📄 হয়রত যাকারিয়্যা (আ)-এর পেশা
নিঃসন্দেহে যাকারিয়্যা (আ) বানু ইসরাঈলের মধ্যে অত্যন্ত মর্যাদাবান নবী ছিলেন। আল্লাহ্র নবীগণ কখনও পরনির্ভর বা অন্যের গলগ্রহ হইয়া থাকিতে মোটেই পছন্দ করিতেন না। তাই দেখা যায় এক এক নবী জীবন যাপনের জন্য এক এক ধরনের পেশা বাছিয়া লইয়াছিলেন। মানুষ হইতে কোন কিছু গ্রহণ করাকে দাওয়াতী কাজের বিনিময় মনে করা হইতে পারে বলিয়া তাঁহারা সর্বদা মানুষের অনুগ্রহ হইতে দূরে থাকিতেন (কাসাসুল কুরআন, ২খ, ২৫৩)। আল-কুরআনে নবীদের বক্তব্য আসিয়াছে এইভাবে:
"উহার মুকাবিলায় আমি তোমাদের নিকট কোন বিনিময় চাহি না, আমার বিনিময় একমাত্র জগৎসমূহের প্রতিপালকের নিকট" (সূরা শুয়ারা: ১০৯)।
এই দৃষ্টিভঙ্গিতে হযরত যাকারিয়্যা (আ)-ও নিজের জীবিকার জন্য কাঠমিস্ত্রির পেশা গ্রহণ করিয়াছিলেন। সহীহ মুসলিম, ইন্ন মাজা ও মুসনাদে আহমাদের বর্ণনা দ্বারা ইহা প্রমাণিত হয়:
"আবু হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (আ) বলিয়াছেন: যাকারিয়্যা (আ) ছিলেন কাঠমিস্ত্রি”।
📄 মারয়াম (আ)-এর জন্ম ও যাকারিয়্যা (আ)
আল-কুরআনের সূরা আল 'ইমরানে হযরত যাকারিয়্যা (আ) প্রসংগ শুরু করিবার পূর্বে মারয়াম (আ)-এর জন্ম প্রসংগ উল্লেখ করা হইয়াছে। হযরত যাকারিয়্যা (আ)-এর স্ত্রীর এক বোন ছিল যার নাম বাইবেলে "আদার হান্নাহ" এবং মুসলিম ঐতিহাসিকদিগের নিকট "হান্নাহ বিনতে ফাকৃষ”। এই হান্নাহ্ স্বামীর নাম ছিল 'ইমরান ইবন মাছান, যিনি অত্যন্ত মর্যাদা- সম্পন্ন বুযুর্গ এবং বনূ ইসরাঈলের মধ্যে বিখ্যাত নেককার ও সাথে সাথে "হায়কাল"-এর প্রসিদ্ধ যাজক ছিলেন। হান্নাহ বার্ধক্যে উপনীত হইয়াছিলেন কিন্তু কোন সন্তানের মা হইতে পারেন নাই। তিনি একদা একটি বৃক্ষের ছায়ায় উপবেশন করিয়াছিলেন এবং সেই অবস্থায় দেখিতে পাইলেন যে, একটি পাখি তাহার ছানাকে আহার করাইতেছে। এই অবস্থা দেখিয়া তাহার সন্তান লাভের আগ্রহ অত্যন্ত প্রবল হইল। তখন তিনি একাগ্রচিত্তে আল্লাহ তাআলার নিকট দো'আ করিয়া বলিলেন, “হে আল্লাহ! যদি তুমি আমাকে একটি পুত্র সন্তান দান কর তাহা হইলে তাহাকে আমি হায়কালের খিদমতের জন্য ওয়াক্ফ্ফ করিয়া দিব"। তাহাদের নিকট এইরূপ মান্নতের পদ্ধতি চালু ছিল। এই জাতীয় সন্তানেরা সারা জীবন গীর্জার খিদমতে অতিবাহিত করিত। এইরূপ মান্নত শুধুমাত্র পুত্র সন্তানদের ক্ষেত্রে করা হইত। কেননা কন্যাসন্তানগণ এই জাতীয় খিদমতের উপযুক্ত ছিল না (আল-বিদায়া, ২খ, ৪৩-৪৪)।
