📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বায়তুল মাকদিসের মর্যাদা

📄 বায়তুল মাকদিসের মর্যাদা


মহান আম্বিয়া-ই কিরাম কর্তৃক নির্মিত পৃথিবীর তিনটি মসজিদ সর্বাধিক মর্যাদার অধিকারী এবং যুগ-যুগান্তরের পরিক্রমায় আজও ইতিহাসের সাক্ষীরূপে দাঁড়াইয়া আছে। বায়তুল মাকদিস সমভাবে মুসলিম, খৃস্টান ও ইয়াহুদীন জাতির নিকটই মর্যাদাপূর্ণ এবং তাহাদের যিয়ারত স্থান। কুরআন মজীদে বায়তুল মাকদিসের উল্লেখের পরপরই বলা হইয়াছে, "ইহার পরিবেশকে আমি বরকতময় করিয়াছি তাহাকে আমার নিদর্শনসমূহ দেখাইবার জন্য" (১৭: ১)। শায়খুল হিন্দের তরজমাঃ "এই ঘরকে আমার বরকত বেষ্টন করিয়া রাখিয়াছে” (তাফসীরে উছমানী, পৃ. ৩৭৩)। বায়তুল মাকদিসের এলাকায় বহু সংখ্যক নবী-রাসূলের আর্বিভাব হইয়াছিল, যাহাদের অনেককেই এখানে দাফন করা হইয়াছে। উপরন্তু মহানবী (স) মি'রাজে যাওয়ার পথে এখানেই আম্বিয়া-ই কিরামের সঙ্গে তাঁহার বরকতময় মর্যাদাপূর্ণ সাক্ষাত হয় (তাফসীরে উছমানী, পৃ. ৩৭৪, টীকা ৩; তাফসীরে কুরতুবী, ১০খ, পৃ. ২১২)। মহানবী (স) বলেনঃ
لَا تُشَدُّ الرِّحَالُ إِلَّا إِلَى ثَلاثَةِ مَسَاجِدَ مَسْجِدِ الْحَرَامِ وَمَسْجِدِي هَذَا وَمَسْجِدِ الْأَقْصَى .
"তিনটি মসজিদ ব্যতীত অন্য কোথায়ও (সওয়াবের অভিপ্রায়ে) সফর করা যায় না: মসজিদুল হারাম, আমার এই মসজিদ এবং মসজিদুল আকসা” (তিরমিযী, সালাত, বাব মা জাআ ফী আয়্যুল মাসাজিদ আফদাল, ১খ, পৃ. ৪৪; বুখারী, তাহাজ্জুদ, বাব ফাদলিস সালাত ফী মাসজিদ মাক্কা ওয়াল মাদীনা এবং বাব মাসজিদ বায়তিল মাকদিস; ইহা ব্যতীত দ্র. মুসলিম, হজ্জ; আবূ দাউদ, মানাসিক; নাসাঈ, মাসাজিদ; মুওয়াত্তা, জুমুআ; ইবন মাজা, ইকামাতুস সালাত, বাব মা জাআ ফিস সালাত ফী মাসজিদ বায়তিল মাকদিস, ১খ, পৃ. ১০১; দারিমী, সালাত ইত্যাদি অধ্যায়)।
উপরিউক্ত হাদীছের ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞ আলিমগণ বলেন যে, কোন ব্যক্তি এমন কোন মসজিদে নামায পড়ার মানত করিলে, যেখানে পৌঁছাইতে সফর করিতে হয়, মানত পূর্ণ না করিয়া নিজের বসতির নিকটস্থ মসজিদে মানতের নামায আদায় করিবে। তবে হাদীছে উক্ত তিনটি মসজিদে নামায আদায়ের মানত করিলে তথায় পৌঁছিয়া উক্ত নামায আদায় করিবে (তাফসীরে কুরতুবী, ১০খ, পৃ. ২১২)। শায়খুল হিন্দ মাহমূদুল হাসান (র) বলেন, উক্ত তিনটি মসজিদ ব্যতীত অন্য কোন মসজিদের উদ্দেশে সফর করা যাইবে না... অর্থাৎ মসজিদের উদ্দেশে সফর করা নিষেধ (তিরমিযী, তাকারীর, পৃ. ১৫-১৬)।
عَنْ مَيْمُونَةَ مَوْلاةَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَتْ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ افْتِنَا فِي بَيْتِ الْمَقْدِسِ قَالَ أَرْضُ المَحْشَرِ وَالْمَنْشَرِ ابْتُوهُ فَصَلُّوا فِيهِ فَإِنَّ صَلوةٌ فِيهِ كَالْفِ صَلوةٌ فِي غَيْرِهِ قُلْتُ أَرَأَيْتَ إِنْ لَمْ أَسْتَطِعْ أَنْ اتَحَمَلَ إِلَيْهِ قَالَ فَتَهْدِي لَهُ زَيْتًا يُسْرَجُ فِيْهِ فَمَنْ فَعَلَ ذَلِكَ فَهُوَ كَمَنْ آتَاهُ .
"মহানবী (স)-এর মুক্তদাসী মায়মূনা (রা) বলেন, আমি বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! বায়তুল মাকদিস সম্পর্কে আমাদেরকে ফতওয়া দিন। তিনি বলেন: ইহা তো হাশরের ময়দান এবং সকলের একত্র হওয়ার স্থান। তোমরা উহাতে নামায পড়। কারণ তথায় এক ওয়াক্ত নামায পড়া অন্যান্য স্থানের নামাযের তুলনায় এক হাজার গুণ শ্রেষ্ঠ। আমি বলিলাম, আপনি কি মনে করেন, আমি যদি তথায় পৌঁছিতে সক্ষম না হই? তিনি বলেন: উহাতে বাতি জ্বালাইবার জন্য তুমি যায়তুন তৈল হাদিয়া পাঠাও। যে ইহা করিল সে যেন তথায় উপস্থিত হইল" (ইবন মাজা, মাসাজিদ, ১খ, পৃ. ১০১)।
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَلَاةُ الرَّجُلِ فِي بَيْتِهِ بِصَلَوَةٍ وَصَلَاتُهُ فِي مسجد القبائل بِخَمْسٍ وَعِشْرِينَ صَلَوَةً وَصَلَاتُهُ فِي الْمَسْجِدِ الَّذِي يُجَمَّعُ فِيهِ بِخَمْسٍ مِائَةٍ صَلَاةٍ وَصَلَاتُهُ فِي الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى بِخَمْسِينَ أَلْفَ صَلَوَةٍ وَصَلَاتُهُ فِي مَسْجِدِي بِخَمْسِينَ أَلْفَ صَلَوَةٍ وَصَلَاتُهُ فِي الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ بِمِائَةِ أَلْفَ صَلَوَةٍ .
"আনাস ইবন মালিক (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: কোন ব্যক্তির নিজ গৃহে এক ওয়াক্ত নামায পড়ার ছওয়াব এক ওয়াক্ত নামাযেরই সমান। তাহার পাড়ার বা গোত্রের মসজিদে তাহার এক নামায পঁচিশ নামাযের সমতুল্য। জুমুআ মসজিদে তাহার এক নামায পাঁচ শত নামাযের সমতুল্য। মসজিদুল আকসায় তাহার এক নামায পঞ্চাশ হাযার নামাযের সমতুল্য। আমার মসজিদে তাহার এক নামায পঞ্চাশ হাযার নামাযের সমতুল্য এবং মসজিদুল হারামে তাহার এক নামায এক লক্ষ নামাযের সমতুল্য" (ইবন মাজা, মাসাজিদ, বাব মা জাআ ফিস-সালাত ফিল-মাসজিদিল জামি, ১খ, পৃ. ১০২)।
عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ مَنْ أَهَلَّ بِعُمْرَةٍ مِنْ بَيْتِ الْمُقَدَّسِ غُفِرَ لَهُ .
