📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সুলায়মান (আ)-এর বিপদ বা পরীক্ষা

📄 সুলায়মান (আ)-এর বিপদ বা পরীক্ষা


কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে যে, আল্লাহ্ তাআলা হযরত সুলায়মান (আ)-কে বিপদগ্রস্ত করিয়া পরীক্ষা করিয়াছিলেন। وَلَقَدْ فَتَنَّا سُلَيْمَنَ وَالْقَيْنَا عَلَى كُرْسِيَّهِ جَسَدًا ثُمَّ أَنَابَ .
"আমি তো সুলায়মানকে পরীক্ষা করিলাম এবং তাহার আসনের উপর রাখিলাম একটি ধড়। অতঃপর সে আমার অভিমুখী হইল" (৩৮: ৩৪)।
উক্ত আয়াতে কেবল পরীক্ষার কথা উল্লেখ আছে, কিন্তু কি ধরনের বা কিসের পরীক্ষা ছিল এবং 'জাসাদ' (ধড়) বলিতেই বা কি বুঝানো হইয়াছে তাহার বিস্তারিত ব্যাখ্যা অন্য কোন আয়াতেও উক্ত হয় নাই। হাদীছ শরীফেও ইহার কোন স্পষ্ট ব্যাখ্যা বিদ্যমান নাই। কুরআন মজীদের এই আয়াতটি অত্যন্ত কঠিন ও দুর্বোধ্য অর্থবোধক আয়াতসমূহের একটি। অকাট্যভাবে ইহার তাফসীর করার সন্দেহাতীত কোন উপাত্ত বিদ্যমান নাই। তাফসীরকার ও ইতিহাসবিদগণ ইহার ব্যাখ্যায় বিভিন্ন ধরনের কাহিনী বর্ণনা করিয়াছেন। কাহারও মতে হযরত সুলায়মান (আ)-এর অজ্ঞাতে তাঁহার প্রাসাদে তাঁহার এক স্ত্রী দীর্ঘ চল্লিশ দিন যাবত প্রতীমা পূজায় লিপ্ত ছিল। এ জন্য আল্লাহ্ তাআলা তাঁহার নবীর প্রতি রুষ্ট হইয়াছিলেন (তাফসীরে কবীর, ২৬খ, পৃ. ২০৮; আরও দ্র. আরাইস, পৃ. ৩৫১; কাসাসুল কুরআন, ৩ খ, পৃ. ১২২; বাইবেলেও ইহার সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ বিবৃতি বিদ্যমান আছে, দ্র. ১ম রাজাবলী, ১১ ১-১০)। কিন্তু ইহা আয়াতের কোন যৌক্তিক ব্যাখ্যা নহে। কারণ স্ত্রী একান্ত চুপিসারে মূর্তিপূজা করিয়া থাকিলে সেই পাপ তাহার। আল্লাহ তাআলা তাঁহার নবীকে স্বীয় অজ্ঞাত বিষয়ের জন্য শাস্তি দেন না (পূর্বোক্ত বরাত)।
কতক তাফসীরকার বলিয়াছেন যে, হযরত সুলায়মান (আ) একাধারে কয়েক দিন (বর্ণনান্তরে তিন দিন) অন্দর মহলে অবস্থান করেন এবং শাসক হওয়া সত্ত্বেও তিনি ঐ সময় কোন মজলুমের ফরিয়াদ শ্রবণ, ও উহার প্রতিকারের জন্য বাহিরে আসেন নাই। ইহাতে তাঁহার রাজ্য ক্ষমতা চলিয়া যায় এবং ঐ তিন দিন শয়তান তাঁহার সিংহাসনে উপবিষ্ট হয় এবং 'জাসাদ'-এর অর্থ এই শয়তান (তাফসীরে কবীর, ২৬খ, পৃ. ২০৮; যাদুল মাসীর, ৭খ, পৃ. ১৩৩-৪; তাহযীব তারীখ দিমাল্ক, ৬খ, পৃ. ২৬৪; আরাইস, পৃ. ৩৫১)। আবার কেহ বলিয়াছেন যে, ইহাতে তাঁহার অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন আংটি হারাইয়া যায়। ফলে উহা শয়তানের হস্তগত হয় এবং শয়তান চল্লিশ দিন ধরিয়া সুলায়মান-বেশে রাজত্ব ও অনাচার করিতে থাকে। তাহার কার্যকলাপ দেখিয়া সন্দেহ হইলে পর বানু ইসরাঈলের আলেমগণ তাহার সম্মুখে তাওরাত কিতাব পড়িতে শুরু করিলে সে ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া পলায়ন করিল। পথিমধ্যে আংটিটি সে ফেলিয়া দেয় অথবা তাহার হাত হইতে সমুদ্রে পড়িয়া যায়। একটি মাছ উহা গলাধঃকরণ করে। ঘটনাক্রমে মাছটি হযরত সুলায়মান (আ)-এর হস্তগত হয় এবং তিনি উহা রন্ধনের উদ্দেশ্যে কাটিতে গিয়া আংটি ফেরত পাইলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে রাজ্যও ফেরত পাইলেন (তাফসীরে কবীর, ২৬খ, পৃ. ২০৭-৮; যাদুল মাসীর, ৭খ, পৃ. ১৩৫-৮)। শয়তান কর্তৃক আংটি দখলের ঘটম্রাটি বিভিন্ন গ্রন্থে বিভিন্নরূপে বর্ণিত হইয়াছে (উদাহরণস্বরূপ দ্র. তাহযীব তারীখ দিমাশক, ৬খ, পৃ. ২৬৪-৫; আল-কামিল, ১খ, পৃ. ১৮৪-৫; আরাইস, পৃ. ৩৪৮-৫১)।
কতক তাফসীরকার বলিয়াছেন যে, হযরত সুলায়মান (আ) একটি পুত্র সন্তান লাভ করিলে শয়তানেরা তাহাকে এই ভাবিয়া হত্যা করার ষড়যন্ত্র করে যে, সে জীবিত থাকিলে ইহারা তাহার হাতেও নিগৃহিত হইতে থাকিবে। হযরত সুলায়মান (আ) এই ষড়যন্ত্রের বিষয়টি টের পাইয়া উক্ত সন্তানকে মেঘপুঞ্জের মধ্যে লুকাইয়া রাখিলেন এবং তথায় তাহার লালন-পালনের ব্যবস্থা করিলেন। তিনি এই ফেতনায় পতিত হইলেন যে, তিনি আল্লাহ্র উপর ভরসা করার পরিবর্তে মেঘমালার উপর উহার প্রতিপালনের দায়িত্ব দিলেন। তাঁহাকে ইহার শাস্তি এইভাবে দেওয়া হইল যে, ছেলেটি মৃত্যুমুখে পতিত হইয়া লাশ আকারে পিতার সিংহাসনের উপর পতিত হইল (তাফসীরে কবীর, ২৬খ, পৃ. ২০৮; যাদুল মাসীর, ৭খ, পৃ. ১৩৪-৫; আরাইস, পৃ. ৩৫১)।
