📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মারয়ামের তত্ত্বাবধায়ক হিসাবে যাকারিয়া (আ)

📄 মারয়ামের তত্ত্বাবধায়ক হিসাবে যাকারিয়া (আ)


এই মারয়াম নাম্নী ক্ষণজন্মা কন্যার তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত হইয়াছিলেন হযরত যাকারিয়‍্যা (আ)। আল্লাহ তা'আলা মারয়ামকে বিশেষ ফযীলত ও মর্যাদা দান করিয়াছিলেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে 'হায়কাল'-এর প্রচলিত নিয়মনীতি ভঙ্গ করিয়া উহার খিদমতকারিনী হিসাবে গ্রহণ করিয়া লইয়াছিলেন। ফলে হায়কালের খাদেমদের মনে তাঁহার ব্যাপারে বিশেষ কৌতূহল সৃষ্টি হইয়াছিল (আম্বিয়ায়ে কুরআন, ২খ, ২৬৬; আল-বিদায়া, ১খ, ৪৪)। আল্লাহ তা'আলা তাহাকে গ্রহণ করিয়া লইয়াছিলেন, তাহার সবচাইতে বড় প্রমাণ হইল কুরআনের বাণী:
ফাতাকাব্বালাহা রাব্বুহা বি-কাবূলিন হাসানিন ওয়া আনবাতা'হা নাতা’বাতা’ন হাসানা’ন
“অতঃপর তাহার প্রতিপালক তাহাকে সাগ্রহে কবুল করিলেন এবং তাহাকে উত্তমরূপে লালন-পালন করিলেন” (আল ইমরান: ৩৭)।
তবে একটা প্রশ্নে 'হায়কাল'-এর যাজকগণ পরস্পর মতানৈক্য করিতে লাগিলেন যে, কে মারয়ামের তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত হইবেন? কেননা মারয়াম ছিল তাহাদের নেতা এবং উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন লোক 'ইমরান ইবন মাছানের দুহিতা। তাই তাহাদের প্রত্যেকেই মারয়ামের তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত হওয়াকে অত্যন্ত গর্বের বিষয় মনে করিতে লাগিলেন (আল-কামিল, ১খ, ১৭০; তাফসীর ফাতহুল কাদীর, ১খ, ৩৩৯)।
হযরত যাকারিয়‍্যা (আ) বলিলেন, আমি তাহার তত্ত্বাবধায়ক হইবার বেশি হকদার। কেননা তাহার খালা আমার নিকটে রহিয়াছে। কিন্তু অন্যরা এই ব্যাপারে ছাড় দিতে রাজি হইল না। তাই অবশেষে লটারীর মাধ্যমে ফয়সালা হইবে বলিয়া ঠিক করা হইল। আল্লাহ তা'আলার ভাষায়:
যালিকা মিন আম্বায়িল গায়বি নূ'হীহি ইলায়কা ওমা কুনতা লাদাইহিম ইয ইয়ুলকূনা আকলামাহুম আইয়ুহুম ইয়াকফুলু মারয়ামা ওমা কুনতা লাদাইহিম ইয ইয়াখতাসিমূন।
“ইহা অদৃশ্য বিষয়ের সংবাদ, যাহা তোমাকে ঐশীবাণী দ্বারা অবহিত করিতেছি। মারয়ামের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব তাহাদের মধ্যে কে গ্রহণ করিবে ইহার জন্য যখন তাহারা তাহাদের কলম নিক্ষেপ করিতেছিল, তুমি তখন তাহাদের নিকট ছিলে না এবং যখন তাহারা বাদানুবাদ করিতেছিল তখনও তুমি তাহাদের নিকট ছিলে না” (আল 'ইমরান: ৪৪)।