"উম্মু সালামা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: যে ব্যক্তি বায়তুল মুকাদ্দাস হইতে উমরার উদ্দেশে ইহ্রাম বাঁধিল, তাহাকে ক্ষমা করা হইল" (ইবন মাজা, মানাসিক, বাব মান আহাল্লা বিউমরাতিন মিন বায়তিল মুকাদ্দাস, ২খ, পৃ. ২১৫)। উম্মু সালামা (রা)-র অপর বর্ণনায় আছে:
مَنْ أَهَلَّ بِعُمْرَةٍ مِنْ بَيْتِ الْمُقَدَّسِ كَانَتْ لَهُ كَفَّارَةٌ لِمَا قَبْلَهَا مِنَ الذُّنُوبِ قَالَتْ فَخَرَجَتْ أُمِّي مِنْ بَيْتِ الْمُقَدَّسِ بِعُمْرَةٍ .
"কোন ব্যক্তি বায়তুল মুকাদ্দাস হইতে উমরার উদ্দেশে ইহ্রাম বাঁধিলে তাহাতে তাহার পূর্বেকার সমস্ত গুনাহ্ কাফ্ফারা হইয়া যায়। উম্মু সালামা (রা) বলেন, অতএব আমার মা বায়তুল মুকাদ্দাস হইতে উমরার উদ্দেশে রওয়ানা হইলেন" (ইবন মাজা, মানাসিক, বাব ঐ, ২খ, পৃ. ২১৫)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বায়তুল মাকদিসের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

📄 বায়তুল মাকদিসের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস


বায়তুল মাকদিস ও জেরুসালেম নগরীর ইতিহাস ওঁৎপ্রোতভাবে জড়িত। জেরুসালেম শহরের উত্থান-পতনের সঙ্গে সঙ্গে কালের প্রবাহে বায়তুল মাকদিসেরও ভাঙ্গা-গড়া নগরীর অব্যাহত থাকে। এই শহর দীর্ঘ কাল বনী ইসরাঈলের দখলে থাকার পর তাহাদের হাতছাড়া হইয়া যায়। হযরত মূসা (আ) তাঁহার জীবদ্দশায় আল্লাহ তা'আলার নির্দেশে বায়তুল মাকদিস পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তাঁহার ইনতিকালের অব্যবহিত পর হযরত ইউশা ইব্‌ন নূন (আ) ইহা পুনরুদ্ধার করেন। প্রায় খৃ. পৃ. ১০০০ বৎসর পূর্বে আমালিকা সম্প্রদায় জেরুসালেম তাহাদের দখলভুক্ত করে। হযরত দাউদ (আ) খৃ. পৃ. ৯৭৭ সালে উহা পুনর্দখল করেন, যাহার ইঙ্গিত ২: ২৪৬-২৫১ আয়াতে বিদ্যমান (ইতিকথা, পৃ. ৪৬)। তাঁহার পুত্র হযরত সুলায়মান (আ) খৃ. পৃ. ৯৬৩-৯২৩ সাল পর্যন্ত প্রায় চল্লিশ বৎসর রাজত্ব করেন। তিনি ইবাদত-বন্দেগীর জন্য "মা'বাদ সুলায়মানী" নির্মাণ করেন, যাহা পরবর্তী কালে "হায়কাল সুলায়মানী" নামে আখ্যায়িত হয় এবং কুরআন মজীদে (১৭: ১) ইহা "মাসজিদুল আকসা” নামে উক্ত হইয়াছে।
সুলায়মান (আ)-এর ইনতিকালের কিছুকাল পর তাঁহার রাজ্য দুই ভাগে বিভক্ত হইয়া যায়: ইয়াহুদা (রাজধানী জেরুসালেম) এবং ইসরাঈল (রাজধানী নাবলুস বা সিক্কীম)। দুই রাজ্যের মধ্যকার অন্তর্দ্বন্দুের সুযোগে মিসরের ফিরআওন শাইশাক জেরুসালেম দখল করিয়া মা'বাদে সুলায়মানীতে রক্ষিত সম্পদরাজি মিসরে লইয়া যায়। খৃ. পৃ. ৭২১ সালে আশূরীয় রাজা সারগন ইসরাঈল দখল করে, কিন্তু শাইশাক তাহা পুনরুদ্ধার করে (ইতিকথা, পৃ. ৪৭)।
খৃ. পৃ. ৫৮৭ সালে ব্যাবিলনের রাজা বখত নাসর ইসরাঈল রাজ্য দখল করিয়া মা'বাদে সুলায়মানী তথা বায়তুল মাকদিস ধ্বংস করে এবং অসংখ্য ইয়াহুদীকে বন্দী করিয়া ব্যাবিলনে লইয়া যায় (ইতিকথা, পৃ. ৪৮)। অতঃপর পারস্য সম্রাট কাওরাস এখমিনী ব্যাবিলন দখল করিলে জেরুসালেম তাহার হস্তগত হয়। তিনি বন্দী ইয়াহুদীদেরকে মুক্তি দেন এবং তাহাদের নিজ ধর্ম পালনের সুযোগ দেন। এই সময় হইতে ইসরাঈলীরা "ইয়াহূদী" নামে অভিহিত হয় এবং তাহারা পুনরায় বায়তুল মাকদিস নির্মাণ করে (ইতিকথা, পৃ. ৪৮-৯)।
খৃ. পূ. ৩২২ সালে মেসিডোনিয়ার আলেকজান্ডারের আদেশে পৌত্তলিক গ্রীকগণ জেরুসালেম দখল করে এবং দীর্ঘ কাল উহা নিজ দখলে রাখে (ইতিকথা, পৃ. ৪৯)। খৃ, পৃ. ২৩ সালে রোমান (বায়যানটাইন)-রাজ হিরোদ জেরুসালেম দখল করেন এবং ইয়াহুদীদের সহিত সম্পাদিত চুক্তির অধীন খৃ. পৃ. ২০-১৮ সালে হায়কালে সুলায়মানী নির্মাণের সুযোগ দেন। পরে তাহা হযরত যাকারিয়া (আ), হযরত ইয়াহ্ইয়া (আ) ও হযরত ঈসা (আ)-এর কাল পর্যন্ত ঐভাবেই বিদ্যমান থাকে (ইতিকথা, পৃ. ৪৯)। যাকারিয়া (আ)-এর যুগে তাহা-বিদ্যমান থাকার স্পষ্ট ইঙ্গিত কুরআন মজীদে রহিয়াছে (দ্র. ৩: ৩৫-৩৯)।
অতঃপর ৬৬ খৃ. রোমান সম্রাট তাইতুস ইয়াহুদীদের সহিত সংঘর্ষে লিপ্ত হন এবং দীর্ঘ পাচ বৎসর যুদ্ধের পর ৭০ সালে জেরুসালেম দখল করেন, হায়কালে সুলায়মানী ধ্বংস করেন এবং অসংখ্য ইয়াহুদীকে হত্যা ও বন্দী করেন। এই যুদ্ধে জেরুসালেম শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হইয়াছিল (ইতিকথা, পৃ. ৫০)। কুরআন মজীদে ইহার প্রতি ইঙ্গিত বিদ্যমান আছে। বখতে নাসরের আক্রমণ ছিল প্রথম আক্রমণ এবং ইহা ছিল দ্বিতীয় আক্রমণ (দ্র. ১৭:৪-৫)। তাইতুস জেরুসালেমের নাম পরিবর্তন করিয়া তদস্থলে ইহার নাম রাখেন 'ঈলিয়া”। তাইতুসের পরবর্তী রোমান সম্রাট আদরিয়ান জেরুসালেমের সকল চিহ্ন এবং হায়কালের সকল ধ্বংসাবশেষ অপসারণ করিয়া ১৩৫ খৃ. তদস্থলে প্রতিমা পূজারী রোমানদের দেবতা 'গোয়েবতার'-এর নামানুসারে একটি মন্দির নির্মাণ করে (ইতিকথা, পৃ. ৫১)। পরে রোমান সম্রাট কনস্টানটাইন খৃস্ট ধর্মে দীক্ষিত হইয়া 'জেরুসালেম' নাম পুনর্বহাল করেন, মন্দির ধ্বংস করিয়া হায়কাল পুনর্নির্মাণ করেন এবং ত্রিত্ববাদ চালু করেন (ইতিকথা, পৃ. ৫১)।
৬১০ খৃ. রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াস ক্ষমতায় আসেন। ৬১৪ খৃ. পারস্য-রাজ দ্বিতীয় খসরু জেরুসালেম দখল করিয়া ৯০ হাজার খৃস্টানকে নির্মমভাবে হত্যা করে এবং বহু গির্জা ধ্বংস করে। ইহা ছিল খৃস্টানদের জন্য এক মহা-প্রলয়স্বরূপ। পরে ৬২৪ খৃ. হিরাক্লিয়াস উহা পুনরুদ্ধার করেন এবং পারস্যে প্রবেশ করিয়া পারসিকদের সর্বপ্রধান অনির্বাণ শিখা নির্বাপিত করেন (বিস্তারিত দ্র. তাফহীমুল কুরআন, সূরা রূম-এর ভূমিকা)। এই দুই ঘটনারই ভবিষ্যদ্বাণী করা হইয়াছিল নিম্নোক্ত আয়াতসমূহেঃ
اﻟﻢ. ﻏُلِبَتِ الرُّومُ ، فِي أَدْنَى الْأَرْضِ وَهُمْ مِّنْ بَعْدِ غَلَبِهِمْ سَيَغْلِبُونَ ، فِي بِضْعِ سِنِينَ لِلَّهِ الْأَمْرُ مِنْ قَبْلُ وَمِنْ بَعْدُ وَيَوْمَئِذٍ يَفْرَحُ الْمُؤْمِنُونَ .
