📄 ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর শাহাদাতের স্থান
হযরত ইয়াহ্ইয়া (আ)-কে কোথায় শহীদ করা হইয়াছিল এই ব্যাপারে সীরাত ও ইতিহাসবিদগণের দুইটি মত রহিয়াছে। শাম্মার ইবন 'আতিয়্যা হইতে সুফিয়ান ছাওরী (র)-এর বর্ণনা অনুসারে বায়তুল মুকাদ্দাসের 'হায়কাল' ও কুরবানীর স্থানের মধ্যবর্তী সত্তরজন নবীকে শহীদ করা হইয়াছিল এবং ইয়াহইয়া ইন্ন যাকারিয়্যা (আ) ছিলেন তাঁহাদের অন্যতম। অপর দিকে সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব (র) হইতে আবূ উবায়দ কাসিম ইবন সাল্লামের বর্ণনামতে তাঁহাকে দামিশকে শহীদ করা হইয়াছিল এবং বুস্ত নাস্সারের দামিশকে আক্রমণকালে সে ইয়াহইয়া (আ)-এর রক্ত উত্তোলিত হইতে দেখিয়া এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করিয়াছিল এবং ইয়াহুদীরা ইয়াহইয়া (আ)-কে হত্যা করিবার কথা স্বীকার করিলে বুস্ত নাস্সার সত্তর হাজার ইয়াহূদীকে হত্যা করিবার পর ইয়াহইয়া (আ)-এর রক্ত শান্ত হইয়াছিল। ইবন কাছীর এই বর্ণনাকে প্রামাণ্য বলিয়াছেন। তবে সেই সংগে মন্তব্য করিয়াছেন যে, ইহা দ্বারা আতা ও হাসান বসরীর বর্ণনার সমর্থনে বুস্ত নাস্সার-এর দামিশক অভিযান ঈসা (আ)-এর সমসাময়িক হওয়া মানিয়া নিবার প্রয়োজন দেখা দেয় (বিদায়া)। কিন্তু তখন আবার বিষয়টি ইতিহাসের প্রায় সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের সহিত সংঘাতপূর্ণ হইয়া দাঁড়ায় (কাসাসুল কুরআন)। তবে ইয়াহইয়া (আ)-এর শাহাদাতের স্থান দামিশকে হওয়ার বিষয়টি ইবন আসাকিরের একটি বর্ণনা দ্বারা সমর্থিত হয়। ইহা যায়দ ইব্ন ওয়াকিদ (র) হইতে ওয়ালীদ ইন্ন মুসলিমের সূত্রে বর্ণিত হইয়াছে। ওয়াকিদ বলেন, দামিশকের (উমৃদুস সাকাসিকা নামে পরিচিত স্থানের) একটি মসজিদ নির্মাণের জন্য খননকালে মসজিদের মিহরাবের নিকটবর্তী পূর্ব পার্শ্ব হইতে ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর মাথা বাহির হইয়াছিল এবং মুখমণ্ডল, এমনকি চুল পর্যন্ত সম্পূর্ণ অক্ষত ও অবিকৃত ছিল। তাহা এমনভাবে রক্তরঞ্জিত দেখাইতেছিল যেন এখনই তাঁহাকে হত্যা করা হইয়াছে। (বিদায়া)। তবে এখানেও প্রাপ্ত মাথাটি যে ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর ছিল উহার নিশ্চয়তার ব্যাপারটি প্রশ্নের সম্মুখীন থাকিয়া যায় (কাসাসুল কুরআন)।
ইন কাছীর (র) ইসহাক ইন্ন বিশরের কিতাব আল-মুরতাদার বরাতে ইয়াহইয়া ও যাকারিয়্যা (আ)-এর শহীদ হওয়া প্রসংগে ইবন 'আব্বাস একটি দীর্ঘ রিওয়ায়াত উপস্থাপন কারিয়াছেন। ইহাতে বলা হইয়াছে যে, মি'রাজের ভ্রমণকালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলায়হি ওয়াসাল্লাম আকাশ জগতে যাকারিয়্যা (আ)-এর সাক্ষাত লাভ করিলে তাঁহাকে সালাম করিয়া বলিলেন, হে ইয়াহ্ইয়ার পিতা! আপনার হত্যার ঘটনা এবং উহার কারণ সম্পর্কে আমাকে অবহিত করুন। তখন তিনি বলিলেন, হে মুহাম্মাদ (স)! আমি আপনাকে অবহিত করিতেছি যে, ইয়াহ্ইয়া ছিল সমকালীন শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি এবং সর্বাধিক সৌন্দর্যের অধিকারী এবং আল্লাহ তা'আলার ঘোষণা অনুসারে সে ছিল 'সায়্যিদ ও হাসূর' (নারীর প্রতি নিরাসক্ত)।
