📄 মারয়ামের প্রতি আল্লাহ্র বিশেষ নেয়ামত ও যাকারিয়্যা (আ)-এর ভূমিকা
মসজিদের মধ্যে মারয়ামের জন্য যে প্রকোষ্ঠ নির্দিষ্ট হইয়াছিল ঐ প্রkoষ্ঠে সিঁড়ি ব্যতীত আরোহণ করা যাইত না এবং যাকারিয়্যা (আ) মারয়ামের নিকট নিয়মিত যাতায়াতরত অবস্থায় দেখিতে পাইতেন যে, মারয়ামের নিকট টাটকা বেমৌসুমী ফলমূলের বিপুল সমাহার। একাধিকবার যখন তিনি ইহা প্রত্যক্ষ করিলেন তখন মারয়ামকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন, "এই ফলমূল তোমার জন্য কোথা হইতে আসিল”? মারয়াম উত্তর দিলেন, "ইহা তো আল্লাহর পক্ষ হইতে"। আল-কুরআনে এইভাবে বর্ণনা আসিয়াছে:
কুল্লামা দাখালা আলাইহা যাকারিয়্যাল মিহরাবা ওয়াজাদা ইনদাহা রিযকান কালা ইয়া মারয়ামু আন্না লাকি হাذا কালাত হুয়া মিন ইনদিল্লাহি ইন্নাল্লাহা ইয়ারযুকু মাই ইয়াশাউ বিগাইরি হিসাবিন।
"যখনই যাকারিয়্যা কক্ষে তাহার সহিত সাক্ষাত করিতে যাইত তখনই তাহার নিকট খাদ্য-সামগ্রী দেখিতে পাইত। সে বলিত, হে মারয়াম! এইসব তুমি কোথায় পাইলে? সে বলিত, উহা আল্লাহর নিকট হইতে, আল্লাহ যাহাকে ইচ্ছা অপরিমিত জীবনোপকরণ দান করেন” (আল 'ইমরান: ৩৭)। (দ্র. রূহুল মা'আনী, ২খ, ১৪৩; জালালায়ন, পৃ. ১৭; তাফসীর সা'দী, পৃ. ১০৬)।
যাকারিয়্যা (আ) যে স্থানে দাঁড়াইয়া ইমামতি করিতেন ঐ স্থানকেও মিহরাব বলা হইত। বায়তুল মাকদিসে এখনও পর্যন্ত হযরত যাকারিয়্যা (আ)-এর মিহরাবকে সংরক্ষণ করিয়া রাখা হইয়াছে।
📄 যাকারিয়্যা (আ)-এর পুত্র সন্তানের জন্য দু'আ
আল্লাহর নবী যাকারিয়্যা (আ) কখনও আল্লাহর রহমত হইতে নিরাশ হন নাই। তদুপরি যখন তিনি প্রত্যক্ষ করিলেন যে, আল্লাহ তা'আলা মীরয়ামকে বেমৌসুমী ফলমূল দান করিতেছেন তখন তাঁহার আশা-ভরসাও প্রবল হইল। তাই তিনি পুত্র সন্তান লাভের জন্য দু'আ করিবার মনস্থ করিলেন। এই সময়ে যাকারিয়্যা (আ) অত্যন্ত বয়োবৃদ্ধ হইয়া গিয়াছিলেন। ইব্ন কাছীরের বর্ণনামতে তাঁহার বয়স ছিল সাতাত্তর বৎসর। ছা'লাবীর বর্ণনা অনুযায়ী তাঁহার বয়স হইয়াছিল ৯০/৯২ অথবা ১২০ বৎসর (কাসাসুল কুরআন, ২খ, ২৫৫)। তদুপরি তাঁহার স্ত্রী ছিলেন বন্ধ্যা। তাই নিজের বার্ধক্য এবং স্ত্রীর বন্ধ্যাত্বের দরুণ স্বাভাবিক নিয়মে সন্তান হইবার কোন সম্ভাবনা ছিল না। বাইবেলের বর্ণনায় "কিন্তু তাহাদিগের কোন সন্তান ছিল না, কেননা এলিজাবেথ ("ঈশা” যাকারিয়্যার স্ত্রী) বন্ধ্যা ছিলেন এবং তাহারা উভয়ে বয়সের দিক দিয়াছিলেন অত্যন্ত প্রৌঢ়" (লুক লিখিত সুসমাচার, ১৪ ৭)।
