📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর হৃদয়ের কোমলতা ও প্রচণ্ড আল্লাহভীরুতা

📄 ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর হৃদয়ের কোমলতা ও প্রচণ্ড আল্লাহভীরুতা


ইবন 'আসাকির ওয়াহ্ব ইবন মুনাব্বিহ হইতে এবং ইবনুল মুবারক উহায়ব ইবনুল ওয়াবুদ হইতে বর্ণনা কারিয়াছেন, ইয়াহইয়া (আ) অত্যন্ত কোমলপ্রাণ ছিলেন এবং প্রচণ্ড আল্লাহ ভীতির কারণে সর্বদা ক্রন্দন করিতেন। এমন কি কাঁদিতে কাঁদিতে তাঁহার গণ্ডদেশে অশ্রুরেখার দাগ বসিয়া গিয়াছিল এবং তাঁহার মাড়ি উন্মুক্ত হইয়া গিয়াছিল (আল-কামিল, ১খ, ২৩০)।
একবার পিতা যাকারিয়‍্যা (আ) তাঁহাকে খুঁজিবার জন্য প্রান্তরে আসিলেন এবং অনেক খোঁজাখুঁজির পর দেখিলেন যে, তিনি একটি কবর খনন করিয়া উহার মধ্যে বসিয়া কাঁদিতেছেন। পিতা বলিলেন, প্রাণপ্রিয় পুত্র! আমরা তোমার অদর্শনে অস্থির আর তুমি এইভাবে কাঁদিয়া জীবন কাটাইতেছ? ইয়াহ্ইয়া (আ) বলিলেন, আব্বাজান! আপনিই তো আমাকে বলিয়াছেন যে, জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী স্থানে এমন একটি বিশাল মরু প্রান্তর রহিয়াছে যাহা আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দনকারীদের চোখের অশ্রু ব্যতীত অতিক্রম করা যাইবে না এবং জান্নাতে পৌঁছান যাইবে না। যাকারিয়‍্যা (আ) বলিলেন, পুত্র! কাঁদ এবং উভয়ে একসংগে কাঁদিতে লাগিলেন (বিদায়া, ২খ, ৫৩; কাসাসুন নাবিয়‍্যীন, ২খ, ২৬৯, ২৭০; আম্বিয়ায়ে কুরআন, ৩খ, ২৮৪)। আল জাযারীর বর্ণনায় তাঁহার মাতা তাঁহার নিকট আসিলেন এবং যাকারিয়‍্যা (আ) ও বিদ্বানগণ (আহ্বার) তাঁহার খোঁজে বাহির হইলেন..... ইহার পরবর্তী সময়ে যাকারিয়া (আ) পুত্র ইয়াহইয়া (আ)-এর উপস্থিতকালে ওয়াজ করিলে জান্নাত-জাহান্নামের আলোচনা করিতেন না (আল-কামিল, ১খ, ২৩০)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ইয়াহইয়া (আ)-এর নবুওয়াত ও নবুওয়াতী কর্মধারা

📄 ইয়াহইয়া (আ)-এর নবুওয়াত ও নবুওয়াতী কর্মধারা


ইয়াহুদীরা তাহাদের বদ প্রকৃতির ধারায় ইয়াহইয়া (আ)-এর নবুওয়াতের স্বীকৃতি প্রদান করে নাই। খৃস্টানরা যাকারিয়‍্যা (আ)-কে 'যাজক' সাবস্ত করে এবং ইয়াহ্ইয়া (আ)-কে হযরত ঈসা (যীশু) (আ)-এর অগ্রবর্তী ঘোষক সাব্যস্ত করে। পবিত্র কুরআনের একাধিক আয়াতে তাঁহাদের উভয়কে বিশিষ্ট নবীগণের তালিকাভুক্তরূপে উল্লেখ করা হইয়াছে (পূর্ব উদ্ধৃতি দ্র.) এবং বিশেষভাবে সূরা আল ইমরানে (৩: ৩৯) স্পষ্ট ভাষায় ইয়াহ্ইয়া (আ) কে নবী (وَنَبَيًا من الصلحين) বলা হইয়াছে। ইহা ছাড়া সূরা মারয়ামের فَخُذِ الكتاب بقوة “হে ইয়াহ্ইয়া। কিতাব (তাওরাত) শক্ত করিয়া ধারণ কর" (১৯; ১২) দ্বারাও তাঁহার নবী হওয়ার ইংগিত পাওয়া যায়।
