📄 হযরত ঈসা ও হযরত ইয়াহ্ইয়া (আ)
পবিত্র কুরআনের আয়াতে পূর্বেই উল্লিখিত হইয়াছে যে, ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর নুবুওয়াতের অন্যতম কর্মধারা ছিল হযরত ঈসা (আ)-এর সুসংবাদ প্রদান ও তাঁহাকে সত্যায়ন করা। এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, আল্লাহ তা'আলা মারয়াম, তাঁহার পুত্র ঈসা (আ) ও যাকরিয়্যা (আ)-এর পুত্র ইয়াহ্ইয়া-এর মাধ্যমে তাঁহার কুদরতের মহিমার বহিঃপ্রকাশ ঘটাইয়াছেন। মারয়ামের মাতার সন্তান প্রার্থনা এবং তাঁহার কাংখিত পুত্র সন্তানের স্থলে কন্যা সন্তান দান, পরবর্তীতে যাঁহার ঈসা (আ)-এর মাতা হওয়া আল্লাহ্র দরবারে সিদ্ধান্তকৃত ছিল এবং মারয়ামের নিকটে অ-মৌসুমের ফল দেখিয়া যাকারিয়্যা (আ)-এর অন্তরে তাঁহার দীনী উত্তরসুরিরূপে সন্তান লাভের প্রবল বাসনা দিয়া যে কুদরতের বহিঃপ্রকাশের সুচনা হইয়াছিল, পরবর্তীতে বৃদ্ধ পিতা-মাতার ঘরে ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর জন্মলাভ এবং কুমারী মারয়ামের গর্ভে আল্লাহ্র কলেমারূপে হযরত ঈসা (আ)-এর জন্ম লাভ ও ইয়াহ্ইয়া (আ) কর্তৃক তাঁহাকে সত্যায়নের মাধ্যমে কুদরতী প্রক্রিয়াটি পূর্ণতা লাভ করিয়াছে।
হযরত ঈসা (আ) ও হযরত ইয়াহইয়া (আ)-এর জন্মকালও ছিল প্রায় একই সময়ে। কেহ কেহ ঈসা (আ)-এর তিন বৎসর পূর্বে ইয়াহইয়া (আ)-এর জন্মের কথা বলিয়াছেন (আল-কামিল, ১খ, ২২৯)। তবে অধিকাংশের মতে এবং বাইবেলের বর্ণনা অনুসারে ঈসা (আ)-এর মাত্র ছয় মাস পূর্বে ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর জন্ম হইয়াছিল। ইবন আবূ হাতিম মালিক ইবন আনাস (র) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, আমি জানিতে পারিলাম যে, ঈসা ইবন মারয়াম (আ) ও ইয়াহইয়া ইবন যাকারিয়্যা (আ) উভয়ে একই সময়ে মাতৃগর্ভে ছিলেন। ছা'লাবী বলিয়াছেন, ঈসা (আ)-এর ছয় মাস পূর্বে ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর জন্ম হইয়াছিল (ফাতহুল বারী, ৬খ, ৩৬৪; কাসাসুল কুরআন, ২খ, ২৬৩; আল কামিল, ১খ, ২৩০)।
পূর্বে উল্লেখ করা হইয়াছে যে, অনেকের মতে ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর মাতা (ঈশা' বা ইয়াসাবা) এবং মারয়াম সহোদর ভগ্নী, ভিন্নমতে ইয়াহইয়া (আ)-এর মাতা মারয়ামের খালা ছিলেন। পারস্পরিক আত্মীয়তা সম্বন্ধের কারণে এবং ইয়াহইয়া (আ)-এর মাতা বৃদ্ধ বয়সে ও মারয়াম কুমারী অবস্থায় অস্বাভাবিকরূপে গর্ভবতী হওয়ার কারণে তাঁহাদের উভয়ের মধ্যে এই বিষয়ে আলাপ-আলোচনা হইত। জাযারীর বর্ণনামতে, "ইয়াহইয়া (আ) ছিলেন ঈসা (আ)-এর প্রতি ঈমান আনয়নকারী ও তাঁহাকে সত্যায়নকারী সর্বপ্রথম ব্যক্তি। ইয়াহইয়া (আ)-কে গর্ভে ধারণকালে একদিন তাঁহার মাতা মারয়াম (আ)-এর সম্মুখে উপস্থিত হইলেন। ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর মাতা মারয়াম (আ)-কে বলিলেন, তুমি কি গর্ভবতী? মারয়াম (আ) বলিলেন, এইরূপ জিজ্ঞাসার হেতু কি? ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর মাতা বলিলেন, কারণ, আমি অনুভব করিতেছি যে, আমার গর্ভে যে আছে, সে তোমার গর্ভে যে আছে তাহাকে 'সিজদা' করিতেছে। ইহাই ইয়াহ্ইয়া (আ) কর্তৃক 'ঈসা (আ)-কে স্বীকৃতি প্রদান। কেহ কেহ বলিয়াছেন, তিন বৎসর বয়সের সময় ইয়াহইয়া (আ) মাসীহ (আ)-কে স্বীকৃতি প্রদান করিয়াছেন” (আল-কামিল, ১খ, ২২৯)।