যাকারিয়্যা (আ) পুত্র সন্তানের জন্য এই কারণে বেশী আগ্রহী ছিলেন যাহাতে তাঁহার অনুপস্থিতিতে এই সন্তান তাঁহার সম্প্রদায়কে আল্লাহর দিকে আহ্বান জানাইতে পারে। কেননা ভ্রষ্টতার কিছু কিছু চিহ্ন তাঁহার সম্প্রদায়ের নিকট ইতোমধ্যে প্রকাশিত হইতেছিল (মা'আল আম্বিয়া ফিল কুরআন, পৃ. ৩১৩)। আল্লাহর কুদরত এবং অকল্পনীয় শক্তির ব্যাপারে যাকারিয়া (আ)-এর ছিল দৃঢ় ঈমান। তাই তিনি অত্যন্ত বিনয়াবনত চিত্তে, হৃদয়ের সবটুকু আবেগ উজাড় করিয়া দিয়া, আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাসী হইয়া সন্তানের জন্য দু'আ করিলেন। আল-কুরআনের ভাষায়:
হুনাালিকা দা'আ যাকারিয়্যা রাব্বাহু কালা রব্বি হাব লি মিন লাদুনকা যুররিয়াতান তাইয়িবাতান ইন্নাকা সামিউদ দু'আ।
"সেখানে ইয যাকারিয়্যা তাহার প্রতিপালকের নিকট প্রার্থনা করিয়া বলিল, 'হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে তোমার পক্ষ হইতে সৎ বংশধর দান কর; তুমিই প্রার্থনা শ্রবণকারী' (আল 'ইমরান: ৩৮)।
যিকরুর রহমাতি রাব্বিকা আবদাহু যাকারিয়্যা ইয নাদা রাব্বাহু নিদাআন খাফিয়া। কালা রব্বি ইন্নি ওাহানাল আযমু মিন্নি ওয়াশতা'আলর রা'সু শাইবাও ও লাম আকুম বিদূ'আইকা রব্বি শাকিয়া। ও ইন্নি খিফতুল মাওয়ালিয়া মিওঁ ওারাঈ ওকাানাতিলমরাতি আ'কিরাহ ফাহাব লি মিল লাদুনকা ওলিয়্যা। ইয়ারিছুনী ও ইয়ারিছু মিন আলি ইয়া'কূবা ওয়াজ'আলহু রব্বি রদিয়্যা।
"ইহা তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহের বিবরণ তাহার বান্দা যাকারিয়্যার প্রতি, যখন সে নিভৃতে তাহার প্রতিপালককে আহ্বান করিয়াছিল। সে বলিয়াছিল, আমার অস্থি দুর্বল হইয়াছে, বার্ধক্যে আমার মস্তক শুভ্রোজ্জ্বল হইয়াছে; হে আমার প্রতিপালক! তোমাকে আহ্বান করিয়া আমি কখনও ব্যর্থকাম হই নাই। আমার পর আমার স্বগোত্রীয়দিগের ব্যাপারে আমি আশংকা করি, আর আমার স্ত্রী বন্ধ্যা। সুতরাং তুমি তোমার নিকট হইতে আমাকে উত্তরাধিকারী দান কর যে আমার উত্তরাধিকারিত্ব করিবে এবং উত্তরাধিকারিত্ব করিবে ইয়া'কবের বংশের এবং হে আমার প্রতিপালক! তাহাকে করিও সন্তোষভাজন" (সূরা মারয়াম : ০২-০৬)।
কাতাদা (র) বলিয়াছেন, বৃদ্ধ ব্যক্তির সন্তানের জন্য দু'আ নিভৃতে হওয়াটাই স্বাভাবিক। কেননা অন্যদের নিকটে ইহা অবশ্যই অসামাঞ্জস্যপূর্ণ মনে হইবে। তাই গভীর রাত্রে সমগ্র প্রকৃত যখন ঘুমের কোলে ঢালিয়া পড়িয়াছে তখন তিনি কায়মনোবাক্যে আল্লাহকে ডাকিতে থাকিলেন। তিনি বলিলেন, ইয়া রাব্বি! ইয়া রাব্বি! ইয়া রাব্বি! সাথে সাথে আল্লাহ তা'আলা ডাকে সাড়া দিয়া বলিলেন, লাব্বায়িক, লাব্বায়িক, লাব্বায়িক! (আল-বিদায়া, ২খ, ৪৪)।
