📄 লুকমান (আ)-এর জন্ম ও বংশধারা
লুকমান (রা)-এর জন্ম ও মৃত্যুর সন-তারীখ সম্পর্কে কোন প্রকাশ্য প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া যায় না। এই প্রসংগে ইতিহাস ও তাফসীর গ্রন্থসমূহের বর্ণনাকে তিনটি মৌলিক ভাগে বিভক্ত করা যায় : (১) প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ মুহাম্মদ ইবন ইসহাকের বর্ণনামতে লুকমান (আ)- এর বংশধারা নিম্নরূপ লুকমান ইব্ন বা'উর (না'উর), ইন্ন নাহুর/নাহর ইব্ন তারাহ/তারাখ (لقمان بن باعور / ناعور بن ناحور / ناحر بن تارح / تارخ) (আ)-এর পিতা আযর-এর অপর নাম। সুতরাং এই বংশধারা মতে লুকমান (আ) হযরত ইবরাহীম (আ)-এর স্বগোত্রীয় এবং তাঁহার ভ্রাতুষ্পুত্রস্থানীয় হইবেন (কালবী, মা'আলিমুত তানযীল- ৩খ, ৩৯০; ফতহুল বারী, ৬খ., ৫৩৭; মুখতারু তাফসীরুল কুরতুবী পৃ. ৬২১, দ্বাইরা, ১৯খ., ১২৯)। তাফসীরে কুরতুবীতে যামাখশারীর বরাতে এবং রূহুল মা'আনীতে তাঁহার নাম লুকমান ইব্ন বাউরা (باعوراء) বলা হইয়াছে। আল-মুবতাদা গ্রন্থে ওয়াহ্হ্ ইব্ন মুনাব্বিহের বর্ণনায় লুকমানকে আইয়ুব (আ)-এর ভাগিনা এবং মুকাতিলের উদ্ধৃতিতে তাঁহার খালাতো ভাই বলা হইয়াছে। অপরদিকে ওয়াকিদীর বর্ণনায় তাঁহাকে বনী ইসরাঈলের কাযী (বিচারপতি) বলা হইয়াছে। অদ্রূপ মুজাহিদসূত্রে তাবারী প্রমুখের বর্ণনায় তাঁহাকে দাউদ (আ)-এর সমকালীন এবং বানু ইসরাঈলের কাযী বলা হইয়াছে। বাগাবী, বায়দাবী ও কুরতুবীর বর্ণনায় বলা হইয়াছে যে, লুকমান (আ) দাউদ (আ)-এর নবী হওয়ার পূর্বে ফতওয়া প্রদানের দায়িত্ব পালন করিতেন। তিনি দাউদ (আ)-এর নিকট হইতে ইল্ম আহরণ করেন। তিনি নবী হওয়ার পর লুকমান (আ) ফতওয়া প্রদান বন্ধ করিয়া দেন এবং দাউদ (আ)-এর 'উযীর'রূপে দায়িত্ব পালন করেন (বাগাবী, ৩খ., ৪৯০, ৪৯১; মুখতাসার তাফসীরিল কুরতুবী, পৃ. ৬২১; ফাতহুল বারী, ৬খ., ৫৩৭; রূহুল মা'আনী, ১১/১খ., ৮২; মাজহারী, উরদু, ৯খ., ২৪৮)।
উল্লিখিত বর্ণনাসমূহে আপাত বিরোধ রহিয়াছে। কেননা উল্লিখিত বংশলতিকা অনুসারে লুকমান (আ) ছিলেন ইবরাহীম (আ)-এর পিতা আযরের ৩য়, অধস্তন পুরুষ। অথচ আইয়ূব (আ) ছিলেন আযরের ৭ম অধস্তন পুরুষ (দ্র. বিদায়া ১/২২০, আইয়ুব (আ)-এর বংশলতিকাস্থ এবং দাউদ (আ) ছিলেন আযরের ১৪তম অধস্তন পুরষ (বিদায়া, ২খ., ৯, দাউদ আ.-এর বংশলতিকা) অথবা ১২তম অধস্তন পুরুষ (বাইবেল, ১ বংশাবলী, ২৪ ৩-১১৬ দ্র.)।
এই বিরোধ নিরসনের জন্য বায়দাবী প্রমুখ বলিয়াছেন যে, লুকমান (আ) এক হাযার বৎসরের দীর্ঘ জীবন লাভ করিয়া দাউদ (আ)-এর কাল পর্যন্ত জীবিত ছিলেন (বায়যাবীর বরাতে তাফসীরে মাজহারী (উরদূ), ৯খ., ২৪৮; মুফতী শফী, মা'আরিফুল কুরআন, ৭খ., ৩৪; রূহুল মা'আনী, ১১/১খ., ৮২; ফাতহুল বারী, ৬খ., ৫৩৭; মুখতারু তাফসীরিল কুরতুবী, পৃ. ৬২১)। কিন্তু লুকমান (আ)-এর এই দীর্ঘকাল বাঁচিয়া থাকা এবং বানু ইসরাঈলের কাযী ও দাউদ (আ)-এর সমকালীন হওয়ার কথা মানিয়া নিলেও অপর একটি জটিল