আল্লাহ তা'আলা হান্নাহ বিনতে ফাকৃষের দো'আ কবুল করিয়া তাহাকে গর্ভধারিনী হইবার সৌভাগ্য দান করিলেন। এই সময়ে হান্নাহ তাহার গর্ভের সন্তানকে শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য দান করিয়াছিলেন। তাহার উদ্দেশ্য ছিল এই সন্তান জাগতিক যাবতীয় কার্যকলাপ হইতে মুক্ত থাকিয়া শুধুমাত্র আল্লাহর ইবাদত এবং “হায়কাল”-এর খেদমতে জীবন কাটাইয়া দিবে। তাহার একান্ত আকাংখা ছিল যেন পুত্র সন্তান ভূমিষ্ট হয়। পবিত্র কুরআনে এই প্রসংগ বিবৃত হইয়াছে এইভাবে:
"স্মরণ কর যখন 'ইমরানের স্ত্রী বলিয়াছিল, হে আমার প্রতিপালক! আমার গর্ভে যাহা আছে তাহা একান্ত তোমার জন্য আমি উৎসর্গ করিলাম। সুতরাং আমার নিকট হইতে তুমি ইহা কবুল কর, তুমি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ” (সূরা আল 'ইমরানঃ ৩৫)।
হান্নাহ আশা করিয়াছিলেন যে, তাহার পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করিবে, কিন্তু হইল বিপরীত। তাই তিনি মনে মনে আফসোস করিতেছিলেন (তাফসীর ইব্ন কাছীর, ১খ, ৩৩৯)। কন্যা সন্তান দেখিয়া তিনি বলিয়া উঠিলেন, আল কুরআনের ভাষায় : "হে আমার প্রতিপালক! আমি কন্যা প্রসব করিয়াছি" (আল 'ইমরান: ৩৬)।
প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা এই রকমই ছিল। তাই আল্লাহ তা'আলার পথ হইতে বলা হইল : "সে যাহা প্রসব করিয়াছে আল্লাহ তাহা সম্যক অবগত; পুত্র তো কন্যার মত নহে" (আল 'ইমরান: ৩৬)।
এইখানে মূলত বুঝানো হইয়াছে যে, কন্যা সন্তান হইলেও সে অত্যন্ত মর্যাদাসম্পন্ন হইবে (ফী যিলালিল কুরআন, ১খ, ৩৯২)। তখন হান্নাহসহ উপস্থিত সকলে মিলিত হইয়া তাহার নাম রাখিলেন মারয়াম। তাহাদের ভাষায় 'মারয়াম' শব্দের অর্থ হইল 'ইবাদতকারিণী, আল্লাহর জন্য নিবেদিতা (দ্র. সাফওয়াতু'ত-তাফাসীর, ১খ, ১৯৯)। আর সাথে সাথে শয়তানের কুমন্ত্রণা হইতে সংরক্ষণের দু'আ করিয়া তিনি বলিলেন:
"আমি উহার নাম রাখিয়াছি "মারয়াম"; এবং অভিশপ্ত শয়তান হইতে তাহার ও তাহার বংশধরদের জন্য তোমার নিকট আশ্রয় চাহিতেছি” (আল 'ইমরান: ৩৬)।
আল্লাহ তা'আলা হান্নাহর এই দু'আ কবুল করিয়াছেন এবং মারয়াম ও তাহার পুত্র 'ঈসাকে শয়তানের কুমন্ত্রণা হইতে রক্ষা করিয়াছেন (তাফসীর বায়দাবী, ১খ, ১৫৭)। ইহার প্রমাণ রহিয়াছে বুখারী এবং মুসলিমে বর্ণিত হাদীছে:
"আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: এমন কোন নবজাতক নাই যাহাকে জন্মের মুহূর্তে শয়তান স্পর্শ করে না। আর তখন সে শয়তানের স্পর্শে চিৎকার করিয়া কাঁদিয়া উঠে। তবে মারয়াম এবং তাহার সন্তান ইহার ব্যতিক্রম। অতঃপর তিনি তিলাওয়াত করিলেন : অভিশপ্ত শয়তান হইতে তাহার ও তাহার বংশধরদের জন্য তোমার নিকট আশ্রয় চাহিতেছি" (ইবন কাছীর, তাফসীর, ১খ, ৩৩৯)।