উল্লিখিত ১৯:১২ আয়াতের وَآتَيْنُهُ الْحُكْمَ صَبِيًّا “শৈশবেই আমি তাহাকে 'হিকমত' দান করিয়াছি” দ্বারা কোন কোন মুফাসসির ও ঐতিহাসিক শিশু বয়সে (২/৩/৭/৯ বৎসর) তাঁহার নবুওয়াত লাভের অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন (ফাতহুল বারী, ৬খ, ৫৪০; আল-কামিল, ১খ, ২৩০; মাজহারী, ৩খ, ৮৬ ও অন্যান্য)। কিন্তু মুফাসসিরগণ এ আয়াত দ্বারা শৈশবে তাওরাত মুখস্ত করিবার (মাজহারী, ৬খ, ৮৬) মত পোষণ করিয়া প্রাপ্ত বয়সে নবুওয়াত লাভের অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন। তবে নবুওয়াতের সাধারণ বয়সসীমা চল্লিশ বৎসরের পূর্বেই (ত্রিশ বৎসর বয়সে যেহেতু তাঁহার ওফাত (শাহাদাত) হইয়াছিল (পরে দ্র.) সে কারণে মুফসসিরগণ ত্রিশ বৎসর বয়সের পূর্বে তাঁহার নবুওয়াত লাভের কথা বলিয়াছেন (নাজ্জার, কাসাসুল আম্বিয়া, ৩৬৯)
ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর নবুওয়াতী কর্মধারাকে দুইটি মৌলিক পর্যায়ে বিভক্ত করা যায়: (ক) হযরত মূসা (আ)-এর শরী'আতের পুনরুজ্জীবন তথা তাওরাতের শিক্ষা বিস্তার, (খ) হযরত ঈসা (আ)-এর সুসংবাদ প্রদান ও পথ প্রস্তুতকরণ এবং তাঁহার সত্যায়ন ও অনুসরণ।
ইয়া'কূব বংশধর তথা বনী ইস্রাঈলের উত্তরাধিকারী ও তত্ত্বাবধায়ক সন্তানের জন্য যাকারিয়‍্যা (আ)-এর দু'আ এবং আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হইতে তৎক্ষণাৎ মঞ্জুরী দ্বারা বুঝা যায় যে, ইয়াহ্ইয়া (আ) কে মূসা (আ)-এর শরী'আতের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা এবং তাওরাতের শিক্ষা পুনরুজ্জীবিত করিবার জন্যই নবুওয়াতের দায়িত্ব অর্পণ করা হইয়াছিল। ইহা ছাড়া )ইয়াহ্ইয়া! দৃঢ়তার সহিত কিতাব ধারণ কর)-এর ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণ প্রায় সর্বসম্মতরূপে কিতাব দ্বারা তাওরাত বুঝানো হইয়াছে বলিয়া অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন (ইব্‌ন কাছীর, ৩খ, ১১৩)। ইহা দ্বারা তাওরাতের শিক্ষা বিস্তার ও বাস্তবায়ন তাঁহার অন্যতম দায়িত্ব হওয়া বুঝা যায়। ইবন ইসহাক বলেন, যাকারিয়‍্যা (আ) ও তাঁহার পুত্র ইয়াহ্ইয়া (আ) ছিলেন ঈসা (আ)-এর আগমনের পূর্বে বনী ইসরাঈলের জন্য প্রেরিত নবীগণের শেষ পর্যায়ের (ফাতহুল বারী, ৬খ, ৫৪০)।
