📄 সুলায়মান (আ)-এর দরবারে বিলকীস
বিলকীস সুলায়মান (আ)-এর দরবারে প্রবেশ করিবার পূর্বে তিনি নির্দেশ প্রদান করিলেন যে, 'সাবা' হইতে আনীত সিংহাসনের আকৃতি যেন পরিবর্তন করিয়া দেওয়া হয়, যাহাতে বিলকীসকে পরীক্ষা করা যায়, সে কি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনিবার মানসিকতা অর্জন করিয়াছে!
قَالَ نَكِّرُوا لَهَا عَرْشَهَا نَنْظُرْ أَتَهْتَدِي أَمْ تَكُونُ مِنَ الَّذِينَ لَا يَهْتَدُونَ.
"সে বলিল, তাহার সিংহাসনের আকৃতি বদলাইয়া দাও, দেখি সে সঠিক দিশা পাইতেছে, না সে বিভ্রান্তদিগের শামিল হয়” (২৭:৪১)।
বিলকীস যখন উপস্থিত হইলেন সর্বপ্রথম তাঁহাকে তাঁহার সিংহাসন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হইলে যে, আপনার সিংহাসন কি এইরূপই?
فَلَمَّا جَاءَتْ قِيلَ أَهَكَذَا عَرْشُكِ قَالَتْ كَأَنَّهُ هُوَ .
“সে যখন আসিল তখন তাহাকে জিজ্ঞাসা করা হইল, তোমার সিংহাসন কি এইরূপই? সে বলিল, ইহা তো যেন উহাই" (২৭:৪২)।
সুলায়মান (আ) নবী হিসাবে যে অলৌকিক শক্তির অধিকারী বিলকীস তাহা ইতোপূর্বেই অনুমান করিতে পারিয়াছিলেন এবং ইহাও বুঝিয়াছিলেন যে, তিনি দুনিয়ার কোন সাধারণ বাদশাহ নহেন, বরং তাঁহার মূল পরিচয় তিনি আল্লাহর নবী। তাই পূর্ব হইতেই আনুগত্য স্বীকার করিবার মানসিকতা বিলকীসের মধ্যে ছিল। তিনি বলিলেন:
وَأُوتِينَا الْعِلْمَ مِنْ قَبْلُ وَكُنَّا مُسْلِمِينَ.
"আমাদিগকে ইতোপূর্বেই প্রকৃত জ্ঞান দান করা হইয়াছে এবং আমরা আত্মসমর্পণও করিয়াছি" (২৭:৪২)।
এই পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহ দ্বারা অনুমেয় যে, বিলকীস বুঝিতে পারেন নাই তাঁহাকে ইসলাম গ্রহণ করিতে হইবে। তিনি বুঝিয়াছিলেন সুলায়মান (আ)-এর নিকট তাহার আত্মসমার্পণ করিলেই চলিবে। সুলায়মান (আ)-এ চিঠিতে উল্লিখিত মুসলিমিন শব্দের অর্থ তিনি মনে করিয়াছেন আত্মসমর্পণ ও আনুগত্য, ইসলাম গ্রহণ করা নয় (আম্বিয়ায়ে কুরআন, ৩খ, ১৩১)। কুরআনের এই আয়াত দ্বারাও উহা বুঝা যায়:
وَصَدَّهَا مَا كَانَتْ تَعْبُدُ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِنَّهَا كَانَتْ مِنْ قَوْمٍ كَافِرِينَ.