ইবন কাছীর ইবন জুরায়জের বরাতে লিখিয়াছেন, 'ইবন আব্বাস (রা) মুসাদ্দিকাম বিকালিমাতিন মিনাল্লাহ -এর ব্যাখ্যায় বলিয়াছেন, ইয়াহ্ইয়া ও ঈসা (আ) খালাত ভাই ছিলেন। ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর মাতা বলিতেন, আমি অনুভব করিতেছি যে, আমার গর্ভে ........... (পূর্বানুরূপ)। ইহাই মাতৃগর্ভে থাকাকালে ইয়াহইয়া (আ) কর্তৃক 'ঈসা (আ)-কে স্বীকৃতি প্রদান। ঈসা (আ)-ই কালিমাতুল্লাহ। ইয়াহইয়া (আ) ঈসা (আ)-এর চাইতে বয়োজ্যেষ্ঠ ছিলেন। ইবন কাছীর ও ইবন হাজার মালিক ইবন আনাস (র) হইতে অনুরূপ বর্ণনা করিয়াছেন। মালিক (র) বলিয়াছেন, আমার মতে ঈসা (আ)-এর শ্রেষ্ঠত্বের কারণে। সুদ্দী (র)-এর বর্ণনায় এক ভিন্নতা রহিয়াছে। মারয়াম (আ) একদিন তাঁহার ভগ্নীর নিকট (ইয়াহ্ইয়া-এর মাতা) গমন করিলে ভগ্নী তাঁহাকে বলিল, "তুমি কি জান যে, আমি (এই বৃদ্ধ বয়সে) গর্ভবতী হইয়াছি"? তখন মারয়াম (আ) বলিলেন, 'তুমি কি জান যে, আমিও (কুমারী হওয়া সত্ত্বেও) গর্ভবতী হইয়াছি।' তখন তাহারা কোলাকুলি করিল এবং ইয়াহইয়া (আ)-এর মাতা বলিল, আমি অনুভব করিতেছি ........... (পূর্বানুরূপ)। ইহাই مُصَدِّقًا بكلمة من الله এর মর্ম। তবে সিজদা করার অর্থ আনুগত্য ও সম্মান প্রদর্শন ...... যাহা আমাদের পূর্ববর্তী শরী'আতে ছিল এবং যেরূপ আল্লাহ ফেরেশতাগণকে আদম (আ)-কে সিজদা করিতে আদেশ করিয়াছিলেন” (আল-বিদায়া, ২খ, ৬৫; ইব্ন কাছীর, তাফসীর, ১খ, ৩৬১)।
আবু নু'আয়ম আবূ সুলায়মান হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, একবার ঈসা ইবন মারয়াম (আ) ও ইয়াহইয়া ইবন যাকারিয়্যা একসংগে পথ চলিতেছিলেন। তখন ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর সহিত এক নারীর ধাক্কা লগিলে ঈসা (আ) বলিলেন, খালাত ভাই! তুমি আজ এমন একটি অন্যায় করিয়াছ যে, আমার ধারণায় কখনও উহার ক্ষমা হইবে না। ইয়াহ্ইয়া (আ) বলিলেন, খালাত ভাই! ব্যাপারটি কি? ঈসা (আ) বলিলেন, তুমি এক নারীকে ধাক্কা দিয়াছ? ইয়াহইয়া (আ) বলিলেন, আল্লাহর কসম! আমি তো বলিতেই পারি না। ঈসা (আ) বলিলেন, সুবহানাল্লাহ! তোমার দেহ তো আমার সংগে রহিয়াছে, তোমার আত্মা কোথায় অবস্থান করিতেছে? ইয়াহ্ইয়া (আ) বলিলেন, 'আরশের সহিত ঝুলন্ত রহিয়াছে। ইবন কাছীর বর্ণনাটিকে 'বিরল' ও ইসরাঈলী বর্ণনা হওয়ার মন্তব্য করিয়াছেন (আল-বিদায়া, ২খ, ৫১)। আহমাদ তাঁহার আয-যুহৃদ কিতাবে এবং অন্যরা কাতাদা সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন, হাসান (র) বলেন, একবার ইয়াহইয়া (আ) ও 'ঈসা (আ) একত্র হইলে ঈসা (আ) ইয়াহ্ইয়া (আ) কে বলিলেন, আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন, কেননা আপনি আমার চাইতে শ্রেষ্ঠ। ইয়াহইয়া (আ) বলিলেন, আপনি আমার চাইতে শ্রেষ্ঠ। তখন 'ঈসা (আ) বলিলেন, আপনিই আমার চাইতে শ্রেষ্ঠ। কেননা, আমি নিজে নিজের জন্য সালাম ও নিরাপত্তা ঘোষণা করিয়াছি (وَالسَّلَامُ عَلَى يَوْمَ وُلِدْتُ وَيَوْمَ أَمُوتُ وَيَوْمَ أَبْعَثُ حَيًّا ) (১৯: ৩৩) এবং আপনাকে আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং সালাম ও নিরাপত্তা প্রদান করিয়াছেন: (وَسَلَامُ عَلَيْهِ يَوْمَ وُلِدَ وَيَوْمَ يَمَوْتُ وَيَوْمَ يُبْعَثُ حَيًا) ১৯:১৫; বর্ণনাকারী বলেন, ইহাতে উভয়ের শ্রেষ্ঠত্বই প্রতিভাত হইল (মুখতাসার ইবন কাছীর, ২খ, ৪৪৫; বিদায়া, ২খ, ৫০; কুরতুবী, ৬/১খ, ৮৯; রূহুল মা'আনী, ৮/২খ, ৭৪)। ইবন কাছীর খায়ছামা হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, ঈসা (আ) 'সূফ' (ভেড়ার পশম বস্ত্র) পরিধান করিতেন এবং ইয়াহইয়া (আ) 'ওয়াবর' (উট-গরুর পশম বস্ত্র) পরিধান করিতেন। তাঁহাদের কাহারও কোন ধন-সম্পদ ছিল না, কোন দাস-দাসী ছিল না এবং বসবাসের জন্য কোন আশ্রয়স্থল (ঘর) ছিল না। যেখানেই রাত্রির আগমন ঘটিত সেখানেই তাঁহারা রাত্রি যাপন করিতেন। বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময় ইয়াহইয়া (আ) ঈসা (আ)-কে বলিলেন, আমাকে উপদেশ দিন। 'ঈসা (আ) বলিলেন, 'রাগ করিবে না।' ইয়াহইয়া (আ) বলিলেন, আমি রাগ না করিয়া থাকিতে পারিব না।' 'ঈসা (আ) বলিলেন, 'সম্পদ সঞ্চয় করিবে না'। জবাবে ইয়াহইয়া (আ) বলিলেন, 'হাঁ, আশা করি, তাহা সঞ্চয় করিব না' (বিদায়া, ২খ., ৫১-৫২)।