"আলিফ-লাম-মীম। রোমকগণ পরাজিত হইয়াছে, নিকটবর্তী অঞ্চল। কিন্তু তাহারা তাহাদের এই পরাজয়ের পর শীঘ্রই বিজয়ী হইবে, কয়েক বৎসরের মধ্যেই। পূর্বের ও পরের সিদ্ধান্ত আল্লাহরই। আর সেই দিন মু'মিনগণ হর্ষোৎফুল্ল হইবে" (৩০:১-৪)।
হিরাক্লিয়াস ৬৪৯ খৃ. পর্যন্ত জেরুসালেম শাসন করেন। তখনও এবং মহানবী (স)-এর মি'রাজ গমনকালেও বায়তুল মাকদিসের এলাকায় চার দেয়াল ব্যতীত আর কোন স্থাপনা ছিল না। মহানবী (স) যে দেয়ালের সহিত বোরাক বাঁধিয়াছিলেন তাহা "হায়ত আল-বুরাক" (বুরাক দেয়াল) নামে অভিহিত (ইতিকথা, পৃ. ৫৩)।
মহনবী (স) নবুওয়াত প্রাপ্তির পর ৮ম হিজরীতে মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে কা'বা ঘরকে প্রতিমামুক্ত করেন। তিনি তাঁহার জীবদ্দশায় বায়তুল মাকদিসকেও প্রতিমা ও ত্রিত্ববাদমুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করিয়াছিলেন। তাঁহার ইনতিকালের আট বৎসর পর ১৮ হিজরীতে হযরত উমার ফারূক (রা)-র খিলাফতকালে জেরুসালেম মুসলিম অধিকারে আসে এবং তখনও বায়তুল মাকদিসের স্থানটি ছিল উন্মুক্ত (ইতিকথা, পৃ. ৫৫-৬)। এই সময় (১৮ হি.) তিনি জেরুসালেম পৌছিয়া 'সাখরা'-এর সম্মুখভাগে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। ইহা 'মসজিদুস সাখরা' ও 'মসজিদে উমার' উভয় নামেই প্রসিদ্ধ (ইতিকথা, পৃ. ৫৫)। বর্তমানে এই মসজিদে জামাআতে নামায অনুষ্ঠিত না হইলেও যিয়ারতকারীগণ পৃথক পৃথকভাবে এখানে নামায পড়েন (পূ. গ্র., পৃ. ২৪, ২৫, ২৭)।
সাখরা (صخرة) : শব্দটির অর্থ 'পাথর'। ইহা একটি অতি প্রকাণ্ড পাথর। উত্তর হইতে দক্ষিণে পাথরের দৈর্ঘ্য ১৭.৭০ মিটার এবং পূর্ব হইতে পশ্চিমে উহার প্রস্থ ১৩.৫০ মিটার। পাথরের নিম্নস্থ গুহার ভেতর হইতে মনে হয় যেন উহা শূন্যে ঝুলন্ত অবস্থায় আছে। প্রাক-ইসলামী যুগে লোকজন পাথরের উপরকার ছিদ্র দিয়া গুহার ভেতর কুরবানীর রক্ত প্রবাহিত করিত (ইতিকথা, পৃ. ২৭-৮)। খৃস্টান সম্প্রদায়, ইয়াহুদীদের প্রতি বিদ্বেষবশত উক্ত পাথরে আবর্জনা নিক্ষেপ করিত (পৃ. গ্র, পৃ. ৫৫)।
কথিত আছে যে, হযরত আদম (আ) সর্বপ্রথম এই পাথরের নিকট নামায পড়িয়াছিলেন, হযরত ইবরাহীম (আ) ইহার নিকট তাঁহার ইবাদতগাহ নির্মাণ করিয়াছিলেন, ইহার উপর অগ্নিস্তম্ভ দেখিয়া হযরত ইয়া'কূব (আ) এখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন, হযরত ইউশা (আ) 'কুব্বাতুয যামান' নামে ইহার উপর একটি গম্বুজ নির্মাণ করেন, হযরত দাউদ (আ) ইহার নিকট তাঁহার মিহরাব নির্মাণ করেন, হযরত সুলায়মান (আ) তাঁহার প্রসিদ্ধ ইবাদতগাহ "হায়কালে সুলায়মানী"ও ইহার নিকটেই নির্মাণ করেন এবং মহানবী (স) এই পাথরের উপর হইতেই মি'রাজে গমন করেন (আল আকসা মসজিদের ইতিকথা, পৃ. ২৪-৫)। দীর্ঘকাল পাথরটি ছিল খোলা আকাশের নীচে। ইহাকে রোদ-বৃষ্টিসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর পরিবেশ হইতে হেফাজতের জন্য উমায়‍্যা খলীফা আবদুল মালিক ইবন মারওয়ান ৭০/৬০১ সালে ইহাকে বেষ্টন করিয়া অত্যন্ত চমৎকার ডিজাইনে উচ্চ গুম্বজ নির্মাণ করেন। মহানবী (স) বলেনঃ
صَلَّيْتُ لَيْلَةَ أَسْرِيَ بِي إِلَى بَيْتِ الْمَقْدِسِ يَمِينَ الصَّخْرَةِ .
"আমি মি'রাজ রজনীতে বায়তুল মাকদিসে সাখরার ডানে নামায পড়িয়াছি"।
صَخْرَةُ بَيْتِ الْمَقْدِسِ مِنْ صَخُورِ الْجَنَّةِ .