"আল্লাহ্র পরিবর্তে সে যাহার পূজা করিত তাহাই তাহাকে নিবৃত্ত করিয়াছিল; সে ছিল কাফের সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত” (২৭:৪৩)।
📄 বিলকীসের ইসলাম গ্রহণ
নির্মাণ শিল্পের অভিনব কারুকার্য বিলকীসকে দেখাইবার জন্য সুলায়মান (আ) স্বচ্ছ স্ফটিক-মণ্ডিত মেঝে সম্বলিত এক প্রাসাদ নির্মাণের নির্দেশ প্রদান করিলেন। ইহার নিচে সামুদ্রিক প্রাণী ও মাছের ছবি ছিল যাহার কারণে মনে হইতেছিল ইহা প্রকৃত জলাশয়। এই ব্যতিক্রমধর্মী প্রাসাদের সম্মুখ কামরায় সুলায়মান (আ) এক আরাম কেদারায় উপবেশন করিলেন এবং বিলকীসকে তথায় প্রবেশ করিতে বলিলেন। প্রবেশ করিতে গিয়া জলাশয় সদৃশ মেঝে অবলোকন করিয়া তিনি হতবিহ্বল হইয়া পড়িলেন এবং শংকিত হইলেন। কাজেই তিনি তাঁহার উভয় পায়ের নিম্নাংশ অনাবৃত করিয়া কাপড় হাঁটু পর্যন্ত উঠাইলেন যাহাতে পোশাক পানিতে ভিজিয়া না যায়। তাঁহাকে সান্ত্বনা প্রদান করিবার জন্য সুলায়মান (আ) বলিলেন, “ইহা স্বচ্ছ কাঁচের তৈরী প্রাসাদ”। বিলকীস ইতোপূর্বে এত চমৎকার প্রাসাদ আর দেখেন নাই (হিফজুর রহমান, কাসাসুল কুরআন, ২খ, ১৪৯-১৫০)। সুলায়মান (আ)-এর পক্ষ হইতে এই অসাধারণ সম্মান প্রদানের আয়োজন প্রত্যক্ষ করিয়া বিলকীসের প্রকৃত বোধোদয় হইল এবং তিনি ভাবিতে লাগিলেন, সুলায়মান আসলেই আল্লাহ্র নবী। তাই তিনি তাহার ভুল স্বীকার করিলেন এবং ইসলাম গ্রহণ করিয়া আল্লাহ্র অনুগত হইবার ঘোষণা প্রদান করিলেন (আফীফ আবদুল ফাত্তাহ তাব্বারাহ, পৃ. ২৯৫)। আল-কুরআনেও এই বর্ণনা আসিয়াছে:
قِيلَ لَهَا ادْخُلِي الصِّرْحَ فَلَمَّا رَأَتْهُ حَسِبَتْهُ لُجَّةً وَكَشَفَتْ عَنْ سَاقَيْهَا قَالَ إِنَّهُ صَرْحٌ مُمَرَّدٌ مِنْ قَرَارِيرَ قَالَتْ رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي وَأَسْلَمْتُ مَعَ سُلَيْمَانَ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ.
"তাহাকে বলা হইল, এই প্রাসাদে প্রবেশ কর। যখন সে উহা দেখিল তখন সে উহাকে এক গভীর জলাশয় মনে করিল এবং সে তাহার উভয় ‘সাক’ অনাবৃত করিল। সুলায়মান বলিল, ইহা তো • স্বচ্ছ স্ফটিকমণ্ডিত প্রাসাদ। সেই নারী বলিল, হে আমার প্রতিপালক! আমি তো নিজের প্রতি জুলুম করিয়াছিলাম, আমি সুলায়মানের সহিত জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ্র নিকট আত্মসমর্পণ করিলাম” (২৭:৪৪)।
📄 সুলায়মান (আ)-এর সহিত বিলকীসের বিবাহ
বিলকীসের ইসলাম গ্রহণ করিবার পর সুলায়মান (আ) তাঁহাকে বিবাহ করিয়াছেন কিনা এই প্রসংগে কুরআন অথবা সহীহ হাদীছে পক্ষে অথবা বিপক্ষে কোন বক্তব্য পাওয়া যায় না। তবে বিভিন্ন ইতিহাস গ্রন্থে এই সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য রহিয়াছে যাহা নিম্নে প্রদত্ত হইল:
(ক) ইসলাম গ্রহণের পর সুলায়মান (আ) তাঁহাকে বিবাহ করিয়াছিলেন এবং তিনি তাঁহাকে সাংঘাতিক ভালোবাসিতেন। তিনি তাঁহাকে য়ামানের রাজত্ব ফেরত দিয়াছিলেন এবং প্রতি মাসে একবার করিয়া সুলায়মান (আ) তাহার নিকট বেড়াইতে যাইতেন, প্রত্যেকবারে তথায় তিন দিন অবস্থান করিতেন (ইব্ন আছীর ১খ, ১৮১)।
