📄 সুলায়মান (আ) ও যাদুবিদ্যা
বর্তমান বাইবেল অধ্যয়নে জানা যায় যে, তাওরাত কিতাবকে বিকৃতকারী বনূ ইসরাঈল খুব সম্ভব প্রতিজ্ঞা করিয়াছিল যে, তাহারা তাহাদের কোনও একজন মহান নবীর চরিত্রও কলঙ্কিত না করিয়া ছাড়িবে না। অতএব তাহারা প্রায় প্রত্যেক নিষ্পাপ নবীর বিরুদ্ধে লাগামহীন ও ন্যাক্কারজনক অভিযোগ আরোপ করিয়াছে এবং হযরত সুলায়মান (আ)-এর নিষ্পাপ চরিত্রে সর্বাধিক কলংক লেপন করিয়াছে। তাহারা তাঁহার নবুওয়াতকে অস্বীকার করিয়াছে এবং তাঁহার বিরুদ্ধে (নাউযুবিল্লাহ) শিক্-এ লিপ্ত হওয়ার ও যাদুবিদ্যা চর্চার ভিত্তিহীন অভিযোগও উত্থাপন করিয়াছে। ইবন্ জারীর তাবারী লিখিয়াছেন। "কতক ইয়াহুদী পণ্ডিত বলাবলি করিল, মুহাম্মাদের কাণ্ড দেখ, সে সুলায়মানকে নবী বলিতেছে। আল্লাহ্র শপথ! সে তো ছিল এক যাদুকর" (তাফসীরে তাবারী, কুরআন মজীদ স্থানে স্থানে এইসব অভিযোগ নাকচ করিয়া দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁহার নিষ্পাপ (মা'সূম) ও নিষ্কলংক হওয়ার ঘোষণা দিয়াছেন (আম্বিয়া-ই কুরআন, ৩খ, পৃ. ১৩৫-৬; কাসাসুল কুরআন, ২খ, পৃ. ১৫৯-৬১)। কুরআন মজীদ বনূ ইসরাঈলের খোদাদ্রোহিতা এবং হযরত সুলায়মান (আ)-এর কুফর ও যাদুবিদ্যার সহিত সম্পর্কহীনতা এভাবে তুলিয়া ধরিয়াছে:
وَلَمَّا جَاءَهُمْ رَسُولٌ مِّنْ عِنْدِ اللَّهِ مُصَدِّقٌ لِمَا مَعَهُمْ نَبَدَ فَرِيقٌ مِّنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَبَ كِتُبَ اللَّهِ وَرَاءَ ظُهُورِهِمْ كَأَنَّهُمْ لَا يَعْلَمُونَ . وَاتَّبَعُوا مَا تَتْلُوا الشَّيْطَينُ عَلَى مُلْكِ سُلَيْمَنَ وَمَا كَفَرَ سُلَيْمَنُ وَلَكِنَّ الشَّيْطَيْنَ كَفَرُوا يُعَلِّمُونَ النَّاسَ السَّحْرَ وَمَا أُنْزِلَ عَلَى الْمَلَكَيْنِ بِبَابِلَ هَارُوتَ وَمَارُوتَ ، وَمَا يُعَلِّمُنِ مِنْ أَحَدٍ حَتَّى يَقُولَا إِنَّمَا نَحْنُ فِتْنَةٌ فَلا تَكْفُرْ فَيَتَعَلَّمُونَ مِنْهُمَا مَا يُفَرِّقُونَ بِهِ بَيْنَ الْمَرْءِ وَزَوْجِهِ وَمَا هُمْ بِضَارِّينَ بِهِ مِنْ أَحَدٍ الا باذن الله . وَيَتَعَلَّمُونَ مَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنْفَعُهُمْ . وَلَقَدْ عَلِمُوا لَمَنِ اشْتَرَهُ مَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِنْ خَلَاقٍ . وَلَبِئْسَ مَا شَرَوْا بِهِ أَنْفُسَهُمْ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ .
"যখন আল্লাহ্ পক্ষ হইতে তাহাদের নিকট একজন রাসূল আসিল, যে তাহাদের নিকট যাহা রহিয়াছে উহার সমর্থক, তখন যাহাদেরকে কিতাব দেওয়া হইয়াছিল তাহাদের একদল আল্লাহর কিতাবটিকে পশ্চাতে নিক্ষেপ করিল, যেন তাহারা জানে না। এবং সুলায়মানের রাজত্বে শয়তানরা যাহা আবৃত্তি করিত তাহারা তাহা অনুসরণ করিত। সুলায়মান কুফরী করে নাই, বরং শয়তানরাই কুফরী করিয়াছিল। তাহারা মানুষকে যাদু শিক্ষা দিত এবং যাহা বাবিল শহরে হারূত ও মারূত ফেরেশতাদ্বয়ের উপর নাযিল করা হইয়াছিল। তাহারা দুইজনে কাহাকেও শিক্ষা দিত না এই কথা না বলিয়া যে, আমরা পরীক্ষাস্বরূপ, সুতরাং তুমি কুফরী করিও না। তাহারা উভয়ের নিকট হইতে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যাহা বিচ্ছেদ সৃষ্টি করে তাহা শিক্ষা করিত, অথচ আল্লাহ্র নির্দেশ ব্যতীত তাহারা কাহারও কোন ক্ষতি সাধন করিতে পারিত না। তাহারা যাহা শিক্ষা করিত তাহা তাহাদের ক্ষতি সাধন করিত এবং কোন উপকারে আসিত না। আর তাহারা নিশ্চিতভাবে জানিত যে, যে কেহ উহা ক্রয় করে আখেরাতে তাহার কোন অংশ নাই। উহা কত নিকৃষ্ট যাহার বিনিময়ে তাহারা স্বীয় আত্মাকে বিক্রয় করিয়াছে, যদি তাহারা জানিত" (২: ১০১-২)।
যাদুচর্চা একটি পাপাচার। দুনিয়াতে আদি কাল হইতে পাপ-পুণ্যের অস্তিত্বের মত যাদুবিদ্যারও অস্তিত্ব ছিল। হযরত ইবরাহীম (আ)-এর পূর্বে আগত নবী হযরত সালিহ (আ) ছামূদ জাতিকে পাপাচার ত্যাগ করিয়া সত্য পথের অনুসরণের দাওয়াত দিলে তাহারা বলে:
إِنَّمَا أَنْتَ مِنَ الْمُسَحَرِينَ .
