📄 সাবার সভ্যতা-সংস্কৃতি
বৃহৎ ইমারতরাজি ও দুর্গাদির জন্য সাবা ছিল তৎকালের একটি প্রসিদ্ধ রাজ্য। এই জাতি ছিল বণিক এবং ব্যবসায় ব্যাপদেশে ছিল সম্পদশালী। আরবদেশে পর্যাপ্ত স্বর্ণ ও মণি-মুক্তার খনি ছিল, যাহার অধিকাংশ ইহাদের এলাকায় বিদ্যমান ছিল ... হাদরামাওত ও ইয়ামন এলাকা সুগন্ধি দ্রব্য উৎপাদনের জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। উমান ও বাহ্রায়নে মণি-মুক্তার খনি ছিল, বর্তমান কালেও তথা হইতে সারা পৃথিবীতে মূল্যবান মণি-মুক্তা রপ্তানী হয়। ইয়ামনের উপকূলে হিন্দুস্তান ও হাবশায় উৎপাদিত পণ্য মজুদের জন্য পণ্যাগার ছিল। তৎকালে সিরিয়া, মিসর, ইউরোপ, হিন্দুস্তান ও হাবশার মধ্যে যে ব্যবসায়িক আদান-প্রদান হইত সাবাই ছিল উহার একচেটিয়া ইজারাদার। এসব কারণে তাহাদের সভ্যতা-সংস্কৃতি বহুল আলোচিত (হিফজুর রহমানের কাসাসুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ৩৩২-এর বরাতে আম্বিয়া-ই কুরআন, ৩খ, পৃ. ১২১-২২; আরও দ্র. বাইবেলের-যিশাইয়, ৪৫ : ১৪ ও ৬০: ৬; যিরমিয়, ৬: ২০; যিহিঙ্কেল, ২৭: ২২-২৪)।
📄 ধর্ম ও ভাষা
সাবা জাতি ছিল মুশরিক ও প্রতীমা পূজারী, সূর্যই ছিল তাহাদের সর্বপ্রধান দেবতা। যেমন হুদহুদ পাখির যবানীতে কুরআন মজীদে উক্ত হইয়াছে (অনুবাদ): "আমি তাহাকে ও তাহার সম্প্রদায়কে দেখিলাম তাহারা আল্লাহর পরিবর্তে সূর্যকে সিজদা করিতেছে। শয়তান উহাদের কার্যাবলী উহাদের নিকট শোভন করিয়াছে এবং উহাদেরকে সৎপথ হইতে নিবৃত্ত করিয়াছে, ফলে উহারা সৎপথ পায় না" (২৭ঃ ২৪)।
ইয়াহূদী বিশ্বকোষেও ইহাদের সূর্য পূজার কথা উল্লেখ আছে (১১খ, পৃ. ২৩৬-এর বরাতে আম্বিয়া-ই কুরআন, ৩খ, পৃ. ১২২)। ইহারা তারকারাজির পূজাও করিত (আরদুল কুরআন, ২খ, পৃ. ১৬৪, 'আয়ানুল আরাব কাবলাল ইসলাম' অনুচ্ছেদের বরাতে আম্বিয়া-ই কুরআন, ৩খ, পৃ. ১২২)। সাবা জাতির ভাষা সম্পর্কে কথিত আছে যে, ইহারা ছিল 'আদ জাতির একটি শাখা। আর 'আদ জাতির ভাষা ছিল প্রাচীন আরামী-আরবী। ইহার খানিকটা পরিবর্তিত রূপই ছিল সাবা জাতির ভাষা। ইহা ছিল প্রাচীন দক্ষিণ আরবীয় অথবা কাহতানী ভাষার একটি শাখা। সাবার অপর গোত্র হিময়ারের ভাষা ছিল হিময়ারী। কুরআন মজীদের আরিম (عرم) শব্দটি এই ভাষাভুক্ত (আম্বিয়া-ই কুরআন, ৩খ, পৃ. ১২৩)। বর্তমানকালে উক্ত এলাকার জাতি-গোষ্ঠী আরবী ভাষাভাষী।
আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা ও অনুসন্ধানের ফলে ইয়ামনে প্রায় তিন হাজার শিলালিপি উদ্ধার হইয়াছে। সেই সঙ্গে আরবী কিংবদন্তী এবং রোমান ও গ্রীক ইতিহাসের সংগৃহীত তথ্যের আলোকে অনুমান করা যায় যে, সাবা রাজ্য উহার গোড়াপত্তন হইতে পতন কাল পর্যন্ত কয়েকটি যুগপর্যায়ে বিভক্ত ছিল।
