📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত ইয়াহইয়া (আ)-এর অন্যান্য বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী

📄 হযরত ইয়াহইয়া (আ)-এর অন্যান্য বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী


পবিত্র কুরআনে উল্লিখিত যাকারিয়‍্যা (আ)-এর উত্তরাধিকারী প্রার্থনার বর্ণনায় কাংখিত সন্তানটির জন্য দুইটি গুণবাচক শব্দ সম্বলিত প্রার্থনা লক্ষ্য করা যায়। সূরা আল-ইমরানের বর্ণনায় রহিয়াছে ذرية طيبة 'পবিত্র' সন্তান (৩: ৩৮) অর্থাৎ সুদ্দীর মতে 'বরকতময়; অন্যদের মতে মুত্তাকী ও পরিচ্ছন্ন আমলের অধিকারী (রূহুল মা'আনী, ২/১খ, ১৪৪) এবং সূরা মারয়ামের বর্ণনায় ওয়া'জ'আলহু রব্বি রদিয়্যা “হে আমার প্রতিপালক! তাহাকে করিও সন্তোষভাজন" (১৯: ৬) অর্থাৎ যাহার প্রতি আপনি তুষ্ট থাকিবেন এবং আপনার বান্দারাও যাহাকে পসন্দ করিবে (তাবারীর বরাতে ফাতহুল বারী, ৬খ., ৫৩৯)। "আপনার ও আপনার সৃষ্টির নিকটে পসন্দনীয়, যাহার দীনদারী ও চরিত্রগুণের কারণে আপনিও তাহাকে ভালবাসিবেন এবং সৃষ্টির নিকটে তাহাকে ভালবাসার পাত্র করিয়া দিবেন" (মুখতাসার ইবন কাছীর, ২খ, ৪৪৩)।
'চরিত্রগুণে ও কর্মে পসন্দনীয় অথবা তকদীরের প্রতি সন্তুষ্ট অথবা পুণ্যবান যাহাকে আপনি পসন্দ করিবেন অথবা তাহার পূর্বপুরুষের ন্যায় নবী' (কুরতুবী, ৬/১খ, ৮২)। 'কথায় ও কাজে আপনার নিকট পসন্দনীয় অথবা আপনার প্রতি সন্তুষ্ট অথবা আপনার বান্দাদিগের মধ্যে পসন্দনীয় অর্থাৎ তাহাদের বরেণ্য ও অনুসরণীয়। এক কথায় একটি 'আলিম ও আমলদার সন্তান (রূহুল মা'আনী, ৮/২খ, ৯৩)। "তাহার পূর্বসূরী ও পূর্বপুরুষদের ন্যায় নবুওয়াত ইত্যাদির মর্যাদায় মর্যাদাবান" (বিদায়া, ২খ,৫৭)।
পবিত্র কুরআনের বর্ণনামতে আল্লাহ তা'আলা যাকারিয়‍্যা (আ)-এর এই মিনতিপূর্ণ দু'আ মঞ্জুর করিলেন এবং উহা এমন পূর্ণাংগরূপে কবুল করিলেন যে, সন্তানের সুসংবাদ দেওয়ার সাথে সাথে তাঁহাকে প্রায় দশ-বারটি সদগুণে গুণান্বিত করিবার আগাম ঘোষণাও প্রদান করিলেন। যেমন سميا আমি ইতোপূর্বে এই নামে কাহারও নামকরণ করি নাই। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় سميا শব্দের অর্থ অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে 'সমনাম' হইলেও উহাতেও বৈশিষ্ট্যের অর্থ বিদ্যামান। কেননা নামের এককত্ব ও অভিনবত্ব বিশেষ গুণের ইংগিত বহন করে (মা'আরিফুল কুরআন, ৬খ, ১৯)। ইহা ছাড়া অনেক বিশেষজ্ঞ মুফাসসির শব্দের অর্থ বলিয়াছেন তুলনীয়, দৃষ্টান্ত, সাদৃশ্যপূর্ণ ও নজীর। ইবন আব্বাস ও মুজাহিদ প্রমুখ বলিয়াছেন, তাঁহার তুলনীয় ও উপমা নাই। কোন বন্ধ্যা নারী তাঁহার মত কোন সন্তান প্রসব করে নাই (ফাতহুল বারী, ৬খ, ৫৩৯; কুরতুবী, ৬/১খ, ৮২৩; মুখতাসার ইবন কাছীর, ২খ, ৪৪৩; রূহুল মা'আনী, ৮/২খ, ৬৫)। ইবন কাছীর আরও বলিয়াছেন, ইহা সংক্ষিপ্ত বর্ণনা। ইহার ব্যাখ্যা রহিয়াছে আল-ইমরানের আয়াতে:
আননাল্লাহা ইউবাশ্বিরুকা বিয়াহইয়া মুসাদ্দিকাম বিকallimatin মিনাল্লাহি ওয়া সাইয়িদান ওয়া হাসূরান ওয়া নাবিইয়াম মিনাস সালিহীন।
(১) আল্লাহ্ কালেমা অর্থাৎ ঈসা (আ) কে সত্যায়নকারী (পরে দ্র.); (২) সায়্যিদ (মহান নেতা); (৩) হাসূর (কামরিপু মুক্ত); (৪) নবী; (৫) পুণ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত (বিদায়া, ২খ, ৫৮,৫৯; রূহুল মা'আনী, ৮/২খ, ৬৫)। এই গুণাবলীর অতিরিক্ত দ্বারা মারয়ামের বর্ণনায়:
ওয়া আতাইনাাহুল হুকমা সাবিয়া। ওয়া হানাআন মিন লাদুন্না যাকাওাতাওঁ ওয়া কা'না তাক্বিয়্যা। ওয়া বাarra'উ বিওয়ালিদাইহি ওয়া লাম ইয়াকুন জাব্বারান আ'সিয়্যা। ওায়াস সালামু আলাইহি ইয়াওমা ওয়ালিদা ওয়া ইয়াওমা ইয়ামূতু ওয়া ইয়াওমা ইউব'আছু হাইয়্যা।
"তাহাকে আমি শৈশবেই দান করিলাম (৬) জ্ঞান, (৭) আমার নিকট হইতে হৃদয়ের কোমলতা ও পবিত্রতা এবং (৮) সে ছিল মুত্তাকী; (৯) এবং পিতা-মাতার অনুগত এবং (১০) সে ছিল না উদ্ধত ও অবাধ্য এবং (১২) তাহার প্রতি শান্তি যেদিন সে জন্মলাভ করে, যেদিন তাহার মৃত্যু হইবে এবং যে দিন সে জীবিত অবস্থায় উত্থিত হইবে" (১৯: ১২-১৫)।