"তুমি তো যাদুগ্রস্তদের অন্যতম" (২৬ঃ ১৫৩)।
হযরত মূসা (আ)-এর অগ্রবর্তী ও সমসাময়িক নবী ছিলেন হযরত শু'আয়ব (আ)। তিনি তাঁহার জাতিকে সৎপথ অনুসরণের আহব্বান জানাইলে তাহারাও তাঁহাকে একই অপবাদ দেয় :
"তুমি তো যাদুগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত” (২৬ঃ ১৮৫)। إِنَّمَا أَنْتَ مِنَ الْمُسَحَرِينَ .
হযরত মূসা (আ)-এর যুগেও ফিরআওন শাসিত মিসরে যাদুর ব্যাপক চর্চা হইত এবং সে মূসা (আ)-কে পরাভূত করিবার জন্য যাদুকরদের সহায়তা গ্রহণ করিয়াছিল, যদিও পরিশেষে তাহার সমস্ত পরিকল্পনা মূসা (আ)-এর মু'জিযার সামনে নস্যাৎ হইয়াছিল (উদাহরণস্বরূপ দ্র. ৭ঃ ১৩৩-১২২)। হযরত দাউদ (আ) ও হযরত সুলায়মান (আ) ছিলেন হযরত মূসা (আ)-এর পরবর্তী কালের রাসূল (দ্র. ২:২৪৬-২৫২)। হযরত সুলায়মান (আ)-কে প্রদত্ত মু'জিযাসুলভ অলৌকিক শক্তি অবলোকন করিয়া একদল মানবরূপী ও জিন্নরূপী শয়তান অপপ্রচার করিতে থাকে যে, তিনি যাদুবিদ্যাবলে যাবতীয় অসাধ্য সাধন করিতেছেন। ইয়াহুদী জাতি কালক্রমে পথভ্রষ্ট হইয়া সুলায়মান (আ)-কে যাদুকর আখ্যায়িত করে। রাসূলুল্লাহ (স)-এর সমকালীন ইয়াহুদীরাও একই ধারণায় নিমজ্জিত ছিল। কুরআন মজীদ ইহার কঠোর প্রতিবাদ করিয়াছে, "সুলায়মান কুফরী করে নাই, বরং শয়তানরাই কুফরী করিয়াছিল। তাহারা মানুষকে যাদু শিক্ষা দিত" (২ঃ ১০২)।
সুলায়মান (আ)-এর যুগের যাদুচর্চা সম্পর্কে তাফসীরকারগণ বিভিন্নরূপ বিবৃতি পেশ করিয়াছেন (এই বিষয়ে তাফসীরের গ্রন্থাবলী, বিশেষত তাফসীরে তাবারী ও তাফসীরে ইব্ন কাছীরে উক্ত আয়াতাধীন তাফসীর দেখা যাইতে পারে)। সুলায়মান (আ)-এর ইনতিকালের পর হইতে পুনরায় বনূ ইসরাঈলের নৈতিক ও বৈষয়িক পতন শুরু হইয়া গিয়াছিল। যে কোন অধঃপতিত জাতি যেমন বিচিত্রমুখী কুসংস্কারে নিমজ্জিত হইয়া পড়ে, তদ্রূপ বনূ ইসরাঈল তথা ইয়াহুদী জাতিও মহাসত্য হইতে বিচ্যুত হইয়া কুসংস্কারে লিপ্ত হইয়া পড়ে। যাদুমন্ত্র, তাবিজ-তুমার, টোটকা প্রভৃতির দিকে তাহাদের গোটা সত্তা ঝুঁকিয়া পড়ে (তাফহীমুল কুরআন, ২: ১০১ আয়াতধীন ১০৪ নং টীকা; তাফসীরে মাজেদী, পৃ. ৩৯, টীকা ৩৫৩)। ইয়াহুদী বংশজাত জার্মান পণ্ডিত মার্গোলিওথ রচিত মহানবী (স)-এর জীবনী গ্রন্থে আরববাসী ইয়াহুদীদের সম্পর্কে লিখিয়াছেন, "ইহারা ছিল যাদুবিদ্যায় অভিজ্ঞ এবং যুদ্ধক্ষেত্রে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হওয়ার পরিবর্তে নীচতার (যাদুর) আশ্রয় লওয়াকে প্রাধান্য দিত” (পৃ. ১৮৯; তাফসীরে মাজেদী হইতে এখানে উদ্ধৃত, পৃ. ৩৯, টীকা ৩৫৩)।
ব্যাবিলনীয় যাদুচর্চার সংস্পর্শে আসিয়া ইয়াহুদীরা চরমভাবে পথভ্রষ্ট ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন হইয়া পড়ে। প্রাচীন যুগে যে দেশটি বাবিল নামে পরিচিত ছিল, তাহা বর্তমান মানচিত্রে ও ভূগোলে আরব-ইরাক নামে অভিহিত। বাবিল নগরী ফোরাত নদীর তীরে, বর্তমান বাগদাদের প্রায় ষাট মাইল (১০০ কি. মি.) দক্ষিণে বর্তমান 'হাল্লা' নামক স্থানের কাছাকাছি অবস্থিত ছিল। যাদুবিদ্যা, ঝাড়ফুঁক, টোটকা ও তন্ত্রমন্ত্রের কুসংস্কারের জন্য দেশটির প্রচুর খ্যাতি ছিল, বর্তমান কালে যাহা Occult Science বা মহাজাতক বিজ্ঞান নামে খ্যাত। ইয়াহুদী-নাসারাদের সহীফাসমূহে ব্যাপক হারে এই দেশটির উল্লেখ আছে যাহা হইতে একদিকে যেমন ইহার ধনেজনে সমৃদ্ধির সাক্ষ্য পাওয়া যায়, অন্যদিকে ইহার অপকর্ম, অপসংস্কৃতি ও বিনাশী তৎপরতারও প্রমাণ পাওয়া যায় (দ্র. বাইবেলের দানিয়েল, ৪: ৩; প্রকাশিত বাক্য, ১৭: ৬; ১৮: ১০ ও অন্যত্র)। এই জনপদের অপকর্মের সূচনা হইয়াছিল যাদুচর্চার মাধ্যমেই। বাইবেলে বলা হইয়াছে: "পরে এক শক্তিমান দূত বৃহৎ এক পাট যাঁতার তুল্য একখানা প্রস্তর লইয়া সমুদ্রে নিক্ষেপ করিয়া কহিলেন, ইহার ন্যায় মহানগরী বাবিল মহাবলে নিপতিতা হইবে, আর কখনও তাহার উদ্দেশ পাওয়া যাইবে না। ...