📄 হযরত যাকারিয়্যা (আ)-এর সময়কাল
হযরত যাকারিয়্যা (আ)-এর সময়কাল ছিল খৃষ্টপূর্ব ১ম শতাব্দী। যেহেতু তিনি ইয়াহ্ইয়া ('আ)-এর পিতা, 'ইমরান ইব্ন মাছানের ভায়রা, মারয়াম (আ)-এর খালু, তথা ঈসা (আ)-এর মায়ের খালু এবং তাঁহার তত্ত্বাবধায়ক, তাই প্রমাণিত হয় যে, যাকারিয়্যা (আ), ইয়াহইয়া ('আ) এবং ঈসা ('আ) সমসাময়িক ছিলেন (আম্বিয়া-ই কুরআন, ২খ, ২৬০; ইসলামী বিশ্বকোষ, ২১খ, ৪৮৫)।
বারনাবাসের বাইবেলের বর্ণনা দ্বারাও প্রমাণিত হয় যে, হযরত যাকারিয়্যা ('আ) হযরত ঈসা (আ)-এর জীবদ্দশাতে বাঁচিয়া ছিলেন। এখানে বলা হইয়াছে যে, ঈসা ('আ) ইয়াহুদীদিগকে সম্বোধন করিয়া বলিয়াছিলেন, "অতি সত্বর তোমাদিগকে সেইসব নবীদিগের রক্তের বদলা দিতে হইবে যাহাদিগকে তোমরা যাকারিয়্যা ইবন বারখিয়ার সময় পর্যন্ত হত্যা করিয়াছ, আর যাকারিয়্যাকে তোমরা হায়কাল (ইবাদতখানা) ও কুররানীখানার মধ্যবর্তী স্থানে হত্যা করিয়াছ" (কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৪৩৯)।
তাই পূর্বের আলোচনা হইতে ইহা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, হযরত যাকারিয়্যা (আ)-এর সময়কাল ছিল খৃষ্টপূর্ব ১ম শতাব্দী হইতে খৃস্টীয় ১ম শতাব্দী পর্যন্ত (যাকারিয়্যা (আ)-এর সময়-কালের একটি ঐতিহাসিক মানচিত্র সংযোজিত হইল]।
বনূ ইসরাঈলদের মধ্যে 'যাকারিয়্যা' খৃস্টপূর্ব প্রায় পঞ্চম শতাব্দীতে আগমন করিয়াছিলেন। ফারিস-এর বাদশাহ দ্বারা ইবন গাশতাসার-এর সময় তিনি আর্বিভূত হন। আর অন্যজন হইলেন বক্ষমাণ প্রবন্ধের আলোচ্য ব্যক্তিত্ব মারয়াম (আ)-এর খালু যাকারিয়্যা (আ) (কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৪৩৮)।
প্রথম যাকারিয়্যার বর্ণনা কুরআনে আসে নাই। তবে বাইবেলের পুরাতন নিয়মে তাঁহার বর্ণনা আসিয়াছে (Book of Zechariah-01 : 01; The New Encyclopaedia of Britannica, 10v, 869; Colliers' Encyclopedia, 23v, 754)। ইব্ন গাশতাসাব-এর সময়ে যখন বায়তুল মাকদিস সংস্কার করা হইয়াছিল তখন তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করিয়াছিলেন। বাইবেলে বর্ণিত অত্র যাকারিয়্যা এবং যাকারিয়্যা (আ)-এর আগমনের মাঝে পার্থক্য প্রায় পাঁচ শত বৎসর। কেননা যাকারিয়্যা (আ) ঈসা (আ)-এর মাতা মারয়ামের খালু ছিলেন (কাসাসুল কুরআন, ২খ, ২৫০)।
📄 আল-কুরআনে যাকারিয়্যা (আ) প্রসংগ