এই গুণাবলীর ব্যাখ্যায় ঐতিহাসিক ও মুফাসসিরগণ বলিয়াছেন, সায়্যিদ শব্দের সরল অর্থ নেতা বা সরদার। আল-জায়ারীর নিহায়া গ্রন্থে سید শব্দের অর্থ বলা হইয়াছে প্রভু, মালিক, অভিজাত, গুণী, মহান, সহনশীল, স্বীয় সম্প্রদায়ের অনাচার বহনকারী, স্বামী, নেতা, অগ্রবর্তী ইত্যাদি (মাজহারী, ২খ, ৪৫; বরাত নিহায়া)। মুফাসসিরগণ শব্দটির আরও কিছু অর্থ বর্ণনা করিয়াছেন। যাজ্জাযের মতে সর্বাধিক কল্যাণকর বিষয়ে যে তাহার সমসাময়িকদের ঊর্ধ্বে (কুরতুবী, ২/২খ, ৭৭)। ইব্‌ন আব্বাস (রা) ও মুজাহিদের মতে আল্লাহ্র নিকট মর্যাদাবান; দাহ্হাক ও ছওরীর মতে সহনশীল, আল্লাহ-ভীরু; সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের মতে 'আলিম, ফকীহ; অন্যান্যদের মতে আল্লাহ্ ফয়সালায় সন্তুষ্ট; কাতাদা: ইল্‌ম ও ইবাদাতে নেতৃস্থানীয়; ইকরিমা: এমন সহনশীল ক্রোধ যাহাকে কাবু করিতে পারে না; সুফয়ান ছওরী: যে হিংসা করে না, হিংসার পাত্রও হয় না; খলীল: সমশ্রেণীর উপরে শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী, অনুসরণীয় নেতা; আবু বাক্স ওয়াররাক: আল্লাহতে তাওয়াক্কুলকারী; তিরমিযী: সমুচ্চ মনোবলসম্পন্ন; আবু ইসহাক: স্বীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে কল্যাণে শীর্ষস্থানীয়; কাহারও মতে অল্পে তুষ্ট। এই সকল গুণ ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর জন্য প্রয়োজ্য হইতে পারে এবং এক কথায় ইলম, ইবাদত, তাকওয়া-পরহেযগারী ও সমগ্র উত্তম স্বভাব ও গুণে সমকালীন সকলের চেয়ে তিনি শ্রেষ্ঠ (তাফসীরে ইব্‌ন কাছীর, ১খ, ৩৬১; রূহুল মা'আনী, ২/২খ, ১৪৭; মাজহারী, ২খ, ৪৫, ৪৬; কাসাসুল কুরআন, ২খ, ২৬৩)।
তবে সংক্ষেপে শব্দটির সরল অর্থ সম্প্রদায়ের অনুসরণীয় নেতা এবং আল্লাহ্র নিকট পসন্দনীয় ব্যক্তি (কাসাসুল কুরআন, ২খ, ২৬৪; রূহুল মা'আনী, ২/২খ, ১৪৭)। হাসূর আত্মরুদ্ধ ও অতিশয় সংযমী। এ শব্দটির ব্যাখ্যায়ও বিভিন্ন মনীষী বিভিন্ন অর্থ উপস্থাপন করিয়াছেন। ইব্‌ন মাস'উদ, ইব্‌ন আব্বাস, ইব্‌ন জুবায়র, কাতাদা, 'আতা, মুজাহিদ, 'ইকরিমা, সাঈদ ইব্‌ন জুবায়র, আবুশ শা'ছা, আতিয়‍্য্যা, হাসান বসরী, সুদ্দী, ইব্‌ন যায়দ প্রমুখের মতে, "যে নারীসংগ হইতে নিজেকে বিরত রাখে এবং কামশক্তি অটুট ও পূর্ণাংগ থাকা সত্ত্বেও নারী সহ্বাস করে না" (তাফসীরে ইব্‌ন কাছীর, ১খ, ৩৬১; কুরতুবী, ২/২খ, ৭৮)। ইবন মাস'উদের একটি বর্ণনায় 'যাহার জন্য নারী সংগ নিষিদ্ধ'। সুতরাং ইহার অর্থ হইবে, যে নিজেকে সকল বাসনা হইতে অবরুদ্ধ ও বিরত রাখে (কুরতুবী, ঐ; রূহুল মা'আনী, ২/২খ, ১৪৮)।
বস্তুত ইয়াহইয়া (আ) শৈশব হইতেই আল্লাহ্র প্রতি এমন নিবেদিত ছিলেন যে, কোন প্রকার পার্থিব ভোগ-বিলাসে, আমোদ-স্ফুর্তি, নারীসংগ তথা বিবাহ, এমনকি শিশু বয়সেও খেলাধুলার প্রতি অনীহ ছিলেন। বিভিন্ন রিওয়ায়াতে বর্ণিত হইয়াছে যে, তিনি কখনও কোন গুনাহের ইচ্ছা করেন নাই। ইবন জারীর, ইবনুল মুনযির, ইব্‌ন আবূ হাতিম ও ইব্‌ন আসাকির প্রমুখ (কাতাদা, ইয়াহ্ইয়া ইবন সাঈদ ও সাঈদ ইবনুল মুসায়্যাব হইতে মাওকূফরূপে এবং 'আম্র ইবনুল 'আস, আবূ হুরায়রা, মু'আয (রা) প্রমুখ হইতে মারফু' রূপে) বর্ণিত হইয়াছে, নবী (স) বলিয়াছেন:
কুল্লু ইবনি আদামা ইয়ালক্বাল্লাহা বিজানবিন ক্বাদ আযানবাহু ইউ'আযযিবুহু আলাইহি ইন শাআ আও ইয়ারহামুহূ ইল্লা ইয়াহইয়া ইবনা যাকারিয়্যা ফা ইন্নাল্লাহা ইয়াকূলু সাইয়িদান ওয়া হাসূরান।
"প্রত্যেক আদম সন্তান আল্লাহ সমীপে উপস্থিত হইবে এই অবস্থায় যে, সে কেননা কোন গুনাহ করিয়াছে। ইচ্ছা করিলে তিনি তাহাকে আযাব দিবেন অথবা দয়া করিবেন, কিন্তু ইয়াহইয়া ইব্‌ন যাকারিয়‍্যা (ব্যতিক্রম)। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলিতেছেন, নেতা ও স্ত্রী-বিরাগী” (তাফসীরে ইবন কাছীর, ৯খ, ৩৬১; বিদায়া ২খ, ৫১; রূহুল মা'আনী ২/২খ, ১৪৮; মাজহারী, ২খ, ৪৬)।