ইয়াহইয়া (আ)-এর নবুওয়াতী দায়িত্বের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল হযরত ঈসা (আ)-এর সত্যায়ন। পবিত্র কুরআনে তাঁহার পরিচিতির বিবরণ তাঁহার অন্যতম গুণরূপে উল্লিখিত হইয়াছে : হে যাকারিয়‍্যা! আল্লাহ তোমাকে সুসংবাদ দিতেছেন পুত্র ইয়াহ্ইয়ার, যে হইবে 'আল্লাহ্র কলেমার' সত্যায়নকারী। 'আল্লাহ্ কলেমা' অর্থ ইবন 'আব্বাস (রা), মুজাহিদ, কাতাদা এবং অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে ঈসা (আ) (কুরতুবী, ২/২খ, ৭৬; রূহুল মা'আনী, ২/১খ., ১৪৭; আল-কামিল, ১খ., ২২৯ ও অন্যান্য)। কেননা পবিত্র কুরআনের একাধিক আয়াতে ঈসা (আ)-কে আল্লাহর কলেমা অভিধায় অভিহিত করা করা হইয়াছে।
মূলত তাওরাত যুগের শেষ ও ইনজীল যুগের সূচনা সন্ধিক্ষণে আগমনের কারণে ইয়াহইয়া (আ) ছিলেন দুইটি যুগের সমন্বয়কারী এবং সেই কারণে তিনি একাধারে তাওরাত অনুসারী বনী ইসরাঈলের শেষ নবী এবং ইনজীলের বাহক হযরত ঈসা (আ)-কে সত্যায়নকারী, তাঁহার অগ্রবর্তী 'পথ প্রস্তুতকারী' ও তাঁহার বিশিষ্ট দ্বাদশ শিষ্যের (হাওয়ারী) অন্যতম।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর তাবলীগ ও তা'লীম

📄 ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর তাবলীগ ও তা'লীম


নবুওয়াত লাভের পর হইতে হযরত ঈসা (আ)-এর নবীরূপে আবির্ভূত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ইয়াহইয়া (আ) তাওরাতের বিধান ও শিক্ষা প্রচারে নিমগ্ন থাকেন। এই সময় তিনি জর্দান নদীর তীরবর্তী প্রান্তর ও বনাঞ্চলে অবস্থান করিতেন এবং পথহারা বনী ইসরাঈলকে আল্লাহ্ দীন ও বিধান মানিয়া জীবন যাপন করিতে উদ্বুদ্ধ করিতেন। এইভাবে তিনি তাওরাতের পুনরুজ্জীবনের সাথে সাথে পরবর্তী নবী ও রাসূল হযরত ঈসা (আ)-এর জন্য অনুকূল ক্ষেত্র প্রস্তুতির কর্ম সম্পাদন করিতেছিলেন।
প্রচলিত বাইবেল (তাওরাত ও ইনজীল) আল্লাহ্ প্রেরিত আসমানী কিতাবের অবিকৃত আসল রূপে নহে। ইহা হযরত ঈসা (আ)-এর দীর্ঘকাল পর তখনকার বিদ্বান ধার্মিকদের শ্রুতি নির্ভর গ্রন্থ এবং উহা যুগে যুগে বহুবার বিকৃত হইয়াছে। সুতরাং ইয়াহইয়া (আ)-এর তাবলীগ ও ধর্ম প্রচার সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডের প্রামাণ্য ও বিস্তারিত বিবরণ পাওয়ার কোন উপায় নাই। প্রচলিত বাইবেলের বিভিন্ন পুস্তকে তাঁহার তাবলীগ ও তা'লীমের প্রতি ক্ষীণ আলোকপাত লক্ষ্য করা যায়। যেমন, সেই সময় যোহন বাপ্তাইজক উপস্থিত হইয়া যিহুদিয়ার প্রান্তরে প্রচার করিতে লাগিলেন। তিনি বলিলেন, 'মন ফিরাও, কেননা স্বর্গরাজ্য সন্নিকট হইল।'..... তখন যিরূশালেম, সমস্ত যিহুদিয়া ও যদ্দনের নিকটবর্তী সম্রস্ত অঞ্চলের লোক বাহির হইয়া তাঁহার নিকট যাইতে লাগিল; আর আপন আপন পাপ স্বীকার করিয়া যদ্দন নদীতে তাহার দ্বারা বাপ্তাইজ' হইতে লাগিল। কিন্তু অনেক ফরীশী ও সদ্দুকী বাপ্তিস্মের জন্য আসিতেছে দেখিয়া তিনি তাহাদিগকে কহিলেন, হে সর্পের বংশেরা। আগামী কোপ হইতে পলায়ন করিতে তোমাদিগকে কে চেতনা