আল-কুরআনে ৪টি সূরায় সর্বমোট ৭ বার "যাকারিয়্যা” নামটি উল্লিখিত হইয়াছে।
সূরা নং ০৩, আয়াত নং ৩৭ = ০২ বার
সূরা নং ০৩, আয়াত নং ৩৮ = ০১ বার
সূরা নং ০৬, আয়াত নং ৮৫ = ০১বার
সূরা নং ১৯, আয়াত নং ০২ = ০১বার
সূরা নং ১৯, আয়াত নং ০৭ = ০১বার
সূরা নং ২১, আয়াত নং ৮৯ = ০১বার
(আল-মু'জামুল মুফাহরাস লি-আলফাযিল কুরআন, ৪০ পৃ.)।
যাকারিয়্যা (আ)-এর সহিত সংশ্লিষ্ট অনেক ঘটনার বর্ণনা কুরআনে আসিয়াছে। তাহা নিম্নরূপ: সূরা আল 'ইমরানের ৩৫ নং আয়াত হইতে হযরত মারয়াম (আ)-এর জন্মবৃত্তান্ত আলোচিত হইয়াছে। যাকারিয়্যা (আ) ছিলেন তাঁহার তত্ত্বাবধায়ক। এই প্রসংগেই যাকারিয়্যা (আ)-এর বিষয় আলোচিত হইয়াছে। ঘটনার শুরু হইতে বর্ণনা এই রকম:
ইমরানের স্ত্রী বলিয়াছিল, 'হে আমার প্রতিপালক! আমার গর্ভে যাহা আছে তাহা একান্ত তোমার জন্য আমি উৎসর্গ করিলাম। সুতরাং তুমি আমার নিকট হইতে উহা কবুল কর। নিশ্চয় তুমি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। অতঃপর যখন সে উহাকে প্রসব করিল তখন বলিল, হে আমার প্রতিপালক! আমি কন্যা প্রসব করিয়াছি। সে যাহা প্রসব করিয়াছে আল্লাহ তাহা সম্যক অবগত। পুত্র তো কন্যার মত নয়। আমি উহার নাম রাখিয়াছি "মারয়াম" এবং অভিশপ্ত শয়তান হইতে তাহার ও তাহার বংশধরদের জন্য তোমার আশ্রয় চাহিতেছি। অতঃপর তাহার প্রতিপালক তাহাকে আগ্রহে কবুল করিলেন এবং তাহাকে উত্তমরূপে লালন-পালন করিলেন এবং তিনি তাহাকে যাকারিয়্যার তত্ত্বাবধানে রাখিয়াছিলেন। যখনই যাকারিয়্যা কক্ষে তাহার সহিত সাক্ষাত করিতে যাইত তখনই তাহার নিকট খাদ্য-সামগ্রী দেখিতে পাইত। সে বলিত, 'হে মারয়াম! এই সব তুমি কোথায় পাইলে?' সে বলিত, উহা আল্লাহর নিকট হইতে। আল্লাহ যাহাকে ইচ্ছা অপরিমিত জীবনোপকরণ দান করেন। সেখানেই যাকারিয়্যা তাহার প্রতিপালকের নিকট প্রার্থনা করিয়া বলিল, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে তুমি তোমার নিকট হইতে সৎ বংশধর দান কর। নিশ্চয় তুমি প্রার্থনা শ্রবণকারী। যখন যাকারিয়্যা কক্ষে সালাতে দাঁড়াইয়াছিল তখন ফেরেশতাগণ তাহাকে সম্বোধন করিয়া বলিল, আল্লাহ তোমাকে ইয়াহ্ইয়ার সুসংবাদ দিতেছেন, সে হইবে আল্লাহর বাণীর সমর্থক, নেতৃস্থানীয়, স্ত্রী বিরাগী এবং পুণ্যবানদের মধ্যে একজন নবী। সে বলিল, হে আমার প্রতিপালক! আমার পুত্র হইবে কিরূপে? আমার তো বার্ধক্য আসিয়াছে এবং আমার স্ত্রী