প্রথম পর্যায় খৃ.পূ. ১১০০ সাল হইতে খৃ. পূ. ৫৫০ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত। সর্বপ্রথম যাবুর কিতাবে সাবা রাজ্যের উল্লেখ দেখা যায় (দ্র. গীতসংহিতা, ৭২:১০)। এই রাজ্যের উত্থান ঘটে সম্ভবত খৃ. পূ. ৯৫০ সালের দিকে এবং হযরত সুলায়মান (আ) ও সাবার রাণীর সংশ্লিষ্ট ঘটনা এই সময়-কালের এবং সম্রাজ্ঞী সুলায়মান (আ)-এর দাওয়াতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ (খৃ. পূ. ৯৬৫-২৬) করিলে সম্ভবত এই জাতিও ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়। কাসাসুল কুরআনের রচয়িতার মতে তাহার ইসলাম গ্রহণের ঘটনা খৃ. পূ. ৯৫০ সালের (৩খ., পৃ. ২৮৩)। এই যুগেই সাবা জাতি ধন-সম্পদ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে চরম উৎকর্ষ লাভ করে (কাসাসুল কুরআন, ২খ, পৃ. ১৩৯; তাফহীমুল কুরআন, ৪খ, পৃ. ১৯৫, টীকা ৩৭; আম্বিয়া-ই কুরআন, ৩খ, পৃ. ১২০)।
এই সময় সালা সম্রাটদের উপাধি ছিল 'মুকাররিব সাবা' (مكرب سبا), যাহা সম্ভবত مقرب سبا -এর অপভ্রংশ এবং যাহার অর্থ তখনকার রাজা-বাদশাহগণ নিজদিগকে মানুষ ও দেবতাদের মধ্যবর্তী যোগসূত্র মনে করিত অথবা তাহারা ছিল পুরোহিত বাদশাহ (Priest King)। তখন তাহাদের রাজধানী ছিল সিরওয়াহ (صرواح) নামক স্থানে, যাহা ছিল মা'রিব হইতে পশ্চিম দিকে এক দিনের পথের দূরত্বে এবং যাহার ধ্বংসাবশেষ এখনও বিদ্যমান। ইহার বর্তমান নাম খারীবা। মা'রিব বাঁধও এই কালেই-নির্মিত হয় এবং পরবর্তী শাসকগণ উহার প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সম্প্রসারণ করেন (তাফহীমুল কুরআন, পৃ. স্থা; আরদুল কুরআন, ১খ, পৃ. ১৯৩-৪; কাসাসুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ২৮৪)।
সাবা রাজ্যের দ্বিতীয় পর্যায় খৃ. পূ. ৫৫০ সাল হইতে খৃ. পূ. ১১৫ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত। এই পর্যায়ে সাবার সম্রাটগণ 'মুকাররিব' উপাধি ত্যাগ করিয়া 'মালিক' (বাদশাহ) উপাধি গ্রহণ করে এবং তাহারা সিরওয়াহ হইতে মা'রিব-এ (বিস্তারিত দ্র. ইসলামী বিশ্বকোষ, ১৮ খ, শিরো. মা'রিব) রাজধানী স্থানান্তরিত করে। স্থানটি সমুদ্রপৃষ্ঠ হইতে ৩৯০০ ফুট উচ্চে এবং সান'আ (صنعاء) হইতে ষাট মাইল পূর্বদিকে অবস্থিত। সায়লুল আরিম তথা বাঁধভাঙ্গা বন্যার বিপর্যয় এই কাল-পর্যায়ের ঘটনা, যাহা কুরআন মজীদে উক্ত হইয়াছে (দ্র. ৩৪: ১৬)। ইহার ধ্বংসাবশেষ এখনো সাক্ষ্য দেয় যে, ইহা এক কালে একটি জাতির সভ্যতা ও সংস্কৃতির লীলাভূমি ছিল (তাফহীমুল কুরআন, পৃ. স্থা.; আম্বিয়া-ই কুরআন, ৩খ, পৃ. ১২০; কাসাসুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ২৮৪; আরদুল কুরআন, ১খ)।