ইবন 'আব্বাস (রা) প্রমুখের বরাতে কেহ কেহ ইয়াহইয়া (আ)-এর বীর্যশূন্য বা বীর্যপাতে অক্ষম অথবা পুরুষত্ব রহিত ও সহবাসে অক্ষম হওয়ার কথা বলিয়াছেন। বিশেষজ্ঞ মুফাসসিরগণ কঠোর ভাষায় উহা খণ্ডন করিয়া বলিয়াছেন যে, আল্লাহ তা'আলা হাসূর শব্দটি ইয়াহইয়া (আ)-এর প্রশংসাসূচক গুণরূপে উল্লেখ করিয়াছেন। আর পুরুষত্বহীনতা ইত্যাদি পুরুষের জন্য দূষণীয়, উহা গুণবাচক নহে। আল্লামা সীউহারুবী লিখিয়াছেন, "আমাদের মতে এই সকল অর্থ অভিন্ন মৌলিক বিষয়ের বিভিন্ন ব্যাখ্যা। কেননা অভিধানে حصر ধাতুমূলটির অর্থ বাধা-বিপত্তি বা রুদ্ধতা এবং حصور উহার অতিশয়ার্থবোধক কর্তৃরূপ। সুতরাং এখানে অর্থ হইবে, যে সকল বিষয় হইতে বিরত থাকা বা উহাতে সংযম অবলম্বন করা আল্লাহ তা'আলার বিধানে অপরিহার্য উহা হইতে বিরত ব্যক্তিকেই 'হাসূর' বলা হয়। যেহেতু ইয়াহইয়া (আ)-এর মধ্যে উল্লিখিত বিষয়াদি সামগ্রিকরূপে বিদ্যমান ছিল, সুতরাং শব্দটির সমস্ত অর্থই পূর্ণরূপে তাঁহার জন্য প্রযোজ্য হইবে। এখানে خصور শব্দের অপর অর্থ পুরুষত্বহীনতা হইতেই পারেনা। কেননা এই অর্থটি পুরুষের জন্য প্রশংসা সূচক নহে, বরং উহা অপূর্ণতা ও দোষরূপে বিবেচিত অথবা শব্দটি এখানে ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর প্রশংসারূপে উল্লিখিত হইয়াছে। এই কারণে বিশেষজ্ঞ মুফাসসিরগণ ঐ অর্থটি প্রত্যাখ্যান করিয়াছেন। কাযী ইয়ায তাঁহার প্রসিদ্ধ 'আশ-শিফা' গ্রন্থে এবং খাফাজী উক্ত গ্রন্থের ব্যাখ্যাগ্রন্থ নাসীমুর রিয়াদ-এ উক্ত অর্থটির কঠোর সমালোচনাপূর্বক অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে উহাকে বাতিল সাব্যস্ত করিয়াছেন, বরঞ্চ কাম শক্তি বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও উহাকে নিয়ন্ত্রিত রাখিবার ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলার বিশিষ্ট বান্দাগণ সর্বদা দুইটি পন্থা অবলম্বন করিয়াছেন। প্রথমত, কুমার জীবন গ্রহণ করিয়া চূড়ান্ত সাধনা ও অধ্যাবসায়ের মাধ্যমে কাম চাহিদাকে চিরতরে প্রদমিত করিয়া রাখা এবং উহাকে শূন্যের কোঠায় পৌঁছাইয়া দেওয়া, যাহা হযরত ঈসা (আ)-এর জীবন ধারায় সমুজ্জ্বলরূপে লক্ষণীয়। আর ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সাধনা ব্যতিরেকে জন্মকালেই আল্লাহ তা'আলা এই বিষয়টি দান করিয়াছিলেন। দ্বিতীয় পদ্ধতি কামশক্তিকে নির্মূল না করিয়া উহা সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ণ রাখিয়া বৈধ ক্ষেত্রসমূহে উহা ব্যবহার করা এবং অবৈধ কোনও ক্ষেত্রে ব্যবহার না করিবার ব্যাপারে নিজেকে এমন পূর্ণাংগ নিয়ন্ত্রণে রাখা যে, কখনও এক মুহূর্তের জন্যও যেন উহার নিয়ন্ত্রণে শিথিলতা সৃষ্টি না হয়। উল্লেখ্য যে, মানব বংশধারা ও সামাজিক জীবনধারা রক্ষার খাতিরে নবী-রাসূলগণ সাধারণত এই দ্বিতীয় পন্থার অনুসারী ছিলেন। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে ও বিশেষ পরিস্থিতির কারণে কোন কোন নবী-রাসূলের ক্ষেত্রে ইহার ব্যতিক্রম ঘটিয়াছে (কাসাসুল কুরআন, ২খ, ২৬৪, ২৬৫)।
উল্লেখ্য যে, ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর অনীহা শুধু বিবাহ বা নারী সংগ লাভেই ছিল না, বরং উত্তম পানাহার, উত্তম পোশাক-পরিচ্ছদ, বাসস্থান, আরাম-আয়েশ এই সবের কোন কিছুর প্রতিই তাঁহার কোন আকর্ষণ ছিল না। মোটকথা, অবিবাহিতরূপে ও পার্থিব ভোগ-বিলাস ও মোহমুক্ত জীবন যাপন ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল। আবু উমামা (রা) সূত্রে তাবারানীর বর্ণিত একটি হাদীসে এই বিষয়টির ইংগিত পাওয়া যায়। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন:
আরবা'আতুন লু'ইনূ ফিদ দুনিয়া ওয়াল আখিরাতি ওয়া আমানাতিল মালায়িকাতু রাজুলুওঁ জা'আলাহুল্লাাহু তা'আলা যাকারান ফাআনসা নাফসাহু ফাতাশাব্বাহা বিন নিসা'ই ওয়ামরাআতুওঁ জা'আলাহাল্লাহু তা'আলা উনসা ফাতাযাক্কারাত ওয়া তাশাব্বাহাত বির রিজাল। ওয়াল্লাযী ইউদিল্লুল আ'মা ওয়া রাজুলুন হাসূরুওঁ ওয়া লাম ইয়াজ'আলিল্লাহু তা'আলা হাসূরান ইল্লা ইয়াহইয়া ইবনা যাকারিয়্যা।
