📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 লুকমান (আ)-এর পেশা

📄 লুকমান (আ)-এর পেশা


অধিকাংশ মুফাস্স্সির ও ইতিহাসবিদের মতে, লুকমান (আ) পেশায় সূত্রধর (নজ্জার) ছিলেন। সুফ্যান ছাওরীর তাফসীর গ্রন্থে ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে ইকরিমা সূত্রের বর্ণনায় এবং খালিদ ইব্‌ন ছাবিত রিব'ঈর বর্ণনায় তাঁহাকে সূত্রধর বলা হইয়াছে। ইবনুল মুনযির ও ইব্‌ন আবু শায়বা ও আহমদের বর্ণনায় তাঁহাকে দর্জী (খিয়্যাত) বলা হইয়াছে। যাজ্জাযের বর্ণনামতে তিনি ছিলেন বিছানার চাদর ও আনুষংগিক বস্ত্র-উপকরণ প্রস্তুতকারী। কেহ কেহ বলিয়াছেন, তাঁহার কাজ ছিল তাঁহার মনিবের জন্য দৈনিক এক বোঝা জ্বালানী কাঠ সংগ্রহ করা। ইব্‌ন আব্বাস (রা)-এর অপর এক বর্ণনায় এবং ইবন জারীরের ও ইব্‌ন আবু হাতিমের এবং ওয়াহবের বর্ণনায় তাঁহাকে রাখাল (রাঈ) বলা হইয়াছে (আল-বিদায়া, মুখতারু তাফসীরিল কুরতুবী, ফাতহুল বারী, তাফসীরে রূহুল মা'আনী)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত লুকমান (আ)-এর সময়কাল

📄 হযরত লুকমান (আ)-এর সময়কাল


লুকমান (আ)-এর যুগ ও অবস্থানকাল অস্পষ্ট ও বিতর্কিত। পূর্বোল্লিখিত অভিমতসমূহের বিচারে হযরত লুকমানের সময়কাল হইবে হয়ত হযরত ইবরাহীম (আ)-এর প্রায় সমসাময়িক অথবা অল্প কিছু কাল পরে। কেননা একটি অভিমতে তাঁহাকে ইবরাহীম (আ)-এর পিতা আযরের তৃতীয় অধস্তন পুরুষ বলা হইয়াছে। অথবা তাঁহার সময়কাল হইবে হযরত দাউদ (আ)-এর সময়কাল। কেননা তাঁহাকে দাউদ (আ)-এর খালাতো ভাই অথবা ভাগিনা এবং তাঁহার সহযোগী ও উযীর বলা হইয়াছে। ইতিহাসের হিসাব-নিকাশে দাউদ (আ)-এর যুগ ছিল খৃষ্টপূর্ব দশম শতাব্দী। সুতরাং এই মত অনুসারে হযরত লুকমানের সময়কালও একই হইবে। অপর দিকে তাঁহাকে প্রাচীন আরবের 'আদ বংশীয় লুকমান ইব্‌ন 'আদ সাব্যস্ত করা হইলে তাঁহার যুগ হইবে অতি সুপ্রাচীন। কেননা ইতিহাসে প্রথম 'আদ সম্প্রদায় ছিল নূহ (আ)-এর চতুর্থ অধঃস্তন পুরুষ এবং 'আদ সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরিত নবী হুদ (আ) ছিলেন নূহ (আ)-এর পঞ্চম অথবা নবম অধস্তন পুরুষ (দ্র. বিদায়া নিহায়া) এবং দ্বিতীয় 'আদ তথা ছামূদ সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরিত নবী সালিহ (আ) ছিলেন নূহ (আ)-এর নবম অথবা দশম অধঃস্তন পুরুষ (বিদায় নিহায়া)। সুতরাং দ্বিতীয় 'আদের বংশধর হইলে লুকমান (আ)-এর সময়কাল হইবে হযরত ইবরাহীম (আ)-এর বেশ পূর্বে। মাওলানা হিফযুর রহমান তাঁহার কাসাসুল কুরআনে লুকমান (আ)-এর সময়কাল ৩০০০ খৃষ্টপূর্ব সন লিখিয়াছেন, যাহা হযরত ইবরাহীম (আ)-এর যুগ হইতে বহু পূর্বে সাব্যস্ত হইবে। এই প্রসঙ্গে ওয়াকিদী লুকমান (রা)-এর সময়কাল হযরত ঈসা (আ) ও আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের মধ্যবর্তী সময় বলিয়াছেন। আত্-তালকীহে ইবনুল জাওযী লুকমান (আ)-কে হযরত ইবরাহীম (আ)-এর পরে এবং হযরত ইসমাঈল ও হযরত ইসহাক (আ)-এর পূর্বে হওয়ার দাবি করিয়াছেন। ইবন হাজার এই উক্তিদ্বয় উল্লেখ করিয়া ওয়াকিদীর মতকে 'অতীব বিরল' বলিয়াছেন এবং লুকমান (আ) দাউদ (আ)-এর সমসাময়িক হওয়া সংক্রান্ত অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতকে সঠিক বলিয়াছেন (ফাতহুল বারী, রূহুল মা'আনী, কাসাসুল কুরআন, আম্বিয়ায়ে কুরআন)। ইব্‌ন হাজার হাকিমের মুসতাদরাক কিতাবের বরাতে এতদসংক্রান্ত আরও একটি বর্ণনা উল্লেখ করিয়াছেন যাহা প্রামাণ্য সনদে আনাস (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে। আনাস (আ) বলেন, যখন লুকমান (আ) দাউদ (আ)-এর নিকটে উপস্থিত ছিলেন তখন দাউদ (আ) (লোহা গলাইয়া) বর্ম তৈরি করিতেছিলেন। তিনি অভিভূত হইয়া বর্মের কার্যকারিতা ও উপকারিতা সম্পর্কে দাউদ (আ)কে জিজ্ঞাসা করিতে চাহিতেছিলেন, কিন্তু তাঁহার হিকমত তাঁহাকে প্রশ্ন করা হইতে বিরত রাখিতেছিল। এই বর্ণনা উল্লেখ করিয়া ইবন হাজার মন্তব্য করিয়াছেন যে, ইহাতে স্পষ্টত বুঝা যায় যে, লুকমান (আ) দাউদ (আ)-এর সমসাময়িক ছিলেন (ফাতহুল বারী)। এ প্রসঙ্গে সায়্যিদ সুলায়মান নদবী তাঁহার আরদুল কুরআন গ্রন্থে লিখিয়াছেন, "লুকমান হাকীম ও বাদশাহ (গোত্রপতি) লুকমান অভিন্ন ব্যক্তি ছিলেন এবং নিঃসন্দেহে তিনি দ্বিতীয় 'আদ সম্প্রদায়ের উত্তম শাসককূলের অন্যতম এবং অতি উঁচু স্তরের জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান। সহীফায় লুকমান নামে প্রসিদ্ধ পুস্তক এই 'আদ গোত্রীয় লুকমানেরই ছিল।" সায়্যিদ নদবী (র) তাঁহার এই দাবির অনুকূলে একাধিক প্রমাণ উপস্থাপন করিয়াছেন। যেমন, আরব জাহিলী যুগের অন্যতম শীর্ষ কবি সালমা ইবন রাবী'আর নিম্নোক্ত কবিতা পংক্তিতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের প্রতি স্পষ্ট আলোকপাত রহিয়াছে। "কালের দুর্বিপাক ও বিবর্তন অসম গোত্র, অতঃপর বকরীর স্তন্যে লালিতদের এবং যূ-জাদুন ইয়ামানের শাসক, জাশ, মারিব গোত্র, লুকমানের গোত্র ও তাকূন প্রভৃতিকে বিলীন করিয়াছে"।
ইহা দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, লুকমান আরবী ভাষাভাষী ছিলেন, ইয়ামানের বাসিন্দা ছিলেন এবং গোত্রপতিও ছিলেন এবং জাঁকজমক ও প্রতিপত্তিতে উল্লেখযোগ্য এবং প্রসিদ্ধ সাবা গোত্রের সমপর্যায়ের ছিলেন। বস্তুত এইসব বিষয় 'আদ গোত্রের লুকমানের জন্যই প্রযোজ্য হইতে পারে। প্রসংগত উল্লেখ্য যে, আবরার-ই উবায়দ গ্রন্থেও এই লুকমানের উল্লেখ রহিয়াছে এবং উহাতে তাঁহাকে 'আদ আল-আখিরা (দ্বিতীয় 'আদ)-এর অন্তর্ভুক্ত বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। মূলত প্রথম 'আদ (আদ আল-উলা)-এর ধ্বংসের পর যে সকল লোক 'আদ সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরিত নবী হূদ (আ)-এর অনুসারীরূপে তাঁহার সহিত হাদরামাওত প্রভৃতি স্থানে গিয়া বসতি স্থাপন করিয়াছিল তাহদিগকে 'আদ আল-আখিরা বলা হয়।
সায়্যিদ সুলায়মান নদবী তাঁহার দাবি প্রমাণে উল্লেখযোগ্য একটি প্রত্নতাত্ত্বিক শিলালিপির কথা উল্লেখ করিয়াছেন। দক্ষিণ আরবের (ইয়ামানের) 'আদন (এডেন)-এর নিকটবর্তী হিসনে গুরাবের ধ্বংসাবশেষ হইতে ১৩৮৪ খৃস্টাব্দে এই শিলালিপিটি পাওয়া গিয়াছে। উহাতে হযরত হূদ (আ)-এর শরী'আত অনুসারী সৎস্বভাবসম্পন্ন শাসকবর্গের প্রতি ইংগিত রহিয়াছে এবং তাহাদের উত্তম ফয়সালাসমূহ একটি গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করার কথা বলা হইয়াছে। সায়্যিদ নদবী এই শিলালিপির বিষয়ে আরব ঐতিহাসিক ভূগোলের লেখক ফরেস্টারের বরাত উল্লেখ করিয়া লিখিয়াছেন যে, হযরত মু'আবিয়া (রা)-র সময়ও অনুরূপ শিলালিপি আবিষ্কৃত হইয়াছিল এবং উভয় শিলালিপির বিষয়বস্তুতে হুবহু মিল রহিয়াছে (দ্র. আরদুল কুরআন, কাসাসুল কুরআন, আম্বিয়ায়ে কুরআন, দাইরাতুল মা'আরিফ)।
হিজরী অষ্টাদশ সালে প্রাপ্ত 'আদ সম্প্রদায়ের শিলালিপির কয়েকটি বাক্যের অনুবাদ নিম্নরূপ : "আমাদের উপরে শাসন পরিচালনা করেন এমন রাজাগণ যাহারা নীচতা সম্বন্ধে ধ্যানধারণা হইতে অতি দূরত্বে অবস্থান করেন, দুষ্ট প্রকৃতির লোকদের শাস্তি বিধান করেন এবং (যাহারা) হৃদ (আ)-এর শরী'আত অনুসরণ আমাদের জন্য 'জন্মলাভ' (?) করিতেন (তাহাদের) উত্তম ফয়সালাগুলি একটি গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করা হইত।" সায়্যিদ নদবী বলেন, এই শেষ বাক্যটি যাহা কাগজে নয়, পাথরে খোদাইরূপে পাওয়া গিয়াছে। ইহা দ্বারা আমরা কি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে পারি না যে, লুকমান (আ)-এর উত্তম ফয়সালাগুলির লিখিত ভাণ্ডারই সহীফা-ই লুকমানরূপে প্রসিদ্ধ ও প্রচলিত ছিল (আরদুল কুরআন, কাসাসুল কুরআন)।
এই পর্যালোচনা দ্বারা লুকমান (আ) আরবের অধিবাসী হওয়া প্রমাণিত হয় এবং সেই সাথে ইয়াহুদী গ্রন্থসমূহে তাঁহার উল্লেখ না থাকিবার সূত্রও বোধগম্য হয়। সায়্যিদ সুলায়মান নদবী এই প্রসঙ্গে ইউরোপের পণ্ডিতদের হাকিম লুকমান ও দার্শনিক ঈশপ (৬১৯-৬৬৪ খৃ. পূ.)-কে (তাহাদের ঘটনাবলী ও দৃষ্টান্তের মাঝে মিল থাকিবার ভিত্তিতে) অভিন্ন ব্যক্তি সাব্যস্ত করিবার ধারাটিও যথার্থরূপে খণ্ডন করিয়াছেন। তাঁহার মতে, ঘটনাপঞ্জী ও বাণী দৃষ্টান্তে মিল থাকাই তাহাদের অভিন্ন ব্যক্তি হওয়ার জন্য যথেষ্ট নহে। কেননা, লুকমান হাকীম ছিলেন সার্বিক সদগুণে গুণান্বিত, আর ইতিহাসের বর্ণনামতে ঈশপ ছিল দাস ও অর্কমণ্য প্রকৃতির লোক (উল্লেখ্য যে, লুকমান (আ.)-এর দাস হওয়া সম্পর্কিত বর্ণনাগুলি তেমন প্রামাণ্য নহে; দামাই)।
