📄 বিলকীসের নিকট সুলায়মান (আ)-এর পত্র প্রেরণ
হুদহুদ কর্তৃক প্রদত্ত তথ্যকে পরীক্ষা করিবার অভিপ্রায়ে এবং তাওহীদের দাওয়াত সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে সুলায়মান (আ) সাবার রাণী বিলকীসের নিকট একখানা পত্র প্রেরণের মনস্থ করিলেন। তিনি চিঠিখানা লিখিলেন। এই চিঠির ভাষা ছিল এই : إِنَّهُ مِنْ سُلَيْمَانَ وَإِنَّهُ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ إِلا تَعْلُوا عَلَى وَآتُونِي مُسْلِمِينَ .
"ইহা সুলায়মানের নিকট হইতে এবং ইহা করুণাময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে। 'অহমিকা বশে আমাকে অমান্য করিও না এবং আনুগত্য স্বীকার করিয়া আমার নিকট উপস্থিত হও" (২৭ঃ৩০-৩১)।
সংক্ষিপ্ত ভাষায় ব্যাপকভাব প্রকাশের ক্ষেত্রে ইহা একটি উত্তম পত্র (ফি যিলালিল কুরআন, ৫খ, ২৬৪০-২৬৪৪)। এই পত্রসহ সুলায়মান (আ) হুদহুদ পাখিকে রাণী বিলকীসের নিকট প্রেরণ করিলেন এবং নির্দেশ দিলেন:
قَالَ سَنَنْظُرُ أَصَدَقْتَ أَمْ كُنْتَ مِنَ الْكَاذِبِينَ اذْهَبْ بِكَتَابِي هُذَا فَالْقِهُ إِلَيْهِمْ ثُمَّ تَوَلَّى عَنْهُمْ فَانْظُرْ مَاذَا يَرْجِعُونَ .
"সুলায়মান বলিল, আমি দেখিব তুমি কি সত্য বলিয়াছ না তুমি মিথ্যাবাদী? তুমি যাও আমার এই পত্র লইয়া এবং ইহা তাহাদিগের নিকট অর্পণ কর; অতঃপর তাহাদিগের নিকট হইতে সরিয়া থাকিও এবং লক্ষ্য করিও তাহাদিগের প্রতিক্রিয়া কি" (২৭ঃ ২৭-২৮)।
যেহেতু 'হুদহুদ' সাবার রাণী বিলকীসের রাজ্য দেখিয়া আসিয়াছিল তাই সুলায়মান (আ) পত্র লইয়া তাহাকেই প্রেরণ করিলেন (মুহাম্মদ জামীল আহমাদ, আম্বিয়ায়ে কুরআন, ৩খ, ১২৪)।
হুদহুদ পাখি পত্র লইয়া রাণী বিলকীসের নিকট হাযীর হইল এবং তাহার সামনে পত্রখানা রাখিয়া সুলায়মান (আ)-এর নির্দেশমত সরিয়া দাঁড়াইল। রাণী বিলকীস পত্রখানা পাঠ করিলেন এবং বুঝিতে পারিলেন যে, ইহা কোন সাধারণ চিঠি নয় অথবা ইহা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং তাহাকে তাহার সকল সভাসদ ও রাজ্য সহকারে আত্মসমর্পণ করিতে বলা হইয়াছে (আফীফ আবদুল ফাত্তাহ তাববারাহ, পৃ. ২৯১)।
এই চিঠি পাইয়া বিলকীস পেরেশান হইয়া পড়িলেন এবং কাল বিলম্ব না করিয়া সভাসদদের নিকট উপস্থিত হইলেন এবং বলিলেন: قَالَتْ يَا أَيُّهَا الْمَلَأُ إِنِّي أُلْقِيَ إِلَى كِتَابٌ كَرِيمٌ إِنَّهُ مِنْ سُلَيْمَانَ وَإِنَّهُ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ إِلا تَعْلُوا عَلَى وَآتُونِي مُسْلِمِينَ.