"চার ব্যক্তিকে দুনিয়া ও আখিরাতে অভিসম্পাত দেওয়া হইয়াছে এবং ফেরেশতাগণ ইহাতে আমীন বলিয়াছেন: (১) কোন পুরুষ, যাহাকে আল্লাহ তা'আলা পুরুষ বানাইয়াছেন, অতঃপর সে নিজেকে নারী বানায় এবং নারীদের সাদৃশ্য গ্রহণ করে; (২) কোন নারী-যাহাকে আল্লাহ তা'আলা নারী বানাইয়াছেন, অতঃপর সে নিজেকে পুরুষ বানায় এবং পুরুষের সাদৃশ্য গ্রহণ করে; (৩) যে ব্যক্তি অন্ধকে বিপথগামী করে এবং (৪) যে স্ত্রী-বিরাগী (হাসূর) হয়। আল্লাহ তা'আলা ইয়াহ্ইয়া ইবন যাকারিয়‍্যা (আ) ব্যতীত কাহাকেও 'হাসূর' করেন নাই" (রূহুল মা'আনী, ৩/১খ, ১৪৮)।
ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর পরবর্তী বৈশিষ্ট্য তিনি নবী তালিকাভুক্ত ছিলেন। অর্থাৎ অন্যান্য গুণাবলীর সহিত তাহাকে পূর্বপুরুষের ধারায় এবং পিতার উত্তরাধিকারী সংক্রান্ত দু'আ কবুল করিয়া তাঁহাকে নবুওয়াতে মর্যাদায় ভূষিত করা হইয়াছিল এবং তিনিই ছিলেন তাওরাত অনুসারী সর্বশেষ নবী।
পরবর্তী বৈশিষ্ট্য পূণ্যবানদের অন্তর্গত দ্বারা অনেকের মতে নবুওয়াতসুলভ যোগ্যতা এবং নবী বংশধারার সদস্য ও 'মা'সুম' হওয়ার অর্থ। তবে অন্যরা বলিয়াছেন যে, এখানে নবী বলিবার পরেও 'সালিহ' গুণের উল্লেখ দ্বারা উদ্দেশ্য এই যে, তিনি নবুওয়াত পদমর্যাদার জন্য উপযোগী ও অপরিহার্য যোগ্যতা ও গুণাবলীর অধিক আরও চূড়ান্ত স্তরের যোগ্যতা-গুণাবলীতে ভূষিত ছিলেন। যেরূপে সুলায়মান (আ) নবী হওয়া সত্ত্বেও "এবং আমাকে আপনার রহমত দ্বারা আপনার 'পুণ্যবান' সালিহ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন" (২৭:১৯) (রূহুল মা'আনী, ৩/১খ, ১৪৮)।
সূরা মারয়ামে উল্লিখিত পরবর্তী বৈশিষ্ট্য হিকমত ও মহাজ্ঞান দান। "শৈশবেই আমি তাহাকে হিকমত দান করিয়াছি” (১৯: ১২)। শৈশবে হিকমত দান দ্বারা কেহ কেহ সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রমরূপে শৈশবে নয় বৎসর বা সাত বৎসর বয়সে অথবা তিন বা দুই বৎসর বয়সেই তাঁহাকে নবুওয়াত দেওয়া হইয়াছিল বলিয়া মত প্রকাশ করিয়াছেন। (১) কিন্তু মুহাক্কিক মুফাসসিরগণের মতে ইয়াহইয়া (আ)-কে সাধারণ নিয়ম তথা চল্লিশ বৎসরের নিয়মের ব্যতিক্রম করিয়া ত্রিশ বৎসরের পূর্বে নবুওয়াত প্রদানের কথা স্বীকৃত হইলেও অতি শিশু বয়সে নবুওয়াতের ন্যায় অত্যোচ্চ ও অতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রদান কোন প্রমাণ দ্বারা প্রমাণিত নহে। তাহাদের মতে আয়াতের হিকমত দ্বারা ইল্ল্ম, বুদ্ধিমত্তা, সাধনা, সাহসিকতা, যাবতীয় কল্যাণের প্রতি আকর্ষণ এবং উহাতে যাথাসাধ্য সাধনা করিবার যোগ্যতা উদ্দেশ্য। কাতাদা বলিয়াছেন, দুই বা তিন বৎসর বয়সের সময়ই ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর মধ্যে এই যোগ্যতার উন্মেষ ঘটিয়াছিল। মোটকথা, ভবিষ্যত তুলনামূলক কম বয়সে নবুওয়ত প্রদানের ভূমিকা ও পূর্ব প্রস্তুতিরূপে তাঁহাকে শৈশবেই হিকমত ও তাওরাতের ইলম দান করা হইয়াছিল। আবদুল্লাহ ইব্‌ন মুবারক সূত্রে মা'মার (র) হইতে এবং ইবন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত মারফু হাদীসে আছে, নবী (স) এই প্রসংগে বলিয়াছেন:
ক্বালাল গিলমাানু ইয়াহইয়া ইবনু যাকারিয়্যা আলাইহিমাস সালামু ইযহাব বিন্না নাল'আবু ফাকালাাা আল-লা'ইবু খুলিকনা মাা লিall'ইবি খুলিকনাাা ইযহাবূ নুসাল্লি ফাহুওয়া কাওলুহু তা'আলাা ওয়া আাতাইনাহুল হুকমা সাবিয়্যা।
"বালকরা (বালক) ইয়াহ্ইয়াকে বলিল, চল, আমরা খেলিতে যাই। তিনি বলিলেন, খেলাধুলার জন্য আমাদিগকে বা আমাকে সৃষ্টি করা হয় নাই, (বরং) চল আমরা সালাত আদায় করি; ইহাই আল্লাহ তা'আলার বাণী واتيناه الحكم صبيا -এর মর্ম।”
সুতরাং আয়াতের দূত শব্দ দ্বারা হিকমত ও প্রজ্ঞা উদ্দেশ্য হওয়াই অধিক সংগত। আবূ নু'আয়ম, ইব্‌ন মারদুওয়ায়হ ও দায়লামী ইন্ন 'আব্বাস (রা) সূত্রে নবী (স) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, তিনি এই প্রসংগে বলিয়াছেনঃ "সাত বৎসর বয়সেই তাঁহাকে বুদ্ধিমত্তা ও ইবাদাত (-এর অভ্যাস) দান করা হইয়াছিল" (তাফসীরে ইব্‌ন কাছীর, ৩খ, ১১৩; কাসাসুল আম্বিয়া, ১খ, ৩৩৬; বিদায়া, ২খ, ৫৯; কুরতুবী, ৬/১খ, ৮৭; রূহুল মা'আনী, ৮/২খ, ৭২; কাসাসুল কুরআন, ২খ, ২৬৬; আল-কামিল, ১খ, ২২৯; ফাতহুল বারী, ৬খ, ৫৪০; মাজহারী, ৬খ, ৮৬)।