প্রশ্ন দেখা দেয় যে, বানু ইসরাঈলের বিশিষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসাবে তাওরিত-ইনজীলে তাঁহার উল্লেখ ও আলোচনা থাকা উচিত ছিল। অথচ ইনজীল অথবা Jewish Encyclopaedia-তে তাঁহার কোন উল্লেখ নাই। এই প্রসংগে আল- কামিলী তাঁহার তাফসীর গ্রন্থে লিখিয়াছেন যে, কোন কোন মুসলিম মনীষী তাওরাতে উল্লিখিত বাল'আম (بلعام بن باعوراء) ও লুকমানকে অভিন্ন ব্যক্তি বলিয়াছেন। কিন্তু ইনজীল ও দাইরা-ই মা'আরীফে য়াহুদে বাল'আমের চরিত্র যেরূপ ঘৃণ্যভাবে উপস্থাপিত হইয়াছে উহার সহিত লুকমান চরিত্রের কোন প্রকার মিল না থাকায় এই দাবি গ্রহণযোগ্য হইতে পারে না (দ্র. দাইরা-ই মা'আরিফ, ১৮খ., ১২৯; ইসলামী বিশ্বাকোষ, ২৩খ., ২৯১)।
(২) লুকমান (আ)-এর বংশধারা ও গোত্র পরিচিতি সম্পর্কে দ্বিতীয় অভিমত এই যে, তিনি সূদানী হাবশী দাস ছিলেন। তাফসীরে রূহুল মা'আনীতে বলা হইয়াছে, লুকমান একটি অনারব (আ'জামী) নাম (রূহুল মা'আনী, ১১/১খ., ৮২)। আবদুল্লাহ ইব্ন আব্বাস, জাবির ইবন আবদুল্লাহ, আবূ হুরায়রা (রা) প্রমুখ সাহাবী, সা'ঈদ ইবনুল মুসায়্যাব, মুজাহিদ, খালিদ ইন্ন ছাবিত, রি'ঈ (খালিদ ইব্দু রাবী'-মাজহারী), 'উমার ইবন কায়স ও আবদুর রহমান ইব্ন ইয়াযীদ প্রমুখ তাবি'ঈ হইতে প্রাপ্ত বর্ণনার ভিত্তিতে ইব্ন আবূ শায়বা, ইমাম আহমদ, ইব্ন আবিদ, ইব্ন জারীর, কুতায়বা, ইবন কাছীর, ইবনুল মুনযির, ইব্ন আবী হাতিম, আবদুর রহমান সুহায়লী প্রমুখ হাদীছ ও তাফসীর শাস্ত্রের ইমাম ও ইতিহাসবিদগণ লুকমানকে আফ্রিকার অন্তর্গত সুদানের নূবা গোত্রের লোক এবং হাবশী দাস বলিয়াছেন। এমনকি ইব্ন আব্বাস ও আবূ হুরায়রা (রা) সূত্রে বর্ণিত একটি মারফু হাদীছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম লুকমানকে হাবশী দাস বলিয়াছেন। তবে হাদীছ বিশারদগণ এই মারফু রিওয়ায়াতকে দুর্বল সাব্যস্ত করিয়াছেন। তাঁহাদের বর্ণনায় লুকমান (আ)-এর বংশ পরিচিতি নিম্নরূপ: লুকমান ইবন আনকা 'ইন্ন সুরূন। ফতহুল বারীতে সুরূন স্থলে শীরূন (شیرون) বলা হইয়াছে।
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়াতে সুরূন স্থলে সুদূন (سدون) এবং মতান্তরে লুকমান ইবন হারান (ثاران) ইন্ন সুদূন বলা হইয়াছে। তিনি ছিলেন মিসরের দক্ষিণ ও সূদানের উত্তরাঞ্চলে বসবাসকারী নূবা গোত্রের লোক এবং তিনি মাদয়ান ও আয়লা (বর্তমান আকাবা)-র বাসিন্দা ছিলেন।
মোটকথা, অধিকাংশ ইতিহাসবিদ, মুফাসসির, মনীষীদের মতে লুকমান একজন হাবশী দাস ছিলেন এবং মূল বংশের দিক দিয়া নূবী হওয়া সত্ত্বেও তাঁহার বসবাস আরবী ভাষাভাষীদের অঞ্চলে হওয়ার কারণে তাঁহার জ্ঞানগত বাণী ও দৃষ্টান্তসমূহ আরবে প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছিল। উল্লিখিত মনীষিগণ তাহাদের অভিমতের স্বপক্ষে যে সকল বর্ণনা প্রমাণ হিসাবে উপস্থাপন করিয়াছেন সেইগুলির কয়েকটি এখানে উদ্ধৃত করা হইল। সুফয়ান ছাওরী, 'ইকরিমা সূত্রে