যাকারিয়্যা (আ) ধনসম্পদ এবং পার্থিব বস্তুর উত্তরাধিকারিত্বের জন্য সন্তান প্রার্থনা করেন নাই; বরং উত্তরাধিকারিত্ব বলিতে এইখানে মূলত নবুওয়াত, রিসালাত ও দাওয়াতী কাজের উত্তরাধিকারিত্ব বুঝান হইয়াছে। তাই তিনি বলিয়াছেন:
ফাহাব লি মিল লাদুনকা ওলিয়্যা। ইয়ারিছুনী ও ইয়ারিছু মিন আলি ইয়া'কূবা।
"তুমি তোমার নিকট হইতে আমাকে উত্তরাধিকারী দান কর, যে আমার এবং ইয়া'কূবের বংশের উত্তরাধিকারিত্ব করিবে" (মারয়াম: ৫-৬)।
নবীগণ যে সম্পদ রাখিয়া যান উহা রাষ্ট্রীয় কোষাগারের সম্পদে পরিণত হয়। বুখারী, মুসলিম, তিরমিযীসহ অন্যান্য হাদীসে আসিয়াছে:
নাহনু মা'আশারাল আম্বিয়াআ লা নূরিছু।
"আমরা নবীদের দল, আমাদের উত্তরাধিকারী হয় না। আমরা যাহা রাখিয়া যাই তাহা সাদাকাহ" (আল-বিদায়া, ২খ, ৪৫)।
অন্যদিকে যাকারিয়্যা (আ) তেমন কোন সম্পদের মালিক ছিলেন না, নিজের জীবিকার জন্য তাঁহার কাঠমিস্ত্রির কাজ করিতে হইত। আল্লাহর নবী দাউদ (আ)-ও নিজ শ্রমে উপার্জন দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করিতেন। তাই নিঃসন্দেহে বলা যাইতে পারে যে, এইখানে উত্তরাধিকারিত্ব বলিতে নবুওয়াতের উত্তরাধিকারিত্ব বুঝান হইয়াছে।
যাকারিয়্যা (আ)-এর সন্তানের জন্য দু'আকে আল্লাহ তা'আলা অত্যন্ত অলংকারপূর্ণ ভাষায় পরিপূর্ণ ভাব-গাম্ভীর্যের সহিত অতি সংক্ষেপে সূরা আম্বিয়াতে এইভাবে বর্ণনা করিয়াছেন:
ওয়াস যাকারিয়্যা ইয নাদা রাব্বাহু রাব্বি লা তাযারনী ফারদাওঁ ওয়া আনতা খাইরুল ওয়ারিছীন।
“এবং স্মরণ কর যাকারিয়্যার কথা, যখন সে তাহার প্রতিপালককে আহ্বান করিয়া বলিয়াছিল, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে একা রাখিও না, তুমি তো শ্রেষ্ঠ বা চূড়ান্ত মালিকানার অধিকারী" (আম্বিয়া: ৮৯)।
আল্লাহ তা'আলা যাকারিয়্যা (আ)-এর একনিষ্ঠ অন্তরের দু'আ কবুল করিলেন এবং তাঁহাকে ফেরেশতার মাধ্যমে পুত্র সন্তানের সুসংবাদ প্রদান করিলেন। যাকারিয়া (আ) মিহরাবে সালাত আদায় করিতে ছিলেন এমন সময়ে এক সুদর্শন যুবককে দেখিয়া কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া গেলেন। তিনি বলিলেন, আমি জিবরাঈল! তোমাকে পুত্র সন্তানের সুসংবাদ প্রদান করিবার নিমিত্তে আগমন করিয়াছি (আল-কামিল, ১খ, ১৭০)। আল-কুরআনে এই সুসংবাদের বর্ণনা আসিয়াছে:
ফানাাাদাতহুল মালায়িকাতু ও হুয়া কাাইমুন ইউসাল্লী ফিল মিহরাবি আননাল্লাহা ইউবাশ্বিরুকা বিয়াহইয়া মুসাদ্দিকাম বিকালimatin মিনাল্লাহি ওয়া সাইয়িদান ওয়া হাসূরান ওয়া নাবিইয়াম মিনাস সালিহীন।
