📄 ইয়াহইয়া (আ)-এর বংশধার ও পিতৃ-মাতৃ পরিচয়
পবিত্র কুরআনে নবীগণের তালিকায় হযরত ইয়াহ্ইয়া (আ) ও তাঁহার পিতা হযরত যাকারিয়্যা (আ)-এর উল্লেখ রহিয়াছে। কিন্তু পবিত্র কুরআনে এবং বাইবেলের কোন পুস্তকেই ইয়াহয়া (আ) ও তাঁহার পিতা যাকারিয়্যা (আ)-এর বংশধারার উল্লেখ নাই। তবে বাইবেলে যাকারিয়্যা ইবন বারখিয়্যা ইদ্দোর পৌত্র, বেরিখিয়ের পুত্র সখরিয় নামে একজন ভাববাদী ও তাহার পুস্তক সংকলিত হইয়াছে, যিনি রাজা দারিয়ুসের (দারিয়াবস-দ্র. সখরিয় পুস্তক ১ঃ১) যুগের নবী ছিলেন এবং যাহার পুস্তকের নবম অধ্যায়ে হযরত উমার (রা)-এর বিজয়ী বেশে সন্ধি স্থাপনের উদ্দেশ্যে জেরুসালেমে প্রবেশের ভবিষ্যদ্বাণী রহিয়াছে (দ্র.সখরিয়, ৯৪ ৯)। কিন্তু ইনি ইয়াহইয়া (আ)-এর পিতা যাকারিয়্যা নহেন। কেননা রাজা দারিয়ুসের সময়কাল ছিল ঈসা (আ)-এর প্রায় তিন শতাব্দী পূর্বে (কাসাসুল আম্বিয়া, ৩৬৮) "এবং দারা ইন্ন গেস্টাসব-এর সময়কাল ছিল হযরত ঈসা (আ)-এর জন্মের পাঁচ শত বৎসর পূর্বে। কেননা দারা রাজা মনোনীত হইয়াছিল কায়েকোবাদ ইব্ন কায়খসরুর মৃত্যুর পরে খৃ.পৃ. ৫১২ সনে। অথচ পবিত্র কুরআনে উল্লিখিত যাকারিয়া (আ) ছিলেন ঈসা (আ)-এর মাতা মরয়ামের অভিভাবক ও তাঁহার প্রায় সমসাময়িক এবং যাকারিয়্যা (আ), তদীয় পূত্র ইয়াহইয়া (আ) এবং ঈসা (আ)-এর মধ্যবর্তী সময়ে অন্য কোন নবীর আগমন ঘটে নাই (কাসাসুল কুরআন, ২খ, ২৪৯, ২৫০; বরাত, ফাতহুল বারী, ৬খ, ৩৬৫)। তবে এতটুকু বুঝা যায় যে, ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর পিতা যাকারিয়্যা (আ) ইয়াহুদীদের দৃষ্টিতে 'হায়কাল' (বায়তুল মুকাদ্দাস)-এর বিশিষ্ট খাদিম ও যাজক ছিলেন। এই হিসাবে তিনি লেবী (ইবন ইয়াকূব)-এর বংশধর হইবেন।..... এবং যাকারিয়া (আ) ঈসা (আ)-এর মাতা মারয়ামের খালু ছিলেন (কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৩৬৮)।
ইয়াহুদীরা ইয়াহইয়া (আ)-কে আস্বীকার করে এবং খৃস্টানরা তাঁহাকে ঈসা (আ)-এর 'ঘোষক' (বার্তাবাহক) সাব্যস্ত করে এবং তাঁহার পিতা যাকারিয়্যা (আ)-কে 'কাহিন' অর্থাৎ ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদির নেতা (যাজক) মান্য করে (কাসাসুল কুরআন, ২খ, ২৭৫)। বাইবেলে লুক পুস্তকে যাকারিয়্যা (আ)-কে 'কাহিন' বলা হইয়াছে: "যিহুদিয়ার রাজা হেরোদের সময়ে অবিয়ের পালার মধ্যে সখরিয় নামে একজন যাজক ছিলেন; তাহার স্ত্রী হারোন বংশীয়া, তাঁহার নাম