ইবন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, লুকমান একজন হাবশী দাস ও সূত্রধর ছিলেন। কাতাদা আবদুল্লাহ ইব্ন যুবায়র (রা) হইতে বর্ণনা করেন: আবদুল্লাহ বলেন, আমি জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ (রা)-কে জিজ্ঞাসা করিলাম, লুকমান সম্পর্কে আপনি কি জানেন? তিনি বলিলেন, কানা কাসীরান আফতাস মিনান নূবা। তিনি নূবা গোত্রের বেঁটে ও চ্যাপ্টা নাকবিশিষ্ট ছিলেন। ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আনসারী সা'ঈদ ইবনুল মুসায়্যিব হইতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, কানা লুকমানু মিন সূদানি মিছরা যাা মিশাাাফিরা আ'তানিহিল্লাহুল হিকমাতা ওয়া মানা'আহুন নুবুওয়াতা। "লুকমান ছিলেন মিসরীয় সুদানের অধিবাসী, মোটা ওষ্ঠবিশিষ্ট; আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে নুবুওয়াত দান না করিলেও হিকমত ও প্রজ্ঞার ভাণ্ডার দান করিয়াছিলেন"। আবদুর রহমান ইন্ন হারমালা হইতে আওযা'ঈর গৃহীত বর্ণনায় আছে, কালো বর্ণের এক ব্যক্তি সা'ঈদ ইবনুল মুসায়িয়বের নিকট আগমন করিল (সে তাহার গাত্রবর্ণ কালো হওয়ার কারণে দুঃখিত ছিল)। সা'ঈদ (রা) তাহাকে বলিলেন, "তোমার বর্ণ কালো এইজন্য তোমার দুঃখিত হওয়ার কোন কারণ নাই। কেননা সূদানের অধিবাসীদের মধ্যে তিনজন শ্রেষ্ঠ লোক হইয়াছেন- বিলাল (রা), উমার (রা)-র আযাদকৃত গোলাম মাহজা' এবং লুকমান হাকীম, যিনি, নূবা গোত্রের কালো বর্ণের মোটা ওষ্ঠবিশিষ্ট লোক ছিলেন"। মুজাহিদ ও 'উমার ইবন কায়সের বর্ণনায় আছে, "লুকমান ছিলেন কালো, মোটা ও ভারী ওষ্ঠবিশিষ্ট এবং মাংসল ও স্কুল এবং ফাটলযুক্ত পা বিশিষ্ট" (ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া, মুখতাসার তাফসীরে ইব্ন কাছীর, রূহুল মা'আনী, মুখতারু তাফসীরিল কুরতুবী, তাফসীরুল বাগাবী, ফাতহুল বারী, তাফসীরে মাজহারী (উরদূ), মা'আরিফুল কুরআন, ইব্ন আবূ শায়বা, আহমদের কিতাবু'য-যুহদ, দা, মা, ই, ইসলামী বিশ্বকোষ, হিফযুর রহমান, কাসাসুল কুরআন, জামীল আহমাদ, আম্বিয়ায়ে কুরআন)। লুকমান (আ)-কে গোলাম সাব্যস্তকারীদের কেহ কেহ বলিয়াছেন, তিনি বানু ইসরাঈলের এক ব্যক্তির গোলাম ছিলেন। তাঁহার মনিব তাঁহাকে মুক্ত করিয়া দিয়াছিল এবং ব্যবসা-বাণিজ্য করার জন্য তাঁহাকে কিছু সম্পদ দিয়াছিল। শারহুল আমালীতে আবূ উবায়দ আল-বিকরী একটি বর্ণনা উল্লেখ করিয়াছেন, যাহাতে লুকমান (আ)-কে ইয়ামানের আযদ গোত্রের শাখা বনু হাসহাস (বনূ নাহহাস, বিদায়া)-এর আযাদকৃত গোলাম বলা হইয়াছে। ইবন হাজার এই বর্ণনা উল্লেখ করিয়া ইহাকে দুর্বল বলিয়াছেন (ফাতহুল বারী)।