দিল? অতএব মন পরিবর্তনের (তওবার) উপযোগী ফলে ফলবান হও। আর ভাবিও না যে, তোমরা মনে মনে বলিতে পার, আব্রাহাম আমাদের পিতা। কেননা আমি তোমাদিগকে বলিতেছি, সদাপ্রভুর এই সকল পাথর হইতে আব্রাহামের জন্য সন্তান উৎপন্ন করিতে পারেন। আর এখনই গাছগুলির মূলে কুড়ালি লাগান আছে; অতএব যে কোন গাছে উত্তম ফল ধরে না, তাহা কাটিয়া আগুনে ফেলিয়া দেওয়া যায়। আমি তোমাদিগকে মন পরিবর্তনের জন্য বাপ্তাইজ করিতেছি বটে........" (মথি, ৩: ১-২, ৫-১)। লুক পুস্তকে এ প্রসংগে আরও আছে, "তিবরীয় কৈসরের রাজত্বের পঞ্চদশ বৎসরে যখন পন্তীয় পলিত যীহুদিয়ার অধ্যক্ষ, হেরোদ গালীলের রাজা, তাঁহার ভ্রাতা ফিলিপ যিতরিয়া ও নাখোনীতিয়া প্রদেশের রাজা এবং লুষানিয় অবিলীনীর রাজা, তখন হানন ও সায়াদার মহাযাজকত্ব কালে সদাপ্রভুর বাণী প্রান্তরে সখরিয়ের পুত্র যোহনের নিকটে উপস্থিত হইল। তাহাতে তিনি যৰ্দ্দনের নিকটবর্তী সমস্ত দেশে আসিয়া পাপমোচনের জন্য মন পরিবর্তনের বাপ্তিস্ম প্রচার করিতে লাগিলেন; যেমন যিশাইয় ভাববাদীর বাক্য গ্রন্থে লিখিত আছে, 'প্রান্তরে একজনের রব, সে ঘোষণা করিতেছে, তোমরা প্রভুর পথ প্রস্তুত কর।..... অতএব যে সমস্ত লোক তাঁহার দ্বারা বাপ্তাইজিত হইতে বাহির হইয়া আসিল, তিনি তাহাদিগকে কহিলেন, হে সর্পের বংশেরা,...... অতএব যে কোন গাছে উত্তম ফল ধরে না, তাহা কাটিয়া অগ্নিতে ফেলিয়া দেওয়া যায়। (পূর্বানুরূপ) তখন লোকেরা তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিল, তবে আমাদের কি করিতে হইবে? তিনি উত্তর করিয়া তাহাদিগকে কহিলেন, যাহার দুইটি আঙরাযা (জামা) আছে, সে, যাহার নাই, তাহাকে একটি দিওক; আর যাহার কাছে খাদ্যদ্রব্য আছে, সেও অদ্রূপ করুক। আর করগ্রাহীরাও বাপ্তাইজিত হইতে আসিল এবং তাহাকে কহিল, গুরো। আমাদের কি করিতে হইবে? তিনি তাহাদিগকে কহিলেন, তোমাদের জন্য যাহা নিরূপিত, তাহার অধিক আদায় করিও না। আর সৈনিকেরাও তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিল, আমাদেরই বা কি করিতে হইবে? তিনি তাহাদিগকে বলিলেন, কাহারও প্রতি দৌরাত্ম করিও না, অন্যায় পূর্বক কিছু আদায় করিও না এবং তোমাদের বেতনে সন্তুষ্ট থাকিও" (লুক, ৩: ১-৪, ৭ ৯-১-৪; তদ্রূপ মার্ক, ১: ১-১১)।
বাইবেল চতুষ্টয়ের (নূতন নিয়ম) বিভিন্ন পুস্তকে ইয়াহইয়া (আ)-এর বিভিন্ন তা'লীম-ও হিদায়াতের ইংগিত বিদ্যমান। যেমন 'ঈসা (আ)-এর শাগরিদগণ তাঁহাকে বলিল, 'যোহনের শিষ্যগণ বারবার উপবাস করে (সিয়াম পালন করে) ও প্রার্থনা করে, ফরিশীদের শিষ্যেরাও সেইরূপ করে ....." (লূক, ৫: ৩৩)। তদ্রূপ, 'তাঁহার (ঈসা (আ)-এর) শিষ্যদের মধ্যে একজন তাঁহাকে কহিলেন, প্রভু, আমাদিগকে প্রার্থনা করিতে শিক্ষা দিউন, যেমন যোহনও আপন শিষ্যদিগকে শিক্ষা দিয়াছেন (লূক, ১১: ১ আরও দ্র. ৭৪ ২৬-৩১; নাজ্জার, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৩৬৯)।