(খ) বলা হইয়া থাকে যে, সুলায়মান (আ) তাঁহাকে তাঁহার সম্প্রদায়ের কোন পুরুষ ব্যক্তিকে বিবাহ করিবার নির্দেশ দেন, কিন্তু তিনি তাহা অস্বীকার করেন এবং বলেন যে, হামাদানের রাজা যদি সম্মত হয় তাহা হইলে তিনি তাহাকে বিবাহ করিতে প্রস্তুত। সুলায়মান (আ) হামাদানের রাজার সাথে তাঁহার বিবাহের ব্যবস্থা করেন এবং য়ামানের রাজত্ব ফেরত দেন। সাথে সাথে য়ামানের জিন্নদেরকে তাঁহার আনুগত্য করিতে নির্দেশ দেন (ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া, ২খ, ২৩)।
📄 সুলায়মান (আ)-এর রাজত্বের সময়কাল ও ইন্তিকাল
রাজত্বের সময়সীমা: Old Testament -এর বর্ণনা অনুযায়ী জানা যায় যে, সুলায়মান (আ) ৪০ বৎসর যাবত ফিলিস্তীনে রাজত্ব পরিচালনা করিয়াছিলেন। এই সময়ে তিনি বনু ইসরাঈলের সকল গ্রুপের রাজা ছিলেন (১ম রাজাবলী, ১১: ৪২-৪৩; দ্বিতীয় বিবরণ, ৯:৩০-৩১)।
ইমাম যুহরী (র)-এর বর্ণনামতে সুলায়মান (আ)-এর বয়স হইয়াছিল ৫২ বৎসর এবং তিনি রাজত্ব পরিচালনা করিয়াছিলেন ৪০ বৎসর (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., ৩০)।
ইবন আব্বাস (রা)-এর এক বর্ণনা মতে সুলায়মান (আ)-এর রাজত্ব ছিল মাত্র ২০ বৎসরের (আল-বিদায়া, ২খ, ৩০)।
ইন্তিকাল: সুলায়মান (আ)-এর ইন্তিকাল সম্পর্কে কুরআনে স্পষ্ট বর্ণনা আসিয়াছে। ফَلَمَّا قَضَيْنَا عَلَيْهِ الْمَوْتَ مَا دَلَّهُمْ عَلَى مَوْتِهِ إِلَّا دَابَّةُ الْأَرْضِ تَأْكُلُ مِنْسَا تَهُ فَلَمَّا خَرَّ تَبَيِّنَتِ الْجِنَّ أَنْ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ الْغَيْبَ مَا لَبِثُوا فِي الْعَذَابِ الْمُهِينِ.
"যখন আমি সুলায়মানের মৃত্যু ঘটাইলাম তখন জিন্নদিগকে তাহার মৃত্যু বিষয় জানাইল কেবল মাটির পোকা যাহা সুলায়মানের লাঠি খাইতেছিল। যখন সুলায়মান পড়িয়া গেল তখন জিন্নেরা বুঝিতে পারিল যে, উহারা যদি অদৃশ্য বিষয়ে অবগত থাকিত তাহা হইলে উহারা লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তিতে আবদ্ধ থাকিত না” (৩৪: ১৪)।
সুলায়মান (আ) মাঝেমধ্যে দীর্ঘ সময়ের জন্য ইবাদতের নিমিত্তে একাকী বায়তুল মুকাদ্দাসে অবস্থান করিতেন, এমনকি মাঝে-মধ্যে এক মাস, দুই মাস বা এক বৎসর, দুই বৎসর পর্যন্তও এইভাবে কাটাইয়া দিতেন। তিনি তাঁহার সহিত খাদ্যদ্রব্য এবং পানীয় লইয়া যাইতেন। একদা তিনি তাঁহার লাঠিতে ভর করিয়া সালাত আদায় করিতেছিলেন, এমতাবস্থায় তাঁহার ইন্তিকাল হইল। তিনি ইন্তিকালের পূর্বে আল্লাহ্র কাছে ফরিয়াদ করিলেন, জিন্নরা যেন তাঁহার মৃত্যু সম্পর্কে জানিতে না পারে, তাহা হইলে ইহা দ্বারা প্রমাণিত হইবে যে, জিন্নরা অদৃশ্যের সংবাদ জানে না (ইব্ন কাছীর, ১খ., ১৭৬)। সুলায়মান (আ)-এর মৃত্যুর এক বৎসর পর মাটির পোকা তাঁহার লাঠি খাইয়া ফেলিবার পর যখন তিনি পড়িয়া গেলেন কেবল তখনই জিন্নরা তাঁহার মৃত্যু সম্পর্কে জানিতে পারিল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., ৩০; আয-যামাখশারী, ৩খ., ৫৭৩)।
কেহ কেহ বলিয়াছেন যে, জিন্নরা যেখানে কাজ করিতেছিল সুলায়মান (আ) তথায় তাঁহার লাঠি দাঁড় করাইয়া রাখিয়া আসিয়াছিলেন। ইত্যবসরে তাঁহার মৃত্যু হইয়া যায় এবং মাটির পোকা এই লাঠি খাইয়া ফেলিবার পরই জিন্নরা তাঁহার মৃত্যু সম্পর্কে জানিতে পারে (তাব্বারাহ, পৃ. ২৯৬)। তবে জিন্ন ব্যতীত অন্য সবাই তাঁহার মৃত্যু সম্পর্কে পূর্বেই জানিতে পারে এবং তাঁহাকে দাফনও করা হয় আর তাঁহার পুত্র রাজত্বের দায়িত্বও গ্রহণ করিয়াছিল (তাব্বারাহ, পৃ. ২৯৬)।