প্রচলিত বাইবেলের বিভিন্ন পুস্তকেও হযরত ইয়াহইয়া (আ) ও হযরত ঈসা (আ)-এর পরস্পরিক স্বীকৃতি প্রদান এবং ইয়াহইয়া (আ) কর্তৃক 'ঈসা (আ)-এর অনুসরণের মোটামুটি বিশদ বর্ণনা পাওয়া যায়। তবে বাইবেলের বর্ণনায় অন্যান্য সাধারণ মানুষের সহিত ইয়াহইয়া (আ)-এর নিকট হইতে তাঁহার প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও ঈসা (আ)-এর বাপ্তিস্ম গ্রহণ ও পরক্ষণে 'মাসীহ'রূপে আত্মপ্রকাশের বিবরণ পাওয়া যায়। এই প্রসংগে যোহন পুস্তকের বর্ণনা নিম্নরূপ: একজন মনুষ্য উপস্থিত হইলেন, তিনি হইতে প্রেরিত হইয়াছিলেন, তাহার নাম যোহন। তিনি সাক্ষ্যের জন্য আসয়াছিলেন, যেন সেই জ্যোতির বিষয়ে সাক্ষ্য দেন, যেন সকলে তাঁহার দ্বারা বিশ্বাস করে।....... যোহন তাঁহার (যীশুর) বিষয়ে সাক্ষ্য দিলেন, আর উচ্চৈস্বরে বলিলেন, ইনি সেই ব্যক্তি, যাঁহার বিষয়ে আমি বলিয়াছি, যিনি আমার পশ্চাতে আসিতেছেন, তিনি আমার অগ্রগণ্য হইলেন। কেননা, তিনি আমার পূর্বে ছিলেন।........ আর যোহনের সাক্ষ্য এই, যখন যিহুদীগণ কয়েজন যাজক ও লেবীয়কে দিয়া যেরুশালেম হইতে তাহার কাছে এই কথা জিজ্ঞাসা করিয়া পাঠাইল, 'আপনি কে? তখন তিনি স্বীকার করিলেন যে, আমি সেই খৃস্ট নই তাহারা তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিল, তবে কি? আপনি কি এলিয়? তিনি বলিলেন, আমি নই। আপনি কি সেই ভাববাদী? তিনি উত্তর করিলেন, না। তখন তাহার তাঁহাকে কহিল, আপনি কে? যাঁহারা আমাদিগকে পাঠাইয়াছেন, তাহাদিগকে যেন উত্তর দিতে পারি। আপনার বিষয়ে আপনি কি বলেন? তিনি বলিলেন, আমি প্রান্তরে একজনের রব, যে ঘোষণা করিতেছে, তোমার প্রভুর পথ সরল কর, যেমন যিশাইয় ভাববাদী বলিয়াছিলেন। তাহারা ফরীশীগণের নিকট হইতে প্রেরিত হইয়াছিল। আর তাহারা তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিল, আপনি যদি সেই খৃষ্ট নহেন, এলিয়ও নহেন, সেই ভাববাদীও নহেন, তবে বাপ্তাইজ করিতেছেন কেন? যোহন উত্তর করিয়া তাহাদিগকে কহিলেন, আমি জলে বাপ্তাইজ করিতেছি; তোমাদের মধ্যে এমনজন দাঁড়াইয়া আছেন যাঁহাকে তোমরা জান না। যিনি আমার পশ্চাতে আসিতেছেন, আমি তাঁহার পাদুকার বন্ধন খুলিবারও যোগ্য নহি। যৰ্দ্দনের পরপারে, বৈথনিয়াতে, যেখানে যোহন বাপ্তাইজ করিতেছিলেন, সেইখানে এই সকল ঘটিল (যোহন, ১৪ ৬-৭, ১৫, ১৯-২৮; কাসাসুল কুরআন, ২খ, ২৭৬; আম্বিয়ায়ে কুরআন, ৩খ, ২৮৮)। মথি পুস্তকে আছে (ইয়াহইয়া এর উক্তি), "আমি তোমাদিগকে মন পরিবর্তনের নিমিত্ত জলে বাপ্তাইজ করিতেছি বটে, কিন্তু আমার পশ্চাতে যিনি আসিতেছেন, তিনি আমা অপেক্ষা শক্তিমান; আমি তাঁহার পাদুকা বহিবারও যোগ্য নহি (মথি, ৩৪ ১২)। "পরে যোহন কারাগারে থাকিয়া খৃষ্টের কর্মের বিষয়ে শুনিয়া আপনার শিষ্যদের দ্বারা তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিয়া পাঠাইলেন, যাঁহার আগমন হইবে, সেই ব্যক্তি কি আপনি না আমরা অন্যের অপেক্ষায় থাকিব? যীশু উত্তর করিয়া তাহাদিগকে কহিলেন, তোমরা যাও, যাহা যাহা শুনিতেছ ও দেখিতেছ, তাহার সংবাদ যোহনকে দেও” (মথিঃ ১১:২-৪)।
শেষাংশের বর্ণনা লুক পুস্তকে একটু বিশদরূপে রহিয়াছে, "আর লোকেরা যখন অপেক্ষায় ছিল এবং যোহনের বিষয়ে সকলে মনে মনে এই তর্ক-বিতর্ক করিতেছিল, কি জানি, ইনিই বা সেই খৃষ্ট, তখন যোহন উত্তর করিয়া সকলকে কহিলেন, আমি তোমাদিগকে জলে বাপ্তাইজ করিতেছি বটে, কিন্তু এমন একজন আসিতেছেন, যিনি আমা অপেক্ষা শক্তিমান, যাঁহার পাদুকার ফিতা খুলিবার যোগ্য আমি নই; তিনি তোমাদিগকে পবিত্র আত্মা ও অগ্নিতে বাপ্তাইজ করিবেন" (লুক, ৩: ১৫-১৭; আরও দ্র. ৩:৪-৮; মথি, ৩:১২; মার্ক, ১:১-৪,৭-৮; লুক ৭:১৮-২২)।
বাইবেলের বর্ণনামতে ঈসা (আ) মিসরে ও গালীলের নাশারত নগরে শৈশব ও বাল্যকাল অতিবাহিত করেন (দ্র. মথি, ২ঃ ১-২৬)। ইয়াহইয়া (আ) দীন প্রচারের কাজ আরম্ভ করিলে ঈসা (আ) ইয়াহইয়া (আ)-এর সহিত সাক্ষাত করিবার উদ্দেশ্যে গালীলের নাশারত (নাসিরা) নগর হইতে জর্দান নদের তীরবর্তী অঞ্চলে আগমন করিলেন এবং ইয়াহইয়া (আ)-এর নিকট হইতে বাপ্তিস্ম গ্রহণ করিতে চাহিলেন (বাইবেল, মথি, ৩: ১৩-১৭; মার্ক, ১: ৯-১১; লুক, ৩: ২১ ও যোহন ১: ২৯-৪২)।
