📄 সাবা জাতির অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি
সাবা জাতি ছিল তখনকার দুনিয়ায় সর্বাধিক সমৃদ্ধিশালী সম্প্রদায়। তাহাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির উৎস ছিল কৃষিকার্য ও ব্যবসা-বাণিজ্য। এক বিশেষ পদ্ধতির উন্নত সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে তাহারা কৃষিকার্যে সমৃদ্ধি আনয়ন করিয়াছিল। তাহাদের দেশ শস্য-শ্যামল ক্ষেত-খামার, বাগ-বাগিচা ও গবাদিপশুতে ভরপুর ছিল। তাহারা জ্বালানী কাঠ হিসাবে দারুচিনি, ছন্দল ও অন্যান্য সুগন্ধি কাষ্ঠ ব্যবহার করিত। তাহারা সোনা-রূপার পাত্র ব্যবহার করিত। তাহাদের বাড়ির ছাদে, প্রাচীরে ও দ্বারদেশে হাতীর দাঁত, সোনা-রূপা ও হীরা-জহরত খচিত থাকিত। রোম ও পারস্যের ধন-সম্পদ ইহাদের দিকেই প্রবাহিত হইতেছিল। তাহাদের নিকটবর্তী তীরভূমি হইতে যেসব পণ্যবাহী নৌযান যাতায়াত করিত তাহা হইতে সে পর্যন্ত সুগন্ধির প্রবাহ পৌঁছিত (তাফহীমুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ১৯৭-৮, টীকা ৩৭; কাসাসুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ২৮৯-৯১; আরদুল কুরআন, ১খ, পৃ. ১৯৭-৮)।
সাবা জাতি এক বিশেষ উন্নত সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষিকার্যকে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত করিয়াছিল। বর্ষাকালে পাহাড় পর্বত হইতে যেসব ঝর্ণা প্রবাহিত হইত সেইগুলির মুখে স্থানে স্থানে বাঁধ বাঁধিয়া সারা দেশব্যাপী অসংখ্য পানি সঞ্চয়াগার গড়িয়া তোলা হইয়াছিল এবং দেশটিকে ফল ও ফসলের সমারোহ ভরিয়া তুলিয়াছিল। কুরআন মজীদে সেদিকেই ইঙ্গিত করিয়া বলা হইয়াছে : "দুইটি উদ্যান, একটি ডানদিকে এবং অপরটি বামদিকে। তাহাদেরকে বলা হইয়াছিল, তোমরা তোমাদের প্রতিপালক প্রদত্ত রিয়িক ভোগ কর এবং তাঁহার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর" (৩৪:১৫)। আয়াতের অর্থ এই নহে যে, মাত্র দুইটি বাগান ছিল; বরং সাবার সমগ্র এলাকা জনপথের দুই পাশ ধরিয়া গুলবাগিচায় ভরিয়া গিয়াছিল। মানুষ চলার পথে যেখানেই থামিয়া দাঁড়াইত, তাঁহার ডাইনে ও বামে কেবল বাগানই দেখিতে পাইত। কেহ ফল সংগ্রহের জন্য মাথায় ঝুড়ি লইয়া এইসব উদ্যানের মধ্য দিয়া অতিক্রম করাকালে তাহাকে কষ্ট স্বীকার করিয়া ফল পাড়ার প্রয়োজন হইত না। গাছের পরিপক্ক ফল পতিত হইয়া তাহার ঝুড়ি ভর্তি হইয়া যাইত (মা'আরিফুল কুরআন, সংক্ষিপ্ত সং, পৃ. ১১০৯, ইব্ন কাছীরের বরাতে; তাফহীমুল