এ বিষয়ে শেষ কথা এই যে, ইয়াহইয়া (আ)-কে হত্যা করিবার কারণ ও সূত্র সম্পর্কে এবং তাঁহার শাহাদতের স্থান সম্পর্কে বর্ণনায় বিরোধ থাকিলেও এই বিষয়টি স্বীকৃত যে, ইয়াহুদীরা তাঁহাকে শহীদ করিয়া ঈসা (আ)-এর নিকট তাঁহার শাহাদতের সংবাদ পৌঁছাইলে তিনি প্রকাশ্যে দীনের দাওয়াতের কাজ আরম্ভ করিয়া দিলেন (কাসাসুল আম্বিয়া, কাসাসুল কুরআন)। হযরত ইয়াহইয়া (আ)-কে হত্যা করিবার পর ইয়াহুদীরা তাঁহার পিতা যাকারিয়্যা (আ)-কে হত্যা করিবার জন্য ছুটিল। পরবর্তী সময়ে তাহারা হযরত ঈসা (আ)-কে হত্যার চক্রান্ত করিলে আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে ঊর্ধ্বাকাশে তুলিয়া নিলেন।
📄 ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর বয়স
ইয়াহ্ইয়া (আ) ঈসা (আ)-এর ছয় মাস পূর্বে জন্মগ্রহণ করেন (দ্র. ফাতহুল বারী, লুক ১: ২৬-৩৫)। ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর শাহাদতের পরে যখন ঈসা (আ) প্রকাশ্যে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ শুরু করিলেন তখন তাঁহার বয়স ত্রিশ বৎসর ছিল বলিয়া কথিত। সুতরাং এই হিসাবে শাহাদাত লাভের সময় ইয়াহইয়া (আ)-এর বয়স সাড়ে ত্রিশ বৎসর হইয়াছিল এবং তিনি খৃ., পৃ. ১ সনে জন্মগ্রহণ করেন (আম্বিয়ায়ে কুরআন)।
"যখন আমি (দ্বিতীয়) আকাশে পৌছিলাম তখন দেখিলাম ইয়াহ্ইয়া ও ঈসা-দুই খালাত ভাইকে। তিনি (জিবরীল) বলিলেন, ইয়াহইয়া ও ঈসা। সুতরাং আপনি তাহাদিগকে সালাম করুন। তখন আমি সালাম করিলে তাঁহারা সালামের জওয়াবে বলিলেন, মারহাবা শ্রেষ্ঠ নবীকে, শ্রেষ্ঠ ভাইকে (কাসাসুল কুরআন; আম্বিয়ায় কুরআন; বরাত বুখারী কিতাবুল আম্বিয়া হাদীছ নং ১৯)।
📄 গ্রন্থপঞ্জী
গ্রন্থপঞ্জী: (১) আল-কুরআনুল কারীম তাফসীর গ্রন্থ; (২) ইব্ন কাছীর, তাফসীরে ইব্ন কাছীর, ১ম খ, ৩খ; (৩) ঐ, মুখতাসার তাফসীরে ইব্ন কাছীর; (৪) আল কুরতুবী, আল জামি'লিআহকামিল কুরআন-তাফসীর কুরতুবী ২/২খ., ১খ.; (৫) আল-আলুসী, তাফসীরে রুহুল মা'আনী, ২/২খ, ৮/২খ; (৬) কাযী ছানাউল্লাহ পানিপথী, তাফসীরে, মাজহারী, ২খ, ৫খ, ৬খ; (৭) মুফতী মুহাম্মাদ শফী; মা'আরিফুল কুরআন, ২খ, ৬খ; (৮) ইব্ন জারীর আত-তাবারী, তাফসীরে তাবারী; ও ইতিহাস গ্রন্থ); (৯) ইব্ন কুতায়বা, আল-আ'আরিফ; (১০) নাজ্জার, কাসাসুল আম্বিয়া; (১১) ছা'লাবী, কাসাসুল আম্বিয়া; (১২) ইবন কাছীর, আল কামিল ১খ; (১৩) ইব্ন কাছীর, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ২খ; (১৪) হিফজুর রহমান সীওহারবী, কাসাসুল কুরআন, ২খ; (১৫) জামীল আহমদ এম, এ, আম্বিয়ায়ে কুরআন; লাহোর ৩খ; (১৫) ইসলামী বিশ্বকোষ, ই,ফা, বা; ২২খ, শিরো; (১৬) ইবন হাজার আসকালানী, ফাতহুল বারী, ৬খ. এবং (১৭) পবিত্র বাইবেল, বাংলাদেশ বাইবেল সোসাইটি। মাওলানা মুহাম্মদ ইসমাইল