সাবা রাজ্যের তৃতীয় পর্যায় খৃ. পৃ. ১১৫ সাল হইতে ৩০০ খৃ. পর্যন্ত বিস্তৃত (কাসাসুল কুরআন ও আম্বিয়া-ই কুরআন ৩০০-এর স্থলে ৩০ খৃ. এবং আরদুল কুরআনে ২৫ খৃ., দ্র. পর্যায়ক্রমে, ৩খ, পৃ. ২৮৫; ৩খ., পৃ. ১২২; ১খ, পৃ. ২১৯)। তবে ৩০০ খৃ.-ই সঠিক মনে হয়। কারণ কাসাসুল কুরআনে চতুর্থ পর্যায় ৩০০ খৃ. হইতে শুরু হইয়াছে, (দ্র. ৩খ., পৃ. ১৮৫)। এই কাল-পর্যায়ে সাবা জাতির হিময়ার উপগোত্র ক্ষমতাসীন হয় এবং তাহারা মা'রিব হইতে রাজধানী 'রায়দান' নামক স্থানে স্থানান্তরিত করে। ইহা ছিল হিময়ার-এর কেন্দ্রভূমি এবং ইহার নামকরণ করা হয় যাফার (ظفا)। বর্তমান 'এরেম' (ارم عرم) শহরের কাছাকাছি এক গোলাকার পর্বতের উপর রায়দান-এর ধ্বংসাবশেষ এখনও লক্ষ্য করা যায় এবং ইহার নিকটবর্তী অঞ্চলে 'হিময়ার' নামে একটি ক্ষুদ্র গোত্র বসবাসরত আছে। ইতিহাসের এই অধ্যায়েই সাবা জাতির পতন শুরু হয় (তাফহীমুল কুরআন, ৪খ, পৃ. ১৯৬, টীকা ৩৭; কাসাসুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ২৮৪; আম্বিয়া-ই কুরআন, ৩খ, পৃ. ১২২; আরদুল কুরআন, ১খ, পৃ. ২১৯)।
সাবা রাজ্যের চতুর্থ পর্যায় ৩০০ খৃস্টাব্দের পর হইতে দীন ইসলামের সূচনাকাল পর্যন্ত বিস্তৃত (কাসাসুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ২৮৫ এবং আম্বিয়া-ই কুরআন, ৩খ, পৃ. ১২২-এ ৫২৫ খৃ. পর্যন্ত বিস্তৃত)। ইহা সাবা জাতির ধ্বংসপ্রাপ্তির অধ্যায়। এই পর্যায়ে তাহাদের মধ্যে ক্রমাগত গৃহযুদ্ধ চলিতে থাকে, বহিশক্তির প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পায় এবং তাহাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষি ব্যবস্থা ধ্বংসপ্রাপ্ত হইতে থাকে। তাহাদের গৃহযুদ্ধের সুযোগে প্রথমে ৩৪০ খৃ. হইতে ৩৭৮ খৃ. পর্যন্ত ইয়ামন হাবশার শাসনাধীনে থাকে। ৪৫০-৫১ খৃ. মা'রিব বাঁধ ভাঙ্গিয়া যাওয়ায় এক সর্বগ্রাসী বন্যার সৃষ্টি হয়। কুরআন মজীদে এই বন্যার (সায়লুল 'আরিম) কথাই উক্ত হইয়াছে। ৫২৩ খৃ. ইয়ামনের ইয়াহুদী শাসক যু-নাওয়াস নাজরানের খৃস্টানদের উপর অকথ্য ও নির্মম অত্যাচার চালায়, কুরআন মজীদে যাহা আসহাবুল উখদূদ (দ্র. ৮৫:৪-৮) নামে উক্ত হইয়াছে। ইহার প্রতিশোধস্বরূপ হাবশার খৃস্টান রাষ্ট্র ইয়ামন আক্রমণ করিয়া সমগ্র দেশ দখল করিয়া নেয়। অতঃপর ইয়ামনের হাবশী গভর্নর আবরাহা কা'বা ঘরের কেন্দ্রীয় মর্যাদা খতম করিয়া আরবের সমগ্র পশ্চিম অঞ্চল নিজ দখলে আনিবার জন্য ৫৭০ খৃ. মক্কা শরীফ আক্রমণ করিতে ৫৭০ খৃ. বা ৫৭১ খৃ. অগ্রসর হয় এবং আল্লাহ্র গযবে আবরাহা বাহিনী সমূলে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় যাহা কুরআন মজীদে 'আসহাবুল ফীল' নামে-উক্ত হইয়াছে (দ্র. ১০৫: ১-৫)। শেষকালে ৫৭৫ খৃ. পারসিকরা ইয়ামন দখল করে এবং ৬২৮ খৃ. পারসিক শাসক বাযান-এর দীন ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে যাহার অবসান ঘটে। তখন হইতে বর্তমান কাল পর্যন্ত সাবা তথা বর্তমান ইয়ামন মুসলিম শাসনাধীন রহিয়াছে এবং এখানকার সমগ্র জনগোষ্ঠী মুসলিম জাতিসত্তার অন্তর্ভুক্ত হইয়াছে (তাফহীমুল কুরআন, ৪খ, পৃ. ১৯৬-৭, টীকা ৩৭)।