ইহা ছাড়া পবিত্র কুরআনে লুকমান (আ) কর্তৃক তাঁহার পুত্রকে প্রদত্ত উপদেশের যে বিবরণ উদ্ধৃত হইয়াছে (পরে দ্র.) উহাতে তিনি পুত্রকে গর্ব ও অহংকার বর্জন করিয়া বিনয়-নম্রতা ও শিষ্টাচার এবং উঁচু মানের গুণাবলী আয়ত্ত করিবার উপদেশ দিয়াছেন যাহা এক দাসপুত্রের তুলনায় একজন রাজপুত্রের জন্যই অধিক সমীচীন। পবিত্র কুরআনে উদ্ধৃত উপদেশ বাণীর বিশ্লেষণে মাওলানা হিফজুর রহমান লিখিয়াছেন, “লুকমান হাকীম যদি দাস হইতেন, তাহা হইলে স্বীয় পুত্রকে এই ধরনের উপদেশ দান করিতেন না। কেননা, অহংকার ও আত্মম্ভরিতা, রূঢ়তা ও অপরকে হেয় প্রতিপন্ন করা এমন সব স্বভাব যাহা রাজা ও রাজপুত্র, স্বচ্ছল ও প্রতিপত্তিতে মদমত্তদের মাঝেই অধিক হারে দেখা যায় এবং এইগুলি আল্লাহর প্রতি ভীতিহীন ও সম্পদের প্রাচুর্যে মত্ত বিলাসীদেরই আচরণ হইয়া থাকে। অহংকারী ও প্রতাপশালীদের এই সকল কু-স্বভাব কোন দাস বা দাস পুত্রের মধ্যে থাকিবার সুযোগ নাই। কেননা, তাহাদের শক্তি ও সময় তো অপরের বশ্যতা ও সেবা প্রদানে অতিবাহিত হয়। 'শেখ সাদীর ভাষায়: "বিনয় তো অহংকারীদের জন্য উত্তম সজ্জা; ভিখারীর বিনয় তো তার মজ্জাগত স্বভাব মাত্র"।
মোটকথা, পবিত্র কুরআনে উদ্ধৃত লুকমান (আ)-এর উপদেশমালার প্রতি লক্ষ্য করিলে দৃঢ়ভাবে এই দাবি করা যায় যে, লুকমান হাকীম ও 'আদ সম্প্রদায়ের লুকমান অভিন্ন ব্যক্তি ছিলেন এবং তিনি দ্বিতীয় 'আদের সদগুণসম্পন্ন বাদশাহ ও হযরত হূদ (আ)-এর অনুসারী ছিলেন। তিনি আফ্রিকার দাস ছিলেন না, বরং খাঁটি আরব ছিলেন। এই প্রসংগে সীরাতবিদ মুহাম্মাদ ইবন ইসহাকের উদ্ধৃতি এবং জাহিলী কবি সালমা ইবন রাবী'আর কাব্যের সাক্ষ্য অগ্রাধিকারযোগ্য ও প্রামাণ্য এবং দ্বিতীয় 'আদ যুগের শিলালিপি দ্বারা আরবাসীদের নিকট প্রসিদ্ধ সহীফা-ই লুকমান-ই উদ্দেশ্য হইবে (কাসাসুল কুরআন)।
এখন এই কথাও বলা যায় যে, লুকমান যেহেতু আরব বংশোদ্ভূত ছিলেন এবং ইয়াহুদী-খৃস্টানদের ধর্মীয় বা রাজনৈতিক ইতিহাসের সহিত তাঁহার কোন সম্বন্ধ ছিল না, সেইজন্য তাহাদের গ্রন্থসমূহে তাঁহার কোন উল্লেখ নাই। অপরদিকে আরবরা তাঁহাদের বংশোদ্ভূত লুকমানের জন্য যথার্থই গৌরব করিত, প্রাচীন কাল হইতে সম্মানের সহিত তাঁহার নাম উচ্চারণ করিত এবং তাঁহার উপদেশাবলীর চর্চা করিত। ইহার ভিত্তিতেই মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে নামোল্লেখের মাধ্যমে লুকমান (আ)-এর ব্যক্তিত্ব অমরত্ব ও চিরন্তনতা লাভ করিয়াছে (দ্র. দা. মা. ই)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত লুকমান (আ)-এর নবুওয়াত প্রসংগ

📄 হযরত লুকমান (আ)-এর নবুওয়াত প্রসংগ