• এইসব ঘটনা উল্লেখের পর ইমাম রাযী (র) সেইগুলিকে বাতিল গালগল্প আখ্যা দিয়াছেন। অনুরূপভাবে আল্লামা ইব্‌ন কাছীর (তাফসীর), ইব্‌ন হাযম (আল-ফিসাল), কাজী ইয়াদ (শিফা), বদরুদ্দীন আয়নী (উমদাতুল কারী), ইব্‌ন হিব্বান (তাফসীর) প্রমুখ ইমামগণ নিজ নিজ গ্রন্থে একই মন্তব্য করিয়াছেন (কাসাসুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ১২৩)। ইমাম রাযী আরও বলিয়াছেন যে, শয়তানকে নবী-রাসূলগণের অবয়ব ধারণের শক্তি দান করা হয় নাই। উহাকে সেই শক্তি দেওয়া হইলে শরীআতের কোন বিষয়ের উপরই আর আস্থা রাখা যাইত না (তাফসীরে কবীর, ২৬খ, পৃ. ২০৮; আরও দ্র. তাহযীব তারীখ দিমাশক, ৬খ, পৃ. ২৬৫, ওয়া হাযা মিন আবাতীলিহি; আল-কামিল, ১খ, পৃ. ১৮২-৩, টীকা নং ১)।
কতক তাফসীরকার উপরিউক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় হযরত সুলায়মান (আ)-এর স্ত্রীসংখ্যা সংক্রান্ত হাদীছটি পেশ করিয়াছেন। কিন্তু মহানবী (স) উক্ত আয়াতের আলোচনা প্রসঙ্গে হাদীছটি বলিয়াছেন এইরূপ প্রমাণ কোথাও বিদ্যমান নাই এবং হাদীছের মূল পাঠেও এইরূপ কথা উক্ত হয় নাই যে, কুরআন মজীদে হযরত সুলায়মান (আ)-এর আসনের উপর যে “দেহ” নিক্ষিপ্ত হওয়ার কথা বলা হইয়াছে তাহা দ্বারা এই অপূর্ণাঙ্গ শিশুকেই বুঝানো হইয়াছে। তাহা ছাড়া হাদীছবেত্তাগণও তাহাদের গ্রন্থের কিতাবুত তাফসীর-এ সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যায়ও উক্ত হাদীছ উল্লেখ করেন নাই বরং অন্য হাদীছ উল্লেখ করিয়াছেন। অতএব মহানবী (স) এই হাদীছ উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যাস্বরূপ বলিয়াছেন তাহা দাবি করা যায় না (তাফহীমুল কুরআন, ৪খ, পৃ. ৩৩৭, টীকা ৩৬; মাআরিফুল কুরআন, ৭খ, পৃ. ৫১৬-৭; কাসাসুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ১২০)।
ইমাম রাযী (র) অপর এক তাফসীরকে অগ্রাধিকার দিয়াছেন। তাহাতে বলা হইয়াছে যে, হযরত সুলায়মান (আ) কোন কঠিন ব্যাধিতে আক্রান্ত হইয়া অথবা কোন বিপদের কারণে এতদূর চিন্তান্বিত হইয়া পড়িলেন যে, তিনি শুকাইতে শুকাইতে একেবারে কংকালসার হইয়া পড়িলেন (তাফসীরে কবীর, ২৬খ, পৃ. ২০৯)। তাঁহাকে সিংহাসনে বসানো হইলে মনে হইতে যেন একটি নিষ্প্রাণ দেহ উহার উপর ফেলিয়া রাখা হইয়াছে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা তাঁহাকে সুস্থতা দান করেন এবং তিনি আল্লাহর দিকে রুজু হইয়া তাঁহার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিলেন ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিলন (মাআরিফুল কুরআন, ৭খ, পৃ. ৫১৭)। কিন্তু এই তাফসীরও অনুমানভিত্তিক, কুরআন মজীদের বক্তব্যের সহিত ইহার তেমন কোন সামঞ্জস্য নাই এবং কোন রিওয়ায়াত হইতেও ইহার সমর্থন পাওয়া যায় না (মাআরিফুল কুরআন, ৭খ, পৃ. ৫১৭; তাফহীমুল কুরআন, ৪খ, পৃ. ৩৩৮, টীকা ৩৬; কাসাসুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ১২১)।
বাস্তব কথা এই যে, আলোচ্য আয়াতে যে ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করা হইয়াছে উহার নিশ্চিত বিবরণ জ্ঞাত হওয়ার কোন উপায় আমাদের নিকট নাই। পরীক্ষার কথা উল্লেখ করার আসল উদ্দেশ্য এই যে, মানুষ কোন বিপদ বা পরীক্ষায় নিক্ষিপ্ত হইলে, তাহারা যেন সুলায়মান (আ)-এর মত আল্লাহ্র দিকে আরো অধিক রুজু হয় (মাআরিফুল কুরআন, ৭খ, পৃ. ৫১৭)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সুলায়মান (আ)-এর বিশাল রাজ্য লাভের আকাঙ্খা

📄 সুলায়মান (আ)-এর বিশাল রাজ্য লাভের আকাঙ্খা


হযরত সুলায়মান (আ) আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করার সংগে সংগে এমন এক বিশাল রাজত্বদানের আবেদন করিয়াছিলেন, যদ্রপ রাজত্ব তাঁহার পরে অপর কেহ যেন লাভ করিতে না পারে। কুরআন মজীদের ভাষায়:
قَالَ رَبِّ اغْفِرْ لِي وَهَبْ لِي مُلْكًا لَا يَنْبَغِي لِأَحَدٍ مِّنْ بَعْدِي إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ .
"সে বলিল, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ক্ষমা কর এবং আমাকে দান কর এমন এক রাজ্য যাহার অধিকারী আমি ছাড়া কেহ না হয়। তুমি তো পরম দাতা" (৩৮ : ৩৫)।
উপরিউক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায়ও তাফসীরকারগণের মতবিরোধ লক্ষ্য করা যায়। একদল বলিয়াছেন, সুলায়মান (আ) এমন একটি রাষ্ট্র প্রার্থনা করিয়াছিলেন যাহা কেহ ছিনাইয়া লইতে না পারে, যেমন ইতিপূর্বে ছিনাইয়া লওয়া হইয়াছিল (তাফসীরে তাবারী, ১০ম বালাম, ২৩ খ, পৃ. ১০২; তাফসীরে কবীর, ২৬খ, পৃ. ২১০; যাদুল মাসীর, ৭খ, পৃ. ১৩৯; তাহযীব তারীখ দিমাস্ক, ৬খ, পৃ. ২৬৬)।
কাহারও মতে তিনি একটি বিশালায়তন সাম্রাজ্য প্রার্থনা করিয়াছিলেন এবং এই মতের তাফসীরকারগণ ইহার এক বিস্তৃত এলাকার বর্ণনা দিয়াছেন যাহা ঐতিহাসিক মূল্যায়নে প্রমাণিত হয় না। বাইবেলে সুলায়মান (আ)-এর সাম্রাজ্যের সীমা সম্পর্কে বলা হইয়াছে, "আর (ফরাত) নদী অবধি পলেস্টীয়দের (ফিলিস্তিনী) দেশ ও মিসরের সীমা পর্যন্ত যাবতীয় রাজ্যের উপরে শলোমন কর্তৃত্ব করিতেন” (১ম রাজাবলী, ৪: ২১০)।
অর্থাৎ উত্তর-পূর্বে ফোরাত নদী পর্যন্ত, দক্ষিণ-পূর্বে ইয়ামন পর্যন্ত, পশ্চিমে ফিলিস্তিনীদের দেশ ও রোম সাগর, উত্তর গালীলী পর্যন্ত এবং দক্ষিণে মিসর পর্যন্ত তাঁহার রাজত্ব বিস্তৃত ছিল (আম্বিয়া-ই কুরআন, ৩খ, পৃ. ১১২)। ইব্‌ন আসাকির তাওরাত কিতাবের বরাতে বলেন যে, সুলায়মান (আ)-এর রাজত্ব ফিলিস্তীন, জর্দান ও আল-গাওর-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এবং রাফাজ, গাযা, আসকালান, সূর, সায়দা, দিমাঙ্ক, আম্মান, বালকা, মুআব ও জাবাল আশ-শারাত কখনও তাঁহার শাসনভুক্ত ছিল না। তিনি তাওরাতের উক্ত বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করিয়া বলেন যে, ইহা তাওরাতের রচয়িতাগণের মিথ্যাচার বৈ কি (তাহযীব তারীখ দিমাল্ক, ৬খ, পৃ. ২৬৭)। উক্ত বক্তব্য বর্তমান বাইবেল হইতে খুঁজিয়া বাহির করা সম্ভব হয় নাই (নিবন্ধকার)।
বর্তমান প্রেক্ষাপটেও বিশালায়তন সাম্রাজ্য সংক্রান্ত মত গ্রহণযোগ্য নহে। কারণ বর্তমান কালেও পৃথিবীতে এমন কয়েকটি বিশালায়তন সাম্রাজ্য আছে যেইগুলির প্রতিটির আয়তন সুলায়মান (আ)-এর সাম্রাজ্যের তুলনায় অনেক বিশাল।
যুক্তিসংগত মত এবং যাহা অধিকাংশ তাফসীরকার গ্রহণ করিয়াছেন তাহা এই যে, আল্লাহ তাআলা হযরত সুলায়মান (আ)-কে মানবজাতি ছাড়াও জিন জাতি, পক্ষীকুল, এমনকি বায়ুর উপর রাজত্ব ও কর্তৃত্ব করিবার (مُلْكًا) এবং নির্বাক প্রাণীর ভাষা বুঝিবার শক্তি (عُلِّمْنَا) দান করিয়াছিলেন, অনুরূপ কর্তৃত্বলাভ আজ পর্যন্ত কাহারও পক্ষে সম্ভব হয় নাই এবং কিয়ামত পর্যন্ত হইবেও না (তাফসীরে কবীর, ২৬খ, পৃ. ২০৯; যাদুল মাসীর, ৭খ, পৃ. ১৩৮; আরাইস, পৃ. ৩১৫; বিদায়া, ২খ, পৃ. ২৮ ও ৩০; তাহযীব তারীখ দিমাশক, ৬খ, পৃ. ২৫৮; আল-কামিল, ১খ, পৃ. ১৭৫; মাআরিফুল কুরআন, ৭খ, পৃ. ৫১৮-৯)। ইমাম রাযী (র) বলেন, "ইন্নাল মুল্কা হুয়াল কুদরাহ" (মুল্ক অর্থাৎ শক্তি)। যেন সুলায়মান (আ) বলিয়াছেন, আমাকে কতগুলি জিনিসের উপর এমন নিয়ন্ত্রণশক্তি দান করুন, অবশ্যই আমি ছাড়া অপর কেহ যেন সেইগুলির উপর নিয়ন্ত্রণশক্তি লাভ করিতে না পারে, যাহাতে উহা আমার নবুওয়াত ও রিসালাতের সত্যতার দলীলস্বরূপ মু'জিযা হইতে পারে। পরবর্তী (৩৮: ৩৬-৩৮) আয়াত ('তখন আমি তাহার অধীন করিয়া দিয়াছিলাম বায়ুকে...) হইতেও উক্ত মতের সমর্থন পাওয়া যায় (তাফসীরে কবীর, ২৬খ, পৃ. ২০৯; যাদুল মাসীর, ৭খ, পৃ. ১৩৮; আরও দ্র. পূর্বোক্ত বরাতসমূহ)। মহানবী (স)-এর হাদীছ হইতেও এই মতের সমর্থন পাওয়া যায়। তিনি বলেন:
إِنَّ عِفْرِيتًا مِّنَ الْجِنِّ تَفَلَّتَ الْبَارِحَةَ لِيَقْطَعَ عَلَيَّ صَلَاتِي فَأَمْكَنَنِي اللَّهُ مِنْهُ فَأَخَذْتُ فَأَرَدْتُ أَنْ أَرْبِطَهُ عَلَى سَارِيَةٍ مِّنْ سَوَارِي الْمَسْجِدِ حَتَّى تَنْظُرُوا إِلَيْهِ كُلُّكُمْ فَذَكَرْتُ دَعْوَةَ أَخِي سُلَيْمَانَ رَبِّ هَبْ لِي مُلْكًا لَا يَنْبَغِي لِأَحَدٍ مِّنْ بَعْدِي فَرَدَدْتُهُ خَاسِئًا عِفْرِيتٌ مُتَمَرِّدٌ مِّنْ إِنْسٍ أَوْ جَانٍّ مِثْلَ زِينَةٍ جَمَاعَتُهَا الزَّبَانِيَةُ .
