তাঁহার অন্তরে হিকমত ঢালিয়া দিলেন। ফলে সকালে তিনি হিকমতপূর্ণ কথা বলিতে লাগিলেন। কাতাদার বর্ণনায় আরও আছে, লুকমানকে প্রশ্ন করা হইল, আপনার প্রতিপালক আপনাকে এখতিয়ার দেওয়া সত্ত্বেও আপনি নবুওয়াত কবুল না করিয়া হিকমতকে পসন্দ করিলেন কেন? জবাবে লুকমান বলিলেন, আমাকে দৃঢ়রূপে নবুওয়াত প্রদান করা হইল উহাতে আমি সাফল্যের আশা করিতাম এবং উহার দায়িত্ব পালনে উত্তীর্ণ হওয়ার আশা করিতাম। কেননা তখন আল্লাহ তা'আলাই আমার তত্ত্বাবধান করিতেন। কিন্তু আমাকে এখতিয়ার দেওয়া হইলে নবুওয়াতের দায়দায়িত্ব প্রতিপালনে আমি নিজেকে অপারগ মনে করিলাম। কেননা তখন ইহার দায় আমার নিজেকেই বহন করিতে হইত। এই কারণে আমি হিকমতকে পসন্দ করিয়াছি। এই রিওয়ায়াতটি সম্পর্কে ইব্‌ন কাছীর সন্দেহ প্রকাশ করিয়াছেন (বিদায়া, মুখতারু তাফসীরিল কুরতুবী, মা'আরিফুল কুরআন, ফাতহুল বারী, মা'আলিমুত তানযীল, মুফতী শফী, আহকামুল কুরআন, মা'আরিফুল কুরআন)।
ইবন কাছীর (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া) প্রমুখ হযরত লুকমানের হিকমত প্রাপ্তির সূত্র সম্পর্কে আরও কতিপয় বর্ণনা উল্লেখ করিয়াছেন। যেমন ইব্‌ন জারীর উমার ইব্‌ন কায়স হইতে বর্ণনা করেন, একদিন লুকমান (আ) একটি বিশাল মাহফিলে হিকমতের কথা শুনাইতেছিলেন। তখন সেখানে এক ব্যক্তি আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, তুমি কি সেই লোকটি নও যে অমুক মাঠে আমার সহিত ছাগল চরাইত? লুকমান (আ) বলিলেন, হাঁ, আমি সেই ব্যক্তি। লোকটি বলিল, তাহা হইলে এখন আমি তোমার প্রতি মানুষের ভক্তি-শ্রদ্ধা এবং তোমার যে মর্যাদা দেখিতেছি উহার উৎস কি? লুকমান বলিলেন, ইহার উৎস আমার দুইটি কাজ। একঃ সর্বদা সত্য কথা বলা; দুই: অনর্থক কথা ও কাজ হইতে নিজেকে সংযত রাখা। ইব্‌ন আবী হাতিম আবদুর রহমান ইব্‌ন আবূ ইয়াযীদ হইতে বর্ণনা করেন, আল্লাহ তা'আলা লুকমান হাকীমকে তাঁহার হিকমতের কারণে উচ্চ মর্যাদায় অভিহিত করিলে তাঁহার পূর্ব-পরিচিত এক ব্যক্তি তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিল, তুমি কি অমুকের পুত্রের দাস নও যে সেদিনও আমার ছাগল চরাইত? লুকমান বলিলেন, হাঁ। লোকটি বলিল, তবে তোমার এই প্রভৃত মর্যাদার কারণ কি? লুকমান বলিলেন, আল্লাহর তাকদীর, আমানত প্রত্যর্পণ, সত্য ভাষণ এবং অনর্থক কার্যকলাপ বর্জন। ইব্‌ন ওয়াহবের বর্ণনায় আছে, এক ব্যক্তি লুকমান হাকীমের সম্মুখে দাঁড়াইয়া বলিল, তুমি বনূ নাহহাসের গোলাম লুকমানই তো? লুকমান বলিলেন, হাঁ। লোকটি বলিল, তুমি ছাগলের রাখাল সেই কালো মানুষটিই তো? লুকমান বলিলেন, (ভাই), আমার কালো বর্ণটি দৃশ্যমানই। কিন্তু আমার ব্যাপারে তোমার বিস্ময়ের কারণ কি? লোকটি বলিল, তোমার দুয়ারে মানুষের এই ভিড় এবং দলে দলে আগমন এবং তোমার বক্তব্য-ভাষণে তাহাদের আকর্ষণ ও তুষ্টিই বিস্ময়ের কারণ। লুকমান বলিলেন, ভ্রাতুষ্পুত্র! আমি