কারণ তোমার বণিকেরা পৃথিবীর মহল্লোক ছিল, কারণ তোমার মায়াতে (যাদু) সমস্ত জাতি ভ্রান্ত হইত। আর ভাববাদীগণের ও পবিত্রগণের রক্ত, এবং যত লোক পৃথিবীতে হত হইয়াছে, সেই সকলের রক্ত ইহার মধ্যে পাওয়া গেল” (প্রকাশিত বাক্য, ১৮: ২১-২৪)। "ব্যবিলনীয় ধর্মের বৃহৎ অংশ জুড়িয়া ছিল যাদুমন্ত্র, জ্যোতিষ বিজ্ঞানের বিভিন্ন ধরন ও প্রকার।... ব্যবিলনীয় ধর্মগ্রন্থসমূহে চোখ বুলাইয়া দেখুন, সব দিকেই জ্যোতিষী ঠাকুরদের মন্ত্র আর মন্ত্রই দেখা যাইবে" (Ency. Religion and Ethics, ২খ, পৃ. ১১৬)। "বাবিল ও নিনাওয়ার ধর্মমতের অধিকাংশ ছিল ভূত-প্রেতের ঝাড়ফুঁক" (রজার্স, Religion of Babilonia and Aseria, পৃ. ১৪৫)। ইয়াহুদীদের বাবিলে সামাজিক মেলামেশা তাহাদের ফেরেশতা ও শয়তান সম্পর্কিত ধ্যানধারণা প্রভাবিত করিতে থাকে (Ency. Brit., ১৩খ, পৃ. ১৮৭, ১১শ সং.)। ইয়াহুদী পণ্ডিতগণের স্বীকারোক্তি এই যে, বাবিলনের ধর্মমতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ সব অঞ্চলের ইয়াহুদীদের মধ্যেই অক্ষুণ্ণ থাকে (Jewish Ency., ৬খ, পৃ. ৪১৩; সম্পূর্ণ আলোচনা তাফসীরে মাজেদী হইতে গৃহীত, পৃ. ৪০-৪১, টীকা ৩৫৮)।
এই বাবিল শহরেই বাবিলবাসীর, বিশেষত ইয়াহুদীদের পরীক্ষার জন্য আল্লাহ তা'আলা হারূত ও মারূত নামক দুই ফেরেশতাকে এমন জ্ঞানসহ প্রেরণ করেন যাহা জনগণের জন্য ছিল ক্ষতিকর। তাই তাহারা উহা শিক্ষা দেওয়ার পূর্বে তাহাদেরকে এই বলিয়া সতর্ক করিয়া দিত যে, তাহারা উভয়ে তাহাদের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ আসিয়াছে। অতএব তাহারা যেন কুফরীতে লিপ্ত না হয়। এই সতর্কবাণী উপেক্ষা করিয়া বাবিলবাসী ফেরেশতাদ্বয়ের নিকট হইতে সংসার বিনাশী ও ক্ষতিকর তন্ত্রমন্ত্র সম্পর্কে অবহিত হইত, যাহা তাহাদের কোন উপকারেই আসিত না। তাহারা স্পষ্টভাবেই জানিত যে, তাহারা যাহা অবহিত হইতেছে তাহা তাহাদের আখেরাতের জীবনেও লাঞ্ছনা ও দুর্ভোগের কারণ হইবে (দ্র. ২: ১০২)। ইয়াহুদীরা তাওরাতের স্পষ্ট বিধান লংঘন করিয়াই যাদুচর্চা করিত। কুরআন মজীদে এই কথার প্রতি ইঙ্গিত করিয়াই তাহাদের সমালোচনা করা হইয়াছে: "যখন আল্লাহ্র পক্ষ হইতে তাহাদের নিকট একজন রাসূল আসিল, যে তাহাদের নিকট যাহা (তাওরাত) আছে উহার সর্মথক, তখন যাহাদেরকে কিতাব দেওয়া হইয়াছিল তাহাদের একদল আল্লাহ্ কিতাবটিকে (তাওরাত) পশ্চাতে নিক্ষেপ করিল... এবং সুলায়মানের রাজত্বে শয়তানরা যাহা আবৃত্তি করিত তাহারা তাহা অনুসরণ করিত" (২: ১০১-২)।
যাদুচর্চা সম্পর্কে বাইবেলের নিষেধাজ্ঞা নিম্নরূপ : "তুমি মায়াবিনীকে জীবিত রাখিও না” (যাত্রাপুস্তক, ২২:১৮)। "তোমরা মোহকের কিংবা গণকের বিদ্যা ব্যবহার করিও না” (লেবীয় পুস্তক, ১৯:২৬)। "তোমার প্রতিপালক সদাপ্রভু তোমাকে যে দেশ দিতেছেন, সেই দেশে উপস্থিত হইলে তুমি তথাকার জাতিগণের ঘৃণার্হ কার্যের ন্যায় কার্য করিতে শিখিও না। তোমার মধ্যে যেন এমন কোন লোক পাওয়া না যায়, যে পুত্র বা কন্যাকে অগ্নির মধ্য দিয়া গমন করায়, যে মন্ত্র ব্যবহার করে বা গণক, মোহক বা মায়াবী বা ঐন্দ্রজালিক বা ভূতড়িয়া বা গুণী বা প্রেতসাধক। কেননা সদাপ্রভু এই সকল কার্যকারীকে ঘৃণা করেন; আর সেই ঘৃণার্হ কার্য প্রযুক্ত তোমার প্রতিপালক সদাপ্রভু তোমার সম্মুখ হইতে তাহাদিগকে অধিকারচ্যুত করিবেন" (দ্বিতীয় বিবরণ, ১৮ : ৯-১২)। এইসব উদ্ধৃতি হইতে স্পষ্টই প্রতীয়মান হয় যে, দীন ইসলামের অনুরূপ ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের জন্যও যাদুচর্চা করা সম্পূর্ণ হারাম। দুই ইয়াহুদী মহানবী (স)-এর নিকট উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে "আমরা মূসাকে নয়টি নিদর্শন দান করিয়াছিলাম" (১৭ : ১০১) শীর্ষক আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিল। তিনি নিদর্শনগুলি উল্লেখ করিলেন, যাহার মধ্যে একটি ছিল "তোমরা যাদুটোনা করিও না” (তিরমিযী, ইসতীযান, ২খ, পৃ. ৯৮; হাতে-পায়ে, চুমু দেয়া, নং ২৬৭০; তাফসীর সূরা ১৭, ২খ, পৃ. ১৪২, নং ৩০৮২; নাসাঈ, তাহ্রীম, বাবুস সিহ্র, ২খ, পৃ. ১৫৩-৪)।