পরবর্তী বৈশিষ্ট্য حنانا শব্দটির আভিধানিক অর্থ দয়া, মমতা, হৃদয়ের কোমলতা, বরকত ইত্যাদি। উল্লেখ্য যে, আল্লাহ তা'আলার অন্যতম মুবারক নাম حنان একই ধাতুমূল হইতে গঠিত। এখানে শব্দটির অর্থ সম্পর্কে ইবনে আব্বাস (রা)-এর একটি বর্ণনায় এবং হাসান, মুজাহিদ, কাতাদা, ইকরিমা, দাহ্হাক, ফাররা, আবু উবায়দা প্রমুখ বলিয়াছেন, বিশেষ রহমত অর্থাৎ তাঁহার প্রতি আল্লাহ তা'আলার বিশেষ রহমত এবং আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হইতে মানুষের জন্য রহমতস্বরূপ, যাহাতে তিনি তাহাদিগকে কুফর ও শিরক হইতে মুক্ত করেন। ইবনুল আরাবীর মতে, বিশেষ বরকতময়। ইকরিমার মতে মহব্বত ও ভালবাসা অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা মানুষের অন্তরে তাঁহার প্রতি আকর্ষণ ও ভালবাসা সৃষ্টি করিয়া দেন। যে কেহ তাঁহার সাক্ষাতে আসিবে সে-ই তাঁহাকে ভালবাসিবে। অন্যরা বলিয়াছেন, মানুষের প্রতি, বিশেষত পিতামাতার প্রতি তাঁহার অন্তরে প্রচণ্ড মমতা দান করিলাম। মোটকথা, দয়া, মমতা, ভালবাসা ইত্যাদি আল্লাহ তা'আলা নিজের পক্ষ হইতে )আমার পক্ষ হইতে) বিশেষভাবে দান করেন (মুখতাসার ইন্ন কাছীর, ২খ, ৪৪৫; বিদায়া ২খ, ৫০; রূহুল মা'আনী, ৮/২খ, ৭২; মাজহারী, ৬খ, ৮৬)।
পরবর্তী বিশেষণ زکواة-এর অর্থ পবিত্রতা। মুফাসসিরগণের মতে ইব্‌ন আব্বাস (রা( বলিয়াছেন, বরকত; কাতাদার মতে নেক আমল; দাহহাকের মতে পরিচ্ছন্ন নেক আমল। ইন্ন কাছীর ও অন্যদের মতে পংকিলতা হইতে পবিত্র এবং কাহারও কাহারও মতে তাঁহার পিতাকে প্রদত্ত আল্লাহ তা'আলার দান ও সাদাকা (মুখতাসার ইব্‌ন কাছীর, ২খ, ৪৪৫; বিদায়া, ২খ, ৫০; রূহুল মা'আনী, ৮/২খ, ৭৩; মাজহারী, ৬খ, ৮৬)।
পরবর্তী বিশেষণ تقی অর্থ মুত্তাকী, আল্লাহভীরু। আল্লাহ্র আদেশাবলী পালন এবং পাপাচার ও নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ বর্জনের মাধ্যমে নিষ্ঠার সহিত ও পূর্ণ আত্মসমর্পণের সহিত আনুগত্যকারী। যেমন হাদীছ বর্ণিত হইয়াছে যে, ইয়াহ্ইয়া (আ) কখনও কোন গুনাহের ইচ্ছা করেন নাই। ইবন জারীর, ইবনুল মুনযির, ইব্‌ন আবূ হাতিম ও ইব্‌ন আসাকির প্রমুখ (কাতাদা, ইয়াহ্ইয়া ইবন সাঈদ ও সাঈদ ইবনুল মুসায়্যাব হইতে মাওকূফরূপে এবং 'আম্র ইবনুল 'আস, আবূ হুরায়রা, মু'আয (রা) প্রমুখ হইতে মারফু' রূপে) বর্ণিত হইয়াছে, নবী (স) বলিয়াছেন:
কুল্লু ইবনি আদামা ইয়ালক্বাল্লাহা বিজানবিন ক্বাদ আযানবাহু ইউ'আযযিবুহু আলাইহি ইন শাআ আও ইয়ারহামুহূ ইল্লা ইয়াহইয়া ইবনা যাকারিয়্যা ফা ইন্নাল্লাহা ইয়াকূলু সাইয়িদান ওয়া হাসূরান।
"প্রত্যেক আদম সন্তান আল্লাহ সমীপে উপস্থিত হইবে এই অবস্থায় যে, সে কেননা কোন গুনাহ করিয়াছে। ইচ্ছা করিলে তিনি তাহাকে আযাব দিবেন অথবা দয়া করিবেন, কিন্তু ইয়াহইয়া ইব্‌ন যাকারিয়‍্যা (ব্যতিক্রম)। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলিতেছেন, নেতা ও স্ত্রী-বিরাগী” (তাফসীরে ইবন কাছীর, ৯খ, ৩৬১; বিদায়া ২খ, ৫১; রূহুল মা'আনী ২/২খ, ১৪৮; মাজহারী, ২খ, ৪৬)।
ইবন 'আব্বাস (রা) প্রমুখের বরাতে কেহ কেহ ইয়াহইয়া (আ)-এর বীর্যশূন্য বা বীর্যপাতে অক্ষম অথবা পুরুষত্ব রহিত ও সহবাসে অক্ষম হওয়ার কথা বলিয়াছেন। বিশেষজ্ঞ মুফাসসিরগণ কঠোর ভাষায় উহা খণ্ডন করিয়া বলিয়াছেন যে, আল্লাহ তা'আলা হাসূর শব্দটি ইয়াহইয়া (আ)-এর প্রশংসাসূচক গুণরূপে উল্লেখ করিয়াছেন। আর পুরুষত্বহীনতা ইত্যাদি পুরুষের জন্য দূষণীয়, উহা গুণবাচক নহে। আল্লামা সীউহারুবী লিখিয়াছেন, "আমাদের মতে এই সকল অর্থ অভিন্ন মৌলিক বিষয়ের বিভিন্ন ব্যাখ্যা। কেননা অভিধানে حصر ধাতুমূলটির অর্থ বাধা-বিপত্তি বা রুদ্ধতা এবং حصور উহার অতিশয়ার্থবোধক কর্তৃরূপ। সুতরাং এখানে অর্থ হইবে, যে সকল বিষয় হইতে বিরত থাকা বা উহাতে সংযম অবলম্বন করা আল্লাহ তা'আলার বিধানে অপরিহার্য উহা হইতে বিরত ব্যক্তিকেই 'হাসূর' বলা হয়। যেহেতু ইয়াহইয়া (আ)-এর মধ্যে উল্লিখিত বিষয়াদি সামগ্রিকরূপে বিদ্যমান ছিল, সুতরাং শব্দটির