📄 যাকারিয়্যা (আ)-এর ইন্তিকাল
যাকারিয়্যা (আ) কি স্বাভাবিকভাবে ইনতিকাল করিয়াছিলেন, নাকি শাহাদাত বরণ করিয়াছিলেন, এই ব্যাপারে ইতিহাসবেত্তাদের মধ্যে সামান্য মতপার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। একদল মনে করেন, তিনি স্বাভাবিকভাবেই ইনতিকাল করিয়াছিলেন। ওয়াহ্ ইবন মুনাব্বিহ-এর বর্ণনা উল্লেখ করিয়া ইব্ন কাছীর বলিয়াছেন, "তবে যাকারিয়্যা স্বাভাবিকভাবেই মৃত্যুবরণ করিয়াছেন” (আল-বিদায়া, ২খ, ৪৮)।
তবে প্রসিদ্ধ মত হইল, যাকারিয়্যা (আ) শাহাদাত বরণ করিয়াছিলেন। ইসলাম বিরোধী শক্তির হাতে তিনি তাজা লহু বিসর্জন দিয়া আল্লাহর দরবারে পাড়ি জমাইয়াছেন। তিনি কোন্ স্থানে কিভাবে শহীদ হইয়াছিলেন এই প্রসঙ্গে দুইটি মত রহিয়াছে:
(ক) বাইবেলের নূতন নিয়ম হইতে জানা যায় যে, তিনি শত্রু পক্ষের হাতে বায়তুল মাকদিস এবং যবেহখানার মধ্যবর্তী স্থানে শহীদ হইয়াছেন। বাইবেল, মথিতে বলা হইয়াছে, নিদোর্ষ হাবিলের খুন হইতে আরম্ভ করিয়া আপনারা যে, বরখিয়ের ছেলে যাকারিয়্যাকে পবিত্র স্থানে ও বেদীর মাঝখানে খুন করিয়াছিলেন সেই যাকারিয়্যার খুন পর্যন্ত দুনিয়াতে যত নিদোর্ষ লোক খুন হইয়াছে, আপনারা সেই সমস্ত রক্তের দায়ী হইবেন" (Book of Matthew, 11:51)। বাইবেলের এই বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, যাকারিয়্যা (আ) 'ইবাদতখানা এবং বেদীর (যবেহখানা) মধ্যবর্তী স্থানে শাহাদত লাভ করিয়াছিলেন।
(খ) ইবনুল আছীর (আল-কামিল, ১খ, ১৭৪-১৭৫) এবং ইন্ন কাছীর (আল-বিদায়া, ২খ, ৪৮) যাকারিয়্যা-এর শাহাদাতের ঘটনা ভিন্নভাবে বর্ণনা করিয়াছেন। বাদশাহ হিরোডসের ভ্রাতুষ্পুত্রীর প্ররোচনায় ইয়াহইয়া (আ) নিহত হইবার পর যাকারিয়্যা (আ) স্বীয় সম্প্রদায় হইতে পলায়ন করিয়া বায়তুল মাকদিসের নিকটবর্তী এক বাগানে আশ্রয় গ্রহণ করেন। বাদশাহ তাঁহার অনুসন্ধানে লোক পাঠাই। তাহারা যখন বাগানে প্রবেশ করিল তখন তিনি একটি গাছের নিকট দিয়া গমন করিতেছিলেন। গাছটি ডাকিয়া বলিল, হে আল্লাহর নবী! আমার নিকট আশ্রয় নিন। তিনি গাছের নিকট গেলে উহা দুই ভাগ হইয়া গেল এবং তিনি উহার ভিতরে প্রবেশ করিলেন। প্রবেশকালে ইবলীস আসিয়া তাঁহার কাপড়ের অগ্রভাগ গাছের বাহিরে রাখিয়া দিল। এমতাবস্থায় গাছ জোড়া লাগিয়া গেল। অনুসন্ধানকারিগণকে ইবলীস বলিল, তোমরা কি খোঁজ করিতেছ? তাহারা বলিল, যাকারিয়্যাকে। ইবলীস বলিল, সে যাদু করিয়া এই গাছের মধ্যে প্রবেশ করিয়াছে। তাহারা বলিল, তুমি মিথ্যাবাদী। তখন ইবলীস তাহাদিগকে তাঁহার কাপড়ের অগ্রভাগ দেখাইল। তখন তাহারা বিশ্বাস করিল এবং একটা করাত লইয়া গাছকে দ্বিখণ্ডিত করিয়া ফেলিল। আর এইভাবেই যাকারিয়্যা (আ) শাহাদাত বরণ করিলেন (আল-কামিল, ১খ, ১৭৪-১৭৫)।