মারয়ামের তত্ত্বাবধায়ক হিসাবে যাকারিয়্যা (আ)
এই মারয়াম নাম্নী ক্ষণজন্মা কন্যার তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত হইয়াছিলেন হযরত যাকারিয়্যা (আ)। আল্লাহ তা'আলা মারয়ামকে বিশেষ ফযীলত ও মর্যাদা দান করিয়াছিলেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে 'হায়কাল'-এর প্রচলিত নিয়মনীতি ভঙ্গ করিয়া উহার খিদমতকারিনী হিসাবে গ্রহণ করিয়া লইয়াছিলেন। ফলে হায়কালের খাদেমদের মনে তাঁহার ব্যাপারে বিশেষ কৌতূহল সৃষ্টি হইয়াছিল (আম্বিয়ায়ে কুরআন, ২খ, ২৬৬; আল-বিদায়া, ১খ, ৪৪)। আল্লাহ তা'আলা তাহাকে গ্রহণ করিয়া লইয়াছিলেন, তাহার সবচাইতে বড় প্রমাণ হইল কুরআনের বাণী:
"অতঃপর তাহার প্রতিপালক তাহাকে সাগ্রহে কবুল করিলেন এবং তাহাকে উত্তমরূপে লালন-পালন করিলেন" (আল ইমরান: ৩৭)।
তবে একটা প্রশ্নে 'হায়কাল'-এর যাজকগণ পরস্পর মতানৈক্য করিতে লাগিলেন যে, কে মারয়ামের তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত হইবেন? কেননা মারয়াম ছিল তাহাদের নেতা এবং উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন লোক 'ইমরান ইবন মাছানের দুহিতা। তাই তাহাদের প্রত্যেকেই মারয়ামের তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত হওয়াকে অত্যন্ত গর্বের বিষয় মনে করিতে লাগিলেন (আল-কামিল, ১খ, ১৭০; তাফসীর ফাতহুল কাদীর, ১খ, ৩৩৯)।
হযরত যাকারিয়্যা (আ) বলিলেন, আমি তাহার তত্ত্বাবধায়ক হইবার বেশি হকদার। কেননা তাহার খালা আমার নিকটে রহিয়াছে। কিন্তু অন্যরা এই ব্যাপারে ছাড় দিতে রাজি হইল না। তাই অবশেষে লটারীর মাধ্যমে ফয়সালা হইবে বলিয়া ঠিক করা হইল। আল্লাহ তা'আলার ভাষায়:
"ইহা অদৃশ্য বিষয়ের সংবাদ, যাহা তোমাকে ঐশীবাণী দ্বারা অবহিত করিতেছি। মারয়ামের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব তাহাদের মধ্যে কে গ্রহণ করিবে ইহার জন্য যখন তাহারা তাহাদের কলম নিক্ষেপ করিতেছিল, তুমি তখন তাহাদের নিকট ছিলে না এবং যখন তাহারা বাদানুবাদ করিতেছিল তখনও তুমি তাহাদের নিকট ছিলে না" (আল 'ইমরান: ৪৪)।
এই আয়াতের তাফসীরে বিস্তারিত ঘটনা বিভিন্ন তাফসীরের কিতাবে বর্ণিত হইয়াছে। ইহার সংক্ষিপ্তসার হইল: হায়কালে সুলায়মানীর খেদমত এবং হেফাযতের জন্য একদল খাদেম এবং স্বেচ্ছাসেবক নিযুক্ত থাকিতেন। তাহারা 'ইবাদতখানার রক্ষণাবেক্ষণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, সালাতে ইমামতি করা ইত্যাদি দায়িত্ব অতি যত্নের সহিত পালন করিতেন। মারয়ামের পিতা 'ইমরান এই দলের নেতা ছিলেন এবং সালাতে