"যখন যাকারিয়্যা কক্ষে সালাতে দাঁড়াইয়াছিল তখন ফেরেশতাগণ তাহাকে আহ্বান করিয়া বলিল, আল্লাহ তোমাকে ইয়াহইয়ার সুসংবাদ দিতেছেন। সে হইবে আল্লাহর বাণীর সমর্থক, নেতা, স্ত্রী-বিরাগী এবং পুণ্যবানদের মধ্যে একজন নবী" (আল ইমরান: ৩৯; দ্র. আত-তাফসীর আল-ওয়াদিহ, ৩খ, ৫৭)।
ইয়া যাকারিয়্যা ইন্না নুবশ্বিরুকা বিguলামিন ইসমুহু ইয়াহইয়া লাম নাজ'আল লাহু মিন কাবলু সামিয়্যা।
"হে যাকারিয়্যা! আমি তোমাকে এক পুত্রের সুসংবাদ দিতেছি। তাহার নাম হইবে ইয়াহ্ইয়া, পূর্বে এই নামে আমি কাহারও নামকরণ করি নাই" (মারয়ামঃ ০৭)।
ফাসতাজাবনা লাহু ওয়া ওয়াহাবনা লাহু ইয়াহইয়া ওয়া আসল্লাহনা লাহু যাউজাহু।
"তৎপর আমি তাহার আহ্বানে সাড়া দিয়াছিলাম এবং তাহাকে দান করিয়াছিলাম ইয়াহ্ইয়া, আর তাহার জন্য তাহার স্ত্রীকে যোগ্যতাসম্পন্ন করিয়াছিলাম" (আম্বিয়া: ৯০)।
বাইবেলের বিভিন্ন স্থানেও অনুরূপ বর্ণনা আসিয়াছে। যেমন, "একদা যখন সখরিয় নিজ পালার অনুক্রমে সদাপ্রভুর সাক্ষাতে যাজকীয় কার্য করিতেছিলেন, তখন যাজকীয় কার্যের প্রথানুসারে গুলিবাট ক্রমে তাঁহাকে প্রভুর মন্দিরে প্রবেশ করিয়া ধূপ জ্বালাইতে হইল। সেই ধূপদাহের সময়ে সমস্ত লোক বাহিরে থাকিয়া প্রার্থনা করিতেছিল। তখন প্রভুর এক দূত ধূপবেদির দক্ষিণ পার্শ্বে দাঁড়াইয়া তাঁহাকে দর্শন দিলেন। দেখিয়া সখরিয় ত্রাসযুক্ত হইলেন, ভয় তাহাকে আক্রমণ করিল। কিন্তু দূত তাঁহাকে বলিলেন, সখরিয়, ভয় করিও না, কেননা তোমার মিনতি গ্রাহ্য হইয়াছে, তোমার স্ত্রী ইলীশাবেৎ তোমার জন্য পুত্র প্রসব করিবেন, ও তুমি তাহার নাম যোহন রাখিবে। আর তোমার আনন্দ ও উল্লাস হইবে, এবং তাহার জন্মে অনেকে আনন্দিত হইবে। কারণ সে প্রভুর সম্মুখে মহান হইবে, এবং দ্রাক্ষারস কি সুরা কিছুই পান করিবে না; আর সে মাতার গর্ভ হইতেই পবিত্র আত্মায় পরিপূর্ণ হইবে; এবং ইস্রায়েল সন্তানদের মধ্যে অনেককে তাহাদের সদাপ্রভুর প্রতি ফিরাইবে" (লুক, ০১:৮-১৭)।
📄 সুসংবাদ প্রাপ্তিতে যাকরিয়্যা (আ)-এর প্রতিক্রিয়া
এই অসম্ভব বস্তু লাভের সুসংবাদে যাকারিয়্যা (আ) যেমন অত্যন্ত আনন্দিত হইলেন অনুরূপভাবে একজন মানুষ হিসাবে আশ্চর্যান্বিতও হইলেন যে, কিভাবে সাধারণ নিয়ম-নীতির বাহিরে তাহার সন্তান জন্ম নিবে (আল-বিদায়া, ২খ, ৪৫)। আল-কুরআনে ইহার বিস্তারিত বর্ণনা আসিয়াছে:
কালা রব্বি আন্না ইয়াকূনু লি গুলামুওঁ ওয়াকাদ বালাগানিয়াল কিবারু ওয়াজমরাতি আ'কিরুন কালা কাযালিকাল্লাহু ইয়াফ'আলু মা ইয়াশা।