কুরআন, সূরা সাবা, টীকা ২৭; তাফসীরে উছমানী, পৃ. ৫৭২, টীকা ৮ এবং পৃ. ৫৭৩, টীকা ১; কাসাসুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ২৯৫-৬; ইসলামী বিশ্বকোষ, ১৮খ, পৃ. ১৯৬)। ইব্ন আব্বাস (রা) বলিয়াছেন যে, জনপদের ডানে ও বামে তেরটি জনপদ ব্যাপিয়া উদ্যানরাজি বিস্তৃত ছিল (তাফসীর ইব্ন আব্বাস, পৃ. ৩৬০)। আল-মাসউদী বলেন, 'সাবা অঞ্চলের উর্বর ও আবাদী এলাকা অতিক্রম করিতে একজন অশ্বারোহীর এক মাসের অধিক সময় লাগিত। জনুযানে অথবা পদব্রজে ভ্রমণকারীকে এই এলাকা অতিক্রমকালে রৌদ্রের খরতাপের মধ্যে পড়িতে হইত না। কারণ সে সম্পূর্ণ পথই বৃক্ষের ছায়ায় অতিক্রম করিতে পারিত, (ই. বি., ১৮খ, পৃ. ১৯৭-৮)।
তাহাদের শহরও ছিল অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন, সুসজ্জিত, স্বাস্থ্যকর ও জীবনোপকরণে ভরপুর। কুরআন মজীদে ইহাকে বলা হইয়াছে “উত্তম নগরী” (৩৪ : ১৫)। শহরটি ছিল নাতিশীতোষ্ণ মণ্ডলে অবস্থিত এবং ইহার আবহাওয়া ছিল স্বাস্থ্যকর ও বিশুদ্ধ। সমগ্র শহরে মশা-মাছি, ছারপোকা ও সাপ-বিছার মত ইতর প্রাণীর অস্তিত্ব ছিল না। বহিরাঞ্চল হইতে কোন ব্যক্তি তাহার দেহে ও পরিচ্ছদে উকুন ইত্যাদি বহন করিয়া এই শহরে প্রবেশ করিলে সেইগুলি আপনা আপনি মরিয়া যাইত (তাফসীরে ইব্ন কাছীরের বরাতে মা'আরিফুল কুরআন, সৌদী সং, পৃ. ১১০৯; ইসলামী বিশ্বকোষ, ১৮খ)।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সম্প্রসারিত বাণিজ্যিক কার্যক্রম, দেশব্যাপী উন্নত পদ্ধতির সেচব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষিকার্যের সম্প্রসারণ এবং উত্তম ও পরিচ্ছন্ন নগর জীবন সাবাবাসীদের প্রভূত সমৃদ্ধির কথাই স্মরণ করাইয়া দেয়। আল্লাহ তা'আলা তাহাদেরকে এইরূপ উত্তম জীবনোপকরণ ও পরিচ্ছন্ন জীবন যাপনের ব্যবস্থা করিয়া দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাবাবাসীদেরকে তাঁহার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার আহ্বান জানাইয়াছেন। তাহাদেরকে বলা হইয়াছিল, "তোমরা তোমাদের প্রতিপালক প্রদত্ত রিযিক ভোগ কর এবং তাঁহার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর ... ক্ষমাশীল প্রতিপালক" (৩৪: ১৫)। হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, আল্লাহ তা'আলা এই সম্প্রদায়ের হেদায়াতের জন্য তেরজন নবী প্রেরণ করিয়াছিলেন। তাঁহারা তাহাদেরকে আল্লাহ প্রদত্ত জীবনোপকরণ ভোগ করিয়া তাঁহার একত্বকে কবুল করার মাধ্যমে তাঁহার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার আহ্বান জানাইয়াছিলেন। কিন্তু তাহারা তাহাদের আহ্বানে কর্ণপাত করে নাই (তাফসীরে ইব্ন আব্বাস, পৃ. ৩৬০; ইসলামী বিশ্বকোষ, ১৮খ, পৃ. ১৯৬)। তাহারা বলিল, আল্লাহ যে আমাদের প্রতি কোনরূপ নিয়ামত নাযিল করিয়াছেন তাহা আমাদের জানা নাই।