সমস্ত অর্থই পূর্ণরূপে তাঁহার জন্য প্রযোজ্য হইবে। এখানে خصور শব্দের অপর অর্থ পুরুষত্বহীনতা হইতেই পারেনা। কেননা এই অর্থটি পুরুষের জন্য প্রশংসা সূচক নহে, বরং উহা অপূর্ণতা ও দোষরূপে বিবেচিত অথবা শব্দটি এখানে ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর প্রশংসারূপে উল্লিখিত হইয়াছে। এই কারণে বিশেষজ্ঞ মুফাসসিরগণ ঐ অর্থটি প্রত্যাখ্যান করিয়াছেন। কাযী ইয়ায তাঁহার প্রসিদ্ধ 'আশ-শিফা' গ্রন্থে এবং খাফাজী উক্ত গ্রন্থের ব্যাখ্যাগ্রন্থ নাসীমুর রিয়াদ-এ উক্ত অর্থটির কঠোর সমালোচনাপূর্বক অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে উহাকে বাতিল সাব্যস্ত করিয়াছেন, বরঞ্চ কাম শক্তি বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও উহাকে নিয়ন্ত্রিত রাখিবার ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলার বিশিষ্ট বান্দাগণ সর্বদা দুইটি পন্থা অবলম্বন করিয়াছেন। প্রথমত, কুমার জীবন গ্রহণ করিয়া চূড়ান্ত সাধনা ও অধ্যাবসায়ের মাধ্যমে কাম চাহিদাকে চিরতরে প্রদমিত করিয়া রাখা এবং উহাকে শূন্যের কোঠায় পৌঁছাইয়া দেওয়া, যাহা হযরত ঈসা (আ)-এর জীবন ধারায় সমুজ্জ্বলরূপে লক্ষণীয়। আর ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সাধনা ব্যতিরেকে জন্মকালেই আল্লাহ তা'আলা এই বিষয়টি দান করিয়াছিলেন। দ্বিতীয় পদ্ধতি কামশক্তিকে নির্মূল না করিয়া উহা সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ণ রাখিয়া বৈধ ক্ষেত্রসমূহে উহা ব্যবহার করা এবং অবৈধ কোনও ক্ষেত্রে ব্যবহার না করিবার ব্যাপারে নিজেকে এমন পূর্ণাংগ নিয়ন্ত্রণে রাখা যে, কখনও এক মুহূর্তের জন্যও যেন উহার নিয়ন্ত্রণে শিথিলতা সৃষ্টি না হয়। উল্লেখ্য যে, মানব বংশধারা ও সামাজিক জীবনধারা রক্ষার খাতিরে নবী-রাসূলগণ সাধারণত এই দ্বিতীয় পন্থার অনুসারী ছিলেন। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে ও বিশেষ পরিস্থিতির কারণে কোন কোন নবী-রাসূলের ক্ষেত্রে ইহার ব্যতিক্রম ঘটিয়াছে (কাসাসুল কুরআন, ২খ, ২৬৪, ২৬৫)।
পবিত্র কুরআনে ইয়াহইয়া (আ)-এর বিশেষণরূপে উল্লিখিত হইয়াছে:
ওয়াস সালামু আলাইহি ইয়াওমা ওয়ালিদা ওয়া ইয়াওমা ইয়ামূতু ওয়া ইয়াওমা ইউব'আছু হাইয়্যা।
"তাহার প্রতি 'সালাম' তাহার জন্মদিনে, তাহার মৃত্যুদিবসে এবং যে দিন তাহাকে পুনরুত্থিত করা হইবে" (১৯: ১৫)।
সালাম শব্দের অর্থ শান্তি ও নিরাপত্তা। তাবারী বলিয়াছেন, মানব শিশুর জন্মকালে শয়তান তাহাকে যে নির্যাতন করে উহা হইতে ইয়াহইয়া (আ)-এর জন্য আল্লাহ তা'আলা তাঁহার পক্ষ হইতে নিরাপত্তার ঘোষণা দিলেন )يوم ولد(। অদ্রূপ মৃত্যুবরণ কালে পৃথিবী ত্যাগের কষ্ট ও কবরের আযাব হইতে নিরাপত্তা )يَوْمَ يَمُوتُ( এবং কিয়ামতে পুনরুত্থানকালে হাশর ময়দানের ভয়াবহতা ও জাহান্নামের আযাব হইতে নিরাপত্তা )وَيَوْمَ يُبْعَثُ حَيًّا( )রূহুল মা'আনী, ৮/২খ, ৭৩; বরাত, তাফসীরে তাবারী, ৮/২খ, ৪৫; মাজহারী, ৬খ, ৮৬)। ইবন আতিয়‍্যা, সুফয়ান ইবন 'উয়ায়না ও ইন্ন কাছীর বলিয়াছেন, জন্ম, মৃত্যু ও কিয়ামতে পুনরুত্থান এই তিনটি সময় মানুষের জন্য অত্যন্ত ভয়াবহ। এই ভয়াবহতা হইতে আল্লাহ ইয়াহইয়া (আ)-কে নিরাপত্তা দান করিয়াছেন (তাবারী, ৮/২খ, ৭৬; মুখতাসার ইব্‌ন কাছীর, ২খ, ৪৪৫; তাফসীরে ইব্‌ন্ন কাছীর, ৩খ, ১১৪; বিদায়া, ২খ, ৫০; মাজহারী, ৬খ, ৮৬; রূহুল মা'আনী, ৮/২খ, ৭০)। তবে ইন্ন 'আতিয়্যা এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ভিন্নমত পোষণ করিয়া 'সালাম' অর্থ পারিভাষিক সালাম (অর্থাৎ আসসালামু আলায়কুম) বলিয়াছেন। কেননা উহাতে নিরাপত্তার অর্থের চাইতে অধিক মর্যাদার প্রকাশ রহিয়াছে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর বৈশিষ্ট্যময় জীবনধারা

📄 ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর বৈশিষ্ট্যময় জীবনধারা