"সে বলিল, হে আমার প্রতিপালক! আমার পুত্র হইবে কিরূপে? আমার তো বার্ধক্য আসিয়াছে আর আমার স্ত্রী তো বন্ধ্যা! তিনি বলিলেন, এইভাবেই, আল্লাহ যাহা ইচ্ছা তাহা করেন” (আল 'ইমরান: ৪০)।
কালা রব্বি আন্না ইয়াকুনু লি গুলামুওঁ ওয়া ক'ানাতিলমরাতি আ'kiratuoঁ ওয়াকাদ বালাগতু মিনাল কিবারি ই'তিয়্যা। কালা কাযালিকা কালা রাব্বুকা হুওয়া আলাইহিনুওঁ ওয়া ক্বাদ খালাকতুকা মিন কাবলু ওয়া লাম তাকু শাইয়া।
"সে বলিল, হে আমার প্রতিপালক! কেমন করিয়া আমার পুত্র হইবে? অথচ আমার স্ত্রী বন্ধ্যা এবং আমি বার্ধক্যের শেষ সীমায় উপনীত? তিনি বলিলেন, এইরূপই হইবে। তোমার প্রতিপালক বলিলেন, ইহা আমার জন্য সহজসাধ্য, আমি তো পূর্বে তোমাকে সৃষ্টি করিয়াছি যখন তুমি কিছুই ছিলে না" (মারয়াম: ৮-৯)।
বাইবেলেও অনুরূপ বর্ণনা আসিয়াছে, "তখন সখরিয় দূতকে কহিলেন, কিসে ইহা জানিব? কেননা আমি বৃদ্ধ এবং আমার স্ত্রীরও অধিক বয়স হইয়াছে। দূত উত্তর করিয়া তাঁহাকে কহিলেন, আমি গাব্রিয়েল, সদাপ্রভুর সম্মুখে দাঁড়াইয়া থাকি, তোমার সহিত কথা কহিবার ও তোমাকে এই সকল বিষয়ে সুসমাচার দিবার জন্য প্রেরিত হইয়াছি" (লুক, ০১ : ১৮-১৯)।
মানব প্রকৃতির চাহিদা হইল, এই জাতীয় আশ্চর্যজনক ও নজীরবিহীন মহান ঘটনার নিদর্শন জানিতে চাওয়া। যেমন পরিপূর্ণ ঈমান ও দৃঢ় বিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও হযরত ইবরাহীম (আ) বলিয়াছিলেন :
রব্বি আরিনি কাইফা তুহয়িল মাওতা কালা আওয়ালাম তু'মিন কালা বালা ওয়ালাকিন লিতাতমা'ইন্না কালবী।
“হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে অবলোকন করাও কিভাবে তুমি মৃতকে জীবিত কর? তিনি বলিলেন, তুমি কি বিশ্বাস কর না? সে বলিল, হাঁ অবশ্যই, তবে ইহা আমার অন্তরের প্রশান্তির জন্য" (সূরা বাকারা : ২৬০)।
ঠিক একইভাবে আত্মতৃপ্তির জন্য হযরত যাকারিয়্যা (আ) আল্লাহ তাআলার নিকট ফরিয়াদ করিলেন, হে আল্লাহ! তুমি ইয়াহইয়ার জন্মের নিদর্শন দেখাও। কুরআনের ভাষায় :
কালা রব্বি আজ'আল লি আ'ইয়াতান কালা আ'ইয়াতুকা আল্লা তু'কাল্লিমুন নাাসা ছালাছাতা আইয়াামিন ইল্লা রামযাওঁ ওয়াজকুর রব্বাকা কাসীরাওঁ ওয়া সাব্বিহ বিলআ'শিয়্যি ওয়াল ইবকাাার।
“সে বলিল, হে আমার প্রতিপালক। আমাকে একটি নিদর্শন দাও। তিনি বলিলেন, তোমার নিদর্শন এই যে, তিন দিন তুমি ইংগিত ব্যতীত কথা বলিতে পারিবে না, আর তোমার প্রতিপালকের অধিক স্মরণ করিবে এবং সন্ধ্যায় ও প্রভাতে তাঁহার মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষণা করিবে” (আল 'ইমরান: ৪১; দ্র. তাফহীমুল কুরআন, ২খ, ৬)।