ইলীশাবেৎ। তাহারা দুইজন সদাপ্রভুর সাক্ষাতে ধার্মিক ছিলেন, প্রভুর সমস্ত আশা ও বিধি অনুসারে নির্দোষরূপে চলিতেন। তাহাদের সন্তান ছিল না। কেননা ইলীশাবেৎ বন্ধ্যা ছিলেন এবং দুইজনেরই অধিক বয়স হইয়াছিল" (লুক, ১ঃ ৫-৭)। তবে বার্নাবাসের বাইবেলে তাঁহার নবী হওয়ার কথা স্পষ্ট ভাষায় বিবৃত হইয়াছে। ঈসা (আ) ইয়াহুদীদিগকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, "সেই সময় নিকটবর্তী যখন তোমাদিগের উপরে নবীগণের রক্তের দায় ও উহার অভিসম্পাত আগত হইবে, যাকারিয়্যা ইবন বারখিয়া পর্যন্ত যাহাদিগকে তোমরা হত্যা করিয়াছিলে" (কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ.৩৬৮; কাসাসুল কুরআন, ২খ, ২৫১)। ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর পিতামহ অর্থাৎ যাকারিয়্যা (আ)-এর পিতার নামের ব্যাপারে ঐতিহাসিকগণের বিভিন্ন উক্তি রহিয়াছে। ইব্ন আসাকির তাঁহার প্রসিদ্ধ ইতিহাসগ্রন্থ আল-হাফিল-এ সেই সকল উক্তি উল্লেখ করিয়াছেন এবং হাফিজ ইব্ন হাজার ফাতহুল বারীতে এবং আল্লামা ইব্ন কাছীর তাঁহার তাফসীর ও তারীখ আল-বিদায়া গ্রন্থে উহা উদ্ধৃত করিয়াছেন। তাঁহাদের বর্ণনামতে ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর বংশধারা নিম্নরূপঃ ইয়াহইয়া ইব্ন যাকারিয়্যা ইন্ন উদ্ন্ন (দান) উয়ন (মাজহারী, ২খ, ৪৩) লুদ/শাব্বী/বারখিয়া অথবা ইব্ন আবী ইন্ন বারখিয়া ইব্ন মুসলিম ইবন সাদুক (সাদুন, মাজহারী, ২খ,৪৩) ইব্ন হাশবান/জাশান ইব্ন দাউদ সুলায়মান ইব্ন মুসলিম ইব্ন সুদায়কা ইব্ বারখিয়া ইব্ন বাল'আতা ইব্ন নাহুর ইব্ন শালুম ইন্ন বাহফাশাত ইব্ন ঈয়ামিন ইব্ন রাহবয়াম ইন্ন সুলায়মান ইব্ন দাউদ আলায়হিমুস সালাম (বিদায়া, ২খ, ৪৭; ফাতহুল বারী, ৬খ, ৫৪১; কাসাসুল কুরআন, ২খ, ২৫০; বরাত ফাতহুল বারী)। তারীখে ইন্ন কাছীর এবং সাধারণভাবে ঐতিহাসিকগণ ইয়াহইয়া ইব্ন যাকারিয়্যা ইন্ন বারখিয়্যা বলিয়াছেন (দ্র. নাজ্জার, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ ৩৬৮; আল-কামিল ১খ, ২২৮)। মাসউদী তাঁহার মুরূজুয যাহাব গ্রন্থে বলিয়াছেন, যাকারিয়্যা ইব্ন আদাকু ইয়াহুদার গোষ্ঠীভুক্ত দাউদ (আ)-এর বংশধর। ইন্ন কুতায়বা তাঁহার আল-মা'আরিফে লিখিয়াছেন, যাকারিয়্যা ইব্ন আযান/উয়ন ইয়াহুদা গোষ্ঠীভুক্ত দাউদ (আ)-এর বংশধর (আল-বিদায়া, ২খ, ৫৬, টীকা ১)।