"বায়তুল মাকদিসের সাখরা নামক প্রস্তরখণ্ডটি জান্নাতের প্রস্তররাজির অন্তর্ভুক্ত" (আল-আকসা মসজিদের ইতিকথা, পৃ. ২৫)।
৭৩-৭৪/৬৮৫-৮৯ সালের মধ্যে উমায়্যা খলীফা আবদুল মালিক ইবন মারওয়ান মসজিদে উমার-কে অত্যন্ত চমৎকার আঙ্গিকে সুশোভিত করিয়া পুনর্নির্মাণ করেন এবং বায়তুল মাকদিস নির্মাণের জন্য মসজিদুল আকসার সম্পূর্ণ অংশ অন্তর্ভুক্ত করেন। তাঁহার পুত্র ওয়ালীদের আমলে বায়তুল মাকদিসের নির্মাণকাজ সমাপ্ত হয় এবং তিনি ইহাতে মিহরাব ও মিনার সংযোজন করেন। বস্তুত উমায়‍্যা আমলেই মসজিদে মিহরাব ও মিনার নির্মাণের সূচনা হয় (ইতিকথা, পৃ. ৫৬)।
১৩২ হি. হইতে ৬৫৬ হিজরী পর্যন্ত আব্বাসী খলীফাগণ বায়তুল মাকদিসের রক্ষণাবেক্ষণ করেন। ১৫৮ হিজরীতে খলীফা মাহদী এবং তাঁহার পরে তৎপুত্র মামুন বায়তুল মাকদিসের সংস্কার ও সম্প্রসারণ করেন (ইতিকথা, পৃ. ৫৬)। ফাতিমী (শী'আ) খলীফা আল-মুইয্য লি-দীনিল্লাহ ৯৬৫ হি. ফিলিস্তীন দখলের পর সেখানে খৃস্টানদের বসতি স্থাপন শুরু হয় (পূ. গ্র., পৃ. ৫৭)। সালজুক শাসকগণ ৪৬৫/১০৭১ সালে ফাতিমীদের কবল হইতে জেরুসালেম নিজ দখলে আনয়ন করেন। ১০৯৯ খৃ. পর্যন্ত সুদীর্ঘ পাচ শত বৎসর জেরুসালেম মুসলিম অধিকারে ছিল (পৃ. গ্র, পৃ. ৫৭)।
১০৯৫ খৃ. জেরুসালেমের খৃস্টান পাদ্রী দ্বিতীয় সোমআন জেরুসালেম উদ্ধারের জন্য খৃস্টান বিশ্বের প্রতি আহবান জানায়। একই বৎসর পোপও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্রুসেড যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য আহবান জানায় এবং মধ্য ও পশ্চিম ইউরোপীয় খৃস্টান রাজগণ তাহার আহবানে সাড়া দেয় (পৃ. ৫৭)। ২৩ শাবান, ৪৯২/১৫ জুলাই, ১০৯৯ সালে খৃস্টান সেনাপতি গডফ্রে ডিবো ইউনের সামরিক অভিযানে ফাতিমীদের নিকট হইতে ৬১ বৎসরের জন্য জেরুসালেম খৃস্টানদের দখলে চলিয়া যায়। এই অভিযানে খৃস্টান বাহিনী নারকীয় তাণ্ডব চালায় এবং ৯০ হাজার মুসলমান হত্যা করে। ১৮ হিজরীতে খৃস্টানদের প্রতি হযরত উমারের ক্ষমার প্রতিদান তাহারা ৪৯২ হিজরীতে এইভাবে পরিশোধ করে। তাহারা মসজিদে উমার বা সাখরাকে গীর্জায় রূপান্তরিত করে, উহার একাংশকে ঘোড়ার আস্তাবলে পরিণত করে এবং অন্য অংশ তাহাদের বসবাসের জন্য ব্যবহার করে (ইতিকথা, পৃ. ৫৮)।
৫৬৭/১১৭১ সালে সুলতান সালাহুদ্দীন খৃস্টানদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেন। ১১৮৭ খৃ. জেরুসালেম দখলের লক্ষ্যে মুসলিম সেনাবাহিনী হিত্তিনের যুদ্ধে খৃস্টান বাহিনীর ১ লাখ ৬৩ হাজার অশ্বরোহীকে পরাজিত করে, ৩০ হাজার খৃস্টান সৈন্য হত্যা করে এবং ৩০ হাজারকে বন্দী করে। ২৭ রজব, ৫৮৩/অকটোবর, ১১৮৭ তারিখ শুক্রবার সুলতান সালাহুদ্দীনের নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী জেরুসালেমে প্রবেশ করে (পৃ. গ্র, পৃ. ৫৮)।
উছমানী শাসনামলেও বায়তুল মাকদিস মুসলমানদের তত্ত্বাবধানে থাকে। ১৯১৭-১৯ খৃ. বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কের পতনের মধ্য দিয়া জেরুসালেম বৃটিশ ম্যান্ডেটভুক্ত হয়। দীর্ঘ ৩১ বৎসর বৃটিশ শাসনাধীন থাকার পর জেরুসালেম পুনরায় জর্দানের আরব মুসলমানদের কর্তৃত্বাধীনে আসে এবং ১৯৬৭ খৃ. পর্যন্ত উহা জর্দানের অধীন থাকে। পাশ্চাত্যের খৃস্টান জাতিগুলির সহায়তায় ১৯৬৭ সালের জুন যুদ্ধে ইয়াহুদীরা জর্দানের নিকট হইতে জেরুসালেম দখল করিয়া নেয়। বর্তমানে ইহা ইসরাঈলের অবৈধ দখলে আছে। ইয়াহুদীরা বায়তুল মাকদিস ধ্বংস করিয়া তদস্থলে হায়কালে সুলায়মানী নির্মাণের সুযোগের অপেক্ষায় আছে (আল আকসা মসজিদের ইতিকথা, পৃ. ৫৯-৬০)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সুলায়মান (আ) ও যাদুবিদ্যা

📄 সুলায়মান (আ) ও যাদুবিদ্যা


বর্তমান বাইবেল অধ্যয়নে জানা যায় যে, তাওরাত কিতাবকে বিকৃতকারী বনূ ইসরাঈল খুব সম্ভব প্রতিজ্ঞা করিয়াছিল যে, তাহারা তাহাদের কোনও একজন মহান নবীর চরিত্রও কলঙ্কিত না করিয়া ছাড়িবে না। অতএব তাহারা প্রায় প্রত্যেক নিষ্পাপ নবীর বিরুদ্ধে লাগামহীন ও ন্যাক্কারজনক অভিযোগ আরোপ করিয়াছে এবং হযরত সুলায়মান (আ)-এর নিষ্পাপ চরিত্রে সর্বাধিক কলংক লেপন করিয়াছে। তাহারা তাঁহার নবুওয়াতকে অস্বীকার করিয়াছে এবং তাঁহার বিরুদ্ধে (নাউযুবিল্লাহ) শিক্-এ লিপ্ত হওয়ার ও যাদুবিদ্যা চর্চার ভিত্তিহীন অভিযোগও উত্থাপন করিয়াছে। ইবন্ জারীর তাবারী লিখিয়াছেন। "কতক ইয়াহুদী পণ্ডিত বলাবলি করিল, মুহাম্মাদের কাণ্ড দেখ, সে সুলায়মানকে নবী বলিতেছে। আল্লাহ্র শপথ! সে তো ছিল এক যাদুকর" (তাফসীরে তাবারী, কুরআন মজীদ স্থানে স্থানে এইসব অভিযোগ নাকচ করিয়া দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁহার নিষ্পাপ (মা'সূম) ও নিষ্কলংক হওয়ার ঘোষণা দিয়াছেন (আম্বিয়া-ই কুরআন, ৩খ, পৃ. ১৩৫-৬; কাসাসুল কুরআন, ২খ, পৃ. ১৫৯-৬১)। কুরআন মজীদ বনূ ইসরাঈলের খোদাদ্রোহিতা এবং হযরত সুলায়মান (আ)-এর কুফর ও যাদুবিদ্যার সহিত সম্পর্কহীনতা এভাবে তুলিয়া ধরিয়াছে:
وَلَمَّا جَاءَهُمْ رَسُولٌ مِّنْ عِنْدِ اللَّهِ مُصَدِّقٌ لِمَا مَعَهُمْ نَبَدَ فَرِيقٌ مِّنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَبَ كِتُبَ اللَّهِ وَرَاءَ ظُهُورِهِمْ كَأَنَّهُمْ لَا يَعْلَمُونَ . وَاتَّبَعُوا مَا تَتْلُوا الشَّيْطَينُ عَلَى مُلْكِ سُلَيْمَنَ وَمَا كَفَرَ سُلَيْمَنُ وَلَكِنَّ الشَّيْطَيْنَ كَفَرُوا يُعَلِّمُونَ النَّاسَ السَّحْرَ وَمَا أُنْزِلَ عَلَى الْمَلَكَيْنِ بِبَابِلَ هَارُوتَ وَمَارُوتَ ، وَمَا يُعَلِّمُنِ مِنْ أَحَدٍ حَتَّى يَقُولَا إِنَّمَا نَحْنُ فِتْنَةٌ فَلا تَكْفُرْ فَيَتَعَلَّمُونَ مِنْهُمَا مَا يُفَرِّقُونَ بِهِ بَيْنَ الْمَرْءِ وَزَوْجِهِ وَمَا هُمْ بِضَارِّينَ بِهِ مِنْ أَحَدٍ الا باذن الله . وَيَتَعَلَّمُونَ مَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنْفَعُهُمْ . وَلَقَدْ عَلِمُوا لَمَنِ اشْتَرَهُ مَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِنْ خَلَاقٍ . وَلَبِئْسَ مَا شَرَوْا بِهِ أَنْفُسَهُمْ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ .
"যখন আল্লাহ্ পক্ষ হইতে তাহাদের নিকট একজন রাসূল আসিল, যে তাহাদের নিকট যাহা রহিয়াছে উহার সমর্থক, তখন যাহাদেরকে কিতাব দেওয়া হইয়াছিল তাহাদের একদল আল্লাহর কিতাবটিকে পশ্চাতে নিক্ষেপ করিল, যেন তাহারা জানে না। এবং সুলায়মানের রাজত্বে শয়তানরা যাহা আবৃত্তি করিত তাহারা তাহা অনুসরণ করিত। সুলায়মান কুফরী করে নাই, বরং শয়তানরাই কুফরী করিয়াছিল। তাহারা মানুষকে যাদু শিক্ষা দিত এবং যাহা বাবিল শহরে হারূত ও মারূত ফেরেশতাদ্বয়ের উপর নাযিল করা হইয়াছিল। তাহারা দুইজনে কাহাকেও শিক্ষা দিত না এই কথা না বলিয়া যে, আমরা পরীক্ষাস্বরূপ, সুতরাং তুমি কুফরী করিও না। তাহারা উভয়ের নিকট হইতে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যাহা বিচ্ছেদ সৃষ্টি করে তাহা শিক্ষা করিত, অথচ আল্লাহ্র নির্দেশ ব্যতীত তাহারা কাহারও কোন ক্ষতি সাধন করিতে পারিত না। তাহারা যাহা শিক্ষা করিত তাহা তাহাদের ক্ষতি সাধন করিত এবং কোন উপকারে আসিত না। আর তাহারা নিশ্চিতভাবে জানিত যে, যে কেহ উহা ক্রয় করে আখেরাতে তাহার কোন অংশ নাই। উহা কত নিকৃষ্ট যাহার বিনিময়ে তাহারা স্বীয় আত্মাকে বিক্রয় করিয়াছে, যদি তাহারা জানিত" (২: ১০১-২)।
যাদুচর্চা একটি পাপাচার। দুনিয়াতে আদি কাল হইতে পাপ-পুণ্যের অস্তিত্বের মত যাদুবিদ্যারও অস্তিত্ব ছিল। হযরত ইবরাহীম (আ)-এর পূর্বে আগত নবী হযরত সালিহ (আ) ছামূদ জাতিকে পাপাচার ত্যাগ করিয়া সত্য পথের অনুসরণের দাওয়াত দিলে তাহারা বলে:
إِنَّمَا أَنْتَ مِنَ الْمُسَحَرِينَ .
"তুমি তো যাদুগ্রস্তদের অন্যতম" (২৬ঃ ১৫৩)।
হযরত মূসা (আ)-এর অগ্রবর্তী ও সমসাময়িক নবী ছিলেন হযরত শু'আয়ব (আ)। তিনি তাঁহার জাতিকে সৎপথ অনুসরণের আহব্বান জানাইলে তাহারাও তাঁহাকে একই অপবাদ দেয় :
"তুমি তো যাদুগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত” (২৬ঃ ১৮৫)। إِنَّمَا أَنْتَ مِنَ الْمُسَحَرِينَ .
হযরত মূসা (আ)-এর যুগেও ফিরআওন শাসিত মিসরে যাদুর ব্যাপক চর্চা হইত এবং সে মূসা (আ)-কে পরাভূত করিবার জন্য যাদুকরদের সহায়তা গ্রহণ করিয়াছিল, যদিও পরিশেষে তাহার সমস্ত পরিকল্পনা মূসা (আ)-এর মু'জিযার সামনে নস্যাৎ হইয়াছিল (উদাহরণস্বরূপ দ্র. ৭ঃ ১৩৩-১২২)। হযরত দাউদ (আ) ও হযরত সুলায়মান (আ) ছিলেন হযরত মূসা (আ)-এর পরবর্তী কালের রাসূল (দ্র. ২:২৪৬-২৫২)। হযরত সুলায়মান (আ)-কে প্রদত্ত মু'জিযাসুলভ অলৌকিক শক্তি অবলোকন করিয়া একদল মানবরূপী ও জিন্নরূপী শয়তান অপপ্রচার করিতে থাকে যে, তিনি যাদুবিদ্যাবলে যাবতীয় অসাধ্য সাধন করিতেছেন। ইয়াহুদী জাতি কালক্রমে পথভ্রষ্ট হইয়া সুলায়মান (আ)-কে যাদুকর আখ্যায়িত করে। রাসূলুল্লাহ (স)-এর সমকালীন ইয়াহুদীরাও একই ধারণায় নিমজ্জিত ছিল। কুরআন মজীদ ইহার কঠোর প্রতিবাদ করিয়াছে, "সুলায়মান কুফরী করে নাই, বরং শয়তানরাই কুফরী করিয়াছিল। তাহারা মানুষকে যাদু শিক্ষা দিত" (২ঃ ১০২)।
সুলায়মান (আ)-এর যুগের যাদুচর্চা সম্পর্কে তাফসীরকারগণ বিভিন্নরূপ বিবৃতি পেশ করিয়াছেন (এই বিষয়ে তাফসীরের গ্রন্থাবলী, বিশেষত তাফসীরে তাবারী ও তাফসীরে ইব্‌ন কাছীরে উক্ত আয়াতাধীন তাফসীর দেখা যাইতে পারে)। সুলায়মান (আ)-এর ইনতিকালের পর হইতে পুনরায় বনূ ইসরাঈলের নৈতিক ও বৈষয়িক পতন শুরু হইয়া গিয়াছিল। যে কোন অধঃপতিত জাতি যেমন বিচিত্রমুখী কুসংস্কারে নিমজ্জিত হইয়া পড়ে, তদ্রূপ বনূ ইসরাঈল তথা ইয়াহুদী জাতিও মহাসত্য হইতে বিচ্যুত হইয়া কুসংস্কারে লিপ্ত হইয়া পড়ে। যাদুমন্ত্র, তাবিজ-তুমার, টোটকা প্রভৃতির দিকে তাহাদের গোটা সত্তা ঝুঁকিয়া পড়ে (তাফহীমুল কুরআন, ২: ১০১ আয়াতধীন ১০৪ নং টীকা; তাফসীরে মাজেদী, পৃ. ৩৯, টীকা ৩৫৩)। ইয়াহুদী বংশজাত জার্মান পণ্ডিত মার্গোলিওথ রচিত মহানবী (স)-এর জীবনী গ্রন্থে আরববাসী ইয়াহুদীদের সম্পর্কে লিখিয়াছেন, "ইহারা ছিল যাদুবিদ্যায় অভিজ্ঞ এবং যুদ্ধক্ষেত্রে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হওয়ার পরিবর্তে নীচতার (যাদুর) আশ্রয় লওয়াকে প্রাধান্য দিত” (পৃ. ১৮৯; তাফসীরে মাজেদী হইতে এখানে উদ্ধৃত, পৃ. ৩৯, টীকা ৩৫৩)।
ব্যাবিলনীয় যাদুচর্চার সংস্পর্শে আসিয়া ইয়াহুদীরা চরমভাবে পথভ্রষ্ট ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন হইয়া পড়ে। প্রাচীন যুগে যে দেশটি বাবিল নামে পরিচিত ছিল, তাহা বর্তমান মানচিত্রে ও ভূগোলে আরব-ইরাক নামে অভিহিত। বাবিল নগরী ফোরাত নদীর তীরে, বর্তমান বাগদাদের প্রায় ষাট মাইল (১০০ কি. মি.) দক্ষিণে বর্তমান 'হাল্লা' নামক স্থানের কাছাকাছি অবস্থিত ছিল। যাদুবিদ্যা, ঝাড়ফুঁক, টোটকা ও তন্ত্রমন্ত্রের কুসংস্কারের জন্য দেশটির প্রচুর খ্যাতি ছিল, বর্তমান কালে যাহা Occult Science বা মহাজাতক বিজ্ঞান নামে খ্যাত। ইয়াহুদী-নাসারাদের সহীফাসমূহে ব্যাপক হারে এই দেশটির উল্লেখ আছে যাহা হইতে একদিকে যেমন ইহার ধনেজনে সমৃদ্ধির সাক্ষ্য পাওয়া যায়, অন্যদিকে ইহার অপকর্ম, অপসংস্কৃতি ও বিনাশী তৎপরতারও প্রমাণ পাওয়া যায় (দ্র. বাইবেলের দানিয়েল, ৪: ৩; প্রকাশিত বাক্য, ১৭: ৬; ১৮: ১০ ও অন্যত্র)। এই জনপদের অপকর্মের সূচনা হইয়াছিল যাদুচর্চার মাধ্যমেই। বাইবেলে বলা হইয়াছে: "পরে এক শক্তিমান দূত বৃহৎ এক পাট যাঁতার তুল্য একখানা প্রস্তর লইয়া সমুদ্রে নিক্ষেপ করিয়া কহিলেন, ইহার ন্যায় মহানগরী বাবিল মহাবলে নিপতিতা হইবে, আর কখনও তাহার উদ্দেশ পাওয়া যাইবে না। ...