📄 পবিত্র কুরআনে হযরত ইয়াহইয়া (আ)
পবিত্র কুরআনের চারটি সূরায় হযরত ইয়াহইয়া (আ)-এর উল্লেখ রহিয়াছে। সূরা আল ইমরানের ৩৭-৪১ নং আয়াত, সূরা আন'আমের ৮৫ নং আয়াত (৮৪-৯০ নং আয়াত একাধিক নবী প্রসংগে), সূরা মারয়ামের ১-১৫ নং আয়াত এবং সূরা আম্বিয়ার ৮৯-৯০ নং আয়াতে তাঁহার জন্ম, নামকরণ প্রসংগ ও অন্যান্য বেশিষ্ট্যের বর্ণনা রহিয়াছে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ, ৫৬; কাসাসুল কুরআন, ২খ, ২৪৯, ২৬২; আম্বিয়ায়ে কুরআন, ৩খ, ২৭৮)। এইসব আয়াতের মধ্যে আল ইমরান ৩৯ নং আয়াত, আন'আম ৮৫, মারয়াম ৭ ও ১২ এবং আম্বিয়া ৯০ নং আয়াতসমূহে তাঁহার নাম ইয়াহইয়া উল্লেখ রহিয়াছে (নাজ্জার, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৩৬৮)।
"এবং যাকারিয়্যা, ইয়াহ্ইয়া ঈসা এবং ইলয়াসকেও সৎপথে পরিচালিত করিয়াছিলাম। ইহারা সকলে সজ্জনদের অন্তর্ভুক্ত” (৬:৮৫)।
"এবং স্মরণ কর যাকারিয়্যার কথা, যখন সে তাহার প্রতিপালককে আহ্বান করিয়া বলিয়াছিল, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে একা (নিঃসন্তান) রাখিও না, তুমি তো শ্রেষ্ঠ মালিকানার অধিকারী। অতঃপর আমি তাহার আহ্বানে সাড়া দিয়াছিলাম এবং তাহাকে দান করিয়াছিলাম 'ইয়াহ্ইয়া' এবং তাহার জন্য তাহার স্ত্রীকে যোগ্যতাসম্পন্ন করিয়াছিলাম। তাহারা সৎকর্মে প্রতিযোগিতা করিত, তাহারা আমাকে ডাকিত আশা ও ভীতির সহিত এবং তাহারা ছিল আমার নিকট বিনীত" (২১:৮৯, ৯০)।
"সেখানেই যাকারিয়্যা তাহার প্রতিপালকের নিকট প্রার্থনা করিয়া বলিল, হে আমার প্রতিপালক। আমাকে তুমি তোমার নিকট হইতে সৎ বংশধর দান কর। নিশ্চয়ই তুমি প্রার্থনা শ্রবণকারী। যখন যাকারিয়্যা কক্ষে সালাতে দাঁড়াইয়াছিল তখন ফেরেশতাগণ তাহাকে সম্বোধন করিয়া বলিল, আল্লাহ তোমাকে ইয়াহ্ইয়ার সুসংবাদ দিতেছেন, সে হইবে আল্লাহর বাণীর সমর্থক, নেতা, স্ত্রী বিরাগী এবং পুণ্যবানদের মধ্যে একজন নবী। সে বলিল, হে আমার প্রতিপালক! আমার পুত্র হইবে কিরূপে? আমার তো বারধক্য আসিয়াছে এবং আমার স্ত্রী বন্ধ্যা। তিনি বলিলেন, এইভাবেই! আল্লাহ যাহা ইচ্ছা তাহা করেন। সে বলিল, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে একটি নিদর্শন দাও। তিনি বলিলেন, তোমার নিদর্শন এই যে, তিন দিন তুমি ইংগিত ব্যতীত কথা বলিতে পারিবে না, আর তোমার প্রতিপালককে অধিক স্মরণ করিবে এবং সন্ধ্যায় ও প্রভাতে তাঁহার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করিবে” (৩ : ৩৭-৪১)।