ইবন হাজার লিখিয়াছেন, যাকারিয়্যা ...... এবং মারয়াম বিনতে ইমরান ইব্ন নাশী উভয়ই সুলায়মান ইব্ন দাউদের (আ) বংশধর। (কেননা), মারয়ামের মাতা হান্না বিনতে ফাকৃষ্ণ ইব্ কুনবুল এবং তাঁহার ভগ্নী ইয়াহয়ার মাতা ঈশা বিনতে ফাকৃষ্ণ। ইবন ইসহাক তাঁহার আল-মুরতাদা গ্রন্থে বলিয়াছেন, হান্না ছিল ইমরানের স্ত্রী এবং তাহার ভগ্নী ছিল যাকারিয়্যার স্ত্রী (ফাতহুল কারী, ৬খ, ৫৪০)। যাকারিয়্যা (আ) দাউদ (আ)-এর বংশধর ছিলেন এবং তাঁহার স্ত্রী ঈশা বা আল-ইয়াশা ছিলেন হারুন (আ)-এর বংশধর (কাসাসুল কুরআন, ২খ, ২৫১; বয়াত ফাতহুল বারী, ৬খ, তারীখে ইন্ন কাছীর ২খ)। পূর্বোক্ত বর্ণনায় উভয়কে সুলায়মান ইন্ন দাউদের (আ) বংশধর এবং অত্র বর্ণনায় যাকারিয়্যা (আ)-কে দাউদ (আ)-এর বংশধর ও তাহার স্ত্রীকে হারুন (আ)-এর বংশধর বলার বাহ্য বিরোধের সমন্বয় এই যে, উভয়ই সর্বোচ্চ ঊর্ধ পুরুষ বিচারে ইয়া'কূব (আ)-এর বংশধর ছিলেন। তবে যাকারিয়্যা (আ) ছিলেন মূসা (আ)-এর ভাই হারূনের বংশধর এবং হারূন ও মূসা (আ) লাবী ইব্ন ইয়া'কূব (আ)-এর বংশধর। আর মারয়ামের মাতা হান্না বিনতে ফাকৃয ও তাহার ভগ্নী ঈশা বিনতে ফাকৃয যাকারিয়্যা (আ)-এর স্ত্রী ও ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর মাতা এবং মতান্তরে মারয়াম বিনতে ইমরান ও তাঁহার ভগ্নী ঈশা বিনতে ইমরান ছিলেন সুলায়মান ইব্ন দাউদ (আ)-এর বংশধর এবং দাউদ (আ) ইয়াহুয়া ইব্ন্ন ইয়া'কূব (আ)-এর বংশধর। মোটকথা তাহারা সুলায়মান ইব্ন দাউদ (আ)-এর বংশধর হওয়া সর্বস্বীকৃত (বিদায়া ২খ, ৫৭, টীকা, ৩; আল-কামিল, ১খ, ২২৮; কাসাসুল কুরআন, ২খ, ২৫০)। ইয়াহইয়া (আ)-এর মাতা ঈশা মারয়াম বিনতে ইমরানের ভগ্নী ছিলেন অথবা মারয়ামের খালা অর্থাৎ তাহার মাতা হান্না বিনতে ফাকৃষ্ণের ভগ্নী ছিলেন, ইহাতে ঐতিহাসিকদের ভিন্নমত রহিয়াছে। সুহায়লী বলিয়াছেন, যাকারিয়্যা (আ)-এর স্ত্রী ঈশা বিনতে ফাকৃয হইলেন মারয়ামের মাতা হান্না বিনতে ফাকৃষের ভগ্নী। এই বক্তব্য তাবারীর। উতবী বলিয়াছেন, যাকারিয়্যা (আ)-এর স্ত্রী হইলেন ঈশা বিনতে ইমরান। এই বক্তব্য অনুসারে ইয়াহইয়া (আ) প্রত্যক্ষরূপে 'ঈসা (আ)-এর খালাত ভাই হইবেন (মুখতাসার ইব্ন কাছীর, ২খ, ৪৪৩, টীকা নং ২; আরও দ্র. বিদায়া, ২খ, ৫৭, টীকা ৩; আল-কামিল, ১খ, ২২৮)।
টিকাঃ