হারূত ও মারূত ফেরেশতাদ্বয়কে কেন্দ্র করিয়াও বিচিত্রমুখী উপাখ্যান সৃষ্টি হইয়াছে, যাহা কোন কোন তাফসীর গ্রন্থেও সবিস্তারে বিবৃত হইয়াছে (উদাহারণস্বরূপ দ্র. তাফসীর তাবারী ও তাফসীর ইব্ন কাছীর, সংশ্লিষ্ট আয়াতাধীন আলোচনা)। মূল প্রকৃতিতে তাহারা ফেরেশতাই ছিলেন। কিন্তু একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে তাহাদেরকে সাময়িকভাবে মানবসমাজে বসবাসের জন্য পাঠানো হইলে তখন স্বভাবতই তাহাদের গঠনাকৃতি, অবয়ব, আচার-আচরণ সবই মানবসদৃশই হইয়া থাকিবে (তাফসীরে মাজেদী, পৃ. ৪১, টীকা ৩৫৮)। শিহাব ইরাকী স্পষ্ট ভাষায় বলিয়াছেন যে, যাহারা বিশ্বাস করে যে, হারূত ও মারূত ফেরেশতাদ্বয় তাহাদের পাপের কারণে শাস্তিভোগ করিবে, তাহারা আল্লাহ্র সহিত কুফরী করে (পৃ. গ্র, পৃ. ৪১)।
যাদুচর্চার প্রসার সম্পর্কে তাফসীরে উছমানীতে বলা হইয়াছে যে, মানুষের মধ্যে দুইভাবে ইহার বিস্তার ঘটে। হযরত সুলায়মান (আ)-এর আমলে জিন্ন ও মানুষের সহাবস্থানের ফলে মানুষেরা শয়তানদের নিকট হইতে যাদুবিদ্যা শিক্ষা করিয়া তাহা হযরত সুলায়মান (আ)-এর শিক্ষা বলিয়া প্রচার করে এবং বলে যে, তিনি এই যাদুবিদ্যার দ্বারা জিন্ন ও মানুষের উপর কর্তৃত্ব করিতেন। আল্লাহ তা'আলা ইহার জবাবে বলেন যে, ইহা কুফরী কাজ, সুলায়মান (আ) কুফরী কাজ করেন নাই। বাবিল শহরে মানবরূপী হারূত ও মারূত নামক ফেরেশতাদ্বয়ের মাধ্যমেও যাদুর বিস্তার ঘটে। কেহ তাহাদের নিকট যাদুবিদ্যা শিক্ষা করিতে আসিলে তাহারা তাহাকে সতর্ক করিয়া বলিতেন যে, ইহাতে ঈমান চলিয়া যায়। ফেরশতাদ্বয়ের মাধ্যমে মানুষকে পরীক্ষা করাই ছিল আল্লাহর উদ্দেশ্য। এইরূপ বিদ্যায় আখিরাতের কোন উপকারিতা নাই, বরং ক্ষতিকর; পার্থিব জীবনেও তাহা ক্ষতিকর। আর আল্লাহ্ হুকুম ছাড়া যাদুমন্ত্র দ্বারা কিছুই হয় না। ইহার পরিবর্তে তাহারা যদি দীন ও কিতাবের শিক্ষা গ্রহণ করিত তবে আল্লাহ্র নিকট পুরস্কৃত হইত (পৃ. ২০, টীকা ১)।
বাইবেলীয় শরীআতের অনুরূপ ইসলামী শরীআতেও যাদুচর্চা নিষিদ্ধ। কুরআন মজীদে যাদুচর্চার সমালোচনা করা হইয়াছে। মহান আল্লাহ বলেন:
وَلَا يُفْلِحُ السَّاحِرُ حَيْثُ أَتَى . "যাদুকররা যেথায়ই আসুক সফল হইবে না" (২০: ৬৯)।
মহানবী (সা) বলেন: لا تَسْحَرُوا "তোমরা যাদুটোনা করিও না” (তিরমিযী, তাফসীর সূরা ১৭, ২খ, পৃ. ১৪২, নং ৩০৮২, আরো দ্র. আবওয়াবুল ইসতিযান, বাব মা জাআ ফী কুবলাতিল ইয়াদ ওয়ার-রিজল, ২খ, পৃ. ৯৮, নং ২৬৭০)।
حد السَّاحِرِ ضَرَبَةٌ بِالسَّيْفِ . "যাদুকরের শাস্তি হইল তরবারির আঘাত (মৃত্যুদণ্ড)” (তিরমিযী, হুদূদ, বাব মা জাআ ফী হাদ্দিস সাহির, ১খ, পৃ. ১৭৬, নং ১৪০০)।
اقْتُلُوا كُلَّ سَاحِرٍ . "প্রত্যেক যাদুকরকে হত্যা কর" (আবু দাউদ, কিতাবুল ইমারা, বাব ফী আখযিল জিযয়া মিনাল মাজুস)।
مَنْ أَتَى كَاهِنًا أَوْ عَرَّافًا أَوْ سَاحِرًا فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُولُ فَقَدْ كَفَرَ عَلَى مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ . "যে ব্যক্তি কোন গণৎকার, অদৃশ্য বক্তা অথবা যাদুকরের নিকট আসিল এবং তাহার কথায় বিশ্বাস স্থাপন করিল, সে মুহাম্মাদ (স)-এর প্রতি কাফির হইয়া গেল” (জাসসাসের আহ্কামুল কুরআন, বাংলা অনু., ১খ, পৃ. ৯৮-৯)।
ফকীহগণের ঐকমত্য অনুযায়ী যাদুচর্চা করা, উহা শিক্ষা দেয়া বা শিক্ষা করা হারাম এবং উহাকে বৈধ বলিয়া বিশ্বাস করা কুফরী। হানাফী, মালিকী ও হাম্বলী মাযহাবমতে যাদুকরের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। শাফিঈ মাযহাবমতে যাদুমন্ত্র কুফরীর পর্যায়ভুক্ত হইলে এবং যাদুকর উহার চর্চা বৈধ্য বলিয়া বিশ্বাস করিলে তাহার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড (কিতাবুল ফিক্হ আলাল-মাযাহিবিল আরবাআ, ৫খ, পৃ. ৪৬১-২; জামে আত-তিরমিযী, কিতাবুল হুদূদ, বাব হাদ্দিস সাহির)। অমুসলিম নাগরিকের (যিম্মী) ষাদুচর্চা বৈধ। তবে তাহার যাদুক্রিয়ায় কোন মুসলমান নিহত হওয়া প্রমাণিত হইলে তাহার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড (কিতাবুল ফিক্হ আলাল-মাযাহিবি, ৫খ, পৃ. ৪৯৩)।