"ইহা তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহের বিবরণ তাঁহার বান্দা যাকারিয়্যার প্রতি, যখন সে তাহার প্রতিপালককে আহ্বান করিয়াছিল নিভৃতে। সে বলিয়াছিল, হে আমার রব! আমার অস্থি দুর্বল হইয়াছে, বার্ধক্যে আমার মস্তক শুভ্রোজ্জ্বল হইয়াছে। হে আমার প্রতিপালক! তোমাকে আহ্বান করিয়া আমি কখনও ব্যর্থকাম হই নাই। আমি আশংকা করি আমার পর আমার স্বগোত্রীয়দের সম্পর্কে, আর আমার স্ত্রী বন্ধ্যা। সুতরাং তুমি তোমার নিকট হইতে আমাকে দান কর উত্তরাধিকারী, যে আমার উত্তরাধিকারিত্ব করিবে এবং উত্তরাধিকারিত্ব করিবে ইয়া'কৃবের বংশের এবং হে আমার প্রতিপালক! তাহাকে করিও সন্তোষভাজন। তিনি বলিলেন, হে যাকারিয়্যা! আমি তোমাকে এক পুত্রের সুসংবাদ দিতেছি। তাহার নাম হইবে ইয়াহ্ইয়া; এই নামে পূর্বে আমি কাহারও নামকরণ করি নাই। সে বলিল, হে আমার প্রতিপালক! কেমন করিয়া আমার পুত্র হইবে, যখন আমার স্ত্রী বন্ধ্যা ও আমি বার্ধক্যের শেষ সীমায় উপনীত! তিনি বলিলেন, এইরূপেই হইবে। তোমার প্রতিপালক বলিলেন, ইহা আমার জন্য সহজসাধ্য, আমি তো পূর্বে তোমাকে সৃষ্টি করিয়াছি যখন তুমি কিছুই ছিলে না। যাকারিয়্যা বলিল, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে একটি নিদর্শন দাও। তিনি বলিলেন, তোমার নিদর্শন এই যে, তুমি সুস্থ থাকা সত্ত্বেও কাহারও সহিত তিন দিন বাক্যালাপ করিবে না।
অতঃপর সে কক্ষ হইতে বাহির হইয়া তাহার সম্প্রদায়ের নিকট আসিল এবং ইংগিতে তাহদিগকে সকাল-সন্ধ্যা আল্লাহ্ পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করিতে বলিল। হে ইয়াহ্ইয়া! এই কিতাব দৃঢ়তার সহিত গ্রহণ কর। আমি তাহাকে শৈশবেই দান করিয়াছিলাম জ্ঞান এবং আমার নিকট হইতে হৃদয়ের কোমলতা ও পবিত্রতা; সে ছিল মুত্তাকী, পিতা-মাতার অনুগত এবং সে ছিল না উদ্ধত ও অবাধ্য। তাহার প্রতি শান্তি যেদিন সে জন্মলাভ করে, যেদিন তাহার মৃত্যু হইবে এবং যেদিন সে জীবিত অবস্থায় উত্থিত হইবে" (১৯:১২-১৫)।