এই আয়াতের তাফসীরে বিস্তারিত ঘটনা বিভিন্ন তাফসীরের কিতাবে বর্ণিত হইয়াছে। ইহার সংক্ষিপ্তসার হইল: হায়কালে সুলায়মানীর খেদমত এবং হেফাযতের জন্য একদল খাদেম এবং স্বেচ্ছাসেবক নিযুক্ত থাকিতেন। তাহারা 'ইবাদতখানার রক্ষণাবেক্ষণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, সালাতে ইমামতি করা ইত্যাদি দায়িত্ব অতি যত্নের সহিত পালন করিতেন। মারয়ামের পিতা 'ইমরান এই দলের নেতা ছিলেন এবং সালাতে তিনি ইমামতিও করিতেন। তাহার ইন্তিকালের পর যখন হান্নাহ মারয়ামকে লইয়া বায়তুল মাকদিসে গিয়া বলিলেন, এই কন্যাকে আমি হায়কালের উদ্দেশ্যে রাখিয়া যাইতে চাই। তখন যাকারিয়া (আ) বলিলেন, আমিই তাহার তত্ত্বাবধায়ক হইব। কিন্তু তাহাতে অন্যান্য যাজকগণ রাজি হইলেন না, বরং তাহারা লটারী করিবার পরামর্শ দিলেন। অবশেষে তাহারা সকলে জর্দান নদীর তীরে যাইয়া হাজির হইলেন এবং যে কলম দ্বারা তাহারা তাওরাত লিখিতেন সেই কলমকে নদীর স্রোতের মধ্যে নিক্ষেপ করিলেন। যে কোন লটারীর ক্ষেত্রেই তাহারা এইরূপ তাওরাত লিখিবার কলমকে নিক্ষেপ করিতেন। যাহার কলম স্রোতে ভাসিয়া না যাইয়া স্থির থাকিত অথবা স্রোতের উল্টা দিকে যাইত তিনি লটারী জিতিয়াছেন বলিয়া মান্য করা হইত। অবশেষে সবাইকে অবাক করিয়া দিয়া যাকারিয়‍্যা (আ)-এর কলম স্থির রহিল এবং স্রোতের উল্টা দিকে যাইতে লাগিল (তাফসীরু'ত-তাবারী, ৩খ, ৩৬২; তাফসীর ইবন আতিয়‍্যাহ, ৩খ, ১১৬-১১৭; তাফসীর ইব্‌ন কাদীর, ১খ, ৩৪৩; জাসসাস, আহকামুল কুরআন, ২খ, ১৬; কুরতুবী, আল-জামে লি-আহকামিল কুরআন, ৪খ, ৯১-৯৪; ফাতহুল কাদীর, ১খ, ৩৩৯; আল-কামিল, ১খ, ১৭০; আবদুল মাজেদ দরিয়াবাদী তাফসীরে কুরআন, পৃ. ১৩৩)। বুখারী শরীফেও এই সংক্রান্ত স্পষ্ট বর্ণনা রহিয়াছে:
বাবুল কুরাআতি ফিল মুশকিলাতি ওয়া কাওলুহু আযযা ওয়া জাল্লা ইয ইয়ুলকূনা আকলামাহum আইয়ুহুম ইয়াকফুলু মারয়ামা ওয়া কালা ইবন আব্বাশ ইকতারাউ ফাজারাতিল আকলামু মা'আল জিরয়াতি ওয়া আ'লা কালামু যাকারিয়্যাল জিরয়াতি ফাকাফফালহা যাকারিয়্যা।