ইয়াহ্ইয়া (আ) সম্পর্কে ঈসা (আ)-এর সাক্ষ্য বিষয়ে বাইবেলের বিভিন্ন পুস্তকে বর্ণিত হইয়াছে, “যোহনের দূতেরা প্রস্থান করিলে পর তিনি লোকদিগকে যোহনের বিষয়ে বলিতে লাগিলেন, তোমরা প্রান্তরে কি দেখিতে গিয়াছিলে? কি বায়ু কম্পিত নল? তবে কি দেখিতে গিয়াছিলে? কি কোমল বস্ত্র পরিহিত কোন ব্যক্তিকে? দেখ, যাহারা জাঁকাল পোশাক পরে এবং ভোগে-সুখে কাল যাপন করে, তাহারা রাজবাটিতে থাকে। তবে কি দেখিতে গিয়াছিলে? কি একজন ভাববাদীকে? হ্যাঁ, আমি তোমাদিগকে বলিতেছি, ভাববাদী হইতেও শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিকে। ইনি সেই ব্যক্তি, যাঁহার বিষয়ে লেখা আছে, 'দেখ, আমি আপন দূতকে তোমার অগ্রে প্রেরণ করি, সে তোমার অগ্রে তোমার পথ প্রস্তুত করিবে।" আমি তোমাদিগকে বলিতেছি, স্ত্রীলোকের গর্ভজাত সকলের মধ্যে যোহন হইতে মহান কেহই নাই; তথাপি সদাপ্রভুর রাজ্যে অতি ক্ষুদ্র যে ব্যক্তি সে তাঁহা হইতেও মহান"...... (লুক, ৭:২৪-২৮; মথি, ১১:৭-১১)।
📄 ইয়াহইয়া (আ)-এর কারাবরণ ও শাহাদাত লাভ
বনী ইসরাঈল তথা ইয়াহুদী সম্প্রদায় তাহাদের বিবিধ কুকর্মের জন্য ইতিহাসে কুখ্যাতি লাভ করিয়াছে। তাহাদের অপকর্মের তালিকায় জঘন্যতম বিষয়রূপে রহিয়াছে তাহাদের কুকর্মে বাধা প্রদানকারী পূণ্যবানদিগকে, এমনকি নবীগণকেও হত্যা করা (দ্র. ৩: ২১; ৪:১৫৫ ও অন্যান্য)। ইতিহাস ও তাফসীরের বর্ণনামতে ইয়াহূদী অথবা তাহাদের অন্যতম সামন্ত রাজা হযরত ইয়াহ্ইয়া (আ)-কে হত্যা করিয়াছিল। হত্যার সূত্র ও ঘটনা সম্পর্কে ঐতিহাসিক ও মুফাসসিরগণের মধ্যে মতবিরোধ থাকিলেও তাঁহার শাহাদাত বরণের বিষয়টি প্রায় সর্বসম্মত। তবে বাইবেলের বর্ণনামতে প্রথমে তাঁহাকে কারারুদ্ধ করা হয় এবং পরে জেলখানায়ই তাঁহাকে হত্যা করা হয়। বাইবেল মথি পুস্তকের বর্ণনা নিম্নরূপ, “সেই সময় হেরোদ রাজা যীশুর বার্তা শুনিতে পাইলেন, আর আপনার দাসগণকে কহিলেন, ইনি সেই যোহন বাপ্তাইজক, তিনি মৃতদের মধ্য হইতে উঠিয়াছেন, আর সেই জন্য পরাক্রম সকল তাঁহার কার্য সাধন করিতেছে। কারণ হেরোদ আপন ভ্রাতা ফিলিপের স্ত্রী হেরোদিয়ার জন্য যোহনকে ধরিয়া বাঁধিয়া কারাগারে রাখিয়াছিলেন। কেননা যোহন তাঁহাকে বলিয়াছিলেন, উহাকে রাখা আপনার বিধেয় নয়। আর তিনি তাঁহাকে বধ করিতে ইচ্ছা করিলেও লোকসমূহকে ভয় করিতেন; কেননা লোকে তাঁহাকে ভাববাদী বলিয়া মানিত" (মথি, ১৪: ১-৫)।
মার্ক পুস্তকেও প্রায় অনুরূপ রহিয়াছে: "কারাগারে বদ্ধ করিয়াছিলেন, কেননা তিনি (রাজা হেরোদ) তাহাকে বিবাহ করিয়াছিলেন।...... আর হেরোদিয়া তাঁহার প্রতি কূপিত হইয়া তাহাকে বধ করিতে চাহিয়াছিল, কিন্তু পারিয়া উঠে নাই। কারণ হেরোদ যোহনকে ধার্মিক ও পবিত্র লোক জানিয়া ভয় করিতেন ও তাঁহাকে রক্ষা করিতেন। আর তাঁহার কথা শুনিয়া তিনি অতিশয় উদ্বিগ্ন হইতেন এবং তাঁহার কথা শুনিতে ভালবাসিতেন" (মার্ক, ৬: ১৭-২০)। লুক পুস্তকে আছে, "কিন্তু হেরোদ রাজা আপন ভ্রাতার স্ত্রী হেরোদিয়ার বিষয়ে এবং আপনার সমস্ত দুষ্কর্মের বিষয়ে তাঁহা কর্তৃক দোষীকৃত হইলে, নিজ দুষ্কার্যসকলের উপরে এইটাও যোগ করিলেন, যোহনকে কারাগারে বদ্ধ করিলেন" (লুক, ৩: ১৯২০; আরও দ্র. মথি, ১১: ২-৬)।
প্রসংগত উল্লেখ্য যে, সমসাময়িক কালে ইয়াহুদীদের পূর্ণাংগ স্বাধীন রাজ্য ছিল না। তখন ফিলিস্তীন ও সিরিয়া (শাম) রোম সম্রাটের শাসনাধীন ছিল এবং ইয়াহুদীদের বসতি এলাকা চারটি প্রাদেশিক অঞ্চলে বিভক্ত ছিল এবং উহাতে শাসন পরিচালনার জন্য রোম সম্রাট কর্তৃক চারজন শাসনকর্তা (সামন্ত রাজা) নিয়োজিত ছিল। হেরোদ ও তাহার ভাই ফিলিপ ছিল সেই চার প্রদেশের মধ্যে যথাক্রমে গালীল ও যিতুরিয়া ও ত্রাযোনীতিয়া (IKERAEA, TRACHONITIS)-এর রাজা। ইহা ছিল রোম সম্রাট তিবরীয়-এর রাজত্বকাল এবং এই সম্রাটের রাজত্বকালের পঞ্চদশ বর্ষে ইয়াহ্ইয়া (আ) নবুওয়াত লাভ করিয়াছিলেন (দ্র. লুক, ৩ঃ ১-৩)। ফিলিপের স্ত্রী হেরোদিয়া ছিল অত্যন্ত সুন্দরী, কিন্তু দুশ্চরিত্রা। হেরোদের