📄 সাবা জাতির অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি
সাবা জাতি ছিল তখনকার দুনিয়ায় সর্বাধিক সমৃদ্ধিশালী সম্প্রদায়। তাহাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির উৎস ছিল কৃষিকার্য ও ব্যবসা-বাণিজ্য। এক বিশেষ পদ্ধতির উন্নত সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে তাহারা কৃষিকার্যে সমৃদ্ধি আনয়ন করিয়াছিল। তাহাদের দেশ শস্য-শ্যামল ক্ষেত-খামার, বাগ-বাগিচা ও গবাদিপশুতে ভরপুর ছিল। তাহারা জ্বালানী কাঠ হিসাবে দারুচিনি, ছন্দল ও অন্যান্য সুগন্ধি কাষ্ঠ ব্যবহার করিত। তাহারা সোনা-রূপার পাত্র ব্যবহার করিত। তাহাদের বাড়ির ছাদে, প্রাচীরে ও দ্বারদেশে হাতীর দাঁত, সোনা-রূপা ও হীরা-জহরত খচিত থাকিত। রোম ও পারস্যের ধন-সম্পদ ইহাদের দিকেই প্রবাহিত হইতেছিল। তাহাদের নিকটবর্তী তীরভূমি হইতে যেসব পণ্যবাহী নৌযান যাতায়াত করিত তাহা হইতে সে পর্যন্ত সুগন্ধির প্রবাহ পৌঁছিত (তাফহীমুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ১৯৭-৮, টীকা ৩৭; কাসাসুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ২৮৯-৯১; আরদুল কুরআন, ১খ, পৃ. ১৯৭-৮)।
সাবা জাতি এক বিশেষ উন্নত সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষিকার্যকে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত করিয়াছিল। বর্ষাকালে পাহাড় পর্বত হইতে যেসব ঝর্ণা প্রবাহিত হইত সেইগুলির মুখে স্থানে স্থানে বাঁধ বাঁধিয়া সারা দেশব্যাপী অসংখ্য পানি সঞ্চয়াগার গড়িয়া তোলা হইয়াছিল এবং দেশটিকে ফল ও ফসলের সমারোহ ভরিয়া তুলিয়াছিল। কুরআন মজীদে সেদিকেই ইঙ্গিত করিয়া বলা হইয়াছে : "দুইটি উদ্যান, একটি ডানদিকে এবং অপরটি বামদিকে। তাহাদেরকে বলা হইয়াছিল, তোমরা তোমাদের প্রতিপালক প্রদত্ত রিয়িক ভোগ কর এবং তাঁহার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর" (৩৪:১৫)। আয়াতের অর্থ এই নহে যে, মাত্র দুইটি বাগান ছিল; বরং সাবার সমগ্র এলাকা জনপথের দুই পাশ ধরিয়া গুলবাগিচায় ভরিয়া গিয়াছিল। মানুষ চলার পথে যেখানেই থামিয়া দাঁড়াইত, তাঁহার ডাইনে ও বামে কেবল বাগানই দেখিতে পাইত। কেহ ফল সংগ্রহের জন্য মাথায় ঝুড়ি লইয়া এইসব উদ্যানের মধ্য দিয়া অতিক্রম করাকালে তাহাকে কষ্ট স্বীকার করিয়া ফল পাড়ার প্রয়োজন হইত না। গাছের পরিপক্ক ফল পতিত হইয়া