টিকাঃ
১. বাপ্তাইজ বা বাপ্তিস্ম তৎকালীন দীক্ষাদানের পারিভাষিক নাম। ধর্মে দীক্ষা গ্রহণের জন্য যুগে যুগে ও দেশে দেশে বিভিন্ন প্রতীকী প্রথা প্রচলিত ছিল ও আছে। খৃষ্টধমে বর্তমানেও রংগীন পানিতে গোসল করাইবার কথা জানা যায়। যে সকল লোক হযরত ইয়াহইয়া (আ)-এর নিকট উপস্থিত হইয়া বিগত পাপ হইতে তওবা করিত এবং ভবিষ্যত জীবনে পাপ বর্জন করিয়া তাহার তা'লীম ও শিক্ষা অনুসারে জীবন যাপনের অংগীকার করিত তিনি তাহাদের মাথায় জর্দন নদীর পানি ছিটাইয়া দিতেন অথবা গোসল করাইয়া দিতেন এবং তাহাদের জন্য খায়র ও বরকতের দু'আ করিতেন। দীক্ষার এই প্রক্রিয়াকেই বাপ্তিস্ম বলা হয়। হযরত ঈসা (আ)-এর দা'ওয়াতী কার্যধারায়ও রাপ্তিম্বের উল্লেখ রহিয়াছে। প্রসংগত ইসলামের 'বায়আত' পদ্ধতি তুলনীয় এবং পবিত্র কুরআনের "আল্লাহর রংগে রংগীন হও"...... (২ : ১৩৮) আয়াত এবং তাফসীর গ্রন্থসমূহে উহার ব্যাখ্যা লক্ষণীয়। (দ্র. আম্বিয়ায়ে কুরআন, ৩খ, ২৮৩; মাজহারী, ১খ, ১২৭ ও অন্যান্য তাফসীর গ্রন্থ)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 পাঁচটি বিশেষ বিষয়ের তা'লীম

📄 পাঁচটি বিশেষ বিষয়ের তা'লীম


হাদীছ গ্রন্থসমূহে ইয়াহইয়া (আ)-এর তা'লীম ও দীন প্রচারের একটি মনোজ্ঞ বিবরণ পাওয়া যায়। মুসনাদে আহমাদ, তিরমিযী ও ইবন মাজা প্রভৃতি গ্রন্থে হারিছ আশ'আরী (রা) সূত্রে বর্ণিত হইয়াছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলিয়াছেন:
ইন্নাল্লাহা আমারা ইয়াহইয়া ইবনা যাকারিয়্যা বি খামসি কালিমাতিন আন ইয়া'মালা বিহিন্না ওয়ান ইয়ামুরা বানি ইসরাইলা আন ইয়া'মালূ বিhinna ও কা'দা আন ইউবতি'আ ফাকালা লাহু ঈসা আলাইহিস সালামু ইন্নাকা ক্বad উমিরতা বি খামসি কালিমাাতিন আন তা'মালা বিহিন্না ওয়া তা'মুরা বানি ইসরাইলা আন ইয়া'মালূ বিহিন্না ফা ইম্মা আন তুবাল্লিগাহুন্না ওয়া ইম্মা আন উবাল্লিগাহুন্না ফাকালা ইয়া আখি ইন্নি আখশা ইন সাবাকতানি আন উ'আযযাবা আও ইউখসাফা বিনী কালা ফাজামা'আ ইয়াহইয়া বানি ইসরাইলা ফি বাইতিল মাকদিসি হাত্তা ইমতালিয়াল মাসজিদু ফাকা'আদা আ'লাশ শারাফি ফাহাম্মাদাল্লাহা ওয়া আ'ছনা আলাইহি ওয়া কালা ইন্নাল্লাহা আ'যযা ওয়া জাল্লা আমরানি বি খামসি কালিমাতিন আন আ'মালা বিহিন্না ওয়া আমুরুকুম আন তা'মালূ বিহিন্না। ওয়া আউয়ালুহুননা আন তা'বদুল্লাহা লা তুশরিকু বিহী শাই'আন ফা ইন্না মাছালা যালিকা মাছালু মানিশতারা আ'বদানা মিন খালিছ মাালিহী বিওয়ারাকিন আও