কালা রব্বি আজ'আল লি আ'ইয়াতান কালা আ'ইয়াতুকা আল্লা তু'কাল্লিমুন নাাসা ছালাছা লায়াালিন সাওিয়্যাা। ফাখরাজা আ'লা ক্বাওমিহি মিনাল মিহরাবি ফাআওহা ইলাইহিম আন সাব্বিহূ বুকরাতাওঁ ওয়া আ'শিয়া।
" সে বলিল, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে একটি নিদর্শন দাও। তিনি বলিলেন, তোমার নিদর্শন এই যে, তুমি সুস্থ থাকা সত্ত্বেও তিন দিন কাহারও সহিত বাক্যালাপ করিবে না। অতঃপর সে কক্ষ হইতে বাহির হইয়া তাহার সম্প্রদায়ের নিকট আসিল এবং ইঙ্গিতে তাহাদিগকে সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষণা করিতে বলিল" (মারয়াম: ১০-১১)।
ইব্ন কাছীর বলিয়াছেন, "নিদর্শন হইল, তোমার জন্য এমন অবস্থার সৃষ্টি হইবে তিন দিন বাধ্যতামূলক তোমাকে মানুষের সাথে বাক্যালাপ হইতে বিরত থাকিতে হইবে। তুমি ইচ্ছা করিলেও ইঙ্গিত ব্যতীত সরাসরি কথা বলিতে পারিবে না; অথচ তোমার শরীর, মেযাজ, স্বাস্থ্য সব কিছুই অক্ষত রহিয়াছে" (আল-বিদায়া, ২খ, ৪৬)।
মুজাহিদ, কাতাদাহ, 'ইকরিমা ও সুদ্দী বলিয়াছেন, "কোন রোগ ব্যতীত তাঁহার জিহ্বার কথা বলিবার ক্ষমতা রহিল না" (আল-বিদায়া, ২খ,৪৬)।
ইব্ন যায়দ বলিয়াছেন, "তিনি পড়িতে এবং তাসবীহ করিতে পারিতেন কিন্তু কাহারও সহিত কথা বলিতে পারিতেন না" (আল-বিদায়া, ২খ, ৪৬)। অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের মতামতের ভিত্তিতে বলা যাইতে পারে যে, হযরত যাকারিয়্যা (আ) মুক বা বোবা হইয়া যান নাই, বরং আল্লাহর যিকির ও 'ইবাদতের সময়ে তাঁহার জিহ্বা যথার্থ চালু ছিল, মানুষের সহিত কথা বলিতে গেলে তাহা বন্ধ হইয়া যাইত (আদওয়াউল বায়ান, ১খ, ২১৮)। কিন্তু মাওলানা আবুল কালাম আযাদ তরজমানুল কুরআনের দ্বিতীয় খণ্ডে ৪৩২ পৃষ্ঠায় একটু ভিন্ন মত পোষণ করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, "কুরআনের বক্তব্য দ্বারা ইহা স্পষ্ট প্রমাণিত যে, যাকারিয়্যা (আ) মুক হইয়া যান নাই....। স্পষ্ট কথা হইল এই যে, যাকারিয়্যা (আ)-কে ইবাদত ও রোযা পালনের নির্দেশ দান করা হইয়াছিল। আর রোযা পালনের অন্যতম কাজ ছিল কাহারও সহিত বাক্যালাপ না করিয়া নিশ্চুপ থাকা" (আম্বিয়ায়ে কুরআন, ২খ, ২৭৩)।
বাইবেলেও এই বক্তব্যের সমর্থন পাওয়া যায়, "আর দেখ, এই সকল যে দিন ঘটিবে, সেই দিন পর্যন্ত তুমি নীরব থাকিবে, কথা কহিতে পারিবে না; যেহেতু আমার এই যে সকল বাক্য যথাসময়ে সফল হইবে, ইহাতে তুমি বিশ্বাস করিলে না। আর লোক সকল সখরিয়ের অপেক্ষা করিতেছিল, এবং মন্দিরের মধ্যে তাঁহার বিলম্ব হওয়াতে তাহারা আশ্চর্য জ্ঞান করিতে লাগিল। পরে তিনি বাহিরে আসিয়া তাহাদের কাছে কথা কহিতে পারিলেন না; তখন তাহারা বুঝিল যে, মন্দিরের মধ্যে তিনি কোন দর্শন পাইয়াছেন; আর তিনি তাহাদের নিকটে নানা সংকেত করিতে থাকিলেন, এবং বোবা হইয়া রহিলেন। পরে তাঁহার উপাসনার সময় পূর্ণ হইলে তিনি নিজ গৃহে চলিয়া গেলেন। এই সময়ের পরে তাঁহার স্ত্রী ইলীশাবেৎ গর্ভবতী হইলেন; আর তিনি পাঁচ মাস আপনাকে সংগোপনে রাখিলেন" (বাইবেল, লুক, ০১: ২০-২৪)।