"সমস্যাসংকুল বিষয়ে লটারী প্রসংগে এই পরিচ্ছেদ; এবং আল্লাহ তা'আলার বাণী ("যখন তাহারা তাহাদের কলমগুলি নিক্ষেপ করিতেছিল তাহাদের মধ্যে কে মারয়ামের তত্ত্বাবধায়ক হইবে"?)। ইব্‌ন আব্বাস (রা) বলিয়াছেন, তাহারা লটারী করিল, অতঃপর স্রোতের সহিত কলমগুলি ভাসিয়া গেল এবং যাকারিয়‍্যার কলম স্রোতের উঁচুতে উঠিয়া গেল তখন যাকারিয়‍্যা তাহার অভিভাবক হইলেন" (ফাতহুল বারী, ৫খ, ৩৪৫)। এইভাবে আল্লাহ তা'আলা মারয়ামকে তাঁহার স্নেহময় খালু এবং স্নেহময়ী খালার ক্রোড়ে নিয়া আসিলেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 যাকারিয়‍্যা (আ)-এর ক্রোড়ে শিশু মারয়াম

📄 যাকারিয়‍্যা (আ)-এর ক্রোড়ে শিশু মারয়াম


লটারীর মাধ্যমে যে অসাধারণ শিশুর তিনি তত্ত্বাবধায়ক হইয়াছেন তাহার প্রতি তিনি এবং তাঁহার স্ত্রী 'ঈশা' বিশেষ যত্ন নিতেন। শিশু মারয়াম তাঁহার খালা উম্মে য়াহয়ার তত্ত্বাবধানে দুধ পান করিতেন (আল-কামিল, ১খ, ১৭০)। খালা ব্যতীত অন্য কোন মহিলার দুধ সাধারণত তিনি পান করিতেন না। শিশুকাল হইতেই এক ব্যতিক্রম চরিত্র লইয়া এই শিশুকন্যা বাড়িয়া উঠিতেছিল। এই রকম পুত-পবিত্র এক শিশুর তত্ত্বাবধায়ক হইতে পারিয়া হযরত যাকারিয়‍্যা (আ) সদাসর্বদা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করিতেন এবং তাঁহার যত্ন ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যাপারে অত্যন্ত তৎপর থাকিতেন। এই শিশু মারয়াম যখন একটু বড় হইলেন তখন যাকারিয়‍্যা (আ) তাঁহার জন্য মসজিদের একটি উচু প্রকোষ্ট নির্দিষ্ট করিয়া দিলেন। দিনের বেলায় তিনি একাকী ঐ প্রকোষ্ঠে নিরিবিলি 'ইবাদতে মশগুল থাকিতেন, এমনকি খাবার-দাবারের জন্যও বাহির হইতেন না, আর আপন খালার গৃহেই রাত্রি যাপন করিতেন (আম্বিয়ায়ে কুরআন, ২খ, ২৬৭)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মারয়ামের প্রতি আল্লাহ্র বিশেষ নেয়ামত ও যাকারিয়‍্যা (আ)-এর ভূমিকা

📄 মারয়ামের প্রতি আল্লাহ্র বিশেষ নেয়ামত ও যাকারিয়‍্যা (আ)-এর ভূমিকা


মসজিদের মধ্যে মারয়ামের জন্য যে প্রকোষ্ঠ নির্দিষ্ট হইয়াছিল ঐ প্রkoষ্ঠে সিঁড়ি ব্যতীত আরোহণ করা যাইত না এবং যাকারিয়‍্যা (আ) মারয়ামের নিকট নিয়মিত যাতায়াতরত অবস্থায় দেখিতে পাইতেন যে, মারয়ামের নিকট টাটকা বেমৌসুমী ফলমূলের বিপুল সমাহার। একাধিকবার যখন তিনি ইহা প্রত্যক্ষ করিলেন তখন মারয়ামকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন, "এই ফলমূল তোমার জন্য কোথা হইতে আসিল”? মারয়াম উত্তর দিলেন, "ইহা তো আল্লাহর পক্ষ হইতে"। আল-কুরআনে এইভাবে বর্ণনা আসিয়াছে:
কুল্লামা দাখালা আলাইহা যাকারিয়্যাল মিহরাবা ওয়াজাদা ইনদাহা রিযকান কালা ইয়া মারয়ামু আন্না লাকি হাذا কালাত হুয়া মিন ইনদিল্লাহি ইন্নাল্লাহা ইয়ারযুকু মাই ইয়াশাউ বিগাইরি হিসাবিন।
"যখনই যাকারিয়‍্যা কক্ষে তাহার সহিত সাক্ষাত করিতে যাইত তখনই তাহার নিকট খাদ্য-সামগ্রী দেখিতে পাইত। সে বলিত, হে মারয়াম! এইসব তুমি কোথায় পাইলে? সে বলিত, উহা আল্লাহর নিকট হইতে, আল্লাহ যাহাকে ইচ্ছা অপরিমিত জীবনোপকরণ দান করেন” (আল 'ইমরান: ৩৭)। (দ্র. রূহুল মা'আনী, ২খ, ১৪৩; জালালায়ন, পৃ. ১৭; তাফসীর সা'দী, পৃ. ১০৬)।
যাকারিয়‍্যা (আ) যে স্থানে দাঁড়াইয়া ইমামতি করিতেন ঐ স্থানকেও মিহরাব বলা হইত। বায়তুল মাকদিসে এখনও পর্যন্ত হযরত যাকারিয়‍্যা (আ)-এর মিহরাবকে সংরক্ষণ করিয়া রাখা হইয়াছে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 যাকারিয়‍্যা (আ)-এর পুত্র সন্তানের জন্য দু'আ

📄 যাকারিয়‍্যা (আ)-এর পুত্র সন্তানের জন্য দু'আ


আল্লাহর নবী যাকারিয়‍্যা (আ) কখনও আল্লাহর রহমত হইতে নিরাশ হন নাই। তদুপরি যখন তিনি প্রত্যক্ষ করিলেন যে, আল্লাহ তা'আলা মীরয়ামকে বেমৌসুমী ফলমূল দান করিতেছেন তখন তাঁহার আশা-ভরসাও প্রবল হইল। তাই তিনি পুত্র সন্তান লাভের জন্য দু'আ করিবার মনস্থ করিলেন। এই সময়ে যাকারিয়‍্যা (আ) অত্যন্ত বয়োবৃদ্ধ হইয়া গিয়াছিলেন। ইব্‌ন কাছীরের বর্ণনামতে তাঁহার বয়স ছিল সাতাত্তর বৎসর। ছা'লাবীর বর্ণনা অনুযায়ী তাঁহার বয়স হইয়াছিল ৯০/৯২ অথবা ১২০ বৎসর (কাসাসুল কুরআন, ২খ, ২৫৫)। তদুপরি তাঁহার স্ত্রী ছিলেন বন্ধ্যা। তাই নিজের বার্ধক্য এবং স্ত্রীর বন্ধ্যাত্বের দরুণ স্বাভাবিক নিয়মে সন্তান হইবার কোন সম্ভাবনা ছিল না। বাইবেলের বর্ণনায় "কিন্তু তাহাদিগের কোন সন্তান ছিল না, কেননা এলিজাবেথ ("ঈশা” যাকারিয়‍্যার স্ত্রী) বন্ধ্যা ছিলেন এবং তাহারা উভয়ে বয়সের দিক দিয়াছিলেন অত্যন্ত প্রৌঢ়" (লুক লিখিত সুসমাচার, ১৪ ৭)।