সাবা জাতি হযরত সুলায়মান (আ)-এর সহিত রাণী বিলকীসের সাক্ষাতের পর প্রতিমা পূজা ত্যাগ করিয়া ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করিয়াছিল। তাহারা আল্লাহর প্রতি অনুগত থাকিলেও কালের প্রবাহে ক্রমান্বয়ে অত্যাচারী হইয়া উঠে এবং লোভ-লালসা ও ভোগ-বিলাসিতার পথ অনুসরণ করিয়া আল্লাহ তা'আলার অবাধ্য হইয়া পড়ে (ই.বি., ১৮খ, পৃ. ১৯৬)। ফলে তাহারা আল্লাহ্ গযবে নিপতিত হইয়া ধ্বংস হয়। মহান আল্লাহ বলেন : “পরে তাহারা অবাধ্য হইল। ফলে আমি তাহাদের উপর প্রবাহিত করিলাম বাঁধভাঙ্গা বন্যা এবং তাহাদের উদ্যান দুইটিকে পরিবর্তিত করিয়া দিলাম এমন দুইটি উদ্যানে যাহাতে উৎপন্ন হয় বিস্বাদ ফলমূল, ঝাউগাছ এবং সামান্য কুলগাছ। আমি তাহাদের কুফরীর জন্য তাহাদেরকে এই শাস্তি দিয়াছিলাম। আমি অকৃতজ্ঞ ব্যতীত আর কাহাকেও এমন শাস্তি দেই না" (৩৪: ১৬-১৭)।
📄 মা'রিব বাঁধ ও সায়লুল আরিম
সাবা জাতির কৃষিজ উন্নতির চাবিকাঠি ছিল মা'রিব বাঁধ এবং যাহা তাহাদের কৃতকর্মের ফলে তাহাদের ধ্বংসের কারণ হইয়াছিল। এই বাঁধ সম্পর্কে কুরআন মজীদে সরাসরি উল্লেখ না থাকিলেও আল্লাহ্ হুকুমে ইহা বিধ্বস্ত হওয়ার ফলে যে সর্বগ্রাসী ধ্বংসাত্মক প্লাবন হইয়াছিল "সায়লুল 'আরিম" (বাঁধভাঙ্গা বন্যা) নামে তাহার উল্লেখ আছে (দ্র. ৩৪: ১৭)। এই বাঁধ কখন এবং কাহার উদ্যোগে নির্মিত হইয়াছিল সেই সম্পর্কে মতভেদ আছে। ইব্ন আব্বাস (রা) ও ওয়াহ্হ্ ইব্ন্ন মুনাব্বিহ প্রমুখের মতে রাণী বিলকীসের নির্দেশে উহা নির্মিত হইয়াছিল (ই. বি., ১৮খ, পৃ. ১৯৬, কলাম ১)। আদ-দামীরী উল্লেখ করিয়াছেন যে, আস-সুহায়লীর মতে সাবা ইব্ন ইয়াশ'আব উহা নির্মাণ করিয়াছিলেন এবং উহার মধ্য দিয়া সত্তরটি নদীর পানি প্রবাহিত হইবার ব্যবস্থা করিয়াছিলেন।
বাঁধের নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হওয়ার পূর্বেই তাহার মৃত্যু হইলে পরবর্তী শাসকগণ উহার অবশিষ্ট নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করেন (পৃ. গ্র., ১পৃ. ১৯৬, কলাম ২)। কাহারও মতে হযরত লুকমান (আ) ইব্ন আদ ইব্ন কির ছিলেন এই বাঁধের নির্মাতা (ই.বি., ১৮খ, পৃ. ১৯৭, কলাম ১)। কবি আল-আ'শা-র কবিতায় হিময়ার-কে ইহার নির্মাতারূপে উল্লেখ করা হইয়াছে (ই.