বন্ধ্যা। তিনি বলিলেন, এইভাবেই। আল্লাহ যাহা ইচ্ছা তাহা করেন। সে বলিল, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে একটি নিদর্শন দাও। তিনি বলিলেন, তোমার নিদর্শন এই যে, তিন দিন তুমি ইংগিত ব্যতীত কথা বলিতে পারিবে না। আর তোমার প্রতিপালককে অধিক স্মরণ করিবে এবং সন্ধ্যায় ও প্রভাতে তাঁহার মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষণা করিবে” (সূরা আল 'ইমরান: ৩৫-৪১)।
সূরা আন'আমে হযরত ইবরাহীম (আ)-এর প্রসংগ বর্ণনার শেষের দিকে যাকারিয়্যা (আ)-এর উল্লেখ আসিয়াছে:
"এবং ইহা আমার যুক্তি-প্রমাণ যাহা ইবরাহীমকে দিয়াছিলাম তাহার সম্প্রদায়ের মুকাবিলায়। যাহাকে ইচ্ছা মর্যাদায় আমি উন্নীত করি, তোমার প্রতিপালক প্রজ্ঞাময়, জ্ঞানী। এবং তোমাদের দান করিয়াছিলাম ইসহাক ও ইয়া'কূব, তাহাদের প্রত্যেককে সৎপথে পরিচালিত করিয়াছিলাম, পূর্বে নূহকেও সৎপথে পরিচালিত করিয়াছিলাম এবং তাহার বংশধর দাউদ, সুলায়মান, আয়্যব, ইউসুফ, মূসা ও হারুনকেও, আর এইভাবেই সৎকর্মশীলদিগকে পুরষ্কৃত করি। এবং যাকারিয়্যা, ইয়াহ্ইয়া, 'ঈসা ও ইলয়াসকেও সৎপথে পরিচালিত করিয়াছিলাম, ইহারা সকলে সজ্জনদিগের অন্তর্ভুক্ত। আরও সৎপথে পরিচালিত করিয়াছিলাম ইসমা'ঈল, আল-য়াসা'আ, ইউনুস ও লূতকে এবং শ্রেষ্ঠত্ব দান করিয়াছিলাম বিশ্বজগতের উপর প্রত্যেককে" (সূরা আন'আম: ৮৩-৮৬)।
সূরা মারয়ামের ০১ হইতে ১১ নং আয়াত পর্যন্ত যাকারিয়্যা (আ)-এর অতি বৃদ্ধ বয়সে সন্তান জন্ম প্রসংগ বিবৃত হইয়াছে। আল্লাহ তাআলা বলিয়াছেন:
কাফ-হা-ইয়া-'আয়ন-সাদ। ইহা তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহের বিবরণ তাঁহার বান্দা যাকারিয়্যার প্রতি। যখন সে নিভৃতে তাহার প্রতিপালককে আহ্বান করিয়াছিল। সে বলিয়াছিল, আমার অস্থি দুর্বল হইয়াছে, বার্ধক্যে আমার মস্তক শুভ্রোজ্জ্বল হইয়াছে। হে আমার প্রতিপালক! তোমাকে আহ্বান করিয়া আমি কখনও ব্যর্থকাম হই নাই। আমার পর আমার স্বগোত্রীয়দিগের সম্পর্কে আমি আশংকা করি; আর আমার স্ত্রী বন্ধ্যা। সুতরাং তুমি তোমার নিকট হইতে আমাকে উত্তরাধিকারী দান কর। সে আমার উত্তরাধিকারিত্ব করিবে এবং উত্তরাধিকারিত্ব করিবে য়া'কূবের বংশের এবং হে আমার প্রতিপালক! তাহাকে করিও সন্তোষভাজন। হে যাকারিয়্যা! আমি তোমাকে এক পুত্রের সুসংবাদ দিতেছি, তাহার নাম হইবে ইয়াহ্ইয়া, এই নামে পূর্বে কাহারো নামকরণ করি নাই। সে বলিল, হে আমার প্রতিপালক! কেমন করিয়া আমার পুত্র হইবে অথচ আমার স্ত্রী বন্ধ্যা এবং আমি বার্ধক্যের শেষ সীমায় উপনীত। তিনি বলিলেন, এইরূপই হইবে। তোমার প্রতিপালক বলিলেন, ইহা আমার জন্য সহজসাধ্য, আমি তো পূর্বে তোমাকে সৃষ্টি করিয়াছি যখন তুমি কিছুই ছিলে না। যাকারিয়্যা বলিল, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে একটি নিদর্শন দাও। তিনি বলিলেন, তোমার নিদর্শন এই যে, তুমি সুস্থ থাকা সত্ত্বেও কাহারও সহিত তিন দিন বাক্যালাপ করিবে না। অতঃপর সে কক্ষ হইতে বাহির হইয়া তাহার সম্প্রদায়ের নিকট আসিল ও ইঙ্গিতে তাহাদিগকে সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষণা করিতে বলিল" (সূরা মারয়াম ৪:০১-১১)।
"এবং স্মরণ কর যাকারিয়্যার কথা, যখন সে তাহার প্রতিপালককে আহ্বান করিয়া বলিয়াছিল, 'হে আমার প্রতিপালক! আমাকে একা রাখিও না, তুমি তো শ্রেষ্ঠ মালিকানার অধিকারী'। অতঃপর আমি তাহার আহ্বানে সাড়া দিয়াছিলাম এবং তাহাকে দান করিয়াছিলাম ইয়াহ্ইয়া এবং তাহার জন্য তাহার স্ত্রীকে সন্তান ধারণের উপযোগী করিয়াছিলাম। তাহারা সৎকর্মের প্রতিযোগিতা করিত, তাহারা আমাকে ডাকিত আশা ও ভীতির সহিত এবং তাহারা ছিল আমার নিকট বিনীত" (সূরা আম্বিয়া: ৮৯-৯০)।
কুরআনে অন্য এক আয়াতে পরোক্ষে যাকারিয়্যা (আ)-এর প্রসংগ আসিয়াছে। মারয়াম (আ)-এর অভিভাবকত্ব গ্রহণের ব্যাপারে যখন তাহারা লটারী করিয়াছিলেন সেই প্রসংগের বর্ণনায় আল-কুরআনে বলা হইয়াছে:
"ইহা অদৃশ্য বিষয়ের সংবাদ যাহা তোমাকে ওহী দ্বারা অবহিত করিতেছি। মারয়ামের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব তাহাদের মধ্যে কে গ্রহণ করিবে ইহার জন্য যখন তাহারা তাহাদের কলম নিক্ষেপ করিতেছিল, তুমি যখন তাহাদের নিকট ছিলে না এবং যখন তাহারা বাদানুবাদ করিতেছিল তখনও তুমি তাহাদের নিকট ছিলে না" (সূরা আল 'ইমরান: ৪৪)।
📄 হাদীছে যাকারিয়্যা (আ) প্রসংগ
হাদীস শরীফে যাকারিয়্যা (আ) সম্পর্কিত বর্ণনা নিতান্ত কম। বুখারী, মুসলিম, ইবন মাজা ও মুসনাদে আহমাদে এই সংক্রান্ত কিছু বর্ণনা পরিলক্ষিত হয় (আল-মু'জামুল মুফাহরাস লি আলফাযিল হাদীছ, ৮খ, ৮৭)।
(১) বুখারী শরীফের কিতাবু'শ শাহাদাত-এ যাকারিয়্যা (আ) সংক্রান্ত তথ্য ইমাম বুখারী (র) বাবের শিরোনামে এভাবে বর্ণনা করিয়াছেন:
"সমস্যাসংকুল বিষয়ে লটারী সংক্রান্ত পরিচ্ছেদ এবং আল্লাহ তা'আলার বাণীঃ "যখন তাহারা তাহাদের কলমগুলি নিক্ষেপ করিতেছিল, তাহাদের কে মারয়ামের তত্ত্বাবধায়ক হইবে"। ইবন আব্বাস (রা) বলিয়াছেন, তাহারা লটারী করিল, অতঃপর স্রোতের সহিত কলমগুলি ভাসিয়া গেল এবং যাকারিয়্যার কলম স্রোতের উঁচুতে উঠিয়া গেল, তখন যাকারিয়্যা তাহার অভিভাবক হইল" (আসকালানী, ফাতহুল বারী, ৫খ, ৩৪৫)।
(২) অনুরূপভাবে বুখারীর কিতাবুল আম্বিয়ার এক স্থানেও যাকারিয়্যা (আ) প্রসংগ উল্লেখ পূর্বক বাবের শিরোনাম। ইমাম বুখারী (র) বলিয়াছেন:
"বক্ষমাণ পরিচ্ছেদ আল্লাহ তা'আলার এই বাণী প্রসংগে: কাফ-হা-ইয়া 'আয়ন-সাদ। ইহা তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহের বিব্ররণ তাঁহার বান্দা যাকারিয়্যার প্রতি। যখন সে নিভৃতে তাহার প্রতিপালককে আহ্বান করিয়াছিল। সে বলিয়াছিল, হে আমার রব! আমার অস্থি দুর্বল হইয়াছে, বার্ধক্যে আমার মস্তক শুভ্রোজ্জ্বল হইয়াছে...... এই নামে পূর্বে আমি কাহারও নামকরণ করি নাই।" অবশ্য ইমাম বুখারী (র) এই বাবে সরাসরি যাকারিয়্যা (আ) সংক্রান্ত কোন হাদীছ উল্লেখ করেন নাই ('আয়নী, উমদাতুল কারী, ৮খ, ১৯)।
(৩) ইমাম মুসলিম (র) এক স্থানে যাকারিয়্যা (আ) সংক্রান্ত একটি হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন:
আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: যাকারিয়্যা (আ) কাঠমিস্ত্রি বা সুতার ছিলেন" (সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ফাদাইল, ৫খ, ১৩৫)।
(৪) ইমাম ইব্ন মাজা মুসলিমে বর্ণিত উপরিউক্ত হাদীছ ভিন্ন সনদে বর্ণনা করিয়াছেন (দ্র. ইব্ন মাজা, ২খ, ৭২৭, হাদীছ নং ২১৫০)।
(৫) ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বলও মুসলিম শরীফে উল্লিখিত একই হাদীছ ভিন্ন সনদে বর্ণনা করিয়াছেন (আল-বিদায়া, ২খ, ৪৫)।
(৬) ইসহাক ইন্ন বিশ্ব তাঁহার কিতাব আল-মুবতাদা-এ যাকারিয়্যা (আ) সংক্রান্ত একখানা দীর্ঘ হাদীছ উল্লেখ করিয়াছেন। অবশ্য আল্লামা ইব্ন কাছীর হাদীছখানাকে আশ্চর্যজনক এবং মারফু হিসাবে বর্ণনা করা সঠিক নয়" বলিয়াছেন )আল-বিদায়া, ২খ, ৫০)।