যাহাবিন ফাজা'আলা ইয়া'মালু ওয়া ফু'উদিয়া গিল্লাহু লিগাইরি সাইয়িদিহী ফাআইয়ুকুম ইয়াসুররুহু আন ইয়াকূনা আ'বদুহু কাযালিকা ওয়া ইন্নাল্লাহা খালাকাকুম ওয়া রাযাকাকুম ফা'বূদূহু ওয়ালা তুশরিকু বিহী শাই'আন (আস-সানী) ওয়া আমুরুকুম বিস সালাতি ফা ইন্না মাছালা যালিকা মাছালু রাজুলিন মা'আহু সূররাতুন মিন মিসকিন ফী ইসাবাতিন কুল্লুহুম ইয়াজিদু রিহাল মিসকি ওয়া ইন্না খালূফু ফামিস সা'ইমি আতইয়াবু ইনদাল্লাহি মিন রিহিল মিসকি। (আস-ছালিছ) ওয়া আমুরুকুম বিসসিয়ামি ফা ইন্না মাছালা যালিকা কামাছালি রাজুলিন মা'আহু সূররাতুন মিন মিসকিন ফি ইসাবাতিন কুল্লুহুম ইয়াজিদু রিহাল মিসকি ওয়া ইন্না খালূফু ফামিস সা'ইমি আতইয়াবু ইনদাল্লাহি মিন রিহিল মিসকি। (আর-রাবি') ওয়া আমুরুকুম বিস সাদাক্বাতি ফা ইন্না মাছালা যালিকা কামাছালি রাজুলিন আসারাহুল আ'দুওউ ফাশাদ্দু ইয়াদাহু ইলা উনুক্বিহী ওয়া ক্বাদ্দামূহু লি ইয়াদরিবূ উনুক্বাহু ফাকালা হাল লাকুম আন আফতাদিয়া নাফসী মিনকুম ফাজা'আলা ইয়াফতাদী নাফসাহু মিনহুম বিল ক্বালীলি ওয়াল কাসীরি হাত্তা ফাক্কা নাফসাহু। (আল-খামিস) ওয়া আমুরুকুম বিযিকরিল্লাহি আ'যযা ওয়া জাল্লা কাসীরান ফা ইন্না মাছালা যালিকা কামাছালি রাজুলিন তালাবাহুল আ'দুওউ সিরা'আন ফি আছারিয়াহু ফা আতা হিসনান্ হাসীনান ফাতাহাসসানা ফীhi ওয়ান্নাল আ'বদা আহসানু মা ইয়াকুনু মিনাশ শাইতানি ইযা কানা ফি যিকরিল্লাহি আ'যযা ওয়া জাল্লা।
"আল্লাহ তা'আলা ইয়াহইয়া ইবন যাকারিয়‍্যা (আ)-কে পাঁচটি বাক্য দ্বারা আদেশ করিলেন, যেন তিনি নিজে সেইগুলি অনুসারে আমল করেন এবং বনী ইসরাঈলকেও তদনুসারে আমল করিবার আদেশ দেন। কিন্তু (কোন কারণে) ইহাতে ইয়াহইয়া (আ)-এর বিলম্ব হইয়া যায়। তখন ঈসা (আ) তাঁহাকে বলিলেন, (ভ্রাতা) আপনাকে পাঁচটি বিষয়ের আদেশ দেওয়া হইয়াছে যেন আপনি নিজে উহা আমল করেন এবং বনী ইসরাঈলকে তদনুসারে আমল করিবার আদেশ প্রদান করেন। সুতরাং আপনি নিজে বনী ইসরাঈলকে কথাগুলি জানাইয়া দিবেন অথবা (আপনি সংগত মনে করিলে) আমি সেগুলি তাহাদিগকে জানাইয়া দিব। ইয়াহইয়া (আ) বলিলেন, ভ্রাত! আমার ভয় হইতেছে যে, আপনি আমার পূর্বে সেগুলি প্রচার করিলে আমাকে শাস্তি দেওয়া হইবে অথবা ভূমিতে ধ্বসাইয়া দেওয়া হইবে। সুতরাং আমিই আমার দায়িত্ব পালন করিতেছি। বর্ণনাকারী বলেন, তখন ইয়াহ্ইয়া (আ) সমস্ত বনী ইসরাঈলকে বায়তুল মুকাদ্দাসে সমবেত করিলেন। মসজিদ পূর্ণ হইয়া গেলে তিনি উঁচু স্থানে বসিলেন এবং আল্লাহ্ হামদ ও ছানা পাঠ করিবার পর বলিলেন, "মহান আল্লাহ, আমাকে পাঁচটি বিষয়ের আদেশ করিয়াছেন যেন আমি নিজে তদনুসারে আমল করি এবং তোমাদিগকেও তদনুসারে আমল