বাইবেলে হযরত ইয়াহইয়া (আ)-এর জন্ম ও নামের বৈশিষ্ট্যসহ তাঁহার কার্যাবলীর যথেষ্ট বিবরণ পাওয়া যায়। এই সকল বিবরণ রহিয়াছে যিশাইয় পুস্তকের ৪০ নং অধ্যায়ে ও মালাখী পুস্তকের ৩,৪ অধ্যায়ে, মথি পুস্তকে লিখিত ৩,১১, ১৪, ১৬, ১৭, ও ২১ অধ্যায়ে; মার্ক লিখিত পুস্তকের ১, ৬, ৮,৯ ও ১১ অধ্যায়ে; লুক লিখিত পুস্তকের ১, ৩, ৫, ৭, ৯ ও ১১ অধ্যায়ে এবং যোহন লিখিত পুস্তকের ১, ৩, ৪, ও ৫ অধ্যায়সমূহে (দ্র. জামীল আহমাদ, আম্বিয়ায়ে কুরআন, ৩খ, ২৭৮)।
📄 হযরত ইয়াহইয়া (আ)-এর জন্ম
হযরত ঈসা (আ)-এর আগমনের পূর্বে তাঁহার সম্পর্কে ঘোষণাকারী হিসাবে হযরত ইয়াহ্ইয়া (আ) আগমন করেন। পবিত্র কুরআনেও বলা হইয়াছে: "আল্লাহ তোমাকে সুসংবাদ দিতেছেন ইয়াহইয়ার, যে আল্লাহ্ কালেমা'র সত্যায়নকারী হইবে" (৩: ৩৯)। এখানে লক্ষণীয় যে, আল্লাহর বিশেষ কুদরতে সৃষ্টি হওয়ার জারণে পবিত্র কুরআনে হযরত 'ঈসা (আ)-কে 'আল্লাহ্ কালেমা' অভিধায় ভূষিত করা হইয়াছে। মালাখী পুস্তকে (মালাখী পুস্তক, ৩ঃ ১; ৪:৩-৬) যাহাকে 'এলিয়' (ইলয়াস) বলা হইয়াছে তিনিই হযরত ইয়াহইয়া (আ) এবং ইয়াহ্ইয়া (আ) নিজেকে এলিয় দাবি না করিলেও (দ্র. যোহন ১: ২১)। হযরত ঈসা (আ) তাঁহার শিষ্যদের নিকটে ইয়াহইয়া (আ)-এর পরিচয় প্রদান কালে তাঁহাকে এলিয় বলিয়াছেন (দ্র. মথি, ১৭: ১০-১৩)।
হযরত ইয়াহ্ইয়া (আ) ছিলেন পিতা হযরত যাকারিয়্যা (আ)-এর দু'আর ফল এবং তাঁহার জন্মের ঘটনাটি ইতিহাসের অন্যতম বিরল ঘটনা। সম্ভবত এই কারণে পবিত্র কুরআনে যাকারিয়া ও ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর ঘটনা সংযুক্তরূপে ও অভিন্ন আয়াতসমূহে বিবৃত হইয়াছে এবং ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর জন্মের ঘটনা বিশেষ গুরুত্ব সহকারে বর্ণিত হইয়াছে। যাকারিয়্যা (আ) ছিলেন মূসা (আ)-এর তাওরাতের অনুসারী এবং বনী ইসরাঈলের দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্যতম নবী। তাঁহার স্ত্রী ছিলেন বন্ধ্যা এবং বার্ধক্যের সীমায় উপনীত হওয়া পর্যন্ত তাহাদের কোন সন্তান জন্মে নাই। তবে নবী হিসাবে যাকারিয়্যা (আ) আল্লাহর ফয়সালায় পূর্ণ তুষ্ট ছিলেন এবং সন্তান কাম্য বিষয় হওয়া সত্ত্বেও নিঃসন্তান থাকিবার কারণে তাঁহার মনে কোন ক্ষোভ বা দুঃখ ছিল না। কিন্তু তিনি লক্ষ্য করিলেন যে, সমকালীন বনী ইসরাঈলের প্রায় সকলেই অপরাধপ্রবণ ও দুষ্টমতি স্বভাবের (রূহুল মা'আনী, ৮/২খ, ৬১) এবং তাঁহার নিজের কোন সন্তান নাই এবং ঘনিষ্ট আত্মীয়-স্বজনের মধ্যেও এমন কেহ নাই যাহার প্রতি তাঁহার উত্তরসুরিরূপে বনী ইসরাঈলকে দীনের পথে সুষ্ঠরূপে পরিচালিত রাখিবার