হযরত লুকমান নবী ছিলেন কিনা এই প্রসংগেও পূর্বসূরী মনীষীদের মধ্যে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। অধিকাংশের মতে তিনি নবী ছিলেন না। শুধু ইকরিমা ও শা'বী হইতে তাঁহার নবী হওয়ার কথা বর্ণিত হইয়াছে (ফাতহুল বারী, মুখতারুত তাফসীরিল কুরতুবী, মাদারিক ও খাযিনের বরাতে মুফতী' শফী, আহকামুল কুরআন, মা'আরিফুল কুরআন)। ইব্‌ন ওয়াহ্হ্ সূত্রে মুহাম্মাদ ইব্‌ন ইসহাকের একটি বর্ণনা পূর্বে উল্লিখিত হইয়াছে যাহাতে ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতেও লুকমানের নবী হওয়ার কথা বলা হইয়াছে। "নবী ছিলেন, রাসূল ছিলেন না" (কাসাসুল কুরআন; বরাত, কিতাবুত তীজান)। বাগাবী বলিয়াছেন, এই বিষয়ে আলিমগণের ঐক্যমত্য রহিয়াছে যে, লুকমান 'হাকীম' ছিলেন, নবী ছিলেন না। একাকী ইক্রিক্রমা তাঁহাকে নবী বলিয়াছেন (মা'আলিমুত তানযীল)। পবিত্র কুরআনের সূরা লুকমানে তাঁহার সারগর্ভ ও প্রজ্ঞাপূর্ণ উপদেশমালার কথা বিশেষ গুরুত্বের সহিত বর্ণিত হইলেও উহার বর্ণনাভংগীতে এবং কোন আয়াত বা শব্দে এমন কোন ইংগিত পাওয়া যায় না যাহা দ্বারা লুকমানের নবী হওয়া বুঝা যাইতে পারে। এই কারণে অধিকাংশ মনীষী তাঁহার নবী না হওয়ার মত পোষণ করিয়াছেন। এমন কি ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতেও নবী না হওয়ার বর্ণনাও রহিয়াছে। এই প্রসংগে ইব্‌ন কাছীর সুস্পষ্ট বক্তব্য প্রদান করিয়াছেন। তিনি লিখিয়াছেন: "জমহূরের প্রসিদ্ধ উক্তি এই যে, তিনি হাকীম ও ওয়ালী ছিলেন, নবী ছিলেন না। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে তাঁহার প্রশংসা করিয়া তাঁহার সর্বাধিক প্রিয়পাত্র স্বীয় পুত্রকে প্রদত্ত তাঁহার উপদেশগুলির বর্ণনা প্রদান করিয়াছেন" (আল-বিদায়া)। অদ্রূপ "আমি লুকমানকে হিকমত দান করিয়াছিলাম.......") আয়াতের ব্যাখ্যায় কাতাদা হইতে বর্ণিত হইয়াছে, "(হিকমাত অর্থ) ফিকহ ও ইসলাম; তিনি নবী ছিলেন না; তাঁহার নিকট ওহী প্রেরণ করা হয় নাই। পূর্বসূরীদের অনেকের বরাতে এইরূপ বর্ণিত হইয়াছে। তাহাদের মধ্যে রহিয়াছেন মুজাহিদ, সা'ঈদ ইবনুল মুসায়‍্যাব এবং ইব্‌ন আব্বাস (রা) প্রমুখ" (প্রাগুক্ত, কাসাসুল কুরআন, আম্বিয়ায়ে কুরআন, রূহুল মা'আনী, মাজহারী, মা'আরিফুল কুরআন, মুখতারু তাফসীরিল কুরতুবী, ফাতহুল বারী)। সা'ঈদ ইবনুল মুসায়্যাবের বর্ণনা "আল্লাহ তাহাকে হিকমত দিয়াছেন, নবুওয়াত দেন নাই..... ইতোপূর্বে উল্লিখিত হইয়াছে, জমহূরের মতে হিকমত অর্থ সুবুদ্ধি, বুদ্ধিমত্তা, তীক্ষ্ণ মেধা, প্রজ্ঞা, ইল্ম ও ইল্ল্ম অনুসারে আমল এবং এক কথায় কথা ও কাজে সুষ্ঠুতা সম্পন্ন হওয়া" (রূহুল মা'আনী, মা'আরিফুল কুরআন, মুখতাসার ইব্‌ন কাছীর)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 লুকমান (আ)-এর হাকীম হওয়ার উৎস ও প্রেক্ষাপট

📄 লুকমান (আ)-এর হাকীম হওয়ার উৎস ও প্রেক্ষাপট