পবিত্র কুরআনে বর্ণিত 'হাসূর' গুণের প্রতিফলনস্বরূপ ইয়াহইয়া (আ) আজীবন অন্ন-বস্ত্র ও বাসস্থানের ব্যাপারে দরবেশী জীবন যাপন করিয়াছেন। শৈশব হইতেই তিনি ছিলেন গৃহহারা এবং তাঁহার অবস্থান ছিল জর্দান নদীর তীরবর্তী বনে-জংগলে। দীন প্রচারের কাজও তিনি বনে-জংগলে ও জর্দান তীরে করিয়াছেন। নাজ্জার ও ইব্‌ন কাছীর প্রমুখ ইসরাঈলী বর্ণনার বরাতে লিখিয়াছেন, ইয়াহ্ইয়া (আ) একাকী ও মানব সমাজ হইতে দূরে নির্জন জীবন যাপন পসন্দ করিতেন। তাঁহার জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়াছে প্রান্তরে ও বনে-জংগলে। তাঁহার খাদ্য ছিল ঘাস, গাছের পাতা এবং কাহারও মতে যবের রুটি (আল-কামিল, ১খ, ২৩০) ও নদীর পানি। তাঁহার পোশাক ছিল উটের পশমের তৈরী। তাঁহার কোন বাসগৃহ ছিল না, সহায়-সম্পদ ও কোন দাস-দাসী ছিল না। যেখানেই রাত্রির আগমন হইত সেখানেই রাত্রি যাপন করিতেন। তাহার পরও তিনি নিজেকে বলিতেন, 'ইয়াহ্ইয়া'! তোমার চাইতে সুখী জীবন আর কাহার আছে? ইন্ন শিহাব যুহরী বলেন, আবু ইদরীস খাওলানী একদিন তাঁহার ওয়াজে উপস্থিত লোকদিগকে বলিলেন, ইয়াহইয়া ইব্‌ন যাকারিয়‍্যা (আ) ছিলেন মানব কুলের মধ্যে সর্বাধিক পবিত্র খাদ্য গ্রহণকারী; মানুষদের সহিত মিলিয়া মিশিয়া জীবন যাপন করিতে হইবে এই আশংকায় তিনি বন্য পশুর সহিত খাদ্য গ্রহণ করিতেন (নাজ্জার, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৩৬৯; বিদায়া, ২খ, ৫১, ৫৩; আল-কামিল, ১খ, ২৩০; কাসাসুন নাবিয়্যীন, ২খ, ২৬৯; আম্বিয়ায়ে কুরআন, ৩খ, ২৮৬, ২৮৪)।
বাইবেলে তাঁহার খাদ্য ও পোশাক সম্পর্কে বলা হইয়াছে, "যোহন উটের লোমের কাপড় পরিতেন, তাঁহার কটিদেশে চর্মপটুক (বেল্ট) ও তাঁহার খাদ্য পংগপাল ও বনমধু ছিল" (মথি, ৩ঃ ৪; মার্ক, ১ঃ ৬ এও অনুরূপ বর্ণনা রহিয়াছে)।
তাঁহার অবস্থান ক্ষেত্র সম্পর্কে বাইবেলের বর্ণনা "পরে বালকটি (ইয়াহ্ইয়া) বাড়িয়া উঠিতে এবং আত্মায় বলবান হইতে লাগিল; আর সে যতদিন ইস্রায়েলের নিকটে প্রকাশিত না হইল, তত দিন প্রান্তরে ছিল" (লুক, ১ঃ৮০)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর হৃদয়ের কোমলতা ও প্রচণ্ড আল্লাহভীরুতা

📄 ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর হৃদয়ের কোমলতা ও প্রচণ্ড আল্লাহভীরুতা


ইবন 'আসাকির ওয়াহ্ব ইবন মুনাব্বিহ হইতে এবং ইবনুল মুবারক উহায়ব ইবনুল ওয়াবুদ হইতে বর্ণনা কারিয়াছেন, ইয়াহইয়া (আ) অত্যন্ত কোমলপ্রাণ ছিলেন এবং প্রচণ্ড আল্লাহ ভীতির কারণে সর্বদা ক্রন্দন করিতেন। এমন কি কাঁদিতে কাঁদিতে তাঁহার গণ্ডদেশে অশ্রুরেখার দাগ বসিয়া গিয়াছিল এবং তাঁহার মাড়ি উন্মুক্ত হইয়া গিয়াছিল (আল-কামিল, ১খ, ২৩০)।
একবার পিতা যাকারিয়‍্যা (আ) তাঁহাকে খুঁজিবার জন্য প্রান্তরে আসিলেন এবং অনেক খোঁজাখুঁজির পর দেখিলেন যে, তিনি একটি কবর খনন করিয়া উহার মধ্যে বসিয়া কাঁদিতেছেন। পিতা বলিলেন, প্রাণপ্রিয় পুত্র! আমরা তোমার অদর্শনে অস্থির আর তুমি এইভাবে কাঁদিয়া জীবন কাটাইতেছ? ইয়াহ্ইয়া (আ) বলিলেন, আব্বাজান! আপনিই তো আমাকে বলিয়াছেন যে, জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী স্থানে এমন একটি বিশাল মরু প্রান্তর রহিয়াছে যাহা আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দনকারীদের চোখের অশ্রু ব্যতীত অতিক্রম করা যাইবে না এবং জান্নাতে পৌঁছান যাইবে না। যাকারিয়‍্যা (আ) বলিলেন, পুত্র! কাঁদ এবং উভয়ে একসংগে কাঁদিতে লাগিলেন (বিদায়া, ২খ, ৫৩; কাসাসুন নাবিয়‍্যীন, ২খ, ২৬৯, ২৭০; আম্বিয়ায়ে কুরআন, ৩খ, ২৮৪)। আল জাযারীর বর্ণনায় তাঁহার মাতা তাঁহার নিকট আসিলেন এবং যাকারিয়‍্যা (আ) ও বিদ্বানগণ (আহ্বার) তাঁহার খোঁজে বাহির হইলেন..... ইহার পরবর্তী সময়ে যাকারিয়া (আ) পুত্র ইয়াহইয়া (আ)-এর উপস্থিতকালে ওয়াজ করিলে জান্নাত-জাহান্নামের আলোচনা করিতেন না (আল-কামিল, ১খ, ২৩০)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ইয়াহইয়া (আ)-এর নবুওয়াত ও নবুওয়াতী কর্মধারা

📄 ইয়াহইয়া (আ)-এর নবুওয়াত ও নবুওয়াতী কর্মধারা