কারণ তোমার বণিকেরা পৃথিবীর মহল্লোক ছিল, কারণ তোমার মায়াতে (যাদু) সমস্ত জাতি ভ্রান্ত হইত। আর ভাববাদীগণের ও পবিত্রগণের রক্ত, এবং যত লোক পৃথিবীতে হত হইয়াছে, সেই সকলের রক্ত ইহার মধ্যে পাওয়া গেল” (প্রকাশিত বাক্য, ১৮: ২১-২৪)। "ব্যবিলনীয় ধর্মের বৃহৎ অংশ জুড়িয়া ছিল যাদুমন্ত্র, জ্যোতিষ বিজ্ঞানের বিভিন্ন ধরন ও প্রকার।... ব্যবিলনীয় ধর্মগ্রন্থসমূহে চোখ বুলাইয়া দেখুন, সব দিকেই জ্যোতিষী ঠাকুরদের মন্ত্র আর মন্ত্রই দেখা যাইবে" (Ency. Religion and Ethics, ২খ, পৃ. ১১৬)। "বাবিল ও নিনাওয়ার ধর্মমতের অধিকাংশ ছিল ভূত-প্রেতের ঝাড়ফুঁক" (রজার্স, Religion of Babilonia and Aseria, পৃ. ১৪৫)। ইয়াহুদীদের বাবিলে সামাজিক মেলামেশা তাহাদের ফেরেশতা ও শয়তান সম্পর্কিত ধ্যানধারণা প্রভাবিত করিতে থাকে (Ency. Brit., ১৩খ, পৃ. ১৮৭, ১১শ সং.)। ইয়াহুদী পণ্ডিতগণের স্বীকারোক্তি এই যে, বাবিলনের ধর্মমতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ সব অঞ্চলের ইয়াহুদীদের মধ্যেই অক্ষুণ্ণ থাকে (Jewish Ency., ৬খ, পৃ. ৪১৩; সম্পূর্ণ আলোচনা তাফসীরে মাজেদী হইতে গৃহীত, পৃ. ৪০-৪১, টীকা ৩৫৮)।
এই বাবিল শহরেই বাবিলবাসীর, বিশেষত ইয়াহুদীদের পরীক্ষার জন্য আল্লাহ তা'আলা হারূত ও মারূত নামক দুই ফেরেশতাকে এমন জ্ঞানসহ প্রেরণ করেন যাহা জনগণের জন্য ছিল ক্ষতিকর। তাই তাহারা উহা শিক্ষা দেওয়ার পূর্বে তাহাদেরকে এই বলিয়া সতর্ক করিয়া দিত যে, তাহারা উভয়ে তাহাদের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ আসিয়াছে। অতএব তাহারা যেন কুফরীতে লিপ্ত না হয়। এই সতর্কবাণী উপেক্ষা করিয়া বাবিলবাসী ফেরেশতাদ্বয়ের নিকট হইতে সংসার বিনাশী ও ক্ষতিকর তন্ত্রমন্ত্র সম্পর্কে অবহিত হইত, যাহা তাহাদের কোন উপকারেই আসিত না। তাহারা স্পষ্টভাবেই জানিত যে, তাহারা যাহা অবহিত হইতেছে তাহা তাহাদের আখেরাতের জীবনেও লাঞ্ছনা ও দুর্ভোগের কারণ হইবে (দ্র. ২: ১০২)। ইয়াহুদীরা তাওরাতের স্পষ্ট বিধান লংঘন করিয়াই যাদুচর্চা করিত। কুরআন মজীদে এই কথার প্রতি ইঙ্গিত করিয়াই তাহাদের সমালোচনা করা হইয়াছে: "যখন আল্লাহ্র পক্ষ হইতে তাহাদের নিকট একজন রাসূল আসিল, যে তাহাদের নিকট যাহা (তাওরাত) আছে উহার সর্মথক, তখন যাহাদেরকে কিতাব দেওয়া হইয়াছিল তাহাদের একদল আল্লাহ্ কিতাবটিকে (তাওরাত) পশ্চাতে নিক্ষেপ করিল... এবং সুলায়মানের রাজত্বে শয়তানরা যাহা আবৃত্তি করিত তাহারা তাহা অনুসরণ করিত" (২: ১০১-২)।
যাদুচর্চা সম্পর্কে বাইবেলের নিষেধাজ্ঞা নিম্নরূপ : "তুমি মায়াবিনীকে জীবিত রাখিও না” (যাত্রাপুস্তক, ২২:১৮)। "তোমরা মোহকের কিংবা গণকের বিদ্যা ব্যবহার করিও না” (লেবীয় পুস্তক, ১৯:২৬)। "তোমার প্রতিপালক সদাপ্রভু তোমাকে যে দেশ দিতেছেন, সেই দেশে উপস্থিত হইলে তুমি তথাকার জাতিগণের ঘৃণার্হ কার্যের ন্যায় কার্য করিতে শিখিও না। তোমার মধ্যে যেন এমন কোন লোক পাওয়া না যায়, যে পুত্র বা কন্যাকে অগ্নির মধ্য দিয়া গমন করায়, যে মন্ত্র ব্যবহার করে বা গণক, মোহক বা মায়াবী বা ঐন্দ্রজালিক বা ভূতড়িয়া বা গুণী বা প্রেতসাধক। কেননা সদাপ্রভু এই সকল কার্যকারীকে ঘৃণা করেন; আর সেই ঘৃণার্হ কার্য প্রযুক্ত তোমার প্রতিপালক সদাপ্রভু তোমার সম্মুখ হইতে তাহাদিগকে অধিকারচ্যুত করিবেন" (দ্বিতীয় বিবরণ, ১৮ : ৯-১২)। এইসব উদ্ধৃতি হইতে স্পষ্টই প্রতীয়মান হয় যে, দীন ইসলামের অনুরূপ ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের জন্যও যাদুচর্চা করা সম্পূর্ণ হারাম। দুই ইয়াহুদী মহানবী (স)-এর নিকট উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে "আমরা মূসাকে নয়টি নিদর্শন দান করিয়াছিলাম" (১৭ : ১০১) শীর্ষক আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিল। তিনি নিদর্শনগুলি উল্লেখ করিলেন, যাহার মধ্যে একটি ছিল "তোমরা যাদুটোনা করিও না” (তিরমিযী, ইসতীযান, ২খ, পৃ. ৯৮; হাতে-পায়ে, চুমু দেয়া, নং ২৬৭০; তাফসীর সূরা ১৭, ২খ, পৃ. ১৪২, নং ৩০৮২; নাসাঈ, তাহ্রীম, বাবুস সিহ্র, ২খ, পৃ. ১৫৩-৪)।
হারূত ও মারূত ফেরেশতাদ্বয়কে কেন্দ্র করিয়াও বিচিত্রমুখী উপাখ্যান সৃষ্টি হইয়াছে, যাহা কোন কোন তাফসীর গ্রন্থেও সবিস্তারে বিবৃত হইয়াছে (উদাহারণস্বরূপ দ্র. তাফসীর তাবারী ও তাফসীর ইব্‌ন কাছীর, সংশ্লিষ্ট আয়াতাধীন আলোচনা)। মূল প্রকৃতিতে তাহারা ফেরেশতাই ছিলেন। কিন্তু একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে তাহাদেরকে সাময়িকভাবে মানবসমাজে বসবাসের জন্য পাঠানো হইলে তখন স্বভাবতই তাহাদের গঠনাকৃতি, অবয়ব, আচার-আচরণ সবই মানবসদৃশই হইয়া থাকিবে (তাফসীরে মাজেদী, পৃ. ৪১, টীকা ৩৫৮)। শিহাব ইরাকী স্পষ্ট ভাষায় বলিয়াছেন যে, যাহারা বিশ্বাস করে যে, হারূত ও মারূত ফেরেশতাদ্বয় তাহাদের পাপের কারণে শাস্তিভোগ করিবে, তাহারা আল্লাহ্র সহিত কুফরী করে (পৃ. গ্র, পৃ. ৪১)।