বাহ্যত লুকমান (আ)-এর মধ্যে নবীসুলভ গুণাবলীর সমাবেশ ঘটিয়াছিল, কিন্তু তবুও তিনি নবী হইলেন না কেন এবং তাঁহার হাকীম হওয়া বা হিকমত লাভের প্রেক্ষাপট কি ছিল, এই প্রসংগে সাহাবী ও তাবি'ঈগণের বরাতে কতিপয় বর্ণনা পাওয়া যায়। এমনকি হাকীম তিরমিযী 'নাওয়াদির' (বিরল হাদীছ)-এ একটি মারফু' হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন যাহাতে বলা হইয়াছে যে, দাউদ (আ)-এর পূর্বে লুকমান (আ)-এর নিকট খিলাফতের প্রস্তাব করা হইলে তিনি বলিলেন, "যদি ইহা (আল্লাহর পক্ষ হইতে) প্রত্যক্ষ আদেশ হয় তবে নির্দ্বিধায় সানন্দে; আর যদি আমাকে উহাতে এখতিয়ার দেওয়া হয় তবে আমি উহার ব্যাপারে অব্যাহতিপ্রার্থী" (আদ-দুরুল মানছুরের বরাতে, মুফতী শফী, আহকামুল কুরআন)। ইবন উমার (রা) ও কাতাদার বরাতে এই প্রসংগে আরও চমকপ্রদ ও বিশদ বিরবণ পাওয়া যায়। 'আতিয়া সূত্রে বর্ণিত, ইবন 'উমার (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামকে বলিতে শুনিয়াছি: "লুকমান নবী ছিলেন না, তবে তিনি ছিলেন অতি চিন্তাশীল ও দৃঢ় বিশ্বাসের অধিকারী এক বান্দা। তিনি আল্লাহকে ভালবাসিলে আল্লাহও তাঁহাকে ভালবাসিলেন এবং হিকমাত দান করিয়া তাঁহার প্রতি অনুগ্রহ করিলেন এবং ন্যায়বিচার পরিচালনার জন্য তাঁহাকে খলীফা মনোনীত করিবার ব্যাপারে তাঁহাকে এখতিয়ার প্রদান করিলেন। লুকমান বলিলেন, হে প্রতিপালক! যদি আপনি আমাকে আমার ইচ্ছার উপর ছাড়িয়া দেন তবে আমি নিরাপত্তাকে কবুল করিলাম এবং বিপদকে বর্জন করিলাম। আর যদি ইহা আপনার প্রত্যক্ষ আদেশ হয় তবে বিনabak্যে ও নির্দ্বিধায় গ্রহণ করিব। কেননা, সে ক্ষেত্রে আপনিই আমাকে হেফাজত করিবেন।" ছা'লাবীর বর্ণনায় আরও আছে: "ফেরেশতা তখন অদৃশ্য হইতে আওয়াজ দিয়া বলিল, এরূপ কেন, হে লুকমান! তিনি বলিলেন, কেননা বিচারপতি একটি কঠিন ও অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিস্থিতিতে অবস্থান করে। নিপীড়িত লোকেরা সর্বত্র হইতে তাহার নিকট আগমন করে। যদি তাহাকে (আল্লাহর পক্ষ হইতে সঠিক বিচারের ব্যাপারে) সাহায্য করা হয়, তবে তো সে মুক্তি লাভ করে, আর বিচার ভুল করিলে জান্নাতের পথ হারাইয়া ফেলে। দুনিয়াতে নিচু থাকা তথায় নেতৃত্ব ও আভিজাত্যের চাইতে উত্তম। যে ব্যক্তি আখিরাতের উপর প্রাধান্য দেয় দুনিয়াকে, দুনিয়া তাহাকে বিমুখ করে এবং আখিরাতও তাহার হাতছাড়া হইয়া যায়। ফেরেশতারা লুকমানের এই সুন্দর কথনে বিস্মিত হইলেন। পরে লুকমান নিদ্রামগ্ন হইলে তাঁহাকে হিকমত দান করা হইল এবং নিদ্রা হইতে জাগ্রত হইয়া তিনি হিকমতপূর্ণ কথাবার্তা বলিতে লাগিলেন। পরবর্তী সময়ে দাউদ (আ)-কে (খিলাফতের জন্য) আহ্বান করা হইলে তিনি উহা কবুল করিলেন এবং লুকমান (আ)-এর কোন শর্ত আরোপ করিলেন না। ফলে তিনি (বিচারকার্যে) কয়েকবার বিচ্যুতির শিকার হইলেন। তবে প্রতি বারই আল্লাহ তাঁহাকে মাফ করিয়া দিলেন"। এই বর্ণনায় আরও আছে, লুকমান (আ) তাঁহার হিকমত দ্বারা দাউদ (আ)-কে সহায়তা করিতেন। একবার দাউদ (আ) তাঁহাকে বলিলেন, লুকমান! তোমার সৌভাগ্য তোমাকে হিকমত দেওয়া হইয়াছে এবং বিপদ হইতে দূরে রাখা হইয়াছে। আর দাউদকে খিলাফত দেওয়া হইয়াছে এবং তাহাকে সমস্যা ও বিপদের সম্মুখীন করা হইয়াছে (মুখতারু তাফসীরুল কুরতুবী, তাফসীরে মাজহারী, উরদু)।