যাকারিয়‍্যা (আ) পুত্র সন্তানের জন্য এই কারণে বেশী আগ্রহী ছিলেন যাহাতে তাঁহার অনুপস্থিতিতে এই সন্তান তাঁহার সম্প্রদায়কে আল্লাহর দিকে আহ্বান জানাইতে পারে। কেননা ভ্রষ্টতার কিছু কিছু চিহ্ন তাঁহার সম্প্রদায়ের নিকট ইতোমধ্যে প্রকাশিত হইতেছিল (মা'আল আম্বিয়া ফিল কুরআন, পৃ. ৩১৩)। আল্লাহর কুদরত এবং অকল্পনীয় শক্তির ব্যাপারে যাকারিয়া (আ)-এর ছিল দৃঢ় ঈমান। তাই তিনি অত্যন্ত বিনয়াবনত চিত্তে, হৃদয়ের সবটুকু আবেগ উজাড় করিয়া দিয়া, আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাসী হইয়া সন্তানের জন্য দু'আ করিলেন। আল-কুরআনের ভাষায়:
হুনাালিকা দা'আ যাকারিয়্যা রাব্বাহু কালা রব্বি হাব লি মিন লাদুনকা যুররিয়াতান তাইয়িবাতান ইন্নাকা সামিউদ দু'আ।
"সেখানে ইয যাকারিয়‍্যা তাহার প্রতিপালকের নিকট প্রার্থনা করিয়া বলিল, 'হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে তোমার পক্ষ হইতে সৎ বংশধর দান কর; তুমিই প্রার্থনা শ্রবণকারী' (আল 'ইমরান: ৩৮)।
যিকরুর রহমাতি রাব্বিকা আবদাহু যাকারিয়্যা ইয নাদা রাব্বাহু নিদাআন খাফিয়া। কালা রব্বি ইন্নি ওাহানাল আযমু মিন্নি ওয়াশতা'আলর রা'সু শাইবাও ও লাম আকুম বিদূ'আইকা রব্বি শাকিয়া। ও ইন্নি খিফতুল মাওয়ালিয়া মিওঁ ওারাঈ ওকাানাতিলমরাতি আ'কিরাহ ফাহাব লি মিল লাদুনকা ওলিয়্যা। ইয়ারিছুনী ও ইয়ারিছু মিন আলি ইয়া'কূবা ওয়াজ'আলহু রব্বি রদিয়্যা।
"ইহা তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহের বিবরণ তাহার বান্দা যাকারিয়‍্যার প্রতি, যখন সে নিভৃতে তাহার প্রতিপালককে আহ্বান করিয়াছিল। সে বলিয়াছিল, আমার অস্থি দুর্বল হইয়াছে, বার্ধক্যে আমার মস্তক শুভ্রোজ্জ্বল হইয়াছে; হে আমার প্রতিপালক! তোমাকে আহ্বান করিয়া আমি কখনও ব্যর্থকাম হই নাই। আমার পর আমার স্বগোত্রীয়দিগের ব্যাপারে আমি আশংকা করি, আর আমার স্ত্রী বন্ধ্যা। সুতরাং তুমি তোমার নিকট হইতে আমাকে উত্তরাধিকারী দান কর যে আমার উত্তরাধিকারিত্ব করিবে এবং উত্তরাধিকারিত্ব করিবে ইয়া'কবের বংশের এবং হে আমার প্রতিপালক! তাহাকে করিও সন্তোষভাজন" (সূরা মারয়াম : ০২-০৬)।
কাতাদা (র) বলিয়াছেন, বৃদ্ধ ব্যক্তির সন্তানের জন্য দু'আ নিভৃতে হওয়াটাই স্বাভাবিক। কেননা অন্যদের নিকটে ইহা অবশ্যই অসামাঞ্জস্যপূর্ণ মনে হইবে। তাই গভীর রাত্রে সমগ্র প্রকৃত যখন ঘুমের কোলে ঢালিয়া পড়িয়াছে তখন তিনি কায়মনোবাক্যে আল্লাহকে ডাকিতে থাকিলেন। তিনি বলিলেন, ইয়া রাব্বি! ইয়া রাব্বি! ইয়া রাব্বি! সাথে সাথে আল্লাহ তা'আলা ডাকে সাড়া দিয়া বলিলেন, লাব্বায়িক, লাব্বায়িক, লাব্বায়িক! (আল-বিদায়া, ২খ, ৪৪)।