ব্যাপারে নির্ভর করা যাইতে পারে। সুতরাং তাঁহার অবর্তমানে বনী ইসরাঈলের পথহারা হওয়ার এবং আল্লাহর দীন তাঁহার সন্তুষ্টির পথ হইতে সরিয়া যাওয়ার আশংকায় শংকিত হওয়ার কারণে তাঁহার অন্তরে যোগ্য উত্তরসুরির চাহিদা সৃষ্টি হইল। ইতোমধ্যে অপর একটি বিস্ময়কর ঘটনা তাঁহার এই চাহিদাকে আরও প্রবল করিয়া তুলিল (বিস্তারিত দ্র. 'যাকারিয়্যা' ও 'মারয়াম' নিবন্ধদ্বয়)। উহা এই যে, যাকারিয়্যা (আ)-এর সমকালীন ও তাঁহার আত্মীয়া এবং বায়তুল মুকাদ্দাসের 'যাজক' সম্প্রদায়ের নেতা ইমাম ইব্ন মাছান (অথবা ইমরান ইব্ন নাশী, কাসাসুল কুরআন, ২খ, ২৫৫) দীর্ঘকাল নিঃসন্তান থাকিবার পর তাহার পূণ্যবতী স্ত্রী মানতের সূত্রে সন্তান লাভ করিয়াছিলেন। মাছান পরিবার সমকালীন বনী ইসরাঈলের ধর্মীয়, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত ছিল (মাজহারী, ২খ, ৪১; আল-কামিল, ১খ, ২২৮) এবং যাকারিয়্যা (আ)-ও ইমরান উভয়ই সুলায়মান ইব্ন দাউদ (আ)-এর অধস্তন পুরুষ ছিলেন (ঐ, দ্র.)। এক আবেগঘন মুহূর্তে 'ইমরান-এর পূণ্যবতী স্ত্রী হান্না বিনতে যাকূদ আল্লাহ তা'আলার নিকট সন্তান প্রার্থনা করিলেন (দ্র. মাজহারী, ২খ, ৪১) এবং দু'আ কবুল হওয়ার ফলস্বরূপ গর্ভবতী হইলে গর্ভস্থ সন্তান 'হায়কাল' অর্থাৎ বায়তুল মুকাদ্দাসের খিদমতের জন্য 'মুক্ত' রাখিবার মানত করিলেন (৩: ৩৫)। যথা সময়ে ইমরানের স্ত্রী তাহার কাংখিত পুত্র সন্তানের পরিবর্তে কন্যা সন্তান প্রসব করিলেন এবং তাহার নাম মারয়াম রাখিলেন (৩: ৩৬)। এই মারয়ামই হইলেন আল্লাহ তা'আলার বিশিষ্ট পয়গাম্বর ও রাসূল হযরত ঈসা (আ)-এর মাতা। লটারীর মাধ্যমে এই সন্তানের লালন-পালন ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব দেয়া হয় হযরত যাকারিয়্যা (আ)-কে। প্রথমে মারয়াম খালার নিকট লালিত-পালিত হইলেন এবং এক সময় যাকারিয়্যা (আ) তাহার জন্য মসজিদে (বায়তুল মুকাদ্দাসে) একটি স্বতন্ত্র সুরক্ষিত কক্ষ নির্মাণ করিয়া সেখানে তাহার অবস্থানের ব্যবস্থা করিলেন। যাকারিয়্যা (আ) নিয়মিত তাহার দেখাশুনা করিতেন ও প্রয়োজনীয় খাদ্য-পানীয় প্রভৃতি পৌছাইয়া দিতেন (মাজহারী, ২খ, ৪৩)। কিন্তু যাকারিয়্যা (আ) মারয়ামের এই রুদ্ধদ্বার কক্ষে অ-মৌসুমী ফল-ফলাদির উপস্থিতি দেখিয়া বিস্ময়াভিভূত হইলেন এবং এ বিষয়ে মারয়ামকে জিজ্ঞাসা করিলে তিনি (মারয়াম) জবাব দিলেন:
"উহা আল্লাহ্র নিকট হইতে; আল্লাহ যাহাকে ইচ্ছা বে-হিসাব রিযিক দান করেন" (৩ঃ ৩৭)। তখন তিনি রাব্বুল আলামীনের দরবারে সন্তান লাভের জন্য দু'আ করিলেন। পবিত্র কুরআনের বর্ণনায় : "যাকারিয়া তাহার প্রতিপালকের নিকট দু'আ করিল" (৩ : ৩৮)।
তাফসীরের বর্ণনামতে যাকারিয়্যা (আ) গভীর রাত্রে তাঁহার সংঙ্গী-সাথীদের নিদ্রামগ্ন থাকিবার অবস্থায় সম্প্রদায়ের লোকদের হইতে গোপনে দু'আ করিলেন (তাফসীর ইব্ন্ন কাছীর, ২খ, ৪৪২; কুরতুবী ৬/১খ, ৭৬; আল-বিদায়া, ওয়ান-নিহায়া, ২খ, ৪৮)।
"আমাকে দান করুন আপনার নিকট হইতে সৎ বংশধর" (৩: ৯৮ এবং ১৯:৫)।
এই দু'আ ছিল একজন নবীর এবং উহাও ছিল সম্পূর্ণ ব্যক্তিস্বার্থমুক্ত ও কওমের হিদায়াত ও কল্যাণের লক্ষ্যে নিবেদিত। সুতরাং উহা কবুল হইতে বিলম্ব ঘটিল না। তৎক্ষণাত আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হইতে জবাব আসিল, "হে যাকারিয়্যা! আমি তোমাকে সুসংবাদ দিতেছি এক পুত্র সন্তানের, যাহার নাম হইবে ইয়াহ্ইয়া" (১৯: ৭) এবং ইহার ব্যাখ্যা-মূলক বর্ণনা:
"ফেরেশতারা তাহাকে ডাকিয়া বলিল, তখন সে মিহরাবে সালাত আদায়রত ছিল, আল্লাহ আপনাকে ইয়াহইয়ার সুসংবাদ দিতেছেন" (৩ঃ ৩৯)।
যাকারিয়্যা (আ) সালাতের মধ্যে দু'আ করিয়াছিলেন এবং সালাতে দাঁড়ানো অবস্থায় তাঁহাকে দু'আ কবুলের সুসংবাদ দেওয়া হইল (কুরতুবী ৬/১খ, ৭৬)।
📄 ইয়াহইয়া (আ)-এর বংশধার ও পিতৃ-মাতৃ পরিচয়
পবিত্র কুরআনে নবীগণের তালিকায় হযরত ইয়াহ্ইয়া (আ) ও তাঁহার পিতা হযরত যাকারিয়্যা (আ)-এর উল্লেখ রহিয়াছে। কিন্তু পবিত্র কুরআনে এবং বাইবেলের কোন পুস্তকেই ইয়াহয়া (আ) ও তাঁহার পিতা যাকারিয়্যা (আ)-এর বংশধারার উল্লেখ নাই। তবে বাইবেলে যাকারিয়্যা ইবন বারখিয়্যা ইদ্দোর পৌত্র, বেরিখিয়ের পুত্র সখরিয় নামে একজন ভাববাদী ও তাহার পুস্তক সংকলিত হইয়াছে, যিনি রাজা দারিয়ুসের (দারিয়াবস-দ্র. সখরিয় পুস্তক ১ঃ১) যুগের নবী ছিলেন এবং যাহার পুস্তকের নবম অধ্যায়ে হযরত উমার (রা)-এর বিজয়ী বেশে সন্ধি স্থাপনের উদ্দেশ্যে জেরুসালেমে প্রবেশের ভবিষ্যদ্বাণী রহিয়াছে (দ্র.সখরিয়, ৯৪ ৯)। কিন্তু ইনি ইয়াহইয়া (আ)-এর পিতা যাকারিয়্যা নহেন। কেননা রাজা দারিয়ুসের সময়কাল ছিল ঈসা (আ)-এর প্রায় তিন শতাব্দী পূর্বে (কাসাসুল আম্বিয়া, ৩৬৮) "এবং দারা ইন্ন গেস্টাসব-এর সময়কাল ছিল হযরত ঈসা (আ)-এর জন্মের পাঁচ শত বৎসর পূর্বে। কেননা দারা রাজা মনোনীত হইয়াছিল কায়েকোবাদ ইব্ন কায়খসরুর মৃত্যুর পরে খৃ.