'আল-কামিল' কিতাবের সম্পাদনা এবং পাদটীকা প্রণয়ন বোর্ড ঘটনাকে কাল্পনিক বলিয়া অভিহিত করিয়াছে এবং বলিয়াছেন, ইহার দ্বারা ইবলীসের ক্ষমতার নিকট 'মু'জিযা পরাজিত হয়। তাই এই ঘটনা কাল্পনিক (আল-কামিল বৈরুত, ৬ষ্ঠ সংস্করণ, ১খ, ১৭৫, পাদটীকা)।
📄 যাকারিয়্যা (আ)-এর ইস্তিকালের সময়কাল
এ সম্পর্কে সরাসরি কোন বর্ণনা পাওয়া যায় না। তবে ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর শাহাদাতের ঘটনার সাথে সাথেই তাঁহার পিতা যাকারিয়্যা (আ)-এর শাহাদাতের ঘটনা ঘটিয়াছিল বলিয়া বিভিন্ন ইতিহাসে উল্লেখ রহিয়াছে (আল-কামিল, ১খ, ১৭৪)। আর ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর শাহাদাতের ঘটনা ঘটিয়াছিল ৩০ খৃস্টাব্দে ঈসা (আ)-কে আসমানে উত্তোলনের মাত্র তিন বৎসর পূর্বে (আম্বিয়ায়ে কুরআন, ২খ, ২৯৪)। এই ঘটনার উপর অনুমান করিয়া বলা যায় যে, যাকারিয়্যা (আ)-ও ৩০ খৃস্টাব্দে শাহাদত বরণ করেন।
📄 যাকারিয়্যা (আ)-এর কবর
যাকারিয়্যা (আ) সারা জীবন বায়তুল মুকাদ্দাসের খেদমতে জীবন উৎসর্গ করিয়াছিলেন। এই পবিত্র মসজিদের চত্বরে তাঁহাকে দাফন করা হইয়াছিল। এখনও পর্যটকগণ বায়তুল মুকাদ্দাসের চত্বরে যাকারিয়া (আ)-এর কবর যিয়ারত করিয়া থাকে (আম্বিয়ায়ে কুরআন: ২খ, ২৬৪-২৬৫)।
📄 যাকারিয়্যা (আ)-এর মর্যাদা
আল্লাহ তা'আলা যাকারিয়্যা (আ)-কে অত্যন্ত মর্যাদাবান করিয়াছিলেন। আল-কুরআনে বিভিন্ন স্থানে ইহার বর্ণনা আসিয়াছে। সূরা আন'আমে তাঁহাকে প্রথম কাতারের নবীদের মধ্যে গণ্য করিয়া 'সৎকর্মশীল' বলা হইয়াছে: “এবং প্রত্যেককে বিশ্বজগতের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করিয়াছিলাম এবং ইহাদিগের পিতৃপুরুষ, বংশধর এবং ভ্রাতৃবৃন্দের কতককে, তাহাদিগকে মনোনীত করিয়াছিলাম এবং সরল পথে পরিচালিত করিয়াছিলাম” (আন'আম : ৮৫-৮৭)।
"উহাদিগকে কিতাব, কর্তৃত্ব এবং নবুওয়াত দান করিয়াছি” (আন'আম : ৮৯)। বিশ্বনবী (সা)-কে আল্লাহ তা'আলা যাকারিয়্যাসহ উল্লিখিত অন্যান্য নবীদিগের অনুসরণের নির্দেশ দিয়াছেন: "উহাদিগকে আল্লাহ সৎপথে পরিচালিত করিয়াছেন। অতএব তুমি তাহাদিগের পথের অনুসরণ কর" (আন'আম: ৯০)।
আল্লাহ তা'আলা যাকারিয়্যা (আ)-কে স্বীয় বান্দা হিসেবে উল্লেখ করিয়াছেন, তাঁহার নিজের সহিত যাকারিয়্যাকে সম্বন্ধযুক্ত করিয়াছেন। নিঃসন্দেহে ইহা মহান মর্যাদা। "ইহা তোমার প্রতিপালকের অনুকম্পার বিবরণ তাঁহার বান্দা যাকারিয়্যার প্রতি" (মারয়াম: ২)।
অন্যান্য নবীদের সঙ্গে যাকারিয়্যা (আ)-এর প্রশংসায় কুরআনে আসিয়াছে: "নিশ্চয় তাহারা কল্যাণের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করিত এবং আশা ও ভীতির সহিত আমাকে ডাকিত, আর তাহারা ছিল আমার নিকট বিনীত” (আম্বিয়া: ৯০)।