“সেই নারী বলিল, হে পারিষদবর্গ! আমাকে এক সম্মানিত পত্র দেওয়া হইয়াছে। ইহা সুলায়মানের নিকট হইতে এবং ইহা করুণাময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে। অহমিকাবশে আমাকে অমান্য করিও না এবং আনুগত্য স্বীকার করিয়া আমার নিকট উপস্থিত হও” (২৭ঃ ২৯-৩১)।
সুলায়মান (আ)-এর চিঠি পাইয়া বিলকীস সভাসদ ডাকিয়া পরামর্শ করাকে জরুরী মনে করিলেন। কেননা ইহাকে তিনি বড় ধরনের দুর্ঘটনা হিসাবে গ্রহণ করিলেন। মন্ত্রী পরিষদ ও বিশিষ্ট নাগরিকদিগকে উপস্থিত করিয়া তিনি বলিলেন:
قَالَتْ يَا أَيُّهَا الْمَلَأُ افْتُونِي فِي أَمْرِي مَا كُنْتُ قَاطِعَةً أَمْرًا حَتَّى تَشْهَدُونَ .
"সেই নারী বলিল, হে পারিষদবর্গ! আমার এই সমস্যায় তোমাদিগের অভিমত দাও। আমি যাহা সিদ্ধান্ত করি তাহা তো তোমাদিগের উপস্থিতিতেই করি" (২৭ঃ ৩২)।
নেতৃবৃন্দ এবং পারিষদবর্গের ক্ষমতা ও সমর কৌশলের উপর তাহাদিগের অটুটু আস্থা ছিল। তাই তাহারা এই মত পেশ করিতে চাহিল যে, তাহারা সুলায়মান (আ)-এর বাহিনীর সহিত যুদ্ধ করিতে প্রস্তুত। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রাণীকেই প্রদান করিতে হইবে। তাহারা বলিলঃ
قَالُوا نَحْنُ أُولُوا قُوَّةٍ وَأُولُوا بَأْسٍ شَدِيدٍ وَالْأَمْرُ إِلَيْكَ فَانْظُرِى مَاذَا تَأْمُرِينَ .
"উহারা বলিল, আমরা তো শক্তিশালী ও কঠোর যোদ্ধা; তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিবার ক্ষমতা আপনারই, কী আদেশ করিবেন তাহা আপনি ভাবিয়া দেখুন" (২৭ঃ ৩৩)।
রাণী বিলকীস অত্যন্ত বুদ্ধিমতি, বিচক্ষণ ও প্রত্যুৎপন্নামতি ছিলেন। তাই সভাসদদের পরামর্শে রাজি হইয়াই যুদ্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিলেন না, বরং গভীর ধীশক্তির মাধ্যমে উপলব্ধি করিলেন যে, যুদ্ধ ঘোষণার অশুভ পরিণাম কি হইতে পারে (আল-বিদায়া, ২খ, ২১: মা'আল আম্বিয়া ফিল কুরআন, পৃ. ২৯২)। তাই তিনি যুদ্ধের ক্ষতিকর বিষয়সমূহ সভাষদের নিকট উপস্থাপন করিলেন এবং বলিলেন, যদি তাহারা আমাদের উপর বিজয়ী হয় তাহা হইলে তাহারা ধ্বংসযজ্ঞ চালাইবে এবং আমাদিগকে নিঃশেষ করিয়া দিবে।
قَالَتْ إِنَّ الْمُلُوكَ إِذَا دَخَلُوا قَرْيَةً أَفْسَدُوهَا وَجَعَلُوا أَعِزَّةَ أَهْلِهَا أَذلَّةٌ وَكَذَلِكَ يَفْعَلُونَ.