(৩) ইতিহাসবিদ মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক-এর মতে, লুকমান হাকীম ছিলেন প্রাচীন আরবের প্রসিদ্ধ 'আদ (দ্বিতীয় 'আদ) গোত্রের বংশধর এবং তিনি বাদশাহ ছিলেন, দাস ছিলেন না। এই অভিমতের সমর্থনে কিতাবুত তীজানে ওয়াহ্ ইব্ন মুনabbiহ বলেন, "শাদ্দাদ ইব্ন আদের মৃত্যুর পর রাজত্ব তাহার ভ্রাতা লুকমান ইব্ন 'আদের নিকট অর্পিত হইল। আল্লাহ তা'আলা লুকমানকে এমন কিছু দান করিয়াছিলেন যাহা তাঁহার সমকালীন অন্য কোন মানুষকে দান করেন নাই। আল্লাহ তাঁহাকে এক শত লোকের সমপরিমাণ অনুভূতি শক্তি দান করিয়াছিলেন এবং তিনি ছিলেন সমসাময়িক কালের সর্বাধিক দীর্ঘকায় ব্যক্তি।" ওয়াহ্ব আরও বলেন, ইবন 'আব্বাস (রা) বলিয়াছেন, "লুকমান ইব্ন আদ ইবনুল মুলতাত ইবনুস সিলক (ইবনুস্ সিক্সাক) ইব্ন ওয়াইল ইন্ন হিময়ার নবী ছিলেন, রাসূল ছিলেন না"। এ বর্ণনা দ্বারা তাঁহার প্রাচীন আরব বংশীয় হওয়া বুঝা যায় এবং লক্ষণীয় ব্যাপার এই যে, লুকমান (আ)-কে হাবশী দাস হওয়ার প্রবক্তা ইব্ন জারীর ও ইব্ন কাছীর প্রমুখ যেরূপে তাহাদের দাবির সমর্থনে ইব্ন আব্বাস (রা)-এর উক্তি উল্লেখ করিয়াছেন তদ্রূপ ইবন ইসহাকও লুকমান (আ)-এর বাদশাহ ও আরবী হওয়ার দাবির সমর্থনে ইব্ন আব্বাস (রা)-এর উক্তিই উদ্ধৃত করিয়াছেন এবং এখানে ওয়াহবের বর্ণনায় লুকমানকে 'আদ-এর বংশধর বলা হইয়াছে, অথচ আল-মুবতাদা কিতাবে উদ্ধৃত ওয়াহবের বর্ণনায়ই তাঁহাকে আইয়ূব (আ)-এর ভাগিনা বলা হইয়াছে (দ্র. ইব্ন হিশাম, কিতাবুত তীজান, কাসাসুল কুরআন, আম্বিয়ায়ে কুরআন, দামাই)।
📄 লুকমান (আ)-এর পেশা
অধিকাংশ মুফাস্স্সির ও ইতিহাসবিদের মতে, লুকমান (আ) পেশায় সূত্রধর (নজ্জার) ছিলেন। সুফ্যান ছাওরীর তাফসীর গ্রন্থে ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে ইকরিমা সূত্রের বর্ণনায় এবং খালিদ ইব্ন ছাবিত রিব'ঈর বর্ণনায় তাঁহাকে সূত্রধর বলা হইয়াছে। ইবনুল মুনযির ও ইব্ন আবু শায়বা ও আহমদের বর্ণনায় তাঁহাকে দর্জী (খিয়্যাত) বলা হইয়াছে। যাজ্জাযের বর্ণনামতে তিনি ছিলেন বিছানার চাদর ও আনুষংগিক বস্ত্র-উপকরণ প্রস্তুতকারী। কেহ কেহ বলিয়াছেন, তাঁহার কাজ ছিল তাঁহার মনিবের জন্য দৈনিক এক বোঝা জ্বালানী কাঠ সংগ্রহ করা। ইব্ন আব্বাস (রা)-এর অপর এক বর্ণনায় এবং ইবন জারীরের ও ইব্ন আবু হাতিমের এবং ওয়াহবের বর্ণনায় তাঁহাকে রাখাল (রাঈ) বলা হইয়াছে (আল-বিদায়া, মুখতারু তাফসীরিল কুরতুবী, ফাতহুল বারী, তাফসীরে রূহুল মা'আনী)।
📄 হযরত লুকমান (আ)-এর সময়কাল
লুকমান (আ)-এর যুগ ও অবস্থানকাল অস্পষ্ট ও বিতর্কিত। পূর্বোল্লিখিত অভিমতসমূহের বিচারে হযরত লুকমানের সময়কাল হইবে হয়ত হযরত ইবরাহীম (আ)-এর প্রায় সমসাময়িক অথবা অল্প কিছু কাল পরে। কেননা একটি অভিমতে তাঁহাকে ইবরাহীম (আ)-এর পিতা আযরের তৃতীয় অধস্তন পুরুষ বলা হইয়াছে। অথবা তাঁহার সময়কাল হইবে হযরত দাউদ (আ)-এর সময়কাল। কেননা তাঁহাকে দাউদ (আ)-এর খালাতো ভাই অথবা ভাগিনা এবং তাঁহার সহযোগী ও উযীর বলা হইয়াছে। ইতিহাসের হিসাব-নিকাশে দাউদ (আ)-এর যুগ ছিল খৃষ্টপূর্ব দশম শতাব্দী। সুতরাং এই মত অনুসারে হযরত লুকমানের সময়কালও একই হইবে। অপর দিকে তাঁহাকে প্রাচীন আরবের 'আদ বংশীয় লুকমান