বি., ১৮খ, পৃ. ১৯৯, কলাম ১)। দুইটি উদ্দেশ্যে এই বাঁধ নির্মাণ করা হইয়াছিল: (১) যাহাতে মা'রিব উপত্যকার উচ্চভূমির কৃষিক্ষেত্রে ও উদ্যানসমূহে পানিসেচের ব্যবস্থা করা যায় এবং তদুদ্দেশ্যে পানির স্তরকে অন্তত পাঁচ মিটার উচ্চতায় আনয়ন করা; (২) বন্যার পানি তথা নদ-নদীর পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে আনা এবং পরবর্তী বর্ষা মৌসুমের পানি সরবরাহ না আসা পর্যন্ত উহাদের পানিকে যথাসম্ভব পরিমাণে সঞ্চিত করিয়া রাখা (ই. বি., ১৮খ, পৃ. ১৯৯, কলাম ২)।
মা'রিব বাঁধটি মযবুত করার জন্য উহার পশ্চাদভাগে অত্যন্ত শক্তিশালী ও বেশ উঁচু স্তম্ভের ঠেস স্থাপন করা হইয়াছিল। সেইগুলির ভিত্তিসমূহকে তাম্র নির্মিত পেরেকের সাহায্যে পরস্পরের সহিত অত্যন্ত মযবুতভাবে সম্পৃক্ত করিয়া দেওয়া হইয়াছিল। স্তম্ভশ্রেণী অদ্যাবধি বিদ্যমান ও দণ্ডায়মান আছে। অনেক সংখ্যক লোক একত্র হইয়া ঐ স্তম্ভগুলির একটিকেও মাটিতে শোয়াইয়া ফেলিতে চেষ্টা করিয়া ব্যর্থ হইবে (ই. বি., ১৮খ, পৃ. ১৯৭, কলাম ১, ২)।
এত শক্তিশালী ও মযবুত বাঁধও আল্লাহ্ গযব হইতে নাফরমান মা'রিববাসীকে রক্ষা করিতে পারে নাই। সাবা জাতি তাহাদের আসমানী কিতাবসমূহ ও নবী-রাসূলগণের ভবিষ্যদ্বাণী দ্বারা পূর্বেই জানিতে পারিয়াছিল যে, তাহাদের বাঁধ এক দিন না এক দিন ইঁদুর দ্বারা বিধ্বস্ত হইবেই (ই. বি., ১৮খ, পৃ. ১৯৬, কলাম ১)। সত্যিই ইঁদুরের মত ক্ষুদ্র প্রাণীর দ্বারা এত সুদৃঢ় একটি বাঁধ ধ্বংস হইল এবং বন্যার পানিতে সমগ্র মা'রিব অঞ্চলের ক্ষেত-খামার ও ফলের বাগান ধ্বংস হইয়া গেল। অভাবের তাড়নায় ও বহিশক্তির আক্রমণে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হইয়া এই এলাকার জনগোষ্ঠী আরবের বিভিন্ন এলাকায় অভিবাসন করে (ই. বি., ১৮খ, পৃ. ১৯৮ ও ১৯৯)। ফলে সুজলা-সুফলা মা'রিব ভূমি বনভূমিতে পরিণত হইল। "পরে উহারা আদেশ অমান্য করিল, ফলে আমি উহাদের উপর প্রবাহিত করিলাম বাঁধভাঙ্গা বন্যা এবং উহাদের উদ্যান দুইটিতে হয় বিস্বাদ ফলমূল, ঝাউগাছ এবং কিছু কুল গাছ” (৩৪: ১৬)। মা'রিব বাঁধ ধ্বংস এবং উহার ফলে তৎপার্শ্ববর্তী সুজলা-সুফলা এলাকা বিধ্বস্ত হইয়া বন-জঙ্গলে পরিণত হওয়ার যে ঘটনা কুরআন মজীদে উক্ত হইয়াছে উহা ৫৪৩ খৃ. হইতে ৫৭০ খৃ.-এর মধ্যবর্তী কোনও এক সময় ঘটিয়াছিল (ই.বি., ১৮খ, পৃ. ১৯৫, কলাম ২)।