'"সে বলিল, রাজা-বাদশাহরা যখন কোন জনপদে প্রবেশ করে তখন উহাকে বিপর্যস্ত করিয়া দেয় এবং তথাকার মর্যাদাবান ব্যক্তিদিগকে অপদস্থ করে; ইহারাও এইরূপই করিবে” (২৭ঃ৩৪)।
রাণী লোকদিগকে বলিল, "আমি বিপুল পরিমাণে উপঢৌকন পাঠাইয়া সুলায়মানকে পরীক্ষা করিতে চাহিতেছি। যদি তিনি দুনিয়ার সাধারণ কোন রাজা-বাদশাহ হইয়া থাকেন তাহা হইলে উপহার পাইয়া খুশী হইবেন এবং আনন্দচিত্তে তাহা গ্রহণ করিবেন। আর যদি তিনি প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর নবী হইয়া থাকেন তাহা হইলে তিনি উপহার গ্রহণ করিবেন না। আর এই পরীক্ষার পরই আমাদিগকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতে হইবে" (ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ১খ, ১৭৯)। কুরআনেও এই বর্ণনা আসিয়াছে:
وَإِنِّي مُرْسِلَةٌ إِلَيْهِمْ بِهَدِيَّةٍ فَنَاظِرَةٌ بِمَ يَرْجِعُ الْمُرْسَلُونَ .
"আমি তাহাদিগের নিকট উপঢৌকন পাঠাইতেছি, দেখি, দূতেরা কী লইয়া ফিরিয়া আসে" (২৭ঃ৩৫)।
রাণী বিলকীসের দূতেরা অতি মূল্যবান অঢেল সম্পত্তির বহর উপঢৌকন লইয়া সুলায়মান (আ)-এর রাজ্যের রাজধানী ফিলিস্তীনে যাইয়া উপস্থিত হইল। সুলায়মান (আ)-এর রাজশক্তি ও আড়ম্বর দেখিয়া তাহারা আশ্চর্য হইয়া গেল এবং আন্দাজ করিতে পারিল যে, এই তুলনায় 'সাবা রাজত্ব' তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু নয়। তাহারা বিলকীস কর্তৃক প্রেরিত উপঢৌকন সুলায়মান (আ)-এর নিকট পেশ করিল। এই উপঢৌকন দেখিয়া তিনি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হইলেন এবং বলিলেন, তোমরা কি আমাকে সম্পদ প্রদান করিয়া সন্তুষ্ট করিতে চাহিতেছ? অথচ মহান আল্লাহ আমাকে যাহা প্রদান করিয়াছেন তাহা পার্থিব সম্পদ হইতে অনেক মূল্যবান। আর তাহা হইতেছে নবুয়াতের মূল্যবান বস্তু (তাববারাহ, পৃ. ২৯৩)। কাজেই তোমরা তোমাদিগের উপহার সামগ্রী লইয়া ফিরিয়া যাও এবং যদি তোমরা আমার প্রতি ঈমান আনিয়া হিদায়াতের পথে আগমন না কর তাহা হইলে এমন বাহিনী লইয়া তোমাদিগের উপর হামলা করিব যাহার মোকাবিলা করিবার ক্ষমতা তোমাদিগের নাই। আর তোমাদিগকে অপদস্থ করিয়া 'সাবা' এলাকা হইতে বাহির করিয়া দিব।
فَلَمَّا جَاءَ سُلَيْمَانَ قَالَ أَتُمِدُّونَنِي بِمَالٍ فَمَا أَتَانِيَ اللَّهُ خَيْرٌ مِّمَّا أَتَاكُم بَلْ أَنْتُمْ بِهَدِيَّتِكُمْ تَفْرَحُوْنَ ارْجِعْ إِلَيْهِمْ فَلَنَأْتِيَنَّهُمْ بِجُنُودٍ لَا قِبَلَ لَهُمْ بِهَا وَلَنُخْرِجَنَّهُمْ مِنْهَا أَذِلَّةٌ وَهُمْ صَاغِرُونَ.