ইব্ন 'আদ সাব্যস্ত করা হইলে তাঁহার যুগ হইবে অতি সুপ্রাচীন। কেননা ইতিহাসে প্রথম 'আদ সম্প্রদায় ছিল নূহ (আ)-এর চতুর্থ অধঃস্তন পুরুষ এবং 'আদ সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরিত নবী হুদ (আ) ছিলেন নূহ (আ)-এর পঞ্চম অথবা নবম অধস্তন পুরুষ (দ্র. বিদায়া নিহায়া) এবং দ্বিতীয় 'আদ তথা ছামূদ সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরিত নবী সালিহ (আ) ছিলেন নূহ (আ)-এর নবম অথবা দশম অধঃস্তন পুরুষ (বিদায় নিহায়া)। সুতরাং দ্বিতীয় 'আদের বংশধর হইলে লুকমান (আ)-এর সময়কাল হইবে হযরত ইবরাহীম (আ)-এর বেশ পূর্বে। মাওলানা হিফযুর রহমান তাঁহার কাসাসুল কুরআনে লুকমান (আ)-এর সময়কাল ৩০০০ খৃষ্টপূর্ব সন লিখিয়াছেন, যাহা হযরত ইবরাহীম (আ)-এর যুগ হইতে বহু পূর্বে সাব্যস্ত হইবে। এই প্রসঙ্গে ওয়াকিদী লুকমান (রা)-এর সময়কাল হযরত ঈসা (আ) ও আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের মধ্যবর্তী সময় বলিয়াছেন। আত্-তালকীহে ইবনুল জাওযী লুকমান (আ)-কে হযরত ইবরাহীম (আ)-এর পরে এবং হযরত ইসমাঈল ও হযরত ইসহাক (আ)-এর পূর্বে হওয়ার দাবি করিয়াছেন। ইবন হাজার এই উক্তিদ্বয় উল্লেখ করিয়া ওয়াকিদীর মতকে 'অতীব বিরল' বলিয়াছেন এবং লুকমান (আ) দাউদ (আ)-এর সমসাময়িক হওয়া সংক্রান্ত অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতকে সঠিক বলিয়াছেন (ফাতহুল বারী, রূহুল মা'আনী, কাসাসুল কুরআন, আম্বিয়ায়ে কুরআন)। ইব্ন হাজার হাকিমের মুসতাদরাক কিতাবের বরাতে এতদসংক্রান্ত আরও একটি বর্ণনা উল্লেখ করিয়াছেন যাহা প্রামাণ্য সনদে আনাস (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে। আনাস (আ) বলেন, যখন লুকমান (আ) দাউদ (আ)-এর নিকটে উপস্থিত ছিলেন তখন দাউদ (আ) (লোহা গলাইয়া) বর্ম তৈরি করিতেছিলেন। তিনি অভিভূত হইয়া বর্মের কার্যকারিতা ও উপকারিতা সম্পর্কে দাউদ (আ)কে জিজ্ঞাসা করিতে চাহিতেছিলেন, কিন্তু তাঁহার হিকমত তাঁহাকে প্রশ্ন করা হইতে বিরত রাখিতেছিল। এই বর্ণনা উল্লেখ করিয়া ইবন হাজার মন্তব্য করিয়াছেন যে, ইহাতে স্পষ্টত বুঝা যায় যে, লুকমান (আ) দাউদ (আ)-এর সমসাময়িক ছিলেন (ফাতহুল বারী)। এ প্রসঙ্গে সায়্যিদ সুলায়মান নদবী তাঁহার আরদুল কুরআন গ্রন্থে লিখিয়াছেন, "লুকমান হাকীম ও বাদশাহ (গোত্রপতি) লুকমান অভিন্ন ব্যক্তি ছিলেন এবং নিঃসন্দেহে তিনি দ্বিতীয় 'আদ সম্প্রদায়ের উত্তম শাসককূলের অন্যতম এবং অতি উঁচু স্তরের জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান। সহীফায় লুকমান নামে প্রসিদ্ধ পুস্তক এই 'আদ গোত্রীয় লুকমানেরই ছিল।" সায়্যিদ নদবী (র) তাঁহার এই দাবির অনুকূলে একাধিক প্রমাণ উপস্থাপন করিয়াছেন। যেমন, আরব জাহিলী যুগের অন্যতম শীর্ষ কবি সালমা ইবন রাবী'আর নিম্নোক্ত কবিতা পংক্তিতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের প্রতি স্পষ্ট আলোকপাত রহিয়াছে। "কালের দুর্বিপাক ও বিবর্তন অসম গোত্র, অতঃপর বকরীর স্তন্যে লালিতদের এবং যূ-জাদুন ইয়ামানের শাসক, জাশ, মারিব গোত্র, লুকমানের গোত্র ও তাকূন প্রভৃতিকে বিলীন করিয়াছে"।