১. বার্নাবাসের বাইবেল পুস্তক বাইবেলের (নূতন নিয়ম) প্রসিদ্ধ চার পুস্তকের অতিরিক্ত পঞ্চম পুস্তক, যাহা হযরত ঈসা (আ)-এর অন্যতম 'হাওয়ারী' বার্নাবাসের নামের সহিত সম্পৃক্ত। এই ইনজীলটি রোম-এর পোপ সৃট-এর লাইব্রেরীতে সংরক্ষিত ছিল এবং জনৈক পাদ্রী উহার সন্ধান লাভ করিয়া সাধারণ্যে প্রকাশ করিয়া দিয়াছিলেন এবং তিনি ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন। কেননা উহাতে আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের আগমনবার্তা স্পষ্টরূপে বিদ্যমান ছিল (কাসাসুল কুরআন, ২খ., ২৫১, টীকা ৩)।
📄 ইয়াহইয়া (আ)-এর দৈহিক গঠন (হুলিয়া)
আল্লাহ্ প্রদত্ত সুসংবাদ অনুযায়ী যাকারিয়্যা (আ)-এর উত্তরসুরিরূপে ইয়াহ্ইয়া (আ) জন্মলাভ করিলেন। "তাঁহার জন্ম হইলে তাঁহার পিতা তাঁহাকে দেখিতে পাইলেন এক সুশ্রী শিশু, হালকা কেশ, ক্ষুদে ক্ষুদে আংগুলবিশিষ্ট, ভ্রূদ্বয় সংযুক্ত ও ক্ষীণ স্বর বিশিষ্টরূপে এবং শৈশব হইতে আল্লাহর ইবাদতে সক্ষমরূপে” (আল-কামিল, ১খ, ২৩০)।
📄 বাইবেলে ইয়্যাহ্ইয়া (আ)-এর জন্মবৃত্তান্ত
এই সম্পর্কে বলা হইয়াছে, "একদা যখন সখরিয় নিজ পালার অনুক্রমে সদাপ্রভুর সাক্ষাতে যাজকীয় কার্য করিতেছিলেন,.... সমস্ত লোক (মন্দিরের) বাহিরে থাকিয়া প্রার্থনা করিতেছিল, তখন প্রভুর এক দূত ধূপবেদির দক্ষিণ পার্শ্বে দাঁড়াইয়া তাঁহাকে দর্শন দিলেন। দেখিয়া সখরিয় ত্রাসযুক্ত হইলেন, ভয় তাঁহাকে আক্রমণ করিল। কিন্তু দূত তাঁহাকে বলিলেন, সখরিয়, ভয় করিও না, কেননা তোমার মিনতি গ্রাহ্য হইয়াছে, তোমার স্ত্রী ইলীশাবেৎ তোমার জন্য পুত্র প্রসব করিবেন ও তুমি তাহার নাম যোহন রাখিবে।......... তখন সখরিয় দূতকে কহিলেন, কিসে ইহা জানিব? কেননা আমি বৃদ্ধ এবং আমার স্ত্রীরও অধিক বয়স হইয়াছে। দূত উত্তর করিয়া তাঁহাকে কহিলেন, আমি গাব্রিয়েল (জিবরীল), সদাপ্রভুর সম্মুখে দাঁড়াইয়া থাকি, তোমার সহিত কথা কহিবার ও তোমাকে এই সকল বিষয়ের সুসমাচার দিবার জন্য প্রেরিত হইয়াছি। আর দেখ, এই সকল যেদিন ঘটিবে, সেই দিন পর্যন্ত তুমি নীরব থাকিবে; কথা কহিতে পারিবে না;...... আর লোকসকল সখরিয়ের অপেক্ষা করিতেছিল এবং মন্দিরের মধ্যে তাঁহার বিলম্ব হওয়াতে তাহারা আশ্চর্য জ্ঞান করিতে লাগিল। পরে তিনি বাহিরে আসিয়া তাহাদের কাছে কথা কহিতে পারিলেন না; তখন তাহারা বুঝিল যে, মন্দিরের মধ্যে তিনি কোন দর্শন পাইয়াছেন; আর তিনি তাহাদের নিকট নানা সংকেত করিতে থাকলেন এবং বোবা হইয়া রহিলেন।...... এই সময়ের পরে তাঁহার স্ত্রী ইলীশাবেৎ গর্ভবতী হইলেন, আর তিনি পাঁচ মাস আপনাকে সংগোপনে রাখিলেন, বলিলেন, লোকদের মধ্যে আমার (বন্ধ্যা হওয়ার) অপযশ খণ্ডাইবার