সহিত তাহার ভ্রাতৃ-বধুর অবৈধ প্রণয় ছিল এবং হেরোদ তাহাকে স্ত্রীরূপে গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়াছিল। ইয়াহইয়া (আ) ইহাকে হারাম ঘোষণা করিলেন। তিনি রাজার কোপানলে পড়িলেন এবং বিশেষত দুশ্চরিত্রা হেরোদিয়ার প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের পাত্রে পরিণত হইলেন। রাজা হোরোদ ভ্রাতৃ-বধুকে রিবাহ করিবার অপকর্মসহ অন্যান্য অপকর্মের জন্য ইয়াহ্ইয়া (আ) কর্তৃক প্রকাশ্যে তিরস্কৃত ও বাধাপ্রাপ্ত হইলেও তাহার অন্তরে ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর নবুওয়াতে বিশ্বাস ও তাঁহার প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা থাকিবার কারণে তাঁহার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে ভীত-শংকিত ছিল, কিন্তু হেরোদিয়ার উস্কানী ও চক্রান্তের কারণে অবশেষে তাঁহাকে কারারুদ্ধ করিতে বাধ্য হইয়াছিল (আম্বিয়ায়ে কুরআন, ৩খ, ২৯০ ২৯১)।
মূল বিষয়ের অভিন্নতাসহ এই প্রসংগে একটি ভিন্ন বর্ণনা নিম্নরূপ: ইয়াহ্ইয়া (আ) যখন আল্লাহ্ দীনের দাওয়াত প্রচার করিতে আরম্ভ করিলেন এবং তাঁহার পরে একজন মহান পয়গাম্বরের আগমন সংবাদ ঘোষণা করিতে লাগিলেন তখন ইয়াহুদীরা তাঁহার প্রতি শত্রুতা পোষণ করিতে লাগিল এবং তাঁহার জনপ্রিয়তা ও তাঁহার প্রতি সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা, ভক্তি ও তাঁহার আগাম ঘোষণা স্বার্থান্ধ ইয়াহুদীদের অস্থির করিয়া ফেলিল। তাহারা তাঁহার নিকট সমবেত হইয়া প্রশ্ন করিল, তুমি কি মাসীহ? তিনি বলিলেন, না। তাহারা বলিল, তবে কি তুমি সেই (বিশ্ব) নবী? তিনি বলিলেন, না। তাহারা বলিল, তবে কি তুমি ঈলিয়া (এলিয়া) নবী? তিনি বলিলেন, না। তখন তাহারা বলিল, তবে তুমি কে, যে এইরূপ ঘোষণা করিতেছ ও দীনের দাওয়াত দিতেছ? তখন ইয়াহইয়া (আ) বলিলেন, আমি প্রান্তরে আহ্বানকারীর একটি ধ্বনি যাহা সত্য-ন্যায়ের জন্য উচ্চকিত করা হইয়াছে (দ্র. যোহন, ১৪ ১৯-৮)। তাঁহার এই বক্তব্য শুনিয়া ইয়াহুদীরা উত্তোজিত হইয়া উঠিল এবং অবশেষে তাঁহাকে শহীদ করিয়া ফেলিল (কাসাসুল কুরআন, ২খ, ২৭০)।
📄 ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর হত্যার ঘটনা
বাগাবী ইব্ন ইসহাকের বরাতে, ইব্ন হাজার হাকেমের বরাতে এবং ইব্ন কাছীর ইন আসাকির-এর আল-মুসতাকসা ফি ফাদাইলিল আকসা গ্রন্থের বরাতে মু'আবিয়া (রা)-এর মাওলা (আযাদকৃত দাস) কাসিমের বর্ণিত রিওয়ায়তে এবং ইবন জারীর তাবারী ও ইবনুল আছীর আল-জাযারী সুদ্দী হইতে, তাবারী ইবন আব্বাস (রা) হইতে এবং আল-জাযযার তাঁহার কাসাসুল আম্বিয়ায় এ প্রসংগে যে বিবরণ পেশ করিয়াছেন উহার সারমর্ম এই যে, সেই সময় অন্যতম রাজা বর্ণনান্তরে দামেশকের রাজা হাদ্দাদ ইব্ন হাদ্দাদ (অথবা) হাদ্দাদ ইব্ন হুদার কাসাসুল কুরআন) তাহার জন্য শরী'আতী বিধানে নিষিদ্ধ ('মাহরাম') কোন নারীকে বিবাহ করিতে চাহিতেছিল। কোন কোন বর্ণনায় এই নিষিদ্ধ বা মাহরাম নারী তাহার ভ্রাতুষ্পুত্রী ছিল। অপর বর্ণনামতে ভ্রাতৃবধু ছিল (যাহার সহিত ভাইয়ের বিবাহ বিচ্ছেদ হয় নাই), অপর বর্ণনামতে রাজার নিজেরই তিন তালাক প্রদত্তা স্ত্রীকে 'হালাল' করা ব্যতীত পুনঃ বিবাহ করিতে চাহিতেছিল। অন্য একটি বর্ণনায়, রাজা তাহার স্ত্রীর পূর্ব সংসারের কন্যাকে বিবাহ করিতে চাহিতেছিল (বিদায়া, টীকা ৩)। মোটকথা, রাজা শরীআতের নিষেধাজ্ঞা লংঘন করিয়া বিবাহ করিতে চাহিতেছিল এবং ইয়াহ্ইয়া (আ) উহার নিষিদ্ধতা ঘোষণা করিয়া ইহাতে বাধা প্রদান করিতেছিলেন। তাবারীর বর্ণনায় আছে, 'ঈসা (আ) তাঁহার বিশিষ্ট দ্বাদশ শিষ্য হাওয়ারীকে দীন প্রচারের জন্য বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠাইলেন, ইহাদের অন্যতম ছিলেন ইয়াহইয়া ইব্ন যাকারিয়া (আ)। তাঁহাদের প্রচারিতব্য বিষয়াবলীর অন্যতম ছিল ভ্রাতুষ্পুত্রীর বিবাহ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা (যাহা ইতোপূর্বে বৈধ ছিল; বিদায়া, টীকা ১)। পরবর্তী বর্ণনামতে রাণী ইয়াহইয়া (আ)-এর প্রতি ক্ষিপ্ত হইয়া প্রতিশোধপরায়ণা হইয়া উঠিল এবং যে কোন উপায়ে তাঁহাকে হত্যা করিবার চক্রান্ত করিতে লাগিল এবং এক সময় রাজাকে বাধ্য করিয়া তাহার নিকট হইতে হত্যার অনুমোদন হাসিল করিল। ইয়াহইয়া (আ) হেবরোনের মসজিদে সালাতে নিমগ্ন অবস্থায় রাণীর হুকুমে তাঁহাকে হত্যা করা হইল এবং তশতরীতে করিয়া তাঁহার মস্তক রাণীর নিকট উপস্থিত করা হইল। কিন্তু কর্তিত মস্তক তখনও বলিতেছিল, "হালাল নয়, হালাল নয়, যতক্ষণ না অন্যের সহিত বিবাহ হইবে"। এই সময় আযাব আসিয়া রাণীকে মাটিতে ধ্বসাইয়া দিল।
ভ্রাতুষ্পুত্রীকে বিবাহ করিবার বর্ণনায় আছে, রাজা কন্যাটিকে ভালবাসিত এবং কন্যা ও তাহার মাতাও এই বিবাহ ঘটাইতে চাহিতেছিল এবং ইয়াহইয়া (আ)-এর প্রতি প্রতিশোধ গ্রহণের প্রতীক্ষায় অস্থির জীবন যাপন করিতেছিল। রাজার অভিষেক অনুষ্ঠান বার্ষিকীর দিনে মাতা তাহার কন্যাকে সাজগোজ করাইয়া নাচের আসরে পাঠাইয়া দিল। রাজা তাহার নৃত্যে অভিভূত হইয়া তাহাকে বলিল, "বল কী চাই, যাহা চাহিবে তাহাই পাইবে"। এই সবের পিছনে নারী চক্রান্ত ক্রিয়াশীল ছিল। কন্যার মাতা এইরূপ পরিস্থিতির বিষয়ে পূর্বে আঁচ করিতে পারিয়াছিল। সুতরাং সে তাহার কন্যাকে দৃঢ়ভাবে শিখাইয়া দিয়াছিল যে, রাজা তাহাকে বাসনার কথা জিজ্ঞাসা করিলে সে বলিবে, 'ইয়াহইয়ার মস্তক চাই'। কন্যা মাতার শিখানোমতে ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর মস্তক প্রার্থনা করিল। রাজা ইহাতে হতভম্ব হইয়া বলিল, অন্য কিছু চাও। কন্যাটি তাহার দাবিতে অনড় রহিল। রাজা অতিথি-অভ্যাগতদের সম্মুখে কথা দিয়াছিল এবং প্রচলিত রীতি অনুসারে তাহার ফিরিবার পথ ছিল না। সুতরাং সে বাধ্য হইয়া সৈনিকদের কারাগারে পাঠাইয়া ইয়াহইয়া (আ)-কে হত্যা করাইল এবং তাঁহার মাথা আনাইয়া তশতরীতে করিয়া দুর্ভাগা কন্যার হাতে তুলিয়া দিল। কন্যা তশতরী নিয়া তাহার মাতার নিকট গেল। মস্তক তখনও বলিতেছিল 'হালাল নয়'। কন্যা মাতার সম্মুখে দণ্ডায়মান হওয়ামাত্র মাটিতে দাবিয়া যাইতে লাগিল। কাঁধ পর্যন্ত দাবিয়া গেলে মাতা জল্লাদদের তাহার গর্দান কাটিতে বলিল। অন্য বর্ণনামতে মাতা প্রাসাদের ছাদে উঠিলে কন্যা সেখান হইতে নিচে পড়িয়া গেল এবং হিংস্র কুকুরেরা তাহাকে টুকরা টুকরা করিয়া খাইয়া ফেলিল। এই বর্ণনার শেষাংশে রহিয়াছে যে, ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর মস্তক যেখানে বায়তুল মুকাদ্দাসে দাফন করা হইয়াছিল সেখানে সর্বদা রক্ত টগবগ করিত।
বুস্ত নাস্সার (নেবুকাদ নেজার) যখন ফিলিস্তীন আক্রমণ করিয়াছিল তখন বিজয় বিলম্বিত হইলে সে অবরোধ তুলিয়া নিয়া ফিরিয়া যাওয়ার ইচ্ছা করিতেছিল। তখন এক ইসরাঈলী নারী নিজের নিরাপত্তা ও ইয়াহইয়া (আ)-এর খুনের প্রতিশোধ গ্রহণে গণহত্যার শর্তে বুস্তকে পরামর্শ ও সাহায্য প্রদানে উদ্যত হইল। সে আক্রমণকারী বাহিনীকে চার ভাগে বিভক্ত করিয়া অতি প্রত্যূষে হাত তুলিয়া "ইয়া আল্লাহ! আমরা ইয়াহইয়া ইব্ন যাকারিয়্যা (আ)-এর খুনের দোহাই দিয়া আপনার সকাশে বিজয় প্রার্থনা করিতেছি" বলিয়া দু'আ করিতে ও আক্রমণ করিতে পরামর্শ দিল। এইরূপ করিলে পরদিন শহর বুস্তের পদানত হইল। খুনের ফোয়ারা দেখিয়া বুস্ত উহার কারণ জানিতে চাহিলে উপস্থিত ইয়াহুদীরা ইয়াহ্ইয়া (আ)-কে খুন করিবার কথা স্বীকার করিল। বুস্ত সত্তর হাজার ইয়াহুদীকে হত্যা করিল এবং অবশেষে হযরত ইরমিয় (আ) রক্তকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, 'হে খুন! এখনও তুমি শান্ত হইবে না? কত শত সহস্র প্রাণ তুমি বধ করিলে, এখন একটু শান্ত হও'। তখন খুনের ফেয়ারা স্থির হইল। মোটকথা, এইভাবে ইয়াহইয়া (আ)-এর হত্যায় অংশগ্রহণকারী ও উহাতে সম্মত ইয়াহুদীদের শাস্তি বিধানের ব্যবস্থা করা হইল।