"দূত সুলায়মানের নিকট আসিলে সুলায়মান বলিল, তোমরা কি আমাকে ধন-সম্পদ দিয়া সাহায্য করিতেছ? আল্লাহ আমাকে যাহা দিয়াছেন তাহা তোমাদিগকে যাহা দিয়াছেন তাহা হইতে উৎকৃষ্ট। অথচ তোমরা তোমাদিগের উপঢৌকন লইয়া উৎফুল্ল বোধ করিতেছ। উহাদিগের নিকট ফিরিয়া যাও, আমি অবশ্যই উহাদিগের বিরুদ্ধে লইয়া আসিব এমন এক সৈন্যবাহিনী যাহার মোকাবিলা করিবার শক্তি উহাদিগের নাই। আমি অবশ্যই উহাদিগকে তথা হইতে লাঞ্ছিতভাবে বহিস্কার করিব এবং উহারা হইবে অপদস্থ" (২৭ঃ ৩৬-৩৭)।
রাণী বিলকীসের দূতগণ ফিরিয়া আসিয়া তাহাকে সুলায়মান (আ)-এর বিস্তারিত সংবাদ প্রদান করিল। ইহা শ্রবণ করিয়া বিলকীস অনুধাবন করিতে পারিলেন যে, তাহাকে আনুগত্য স্বীকার করিয়া সুলায়মান (আ)-এর দরবারে যাইতে হইবে। তাই তিনি অতি শান-শওকতের সহিত ও অসংখ্য অনুসারী লইয়া য়ামান হইতে ফিলিস্তীনের পথে গমন করিল (আল-বিদায়া, ২খ, ২২)।
সুলায়মান (আ) যখন অবগত হইলেন যে, বিলকীস তাহার অসংখ্য অনুসারী সহকারে আনুগত্য প্রকাশ করিবার জন্য আগমন করিতেছেন তখন তিনি চিন্তা করিলেন যে, "বিলকীসকে এমন কোন অলৌকিক বিষয় দেখাইতে হইবে যাহাতে নবুওয়াতের প্রমাণ স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয় এবং আল্লাহ তাআলার অফুরন্ত কুদরতও প্রকাশ পায়। তাই তিনি তাঁহার চারদিকে উপস্থিত জিন্নদেরকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন, তাহারা আমার নিকটে আসিবার পূর্বে কে বিলকীসের সিংহাসন আমার নিকট লইয়া আসিতে পারিবে? সুলায়মান আরো বলিলেন:
يَا أَيُّهَا الْمَلَأُ أَيُّكُمْ يَأْتِينِي بِعَرْشِهَا قَبْلَ أَنْ يَأْتُونِي مُسْلِمِينَ .
“হে আমার পারিষদবর্গ! তাহারা আত্মসমর্পণ করিয়া আমার নিকট আসিবার পূর্বে তোমাদিগের মধ্যে কে তাহার সিংহাসন আমার নিকট লইয়া আসিবে” (২৭ঃ ৩৮)।
একটি শক্তিশালী বিচক্ষণ জিন্ন বলিল: আপনি এই জায়গা হইতে উঠিবার পূর্বেই আমি উহা আনিয়া উপস্থিত করিব।
قَالَ عِفْرِيتٌ مِّنَ الْجِنِّ أَنَا أَتِيكَ بِهِ قَبْلَ أَنْ تَقُومَ مِنْ مَقَامِكَ وَإِنِّي عَلَيْهِ لَقَوِيٌّ أَمِينٌ .
“এক শক্তিশালী জিন্ন বলিল, আপনি আপনার স্থান হইতে উঠিবার পূর্বে আমি উহা আনিয়া দিব এবং এই ব্যাপারে আমি অবশ্যই ক্ষমতাবান, বিশ্বস্ত” (২৭ঃ ৩৯)। সুলায়মান (আ) আরও দ্রুত সিংহাসন আনাইতে চাহেন। তখন
قَالَ الَّذِي عِنْدَهُ عِلْمٌ مِّنَ الْكِتَابِ أَنَا أُتِيكَ بِهِ قَبْلَ أَنْ يُرْتَدَّ إِلَيْكَ طَرْفُكَ.