সায়লুল 'আরিম-এর পূর্বেই খৃস্টীয় প্রথম শতাব্দীর কাছাকাছি সময়ে সাবা জাতির আন্তর্জাতিক স্থল ও নৌপথের আন্তর্জাতিক একচেটিয়া বাণিজ্যের পতন শুরু হয়। একের পর এক গ্রীক, রোমান ও হাবশী শাসক গোষ্ঠীর আক্রমণে এই জাতির একচেটিয়া ব্যবসা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হইয়া যায় (তাফহীমুল কুরআন, ৪খ, পৃ. ১৯৭-৯৯, টীকা ৩৭। সাবাঈদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, মা'রিব বাঁধ, সায়লুল আরিম ইত্যাদি বিষয়ের বিস্তারিত বিবরণের জন্য দ্র. শিরো, "মা'রিব", ই. বি., ১৮খ, পৃ. ১৮৭-২০৪)।
📄 গ্রন্থপঞ্জী
কুরআন: তরজমা ও তাফসীর: (১) আয়াতসমূহের তরজমার জন্য আল-কুরআনুল করীম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১৯শ মুদ্রণ, ঢাকা ১৪১৭/১৯৯৭; (২) ইমাম রাযী, তাফসীরে কবীর, বৈরূত তা.বি., ২১খ, ২৪খ, ২৫খ. ও ২৬খ.; (৩) আল-আলুসী, রূহুল মা'আনী, বৈরূত তা.বি., ২খ, ১৭খ, ১৯খ ও ২৩খ; (৪) কুরতুবী, আহকামুল কুরআন, বৈরূত ১৯৬৬ খৃ., ৪খ, ১০খ, ১৪খ.; (৫) ইব্ন জারীর তাবারী, তাফসীরুল কুরআনুল আজীম, ৩য় সং, বৈরূত ১৩৯৮/১৯৭৮, ১০ম বালাম, ২৩খ; (৬) তাফসীরে ইব্ন আব্বাস (রা); (৭) ইব্ন কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল আজীম, ২খ. (বৃহৎ সংস্করণ); (৮) ইবনুল জাওযী, তাফসীর যাদুল মাহীর, ২খ. ও ৭খ.; (৯) শিব্বির আহমাদ উছমানী, তাফসীরে উছমানী (উর্দু), সৌদী সংস্করণ (১০) সায়্যিদ আবুল আলা মওদূদী, তাফহীমুল কুরআন (উর্দু), ৩খ. ও ৪খ.; (১১) মুফতী মুহাম্মাদ শফী, মাআরিফুল কুরআন (উর্দু), ৬খ. ও ৭খ.; (১২) আবদুল মাজেদ দরিয়াবাদী, তাফসীরে মাজেদী (উর্দু), লাহোর-করাচী তা.বি. (সংশ্লিষ্ট গ্রন্থাবলীর সংশ্লিষ্ট পৃষ্ঠা নম্বর নিবন্ধ গর্ভে উক্ত হইয়াছে)।
হাদীছের গ্রন্থাবলী: (১৩) সহীহ আল-বুখারী, কলিকাতা সংস্করণ, ১খ. ও ২খ.; (১৪) সহীহ মুসলিম, দেওবন্দ সং, ২খ.; (১৫) সুনান আবী দাউদ, কলিকাতা সং, ২খ.; (১৬) জামে আত-তিরমিযী (বাংলা সংস্করণ), বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, ঢাকা; (১৭) আল-মুজতাবা মিন সুনান আন নাসাঈ, দেওবন্দ সং; (১৮) সুনান ইবন মাজা, বৈরূত সং, ফুআদ আবদুল বাকী সম্পা.; (১৯) আহমাদ ইব্ন হাম্বল, আল-মুসনাদ, বায়তুল আফকার আদ-দুওয়ালিয়া, রিয়াদ ১৪১৯/১৯৯৮ (৬ খণ্ড একত্রে); (২০) আল-মুজামুল মাফাহরিস লি-আলফাজিল হাদীছ আন-নাবাবী (স), ৮ খণ্ডে সমাপ্ত।
ইসলামের ইতিহাস ও অন্যান্যঃ (২১) ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, দারুল ফিক্র আল-আরাবী, বৈরূত তা.বি., ১খ. ও ২খ.; (২২) ইবনুল আছীর, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ১ম সং, বৈরূত ১৪০৭/১৯৮৭, ১খ.; (২৩) ইব্ন সা'দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, দারু সাদির, বৈরূত তা.বি.; (২৪) ইব্ন জারীর তাবারী, তারীখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, বৈরূত তা.বি., ১খ.; (২৫) ইব্ন আসাকির, তাহযীব তা'রীখ দিমাশৃঙ্ক আল-কাবীর, ২য় সং, বৈরূত ১৩৯৯/১৯৭৯, ৫ম খণ্ড; (২৬) ছা'আলিবী, কাসাসুল আম্বিয়া (আল-মুসাম্মা বিহি আরাইসুল মাজালিস), তা.বি.; (২৭) মালিক গোলাম আলী এণ্ড সন্স লিঃ, আনওয়ারে আম্বিয়া, ৫ম সং, লাহোর-হায়দরাবাদ-করাচী ১৯৮৫ খৃ.; (২৮) হিফজুর রহমান সিউহারবী, কাসাসুল কুরআন (উর্দু), ৪র্থ সং, দিল্লী ১৪০০/১৯৮০, ২খ.; (২৯) মুহাম্মাদ জামীল আহমাদ, আম্বিয়া-ই কুরআন, লাহোর তা.বি., ৩খ.; (৩০) সায়্যিদ সুলায়মান নাদবী, আরদুল কুরআন, কুতুবখানা রশীদিয়া, তা.বি., ২খ.; (৩১) আবদুর রহমান আল-জাযীরী, কিতাবুল ফিক্হ আলাল-মাযাহিবিল আরবা'আ, বৈরূত তা.বি., ৫খ.; (৩২) ইসলামী বিশ্বকোষ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১৮খ. (সংশ্লিষ্ট গ্রন্থাবলীর সংশ্লিষ্ট পৃষ্ঠা নম্বর নিবন্ধগর্ভে উক্ত হইয়াছে)।
পাশ্চাত্য উৎস : (৩৩) বাংলা বাইবেল, বাংলাদেশ বাইবেল সোসাইটি, ঢাকা; (৩৪) Collier's Encyclopaedia, vol. 21; (৩৫) Ency. Britannica, 1962, vol. 13 and 20; (৩৬) Ency. of Religion and Ethics, vol. 2, New York.
মুহাম্মদ মূসা
📄 সুলায়মান (আ) ও সাবার রাণী বিলকীস প্রসংগ
বিলকীসের বংশ পরিচয়: তাঁহার মূল নাম ছিল 'বার্লকামাহ' এবং ডাকনাম ছিল "বিলকীস”। তাঁহার বংশপরিচয়ের ক্ষেত্রে কয়েকটি বর্ণনা নিম্নরূপ:
বালকামাহ বিন্ত আনশারাহ ইবনিল হারিছ ইব্ন কায়স ইব্ন সায়ফী ইব্ন সাবা ইব্ন ইয়াশজাব ইবন ইয়ারব ইব্ন কাহতান (ইবনুল আছীর ও আল-কামিল, ১খ, ১৭৬)।
ভিন্নমতে, বালকামাহ বিন্তিল হৃদহাদ (তাহার নাম আনশারাহ) ইব্ন তুববা ইব্ন বিল আদগার ইব্ন তুব্বা' যিল মানার ইব্ন তুব্বা' আর-রাইশ (ইবনুল আছীর, ১খ, ১৭৬)।
অথবা বিলকীস বিন্তু সীরাহ (হুদহাদ রাহিল) ইব্ন যিজাদন ইব্ন সায়রাহ ইব্ন হারছ ইব্ন কায়স ইব্ন সায়ফী ইব্ন সাবা ইব্ন ইয়াশজাব ইব্ন ইয়ারুব ইব্ন কাহতান (ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া, ২খ, ২০)।
হাবশার পুরাতন অধিবাসীরা তাঁহার নাম 'মাকিদাহ' বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। তাহারা আরো দাবি করিয়া থাকেন যে, তাহাদের পুরাতন রাজবংশ সুলায়মান (আ) ও রাণী 'মাকিদাহ'-এর বংশধর ('আফীফ তাববারাহ, মা'আল আম্বিয়া ফি'ল কুরআন, পৃ. ২৯০)।