তাহার ঝুড়ি ভর্তি হইয়া যাইত (মা'আরিফুল কুরআন, সংক্ষিপ্ত সং, পৃ. ১১০৯, ইব্ন কাছীরের বরাতে; তাফহীমুল কুরআন, সূরা সাবা, টীকা ২৭; তাফসীরে উছমানী, পৃ. ৫৭২, টীকা ৮ এবং পৃ. ৫৭৩, টীকা ১; কাসাসুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ২৯৫-৬; ইসলামী বিশ্বকোষ, ১৮খ, পৃ. ১৯৬)। ইব্ন আব্বাস (রা) বলিয়াছেন যে, জনপদের ডানে ও বামে তেরটি জনপদ ব্যাপিয়া উদ্যানরাজি বিস্তৃত ছিল (তাফসীর ইব্ন আব্বাস, পৃ. ৩৬০)। আল-মাসউদী বলেন, 'সাবা অঞ্চলের উর্বর ও আবাদী এলাকা অতিক্রম করিতে একজন অশ্বারোহীর এক মাসের অধিক সময় লাগিত। জনুযানে অথবা পদব্রজে ভ্রমণকারীকে এই এলাকা অতিক্রমকালে রৌদ্রের খরতাপের মধ্যে পড়িতে হইত না। কারণ সে সম্পূর্ণ পথই বৃক্ষের ছায়ায় অতিক্রম করিতে পারিত, (ই. বি., ১৮খ, পৃ. ১৯৭-৮)।
তাহাদের শহরও ছিল অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন, সুসজ্জিত, স্বাস্থ্যকর ও জীবনোপকরণে ভরপুর। কুরআন মজীদে ইহাকে বলা হইয়াছে “উত্তম নগরী” (৩৪ : ১৫)। শহরটি ছিল নাতিশীতোষ্ণ মণ্ডলে অবস্থিত এবং ইহার আবহাওয়া ছিল স্বাস্থ্যকর ও বিশুদ্ধ। সমগ্র শহরে মশা-মাছি, ছারপোকা ও সাপ-বিছার মত ইতর প্রাণীর অস্তিত্ব ছিল না। বহিরাঞ্চল হইতে কোন ব্যক্তি তাহার দেহে ও পরিচ্ছদে উকুন ইত্যাদি বহন করিয়া এই শহরে প্রবেশ করিলে সেইগুলি আপনা আপনি মরিয়া যাইত (তাফসীরে ইব্ন কাছীরের বরাতে মা'আরিফুল কুরআন, সৌদী সং, পৃ. ১১০৯; ইসলামী বিশ্বকোষ, ১৮খ)।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সম্প্রসারিত বাণিজ্যিক কার্যক্রম, দেশব্যাপী উন্নত পদ্ধতির সেচব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষিকার্যের সম্প্রসারণ এবং উত্তম ও পরিচ্ছন্ন নগর জীবন সাবাবাসীদের প্রভূত সমৃদ্ধির কথাই স্মরণ করাইয়া দেয়। আল্লাহ তা'আলা তাহাদেরকে এইরূপ উত্তম জীবনোপকরণ ও পরিচ্ছন্ন জীবন যাপনের ব্যবস্থা করিয়া দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাবাবাসীদেরকে তাঁহার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার আহ্বান জানাইয়াছেন। তাহাদেরকে বলা হইয়াছিল, "তোমরা তোমাদের প্রতিপালক প্রদত্ত রিযিক ভোগ কর এবং তাঁহার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর ... ক্ষমাশীল প্রতিপালক" (৩৪: ১৫)। হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, আল্লাহ তা'আলা এই সম্প্রদায়ের হেদায়াতের জন্য তেরজন নবী প্রেরণ করিয়াছিলেন। তাঁহারা তাহাদেরকে আল্লাহ প্রদত্ত জীবনোপকরণ ভোগ করিয়া তাঁহার একত্বকে কবুল করার মাধ্যমে তাঁহার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার আহ্বান জানাইয়াছিলেন। কিন্তু তাহারা তাহাদের আহ্বানে কর্ণপাত করে নাই (তাফসীরে ইব্ন আব্বাস, পৃ. ৩৬০; ইসলামী বিশ্বকোষ, ১৮খ, পৃ. ১৯৬)। তাহারা বলিল, আল্লাহ যে আমাদের প্রতি কোনরূপ নিয়ামত নাযিল করিয়াছেন তাহা আমাদের জানা নাই।