ইহা দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, লুকমান আরবী ভাষাভাষী ছিলেন, ইয়ামানের বাসিন্দা ছিলেন এবং গোত্রপতিও ছিলেন এবং জাঁকজমক ও প্রতিপত্তিতে উল্লেখযোগ্য এবং প্রসিদ্ধ সাবা গোত্রের সমপর্যায়ের ছিলেন। বস্তুত এইসব বিষয় 'আদ গোত্রের লুকমানের জন্যই প্রযোজ্য হইতে পারে। প্রসংগত উল্লেখ্য যে, আবরার-ই উবায়দ গ্রন্থেও এই লুকমানের উল্লেখ রহিয়াছে এবং উহাতে তাঁহাকে 'আদ আল-আখিরা (দ্বিতীয় 'আদ)-এর অন্তর্ভুক্ত বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। মূলত প্রথম 'আদ (আদ আল-উলা)-এর ধ্বংসের পর যে সকল লোক 'আদ সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরিত নবী হূদ (আ)-এর অনুসারীরূপে তাঁহার সহিত হাদরামাওত প্রভৃতি স্থানে গিয়া বসতি স্থাপন করিয়াছিল তাহদিগকে 'আদ আল-আখিরা বলা হয়।
সায়্যিদ সুলায়মান নদবী তাঁহার দাবি প্রমাণে উল্লেখযোগ্য একটি প্রত্নতাত্ত্বিক শিলালিপির কথা উল্লেখ করিয়াছেন। দক্ষিণ আরবের (ইয়ামানের) 'আদন (এডেন)-এর নিকটবর্তী হিসনে গুরাবের ধ্বংসাবশেষ হইতে ১৩৮৪ খৃস্টাব্দে এই শিলালিপিটি পাওয়া গিয়াছে। উহাতে হযরত হূদ (আ)-এর শরী'আত অনুসারী সৎস্বভাবসম্পন্ন শাসকবর্গের প্রতি ইংগিত রহিয়াছে এবং তাহাদের উত্তম ফয়সালাসমূহ একটি গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করার কথা বলা হইয়াছে। সায়্যিদ নদবী এই শিলালিপির বিষয়ে আরব ঐতিহাসিক ভূগোলের লেখক ফরেস্টারের বরাত উল্লেখ করিয়া লিখিয়াছেন যে, হযরত মু'আবিয়া (রা)-র সময়ও অনুরূপ শিলালিপি আবিষ্কৃত হইয়াছিল এবং উভয় শিলালিপির বিষয়বস্তুতে হুবহু মিল রহিয়াছে (দ্র. আরদুল কুরআন, কাসাসুল কুরআন, আম্বিয়ায়ে কুরআন, দাইরাতুল মা'আরিফ)।
হিজরী অষ্টাদশ সালে প্রাপ্ত 'আদ সম্প্রদায়ের শিলালিপির কয়েকটি বাক্যের অনুবাদ নিম্নরূপ : "আমাদের উপরে শাসন পরিচালনা করেন এমন রাজাগণ যাহারা নীচতা সম্বন্ধে ধ্যানধারণা হইতে অতি দূরত্বে অবস্থান করেন, দুষ্ট প্রকৃতির লোকদের শাস্তি বিধান করেন এবং (যাহারা) হৃদ (আ)-এর শরী'আত অনুসরণ আমাদের জন্য 'জন্মলাভ' (?) করিতেন (তাহাদের) উত্তম ফয়সালাগুলি একটি গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করা হইত।" সায়্যিদ নদবী বলেন, এই শেষ বাক্যটি যাহা কাগজে নয়, পাথরে খোদাইরূপে পাওয়া গিয়াছে। ইহা দ্বারা আমরা কি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে পারি না যে, লুকমান (আ)-এর উত্তম ফয়সালাগুলির লিখিত ভাণ্ডারই সহীফা-ই লুকমানরূপে প্রসিদ্ধ ও প্রচলিত ছিল (আরদুল কুরআন, কাসাসুল কুরআন)।