যাদুচর্চার প্রসার সম্পর্কে তাফসীরে উছমানীতে বলা হইয়াছে যে, মানুষের মধ্যে দুইভাবে ইহার বিস্তার ঘটে। হযরত সুলায়মান (আ)-এর আমলে জিন্ন ও মানুষের সহাবস্থানের ফলে মানুষেরা শয়তানদের নিকট হইতে যাদুবিদ্যা শিক্ষা করিয়া তাহা হযরত সুলায়মান (আ)-এর শিক্ষা বলিয়া প্রচার করে এবং বলে যে, তিনি এই যাদুবিদ্যার দ্বারা জিন্ন ও মানুষের উপর কর্তৃত্ব করিতেন। আল্লাহ তা'আলা ইহার জবাবে বলেন যে, ইহা কুফরী কাজ, সুলায়মান (আ) কুফরী কাজ করেন নাই। বাবিল শহরে মানবরূপী হারূত ও মারূত নামক ফেরেশতাদ্বয়ের মাধ্যমেও যাদুর বিস্তার ঘটে। কেহ তাহাদের নিকট যাদুবিদ্যা শিক্ষা করিতে আসিলে তাহারা তাহাকে সতর্ক করিয়া বলিতেন যে, ইহাতে ঈমান চলিয়া যায়। ফেরশতাদ্বয়ের মাধ্যমে মানুষকে পরীক্ষা করাই ছিল আল্লাহর উদ্দেশ্য। এইরূপ বিদ্যায় আখিরাতের কোন উপকারিতা নাই, বরং ক্ষতিকর; পার্থিব জীবনেও তাহা ক্ষতিকর। আর আল্লাহ্ হুকুম ছাড়া যাদুমন্ত্র দ্বারা কিছুই হয় না। ইহার পরিবর্তে তাহারা যদি দীন ও কিতাবের শিক্ষা গ্রহণ করিত তবে আল্লাহ্র নিকট পুরস্কৃত হইত (পৃ. ২০, টীকা ১)।
বাইবেলীয় শরীআতের অনুরূপ ইসলামী শরীআতেও যাদুচর্চা নিষিদ্ধ। কুরআন মজীদে যাদুচর্চার সমালোচনা করা হইয়াছে। মহান আল্লাহ বলেন:
وَلَا يُفْلِحُ السَّاحِرُ حَيْثُ أَتَى . "যাদুকররা যেথায়ই আসুক সফল হইবে না" (২০: ৬৯)।
মহানবী (সা) বলেন: لا تَسْحَرُوا "তোমরা যাদুটোনা করিও না” (তিরমিযী, তাফসীর সূরা ১৭, ২খ, পৃ. ১৪২, নং ৩০৮২, আরো দ্র. আবওয়াবুল ইসতিযান, বাব মা জাআ ফী কুবলাতিল ইয়াদ ওয়ার-রিজল, ২খ, পৃ. ৯৮, নং ২৬৭০)।
حد السَّاحِرِ ضَرَبَةٌ بِالسَّيْفِ . "যাদুকরের শাস্তি হইল তরবারির আঘাত (মৃত্যুদণ্ড)” (তিরমিযী, হুদূদ, বাব মা জাআ ফী হাদ্দিস সাহির, ১খ, পৃ. ১৭৬, নং ১৪০০)।
اقْتُلُوا كُلَّ سَاحِرٍ . "প্রত্যেক যাদুকরকে হত্যা কর" (আবু দাউদ, কিতাবুল ইমারা, বাব ফী আখযিল জিযয়া মিনাল মাজুস)।
مَنْ أَتَى كَاهِنًا أَوْ عَرَّافًا أَوْ سَاحِرًا فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُولُ فَقَدْ كَفَرَ عَلَى مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ . "যে ব্যক্তি কোন গণৎকার, অদৃশ্য বক্তা অথবা যাদুকরের নিকট আসিল এবং তাহার কথায় বিশ্বাস স্থাপন করিল, সে মুহাম্মাদ (স)-এর প্রতি কাফির হইয়া গেল” (জাসসাসের আহ্কামুল কুরআন, বাংলা অনু., ১খ, পৃ. ৯৮-৯)।
ফকীহগণের ঐকমত্য অনুযায়ী যাদুচর্চা করা, উহা শিক্ষা দেয়া বা শিক্ষা করা হারাম এবং উহাকে বৈধ বলিয়া বিশ্বাস করা কুফরী। হানাফী, মালিকী ও হাম্বলী মাযহাবমতে যাদুকরের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। শাফিঈ মাযহাবমতে যাদুমন্ত্র কুফরীর পর্যায়ভুক্ত হইলে এবং যাদুকর উহার চর্চা বৈধ্য বলিয়া বিশ্বাস করিলে তাহার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড (কিতাবুল ফিক্হ আলাল-মাযাহিবিল আরবাআ, ৫খ, পৃ. ৪৬১-২; জামে আত-তিরমিযী, কিতাবুল হুদূদ, বাব হাদ্দিস সাহির)। অমুসলিম নাগরিকের (যিম্মী) ষাদুচর্চা বৈধ। তবে তাহার যাদুক্রিয়ায় কোন মুসলমান নিহত হওয়া প্রমাণিত হইলে তাহার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড (কিতাবুল ফিক্হ আলাল-মাযাহিবি, ৫খ, পৃ. ৪৯৩)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সাবার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

📄 সাবার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস


কুরআন মজীদের দুইটি সূরার দুই স্থানে 'সাবা'-এর উল্লেখ আছে। "আমি সাবা হইতে সুনিশ্চিত সংবাদ লইয়া আসিয়াছি” (২৭: ২২)। "সাবাবাসীদের জন্য তো উহার বাসভূমিতে ছিল এক নিদর্শন" (৩৪: ১৫)। ইতিহাস দৃষ্টে 'সাবা' দক্ষিণ আরবের একটি বৃহৎ জাতি-গোষ্ঠীর নাম। এই সম্পর্কে মহানবী (স)-এর একটি হাদীছ বর্ণিত আছে।
عَنْ فَرْوَةَ بْنِ مُسَيْكَ الْمُرَادِي قَالَ أَتَيْتُ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ..... قَالَ وَأُنْزِلَ فِي سَبَا مَا أُنْزِلَ فَقَالَ رَجُلٌ يَا رَسُولَ اللهِ وَمَا سَبَا أَرْضُ أَوْ إِمْرَاةٌ قَالَ لَيْسَ بِأَرْضِ وَلَا امْرَأَةٍ وَلَكِنَّهُ رَجُلٌ وَلَدَ عَشَرَةٌ مِنَ الْعَرَبِ فَتَيَامَنَ مِنْهُمْ سِتَّةَ تَشَائَمَ مِنْهُمْ أَرْبَعَةً فَأَمَّا الَّذِينَ تَشَأَمُوا فَلَحْمُ وَجُدَامٌ وَغَسَّانٌ وَعَامِلَةً وَأَمَّا الَّذِينَ تَيَأْمَنُوا فَالْأَزْدُ وَالأَشْعَرِيُّونَ وَحَمِيرٌ وَمَدْحِجٌ وَانْمَارِ وَكنْدَةُ فَقَالَ رَجُلٌ يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا أَنْمَارُ قَالَ الَّذِينَ مِنْهُمْ خَنْعَمْ وَبَجِبلة