📄 সাবার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
কুরআন মজীদের দুইটি সূরার দুই স্থানে 'সাবা'-এর উল্লেখ আছে। "আমি সাবা হইতে সুনিশ্চিত সংবাদ লইয়া আসিয়াছি” (২৭: ২২)। "সাবাবাসীদের জন্য তো উহার বাসভূমিতে ছিল এক নিদর্শন" (৩৪: ১৫)। ইতিহাস দৃষ্টে 'সাবা' দক্ষিণ আরবের একটি বৃহৎ জাতি-গোষ্ঠীর নাম। এই সম্পর্কে মহানবী (স)-এর একটি হাদীছ বর্ণিত আছে।
عَنْ فَرْوَةَ بْنِ مُسَيْكَ الْمُرَادِي قَالَ أَتَيْتُ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ..... قَالَ وَأُنْزِلَ فِي سَبَا مَا أُنْزِلَ فَقَالَ رَجُلٌ يَا رَسُولَ اللهِ وَمَا سَبَا أَرْضُ أَوْ إِمْرَاةٌ قَالَ لَيْسَ بِأَرْضِ وَلَا امْرَأَةٍ وَلَكِنَّهُ رَجُلٌ وَلَدَ عَشَرَةٌ مِنَ الْعَرَبِ فَتَيَامَنَ مِنْهُمْ سِتَّةَ تَشَائَمَ مِنْهُمْ أَرْبَعَةً فَأَمَّا الَّذِينَ تَشَأَمُوا فَلَحْمُ وَجُدَامٌ وَغَسَّانٌ وَعَامِلَةً وَأَمَّا الَّذِينَ تَيَأْمَنُوا فَالْأَزْدُ وَالأَشْعَرِيُّونَ وَحَمِيرٌ وَمَدْحِجٌ وَانْمَارِ وَكنْدَةُ فَقَالَ رَجُلٌ يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا أَنْمَارُ قَالَ الَّذِينَ مِنْهُمْ خَنْعَمْ وَبَجِبلة
"ফারওয়া ইব্ন মুসায়্ক আল-মুরাদী (রা) বলেন, আমি নবী (স)-এর নিকট আসিলাম।... রাবী বলেন, অতঃপর সাবা সম্পর্কে যাহা নাযিল হওয়ার ছিল তাহা নাযিল হইল। এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! 'সাবা' কি কোন এলাকার নাম না কোন স্ত্রীলোকের নাম? তিনি বলেন: কোন ভূখণ্ডের নামও নহে বা কোন স্ত্রীলোকের নামও নহে, বরং একজন পুরুষলোকের নাম। তাহার ঔরসে আরবের দশজন লোক জন্মগ্রহণ করেন। তাহাদের ছয়জন ইয়ামানে (দক্ষিণ দিকে) এবং চারজন সিরিয়ায় (বাঁ দিকে) বসতি স্থাপন করে। বাম দিকের লোকদের নাম : লাখখ, জুযাম, গাসসান ও আমিলা (গোত্র)। আর ডান দিকের লোকদের নাম : আব্দ, আশ'আরী, হিময়ার, কিন্দা, মাযহিজ ও আনমার। এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! 'আনমার' কাহারা? তিনি বলেন: খাছ'আম ও বাজীলা গোত্রের লোকজন তাহাদের অন্তর্ভুক্ত” (তিরমিযী, তাফসীর, সূরা সাবা; আবূ দাউদ, কিতাবুল হুরুফ ওয়াল-কিরাআত, ২০ নং হাদীস; মুসনাদে আহমাদ, ১খ, পৃ. ৩১৬, নং ২৯০০; তাবাকাত ইবন সা'দ, ১খ, কিসমুল আওয়াল, পৃ. ২০)।
কুরআন মজীদে সাবা জাতির আর্থিক সমৃদ্ধি, কৃষিজ উন্নতি, পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর শহর সভ্যতা, এই জাতির ধ্বংস, বিশেষত তাহাদের রাজধানী মা'রিবের শস্য-শ্যামল সবুজ বনানীর ধ্বংস সম্পর্কে কুরআন মজীদে একটি নাতিদীর্ঘ বর্ণনা রহিয়াছে:
لَقَدْ كَانَ لِسَبَا فِي مَسْكَنِهِمْ أَيَةٌ جَنَّانِ عَنْ يَمِينِ وَشِمَالٍ كُلُوا مِنْ رِزْقِ رَبِّكُمْ وَاشْكُرُوا لَهُ بَلْدَةً طَيِّبَةً وَرَبُّ غَفُورٌ. فَأَعْرَضُوا فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ سَيْلَ الْعَرِمِ وَبَدَّلْنَهُمْ بِجَنْتَيْهِمْ جَنَّتَيْنِ ذَوَاتَيْ أَكُل خَمْطَ وَأَثْلٍ وَشَيْيْ مِنْ سِدْرٍ قَلِيلٍ . ذَلِكَ جَزَيْنَهُمْ بِمَا كَفَرُوا وَهَلْ تُجْزِي إِلا الْكَفُورُ . وَجَعَلْنَا بَيْنَهُمْ وَبَيْنَ الْقُرَى الَّتِي بَرَكْنَا فِيهَا قرى ظَاهِرَةً وَقَدَّرْنَا فِيهَا السَّيْرَ سِيرُوا فِيهَا لَيَالِي وَأَيَّامًا امْنِينَ ، فَقَالُوا رَبُّنَا بُعِدْ بَيْنَ أَسْفَارِنَا وَظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ فَجَعَلْتُهُمْ أَحَادِيثَ وَمَزَقْنَهُمْ كُلَّ مُمَزَّقٍ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَتٍ لِكُلِّ صَبَّارٍ شَكُورٍ : وَلَقَدْ صَدَّقَ عَلَيْهِمْ إِبْلِيسُ ظَنَّهُ فَاتَّبَعُوهُ إِلَّا فَرِيقًا مِنَ الْمُؤْمِنِينَ . وَمَا كَانَ لَهُ عَلَيْهِمْ مِنْ سُلْطَنِ إِلَّا لِنَعْلَمَ مَنْ يُؤْمِنُ بِالْآخِرَةِ مِمَّنْ هُوَ مِنْهَا فِي شَكٍّ وَرَبُّكَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ حَفِيظٌ .