"কিতাবের জ্ঞান যাহার ছিল সে বলিল, 'আপনি চক্ষুর পলক ফেলিবার পূর্বেই আমি উহা আপনাকে আনিয়া দিব" (২৭:৪০)।
যাহার কিতাবের জ্ঞান ছিল সেই ব্যক্তি কে? এই প্রসংগে কয়েকটি মতামত রহিয়াছে। (ক) তিনি হইলেন আসিফ ইবন বারখিয়া, সুলায়মান (আ)-এর মন্ত্রী এবং খালাত ভাই (ইবনুল আছীর, ১খ, ১৭০)। (খ) জিন্নের মধ্যকার এক মু'মিন ব্যক্তি যিনি আল্লাহর মহান নাম (اسم الله الأعظم) জানিতেন (ইব্ন কাছীর, ২খ, ২২)। (গ) ইবন 'আব্বাস (রা) বলিয়াছেন, তিনি সুলায়মান (আ)-এর অত্যন্ত বিশ্বস্ত সচিব ছিলেন (আম্বিয়ায়ে কুরআন, ৩খ, ১২৯)। (ঘ) দাহ্হাক, কাতাদা ও মুজাহিদ বলিয়াছেন, তিনি জিন্ন নহেন বরং মানব ছিলেন (হিফজুর রহমান, ২খ, ১৪৭)।
হযরত সুলায়মান (আ) যখন বিলকীসের সিংহাসন তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত দেখিতে পাইলেন তখন আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতায় তাঁহার মাথা নিচু হইয়া আসিল এবং তিনি বলিলেন:
هَذَا مِنْ فَضْلِ رَبِّي لِيَبْلُوَنِي أَأَشْكُرُ أَمْ أَكْفُرُ وَمَنْ شَكَرَ فَإِنَّمَا يَشْكُرُ لِنَفْسِهِ وَمَنْ كَفَرَ فَإِنَّ رَبِّي غَنِيٌّ كَرِيمٌ .
"ইহা আমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ, যাহাতে তিনি আমাকে পরীক্ষা করিতে পারেন- আমি কৃতজ্ঞ না অকৃতজ্ঞ। যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, সে তো নিজের কল্যাণের জন্যই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং যে অকৃতজ্ঞ সে জানিয়া রাখুক যে, আমার প্রতিপালক অভাবমুক্ত, মহানুভব” (২৭:৪০)।
সুলায়মান (আ)-এর দরবারে বিলকীস। বিলকীস সুলায়মান (আ)-এর দরবারে প্রবেশ করিবার পূর্বে তিনি নির্দেশ প্রদান করিলেন যে, 'সাবা' হইতে আনীত সিংহাসনের আকৃতি যেন পরিবর্তন করিয়া দেওয়া হয়, যাহাতে বিলকীসকে পরীক্ষা করা যায়, সে কি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনিবার মানসিকতা অর্জন করিয়াছে!
قَالَ نَكِّرُوا لَهَا عَرْشَهَا نَنْظُرْ أَتَهْتَدِي أَمْ تَكُونُ مِنَ الَّذِينَ لَا يَهْتَدُونَ.
"সে বলিল, তাহার সিংহাসনের আকৃতি বদলাইয়া দাও, দেখি সে সঠিক দিশা পাইতেছে, না সে বিভ্রান্তদিগের শামিল হয়” (২৭:৪১)।
বিলকীস যখন উপস্থিত হইলেন সর্বপ্রথম তাঁহাকে তাঁহার সিংহাসন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হইলে যে, আপনার সিংহাসন কি এইরূপই?