"ফারওয়া ইব্‌ন মুসায়্‌ক আল-মুরাদী (রা) বলেন, আমি নবী (স)-এর নিকট আসিলাম।... রাবী বলেন, অতঃপর সাবা সম্পর্কে যাহা নাযিল হওয়ার ছিল তাহা নাযিল হইল। এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! 'সাবা' কি কোন এলাকার নাম না কোন স্ত্রীলোকের নাম? তিনি বলেন: কোন ভূখণ্ডের নামও নহে বা কোন স্ত্রীলোকের নামও নহে, বরং একজন পুরুষলোকের নাম। তাহার ঔরসে আরবের দশজন লোক জন্মগ্রহণ করেন। তাহাদের ছয়জন ইয়ামানে (দক্ষিণ দিকে) এবং চারজন সিরিয়ায় (বাঁ দিকে) বসতি স্থাপন করে। বাম দিকের লোকদের নাম : লাখখ, জুযাম, গাসসান ও আমিলা (গোত্র)। আর ডান দিকের লোকদের নাম : আব্দ, আশ'আরী, হিময়ার, কিন্দা, মাযহিজ ও আনমার। এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! 'আনমার' কাহারা? তিনি বলেন: খাছ'আম ও বাজীলা গোত্রের লোকজন তাহাদের অন্তর্ভুক্ত” (তিরমিযী, তাফসীর, সূরা সাবা; আবূ দাউদ, কিতাবুল হুরুফ ওয়াল-কিরাআত, ২০ নং হাদীস; মুসনাদে আহমাদ, ১খ, পৃ. ৩১৬, নং ২৯০০; তাবাকাত ইবন সা'দ, ১খ, কিসমুল আওয়াল, পৃ. ২০)।
কুরআন মজীদে সাবা জাতির আর্থিক সমৃদ্ধি, কৃষিজ উন্নতি, পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর শহর সভ্যতা, এই জাতির ধ্বংস, বিশেষত তাহাদের রাজধানী মা'রিবের শস্য-শ্যামল সবুজ বনানীর ধ্বংস সম্পর্কে কুরআন মজীদে একটি নাতিদীর্ঘ বর্ণনা রহিয়াছে:
لَقَدْ كَانَ لِسَبَا فِي مَسْكَنِهِمْ أَيَةٌ جَنَّانِ عَنْ يَمِينِ وَشِمَالٍ كُلُوا مِنْ رِزْقِ رَبِّكُمْ وَاشْكُرُوا لَهُ بَلْدَةً طَيِّبَةً وَرَبُّ غَفُورٌ. فَأَعْرَضُوا فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ سَيْلَ الْعَرِمِ وَبَدَّلْنَهُمْ بِجَنْتَيْهِمْ جَنَّتَيْنِ ذَوَاتَيْ أَكُل خَمْطَ وَأَثْلٍ وَشَيْيْ مِنْ سِدْرٍ قَلِيلٍ . ذَلِكَ جَزَيْنَهُمْ بِمَا كَفَرُوا وَهَلْ تُجْزِي إِلا الْكَفُورُ . وَجَعَلْنَا بَيْنَهُمْ وَبَيْنَ الْقُرَى الَّتِي بَرَكْنَا فِيهَا قرى ظَاهِرَةً وَقَدَّرْنَا فِيهَا السَّيْرَ سِيرُوا فِيهَا لَيَالِي وَأَيَّامًا امْنِينَ ، فَقَالُوا رَبُّنَا بُعِدْ بَيْنَ أَسْفَارِنَا وَظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ فَجَعَلْتُهُمْ أَحَادِيثَ وَمَزَقْنَهُمْ كُلَّ مُمَزَّقٍ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَتٍ لِكُلِّ صَبَّارٍ شَكُورٍ : وَلَقَدْ صَدَّقَ عَلَيْهِمْ إِبْلِيسُ ظَنَّهُ فَاتَّبَعُوهُ إِلَّا فَرِيقًا مِنَ الْمُؤْمِنِينَ . وَمَا كَانَ لَهُ عَلَيْهِمْ مِنْ سُلْطَنِ إِلَّا لِنَعْلَمَ مَنْ يُؤْمِنُ بِالْآخِرَةِ مِمَّنْ هُوَ مِنْهَا فِي شَكٍّ وَرَبُّكَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ حَفِيظٌ .
"সাবাবাসীদের জন্য তো তাহাদের বাসভূমিতে ছিল এক নিদর্শন : দুইটি উদ্যান, একটি ডানদিকে এবং অপরটি বামদিকে। তাহাদেরকে বলা হইয়াছিল, তোমরা তোমাদের প্রতিপালক প্রদত্ত রিযিক ভোগ কর এবং তাঁহার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। উত্তম নগরী এবং ক্ষমাশীল প্রতিপালক। পরে তাহারা অবাধ্য হইল। ফলে আমি তাহাদের উপর প্রবাহিত করিলাম বাঁধভাঙ্গা বন্যা এবং তাহাদের উদ্যান দুইটিকে পরিবর্তিত করিয়া দিলাম এমন দুইটি উদ্যানে যাহাতে উৎপন্ন হয় বিস্বাদ ফলমূল, ঝাউগাছ এবং সামান্য কুলগাছ। আমি তাহাদের কুফরীর জন্য তাহাদেরকে এই শাস্তি দিয়াছিলাম। আমি অকৃতজ্ঞ ব্যতীত আর কাহাকেও এমন শাস্তি দেই না। তাহাদের ও যেসব জনপদের প্রতি আমি অনুগ্রহ করিয়াছিলাম সেইগুলির মধ্যবর্তী স্থানে দৃশ্যমান বহু জনপদ স্থাপন করিয়াছিলাম এবং ঐসব জনপদে ভ্রমণের যথাযথ ব্যবস্থা করিয়াছিলাম এবং তাহাদেরকে বলিয়াছিলাম, তোমরা এইসব জনপদে নিরাপদে ভ্রমণ কর দিবস ও রজনীতে। কিন্তু তাহারা বলিল, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের সফরের মনযিলের ব্যবধান বর্ধিত কর। তাহারা নিজেদের প্রতি যুলুম করিয়াছিল। ফলে আমি তাহাদেরকে কাহিনীর বিষয়বস্তুতে পরিণত করিলাম এবং তাহাদেরকে ছিন্নভিন্ন করিয়া দিলাম। ইহাতে প্রত্যেক ধৈর্যশীল কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য নিদর্শন রহিয়াছে। তাহাদের সম্বন্ধে ইবলীস তাহার ধারণা সত্য প্রমাণ করিল, ফলে তাহাদের মধ্যে একটি মুমিন দল ব্যতীত সকলেই তাহার অনুসরণ করিল। তাহাদের উপর শয়তানের কোন আধিপত্য ছিল না; বরং কাহারা আখেরাতে ঈমান আনে এবং কাহারা তাহাতে সন্দিহান তাহা প্রকাশ করিয়া দেওয়াই ছিল আমার উদ্দেশ্য। তোমার প্রতিপালক সর্ববিষয়ে হেফাজতকারী" (৩৪ : ১৫-২১)।
অতএব সাবা ছিল আরবের একটি লোকের নাম। বহু প্রাচীন কাল হইতেই আরবের এই জাতিটি খ্যাতিমান ছিল। খৃ.পূ. ২৫০০ সনে উর-এর শিলালিপিসমূহে সাবা জাতি "সাবূম” নামে উক্ত হইয়াছে। অতঃপর ব্যাবিলনীয় ও এ্যাসিরীয় শিলালিপিতে, অনুরূপভাবে বাইবেলের বহু স্থানে ইহার উল্লেখ আছে (উদাহরণস্বরূপ দ্র. গীত সংহিতা, ৭২: ১৫; যিরমিয়, ৬: ২০; যিহিঙ্কেল, ২৭: ২২ হইতে ৩৮: ১৩; ইয়োব, ৬: ১৯; আরও দ্র. তাফহীমুল কুরআন, পৃ. স্থা.)। এই সাবা-ই বর্তমান কালে 'ইয়ামন' নামে খ্যাত (তাফহীম, পৃ. স্থা.)।
আদ জাতির মধ্যে হযরত হূদ (আ) জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন হযরত নূহ (আ)-এর বংশধর এবং অধস্তন পঞ্চম পুরুষ : হৃদ ইবন সিল্হ ইব্‌ন আরফাখসাদ ইব্‌ন সাম ইব্‌ন নূহ (আম্বিয়া-ই কুরআন, ৩খ, ১১৯)। বাইবেলে 'হৃদ' নামের স্থলে 'এবং' উক্ত হইয়াছে (আদিপুস্তক, ১০ ৪১-৩২; ১ম বংশাবলী, ১: ১৭-১৮)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00