ইব্‌ন আবূ হাতিম কাতাদা হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, কাতাদা বলেন, আল্লাহ তা'আলা লুকমান হাকীমকে নবুওয়াত ও হিকমতের মধ্যে এখতিয়ার প্রদান করিলে তিনি নবুওয়াতের বিপরীতে হikmat গ্রহণ করিলেন। তখন তাঁহার নিদ্রামগ্ন অবস্থায় জিবরীল (আ) আগমন করিয়া তাঁহার অন্তরে হিকমত ঢালিয়া দিলেন। ফলে সকালে তিনি হিকমতপূর্ণ কথা বলিতে লাগিলেন। কাতাদার বর্ণনায় আরও আছে, লুকমানকে প্রশ্ন করা হইল, আপনার প্রতিপালক আপনাকে এখতিয়ার দেওয়া সত্ত্বেও আপনি নবুওয়াত কবুল না করিয়া হিকমতকে পসন্দ করিলেন কেন? জবাবে লুকমান বলিলেন, আমাকে দৃঢ়রূপে নবুওয়াত প্রদান করা হইল উহাতে আমি সাফল্যের আশা করিতাম এবং উহার দায়িত্ব পালনে উত্তীর্ণ হওয়ার আশা করিতাম। কেননা তখন আল্লাহ তা'আলাই আমার তত্ত্বাবধান করিতেন। কিন্তু আমাকে এখতিয়ার দেওয়া হইলে নবুওয়াতের দায়দায়িত্ব প্রতিপালনে আমি নিজেকে অপারগ মনে করিলাম। কেননা তখন ইহার দায় আমার নিজেকেই বহন করিতে হইত। এই কারণে আমি হিকমতকে পসন্দ করিয়াছি। এই রিওয়ায়াতটি সম্পর্কে ইব্‌ন কাছীর সন্দেহ প্রকাশ করিয়াছেন (বিদায়া, মুখতারু তাফসীরিল কুরতুবী, মা'আরিফুল কুরআন, ফাতহুল বারী, মা'আলিমুত তানযীল, মুফতী শফী, আহকামুল কুরআন, মা'আরিফুল কুরআন)।
ইবন কাছীর (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া) প্রমুখ হযরত লুকমানের হিকমত প্রাপ্তির সূত্র সম্পর্কে আরও কতিপয় বর্ণনা উল্লেখ করিয়াছেন। যেমন ইব্‌ন জারীর উমার ইব্‌ন কায়স হইতে বর্ণনা করেন, একদিন লুকমান (আ) একটি বিশাল মাহফিলে হিকমতের কথা শুনাইতেছিলেন। তখন সেখানে এক ব্যক্তি আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, তুমি কি সেই লোকটি নও যে অমুক মাঠে আমার সহিত ছাগল চরাইত? লুকমান (আ) বলিলেন, হাঁ, আমি সেই ব্যক্তি। লোকটি বলিল, তাহা হইলে এখন আমি তোমার প্রতি মানুষের ভক্তি-শ্রদ্ধা এবং তোমার যে মর্যাদা দেখিতেছি উহার উৎস কি? লুকমান বলিলেন, ইহার উৎস আমার দুইটি কাজ। একঃ সর্বদা সত্য কথা বলা; দুই: অনর্থক কথা ও কাজ হইতে নিজেকে সংযত রাখা। ইব্‌ন আবী হাতিম আবদুর রহমান ইব্‌ন আবূ ইয়াযীদ হইতে বর্ণনা করেন, আল্লাহ তা'আলা লুকমান হাকীমকে তাঁহার হিকমতের কারণে উচ্চ মর্যাদায় অভিহিত করিলে তাঁহার পূর্ব-পরিচিত এক ব্যক্তি তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিল, তুমি