فَلَمَّا جَاءَتْ قِيلَ أَهَكَذَا عَرْشُكِ قَالَتْ كَأَنَّهُ هُوَ .
“সে যখন আসিল তখন তাহাকে জিজ্ঞাসা করা হইল, তোমার সিংহাসন কি এইরূপই? সে বলিল, ইহা তো যেন উহাই" (২৭:৪২)।
সুলায়মান (আ) নবী হিসাবে যে অলৌকিক শক্তির অধিকারী বিলকীস তাহা ইতোপূর্বেই অনুমান করিতে পারিয়াছিলেন এবং ইহাও বুঝিয়াছিলেন যে, তিনি দুনিয়ার কোন সাধারণ বাদশাহ নহেন, বরং তাঁহার মূল পরিচয় তিনি আল্লাহর নবী। তাই পূর্ব হইতেই আনুগত্য স্বীকার করিবার মানসিকতা বিলকীসের মধ্যে ছিল। তিনি বলিলেন:
وَأُوتِينَا الْعِلْمَ مِنْ قَبْلُ وَكُنَّا مُسْلِمِينَ.
"আমাদিগকে ইতোপূর্বেই প্রকৃত জ্ঞান দান করা হইয়াছে এবং আমরা আত্মসমর্পণও করিয়াছি" (২৭:৪২)।
এই পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহ দ্বারা অনুমেয় যে, বিলকীস বুঝিতে পারেন নাই তাঁহাকে ইসলাম গ্রহণ করিতে হইবে। তিনি বুঝিয়াছিলেন সুলায়মান (আ)-এর নিকট তাহার আত্মসমার্পণ করিলেই চলিবে। সুলায়মান (আ)-এ চিঠিতে উল্লিখিত মুসলিমিন শব্দের অর্থ তিনি মনে করিয়াছেন আত্মসমর্পণ ও আনুগত্য, ইসলাম গ্রহণ করা নয় (আম্বিয়ায়ে কুরআন, ৩খ, ১৩১)। কুরআনের এই আয়াত দ্বারাও উহা বুঝা যায়:
وَصَدَّهَا مَا كَانَتْ تَعْبُدُ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِنَّهَا كَانَتْ مِنْ قَوْمٍ كَافِرِينَ.
"আল্লাহ্র পরিবর্তে সে যাহার পূজা করিত তাহাই তাহাকে নিবৃত্ত করিয়াছিল; সে ছিল কাফের সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত” (২৭:৪৩)।
📄 সুলায়মান (আ)-এর দরবারে বিলকীস
বিলকীস সুলায়মান (আ)-এর দরবারে প্রবেশ করিবার পূর্বে তিনি নির্দেশ প্রদান করিলেন যে, 'সাবা' হইতে আনীত সিংহাসনের আকৃতি যেন পরিবর্তন করিয়া দেওয়া হয়, যাহাতে বিলকীসকে পরীক্ষা করা যায়, সে কি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনিবার মানসিকতা অর্জন করিয়াছে!
قَالَ نَكِّرُوا لَهَا عَرْشَهَا نَنْظُرْ أَتَهْتَدِي أَمْ تَكُونُ مِنَ الَّذِينَ لَا يَهْتَدُونَ.
"সে বলিল, তাহার সিংহাসনের আকৃতি বদলাইয়া দাও, দেখি সে সঠিক দিশা পাইতেছে, না সে বিভ্রান্তদিগের শামিল হয়” (২৭:৪১)।
বিলকীস যখন উপস্থিত হইলেন সর্বপ্রথম তাঁহাকে তাঁহার সিংহাসন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হইলে যে, আপনার সিংহাসন কি এইরূপই?
فَلَمَّا جَاءَتْ قِيلَ أَهَكَذَا عَرْشُكِ قَالَتْ كَأَنَّهُ هُوَ .