তাবারী ও জাযারী প্রমুখ এই ঘটনা উদ্ধৃত করিয়া ইহার বাস্তবতা প্রত্যাখ্যান করিয়াছেন। তাঁহাদের মতে, বিগত যুগের ঘটনাবলীর বিশেষজ্ঞ ও ঐতিহাসিকদের সর্বসম্মত মতে এই কাহিনী অসত্য ও বানোয়াট। কেননা ঐতিহাসিকদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত এই যে, বুখত নাস্সারের যুগ ছিল 'ঈসা (আ)-এর কয়েক শতক পূর্বে। সুতরাং তাহার আক্রমণের সহিত ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর শাহাদতের ঘটনা জড়াইয়া দেওয়া কিরূপে যথার্থ হইতে পারে? কিন্তু অত্যধিক বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, হাফিজ ইবন আসাকির ও হাফিজ ইব্ন কাছীরের ন্যায় স্বনামধন্য গবেষক ও ইতিহাসবিদ ঐতিহাসিক বর্ণনাসমূহের পর্যালোচনা বিশারদ হওয়া সত্ত্বেও মন্তব্যবিহীন এই ধরনের বিস্ময়কর ও বিরল বিষয় বর্ণনা করিয়াছেন।
অথচ প্রামাণ্য ও প্রত্যক্ষ সনদযুক্ত বিবরণ ব্যতীত এই ধরনের বর্ণনা গ্রহণযোগ্য হইতে পারে না (সমগ্র আলোচনার জন্য দ্র. আল-বিদায়া, কাসাসুল আম্বিয়া, আল-কামিল, মা'আরিফ, তাবারী, বিদায়া, কাসাসুল কুরআন, মাজহারী)। কাযী ছানাউল্লাহ তাফসীরে মাজহারীতে ইবন ইসহাকের বর্ণনাকে সঠিক বলিয়াছেন (মাজহারী)।
অন্য একটি বর্ণনায় আছে, বনী ইসরাঈলের পবিত্র কুরআনে বিঘোষিত দুইবারের ভয়ংকর ধ্বংসলীলার (১৭:৪-৭) প্রথমটি সংঘটিত হইয়াছিল বুখত নাসসারের মাধ্যমে। আর দ্বিতীয়টির বিবরণ এই যে, ইয়াহুদীরা যখন ইয়াহইয়া (আ)-কে হত্যা করিল এবং আল্লাহ তা'আলা 'ঈসা (আ)-কে ঊর্ধ্বাকাশে তুলিয়া লইলেন, ইহার পরে বাবিল সম্রাট খিরদাওস অথবা জুদরীস ইয়াহুদীদের আক্রমণ করিল এবং বিজয় লাভের পর তাহার হস্তীবাহিনীর সেনাপতি য়াবুর যাযান অথবা নাবুযাযান-কে ডাকিয়া পাঠাইয়া বলিল, 'আমি পণ করিয়াছিলাম যে, বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করিতে পারিলে ইয়াহূদীদের এমনভাবে হত্যা করিব যে, আমার সেনা ছাউনীতে রক্ত প্রবাহিত হইবে। এই কথা বলিয়া সম্রাট সেনাপতিকে ইহার ব্যবস্থা গ্রহণে আদেশ প্রদান করিল। সেনাপতি বায়তুল মুকাদ্দাসের কুরবানী করিবার স্থানে পৌঁছিয়া সেখানে রক্তের উচ্ছল ফোয়ারা দেখিয়া সে বিষয়ে ইয়াহুদীদিগকে জিজ্ঞাসা করিল। তাহারা বলিল, ইহা আমাদের একটি কুরবানী যাহা কবুল না হওয়ার কারণে এই অবস্থা হইয়াছে। সেনাপতি তাহাদিগকে অবিশ্বাস করিয়া তাহাদের সাত শত সত্তরজন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি, সাত শতজন বিদ্বান ও সাত শত কিশোরকে সেই রক্তের নিকট খুন করিল। ইহাতেও রক্তের ফোয়ারা শান্ত না হওয়ায় সেনাপতি ইয়াহূদীদিগকে ডাকিয়া বলিল, "তোমরা দীর্ঘকাল ধরিয়া অপকর্ম ও যথেচ্ছাচার করিয়া আসিতেছ। এখন তোমরা সত্য কথা না বলিলে আমি তোমাদের একটি প্রাণীকেও রেহাই দিব না"। তখন তাহারা নিরুপায় হইয়া একজন নবীকে হত্যা করিবার কথা স্বীকার করিল, যিনি তাহাদিগকে আল্লাহ্ অসন্তুষ্টির কার্য হইতে বিরত থাকিতে উপদেশ দিতেন এবং বর্তমানে আগত শত্রুদের সর্বনাশা ধ্বংসযজ্ঞের ব্যাপারেও তাহাদিগকে সতর্ক করিতেন।
সেনাপতির জিজ্ঞাসার জবাবে তাহার সেই নবীর নাম 'ইয়াহ্ইয়া' বলিলে সেনাপতি বলিলেন, এইবার তোমরা সত্য বলিয়াছ। তখন সেনাপতি তাহার বাহিনীকে বাহিরে যাওয়ার আদেশ প্রদান করিল এবং সিজদায় পতিত হইয়া আল্লাহর হুকুমে ইয়াহইয়া (আ)-এর রক্তকে শান্ত হওয়ার নিবেদন করিলে উহা শান্ত হইয়া গেল। অতঃপর সেনাপতি বনী ইসরাঈলের 'রবের' প্রতি ঈমান আনিয়া উপস্থিত ইয়াহুদীদিগকে সম্রাটের আদেশের বিষয় অবহিত করিল এবং সকল পশু আনিয়া সেইগুলি জবাই করিয়া মৃতদেহগুলি স্তূপীকৃত করিল এবং উহার উপরে ইতোপূর্বে নিহতদের লাশগুলি রাখিয়া দিল। ওদিকে রক্ত প্রবাহিত হইয়া সেনা ছাউনী পর্যন্ত পৌছিলে সম্রাট উহাকে বনী ইসরাঈলের রক্ত মনে করিয়া সেনাপতির নিকট হত্যা বন্ধ করিবার আদেশ পাঠাইল। ইহাই ছিল বনী ইসরাঈলের দ্বিতীয় ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা এবং এইটি ধ্বংসযজ্ঞদ্বয়ের মধ্যে বৃহত্তর। মোটকথা ইয়াহুদীরা অথবা তাহাদের রাজা তাহার স্ত্রীর প্ররোচনায় ইয়াহ্ইয়া (আ)-কে হত্যা করিয়াছিল।