"সাবাবাসীদের জন্য তো তাহাদের বাসভূমিতে ছিল এক নিদর্শন : দুইটি উদ্যান, একটি ডানদিকে এবং অপরটি বামদিকে। তাহাদেরকে বলা হইয়াছিল, তোমরা তোমাদের প্রতিপালক প্রদত্ত রিযিক ভোগ কর এবং তাঁহার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। উত্তম নগরী এবং ক্ষমাশীল প্রতিপালক। পরে তাহারা অবাধ্য হইল। ফলে আমি তাহাদের উপর প্রবাহিত করিলাম বাঁধভাঙ্গা বন্যা এবং তাহাদের উদ্যান দুইটিকে পরিবর্তিত করিয়া দিলাম এমন দুইটি উদ্যানে যাহাতে উৎপন্ন হয় বিস্বাদ ফলমূল, ঝাউগাছ এবং সামান্য কুলগাছ। আমি তাহাদের কুফরীর জন্য তাহাদেরকে এই শাস্তি দিয়াছিলাম। আমি অকৃতজ্ঞ ব্যতীত আর কাহাকেও এমন শাস্তি দেই না। তাহাদের ও যেসব জনপদের প্রতি আমি অনুগ্রহ করিয়াছিলাম সেইগুলির মধ্যবর্তী স্থানে দৃশ্যমান বহু জনপদ স্থাপন করিয়াছিলাম এবং ঐসব জনপদে ভ্রমণের যথাযথ ব্যবস্থা করিয়াছিলাম এবং তাহাদেরকে বলিয়াছিলাম, তোমরা এইসব জনপদে নিরাপদে ভ্রমণ কর দিবস ও রজনীতে। কিন্তু তাহারা বলিল, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের সফরের মনযিলের ব্যবধান বর্ধিত কর। তাহারা নিজেদের প্রতি যুলুম করিয়াছিল। ফলে আমি তাহাদেরকে কাহিনীর বিষয়বস্তুতে পরিণত করিলাম এবং তাহাদেরকে ছিন্নভিন্ন করিয়া দিলাম। ইহাতে প্রত্যেক ধৈর্যশীল কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য নিদর্শন রহিয়াছে। তাহাদের সম্বন্ধে ইবলীস তাহার ধারণা সত্য প্রমাণ করিল, ফলে তাহাদের মধ্যে একটি মুমিন দল ব্যতীত সকলেই তাহার অনুসরণ করিল। তাহাদের উপর শয়তানের কোন আধিপত্য ছিল না; বরং কাহারা আখেরাতে ঈমান আনে এবং কাহারা তাহাতে সন্দিহান তাহা প্রকাশ করিয়া দেওয়াই ছিল আমার উদ্দেশ্য। তোমার প্রতিপালক সর্ববিষয়ে হেফাজতকারী" (৩৪ : ১৫-২১)।
অতএব সাবা ছিল আরবের একটি লোকের নাম। বহু প্রাচীন কাল হইতেই আরবের এই জাতিটি খ্যাতিমান ছিল। খৃ.পূ. ২৫০০ সনে উর-এর শিলালিপিসমূহে সাবা জাতি "সাবূম” নামে উক্ত হইয়াছে। অতঃপর ব্যাবিলনীয় ও এ্যাসিরীয় শিলালিপিতে, অনুরূপভাবে বাইবেলের বহু স্থানে ইহার উল্লেখ আছে (উদাহরণস্বরূপ দ্র. গীত সংহিতা, ৭২: ১৫; যিরমিয়, ৬: ২০; যিহিঙ্কেল, ২৭: ২২ হইতে ৩৮: ১৩; ইয়োব, ৬: ১৯; আরও দ্র. তাফহীমুল কুরআন, পৃ. স্থা.)। এই সাবা-ই বর্তমান কালে 'ইয়ামন' নামে খ্যাত (তাফহীম, পৃ. স্থা.)।
আদ জাতির মধ্যে হযরত হূদ (আ) জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন হযরত নূহ (আ)-এর বংশধর এবং অধস্তন পঞ্চম পুরুষ : হৃদ ইবন সিল্হ ইব্ন আরফাখসাদ ইব্ন সাম ইব্ন নূহ (আম্বিয়া-ই কুরআন, ৩খ, ১১৯)। বাইবেলে 'হৃদ' নামের স্থলে 'এবং' উক্ত হইয়াছে (আদিপুস্তক, ১০ ৪১-৩২; ১ম বংশাবলী, ১: ১৭-১৮)।
📄 সাবার সভ্যতা-সংস্কৃতি
বৃহৎ ইমারতরাজি ও দুর্গাদির জন্য সাবা ছিল তৎকালের একটি প্রসিদ্ধ রাজ্য। এই জাতি ছিল বণিক এবং ব্যবসায় ব্যাপদেশে ছিল সম্পদশালী। আরবদেশে পর্যাপ্ত স্বর্ণ ও মণি-মুক্তার খনি ছিল, যাহার অধিকাংশ ইহাদের এলাকায় বিদ্যমান ছিল ... হাদরামাওত ও ইয়ামন এলাকা সুগন্ধি দ্রব্য উৎপাদনের জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। উমান ও বাহ্রায়নে মণি-মুক্তার খনি ছিল, বর্তমান কালেও তথা হইতে সারা পৃথিবীতে মূল্যবান মণি-মুক্তা রপ্তানী হয়। ইয়ামনের উপকূলে হিন্দুস্তান ও হাবশায় উৎপাদিত পণ্য মজুদের জন্য পণ্যাগার ছিল। তৎকালে সিরিয়া, মিসর, ইউরোপ, হিন্দুস্তান ও হাবশার মধ্যে যে ব্যবসায়িক আদান-প্রদান হইত সাবাই ছিল উহার একচেটিয়া ইজারাদার। এসব কারণে তাহাদের সভ্যতা-সংস্কৃতি বহুল আলোচিত (হিফজুর রহমানের কাসাসুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ৩৩২-এর বরাতে আম্বিয়া-ই কুরআন, ৩খ, পৃ. ১২১-২২; আরও দ্র. বাইবেলের-যিশাইয়, ৪৫ : ১৪ ও ৬০: ৬; যিরমিয়, ৬: ২০; যিহিঙ্কেল, ২৭: ২২-২৪)।