"একটি অবাধ্য দুষ্ট জিন্ন আমার নামায ভঙ্গ করার জন্য গত রাত্রে হঠাৎ আবির্ভূত হইল। আল্লাহ আমাকে উহাকে পাকড়াও করার ক্ষমতা দান করিলে আমি উহাকে ধরিয়া ফেলিলাম। আমি উহাকে মসজিদের একটি খুঁটির সহিত বাঁধিয়া রাখিতে মনস্থ করিলাম, যাহাতে তোমরা সকলে উহাকে দেখিতে পাও। তৎক্ষণাৎ আমার ভাই সুলায়মান (আ)-এর একটি দু'আ আমার মনে পড়িলঃ "হে আমার প্রতিপালক! আমাকে দান কর এমন এক রাজ্য যাহার অধিকারী আমি ব্যতীত আর কেহ না হয়"। অতঃপর আমি জিন্নটিকে ব্যর্থ ও বিফল করিয়া তাড়াইয়া দিলাম।"
لَمَّا فَرَغَ سُلَيْمَانُ بْنُ دَاوُدَ مِنْ بَنَاءِ بَيْتِ الْمَقْدِسِ سَأَلَ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ خِلَالًا ثَلَاثًا حُكْمًا يُصَادِفُ حُكْمُهُ وَمُلْكًا لَا يَنْبَغِي لِأَحَدٍ مِّنْ بَعْدِهِ وَأَنْ لَا يَأْتِيَ هَذَا الْمَسْجِدَ أَحَدٌ لَا يُرِيدُ إِلَّا الصَّلَاةَ فِيهِ إِلَّا خَرَجَ مِنْ ذُنُوبِهِ كَيَوْمٍ وَلَدَتْهُ أُمُّهُ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمَا اثْنَتَانِ فَقَدْ أُعْطِيَهُمَا وَأَرْجُو أَنْ يَكُونَ قَدْ أُعْطِيَ الثَّالِثَةَ .
"সুলায়মান ইব্‌ন দাউদ (আ) বায়তুল মাকদিসের নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করিবার পর আল্লাহ্র নিকট তিনটি বিষয়ের দু'আ করেন: আল্লাহ্ হুকুমমত সুবিচার, এমন রাজত্ব যাহা তাঁহার পরে আর কাহাকেও দেওয়া হইবে না এবং যে ব্যক্তি বায়তুল মাকদিসে কেবল নামায পড়ার উদ্দেশ্যে আগমন করিবে তাহার গুনাহ যেন তাহার মধ্য হইতে বাহির হইয়া যায় তাহার মাতা তাহাকে প্রসব করার দিনের মত। মহানবী (স) বলেন: প্রথম দুইটি তাঁহাকে দান করা হইয়াছে এবং আমি আশা করি যে, তৃতীয়টিও তাঁহাকে দান করা হইবে" (ইবন মাজা, ইকামাতুস সালাত, বাব মা জাআ ফিস-সালাত ফী মাসজিদ বায়তিল মাকদিস, ১খ, পৃ. ১০১; নাসাঈ, কিতাবুল মাসাজিদ, বাবুল মাসজিদিল আকসা ওয়াস-সালাত ফীহি, ১খ, পৃ.)। অতএব এই শেষোক্ত ব্যাখ্যাই যুক্তিগ্রাহ্য।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বায়তুল মাকদিস নির্মাণ

📄 বায়তুল মাকদিস নির্মাণ


বায়তুল মাকদিস পৃথিবীর সর্বপ্রাচীন দুইটি মসজিদের একটি এবং সর্বশ্রেষ্ঠ, সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ ও বরকতময় তিনটি মসজিদের অন্যতম। মহানবী (স)-এর মি'রাজের ঘটনা বর্ণনা প্রসঙ্গে কুরআন মজীদে বায়তুল মাকদিস "মাসজিদুল আকসা” (দূরবর্তী মসজিদ নামে একবার উক্ত হইয়াছে) (মি'রাজ শীর্ষক নিবন্ধে বিস্তারিত দ্র.) এবং হাদীছ শরীফে ইহা বায়তুল মাকদিস (বা মুকাদ্দাস), মাসজিদুল আকসা ও মাসজিদ ঈলিয়া নামে অভিহিত হইয়াছে (দ্র. মু'জামুল হাদীস)। কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে:
سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلاً مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلى المَسْجِدِ الْأَقْصَا الَّذِي يُرَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ أَيْتِنَا . إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ .
"পবিত্র ও মহিমময় তিনি, যিনি তাঁহার বান্দাকে আল-মাসজিদুল হারাম হইতে আল-মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত রজনীযোগে ভ্রমণ করাইয়াছেন, যাহার পরিবেশ আমি বরকতময় করিয়াছিলাম, তাহাকে আমার নিদর্শনসমূহ দেখাইবার জন্য। তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা" (১৭ঃ ১)।
মহানবী (স) হিজরত করিয়া মদীনায় পৌছিবার পর ষোল-সতের মাস পর্যন্ত বায়তুল মাকদিসের দিকে ফিরিয়া নামায পড়িয়াছিলেন (মুসলিম, মাসাজিদ, বাব তাবীলিল কিবলাতি মিনাল মাকদিসি ইলাল কা'বা; বুখারী, সালাত, বাবুত তাওয়াজ্জুহ নাহওয়াল কিবলা)। অতঃপর মসজিদুল হারামকে চিরকালের জন্য কিবলারূপে নির্দ্ধারিত করা হয়। কিবলা পরিবর্তনের এই আলোচনা প্রসঙ্গেও পরোক্ষভাবে বা ইঙ্গিতে বায়তুল মাকদিস প্রসঙ্গ আসিয়াছে (দ্র. ২ঃ ১৪২-১৪৫ এবং তাফসীর গ্রন্থাবলীতে তৎসম্পর্কিত তাফসীর)। মহানবী (স)-এর হাদীছে বায়তুল মাকদিসের পর্যাপ্ত উল্লেখ আছে।
বায়তুল মাকদিস সর্বপ্রথম কোন ব্যক্তি এবং কখন নির্মাণ করেন তাহা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। মহানবী (স)-এর নিকটও এই সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হইয়াছিল:
عَنْ أَبِي ذَرِّ قَالَ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَيُّ مَسْجِدٍ وُضِعَ أَوَّلُ قَالَ الْمَسْجِدُ الْحَرَامُ قُلْتُ ثُمَّ أَيُّ قَالَ الْمَسْجِدُ الْأَقْصَى قُلْتُ كَمْ كَانَ بَيْنَهُمَا قَالَ أَرْبَعُونَ ثُمَّ قَالَ حَيْثُمَا أَدْرَكَتْكَ الصَّلَاةُ فَصَلُّ وَالْأَرْضُ لَكَ مَسْجِدٌ
আবূ যার (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সর্বপ্রথম কোন মসজিদ নির্মাণ করা হয়? তিনি বলেন: মসজিদুল হারাম। আমি বলিলাম, উহার পর কোনটি? তিনি বলেন: মসজিদুল আকসা। আমি বলিলাম, এই দুইটির (নির্মাণের) মাঝখানে (কালের) কত ব্যবধান ছিল? তিনি বলেন: চল্লিশ বৎসর। অতঃপর তিনি আরও বলেন: যেখানেই তোমার নামাযের ওয়াক্ত হইবে সেখানেই নামায পড়িবে। গোটা পৃথিবীই তোমার জন্য মসজিদ” (বুখারী, কিতাবুল আম্বিয়া, বাব; এবং বাব ওয়া ওয়াহাবনা লিদাউদা সুলায়মান, ১খ, পৃ. ৪৭৭ ও ৪৮৭; মুসলিম, মাসাজিদ, ১ম হাদীস; নাসাঈ, মাসাজিদ, বাব যিকরি আয়্যু মাসজিদ উদিআ আওয়ালা; ইবন মাজা, মাসাজিদ, বাব আয়্যু মাসজিদ উদিআ আওয়ালান)।
উক্ত হাদীছের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনুল জাওযী (র) বলেন, কাবা ঘরের নির্মাতা হযরত ইবরাহীম (আ) এবং বায়তুল মাকদিসের নির্মাতা হযরত সুলায়মান (আ)-এর যুগের মধ্যে এক হাজার বৎসরের অধিক কালের ব্যবধান। উক্ত হাদীছের তাৎপর্য এই যে, এখানে দুই মুসজিদের ভিত্তি স্থাপনের দিকে ইঙ্গিত করা হইয়াছে অর্থাৎ সর্বপ্রথম আদম (আ) কা'বা ঘরের ভিত্তি স্থাপন করেন। অতঃপর তাঁহার বংশধরের সংখ্যা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইলে তাহারা দুনিয়ার বিভিন্ন এলাকায় ছড়াইয়া পড়ে এবং তাহাদের কোন ব্যক্তি হয়ত (কা'বা ঘর নির্মাণের চল্লিশ বৎসর পর) বায়তুল মাকদিসের ভিত্তি স্থাপন করিয়া থাকিবেন। পরে হযরত ইবরাহীম (আ) কা'বা ঘর এবং হযরত সুলায়মান (আ) বায়তুল মাকদিস পুননির্মাণ করেন। পুনর্নির্মাতা হিসাবে তাঁহাদের দুইজনকে দুই মসজিদের নির্মাতারূপে অভিহিত করা হইয়াছে (বুখারী, কিতাবুল আম্বিয়া, ১খ, পৃ. ৪৭৭, টীকা ২; কুরতুবীর আহকামুল কুরআন, ৪খ, পৃ. ১৩৮)।
ইমাম ইব্‌ন তায়মিয়্যা (র) বলেন যে, হযরত ইবরাহীম (আ)-এর যুগেই বায়তুল মাকদিস নির্মিত হইয়াছিল। অতঃপর হযরত সুলায়মান (আ) উহাকে বৃহদাকারে মজবুত করিয়া নির্মাণ করেন (মাজমুউল ফাতাওয়া, ১৭খ, পৃ.৩৫১-এর বরাতে আল-আকসা মসজিদের ইতিকথা, পৃ. ৪৭১)। অপর এক বর্ণনায় আছে যে, পৃথিবী পৃষ্ঠে সর্বপ্রথম মসজিদ হইল কা'বা শরীফ যাহা হযরত ইবরাহীম (আ) নির্মাণ করেন এবং মসজিদুল আকসা (বায়তুল মাকদিস) হইল দ্বিতীয় মসজিদ, যাহা প্রথমোক্ত মসজিদ নির্মাণের চল্লিশ বৎসর পর হযরত ইয়া'কূব (আ) নির্মাণ করেন। অতঃপর হযরত দাউদ (আ) উহার সংস্কার করেন এবং হযরত সুলায়মান (আ) উহার পুনর্নির্মাণ করেন (বিদায়া, ১খ, পৃ. ১৫২; ডঃ আবদুল আলীম খিদির রচিত আত-তাতাউর আল-উমরানী লি-মাদীনাতিল কুদ্‌স্স গ্রন্থের বরাতে আল-আকসা মসজিদের ইতিকথা, পৃ. ৩৭)। অপর এক বর্ণনায় আছে যে, আহলে কিতাব মতে কা'বা ঘর নির্মাণের চল্লিশ বৎসর পর হযরত ইয়া'কূব (আ)-ই বায়তুল মাকদিসও নির্মাণ করেন (বিদায়া, ১খ, পৃ. ১৫২, দারুল কুতুব আল- ইলমিয়‍্যা, ৪র্থ সং; আরও দ্র. পৃ. ১৮৪)।