সাবা জাতি হযরত সুলায়মান (আ)-এর সহিত রাণী বিলকীসের সাক্ষাতের পর প্রতিমা পূজা ত্যাগ করিয়া ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করিয়াছিল। তাহারা আল্লাহর প্রতি অনুগত থাকিলেও কালের প্রবাহে ক্রমান্বয়ে অত্যাচারী হইয়া উঠে এবং লোভ-লালসা ও ভোগ-বিলাসিতার পথ অনুসরণ করিয়া আল্লাহ তা'আলার অবাধ্য হইয়া পড়ে (ই.বি., ১৮খ, পৃ. ১৯৬)। ফলে তাহারা আল্লাহ্ গযবে নিপতিত হইয়া ধ্বংস হয়। মহান আল্লাহ বলেন : “পরে তাহারা অবাধ্য হইল। ফলে আমি তাহাদের উপর প্রবাহিত করিলাম বাঁধভাঙ্গা বন্যা এবং তাহাদের উদ্যান দুইটিকে পরিবর্তিত করিয়া দিলাম এমন দুইটি উদ্যানে যাহাতে উৎপন্ন হয় বিস্বাদ ফলমূল, ঝাউগাছ এবং সামান্য কুলগাছ। আমি তাহাদের কুফরীর জন্য তাহাদেরকে এই শাস্তি দিয়াছিলাম। আমি অকৃতজ্ঞ ব্যতীত আর কাহাকেও এমন শাস্তি দেই না" (৩৪: ১৬-১৭)।
📄 মা'রিব বাঁধ ও সায়লুল আরিম
সাবা জাতির কৃষিজ উন্নতির চাবিকাঠি ছিল মা'রিব বাঁধ এবং যাহা তাহাদের কৃতকর্মের ফলে তাহাদের ধ্বংসের কারণ হইয়াছিল। এই বাঁধ সম্পর্কে কুরআন মজীদে সরাসরি উল্লেখ না থাকিলেও আল্লাহ্ হুকুমে ইহা বিধ্বস্ত হওয়ার ফলে যে সর্বগ্রাসী ধ্বংসাত্মক প্লাবন হইয়াছিল "সায়লুল 'আরিম" (বাঁধভাঙ্গা বন্যা) নামে তাহার উল্লেখ আছে (দ্র. ৩৪: ১৭)। এই বাঁধ কখন এবং কাহার উদ্যোগে নির্মিত হইয়াছিল সেই সম্পর্কে মতভেদ আছে। ইব্ন আব্বাস (রা) ও ওয়াহ্হ্ ইব্ন্ন মুনাব্বিহ প্রমুখের মতে রাণী বিলকীসের নির্দেশে উহা নির্মিত হইয়াছিল (ই. বি., ১৮খ, পৃ. ১৯৬, কলাম ১)। আদ-দামীরী উল্লেখ করিয়াছেন যে, আস-সুহায়লীর মতে সাবা ইব্ন ইয়াশ'আব উহা নির্মাণ করিয়াছিলেন এবং উহার মধ্য দিয়া সত্তরটি নদীর পানি প্রবাহিত হইবার ব্যবস্থা করিয়াছিলেন।
বাঁধের নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হওয়ার পূর্বেই তাহার মৃত্যু হইলে পরবর্তী শাসকগণ উহার অবশিষ্ট নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করেন (পৃ. গ্র., ১পৃ. ১৯৬, কলাম ২)। কাহারও মতে হযরত লুকমান (আ) ইব্ন আদ ইব্ন কির ছিলেন এই বাঁধের নির্মাতা (ই.বি., ১৮খ, পৃ. ১৯৭, কলাম ১)। কবি আল-আ'শা-র কবিতায় হিময়ার-কে ইহার নির্মাতারূপে উল্লেখ করা হইয়াছে (ই.বি., ১৮খ, পৃ. ১৯৯, কলাম ১)। দুইটি উদ্দেশ্যে এই বাঁধ নির্মাণ করা হইয়াছিল: (১) যাহাতে মা'রিব উপত্যকার উচ্চভূমির কৃষিক্ষেত্রে ও উদ্যানসমূহে পানিসেচের ব্যবস্থা করা যায় এবং তদুদ্দেশ্যে পানির স্তরকে অন্তত পাঁচ মিটার উচ্চতায় আনয়ন করা; (২) বন্যার পানি তথা নদ-নদীর পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে আনা এবং পরবর্তী বর্ষা মৌসুমের পানি সরবরাহ না আসা পর্যন্ত উহাদের পানিকে যথাসম্ভব পরিমাণে সঞ্চিত করিয়া রাখা (ই. বি., ১৮খ, পৃ. ১৯৯, কলাম ২)।