📄 ধর্ম ও ভাষা
সাবা জাতি ছিল মুশরিক ও প্রতীমা পূজারী, সূর্যই ছিল তাহাদের সর্বপ্রধান দেবতা। যেমন হুদহুদ পাখির যবানীতে কুরআন মজীদে উক্ত হইয়াছে (অনুবাদ): "আমি তাহাকে ও তাহার সম্প্রদায়কে দেখিলাম তাহারা আল্লাহর পরিবর্তে সূর্যকে সিজদা করিতেছে। শয়তান উহাদের কার্যাবলী উহাদের নিকট শোভন করিয়াছে এবং উহাদেরকে সৎপথ হইতে নিবৃত্ত করিয়াছে, ফলে উহারা সৎপথ পায় না" (২৭ঃ ২৪)।
ইয়াহূদী বিশ্বকোষেও ইহাদের সূর্য পূজার কথা উল্লেখ আছে (১১খ, পৃ. ২৩৬-এর বরাতে আম্বিয়া-ই কুরআন, ৩খ, পৃ. ১২২)। ইহারা তারকারাজির পূজাও করিত (আরদুল কুরআন, ২খ, পৃ. ১৬৪, 'আয়ানুল আরাব কাবলাল ইসলাম' অনুচ্ছেদের বরাতে আম্বিয়া-ই কুরআন, ৩খ, পৃ. ১২২)। সাবা জাতির ভাষা সম্পর্কে কথিত আছে যে, ইহারা ছিল 'আদ জাতির একটি শাখা। আর 'আদ জাতির ভাষা ছিল প্রাচীন আরামী-আরবী। ইহার খানিকটা পরিবর্তিত রূপই ছিল সাবা জাতির ভাষা। ইহা ছিল প্রাচীন দক্ষিণ আরবীয় অথবা কাহতানী ভাষার একটি শাখা। সাবার অপর গোত্র হিময়ারের ভাষা ছিল হিময়ারী। কুরআন মজীদের আরিম (عرم) শব্দটি এই ভাষাভুক্ত (আম্বিয়া-ই কুরআন, ৩খ, পৃ. ১২৩)। বর্তমানকালে উক্ত এলাকার জাতি-গোষ্ঠী আরবী ভাষাভাষী।
আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা ও অনুসন্ধানের ফলে ইয়ামনে প্রায় তিন হাজার শিলালিপি উদ্ধার হইয়াছে। সেই সঙ্গে আরবী কিংবদন্তী এবং রোমান ও গ্রীক ইতিহাসের সংগৃহীত তথ্যের আলোকে অনুমান করা যায় যে, সাবা রাজ্য উহার গোড়াপত্তন হইতে পতন কাল পর্যন্ত কয়েকটি যুগপর্যায়ে বিভক্ত ছিল।
প্রথম পর্যায় খৃ.পূ. ১১০০ সাল হইতে খৃ. পূ. ৫৫০ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত। সর্বপ্রথম যাবুর কিতাবে সাবা রাজ্যের উল্লেখ দেখা যায় (দ্র. গীতসংহিতা, ৭২:১০)। এই রাজ্যের উত্থান ঘটে সম্ভবত খৃ. পূ. ৯৫০ সালের দিকে এবং হযরত সুলায়মান (আ) ও সাবার রাণীর সংশ্লিষ্ট ঘটনা এই সময়-কালের এবং সম্রাজ্ঞী সুলায়মান (আ)-এর দাওয়াতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ (খৃ. পূ. ৯৬৫-২৬) করিলে সম্ভবত এই জাতিও ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়। কাসাসুল কুরআনের রচয়িতার মতে তাহার ইসলাম গ্রহণের ঘটনা খৃ. পূ. ৯৫০ সালের (৩খ., পৃ. ২৮৩)। এই যুগেই সাবা জাতি ধন-সম্পদ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে চরম উৎকর্ষ লাভ করে (কাসাসুল কুরআন, ২খ, পৃ. ১৩৯; তাফহীমুল কুরআন, ৪খ, পৃ. ১৯৫, টীকা ৩৭; আম্বিয়া-ই কুরআন, ৩খ, পৃ. ১২০)।
এই সময় সালা সম্রাটদের উপাধি ছিল 'মুকাররিব সাবা' (مكرب سبا), যাহা সম্ভবত مقرب سبا -এর অপভ্রংশ এবং যাহার অর্থ তখনকার রাজা-বাদশাহগণ নিজদিগকে মানুষ ও দেবতাদের মধ্যবর্তী যোগসূত্র মনে করিত অথবা তাহারা ছিল পুরোহিত বাদশাহ (Priest King)। তখন তাহাদের রাজধানী ছিল সিরওয়াহ (صرواح) নামক স্থানে, যাহা ছিল মা'রিব হইতে পশ্চিম দিকে এক দিনের পথের দূরত্বে এবং যাহার ধ্বংসাবশেষ এখনও বিদ্যমান। ইহার বর্তমান নাম খারীবা। মা'রিব বাঁধও এই কালেই-নির্মিত হয় এবং পরবর্তী শাসকগণ উহার প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সম্প্রসারণ করেন (তাফহীমুল কুরআন, পৃ. স্থা; আরদুল কুরআন, ১খ, পৃ. ১৯৩-৪; কাসাসুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ২৮৪)।