বাইবেলে বলা হইয়াছে যে, হযরত দাউদ (আ) বায়তুল মাকদিস নির্মাণের চিন্তা-ভাবনা করিয়াছিলেন, কিন্তু যুদ্ধ-সংঘাতে ব্যতিব্যস্ত থাকার কারণে তাঁহার পক্ষে উহার নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হয় নাই (দ্র. ১ম রাজাবলী, ৫: ৩)। তবে তিনি উহার নির্মাণ কার্যের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণাদি সংগ্রহে মনোনিবেশ করিয়াছিলেন এবং হযরত সুলায়মান (আ)-কে উহা নির্মাণের হুকুম দিয়াছিলেন (দ্র. ১ম বংশাবলী, ২২ঃ ১-৭)। এই উদ্দেশে হযরত সুলায়মান (আ) সোর (লেবানন, ফিনিসীয় নামেও অভিহিত)-এর রাজা হীরমের নিকট এরস কাষ্ঠ, দেবদারু ও নির্মাণ শ্রমিক চাহিয়া পাঠাইলে তিনি সানন্দে তাহা দিতে সম্মত হইলেন (১ম রাজাবলী, ৫ম অধ্যায়)। তিনি তাঁহার রাজত্বের চতুর্থ বর্ষের দ্বিতীয় মাসের দ্বিতীয় দিবসে এবং মিসর হইতে বনূ ইসরাঈলের নির্গত হইয়া আসিবার চারি শত আশি বৎসরের মাথায় বায়তুল মাকদিসের নির্মাণ কাজ শুরু করেন (১ম বংশাবলী, ৬:১ ও ৩৭; ২য় বংশাবলী, ৩:২; তাফসীরে কুরতুবী, ১৪খ, পৃ. ২৫ ও ২৮১)।
হযরত সুলায়মান (আ) ইহার নির্মাণকর্মে অসংখ্য শ্রমিক নিয়োগ করিলেন এবং সাড়ে সাত বৎসরে তাঁহার রাজত্বের একাদশ বৎসরের অষ্টম মাসে ইহার নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হইল। এই হিসাবে ইহার নির্মাণ তারিখ খৃ. পৃ. ৯৬০-৯৫৩ সাল নির্ণীত হয় (আম্বিয়া-ই কুরআন, ৩খ, পৃ. ১০৯)।
তিনি দীর্ঘ সাত বৎসর বায়তুল মাকদিসের নির্মাণকর্মে ব্যাপৃত ছিলেন (১ম রাজাবলী, ৬: ৩৮)। তিনি আল্লাহ্র ঘর নির্মাণে অতি মূল্যবান কাষ্ঠ ও প্রস্তর ব্যবহার করেন এবং স্বর্ণ, রৌপ্য ও অন্যান্য দামী ধাতব পাত দ্বারা ইহার দরজা-জানালা ইত্যাদি কারুকার্যময় করিলেন, ইহার দেওয়াল গাত্র কারুবের, খেজুর বৃক্ষের ও বিকশিত পুষ্পের ভাস্কর্যে সুশোভিত করিলেন (বায়তুল মাকদিস নির্মাণ সম্পর্কিত বিষয়ে বিস্তারিত দ্র. ১ম রাজাবলী, ৫-৯ অধ্যায় এবং ২য় রাজাবলী, ৩-৭ অধ্যায়)। এই মহান গৃহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি তাঁহার দীর্ঘ প্রার্থনার সূচনা করেন এইভাবেঃ "হে সদাপ্রভু! ইসরাঈলের প্রভু! আকাশে কি পৃথিবীতে তোমার তুল্য প্রভু নাই" (২য় বংশাবলী, ৬:২৪)।
কুরআন মজীদের বক্তব্য অনুসারে হযরত সুলায়মান (আ) তাঁহার ইমারতাদির নির্মাণকার্যে জিন্নদিগকে শ্রমিক হিসাবে নিয়োগ করিয়াছিলেন। তাফসীরকারগণের মতে, তিনি তাঁহার নির্মাণকর্ম তদারকরত অবস্থায় ইনতিকাল করেন। এই সম্পর্কিত কুরআন মজীদের বক্তব্য নিম্নরূপঃ
فَلَمَّا قَضَيْنَا عَلَيْهِ الْمَوْتَ مَا دَلَّهُمْ عَلَى مَوْتِهِ إِلا دَابَّةُ الْأَرْضِ تَأْكُلُ مِنْسَاتَهُ ، فَلَمَّا خَرَّ تَبَيِّنَتِ الْجِنُّ أَنْ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ الْغَيْبَ مَا لَبِثُوا فِي الْعَذَابِ الْمُهِينِ .
"যখন আমি সুলায়মানের মৃত্যু ঘটাইলাম তখন জিন্নদিগকে তাহার মৃত্যু বিষয় জানাইল কেবল মাটির পোকা যাহা তাহার লাঠিকে খাইতেছিল। সে যখন পড়িয়া গেল তখন জিন্নেরা বুঝিতে পারিল যে, উহারা যদি অদৃশ্য বিষয় অবগত থাকিত তাহা হইলে উহারা লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তিতে আবদ্ধ থাকিত না" (৩৪: ১৪)।
আয়াতে স্পষ্ট উল্লেখ নাই যে, হযরত সুলায়মান (আ) বায়তুল মাকদিস বা অন্য কোন নির্মাণকার্য তদারকরত অবস্থায় ইনতিকাল করেন। কতক তাফসীরকার বলিয়াছেন যে, তিনি বায়তুল মাকদিসের নির্মাণকার্য তদারকরত অবস্থায় ইনতিকাল করেন। ইহার নির্মাণকার্য সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত কয়েক মাস বা এক বৎসর তাঁহার মৃতদেহ লাঠিতে ভর দেওয়া অবস্থায় তাঁহার জীবিত অবস্থার মতই স্থির থাকে। নির্মাণকার্য সমাপ্ত হওয়ার সংগে সংগে লাঠিটি মাটির পোকায় (উই অথবা ঘুণ) খাইয়া ফেলার কারণে ভাঙ্গিয়া যায় এবং তাঁহার প্রাণহীন দেহটি মাটিতে পড়িয়া যায় (কুরতুবীর আহকামুল কুরআন, ১৪খ, পৃ. ২৭৮; তাফসীরে কবীর, ২৫খ, পৃ. ২৫০; তাফসীরে তাবারী, ২২খ, পৃ. ৫২ ইত্যাদি)।