করিতে বলি। (১) তোমরা এক আল্লাহ্ ইবাদত করিবে। তাঁহার সহিত কাহাকেও শরীক করিবে না। কেননা শিরক-এর দৃষ্টান্ত ঐ ব্যক্তির ন্যায় যে তাহার নিজস্ব সম্পদ স্বর্ণ বা রৌপ্য দ্বারা একটি গোলাম খরিদ করিল। কিন্তু সে গোলাম কাজকর্ম করিয়া উপার্জন করিতে লাগিল এবং তাহার উপার্জন তাহার মনিব ব্যতীত অন্য কাহাকেও দিতে থাকিল। এখন বল, তোমাদের কেহ কি তাহার গোলামের এইরূপ আচরণ পছন্দ করিবে? সুতরাং যে আল্লাহ তোমাদিগকে সৃষ্টি করিয়াছেন এবং তোমাদিগকে খাদ্য দান করিতেছেন তোমরা শুধু তাঁহারই ইবাদত কর এবং অন্য কাহাকেও তাঁহার সহিত শরীক সাব্যস্ত করিও না।
(২) তিনি তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়াছেন, তোমরা সালাত আদায় কর। কেননা আল্লাহ তা'আলা তাঁহার 'মুখ' (রহমত ও সন্তুষ্টি) বান্দার অভিমুখী করিয়া রাখেন, যতক্ষণ না বান্দা অন্য কোন দিকে দৃষ্টিপাত করে (মনোযোগ দেয়)। সুতরাং সালাত আদায়কালে অন্য কিছুর দিকে দৃষ্টিপাত করিবে না।
(৩) তোমাদিগকে সিয়াম পালনের আদেশ প্রদান করিয়াছেন। কেননা সিয়াম পালনকারীর দৃষ্টান্ত ঐ ব্যক্তির ন্যায় যাহার নিকট মিশকের একটি থলে রহিয়াছে-এবং সে একদল মানুষের মধ্যে বসিয়া রহিয়াছে। সকলেই তাহার নিকট হইতে মিশকের সুগন্ধি আহরণ করিয়া মাতোয়ারা হইতেছে। মূলত রোযাদারের মুখের ঘ্রাণ আল্লাহ তা'আলার নিকটে মিশকের সুঘ্রাণ হইতে পবিত্রতর।
(৪) তিনি তোমাদিগকে দান-সাদাকা করিবার আদেশ করিয়াছেন। কেননা সাদাকাকারীর দৃষ্টান্ত সেই ব্যক্তির ন্যায় যাহাকে তাহার শত্রুরা (অতর্কিতে) বন্দী করিয়াছে এবং ঘাড়ের সহিত তাহার হাত বাঁধিয়া দিয়া তাহাকে বধ্যভূমিতে নিয়া চলিয়াছে। এইরূপ (নৈরাশ্যজনক) পরিস্থিতিতে সে বলিতেছে, তোমরা কি মুক্তিপণের বিনিময়ে আমাকে মুক্তি দিবে? পরে সে তাহার যাবতীয় সম্পদ মুক্তিপণরূপে প্রদান করিয়া আত্মরক্ষার ব্যবস্থা করিল।
তিনি তোমাদেরকে আরও নির্দেশ দিয়াছেন যে, (৫) তোমরা সর্বদা অধিক পরিমাণে আল্লাহর যিক্র করিতে থাকিবে। কেননা যিক্রকারীর দৃষ্টান্ত সেই ব্যক্তির ন্যায় শত্রু দ্রুত গতিতে পশ্চাদ্ধাবন করিতেছে। সে দৌড়াইয়া গিয়া একটি সুরক্ষিত দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করিল এবং শত্রুর আক্রমণ হইতে আত্মরক্ষা করিল। নিঃসন্দেহে মানুষ আল্লাহর যিক্র (-র দুর্গে) আশ্রয় গ্রহণ করিয়াই শয়তান শত্রুর আক্রমণ হইতে সুরক্ষা অর্জন করিতে পারে " (বিদায়-নিহায়া, ২খ, ৫২/৬২; বরাত, মুসনাদে আহমদে, ৪খ, ২০২; আবূ দাউদ তায়ালিসী, মুসনাদ, হাদীস নং ১১৬১; কাসাসুল কুরআন, ২খ, ২৬৭, ২৬৮; আম্বিয়ায়ে কুরআন, ৩খ, ২৮৬, ২৮৭)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00