অনেক ঐতিহাসিক এই মর্মে মত পেশ করিয়াছেন যে, বিলকীসের মাতা ছিল জিন্ন সম্রাটের কন্যা। তাঁহার নাম ছিল 'রাওয়াহ বিন্ত সুকার' (ইবনুল আছীর, ১খ, ১৭৬) অথবা 'রায়হানাহ বিন্ত সাকান' (ইব্ন কাছীর, ২খ, ২০)। ইব্ন কাছীরের মতে ইহা দুর্বল বর্ণনা। তাঁহার পিতা সেই সময়ে মনুষ্য সমাজে উপযুক্ত পাত্রী না পাইয়া জিন্ন জাতির মধ্য হইতে এই নারীকে বিবাহ করিয়াছিল। ইহা একটি উপাখ্যান মাত্র। ইমাম ছা'লাবী আবূ হুরায়রা (রা)-এর সূত্রে একটি হাদীছ বর্ণনা করিয়াছে, যাহার ভাষ্য এইরকম:
قال رسول الله صلى الله عليه وسلم كان أحد ابوى بلقيس جنيا .
"নবী (স) ইরশাদ করিয়াছেন, "বিলকীসের মাতা-পিতার মধ্যে একজন ছিল জিন্ন" (আল-বিদায়া, ২খ, ২০)। অবশ্য এই হাদীছের সনদ দুর্বল। বিলকীসের পিতা কিভাবে জিন্ন সম্প্রদায়ের সন্ধান পাইল সে সম্পর্কেও কিংবদন্তীমূলক গল্প রহিয়াছে (দ্র. ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ১খ, ১৭৭)। তবে এই জাতীয় ঘটনা এবং গল্পের সাথে বাস্তবতার আদৌ কোন সম্পর্ক নাই বলিয়া মত প্রকাশ করিয়াছেন আল্লামা ইবনুল আছীর (আল-কামিল, ১খ, ১৭৭)।
হুদহুদ পাখির মাধ্যমে সুলায়মান (আ) বিলকীস সম্পর্কে অবগত হন। ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হইয়াছে যে, আল্লাহ তা'আলা সুলায়মান (আ)-কে অসাধারণ ক্ষমতা প্রদান করিয়াছিলেন। মানুষ, জিন্ন, পাখি সকলেই তাঁহার সৈন্যবাহিনীর অন্তর্গত ছিল। তিনি পাখীদের কথাবার্তা বুঝিতে পারিতেন। একদা এক যুদ্ধের সফরে সুলায়মান (আ) এবং তাঁহার বাহিনীর পানির প্রয়োজন হইয়া পড়িল। হুদহুদ পাখী বলিতে পারে মাটির নীচে কাছে অথবা দূরে পানি আছে কিনা। তাই এই সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করিবার জন্য সুলায়মান (আ) হুদহুদ পাখীকে ডাকিয়া পাঠাইলেন, কিন্তু অনেক খোঁজাখুঁজির পরও তাহাকে পাওয়া গেল না। এই হুদহুদ অত্যন্ত সুদর্শন পাখী। তাহার মাথার উপর চমকপ্রদ ঝুটি রহিয়াছে। হুদহুদকে ইংরেজীতে বলা হয় Hoopoe, ইহার ঠোঁট একটু লম্বা। ডানা দুইখানা অত্যন্ত সুন্দর ও মার্জিত।
এই হুদহুদ পাখীকে দেখিতে না পাইয়া সুলায়মান (আ) অত্যন্ত রাগান্বিত হইলেন এবং ঘোষণা দিয়া দিলেন যে, অনুপস্থিতির উপযুক্ত কারণ দর্শাইতে না পারিলে হুদহুদকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা হইবে। এই বর্ণনা আল-কুরআনে এইভাবে আসিয়াছে:
(وَتَفَقَّدَ الطَّيْرَ فَقَالَ مَالِيَ لَا أَرَى الْهُدْهُدَ أَمْ كَانَ مِنَ الْغَائِبِينَ. لَأُعَذِّبَنَّهُ عَذَابًا شَدِيدًا أَوْ لَأَذْبَحَنَّهُ أَوْ لَيَأْتِيَنِي بِسُلْطَانِ مُبِينٍ)
"সুলায়মান বিহংগদলের সন্ধান লইল এবং বলিল, ব্যাপার কি, হুদহুদকে দেখিতেছি না যে! সে অনুপস্থিত না কি? সে উপযুক্ত কারণ না দর্শাইলে আমি অবশ্যই উহাকে কঠিন শাস্তি দিব অথবা যবাহ করিব" (২৭:২০-২১)।
অনতিবিলম্বে হুদহুদ আসিয়া পড়িল এবং বলিল, আপনি যাহা অবগত নহেন, আমি তাহা অবগত হইয়াছি। আমি সাবা হইতে এক সুনিশ্চিত সংবাদ লইয়া আসিয়াছি।" আল-কুরআনে এইভাবে বর্ণনা আসিয়াছে:
فَمَكَثَ غَيْرَ بَعِيدٍ فَقَالَ أَحَطْتُ بِمَا لَمْ تُحِطْ بِهِ وَجِئْتُكَ مِنْ سَبَإٍ بِنَبَإٍ يَقِينٍ. إِنِّي وَجَدْتُ امْرَأَةً تَمْلِكُهُمْ وَأُوتِيَتْ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ وَلَهَا عَرْشِ عَظِيمٌ. وَجَدْتُهَا وَقَوْمَهَا يَسْجُدُونَ لِلشَّمْسِ مِنْ دُونِ اللَّهِ وَزَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانُ أَعْمَالَهُمْ فَصَدَّهُمْ عَنِ السَّبِيلِ فَهُمْ لَا يَهْتَدُونَ . أَلا يَسْجُدُوا لِلَّهِ الَّذِي يُخْرِجُ الْخَبْءَ فِي السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَيَعْلَمُ مَا تُخْفُونَ وَمَا تُعْلِنُونَ . اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ .
"অনতিবিলম্বে হুদহুদ আসিয়া পড়িল এবং বলিল, আপনি যাহা অবগত নহেন আমি তাহা অবগত হইয়াছি এবং 'সাবা' হইতে সুনিশ্চিত সংবাদ লইয়া আসিয়াছি। আমি তো এক নারীকে দেখিলাম উহাদিগের উপর রাজত্ব করিতেছে, তাহাকে দেওয়া হইয়াছে সকল কিছু এবং তাহার আছে এক বিরাট সিংহাসন। আমি তাহাকে এবং তাহার সম্প্রদায়কে দেখিলাম তাহারা আল্লাহর পরিবর্তে সূর্যকে সিজদা করিতেছে, শয়তান উহাদিগের কার্যাবলী উহাদিগের নিকট শোভন করিয়াছে এবং উহাদিগকে সৎপথ হইতে নিবৃত্ত করিয়াছে; এই জন্য যে, উহারা যেন সিজদা না করে আল্লাহকে যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর লুক্কায়িত বস্তুকে প্রকাশ করেন, যিনি জানেন, যাহা তোমরা গোপন কর এবং যাহা তোমরা ব্যক্ত কর। 'আল্লাহ', তিনি ব্যতীত কোন ইলাহ নাই, তিনি মহান আরশের অধিপতি" (২৭: ২২-২৫)।
রাণী বিলকীস যে সিংহাসনে বসিত তাহা ছিল কারুকার্য খচিত খাটের মত যাহা মূল্যবান স্বর্ণ দ্বারা তৈরী। ইহার ফাঁকে ফাঁকে ছিল হীরা, চুনি-পান্নার মত মূল্যবান পাথর (ইবনুল আছীর, ১খ., ১৭৯)।