"ইব্ন আব্বাস (রা) বর্ণনা করিয়াছেন যে, যেই রাত্রিতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইসরা ও মি'রাজ হইয়াছিল সেই রাত্রিতে তিনি আসমানে যাকারিয়্যা (আ)-কে দেখিয়াছিলেন। তিনি তাঁহাকে সালাম প্রদান করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, হে আবু ইয়াহ্ইয়া! আপনাকে কিভাবে হত্যা করা হইয়াছিল সেই সম্পর্কে আমাকে বলুন এবং বনূ ইসরাঈল কেন আপনাকে হত্যা করিয়াছিল? যাকারিয়্যা (আ) বলিলেন, হে মুহাম্মাদ! তাহা হইলে আপনাকে বলি: ইয়াহইয়া তাহার সময়ের সর্বোত্তম ব্যক্তি ছিল, সৌন্দর্য এবং উজ্জ্বলতার দিক হইতে সর্বশ্রেষ্ঠ চেহারার অধিকারী, আল্লাহ যেইরূপ বলিয়াছেন (নেতা ও স্ত্রী বিরাগী) ঠিক অনুরূপই ছিল। তাহার মহিলাদের প্রয়োজন হইত না। কিন্তু বনূ ইসরাঈলের বাদশাহের স্ত্রী তাহার প্রতি আসক্ত হইয়া পড়িল। এই নারী ছিল দুশ্চরিত্রা। সে ইয়াহ্ইয়ার নিকট কুপ্রস্তাবসহ লোক পাঠাইল। আল্লাহ্ ইয়াহ্ইয়াকে রক্ষা করিলেন, সে বিরত থাকিল এবং অস্বীকৃতি জানাইল। ফলে কুল্টা নারী ইয়াহ্ইয়াকে হত্যার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিল। তাহাদের একটি বাৎসরিক উৎসব ছিল, এই উৎসবে তাহারা সকলে একত্রিত হইত। বাদশার অভ্যাস ছিল এই উপলক্ষে সে যে ওয়াদা করিত উহা ভঙ্গ করিত না এবং মিথ্যাও বলিত না। বাদশাহ উৎসবের উদ্দেশ্যে বাহির হইবার মনস্থ করিলে তাহার স্ত্রী তাহাকে দাঁড়াইয়া বিদায় জানাইল। বাদশাহ ছিল স্ত্রীর প্রতি অত্যন্ত দুর্বল। ইতোপূর্বে সে এইভাবে বাদশাহকে বিদায় জানাইত না। বাদশাহ বলিল: তুমি আমার নিকট প্রার্থনা কর, তুমি যাহা প্রার্থনা করিবে তাহাই তোমাকে প্রদান করা হইবে। স্ত্রী বলিল: আমি ইয়াহইয়া ইন্ন যাকারিয়্যার রক্ত চাই। বাদশাহ বলিল, ইহা ব্যতীত অন্য কিছু প্রার্থনা কর। স্ত্রী বলিল, না, আমি ইহাই চাই। বাদশাহ বলিল, তোমার জন্য ইহাই করা হইবে। নারী তাহার ঘাতককে ইয়াহ্ইয়ার নিকট প্রেরণ করিল। তখন তিনি মিহরাবে সালাত আদায় করিতেছিলেন। আমিও (যাকারিয়্যা) তাহার পার্শ্বে সালাত আদায় করিতেছিলাম। সে তাহাকে হত্যা করিল এবং তাহার মস্তক ও রক্ত একটি থালায় করিয়া ঐ নারীর নিকট বহন করিয়া লইয়া গেল। রাসূলুল্লাহ (স) যাকারিয়্যা (আ)-কে বলিলেন: আপনি কি পরিমাণ ধৈর্য ধারণ করিলেন? তিনি বলিলেন: আমি সালাত হইতে বিরত হই নাই। বাদশাহের স্ত্রীয় সামনে ইয়াহইয়ার মস্তক ও রক্ত রাখিবার পর যখন সন্ধ্যা হইল তখন আল্লাহ তাআলা বাদশাহ ও তাহার পরিবারকে ভূগর্ভে ধ্বসাইয়া দিলেন। যখন প্রভাত হইল তখন বনু ইসরাঈল বলিতে থাকিল যে, যাকারিয়্যার প্রভু যাকারিয়্যার স্বার্থে রাগান্বিত হইয়াছেন। কাজেই আমরা