উপরিউক্ত মত যথার্থ নহে। কারণ মহানবী (স)-এর হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত যে, হযরত সুলায়মান (আ)-এর জীবদ্দশায়ই বায়তুল মাকদিসের নির্মাণকর্ম সমাপ্ত হইয়াছিল। মহানবী (স) বলেন : “সুলায়মান ইব্‌ন দাউদ (আ) বায়তুল মাকদিসের নির্মাণকাজ সমাপ্ত করিবার পর আল্লাহ্র নিকট তিনটি বিষয়ের দো'আ করেন...” (নাসাঈ, কিতাবুল মাসাজিদ, বাবুল মাসজিদিল আকসা ওয়াস-সালাত ফীহি, ১ম খ, পৃ.; ইব্‌ন মাজা, ইকামাতুস-সালাত, বাব মা জাআ ফিস-সালাত ফী মাসজিদ বায়তিল মাকদিস, ১খ, পৃ. ১০১)। ইমাম সুদ্দী (র)-এর বর্ণনায় আছে যে, বায়তুল মাকদিসের নির্মাণকাজ সমাপ্ত করিবার দিনটিকে হযরত সুলায়মান (আ) ঈদের দিন হিসাবে গ্রহণ করেন এবং আল্লাহ্র প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ বারো হাজার গরু এবং বিশ হাজার মেষ কুরবানী করিয়া জনসাধারণকে আপ্যায়িত করিলেন, অতঃপর সাখরার উপর দায়মান হইয়া দো'আ করিলেন : হে আল্লাহ! আমাকে উক্ত নিয়ামতের শোকর আদায় করার তৌফিক দান করুন, আমাকে আপনার দীনের উপর মৃত্যু দান করুন এবং হিদায়াত প্রাপ্তির পর আর আমার অন্তরে কোনও বক্রতা সৃষ্টি করিবেন না। ইয়া আল্লাহ! যে ব্যক্তি এই মসজিদে প্রবেশ করিবে আমি তাহার জন্য আপনার নিকট পাঁচটি বিষয়ের দো'আ করিতেছিঃ (১) গুনাহগার ব্যক্তি তওবা করার জন্য এই মসজিদে প্রবেশ করিলে আপনি তাহার তওবা কবুল করুন এবং তাহাকে মাফ করুন। (২) কোন ব্যক্তি ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া আত্মরক্ষার জন্য এই মসজিদে প্রবেশ করিলে আপনি তাহাকে নিরাপত্তা দান করুন। (৩) রুগ্ন ব্যক্তি এই মসজিদে প্রবেশ করিলে আপনি তাহাকে আরোগ্য দান করুন। (৪) নিঃস্ব ব্যক্তি এই মসজিদে প্রবেশ করিলে আপনি তাহাকে ধনাঢ্য করুন। (৫) এই মসজিদে প্রবেশকারী যতক্ষণ এখানে অবস্থান করে, ততক্ষণ আপনি তাহার প্রতি কৃপাদৃষ্টি রাখুন; তবে কেহ অন্যায় অধর্মের কাজে লিপ্ত হইলে তাহার প্রতি নহে"। আল-মাওয়ারদী (র) ইহা উল্লেখ করিয়াছেন (তাফসীরে কুরতুবী, ১৪খ, পৃ. ২৮১-২)। বাইবেলেও অনুরূপ ভোজন উৎসব ও দীর্ঘ দু'আর অনুষ্ঠানের উল্লেখ আছে (দ্র. দ্বিতীয় বংশাবলী, ৫৪৩-৬; ৬ঃ ১০-৪২)। ইহা দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, হযরত সুলায়মান (আ)-এর জীবদ্দশায়ই বায়তুল মাকদিসের নির্মাণকাজ সমাপ্ত হইয়াছিল এবং "তাবৃতে সাকীনা"ও উক্ত গৃহের নির্দিষ্ট স্থানে সংরক্ষিত করা হইয়াছিল (২য় বংশাবলী, ৫৪৭)।
ইয়াহুদী জাতি ও জাহিলী আরবের ধারণা ছিল যে, জিন্নেরা অদৃশ্য'বিষয় সম্পর্কে অবহিত। উক্ত আয়াত নাযিলের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা তাহাদের জানাইয়া দিয়াছেন যে, জিন্নদের গায়বী বিষয়ের জ্ঞান নাই (কাসাসুল কুরআন, ২খ, পৃ. ১৬৮-৯)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বায়তুল মাকদিসের মর্যাদা

📄 বায়তুল মাকদিসের মর্যাদা


মহান আম্বিয়া-ই কিরাম কর্তৃক নির্মিত পৃথিবীর তিনটি মসজিদ সর্বাধিক মর্যাদার অধিকারী এবং যুগ-যুগান্তরের পরিক্রমায় আজও ইতিহাসের সাক্ষীরূপে দাঁড়াইয়া আছে। বায়তুল মাকদিস সমভাবে মুসলিম, খৃস্টান ও ইয়াহুদীন জাতির নিকটই মর্যাদাপূর্ণ এবং তাহাদের যিয়ারত স্থান। কুরআন মজীদে বায়তুল মাকদিসের উল্লেখের পরপরই বলা হইয়াছে, "ইহার পরিবেশকে আমি বরকতময় করিয়াছি তাহাকে আমার নিদর্শনসমূহ দেখাইবার জন্য" (১৭: ১)। শায়খুল হিন্দের তরজমাঃ "এই ঘরকে আমার বরকত বেষ্টন করিয়া রাখিয়াছে” (তাফসীরে উছমানী, পৃ. ৩৭৩)। বায়তুল মাকদিসের এলাকায় বহু সংখ্যক নবী-রাসূলের আর্বিভাব হইয়াছিল, যাহাদের অনেককেই এখানে দাফন করা হইয়াছে। উপরন্তু মহানবী (স) মি'রাজে যাওয়ার পথে এখানেই আম্বিয়া-ই কিরামের সঙ্গে তাঁহার বরকতময় মর্যাদাপূর্ণ সাক্ষাত হয় (তাফসীরে উছমানী, পৃ. ৩৭৪, টীকা ৩; তাফসীরে কুরতুবী, ১০খ, পৃ. ২১২)। মহানবী (স) বলেনঃ
لَا تُشَدُّ الرِّحَالُ إِلَّا إِلَى ثَلاثَةِ مَسَاجِدَ مَسْجِدِ الْحَرَامِ وَمَسْجِدِي هَذَا وَمَسْجِدِ الْأَقْصَى .