📄 ইয়াহইয়া (আ)-এর জন্ম
আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা পরিপূর্ণতার দিকে অগ্রসর হইল। যাকারিয়া (আ)-এর স্ত্রী 'ঈশা' গর্ভবতী হইলেন। ইয়াহইয়া (আ) গর্ভে থাকিতেই বিভিন্ন অলৌকিক ঘটনা ঘটিতে থাকে। উল্লেখ্য যে, 'ঈসা (আ)-এর মাতা মারয়াম এবং ইয়াহ্ইয়ার মাতা 'ঈশা' একই সময়ে গর্ভবতী ছিলেন। ইয়াহ্ইয়া মাতৃগর্ভে থাকিতেই 'ঈসা'-কে সত্য বলিয়া স্বীকৃতি দিয়াছিলেন। "আল্লাহর কালিমা (ঈসা) সত্যতা স্বীকারকারী" (আল 'ইমরান : ৩৯) এই আয়াতের তাফসীরে ইবন আব্বাস (রা) বলিয়াছেন-
"ইয়াহ্ইয়া এবং ঈসা খালাত ভাই ছিলেন। ইয়াহ্ইয়ার মাতা মারয়ামকে বলিতেন, আমার মনে হয় আমার পেটের বাচ্চা তোমার পেটের বাচ্চাকে সিজদা করিতেছে। ইহাই হইল মাতৃগর্ভে ইয়াহইয়ার পক্ষ হইতে ঈসা (আ)-কে সত্য বলিয়া স্বীকৃতি প্রদান। ইয়াহ্ইয়াই সর্বপ্রথম ঈসাকে স্বীকার করিয়া লইয়াছিলেন; আর আল্লাহর কালিমা হইল ঈসা। ইয়াহইয়া (আ) ঈসা (আ) হইতে বয়সে সামান্য বড় ছিলেন" (তাফসীর ইব্ন কাছীর, ১খ, ৩৪১; আল-কামিল, ১খ, ১৭০)।
গর্ভধারণের নির্ধারিত সময় শেষ হইবার পর যাকারিয়্যা (আ)-এর ঘরে নব চাঁদের উদয় ঘটিল। ইয়াহ্ইয়া দুনিয়াতে আগমন করিলেন। শিশুকাল হইতেই আল্লাহ তাআলা তাঁহাকে অসাধারণ নিয়ামত দান করিয়াছিলেন। ইয়াহ্ইয়া ছিলেন অত্যন্ত ধীশক্তিসম্পন্ন (মাআল আম্বিয়া ফিল কুরআন, পৃ. ৩১৫)। ইবনুল আছীর ইয়াহইয়ার জন্মের সময়ে যাকারিয়্যা (আ)-এর আবেগ এইভাবে বর্ণনা করিয়াছেন-
"যখন তিনি জন্মগ্রহণ করিলেন তখন তাঁহার পিতা দেখিলেন যে, বাচ্চাটি অত্যন্ত সুদর্শন, কম চুল, খাট খাট আঙ্গুল, যুগল ক্রবিশিষ্ট, সূক্ষ্ম স্বরবিশিষ্ট এবং ছেলেবেলা হইতে আল্লাহর আনুগত্যে প্রবল” (আল-কামিল, ১খ, ১৭১; বিস্তারিত দ্র. ইয়াহ্ইয়া নিবন্ধ)।
অলৌকিক ঘটনা হিসাবে যাকারিয়্যা (আ)-এর ঘর আলোকিত হইল এবং বৃদ্ধ বয়সে তিনি উপযুক্ত সন্তানের পিতা হইবার সৌভাগ্য অর্জন করিলেন। আল্লাহ তা'আলার এত বিরাট নিয়ামত লাভ করিয়া যাকারিয়্যা (আ) রাব্বুল আলামীনের শুকরিয়ায় বিনয়াবনত হইবেন ইহাই স্বাভাবিক। এই শুকরিয়া আদায়ের সর্বোত্তম পন্থা হইল অধিক হারে আল্লাহ তা'আলার আনুগত্য করা। তাই যাকারিয়্যা (আ) সন্তান জন্মগ্রহণের পর আরও অধিক আগ্রহ সহকারে আল্লাহর আনুগত্য করিতে থাকিলেন। আল-কুরআনের ভাষায়:
ইন্নাহুম ক্বানু ইউসা'রি'ঊনা ফিল খইরাতি ওয়া ইয়াদ'ঊনানা রাগাবা্ওঁ ওয়া রাহাবা্ওঁ ওয়া ক্বানূ লানা খা'শি'ঈন।
"তাহারা সৎকর্মের প্রতিযোগিতা করিত, তাহারা আশা ও ভীতির সহিত আমাকে ডাকিত এবং তাহারা ছিল আমার নিকট বিনীত" (সূরা-আম্বিয়া: ৯০)।
বাইবেলে এই কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন এবং শুকরিয়া আদায়ের বিস্তারিত বর্ণনা আসিয়াছে। উহার কিয়দংশ এইরূপ, "তখন তাহার পিতা সখরিয় পবিত্র আত্মায় পরিপূর্ণ হইলেন, ভাববাণী বলিলেন; তিনি কহিলেন, ধন্য প্রভু, ইস্রায়েলের প্রভু; কেননা তিনি তত্ত্বাবধান করিয়াছেন, আপন প্রজাদের জন্য মুক্তি সাধন করিয়াছেন, আর আমাদের জন্য আপন দাস দায়দের কুলে পরিত্রাণের এক শৃঙ্গ উঠাইয়াছেন, যেমন তিনি পুরাকাল অবধি তাঁহার সেই পবিত্র ভাববাদিগণের মুখ দ্বারা বলিয়া আসিয়াছেন- আমাদের শত্রুগণ হইতে ও যাহারা আমাদিগকে দ্বেষ করে, তাহাদের সকলের হস্ত হইতে পরিত্রাণ করিয়াছেন। আমাদের পিতৃপুরুষগণের প্রতি কৃপা করিবার জন্য, আপন পবিত্র নিয়ম স্মরণ করিবার জন্য। এ সেই দিব্য, যাহা তিনি আমাদের পিতৃপুরুষ আব্রাহামের কাছে শপথ করিয়াছিলেন, আমাদিগকে এই বর দিবার জন্য যে, আমরা শত্রুগণের হস্ত হইতে নিস্তার পাইয়া নির্ভয়ে সাধুতায় ও ধার্মিকতায় তাঁহার আরাধনা করিতে পারিব, তাঁহার সাক্ষাতে যাবজ্জীবন করিতে পারিব। আর হে বালক! তুমি পরাৎপরের ভাববাদী বলিয়া আখ্যাত হইবে, কারণ তুমি প্রভুর সম্মুখে চলিবে, তাঁহার পথ প্রস্তুত করিবার জন্য; তাঁহার প্রজাদের পাপ মোচনে তাহাদিগকে পরিত্রাণের জ্ঞান দিবার জন্য। ইহা আমাদের সদাপ্রভুর সেই কৃপাযুক্ত স্নেহহেতু হইবে, যদ্দ্বারা ঊর্ধ্ব হইতে ঊষা আমাদের তত্ত্বাবধান করিবে, যাহারা অন্ধকারে ও মৃত্যুচ্ছায়ায় বসিয়া আছে, তাহাদের উপরে দীপ্তি দিবার জন্য, আমাদের চরণ শান্তিপথে চালাইবার জন্য" (বাইবেল: লুক, ০১:৬৭-৭৯)।
বাইবেলে উল্লিখিত যাকারিয়্যা (আ)-এর এই কৃতজ্ঞতামূলক বক্তব্য দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, ইয়াহ্ইয়া (আ) বনূ ইসরাঈলের জন্য আল্লাহর অনুকম্পা হিসাবেই আগমন করিয়াছিলেন। ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর জন্মকে যাকারিয়্যা (আ), পূর্বপুরুষ তথা ইবরাহীম (আ), দাউদ (আ)-সহ পরবর্তী লোকদের জন্যও বিধাতার অপার করুণা বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন (আম্বিয়ায়ে কুরআন, ২খ, ২৭৪-২৭৫)।