📄 ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর শাহাদাতের স্থান
হযরত ইয়াহ্ইয়া (আ)-কে কোথায় শহীদ করা হইয়াছিল এই ব্যাপারে সীরাত ও ইতিহাসবিদগণের দুইটি মত রহিয়াছে। শাম্মার ইবন 'আতিয়্যা হইতে সুফিয়ান ছাওরী (র)-এর বর্ণনা অনুসারে বায়তুল মুকাদ্দাসের 'হায়কাল' ও কুরবানীর স্থানের মধ্যবর্তী সত্তরজন নবীকে শহীদ করা হইয়াছিল এবং ইয়াহইয়া ইন্ন যাকারিয়্যা (আ) ছিলেন তাঁহাদের অন্যতম। অপর দিকে সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব (র) হইতে আবূ উবায়দ কাসিম ইবন সাল্লামের বর্ণনামতে তাঁহাকে দামিশকে শহীদ করা হইয়াছিল এবং বুস্ত নাস্সারের দামিশকে আক্রমণকালে সে ইয়াহইয়া (আ)-এর রক্ত উত্তোলিত হইতে দেখিয়া এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করিয়াছিল এবং ইয়াহুদীরা ইয়াহইয়া (আ)-কে হত্যা করিবার কথা স্বীকার করিলে বুস্ত নাস্সার সত্তর হাজার ইয়াহূদীকে হত্যা করিবার পর ইয়াহইয়া (আ)-এর রক্ত শান্ত হইয়াছিল। ইবন কাছীর এই বর্ণনাকে প্রামাণ্য বলিয়াছেন। তবে সেই সংগে মন্তব্য করিয়াছেন যে, ইহা দ্বারা আতা ও হাসান বসরীর বর্ণনার সমর্থনে বুস্ত নাস্সার-এর দামিশক অভিযান ঈসা (আ)-এর সমসাময়িক হওয়া মানিয়া নিবার প্রয়োজন দেখা দেয় (বিদায়া)। কিন্তু তখন আবার বিষয়টি ইতিহাসের প্রায় সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের সহিত সংঘাতপূর্ণ হইয়া দাঁড়ায় (কাসাসুল কুরআন)। তবে ইয়াহইয়া (আ)-এর শাহাদাতের স্থান দামিশকে হওয়ার বিষয়টি ইবন আসাকিরের একটি বর্ণনা দ্বারা সমর্থিত হয়। ইহা যায়দ ইব্ন ওয়াকিদ (র) হইতে ওয়ালীদ ইন্ন মুসলিমের সূত্রে বর্ণিত হইয়াছে। ওয়াকিদ বলেন, দামিশকের (উমৃদুস সাকাসিকা নামে পরিচিত স্থানের) একটি মসজিদ নির্মাণের জন্য খননকালে মসজিদের মিহরাবের নিকটবর্তী পূর্ব পার্শ্ব হইতে ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর মাথা বাহির হইয়াছিল এবং মুখমণ্ডল, এমনকি চুল পর্যন্ত সম্পূর্ণ অক্ষত ও অবিকৃত ছিল। তাহা এমনভাবে রক্তরঞ্জিত দেখাইতেছিল যেন এখনই তাঁহাকে হত্যা করা হইয়াছে। (বিদায়া)। তবে এখানেও প্রাপ্ত মাথাটি যে ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর ছিল উহার নিশ্চয়তার ব্যাপারটি প্রশ্নের সম্মুখীন থাকিয়া যায় (কাসাসুল কুরআন)।
ইন কাছীর (র) ইসহাক ইন্ন বিশরের কিতাব আল-মুরতাদার বরাতে ইয়াহইয়া ও যাকারিয়্যা (আ)-এর শহীদ হওয়া প্রসংগে ইবন 'আব্বাস একটি দীর্ঘ রিওয়ায়াত উপস্থাপন কারিয়াছেন। ইহাতে বলা হইয়াছে যে, মি'রাজের ভ্রমণকালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলায়হি ওয়াসাল্লাম আকাশ জগতে যাকারিয়্যা (আ)-এর সাক্ষাত লাভ করিলে তাঁহাকে সালাম করিয়া বলিলেন, হে ইয়াহ্ইয়ার পিতা! আপনার হত্যার ঘটনা এবং উহার কারণ সম্পর্কে আমাকে অবহিত করুন। তখন তিনি বলিলেন, হে মুহাম্মাদ (স)! আমি আপনাকে অবহিত করিতেছি যে, ইয়াহ্ইয়া ছিল সমকালীন শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি এবং সর্বাধিক সৌন্দর্যের অধিকারী এবং আল্লাহ তা'আলার ঘোষণা অনুসারে সে ছিল 'সায়্যিদ ও হাসূর' (নারীর প্রতি নিরাসক্ত)।
এ বিষয়ে শেষ কথা এই যে, ইয়াহইয়া (আ)-কে হত্যা করিবার কারণ ও সূত্র সম্পর্কে এবং তাঁহার শাহাদতের স্থান সম্পর্কে বর্ণনায় বিরোধ থাকিলেও এই বিষয়টি স্বীকৃত যে, ইয়াহুদীরা তাঁহাকে শহীদ করিয়া ঈসা (আ)-এর নিকট তাঁহার শাহাদতের সংবাদ পৌঁছাইলে তিনি প্রকাশ্যে দীনের দাওয়াতের কাজ আরম্ভ করিয়া দিলেন (কাসাসুল আম্বিয়া, কাসাসুল কুরআন)। হযরত ইয়াহইয়া (আ)-কে হত্যা করিবার পর ইয়াহুদীরা তাঁহার পিতা যাকারিয়্যা (আ)-কে হত্যা করিবার জন্য ছুটিল। পরবর্তী সময়ে তাহারা হযরত ঈসা (আ)-কে হত্যার চক্রান্ত করিলে আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে ঊর্ধ্বাকাশে তুলিয়া নিলেন।