এই পর্যালোচনা দ্বারা লুকমান (আ) আরবের অধিবাসী হওয়া প্রমাণিত হয় এবং সেই সাথে ইয়াহুদী গ্রন্থসমূহে তাঁহার উল্লেখ না থাকিবার সূত্রও বোধগম্য হয়। সায়্যিদ সুলায়মান নদবী এই প্রসঙ্গে ইউরোপের পণ্ডিতদের হাকিম লুকমান ও দার্শনিক ঈশপ (৬১৯-৬৬৪ খৃ. পূ.)-কে (তাহাদের ঘটনাবলী ও দৃষ্টান্তের মাঝে মিল থাকিবার ভিত্তিতে) অভিন্ন ব্যক্তি সাব্যস্ত করিবার ধারাটিও যথার্থরূপে খণ্ডন করিয়াছেন। তাঁহার মতে, ঘটনাপঞ্জী ও বাণী দৃষ্টান্তে মিল থাকাই তাহাদের অভিন্ন ব্যক্তি হওয়ার জন্য যথেষ্ট নহে। কেননা, লুকমান হাকীম ছিলেন সার্বিক সদগুণে গুণান্বিত, আর ইতিহাসের বর্ণনামতে ঈশপ ছিল দাস ও অর্কমণ্য প্রকৃতির লোক (উল্লেখ্য যে, লুকমান (আ.)-এর দাস হওয়া সম্পর্কিত বর্ণনাগুলি তেমন প্রামাণ্য নহে; দামাই)।
ইহা ছাড়া পবিত্র কুরআনে লুকমান (আ) কর্তৃক তাঁহার পুত্রকে প্রদত্ত উপদেশের যে বিবরণ উদ্ধৃত হইয়াছে (পরে দ্র.) উহাতে তিনি পুত্রকে গর্ব ও অহংকার বর্জন করিয়া বিনয়-নম্রতা ও শিষ্টাচার এবং উঁচু মানের গুণাবলী আয়ত্ত করিবার উপদেশ দিয়াছেন যাহা এক দাসপুত্রের তুলনায় একজন রাজপুত্রের জন্যই অধিক সমীচীন। পবিত্র কুরআনে উদ্ধৃত উপদেশ বাণীর বিশ্লেষণে মাওলানা হিফজুর রহমান লিখিয়াছেন, “লুকমান হাকীম যদি দাস হইতেন, তাহা হইলে স্বীয় পুত্রকে এই ধরনের উপদেশ দান করিতেন না। কেননা, অহংকার ও আত্মম্ভরিতা, রূঢ়তা ও অপরকে হেয় প্রতিপন্ন করা এমন সব স্বভাব যাহা রাজা ও রাজপুত্র, স্বচ্ছল ও প্রতিপত্তিতে মদমত্তদের মাঝেই অধিক হারে দেখা যায় এবং এইগুলি আল্লাহর প্রতি ভীতিহীন ও সম্পদের প্রাচুর্যে মত্ত বিলাসীদেরই আচরণ হইয়া থাকে। অহংকারী ও প্রতাপশালীদের এই সকল কু-স্বভাব কোন দাস বা দাস পুত্রের মধ্যে থাকিবার সুযোগ নাই। কেননা, তাহাদের শক্তি ও সময় তো অপরের বশ্যতা ও সেবা প্রদানে অতিবাহিত হয়। 'শেখ সাদীর ভাষায়: "বিনয় তো অহংকারীদের জন্য উত্তম সজ্জা; ভিখারীর বিনয় তো তার মজ্জাগত স্বভাব মাত্র"।
মোটকথা, পবিত্র কুরআনে উদ্ধৃত লুকমান (আ)-এর উপদেশমালার প্রতি লক্ষ্য করিলে দৃঢ়ভাবে এই দাবি করা যায় যে, লুকমান হাকীম ও 'আদ সম্প্রদায়ের লুকমান অভিন্ন ব্যক্তি ছিলেন এবং তিনি দ্বিতীয় 'আদের সদগুণসম্পন্ন বাদশাহ ও হযরত হূদ (আ)-এর অনুসারী ছিলেন। তিনি আফ্রিকার দাস ছিলেন না, বরং খাঁটি আরব ছিলেন। এই প্রসংগে সীরাতবিদ মুহাম্মাদ ইবন ইসহাকের উদ্ধৃতি এবং জাহিলী কবি সালমা ইবন রাবী'আর কাব্যের সাক্ষ্য অগ্রাধিকারযোগ্য ও প্রামাণ্য এবং দ্বিতীয় 'আদ যুগের শিলালিপি দ্বারা আরবাসীদের নিকট প্রসিদ্ধ সহীফা-ই লুকমান-ই উদ্দেশ্য হইবে (কাসাসুল কুরআন)।
এখন এই কথাও বলা যায় যে, লুকমান যেহেতু আরব বংশোদ্ভূত ছিলেন এবং ইয়াহুদী-খৃস্টানদের ধর্মীয় বা রাজনৈতিক ইতিহাসের সহিত তাঁহার কোন সম্বন্ধ ছিল না, সেইজন্য তাহাদের গ্রন্থসমূহে তাঁহার কোন উল্লেখ নাই। অপরদিকে আরবরা তাঁহাদের বংশোদ্ভূত লুকমানের জন্য যথার্থই গৌরব করিত, প্রাচীন কাল হইতে সম্মানের সহিত তাঁহার নাম উচ্চারণ করিত এবং তাঁহার উপদেশাবলীর চর্চা করিত। ইহার ভিত্তিতেই মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে নামোল্লেখের মাধ্যমে লুকমান (আ)-এর ব্যক্তিত্ব অমরত্ব ও চিরন্তনতা লাভ করিয়াছে (দ্র. দা. মা. ই)।