তোমাকে যাহা বলিব তদনুসারে কাজ করিলে তুমিও আমার মত হইতে পারিবে। লোকটি বলিল, সে সব কি কাজ? লুকমান বলিলেন, "আমার দৃষ্টিকে অবনত রাখা, জিহ্বা নিয়ন্ত্রণে রাখা, আমার খাদ্যের নিষ্কলুষতা অর্থাৎ হালাল খাদ্যে তুষ্টি, আমার লজ্জাস্থানের হিফাজত করা, ওয়াদা প্রতিপালন করা এবং মেহমানকে সমাদর করা, প্রতিবেশীর রক্ষণাবেক্ষণ করা এবং অনর্থক কথা ও কাজ পরিত্যাগ করা। এই কাজগুলি আমাকে ঐ অবস্থায় পৌঁছাইয়াছে যাহা তুমি প্রত্যক্ষ করিতেছ" (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, মুখতারু তাফসীরিল কুরতুবী, মা'আরিফুল কুরআন)। একবার লুকমান (আ) এক ব্যক্তিকে বিশেষ দৃষ্টিতে তাকাইতে দেখিয়া তাহাকে বলিলেন, যদি তুমি আমার ওষ্ঠাধর ভারী দেখিয়া থাক তবে এই দুই ওষ্ঠের মধ্য হইতে কোমল কথা বাহির হয় এবং তুমি যদি আমাকে কালো দেখিয়া থাক, তবে আমার অন্তরটি সাদা (মুখতারু তাফসীরিল কুরতুবী)। ইব্‌ন আবী হাতিম আবু দারদা (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, লুকমান (আ)-এর আলোচনা প্রসংগে একদিন তিনি বলিলেন, লুকমান হাকীম ধনবল-জনবলে বলীয়ান ছিলেন না, উল্লেখযোগ্য কোন বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন না, তবে তিনি ছিলেন গম্ভীর প্রকৃতির নিরবতাপ্রিয়, অতি চিন্তাশীল ও সুগভীর দৃষ্টিসম্পন্ন। তিনি দিনের বেলা কখনও ঘুমাইতেন না। কেহ তাঁহাকে জনসমক্ষে থুথু ফেলিতে, গালি দিতে অথবা গলা পরিষ্কার করিতে, মানুষের দৃষ্টিসীমায় পেশাব-পায়খানা করিতে ও গোসল করিতে দেখে নাই। তিনি অহেতুক কথা বলিতেন না, হাসিতেন না, কোন কথার পুনরুক্তি করিতেন না। তবে কেহ কোঁন হিকমতের কথা পুনরায় শুনাইবার অনুরোধ করিলে বলিতেন। তিনি রাজদরবারে ও বিচারকদের এজলাসে দেখার জন্য গমনাগমন করিতেন, ভাবিতেন এবং সেখান হইতে শিক্ষার বিষয় আহরণ করিতেন। এইসব কারণেই তাঁহাকে হিকমত দান করা হইয়াছিল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 পবিত্র কুরআন ও হাদীছে লুকমান প্রসংগ

📄 পবিত্র কুরআন ও হাদীছে লুকমান প্রসংগ


পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে যে, কুরআন মজীদে লুকমান (আ)-এর উল্লেখ রহিয়াছে। কুরআন মজীদের ৩১নং সূরাটির নাম রাখা হইয়াছে 'লুকমান', যাহা এই ঐতিহাসিক মনীষীর নামকে চিরন্তন করিয়া রাখিয়াছে। এই সূরায় আল্লাহ তা'আলার একত্বের সমর্থনে এবং শিরক ও কুফরী বাতিল হওয়া প্রসংগে লুকমানের প্রজ্ঞাপূর্ণ বাণীসমূহ স্থান পাইয়াছে। সূরার ১২ হইতে ১৯তম আয়াতে লুকমান (আ)-কে হিকমত প্রদান এবং লুকমান কর্তৃক তাঁহার পুত্রকে প্রদত্ত উপদেশের উল্লেখ রহিয়াছে। এই প্রসংগে ইরশাদ হইয়াছে:
"আমি লুকমানকে জ্ঞান দান করিয়াছিলাম এবং বলিাছিলাম, আল্লাহ্র প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সে তো তাহা করে নিজেরই জন্য এবং কেহ অকৃতজ্ঞ হইলে আল্লাহ তো অভাবমুক্ত, প্রশংসার্হ” (৩১: ১২)।