“সে যখন আসিল তখন তাহাকে জিজ্ঞাসা করা হইল, তোমার সিংহাসন কি এইরূপই? সে বলিল, ইহা তো যেন উহাই" (২৭:৪২)।
সুলায়মান (আ) নবী হিসাবে যে অলৌকিক শক্তির অধিকারী বিলকীস তাহা ইতোপূর্বেই অনুমান করিতে পারিয়াছিলেন এবং ইহাও বুঝিয়াছিলেন যে, তিনি দুনিয়ার কোন সাধারণ বাদশাহ নহেন, বরং তাঁহার মূল পরিচয় তিনি আল্লাহর নবী। তাই পূর্ব হইতেই আনুগত্য স্বীকার করিবার মানসিকতা বিলকীসের মধ্যে ছিল। তিনি বলিলেন:
وَأُوتِينَا الْعِلْمَ مِنْ قَبْلُ وَكُنَّا مُسْلِمِينَ.
"আমাদিগকে ইতোপূর্বেই প্রকৃত জ্ঞান দান করা হইয়াছে এবং আমরা আত্মসমর্পণও করিয়াছি" (২৭:৪২)।
এই পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহ দ্বারা অনুমেয় যে, বিলকীস বুঝিতে পারেন নাই তাঁহাকে ইসলাম গ্রহণ করিতে হইবে। তিনি বুঝিয়াছিলেন সুলায়মান (আ)-এর নিকট তাহার আত্মসমার্পণ করিলেই চলিবে। সুলায়মান (আ)-এ চিঠিতে উল্লিখিত মুসলিমিন শব্দের অর্থ তিনি মনে করিয়াছেন আত্মসমর্পণ ও আনুগত্য, ইসলাম গ্রহণ করা নয় (আম্বিয়ায়ে কুরআন, ৩খ, ১৩১)। কুরআনের এই আয়াত দ্বারাও উহা বুঝা যায়:
وَصَدَّهَا مَا كَانَتْ تَعْبُدُ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِنَّهَا كَانَتْ مِنْ قَوْمٍ كَافِرِينَ.
"আল্লাহ্র পরিবর্তে সে যাহার পূজা করিত তাহাই তাহাকে নিবৃত্ত করিয়াছিল; সে ছিল কাফের সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত” (২৭:৪৩)।
📄 বিলকীসের ইসলাম গ্রহণ
নির্মাণ শিল্পের অভিনব কারুকার্য বিলকীসকে দেখাইবার জন্য সুলায়মান (আ) স্বচ্ছ স্ফটিক-মণ্ডিত মেঝে সম্বলিত এক প্রাসাদ নির্মাণের নির্দেশ প্রদান করিলেন। ইহার নিচে সামুদ্রিক প্রাণী ও মাছের ছবি ছিল যাহার কারণে মনে হইতেছিল ইহা প্রকৃত জলাশয়। এই ব্যতিক্রমধর্মী প্রাসাদের সম্মুখ কামরায় সুলায়মান (আ) এক আরাম কেদারায় উপবেশন করিলেন এবং বিলকীসকে তথায় প্রবেশ করিতে বলিলেন। প্রবেশ করিতে গিয়া জলাশয় সদৃশ মেঝে অবলোকন করিয়া তিনি হতবিহ্বল হইয়া পড়িলেন এবং শংকিত হইলেন। কাজেই তিনি তাঁহার উভয় পায়ের নিম্নাংশ অনাবৃত করিয়া কাপড় হাঁটু পর্যন্ত উঠাইলেন যাহাতে পোশাক পানিতে ভিজিয়া না যায়। তাঁহাকে সান্ত্বনা প্রদান করিবার জন্য সুলায়মান (আ) বলিলেন, “ইহা স্বচ্ছ কাঁচের তৈরী প্রাসাদ”। বিলকীস ইতোপূর্বে এত চমৎকার প্রাসাদ আর দেখেন নাই (হিফজুর রহমান, কাসাসুল কুরআন, ২খ, ১৪৯-১৫০)। সুলায়মান (আ)-এর পক্ষ হইতে