📄 হযরত লুকমান (আ)-এর নবুওয়াত প্রসংগ
হযরত লুকমান নবী ছিলেন কিনা এই প্রসংগেও পূর্বসূরী মনীষীদের মধ্যে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। অধিকাংশের মতে তিনি নবী ছিলেন না। শুধু ইকরিমা ও শা'বী হইতে তাঁহার নবী হওয়ার কথা বর্ণিত হইয়াছে (ফাতহুল বারী, মুখতারুত তাফসীরিল কুরতুবী, মাদারিক ও খাযিনের বরাতে মুফতী' শফী, আহকামুল কুরআন, মা'আরিফুল কুরআন)। ইব্ন ওয়াহ্হ্ সূত্রে মুহাম্মাদ ইব্ন ইসহাকের একটি বর্ণনা পূর্বে উল্লিখিত হইয়াছে যাহাতে ইব্ন আব্বাস (রা) হইতেও লুকমানের নবী হওয়ার কথা বলা হইয়াছে। "নবী ছিলেন, রাসূল ছিলেন না" (কাসাসুল কুরআন; বরাত, কিতাবুত তীজান)। বাগাবী বলিয়াছেন, এই বিষয়ে আলিমগণের ঐক্যমত্য রহিয়াছে যে, লুকমান 'হাকীম' ছিলেন, নবী ছিলেন না। একাকী ইক্রিক্রমা তাঁহাকে নবী বলিয়াছেন (মা'আলিমুত তানযীল)। পবিত্র কুরআনের সূরা লুকমানে তাঁহার সারগর্ভ ও প্রজ্ঞাপূর্ণ উপদেশমালার কথা বিশেষ গুরুত্বের সহিত বর্ণিত হইলেও উহার বর্ণনাভংগীতে এবং কোন আয়াত বা শব্দে এমন কোন ইংগিত পাওয়া যায় না যাহা দ্বারা লুকমানের নবী হওয়া বুঝা যাইতে পারে। এই কারণে অধিকাংশ মনীষী তাঁহার নবী না হওয়ার মত পোষণ করিয়াছেন। এমন কি ইব্ন আব্বাস (রা) হইতেও নবী না হওয়ার বর্ণনাও রহিয়াছে। এই প্রসংগে ইব্ন কাছীর সুস্পষ্ট বক্তব্য প্রদান করিয়াছেন। তিনি লিখিয়াছেন: "জমহূরের প্রসিদ্ধ উক্তি এই যে, তিনি হাকীম ও ওয়ালী ছিলেন, নবী ছিলেন না। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে তাঁহার প্রশংসা করিয়া তাঁহার সর্বাধিক প্রিয়পাত্র স্বীয় পুত্রকে প্রদত্ত তাঁহার উপদেশগুলির বর্ণনা প্রদান করিয়াছেন" (আল-বিদায়া)। অদ্রূপ "আমি লুকমানকে হিকমত দান করিয়াছিলাম.......") আয়াতের ব্যাখ্যায় কাতাদা হইতে বর্ণিত হইয়াছে, "(হিকমাত অর্থ) ফিকহ ও ইসলাম; তিনি নবী ছিলেন না; তাঁহার নিকট ওহী প্রেরণ করা হয় নাই। পূর্বসূরীদের অনেকের বরাতে এইরূপ বর্ণিত হইয়াছে। তাহাদের মধ্যে রহিয়াছেন মুজাহিদ, সা'ঈদ ইবনুল মুসায়্যাব এবং ইব্ন আব্বাস (রা) প্রমুখ" (প্রাগুক্ত, কাসাসুল কুরআন, আম্বিয়ায়ে কুরআন, রূহুল মা'আনী, মাজহারী, মা'আরিফুল কুরআন, মুখতারু তাফসীরিল কুরতুবী, ফাতহুল বারী)। সা'ঈদ ইবনুল মুসায়্যাবের বর্ণনা "আল্লাহ তাহাকে হিকমত দিয়াছেন, নবুওয়াত দেন নাই..... ইতোপূর্বে উল্লিখিত হইয়াছে, জমহূরের মতে হিকমত অর্থ সুবুদ্ধি, বুদ্ধিমত্তা, তীক্ষ্ণ মেধা, প্রজ্ঞা, ইল্ম ও ইল্ল্ম অনুসারে আমল এবং এক কথায় কথা ও কাজে সুষ্ঠুতা সম্পন্ন হওয়া" (রূহুল মা'আনী, মা'আরিফুল কুরআন, মুখতাসার ইব্ন কাছীর)।