তিনি ইমামতিও করিতেন। তাহার ইন্তিকালের পর যখন হান্নাহ মারয়ামকে লইয়া বায়তুল মাকদিসে গিয়া বলিলেন, এই কন্যাকে আমি হায়কালের উদ্দেশ্যে রাখিয়া যাইতে চাই। তখন যাকারিয়া (আ) বলিলেন, আমিই তাহার তত্ত্বাবধায়ক হইব। কিন্তু তাহাতে অন্যান্য যাজকগণ রাজি হইলেন না, বরং তাহারা লটারী করিবার পরামর্শ দিলেন। অবশেষে তাহারা সকলে জর্দান নদীর তীরে যাইয়া হাজির হইলেন এবং যে কলম দ্বারা তাহারা তাওরাত লিখিতেন সেই কলমকে নদীর স্রোতের মধ্যে নিক্ষেপ করিলেন। যে কোন লটারীর ক্ষেত্রেই তাহারা এইরূপ তাওরাত লিখিবার কলমকে নিক্ষেপ করিতেন। যাহার কলম স্রোতে ভাসিয়া না যাইয়া স্থির থাকিত অথবা স্রোতের উল্টা দিকে যাইত তিনি লটারী জিতিয়াছেন বলিয়া মান্য করা হইত। অবশেষে সবাইকে অবাক করিয়া দিয়া যাকারিয়্যা (আ)-এর কলম স্থির রহিল এবং স্রোতের উল্টা দিকে যাইতে লাগিল (তাফসীরু'ত-তাবারী, ৩খ, ৩৬২; তাফসীর ইবন আতিয়্যাহ, ৩খ, ১১৬-১১৭; তাফসীর ইব্ন কাদীর, ১খ, ৩৪৩; জাসসাস, আহকামুল কুরআন, ২খ, ১৬; কুরতুবী, আল-জামে লি-আহকামিল কুরআন, ৪খ, ৯১-৯৪; ফাতহুল কাদীর, ১খ, ৩৩৯; আল-কামিল, ১খ, ১৭০; আবদুল মাজেদ দরিয়াবাদী তাফসীরে কুরআন, পৃ. ১৩৩)। বুখারী শরীফেও এই সংক্রান্ত স্পষ্ট বর্ণনা রহিয়াছে:
"সমস্যাসংকুল বিষয়ে লটারী প্রসংগে এই পরিচ্ছেদ; এবং আল্লাহ তা'আলার বাণী ("যখন তাহারা তাহাদের কলমগুলি নিক্ষেপ করিতেছিল তাহাদের মধ্যে কে মারয়ামের তত্ত্বাবধায়ক হইবে"?)। ইব্ন আব্বাস (রা) বলিয়াছেন, তাহারা লটারী করিল, অতঃপর স্রোতের সহিত কলমগুলি ভাসিয়া গেল এবং যাকারিয়্যার কলম স্রোতের উঁচুতে উঠিয়া গেল তখন যাকারিয়্যা তাহার অভিভাবক হইলেন"।
📄 মারয়ামের তত্ত্বাবধায়ক হিসাবে যাকারিয়া (আ)
এই মারয়াম নাম্নী ক্ষণজন্মা কন্যার তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত হইয়াছিলেন হযরত যাকারিয়্যা (আ)। আল্লাহ তা'আলা মারয়ামকে বিশেষ ফযীলত ও মর্যাদা দান করিয়াছিলেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে 'হায়কাল'-এর প্রচলিত নিয়মনীতি ভঙ্গ করিয়া উহার খিদমতকারিনী হিসাবে গ্রহণ করিয়া লইয়াছিলেন। ফলে হায়কালের খাদেমদের মনে তাঁহার ব্যাপারে বিশেষ কৌতূহল সৃষ্টি হইয়াছিল (আম্বিয়ায়ে কুরআন, ২খ, ২৬৬; আল-বিদায়া, ১খ, ৪৪)। আল্লাহ তা'আলা তাহাকে গ্রহণ করিয়া লইয়াছিলেন, তাহার সবচাইতে বড় প্রমাণ হইল কুরআনের বাণী:
ফাতাকাব্বালাহা রাব্বুহা বি-কাবূলিন হাসানিন ওয়া আনবাতা'হা নাতা’বাতা’ন হাসানা’ন
“অতঃপর তাহার প্রতিপালক তাহাকে সাগ্রহে কবুল করিলেন এবং তাহাকে উত্তমরূপে লালন-পালন করিলেন” (আল ইমরান: ৩৭)।