পৃ. ৫১২ সনে। অথচ পবিত্র কুরআনে উল্লিখিত যাকারিয়া (আ) ছিলেন ঈসা (আ)-এর মাতা মরয়ামের অভিভাবক ও তাঁহার প্রায় সমসাময়িক এবং যাকারিয়্যা (আ), তদীয় পূত্র ইয়াহইয়া (আ) এবং ঈসা (আ)-এর মধ্যবর্তী সময়ে অন্য কোন নবীর আগমন ঘটে নাই (কাসাসুল কুরআন, ২খ, ২৪৯, ২৫০; বরাত, ফাতহুল বারী, ৬খ, ৩৬৫)। তবে এতটুকু বুঝা যায় যে, ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর পিতা যাকারিয়্যা (আ) ইয়াহুদীদের দৃষ্টিতে 'হায়কাল' (বায়তুল মুকাদ্দাস)-এর বিশিষ্ট খাদিম ও যাজক ছিলেন। এই হিসাবে তিনি লেবী (ইবন ইয়াকূব)-এর বংশধর হইবেন।..... এবং যাকারিয়া (আ) ঈসা (আ)-এর মাতা মারয়ামের খালু ছিলেন (কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৩৬৮)।
ইয়াহুদীরা ইয়াহইয়া (আ)-কে আস্বীকার করে এবং খৃস্টানরা তাঁহাকে ঈসা (আ)-এর 'ঘোষক' (বার্তাবাহক) সাব্যস্ত করে এবং তাঁহার পিতা যাকারিয়্যা (আ)-কে 'কাহিন' অর্থাৎ ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদির নেতা (যাজক) মান্য করে (কাসাসুল কুরআন, ২খ, ২৭৫)। বাইবেলে লুক পুস্তকে যাকারিয়্যা (আ)-কে 'কাহিন' বলা হইয়াছে: "যিহুদিয়ার রাজা হেরোদের সময়ে অবিয়ের পালার মধ্যে সখরিয় নামে একজন যাজক ছিলেন; তাহার স্ত্রী হারোন বংশীয়া, তাঁহার নাম ইলীশাবেৎ। তাহারা দুইজন সদাপ্রভুর সাক্ষাতে ধার্মিক ছিলেন, প্রভুর সমস্ত আশা ও বিধি অনুসারে নির্দোষরূপে চলিতেন। তাহাদের সন্তান ছিল না। কেননা ইলীশাবেৎ বন্ধ্যা ছিলেন এবং দুইজনেরই অধিক বয়স হইয়াছিল" (লুক, ১ঃ ৫-৭)। তবে বার্নাবাসের বাইবেলে তাঁহার নবী হওয়ার কথা স্পষ্ট ভাষায় বিবৃত হইয়াছে। ঈসা (আ) ইয়াহুদীদিগকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, "সেই সময় নিকটবর্তী যখন তোমাদিগের উপরে নবীগণের রক্তের দায় ও উহার অভিসম্পাত আগত হইবে, যাকারিয়্যা ইবন বারখিয়া পর্যন্ত যাহাদিগকে তোমরা হত্যা করিয়াছিলে" (কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ.৩৬৮; কাসাসুল কুরআন, ২খ, ২৫১)। ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর পিতামহ অর্থাৎ যাকারিয়্যা (আ)-এর পিতার নামের ব্যাপারে ঐতিহাসিকগণের বিভিন্ন উক্তি রহিয়াছে। ইব্ন আসাকির তাঁহার প্রসিদ্ধ ইতিহাসগ্রন্থ আল-হাফিল-এ সেই সকল উক্তি উল্লেখ করিয়াছেন এবং হাফিজ ইব্ন হাজার ফাতহুল বারীতে এবং আল্লামা ইব্ন কাছীর তাঁহার তাফসীর ও তারীখ আল-বিদায়া গ্রন্থে উহা উদ্ধৃত করিয়াছেন। তাঁহাদের বর্ণনামতে ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর বংশধারা নিম্নরূপঃ ইয়াহইয়া ইব্ন যাকারিয়্যা ইন্ন উদ্ন্ন (দান) উয়ন (মাজহারী, ২খ, ৪৩) লুদ/শাব্বী/বারখিয়া অথবা ইব্ন আবী ইন্ন বারখিয়া ইব্ন মুসলিম ইবন সাদুক (সাদুন, মাজহারী, ২খ,৪৩) ইব্ন হাশবান/জাশান ইব্ন দাউদ সুলায়মান ইব্ন মুসলিম ইব্ন সুদায়কা ইব্ বারখিয়া ইব্ন বাল'আতা ইব্ন নাহুর ইব্ন শালুম ইন্ন বাহফাশাত ইব্ন ঈয়ামিন ইব্ন রাহবয়াম ইন্ন সুলায়মান ইব্ন দাউদ আলায়হিমুস সালাম (বিদায়া, ২খ, ৪৭; ফাতহুল বারী, ৬খ, ৫৪১; কাসাসুল কুরআন, ২খ, ২৫০; বরাত ফাতহুল বারী)। তারীখে ইন্ন কাছীর এবং সাধারণভাবে ঐতিহাসিকগণ ইয়াহইয়া ইব্ন যাকারিয়্যা ইন্ন বারখিয়্যা বলিয়াছেন (দ্র. নাজ্জার, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ ৩৬৮; আল-কামিল ১খ, ২২৮)। মাসউদী তাঁহার মুরূজুয যাহাব গ্রন্থে বলিয়াছেন, যাকারিয়্যা ইব্ন আদাকু ইয়াহুদার গোষ্ঠীভুক্ত দাউদ (আ)-এর বংশধর। ইন্ন কুতায়বা তাঁহার আল-মা'আরিফে লিখিয়াছেন, যাকারিয়্যা ইব্ন আযান/উয়ন ইয়াহুদা গোষ্ঠীভুক্ত দাউদ (আ)-এর বংশধর (আল-বিদায়া, ২খ, ৫৬, টীকা ১)।
ইবন হাজার লিখিয়াছেন, যাকারিয়্যা ...... এবং মারয়াম বিনতে ইমরান ইব্ন নাশী উভয়ই সুলায়মান ইব্ন দাউদের (আ) বংশধর। (কেননা), মারয়ামের মাতা হান্না বিনতে ফাকৃষ্ণ ইব্ কুনবুল এবং তাঁহার ভগ্নী ইয়াহয়ার মাতা ঈশা বিনতে ফাকৃষ্ণ। ইবন ইসহাক তাঁহার আল-মুরতাদা গ্রন্থে বলিয়াছেন, হান্না ছিল ইমরানের স্ত্রী এবং তাহার ভগ্নী ছিল যাকারিয়্যার স্ত্রী (ফাতহুল কারী, ৬খ, ৫৪০)। যাকারিয়্যা (আ) দাউদ (আ)-এর বংশধর ছিলেন এবং তাঁহার স্ত্রী ঈশা বা আল-ইয়াশা ছিলেন হারুন (আ)-এর বংশধর (কাসাসুল কুরআন, ২খ, ২৫১; বয়াত ফাতহুল বারী, ৬খ, তারীখে ইন্ন কাছীর ২খ)। পূর্বোক্ত বর্ণনায় উভয়কে সুলায়মান ইন্ন দাউদের (আ) বংশধর এবং অত্র বর্ণনায় যাকারিয়্যা (আ)-কে দাউদ (আ)-এর বংশধর ও তাহার স্ত্রীকে হারুন (আ)-এর বংশধর বলার বাহ্য বিরোধের সমন্বয় এই যে, উভয়ই সর্বোচ্চ ঊর্ধ পুরুষ বিচারে ইয়া'কূব (আ)-এর বংশধর ছিলেন। তবে