সাবা রাজ্যের দ্বিতীয় পর্যায় খৃ. পূ. ৫৫০ সাল হইতে খৃ. পূ. ১১৫ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত। এই পর্যায়ে সাবার সম্রাটগণ 'মুকাররিব' উপাধি ত্যাগ করিয়া 'মালিক' (বাদশাহ) উপাধি গ্রহণ করে এবং তাহারা সিরওয়াহ হইতে মা'রিব-এ (বিস্তারিত দ্র. ইসলামী বিশ্বকোষ, ১৮ খ, শিরো. মা'রিব) রাজধানী স্থানান্তরিত করে। স্থানটি সমুদ্রপৃষ্ঠ হইতে ৩৯০০ ফুট উচ্চে এবং সান'আ (صنعاء) হইতে ষাট মাইল পূর্বদিকে অবস্থিত। সায়লুল আরিম তথা বাঁধভাঙ্গা বন্যার বিপর্যয় এই কাল-পর্যায়ের ঘটনা, যাহা কুরআন মজীদে উক্ত হইয়াছে (দ্র. ৩৪: ১৬)। ইহার ধ্বংসাবশেষ এখনো সাক্ষ্য দেয় যে, ইহা এক কালে একটি জাতির সভ্যতা ও সংস্কৃতির লীলাভূমি ছিল (তাফহীমুল কুরআন, পৃ. স্থা.; আম্বিয়া-ই কুরআন, ৩খ, পৃ. ১২০; কাসাসুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ২৮৪; আরদুল কুরআন, ১খ)।
সাবা রাজ্যের তৃতীয় পর্যায় খৃ. পৃ. ১১৫ সাল হইতে ৩০০ খৃ. পর্যন্ত বিস্তৃত (কাসাসুল কুরআন ও আম্বিয়া-ই কুরআন ৩০০-এর স্থলে ৩০ খৃ. এবং আরদুল কুরআনে ২৫ খৃ., দ্র. পর্যায়ক্রমে, ৩খ, পৃ. ২৮৫; ৩খ., পৃ. ১২২; ১খ, পৃ. ২১৯)। তবে ৩০০ খৃ.-ই সঠিক মনে হয়। কারণ কাসাসুল কুরআনে চতুর্থ পর্যায় ৩০০ খৃ. হইতে শুরু হইয়াছে, (দ্র. ৩খ., পৃ. ১৮৫)। এই কাল-পর্যায়ে সাবা জাতির হিময়ার উপগোত্র ক্ষমতাসীন হয় এবং তাহারা মা'রিব হইতে রাজধানী 'রায়দান' নামক স্থানে স্থানান্তরিত করে। ইহা ছিল হিময়ার-এর কেন্দ্রভূমি এবং ইহার নামকরণ করা হয় যাফার (ظفا)। বর্তমান 'এরেম' (ارم عرم) শহরের কাছাকাছি এক গোলাকার পর্বতের উপর রায়দান-এর ধ্বংসাবশেষ এখনও লক্ষ্য করা যায় এবং ইহার নিকটবর্তী অঞ্চলে 'হিময়ার' নামে একটি ক্ষুদ্র গোত্র বসবাসরত আছে। ইতিহাসের এই অধ্যায়েই সাবা জাতির পতন শুরু হয় (তাফহীমুল কুরআন, ৪খ, পৃ. ১৯৬, টীকা ৩৭; কাসাসুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ২৮৪; আম্বিয়া-ই কুরআন, ৩খ, পৃ. ১২২; আরদুল কুরআন, ১খ, পৃ. ২১৯)।
সাবা রাজ্যের চতুর্থ পর্যায় ৩০০ খৃস্টাব্দের পর হইতে দীন ইসলামের সূচনাকাল পর্যন্ত বিস্তৃত (কাসাসুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ২৮৫ এবং আম্বিয়া-ই কুরআন, ৩খ, পৃ. ১২২-এ ৫২৫ খৃ. পর্যন্ত বিস্তৃত)। ইহা সাবা জাতির ধ্বংসপ্রাপ্তির অধ্যায়। এই পর্যায়ে তাহাদের মধ্যে ক্রমাগত গৃহযুদ্ধ চলিতে থাকে, বহিশক্তির প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পায় এবং তাহাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষি ব্যবস্থা ধ্বংসপ্রাপ্ত হইতে থাকে। তাহাদের গৃহযুদ্ধের সুযোগে প্রথমে ৩৪০ খৃ. হইতে ৩৭৮ খৃ. পর্যন্ত ইয়ামন হাবশার শাসনাধীনে থাকে। ৪৫০-৫১ খৃ. মা'রিব বাঁধ ভাঙ্গিয়া যাওয়ায় এক সর্বগ্রাসী বন্যার সৃষ্টি হয়। কুরআন মজীদে এই বন্যার (সায়লুল 'আরিম) কথাই উক্ত হইয়াছে। ৫২৩ খৃ. ইয়ামনের ইয়াহুদী শাসক যু-নাওয়াস নাজরানের খৃস্টানদের উপর অকথ্য ও নির্মম অত্যাচার চালায়, কুরআন মজীদে যাহা আসহাবুল উখদূদ (দ্র. ৮৫:৪-৮) নামে উক্ত হইয়াছে। ইহার প্রতিশোধস্বরূপ হাবশার খৃস্টান রাষ্ট্র ইয়ামন আক্রমণ করিয়া সমগ্র দেশ দখল করিয়া নেয়। অতঃপর ইয়ামনের হাবশী গভর্নর আবরাহা কা'বা ঘরের কেন্দ্রীয় মর্যাদা খতম করিয়া আরবের সমগ্র পশ্চিম অঞ্চল নিজ দখলে আনিবার জন্য ৫৭০ খৃ. মক্কা শরীফ আক্রমণ করিতে ৫৭০ খৃ. বা ৫৭১ খৃ. অগ্রসর হয় এবং আল্লাহ্র গযবে আবরাহা বাহিনী সমূলে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় যাহা কুরআন মজীদে 'আসহাবুল ফীল' নামে-উক্ত হইয়াছে (দ্র. ১০৫: ১-৫)। শেষকালে ৫৭৫ খৃ. পারসিকরা ইয়ামন দখল করে এবং ৬২৮ খৃ. পারসিক শাসক বাযান-এর দীন ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে যাহার অবসান ঘটে। তখন হইতে বর্তমান কাল পর্যন্ত সাবা তথা বর্তমান ইয়ামন মুসলিম শাসনাধীন রহিয়াছে এবং এখানকার সমগ্র জনগোষ্ঠী মুসলিম জাতিসত্তার অন্তর্ভুক্ত হইয়াছে (তাফহীমুল কুরআন, ৪খ, পৃ. ১৯৬-৭, টীকা ৩৭)।