তবে একটা প্রশ্নে 'হায়কাল'-এর যাজকগণ পরস্পর মতানৈক্য করিতে লাগিলেন যে, কে মারয়ামের তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত হইবেন? কেননা মারয়াম ছিল তাহাদের নেতা এবং উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন লোক 'ইমরান ইবন মাছানের দুহিতা। তাই তাহাদের প্রত্যেকেই মারয়ামের তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত হওয়াকে অত্যন্ত গর্বের বিষয় মনে করিতে লাগিলেন (আল-কামিল, ১খ, ১৭০; তাফসীর ফাতহুল কাদীর, ১খ, ৩৩৯)।
হযরত যাকারিয়্যা (আ) বলিলেন, আমি তাহার তত্ত্বাবধায়ক হইবার বেশি হকদার। কেননা তাহার খালা আমার নিকটে রহিয়াছে। কিন্তু অন্যরা এই ব্যাপারে ছাড় দিতে রাজি হইল না। তাই অবশেষে লটারীর মাধ্যমে ফয়সালা হইবে বলিয়া ঠিক করা হইল। আল্লাহ তা'আলার ভাষায়:
যালিকা মিন আম্বায়িল গায়বি নূ'হীহি ইলায়কা ওমা কুনতা লাদাইহিম ইয ইয়ুলকূনা আকলামাহুম আইয়ুহুম ইয়াকফুলু মারয়ামা ওমা কুনতা লাদাইহিম ইয ইয়াখতাসিমূন।
“ইহা অদৃশ্য বিষয়ের সংবাদ, যাহা তোমাকে ঐশীবাণী দ্বারা অবহিত করিতেছি। মারয়ামের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব তাহাদের মধ্যে কে গ্রহণ করিবে ইহার জন্য যখন তাহারা তাহাদের কলম নিক্ষেপ করিতেছিল, তুমি তখন তাহাদের নিকট ছিলে না এবং যখন তাহারা বাদানুবাদ করিতেছিল তখনও তুমি তাহাদের নিকট ছিলে না” (আল 'ইমরান: ৪৪)।
এই আয়াতের তাফসীরে বিস্তারিত ঘটনা বিভিন্ন তাফসীরের কিতাবে বর্ণিত হইয়াছে। ইহার সংক্ষিপ্তসার হইল: হায়কালে সুলায়মানীর খেদমত এবং হেফাযতের জন্য একদল খাদেম এবং স্বেচ্ছাসেবক নিযুক্ত থাকিতেন। তাহারা 'ইবাদতখানার রক্ষণাবেক্ষণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, সালাতে ইমামতি করা ইত্যাদি দায়িত্ব অতি যত্নের সহিত পালন করিতেন। মারয়ামের পিতা 'ইমরান এই দলের নেতা ছিলেন এবং সালাতে তিনি ইমামতিও করিতেন। তাহার ইন্তিকালের পর যখন হান্নাহ মারয়ামকে লইয়া বায়তুল মাকদিসে গিয়া বলিলেন, এই কন্যাকে আমি হায়কালের উদ্দেশ্যে রাখিয়া যাইতে চাই। তখন যাকারিয়া (আ) বলিলেন, আমিই তাহার তত্ত্বাবধায়ক হইব। কিন্তু তাহাতে অন্যান্য যাজকগণ রাজি হইলেন না, বরং তাহারা লটারী করিবার পরামর্শ দিলেন। অবশেষে তাহারা সকলে জর্দান নদীর তীরে যাইয়া হাজির হইলেন এবং যে কলম দ্বারা তাহারা তাওরাত লিখিতেন সেই কলমকে নদীর স্রোতের মধ্যে নিক্ষেপ করিলেন। যে কোন লটারীর ক্ষেত্রেই তাহারা এইরূপ তাওরাত লিখিবার কলমকে নিক্ষেপ করিতেন। যাহার কলম স্রোতে