যাকারিয়্যা (আ) ছিলেন মূসা (আ)-এর ভাই হারূনের বংশধর এবং হারূন ও মূসা (আ) লাবী ইব্ন ইয়া'কূব (আ)-এর বংশধর। আর মারয়ামের মাতা হান্না বিনতে ফাকৃয ও তাহার ভগ্নী ঈশা বিনতে ফাকৃয যাকারিয়্যা (আ)-এর স্ত্রী ও ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর মাতা এবং মতান্তরে মারয়াম বিনতে ইমরান ও তাঁহার ভগ্নী ঈশা বিনতে ইমরান ছিলেন সুলায়মান ইব্ন দাউদ (আ)-এর বংশধর এবং দাউদ (আ) ইয়াহুয়া ইব্ন্ন ইয়া'কূব (আ)-এর বংশধর। মোটকথা তাহারা সুলায়মান ইব্ন দাউদ (আ)-এর বংশধর হওয়া সর্বস্বীকৃত (বিদায়া ২খ, ৫৭, টীকা, ৩; আল-কামিল, ১খ, ২২৮; কাসাসুল কুরআন, ২খ, ২৫০)। ইয়াহইয়া (আ)-এর মাতা ঈশা মারয়াম বিনতে ইমরানের ভগ্নী ছিলেন অথবা মারয়ামের খালা অর্থাৎ তাহার মাতা হান্না বিনতে ফাকৃষ্ণের ভগ্নী ছিলেন, ইহাতে ঐতিহাসিকদের ভিন্নমত রহিয়াছে। সুহায়লী বলিয়াছেন, যাকারিয়্যা (আ)-এর স্ত্রী ঈশা বিনতে ফাকৃয হইলেন মারয়ামের মাতা হান্না বিনতে ফাকৃষের ভগ্নী। এই বক্তব্য তাবারীর। উতবী বলিয়াছেন, যাকারিয়্যা (আ)-এর স্ত্রী হইলেন ঈশা বিনতে ইমরান। এই বক্তব্য অনুসারে ইয়াহইয়া (আ) প্রত্যক্ষরূপে 'ঈসা (আ)-এর খালাত ভাই হইবেন (মুখতাসার ইব্ন কাছীর, ২খ, ৪৪৩, টীকা নং ২; আরও দ্র. বিদায়া, ২খ, ৫৭, টীকা ৩; আল-কামিল, ১খ, ২২৮)।
টিকাঃ
১. বার্নাবাসের বাইবেল পুস্তক বাইবেলের (নূতন নিয়ম) প্রসিদ্ধ চার পুস্তকের অতিরিক্ত পঞ্চম পুস্তক, যাহা হযরত ঈসা (আ)-এর অন্যতম 'হাওয়ারী' বার্নাবাসের নামের সহিত সম্পৃক্ত। এই ইনজীলটি রোম-এর পোপ সৃট-এর লাইব্রেরীতে সংরক্ষিত ছিল এবং জনৈক পাদ্রী উহার সন্ধান লাভ করিয়া সাধারণ্যে প্রকাশ করিয়া দিয়াছিলেন এবং তিনি ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন। কেননা উহাতে আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের আগমনবার্তা স্পষ্টরূপে বিদ্যমান ছিল (কাসাসুল কুরআন, ২খ., ২৫১, টীকা ৩)।
📄 ইয়াহইয়া (আ)-এর দৈহিক গঠন (হুলিয়া)
আল্লাহ্ প্রদত্ত সুসংবাদ অনুযায়ী যাকারিয়্যা (আ)-এর উত্তরসুরিরূপে ইয়াহ্ইয়া (আ) জন্মলাভ করিলেন। "তাঁহার জন্ম হইলে তাঁহার পিতা তাঁহাকে দেখিতে পাইলেন এক সুশ্রী শিশু, হালকা কেশ, ক্ষুদে ক্ষুদে আংগুলবিশিষ্ট, ভ্রূদ্বয় সংযুক্ত ও ক্ষীণ স্বর বিশিষ্টরূপে এবং শৈশব হইতে আল্লাহর ইবাদতে সক্ষমরূপে” (আল-কামিল, ১খ, ২৩০)।