আমাদের বাদশাহের জন্য রাগান্বিত হইব এবং যাকারিয়্যাকে হত্যা করিব। যাকারিয়্যা বলিলেন: তাহারা আমাকে হত্যা করিতে আমার অনুসন্ধানে বাহির হইল। সতর্ককারী আমাকে সতর্ক করিয়া দিলে আমি পলায়ন করিলাম, কিন্তু ইবলীস তাহাদের সম্মুখে ছিল এবং আমার ব্যাপারে তাহাদিগকে পথ দেখাইতেছিল। যখন আমি ভয় করিলাম যে, তাহাদিগকে পরাজিত করিতে পারিব না, তখন একটি বৃক্ষ আমার সামনে পড়িল। বৃক্ষটি আমাকে ডাক দিয়া বলিল, আমার দিকে, আমার দিকে। আমার জন্য বৃক্ষটি ফাঁক হইয়া গেল এবং আমি উহার মধ্যে প্রবেশ করিলাম, কিন্তু ইবলীস আসিয়া আমার চাদরের আঁচল ধরিয়া ফেলিল। বৃক্ষটি জোড়া লাগিয়া গেল কিন্তু আমার চাদরের আঁচল বাহিরে রহিয়া গেল। বনূ ইসরাঈল আসিলে ইবলীস বলিল, তোমরা কি প্রত্যক্ষ কর নাই যে, সে যাদু করিয়া এই গাছের অভ্যন্তরে প্রবেশ করিয়াছে, আর এই হইল তাহার চাদরের আঁচল। তাহারা বলিল, তাহা হইলে আমরা বৃক্ষটিকে পোড়াইয়া ফেলিব। ইবলীস বলিল, না, বরং করাত দ্বারা বৃক্ষকে খণ্ডিত করিয়া ফেল। যাকারিয়্যা (আ) বলেন, গাছের সহিত করাত দ্বারা আমিও দ্বিখণ্ডিত হইয়া গেলাম। নবী (স) বলিলেন: আপনি কি কোন স্পর্শ, ভয় বা ব্যথা পাইয়াছিলেন? যাকারিয়্যা (আ) বলিলেন, না, বরং এই বৃক্ষের মধ্যেই আল্লাহ আমার প্রাণশক্তি রাখিয়া দিয়াছিলেন"।
📄 হয়রত যাকারিয়্যা (আ)-এর পেশা
নিঃসন্দেহে যাকারিয়্যা (আ) বানু ইসরাঈলের মধ্যে অত্যন্ত মর্যাদাবান নবী ছিলেন। আল্লাহ্র নবীগণ কখনও পরনির্ভর বা অন্যের গলগ্রহ হইয়া থাকিতে মোটেই পছন্দ করিতেন না। তাই দেখা যায় এক এক নবী জীবন যাপনের জন্য এক এক ধরনের পেশা বাছিয়া লইয়াছিলেন। মানুষ হইতে কোন কিছু গ্রহণ করাকে দাওয়াতী কাজের বিনিময় মনে করা হইতে পারে বলিয়া তাঁহারা সর্বদা মানুষের অনুগ্রহ হইতে দূরে থাকিতেন (কাসাসুল কুরআন, ২খ, ২৫৩)। আল-কুরআনে নবীদের বক্তব্য আসিয়াছে এইভাবে:
"উহার মুকাবিলায় আমি তোমাদের নিকট কোন বিনিময় চাহি না, আমার বিনিময় একমাত্র জগৎসমূহের প্রতিপালকের নিকট" (সূরা শুয়ারা: ১০৯)।
এই দৃষ্টিভঙ্গিতে হযরত যাকারিয়্যা (আ)-ও নিজের জীবিকার জন্য কাঠমিস্ত্রির পেশা গ্রহণ করিয়াছিলেন। সহীহ মুসলিম, ইন্ন মাজা ও মুসনাদে আহমাদের বর্ণনা দ্বারা ইহা প্রমাণিত হয়:
"আবু হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (আ) বলিয়াছেন: যাকারিয়্যা (আ) ছিলেন কাঠমিস্ত্রি”।