মা'রিব বাঁধটি মযবুত করার জন্য উহার পশ্চাদভাগে অত্যন্ত শক্তিশালী ও বেশ উঁচু স্তম্ভের ঠেস স্থাপন করা হইয়াছিল। সেইগুলির ভিত্তিসমূহকে তাম্র নির্মিত পেরেকের সাহায্যে পরস্পরের সহিত অত্যন্ত মযবুতভাবে সম্পৃক্ত করিয়া দেওয়া হইয়াছিল। স্তম্ভশ্রেণী অদ্যাবধি বিদ্যমান ও দণ্ডায়মান আছে। অনেক সংখ্যক লোক একত্র হইয়া ঐ স্তম্ভগুলির একটিকেও মাটিতে শোয়াইয়া ফেলিতে চেষ্টা করিয়া ব্যর্থ হইবে (ই. বি., ১৮খ, পৃ. ১৯৭, কলাম ১, ২)।
এত শক্তিশালী ও মযবুত বাঁধও আল্লাহ্ গযব হইতে নাফরমান মা'রিববাসীকে রক্ষা করিতে পারে নাই। সাবা জাতি তাহাদের আসমানী কিতাবসমূহ ও নবী-রাসূলগণের ভবিষ্যদ্বাণী দ্বারা পূর্বেই জানিতে পারিয়াছিল যে, তাহাদের বাঁধ এক দিন না এক দিন ইঁদুর দ্বারা বিধ্বস্ত হইবেই (ই. বি., ১৮খ, পৃ. ১৯৬, কলাম ১)। সত্যিই ইঁদুরের মত ক্ষুদ্র প্রাণীর দ্বারা এত সুদৃঢ় একটি বাঁধ ধ্বংস হইল এবং বন্যার পানিতে সমগ্র মা'রিব অঞ্চলের ক্ষেত-খামার ও ফলের বাগান ধ্বংস হইয়া গেল। অভাবের তাড়নায় ও বহিশক্তির আক্রমণে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হইয়া এই এলাকার জনগোষ্ঠী আরবের বিভিন্ন এলাকায় অভিবাসন করে (ই. বি., ১৮খ, পৃ. ১৯৮ ও ১৯৯)। ফলে সুজলা-সুফলা মা'রিব ভূমি বনভূমিতে পরিণত হইল। "পরে উহারা আদেশ অমান্য করিল, ফলে আমি উহাদের উপর প্রবাহিত করিলাম বাঁধভাঙ্গা বন্যা এবং উহাদের উদ্যান দুইটিতে হয় বিস্বাদ ফলমূল, ঝাউগাছ এবং কিছু কুল গাছ” (৩৪: ১৬)। মা'রিব বাঁধ ধ্বংস এবং উহার ফলে তৎপার্শ্ববর্তী সুজলা-সুফলা এলাকা বিধ্বস্ত হইয়া বন-জঙ্গলে পরিণত হওয়ার যে ঘটনা কুরআন মজীদে উক্ত হইয়াছে উহা ৫৪৩ খৃ. হইতে ৫৭০ খৃ.-এর মধ্যবর্তী কোনও এক সময় ঘটিয়াছিল (ই.বি., ১৮খ, পৃ. ১৯৫, কলাম ২)।
সায়লুল 'আরিম-এর পূর্বেই খৃস্টীয় প্রথম শতাব্দীর কাছাকাছি সময়ে সাবা জাতির আন্তর্জাতিক স্থল ও নৌপথের আন্তর্জাতিক একচেটিয়া বাণিজ্যের পতন শুরু হয়। একের পর এক গ্রীক, রোমান ও হাবশী শাসক গোষ্ঠীর আক্রমণে এই জাতির একচেটিয়া ব্যবসা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হইয়া যায় (তাফহীমুল কুরআন, ৪খ, পৃ. ১৯৭-৯৯, টীকা ৩৭। সাবাঈদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, মা'রিব বাঁধ, সায়লুল আরিম ইত্যাদি বিষয়ের বিস্তারিত বিবরণের জন্য দ্র. শিরো, "মা'রিব", ই. বি., ১৮খ, পৃ. ১৮৭-২০৪)।