বস্তুত এই বর্ণনাধারা লুকমান (আ)-এর নবী না হইয়া 'হাকীম' হওয়ার স্পষ্ট ইংগিত বহন করে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা) হইতে বর্ণিত একটি হাদীছে উল্লেখ রহিয়াছে: "যাহারা ঈমান আনিয়াছে এবং তাহাদের ঈমানকে জুলুম দ্বারা কলুষিত করে নাই, নিরাপত্তা তাহাদেরই জন্য এবং তাহারাই সৎপথপ্রাপ্ত” (৬ঃ ৮২) শীর্ষক আয়াত নাযিল হইলে প্রতিভাত হয় যে, উহার প্রকাশ্য অর্থ অর্থাৎ ঈমান আনয়নের পরে কোনও প্রকার অন্যায় আচরণ করিলে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। ইহাতে সাহাবীগণ বিচলিত হইয়া পড়েন এবং বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের মধ্যে এমন কে আছে যে তাহার ঈমানকে কোন না কোন অন্যায় (জুলুম) দ্বারা কলুষিত করে নাই? (সুতরাং আমাদের মুক্তির উপায় কি?) তখন তাঁহাদের সান্ত্বনা প্রদান করিয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলিলেন, "তোমরা যেইরূপ ধারণা করিয়াছ (আয়াতের মর্ম) সেইরূপ নহে। তোমরা কি লুকমানের সেই কথা শুন নাই যাহা তিনি তাহার পুত্রকে বলিয়াছিলেন যে, "শিরকই হইল বড় জুলুম" (বুখারী, ২খ., ৭০৪, কিতাবুত তাফসীর, মুসলিম, ১খ., ৭৭, কিতাবুল ঈমান)? অর্থাৎ পূর্বোক্ত আয়াতে জুলুম দ্বারা উদ্দেশ্য শিরক যাহা দ্বারা আখেরাতে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়।
ইহা ছাড়া ইব্‌ন হিশামের সীরাত ও ইবনুল আছীরের উসদুল গাবা গ্রন্থে লুকমানের সহীফা সংক্রান্ত একটি ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। সুওয়ায়দ ইব্‌ন সামিত ছিলেন মদীনার একজন প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি, যিনি স্বীয় প্রজ্ঞা, বীরত্ব, কাব্যচর্চা ও বংশ মর্যাদার কারণে মদীনাবাসীদের নিকট 'কামিল' উপাধিতে ভূষিত ছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের হিজরতের কিছুকাল পূর্বে এই সুওয়ায়দ হজ্জ অথবা উমরা পালনের উদ্দেশে মক্কায় আগমন করিলেন। নবুওয়াত প্রাপ্তির পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম হজ্জব্রত পালনে আগত লোকদিগকে ইসলামের দাওয়াত দিতেন। তিনি সুওয়ায়দকেও ইসলামের দাওয়াত প্রদান করিলে তিনি বলিলেন, 'সম্ভবত আপনার নিকট যাহা আছে তাহা আমার নিকট যাহা আছে উহারই অনুরূপ। নবী আলায়হিস সালাম বলিলেন, আপনার নিকট কি আছে? সুওয়ায়দ বলিলেন, সাহীফা-ই লুকমান অর্থাৎ লুকমানের হিকমতপূর্ণ বাণীমালা। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের অনুরোধে সুওয়ায়দ উক্ত সাহীফার কিছু অংশ পাঠ করিয়া শুনাইলে নবী আলায়হিস সালাম বলিলেন, খুবই সুন্দর বক্তব্য; তবে আমার নিকট যাহা আছে উহা আরো উত্তম। সুওয়ায়দ উহা শুনিতে চাহিলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাহাকে পবিত্র কুরআনের কিছু অংশ তিলাওয়াত করিয়া শুনাইলেন। সুওয়ায়দ অকপটে স্বীকার করিলেন যে, নিঃসন্দেহে ইহা সাহীফায়ে লুকমান হইতে উত্তম। মদীনা প্রত্যাবর্তনের কিছু কাল পরে সুওয়ায়দ বু'আছ যুদ্ধে নিহত হন (ইবনুল আছীর, উসদুল গাবা, ২খ., ৩৭৮; দা. মা. ই., ১৯খ., ১২৯)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 পবিত্র কুরআনে উদ্ধৃত লুকমান (আ)-এর উপদেশসমূহ