এই অসাধারণ সম্মান প্রদানের আয়োজন প্রত্যক্ষ করিয়া বিলকীসের প্রকৃত বোধোদয় হইল এবং তিনি ভাবিতে লাগিলেন, সুলায়মান আসলেই আল্লাহ্র নবী। তাই তিনি তাহার ভুল স্বীকার করিলেন এবং ইসলাম গ্রহণ করিয়া আল্লাহ্র অনুগত হইবার ঘোষণা প্রদান করিলেন (আফীফ আবদুল ফাত্তাহ তাব্বারাহ, পৃ. ২৯৫)। আল-কুরআনেও এই বর্ণনা আসিয়াছে:
قِيلَ لَهَا ادْخُلِي الصِّرْحَ فَلَمَّا رَأَتْهُ حَسِبَتْهُ لُجَّةً وَكَشَفَتْ عَنْ سَاقَيْهَا قَالَ إِنَّهُ صَرْحٌ مُمَرَّدٌ مِنْ قَرَارِيرَ قَالَتْ رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي وَأَسْلَمْتُ مَعَ سُلَيْمَانَ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ.
"তাহাকে বলা হইল, এই প্রাসাদে প্রবেশ কর। যখন সে উহা দেখিল তখন সে উহাকে এক গভীর জলাশয় মনে করিল এবং সে তাহার উভয় ‘সাক’ অনাবৃত করিল। সুলায়মান বলিল, ইহা তো • স্বচ্ছ স্ফটিকমণ্ডিত প্রাসাদ। সেই নারী বলিল, হে আমার প্রতিপালক! আমি তো নিজের প্রতি জুলুম করিয়াছিলাম, আমি সুলায়মানের সহিত জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ্র নিকট আত্মসমর্পণ করিলাম” (২৭:৪৪)।
📄 সুলায়মান (আ)-এর সহিত বিলকীসের বিবাহ
বিলকীসের ইসলাম গ্রহণ করিবার পর সুলায়মান (আ) তাঁহাকে বিবাহ করিয়াছেন কিনা এই প্রসংগে কুরআন অথবা সহীহ হাদীছে পক্ষে অথবা বিপক্ষে কোন বক্তব্য পাওয়া যায় না। তবে বিভিন্ন ইতিহাস গ্রন্থে এই সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য রহিয়াছে যাহা নিম্নে প্রদত্ত হইল:
(ক) ইসলাম গ্রহণের পর সুলায়মান (আ) তাঁহাকে বিবাহ করিয়াছিলেন এবং তিনি তাঁহাকে সাংঘাতিক ভালোবাসিতেন। তিনি তাঁহাকে য়ামানের রাজত্ব ফেরত দিয়াছিলেন এবং প্রতি মাসে একবার করিয়া সুলায়মান (আ) তাহার নিকট বেড়াইতে যাইতেন, প্রত্যেকবারে তথায় তিন দিন অবস্থান করিতেন (ইব্ন আছীর ১খ, ১৮১)।
(খ) বলা হইয়া থাকে যে, সুলায়মান (আ) তাঁহাকে তাঁহার সম্প্রদায়ের কোন পুরুষ ব্যক্তিকে বিবাহ করিবার নির্দেশ দেন, কিন্তু তিনি তাহা অস্বীকার করেন এবং বলেন যে, হামাদানের রাজা যদি সম্মত হয় তাহা হইলে তিনি তাহাকে বিবাহ করিতে প্রস্তুত। সুলায়মান (আ) হামাদানের রাজার সাথে তাঁহার বিবাহের ব্যবস্থা করেন এবং য়ামানের রাজত্ব ফেরত দেন। সাথে সাথে য়ামানের জিন্নদেরকে তাঁহার আনুগত্য করিতে নির্দেশ দেন (ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া, ২খ, ২৩)।