ভাসিয়া না যাইয়া স্থির থাকিত অথবা স্রোতের উল্টা দিকে যাইত তিনি লটারী জিতিয়াছেন বলিয়া মান্য করা হইত। অবশেষে সবাইকে অবাক করিয়া দিয়া যাকারিয়্যা (আ)-এর কলম স্থির রহিল এবং স্রোতের উল্টা দিকে যাইতে লাগিল (তাফসীরু'ত-তাবারী, ৩খ, ৩৬২; তাফসীর ইবন আতিয়্যাহ, ৩খ, ১১৬-১১৭; তাফসীর ইব্ন কাদীর, ১খ, ৩৪৩; জাসসাস, আহকামুল কুরআন, ২খ, ১৬; কুরতুবী, আল-জামে লি-আহকামিল কুরআন, ৪খ, ৯১-৯৪; ফাতহুল কাদীর, ১খ, ৩৩৯; আল-কামিল, ১খ, ১৭০; আবদুল মাজেদ দরিয়াবাদী তাফসীরে কুরআন, পৃ. ১৩৩)। বুখারী শরীফেও এই সংক্রান্ত স্পষ্ট বর্ণনা রহিয়াছে:
বাবুল কুরাআতি ফিল মুশকিলাতি ওয়া কাওলুহু আযযা ওয়া জাল্লা ইয ইয়ুলকূনা আকলামাহum আইয়ুহুম ইয়াকফুলু মারয়ামা ওয়া কালা ইবন আব্বাশ ইকতারাউ ফাজারাতিল আকলামু মা'আল জিরয়াতি ওয়া আ'লা কালামু যাকারিয়্যাল জিরয়াতি ফাকাফফালহা যাকারিয়্যা।
"সমস্যাসংকুল বিষয়ে লটারী প্রসংগে এই পরিচ্ছেদ; এবং আল্লাহ তা'আলার বাণী ("যখন তাহারা তাহাদের কলমগুলি নিক্ষেপ করিতেছিল তাহাদের মধ্যে কে মারয়ামের তত্ত্বাবধায়ক হইবে"?)। ইব্ন আব্বাস (রা) বলিয়াছেন, তাহারা লটারী করিল, অতঃপর স্রোতের সহিত কলমগুলি ভাসিয়া গেল এবং যাকারিয়্যার কলম স্রোতের উঁচুতে উঠিয়া গেল তখন যাকারিয়্যা তাহার অভিভাবক হইলেন" (ফাতহুল বারী, ৫খ, ৩৪৫)। এইভাবে আল্লাহ তা'আলা মারয়ামকে তাঁহার স্নেহময় খালু এবং স্নেহময়ী খালার ক্রোড়ে নিয়া আসিলেন।
📄 যাকারিয়্যা (আ)-এর ক্রোড়ে শিশু মারয়াম
লটারীর মাধ্যমে যে অসাধারণ শিশুর তিনি তত্ত্বাবধায়ক হইয়াছেন তাহার প্রতি তিনি এবং তাঁহার স্ত্রী 'ঈশা' বিশেষ যত্ন নিতেন। শিশু মারয়াম তাঁহার খালা উম্মে য়াহয়ার তত্ত্বাবধানে দুধ পান করিতেন (আল-কামিল, ১খ, ১৭০)। খালা ব্যতীত অন্য কোন মহিলার দুধ সাধারণত তিনি পান করিতেন না। শিশুকাল হইতেই এক ব্যতিক্রম চরিত্র লইয়া এই শিশুকন্যা বাড়িয়া উঠিতেছিল। এই রকম পুত-পবিত্র এক শিশুর তত্ত্বাবধায়ক হইতে পারিয়া হযরত যাকারিয়্যা (আ) সদাসর্বদা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করিতেন এবং তাঁহার যত্ন ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যাপারে অত্যন্ত তৎপর থাকিতেন। এই শিশু মারয়াম যখন একটু বড় হইলেন তখন যাকারিয়্যা (আ) তাঁহার জন্য মসজিদের একটি উচু প্রকোষ্ট নির্দিষ্ট করিয়া দিলেন। দিনের বেলায় তিনি একাকী ঐ প্রকোষ্ঠে নিরিবিলি 'ইবাদতে মশগুল থাকিতেন, এমনকি খাবার-দাবারের জন্যও বাহির হইতেন না, আর আপন খালার গৃহেই রাত্রি যাপন করিতেন (আম্বিয়ায়ে কুরআন, ২খ, ২৬৭)।