নিমিত্ত এই সময় দৃষ্টিপাত করিয়া প্রভু আমার প্রতি এইরূপ ব্যবহার করিয়াছেন।....... পরে ইলীশাবেতের প্রসবকাল সম্পূর্ণ হইলে তিনি পুত্র প্রসব করিলেন" (লুক, ১ঃ ৮-১৩, ১৮-২৫, ৫৭)। জিবরীল (আ) যখন মরয়াম (আ)-এর নিকট আগমন করিয়া তাঁহাকে ঈসা (আ)-এর জন্মের সুসংবাদ দিয়াছিলেন তখন তাঁহাকে এই কথাও বলিয়াছিলেন, "আর দেখ, তোমার জ্ঞাতি যে ইলীশাবেৎ, তিনিও বৃদ্ধ বয়সে পুত্র সন্তান গর্ভে ধারণ করিয়াছেন; লোকে তাঁহাকে বন্ধ্যা বলিত, এই তাঁহার ষষ্ঠ মাস" (কাসাসুল কুরআন, ২খ, ২৬২, ২৬৩; বরাত লুক, ১৪ ২৬,৩৬)।
📄 নামকরণ ও ন্যামের বৈশিষ্ট্য
হযরত ইয়াহইয়া (আ)-এর নামের বিশেষ বৈশিষ্ট্য রহিয়াছে। উহা এই যে, এই নামটি স্বয়ং আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ হইতে নির্ধারিত হইয়াছিল এবং তাঁহার জন্মের পূর্বেই উহা বিঘোষিত হইয়াছিল। তদুপরি ইহা ছিল এমন একটি নূতন ও বিরল নাম যাহা ইতোপূর্বে বনূ ইসরাঈল তথা পৃথিবীর কোথাও কাহারও-জন্য রাখা হয় নাই। এই বিষয়ে পবিত্র কুরআনের বর্ণনা أَنَّ اللَّهَ يُبَشِّرُكَ .بيحي "আল্লাহ তোমাকে ইয়াহ্ইয়ার সুসংবাদ দিতেছেন"। یزَكَرِيَّا إِنَّا نُبَشِّرُكَ بِغُلْمٍ اسْمُهُ يَحْيَى لَمْ نَجْعَلْ لَهُ مِنْ قَبْلُ سَمِيًّا . "হে যাকারিয়্যা আমি তোমাকে এমন একটি সন্তানের সুসংবাদ দিতেছি, যাহার নাম হইবে ইয়াহ্ইয়া, এই নামে পূর্বে আমি কাহারও নামকরণ করি নাই" (১৯:৭)।
শব্দটির অর্থ সমনামের অধিকারী। আয়াতের ব্যাখ্যায় ইব্ন আব্বাস (রা), ইকরিমা, কাতাদা, যায়দ ইব্ন আসলাম, সুদ্দী ও কালবী প্রমুখ বলিয়াছেন, ইতোপূর্বে অন্য কাহারও নাম 'ইয়াহ্ইয়া' ছিল না। ইব্ন জারীরও এই মতটি সমর্থন করিয়াছেন (মুখতাসার ইব্ন কাছীর, ২খ, ৪৪৩; কুরতুবী, ৬/১খ, ৮৩; আল-মাসাল, ১খ, ২২৯; ফাতহুল বারী, ৬খ, ৫৩৯; মাজহারী, ৬খ, ৮৪; মা'আরিফুল কুরআন, ৬খ, ১৯; আম্বিয়ায়ে কুরআন, ৩খ, ২৮২; কাসাসুল কুরআন, ২খ, ২৬২)। এই রূপ নামকরণের কারণ ও নামের ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণ বলিয়াছেন, বিরল নাম ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদা প্রকাশ করে। জন্মের পূর্বেই নাম নির্ধারণ দ্বারা ওয়াদার নিশ্চয়তা প্রদান করা হইয়াছে এবং তাঁহাকে মহিমান্বিত করা হইয়াছে। ইব্ন আব্বাস, কাতদা প্রমুখের বর্ণনামতে বিরল ও বিশেষ ধরনের নামকরণ তাঁহার অধিক মর্যাদা ও মাহাত্মেরই পরিচয়। যামাখশারী বলিয়াছেন, ইহা প্রমাণ করে যে, বিরল নামকরণ উহার বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হওয়ার ইঙ্গিতবহ এবং আরবরাও এইরূপ অভিনব নাম রাখাকে প্রশংসনীয় মনে করিত (রূহুল মা'আনী, ৮/২ খ., ৬৫; মাজহারী, ৬খ, ৮৪, ৮৫)। মুফাসসিরদের মতে নামটি অ-আরবী। কেননা, বনূ ইসরাঈলের মধ্যে আরবী নামকরণের ব্যাপক প্রচলন ছিল না। পক্ষান্তরে কেহ কেহ বলিয়াছেন, আরবী ক্রিয়া নাম (বিশেষ্য) রূপে ব্যবহার করা হইয়াছে এবং আরবী হওয়ায় উহা বিরল হওয়ার অন্যতম কারণ। আরবী ক্রিয়াটির অর্থ'বাঁচিয়া থাকিবে' অর্থাৎ যেন যাকারিয়্যা (আ)-এর উত্তরাধিকারী হওয়ার বয়স পর্যন্ত সন্তানটি বাঁচিয়া থাকিবার ইংগিত করা হইয়াছে। বাইবেলে তাঁহার নাম ইউহান্না )يوحنا = যোহন) বলা হইয়াছে। এমন হইতে পারে যে, হিব্রু যূহান্না ও আরবী ইয়াহইয়া সমার্থবোধক অথবা হিব্রু ভাষার যূহান্না আরবীতে 'ইয়াহ্ইয়া' উচ্চারণ পরিগ্রহ করিয়াছ (রূহুল মা'আনী), ৮/২খ, ৬৬; কাসাসুল কুরআন, ২খ, ২৭৫)। নামটির রূপান্তর সম্বন্ধে কেহ বলিয়াছেন যে, নামটি মূলত 'হায়া' ছিল এবং সারা ইিবরাহীম (আ)-এর প্রথম স্ত্রী)-র নাম ছিল 'য়াসারা' অর্থাৎ যে সন্তান জন্ম দেয় না। য়াসারা হইতে সারা বিলুপ্ত করিয়া "ইয়ু"কে 'হায়া'-র পূর্বে যুক্ত করিয়া ইয়াহ্ইয়া বানানো হইয়াছে (কুরতুবী, ২/২খ, ৭৫,৭৬)। নামটির অর্থ বর্ণনায় কাতাদা বলিয়াছেন, এইরূপ নামকরণের কারণ এই যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে ঈমান ও নবুওয়াত দ্বারা 'জীবন্ত' করিয়াছিলেন অথবা তাহার হৃদয়কে ঈমান ও আল্লাহ্র আনুগত্য দ্বারা জীবন্ত করিয়াছিলেন। সুতরাং তিনি কখনও কোন পাপে লিপ্ত হন নাই, এমনকি কোন পাপের ইচ্ছাও করেন নাই। কেহ কেহ বলিয়াছেন, আল্লাহ তা'আলা তাঁহার মাধ্যমে মানব হৃদয়গুলি হিদায়াতের দ্বারা জীবন্ত করিয়াছিলেন। কাহারও মতে তিনি প্রজ্ঞা ও পবিত্রতা দ্বারা জীবন্ত হইয়াছিলেন অথবা মানবজাতিকে হিদায়াত ও সঠিক পথের দিশা দানের মাধ্যমে তিনি 'জীবন্ত' হইয়াছিলেন। ইন্ন'আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত মতে তাঁহার দ্বারা তাঁহার মাতার বন্ধ্যাত্ব অবসান ঘটাইয়া তাহার গর্ভকে জীবন্ত করা হইয়াছিল।। মুকাতিলের মতে আল্লাহ্ নাম 'হণয়্যুন' হইতে নামটি গৃহীত হইয়াছে। কেহ কেহ তাঁহার শাহাদাত মর্যাদা লাভের দ্বারা জীবন্ত হওয়ার কথা বলিয়াছেন (কুরতুবী, ২/২খ, ৭৫; ৬/১খ, ৮২; রূহুল মা'আনী, ৮/২খ, ৬৬; মাজহারী, ২খ, ৪৫)।