যাকারিয়‍্যা (আ) ধনসম্পদ এবং পার্থিব বস্তুর উত্তরাধিকারিত্বের জন্য সন্তান প্রার্থনা করেন নাই; বরং উত্তরাধিকারিত্ব বলিতে এইখানে মূলত নবুওয়াত, রিসালাত ও দাওয়াতী কাজের উত্তরাধিকারিত্ব বুঝান হইয়াছে। তাই তিনি বলিয়াছেন:
ফাহাব লি মিল লাদুনকা ওলিয়্যা। ইয়ারিছুনী ও ইয়ারিছু মিন আলি ইয়া'কূবা।
"তুমি তোমার নিকট হইতে আমাকে উত্তরাধিকারী দান কর, যে আমার এবং ইয়া'কূবের বংশের উত্তরাধিকারিত্ব করিবে" (মারয়াম: ৫-৬)।
নবীগণ যে সম্পদ রাখিয়া যান উহা রাষ্ট্রীয় কোষাগারের সম্পদে পরিণত হয়। বুখারী, মুসলিম, তিরমিযীসহ অন্যান্য হাদীসে আসিয়াছে:
নাহনু মা'আশারাল আম্বিয়াআ লা নূরিছু।
"আমরা নবীদের দল, আমাদের উত্তরাধিকারী হয় না। আমরা যাহা রাখিয়া যাই তাহা সাদাকাহ" (আল-বিদায়া, ২খ, ৪৫)।
অন্যদিকে যাকারিয়‍্যা (আ) তেমন কোন সম্পদের মালিক ছিলেন না, নিজের জীবিকার জন্য তাঁহার কাঠমিস্ত্রির কাজ করিতে হইত। আল্লাহর নবী দাউদ (আ)-ও নিজ শ্রমে উপার্জন দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করিতেন। তাই নিঃসন্দেহে বলা যাইতে পারে যে, এইখানে উত্তরাধিকারিত্ব বলিতে নবুওয়াতের উত্তরাধিকারিত্ব বুঝান হইয়াছে।
যাকারিয়‍্যা (আ)-এর সন্তানের জন্য দু'আকে আল্লাহ তা'আলা অত্যন্ত অলংকারপূর্ণ ভাষায় পরিপূর্ণ ভাব-গাম্ভীর্যের সহিত অতি সংক্ষেপে সূরা আম্বিয়াতে এইভাবে বর্ণনা করিয়াছেন:
ওয়াস যাকারিয়্যা ইয নাদা রাব্বাহু রাব্বি লা তাযারনী ফারদাওঁ ওয়া আনতা খাইরুল ওয়ারিছীন।
“এবং স্মরণ কর যাকারিয়‍্যার কথা, যখন সে তাহার প্রতিপালককে আহ্বান করিয়া বলিয়াছিল, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে একা রাখিও না, তুমি তো শ্রেষ্ঠ বা চূড়ান্ত মালিকানার অধিকারী" (আম্বিয়া: ৮৯)।
আল্লাহ তা'আলা যাকারিয়‍্যা (আ)-এর একনিষ্ঠ অন্তরের দু'আ কবুল করিলেন এবং তাঁহাকে ফেরেশতার মাধ্যমে পুত্র সন্তানের সুসংবাদ প্রদান করিলেন। যাকারিয়া (আ) মিহরাবে সালাত আদায় করিতে ছিলেন এমন সময়ে এক সুদর্শন যুবককে দেখিয়া কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া গেলেন। তিনি বলিলেন, আমি জিবরাঈল! তোমাকে পুত্র সন্তানের সুসংবাদ প্রদান করিবার নিমিত্তে আগমন করিয়াছি (আল-কামিল, ১খ, ১৭০)। আল-কুরআনে এই সুসংবাদের বর্ণনা আসিয়াছে:
ফানাাাদাতহুল মালায়িকাতু ও হুয়া কাাইমুন ইউসাল্লী ফিল মিহরাবি আননাল্লাহা ইউবাশ্বিরুকা বিয়াহইয়া মুসাদ্দিকাম বিকালimatin মিনাল্লাহি ওয়া সাইয়িদান ওয়া হাসূরান ওয়া নাবিইয়াম মিনাস সালিহীন।
"যখন যাকারিয়‍্যা কক্ষে সালাতে দাঁড়াইয়াছিল তখন ফেরেশতাগণ তাহাকে আহ্বান করিয়া বলিল, আল্লাহ তোমাকে ইয়াহইয়ার সুসংবাদ দিতেছেন। সে হইবে আল্লাহর বাণীর সমর্থক, নেতা, স্ত্রী-বিরাগী এবং পুণ্যবানদের মধ্যে একজন নবী" (আল ইমরান: ৩৯; দ্র. আত-তাফসীর আল-ওয়াদিহ, ৩খ, ৫৭)।
ইয়া যাকারিয়্যা ইন্না নুবশ্বিরুকা বিguলামিন ইসমুহু ইয়াহইয়া লাম নাজ'আল লাহু মিন কাবলু সামিয়্যা।
"হে যাকারিয়‍্যা! আমি তোমাকে এক পুত্রের সুসংবাদ দিতেছি। তাহার নাম হইবে ইয়াহ্ইয়া, পূর্বে এই নামে আমি কাহারও নামকরণ করি নাই" (মারয়ামঃ ০৭)।
ফাসতাজাবনা লাহু ওয়া ওয়াহাবনা লাহু ইয়াহইয়া ওয়া আসল্লাহনা লাহু যাউজাহু।
"তৎপর আমি তাহার আহ্বানে সাড়া দিয়াছিলাম এবং তাহাকে দান করিয়াছিলাম ইয়াহ্ইয়া, আর তাহার জন্য তাহার স্ত্রীকে যোগ্যতাসম্পন্ন করিয়াছিলাম" (আম্বিয়া: ৯০)।
বাইবেলের বিভিন্ন স্থানেও অনুরূপ বর্ণনা আসিয়াছে। যেমন, "একদা যখন সখরিয় নিজ পালার অনুক্রমে সদাপ্রভুর সাক্ষাতে যাজকীয় কার্য করিতেছিলেন, তখন যাজকীয় কার্যের প্রথানুসারে গুলিবাট ক্রমে তাঁহাকে প্রভুর মন্দিরে প্রবেশ করিয়া ধূপ জ্বালাইতে হইল। সেই ধূপদাহের সময়ে সমস্ত লোক বাহিরে থাকিয়া প্রার্থনা করিতেছিল। তখন প্রভুর এক দূত ধূপবেদির দক্ষিণ পার্শ্বে দাঁড়াইয়া তাঁহাকে দর্শন দিলেন। দেখিয়া সখরিয় ত্রাসযুক্ত হইলেন, ভয় তাহাকে আক্রমণ করিল। কিন্তু দূত তাঁহাকে বলিলেন, সখরিয়, ভয় করিও না, কেননা তোমার মিনতি গ্রাহ্য হইয়াছে, তোমার স্ত্রী ইলীশাবেৎ তোমার জন্য পুত্র প্রসব করিবেন, ও তুমি তাহার নাম যোহন রাখিবে। আর তোমার আনন্দ ও উল্লাস হইবে, এবং তাহার জন্মে অনেকে আনন্দিত হইবে। কারণ সে প্রভুর সম্মুখে মহান হইবে, এবং দ্রাক্ষারস কি সুরা কিছুই পান করিবে না; আর সে মাতার গর্ভ হইতেই পবিত্র আত্মায় পরিপূর্ণ হইবে; এবং ইস্রায়েল সন্তানদের মধ্যে অনেককে তাহাদের সদাপ্রভুর প্রতি ফিরাইবে" (লুক, ০১:৮-১৭)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00