কি অমুকের পুত্রের দাস নও যে সেদিনও আমার ছাগল চরাইত? লুকমান বলিলেন, হাঁ। লোকটি বলিল, তবে তোমার এই প্রভৃত মর্যাদার কারণ কি? লুকমান বলিলেন, আল্লাহর তাকদীর, আমানত প্রত্যর্পণ, সত্য ভাষণ এবং অনর্থক কার্যকলাপ বর্জন। ইব্‌ন ওয়াহবের বর্ণনায় আছে, এক ব্যক্তি লুকমান হাকীমের সম্মুখে দাঁড়াইয়া বলিল, তুমি বনূ নাহহাসের গোলাম লুকমানই তো? লুকমান বলিলেন, হাঁ। লোকটি বলিল, তুমি ছাগলের রাখাল সেই কালো মানুষটিই তো? লুকমান বলিলেন, (ভাই), আমার কালো বর্ণটি দৃশ্যমানই। কিন্তু আমার ব্যাপারে তোমার বিস্ময়ের কারণ কি? লোকটি বলিল, তোমার দুয়ারে মানুষের এই ভিড় এবং দলে দলে আগমন এবং তোমার বক্তব্য-ভাষণে তাহাদের আকর্ষণ ও তুষ্টিই বিস্ময়ের কারণ। লুকমান বলিলেন, ভ্রাতুষ্পুত্র! আমি তোমাকে যাহা বলিব তদনুসারে কাজ করিলে তুমিও আমার মত হইতে পারিবে। লোকটি বলিল, সে সব কি কাজ? লুকমান বলিলেন, "আমার দৃষ্টিকে অবনত রাখা, জিহ্বা নিয়ন্ত্রণে রাখা, আমার খাদ্যের নিষ্কলুষতা অর্থাৎ হালাল খাদ্যে তুষ্টি, আমার লজ্জাস্থানের হিফাজত করা, ওয়াদা প্রতিপালন করা এবং মেহমানকে সমাদর করা, প্রতিবেশীর রক্ষণাবেক্ষণ করা এবং অনর্থক কথা ও কাজ পরিত্যাগ করা। এই কাজগুলি আমাকে ঐ অবস্থায় পৌঁছাইয়াছে যাহা তুমি প্রত্যক্ষ করিতেছ" (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, মুখতারু তাফসীরিল কুরতুবী, মা'আরিফুল কুরআন)। একবার লুকমান (আ) এক ব্যক্তিকে বিশেষ দৃষ্টিতে তাকাইতে দেখিয়া তাহাকে বলিলেন, যদি তুমি আমার ওষ্ঠাধর ভারী দেখিয়া থাক তবে এই দুই ওষ্ঠের মধ্য হইতে কোমল কথা বাহির হয় এবং তুমি যদি আমাকে কালো দেখিয়া থাক, তবে আমার অন্তরটি সাদা (মুখতারু তাফসীরিল কুরতুবী)। ইব্‌ন আবী হাতিম আবু দারদা (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, লুকমান (আ)-এর আলোচনা প্রসংগে একদিন তিনি বলিলেন, লুকমান হাকীম ধনবল-জনবলে বলীয়ান ছিলেন না, উল্লেখযোগ্য কোন বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন না, তবে তিনি ছিলেন গম্ভীর প্রকৃতির নিরবতাপ্রিয়, অতি চিন্তাশীল ও সুগভীর দৃষ্টিসম্পন্ন। তিনি দিনের বেলা কখনও ঘুমাইতেন না। কেহ তাঁহাকে জনসমক্ষে থুথু ফেলিতে, গালি দিতে অথবা গলা পরিষ্কার করিতে, মানুষের দৃষ্টিসীমায় পেশাব-পায়খানা করিতে ও গোসল করিতে দেখে নাই। তিনি অহেতুক কথা বলিতেন না, হাসিতেন না, কোন কথার পুনরুক্তি করিতেন না। তবে কেহ কোঁন হিকমতের কথা পুনরায় শুনাইবার অনুরোধ করিলে বলিতেন। তিনি রাজদরবারে ও বিচারকদের এজলাসে দেখার জন্য গমনাগমন করিতেন, ভাবিতেন এবং সেখান হইতে শিক্ষার বিষয় আহরণ করিতেন। এইসব কারণেই তাঁহাকে হিকমত দান করা হইয়াছিল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00