ইয়াহুদীরা তাহাদের বদ প্রকৃতির ধারায় ইয়াহইয়া (আ)-এর নবুওয়াতের স্বীকৃতি প্রদান করে নাই। খৃস্টানরা যাকারিয়‍্যা (আ)-কে 'যাজক' সাবস্ত করে এবং ইয়াহ্ইয়া (আ)-কে হযরত ঈসা (যীশু) (আ)-এর অগ্রবর্তী ঘোষক সাব্যস্ত করে। পবিত্র কুরআনের একাধিক আয়াতে তাঁহাদের উভয়কে বিশিষ্ট নবীগণের তালিকাভুক্তরূপে উল্লেখ করা হইয়াছে (পূর্ব উদ্ধৃতি দ্র.) এবং বিশেষভাবে সূরা আল ইমরানে (৩: ৩৯) স্পষ্ট ভাষায় ইয়াহ্ইয়া (আ) কে নবী (وَنَبَيًا من الصلحين) বলা হইয়াছে। ইহা ছাড়া সূরা মারয়ামের فَخُذِ الكتاب بقوة “হে ইয়াহ্ইয়া। কিতাব (তাওরাত) শক্ত করিয়া ধারণ কর" (১৯; ১২) দ্বারাও তাঁহার নবী হওয়ার ইংগিত পাওয়া যায়।
উল্লিখিত ১৯:১২ আয়াতের وَآتَيْنُهُ الْحُكْمَ صَبِيًّا “শৈশবেই আমি তাহাকে 'হিকমত' দান করিয়াছি” দ্বারা কোন কোন মুফাসসির ও ঐতিহাসিক শিশু বয়সে (২/৩/৭/৯ বৎসর) তাঁহার নবুওয়াত লাভের অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন (ফাতহুল বারী, ৬খ, ৫৪০; আল-কামিল, ১খ, ২৩০; মাজহারী, ৩খ, ৮৬ ও অন্যান্য)। কিন্তু মুফাসসিরগণ এ আয়াত দ্বারা শৈশবে তাওরাত মুখস্ত করিবার (মাজহারী, ৬খ, ৮৬) মত পোষণ করিয়া প্রাপ্ত বয়সে নবুওয়াত লাভের অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন। তবে নবুওয়াতের সাধারণ বয়সসীমা চল্লিশ বৎসরের পূর্বেই (ত্রিশ বৎসর বয়সে যেহেতু তাঁহার ওফাত (শাহাদাত) হইয়াছিল (পরে দ্র.) সে কারণে মুফসসিরগণ ত্রিশ বৎসর বয়সের পূর্বে তাঁহার নবুওয়াত লাভের কথা বলিয়াছেন (নাজ্জার, কাসাসুল আম্বিয়া, ৩৬৯)
ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর নবুওয়াতী কর্মধারাকে দুইটি মৌলিক পর্যায়ে বিভক্ত করা যায়: (ক) হযরত মূসা (আ)-এর শরী'আতের পুনরুজ্জীবন তথা তাওরাতের শিক্ষা বিস্তার, (খ) হযরত ঈসা (আ)-এর সুসংবাদ প্রদান ও পথ প্রস্তুতকরণ এবং তাঁহার সত্যায়ন ও অনুসরণ।
ইয়া'কূব বংশধর তথা বনী ইস্রাঈলের উত্তরাধিকারী ও তত্ত্বাবধায়ক সন্তানের জন্য যাকারিয়‍্যা (আ)-এর দু'আ এবং আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হইতে তৎক্ষণাৎ মঞ্জুরী দ্বারা বুঝা যায় যে, ইয়াহ্ইয়া (আ) কে মূসা (আ)-এর শরী'আতের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা এবং তাওরাতের শিক্ষা পুনরুজ্জীবিত করিবার জন্যই নবুওয়াতের দায়িত্ব অর্পণ করা হইয়াছিল। ইহা ছাড়া )ইয়াহ্ইয়া! দৃঢ়তার সহিত কিতাব ধারণ কর)-এর ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণ প্রায় সর্বসম্মতরূপে কিতাব দ্বারা তাওরাত বুঝানো হইয়াছে বলিয়া অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন (ইব্‌ন কাছীর, ৩খ, ১১৩)। ইহা দ্বারা তাওরাতের শিক্ষা বিস্তার ও বাস্তবায়ন তাঁহার অন্যতম দায়িত্ব হওয়া বুঝা যায়। ইবন ইসহাক বলেন, যাকারিয়‍্যা (আ) ও তাঁহার পুত্র ইয়াহ্ইয়া (আ) ছিলেন ঈসা (আ)-এর আগমনের পূর্বে বনী ইসরাঈলের জন্য প্রেরিত নবীগণের শেষ পর্যায়ের (ফাতহুল বারী, ৬খ, ৫৪০)।
ইয়াহইয়া (আ)-এর নবুওয়াতী দায়িত্বের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল হযরত ঈসা (আ)-এর সত্যায়ন। পবিত্র কুরআনে তাঁহার পরিচিতির বিবরণ তাঁহার অন্যতম গুণরূপে উল্লিখিত হইয়াছে : হে যাকারিয়‍্যা! আল্লাহ তোমাকে সুসংবাদ দিতেছেন পুত্র ইয়াহ্ইয়ার, যে হইবে 'আল্লাহ্র কলেমার' সত্যায়নকারী। 'আল্লাহ্ কলেমা' অর্থ ইবন 'আব্বাস (রা), মুজাহিদ, কাতাদা এবং অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে ঈসা (আ) (কুরতুবী, ২/২খ, ৭৬; রূহুল মা'আনী, ২/১খ., ১৪৭; আল-কামিল, ১খ., ২২৯ ও অন্যান্য)। কেননা পবিত্র কুরআনের একাধিক আয়াতে ঈসা (আ)-কে আল্লাহর কলেমা অভিধায় অভিহিত করা করা হইয়াছে।
মূলত তাওরাত যুগের শেষ ও ইনজীল যুগের সূচনা সন্ধিক্ষণে আগমনের কারণে ইয়াহইয়া (আ) ছিলেন দুইটি যুগের সমন্বয়কারী এবং সেই কারণে তিনি একাধারে তাওরাত অনুসারী বনী ইসরাঈলের শেষ নবী এবং ইনজীলের বাহক হযরত ঈসা (আ)-কে সত্যায়নকারী, তাঁহার অগ্রবর্তী 'পথ প্রস্তুতকারী' ও তাঁহার বিশিষ্ট দ্বাদশ শিষ্যের (হাওয়ারী) অন্যতম।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00