📄 পবিত্র কুরআনে উদ্ধৃত লুকমান (আ)-এর উপদেশসমূহ


পবিত্র কুরআনের সূরা লুকমানে লুকমান (আ) কর্তৃক তাঁহার পুত্রকে প্রদত্ত উপদেশমালার বর্ণনা নিম্নরূপ:
"স্মরণ কর, যখন লুকমান তাহার পুত্রকে উপদেশ দিতে গিয়া বলিয়াছিল, হে বৎস! আল্লাহর কোন শরীক করিও না। নিশ্চয় শিরক চরম জুলুম। আমি তো মানুষকে তাহার পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়াছি। জননী সন্তানকে কষ্টের পর কষ্ট বরণ করিয়া গর্ভে ধারণ করে এবং তাহার দুধ ছাড়ান হয় দুই বৎসরে। সুতরাং আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। প্রত্যাবর্তন তো আমারই নিকট। তোমার পিতা-মাতা যদি তোমাকে পীড়াপীড়ি করে আমার সমকক্ষ দাঁড় করাইতে, যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নাই, তুমি তাহাদের কথা মানিও না, তবে পৃথিবীতে তাহাদের সহিত বসবাস করিবে সদ্ভাবে এবং যে বিশুদ্ধ চিত্তে আমার অভিমুখী হইয়াছে তাহার পথ অবলম্বন কর, অতঃপর তোমাদের প্রত্যাবর্তন আমারই নিকট এবং তোমরা যাহা করিতে সে বিষয়ে আমি তোমাদিগকে অবহিত করিব। হে বৎস! ক্ষুদ্র বস্তুটি যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয় এবং উহা যদি থাকে শিলাগর্ভে অথবা আকাশে কিংবা মৃত্তিকার নীচে, আল্লাহ তাহাও উপস্থিত করিবেন। আল্লাহ সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবগত। হে বৎস! সালাত কায়েম করিও, সৎকর্মের নির্দেশ দিও, আর অসৎ কর্মে নিষেধ করিও এবং আপদে-বিপদে ধৈর্য ধারণ করিও। ইহা তো দৃঢ় সংকল্পের কাজ। অহংকার বশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করিও না এবং পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে বিচরণ করিও না; নিশ্চয় আল্লাহ কোন উদ্ধত, অহংকারীকে পসন্দ করেন না। তুমি পদক্ষেপ করিও সংযতভাবে এবং তোমার কন্ঠস্বর নীচু করিও; নিশ্চয় স্বরের মধ্যে গর্দভের স্বরই সর্বাপেক্ষা অপ্রীতিকর" (৩১: ১৩-১৯)।
লুকমান (আ)-এর উল্লিখিত উপদেশমালায় তাওহীদ অবলম্বন ও শিরক্ বর্জন, আল্লাহ্র পূর্ণাংগ ইলম ও কুদরতে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন, আদর্শ ব্যক্তি ও সুষ্ঠু সমাজ গঠনের দৃঢ় সংকল্পের কর্মসূচী বাস্তবায়ন এবং শিষ্টাচার অবলম্বনের উল্লেখ রহিয়াছে (দ্র., সীউহারবী, কাসাসুল কুরআন ৩খ., ৪১-৪৬; মুফতী শফী, মা'আরিফুল কুরআন, ৭খ, ৩৬-৪০; জামীল আহমদ, আম্বিয়ায়ে কুরআন, ৩খ., ৫২০-৫২৩)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00