"তিনটি মসজিদ ব্যতীত অন্য কোথায়ও (সওয়াবের অভিপ্রায়ে) সফর করা যায় না: মসজিদুল হারাম, আমার এই মসজিদ এবং মসজিদুল আকসা” (তিরমিযী, সালাত, বাব মা জাআ ফী আয়্যুল মাসাজিদ আফদাল, ১খ, পৃ. ৪৪; বুখারী, তাহাজ্জুদ, বাব ফাদলিস সালাত ফী মাসজিদ মাক্কা ওয়াল মাদীনা এবং বাব মাসজিদ বায়তিল মাকদিস; ইহা ব্যতীত দ্র. মুসলিম, হজ্জ; আবূ দাউদ, মানাসিক; নাসাঈ, মাসাজিদ; মুওয়াত্তা, জুমুআ; ইবন মাজা, ইকামাতুস সালাত, বাব মা জাআ ফিস সালাত ফী মাসজিদ বায়তিল মাকদিস, ১খ, পৃ. ১০১; দারিমী, সালাত ইত্যাদি অধ্যায়)।
উপরিউক্ত হাদীছের ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞ আলিমগণ বলেন যে, কোন ব্যক্তি এমন কোন মসজিদে নামায পড়ার মানত করিলে, যেখানে পৌঁছাইতে সফর করিতে হয়, মানত পূর্ণ না করিয়া নিজের বসতির নিকটস্থ মসজিদে মানতের নামায আদায় করিবে। তবে হাদীছে উক্ত তিনটি মসজিদে নামায আদায়ের মানত করিলে তথায় পৌঁছিয়া উক্ত নামায আদায় করিবে (তাফসীরে কুরতুবী, ১০খ, পৃ. ২১২)। শায়খুল হিন্দ মাহমূদুল হাসান (র) বলেন, উক্ত তিনটি মসজিদ ব্যতীত অন্য কোন মসজিদের উদ্দেশে সফর করা যাইবে না... অর্থাৎ মসজিদের উদ্দেশে সফর করা নিষেধ (তিরমিযী, তাকারীর, পৃ. ১৫-১৬)।
عَنْ مَيْمُونَةَ مَوْلاةَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَتْ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ افْتِنَا فِي بَيْتِ الْمَقْدِسِ قَالَ أَرْضُ المَحْشَرِ وَالْمَنْشَرِ ابْتُوهُ فَصَلُّوا فِيهِ فَإِنَّ صَلوةٌ فِيهِ كَالْفِ صَلوةٌ فِي غَيْرِهِ قُلْتُ أَرَأَيْتَ إِنْ لَمْ أَسْتَطِعْ أَنْ اتَحَمَلَ إِلَيْهِ قَالَ فَتَهْدِي لَهُ زَيْتًا يُسْرَجُ فِيْهِ فَمَنْ فَعَلَ ذَلِكَ فَهُوَ كَمَنْ آتَاهُ .
"মহানবী (স)-এর মুক্তদাসী মায়মূনা (রা) বলেন, আমি বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! বায়তুল মাকদিস সম্পর্কে আমাদেরকে ফতওয়া দিন। তিনি বলেন: ইহা তো হাশরের ময়দান এবং সকলের একত্র হওয়ার স্থান। তোমরা উহাতে নামায পড়। কারণ তথায় এক ওয়াক্ত নামায পড়া অন্যান্য স্থানের নামাযের তুলনায় এক হাজার গুণ শ্রেষ্ঠ। আমি বলিলাম, আপনি কি মনে করেন, আমি যদি তথায় পৌঁছিতে সক্ষম না হই? তিনি বলেন: উহাতে বাতি জ্বালাইবার জন্য তুমি যায়তুন তৈল হাদিয়া পাঠাও। যে ইহা করিল সে যেন তথায় উপস্থিত হইল" (ইবন মাজা, মাসাজিদ, ১খ, পৃ. ১০১)।
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَلَاةُ الرَّجُلِ فِي بَيْتِهِ بِصَلَوَةٍ وَصَلَاتُهُ فِي مسجد القبائل بِخَمْسٍ وَعِشْرِينَ صَلَوَةً وَصَلَاتُهُ فِي الْمَسْجِدِ الَّذِي يُجَمَّعُ فِيهِ بِخَمْسٍ مِائَةٍ صَلَاةٍ وَصَلَاتُهُ فِي الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى بِخَمْسِينَ أَلْفَ صَلَوَةٍ وَصَلَاتُهُ فِي مَسْجِدِي بِخَمْسِينَ أَلْفَ صَلَوَةٍ وَصَلَاتُهُ فِي الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ بِمِائَةِ أَلْفَ صَلَوَةٍ .
"আনাস ইবন মালিক (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: কোন ব্যক্তির নিজ গৃহে এক ওয়াক্ত নামায পড়ার ছওয়াব এক ওয়াক্ত নামাযেরই সমান। তাহার পাড়ার বা গোত্রের মসজিদে তাহার এক নামায পঁচিশ নামাযের সমতুল্য। জুমুআ মসজিদে তাহার এক নামায পাঁচ শত নামাযের সমতুল্য। মসজিদুল আকসায় তাহার এক নামায পঞ্চাশ হাযার নামাযের সমতুল্য। আমার মসজিদে তাহার এক নামায পঞ্চাশ হাযার নামাযের সমতুল্য এবং মসজিদুল হারামে তাহার এক নামায এক লক্ষ নামাযের সমতুল্য" (ইবন মাজা, মাসাজিদ, বাব মা জাআ ফিস-সালাত ফিল-মাসজিদিল জামি, ১খ, পৃ. ১০২)।
عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ مَنْ أَهَلَّ بِعُمْرَةٍ مِنْ بَيْتِ الْمُقَدَّسِ غُفِرَ لَهُ .
"উম্মু সালামা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: যে ব্যক্তি বায়তুল মুকাদ্দাস হইতে উমরার উদ্দেশে ইহ্রাম বাঁধিল, তাহাকে ক্ষমা করা হইল" (ইবন মাজা, মানাসিক, বাব মান আহাল্লা বিউমরাতিন মিন বায়তিল মুকাদ্দাস, ২খ, পৃ. ২১৫)। উম্মু সালামা (রা)-র অপর বর্ণনায় আছে:
مَنْ أَهَلَّ بِعُمْرَةٍ مِنْ بَيْتِ الْمُقَدَّسِ كَانَتْ لَهُ كَفَّارَةٌ لِمَا قَبْلَهَا مِنَ الذُّنُوبِ قَالَتْ فَخَرَجَتْ أُمِّي مِنْ بَيْتِ الْمُقَدَّسِ بِعُمْرَةٍ .
"কোন ব্যক্তি বায়তুল মুকাদ্দাস হইতে উমরার উদ্দেশে ইহ্রাম বাঁধিলে তাহাতে তাহার পূর্বেকার সমস্ত গুনাহ্ কাফ্ফারা হইয়া যায়। উম্মু সালামা (রা) বলেন, অতএব আমার মা বায়তুল মুকাদ্দাস হইতে উমরার উদ্দেশে রওয়ানা হইলেন" (ইবন মাজা, মানাসিক, বাব ঐ, ২খ, পৃ. ২১৫)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00